রবিবার, নভেম্বর ১৯, ২০১৭
হোম > সাক্ষাৎকার > ইসলামী আইন হিসেবে হুদুদের প্রয়োগযোগ্যতা (প্রথম পর্ব)

ইসলামী আইন হিসেবে হুদুদের প্রয়োগযোগ্যতা (প্রথম পর্ব)

এডিটর’স নোট:

ইসলামী আইন, এমনকি শরীয়াহ বলতে অনেকে হুদুদকে বুঝে থাকেন। এই ভুল ধারণা দূর করতে প্রফেসর ড .মোহাম্মদ হাশিম কামালীর এই সাক্ষাৎকারটি বেশ কাজে দেবে। ২০১১ সালের ৩ অক্টোবর ‘মালয়েশিয়ান অবজারভার’ টিভির ‘লেট’স টক’ অনুষ্ঠানে ইসলামী আইন ও হুদুদের ধারণা, প্রয়োগ ও বাস্তবতা ইত্যাদি নিয়ে তিনি বিস্তারিত কথা বলেন। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য আজ সাক্ষাৎকারটির অনুবাদের প্রথম অংশ তুলে ধরা হলো। শেষাংশ পড়তে ভিজিট করুন এখানে


প্রিয় দর্শক! ‘মব টিভি’র এই অনুষ্ঠানে আমাদের সাথে যোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। ‘লেটস টক’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে আপনাদের সাথে আছি আমি জাহাবেরদীন মোহাম্মদ ইউনুস।

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, মালয়েশিয়ায় ইসলামী আইনের পরিধি আরো বাড়ানোর কি দরকার আছে? বিদ্যমান চুক্তি আইন, দণ্ডবিধি, সড়ক পরিবহন আইন প্রভৃতি ইসলামী আইন কি যথেষ্ট নয়? এগুলো কি ইসলামী আইন নয়?

যাই হোক, মালয়েশিয়ার প্রতিটি নির্বাচনী প্রচারণায় হুদুদ আইনের বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনার প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়। এটিকে অনেক বেশি রাজনৈতিকীকরণ করে ফেলা হয়েছে। যার ফলে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে মালয়েশিয়ার নাগরিকরা সামগ্রিকভাবে বিষয়টি নিয়ে কনফিউজড। অথচ, হুদুদ আইন কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়। এটি একটি আইনী ব্যাপার, আরো স্পষ্ট করে বললে, ইসলামী আইনী ব্যাপার।

এসব বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য আজকে আমাদের সাথে রয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী স্কলার প্রফেসর ড. মোহাম্মদ হাশিম কামালী। ইসলামী আইন ও আইনশাস্ত্র (ফিকাহ) নিয়ে তিনি অনেকগুলো বই লিখেছেন। বর্তমানে তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব অ্যাডভান্সড ইসলামিক স্টাডিজের’ চেয়ারম্যান এবং সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আজকের অনুষ্ঠানে আপনাকে স্বাগতম, প্রফেসর।

হাশিম কামালী: ধন্যবাদ।



মোহাম্মদ ইউনুস: প্রায় বছর তিনেক আগে আপনার লেখা ‘Islamic Law in Malaysia: Issues and Developments’ বইটি এখন আমার হাতে রয়েছে। এখানে একটি পুরো চ্যাপ্টার জুড়ে আপনি হুদুদ আইনের উপর বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। দর্শকদের জানার জন্য আপনি কি বলবেন, হুদুদ আইন আসলে কী?

হাশিম কামালী: হুদুদ আইন হচ্ছে এমন আইন, যেগুলো কোরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট। বিশেষ করে যেসব অপরাধের শাস্তি কোরআনে সুনির্দিষ্ট বলা আছে, সেগুলো হুদুদ আইনের আওতাভুক্ত। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুন্নাহ থেকেও দৃষ্টান্ত নেয়া হয়। যদিও হুদুদের মতো বড় ধরনের শাস্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোরআনের নির্দেশই সর্বোচ্চ।

মোহাম্মদ ইউনুস: হুদুদ আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? আমরা আসলে জানতে চাই, হুদুদ আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য একে কি একটি দেশের ‘ল অব দ্যা ল্যান্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতেই হবে?

হাশিম কামালী: যে কোনো ফৌজদারী আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। শাস্তি প্রদানের আরো একটি অন্যতম উদ্দেশ্য নিশ্চয় অপরাধ দমন করা। এখন বিধিবদ্ধ আইনী কাঠামোর মাধ্যমেই হুদুদ প্রয়োগ করা জরুরি কিনা তা নির্ভর করে ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষের উপর। ইসলামে রাষ্ট্রীয় আইন (সিয়াসাহ শরীয়াহ) প্রণয়নের ব্যাপারে শাসকের সিদ্ধান্ত বা মতামত অনুমোদিত। বিশেষ করে, অপরাধ দমন ও অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা এবং ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য সর্বোত্তম পদ্ধতি গ্রহণ করার অনুমোদন শাসককে দেয়া হয়েছে।

মোহাম্মদ ইউনুস: সিয়াসাহ শরীয়াহ নিয়ে আপনার কথাগুলো খুবই ইন্টারেস্টিং। কারণ আপনার মতে, অপরাধ দমনের জন্য সম্ভাব্য সর্বোত্তম পন্থা গ্রহণের স্বাধীনতা শাসক কিংবা সরকারের রয়েছে। কিন্তু প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী হুদুদ আইন সমাজে, বিশেষ করে মুসলিম সমাজে, বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। কারণ, যে কোনো মুসলিম সমাজের উপর হুদুদ আইন বাধ্যতামূলক বলে অনেকের ধারণা। এ ব্যাপারে…

হাশিম কামালী: হ্যা, হুদুদ প্রয়োগ শরীয়াহ বাস্তবায়নের একটি শর্ত। কিন্তু হুদুদ প্রয়োগের সর্বোত্তম উপায়টা কী? হুদুদ প্রয়োগের ভিন্ন ভিন্ন উপায় আছে। একটি হলো, নিছক বাস্তবায়ন করার জন্যই হুদুদ প্রয়োগ করা। এটা হলো এ সংক্রান্ত নির্দেশনাগুলোকে আক্ষরিক অর্থে বিবেচনা করার ফল। আরেকটা পদ্ধতি হলো ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে হুদুদ কার্যকর করা। এখন, সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হচ্ছে সর্বোত্তম উপায়টি খুঁজে বের করা। আইন, পলিসি ডকুমেন্টস কিংবা অন্য কোনো মানদণ্ডের আলোকে হুদুদ বাস্তবায়নের সর্বোত্তম উপায়টি ঠিক করে নেয়ার অনুমোদন ইসলামে রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে মৌলিক শর্ত হলো অপরাধের শাস্তি এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি নিশ্চিত করা। এ দুটি বিষয় নিশ্চিত করার জন্যই কোরআন সুনির্দিষ্ট কয়েকটি শাস্তির বিধান তথা হুদুদ নির্ধারণ করে দিয়েছে।

মোহাম্মদ ইউনুস: তারমানে আপনার মতে, এখানে দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় রয়েছে। একটি হচ্ছে নিছক বাস্তবায়নের জন্যই হুদুদ বাস্তবায়ন করা। আর অপরটি হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যের বাস্তবায়ন করা, যা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে তো দ্বিতীয়টি প্রথমটিকে খারিজ করে দেয়।

হাশিম কামালী: ঠিক বলেছেন। মালয়েশিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে হুদুদকে যেভাবে চিত্রিত করা হয়, আমি তার সমালোচনা করি। হুদুদকে অনেক বেশি রাজনৈতিকীকরণ করে ফেলা হয়েছে, যা একটু আগে আপনিও বলেছেন। হুদুদের প্রকৃত উদ্দেশ্য জনগণের কাছে তুলে ধরার পরিবর্তে এটিকে দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে।

শাব্দিক অর্থের দিক থেকেই হুদুদের আওতাধীন হলো স্বল্পসংখ্যক ও সুনির্দিষ্ট কিছু শাস্তি। শরীয়াহ ও ফিকাহর আলোচনায় যথেষ্ট সাবধানতার সাথে এইসব শাস্তি প্রক্রিয়াগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে কিছু কিছু শাস্তির উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজকে নৈতিকতার সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যাওয়া। উদাহরণ হিসেবে ব্যভিচারের শাস্তির কথা বলা যায়। এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে কোরআনে ১০০ বেত্রাঘাতের কথা বলা হয়েছে। তবে এটি কার্যকরের পূর্বশর্ত হলো– এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে, এমন চারজন সাক্ষীকে সাক্ষ্য দিতে হবে। কেউ যদি একেবারে মার্কেটপ্লেসের মতো উন্মুক্ত কোনো স্থানে এ ধরনের কাজ না করে থাকে, তাহলে তো চারজন প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া খুবই কঠিন ব্যাপার!

এ ধরনের কঠিন শর্তারোপের কথা কোরআনে বলা থাকায় বুঝা যায়, হুদুদ প্রয়োগ করার জন্যই হুদুদের বিধান নয়। সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে হুদুদের কথা বলা হয়েছে বটে। তবে আরো নমনীয় শাস্তি প্রয়োগের কথাও বলা হয়েছে। একে বলা হয় ‘তাজীর’। হুদুদ প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় সকল পূর্বশর্ত যথাযথভাবে পূরণ করা না গেলে আরেক ধাপ নিচের শাস্তি তাজীর প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। আমি মনে করি, দণ্ডবিধিসহ মালয়েশিয়ায় প্রচলিত যেসব আইনের কথা একটু আগে আপনি বলেছেন, সেগুলো তাজীরের অন্তর্ভুক্ত।

মোহাম্মদ ইউনুস: আপনার কথার সারমর্ম হলো, রাষ্ট্রীয় আইনের (সিয়াসাহ শরীয়াহ) ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের বাহ্যিক কাঠামোর চেয়ে ন্যায়বিচারের অন্তর্গত প্রেরণা প্রতিষ্ঠা করাই হলো ইসলামের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য। সেক্ষেত্রে আপনি বলতে চাচ্ছেন, চুরি, প্রতারণা ও আত্মসাৎসহ নানা ধরনের অপরাধের জন্য যেসব দণ্ডবিধি রয়েছে, সেসব যদি ন্যায়বিচারের ইসলামী মূলনীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ থাকে, তাহলে এগুলোকে তাজীর হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করা যাবে?

হাশিম কামালী:  হ্যাঁ। আমি মনে করি তাজীর একটি সাধারণ আইন। আপনি যেসব আইনের কথা বলেছেন, সেগুলো মালয়েশিয়ার পার্লামেন্ট ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করেছে। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা এগুলোকে আইনে পরিণত করেছে। ‘উলিল আমর’, অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এগুলো হয়েছে। ফলে মালয়েশিয়ার আইনকানুন সিয়াসাহ শরীয়াহর আওতার মধ্যেই রয়েছে।

মোহাম্মদ ইউনুস: প্রচলিত দণ্ডবিধি বা চুক্তি আইন ইত্যাদি তো ইসলামী আইন বিশারদগণ (ফকীহ) প্রণয়ন করেননি। এগুলো ‘সিভিল সিস্টেম’ তথা পার্লামেন্টের মাধ্যমে হয়েছে। আমার প্রশ্ন হলো, কোনো আইনকে ‘ইসলামী’ হতে হলে কি তা ফিকাহবিদদের নিকট থেকেই আসতে হবে? নাকি কোরআন ও সুন্নাহর মধ্যে যেসব মূলনীতি পাওয়া যায়, তারসাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়াটাই যথেষ্ট?

হাশিম কামালী: প্রতিটি আইনকে অবশ্যই টেক্সট থেকে আসতে হবে– এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখবো, শাসক, গভর্নর, খলিফা কিংবা সুলতানগণ যেসব অর্ডিন্যান্স, পলিসি ডকুমেন্টস ও আইন প্রণয়ন করেছেন সেগুলোর পেছনে সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মতো সুনির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্য উদ্দেশ্য ছিল। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য গৃহীত যে কোনো পদক্ষেপই শরীয়াহ তথা ইসলামের উদ্দেশ্যের আওতাভুক্ত।

ইবনে কাইয়ুম (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ‘সিয়াসাহ আস-শরীয়াহ’ গ্রন্থে তো আসলে এ কথাই বলেছেন। তিনি বলেছেন, সকল আইনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জনগণের কল্যাণ সাধন, তাদেরকে দুর্নীতি ও ক্ষতিকর কোনো কিছু থেকে দূরে রাখা। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গৃহীত যে কোনো উপায় কিংবা পদ্ধতিই ইসলাম ও শরীয়াহর অন্তর্ভুক্ত।

মোহাম্মদ ইউনুস: তারমানে, হুদুদ এবং ইসলামী আইনের আইনের বাহ্যিক কাঠামোর চেয়ে এর মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হওয়াটাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই নয় কি?

হাশিম কামালী: আপনি যদি আমাকে এমন প্রক্রিয়ায় হুদুদ প্রয়োগ করতে বলেন, যা স্পষ্টত জুলুম; তাহলে আমি তা করতে রাজী নই। বরং আমি এমন একটা পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করবো, যার মাধ্যমে অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায় এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায়। বিশেষ করে সমাজের বাস্তবতা যদি এমন হয়, যেমন যুদ্ধাবস্থা ইত্যাদি। মহানবী (সা) ও খেলাফতে রাশেদার যুগে যুদ্ধাবস্থায় হুদুদ প্রয়োগ স্থগিত রাখা হতো।

মোহাম্মদ ইউনুস: ভেরি ইন্টারেস্টিং!

হাশিম কামালী: হ্যাঁ। স্থগিত রাখার কারণটা বলি। যেমন, একবার এক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে খবর আসলো, কিছু সৈন্য মদ্যপান করছে। তাদেরকে শাস্তি দেয়া উচিত হবে কি না, তা জানতে চাওয়া হলো। এই জিজ্ঞাসার যে জবাব দেয়া হয়েছিল, এর সারকথা হলো, মদ্যপানের শাস্তি কার্যকরের চেয়ে শত্রুপক্ষের নিকট একজন সৈনিকের পরাজিত হওয়াটা ইসলামের জন্য বেশি ক্ষতিকর।

মোহাম্মদ ইউনুস: খুবই ইন্টারেস্টিং! তারমানে অনুশোচনা ও ক্ষমার একটি দিকও রয়েছে। কিন্তু রাজনীতিবিদরা যখন হুদুদ নিয়ে কথা বলেন, তখন তারা অনুশোচনা ও ক্ষমার দিকটি পুরোপুরি এড়িয়ে যান। ফলে সাধারণ মানুষের ধারণা, হুদুদ খুবই কঠোর ও নিষ্ঠুর একটি শাস্তি। এ ব্যাপারে কিছু বলুন, প্লিজ।

হাশিম কামালী: নিশ্চয়। কোরআনের বর্ণনার আলোকেই এটি হুদুদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ‘Punishment in Islamic Law: An Enquiry into the Hudud Bill of Kelantan’ শিরোনামে আমার লেখা একটি বই ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। বইটিতে আমি কেলান্তান প্রদেশের হুদুদ বিলের উপর একটি পর্যালোচনা করেছি। হুদুদ নিয়ে কোরআনের বর্ণনার সাথে ওই বিলটি মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

চলুন দেখা যাক, অনুশোচনা প্রসঙ্গে কোরআন কী বলেছে। হুদুদ নিয়ে কোরআনে ৪/৫টি আয়াত রয়েছে। অপরাধ ও অপরাধের শাস্তির বিধান একইসাথে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। তারপর বলা হয়েছে, অপরাধী যদি অনুশোচনা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে নেয়, তাহলে আল্লাহও তাকে ক্ষমা করে দেন, তিনিও মানুষের অনুশোচনা শোনেন। এটাই হলো হুদুদ নিয়ে কোরআনের আয়াতগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্য। যেখানেই খুঁজেন, এ ধরনের কথাই কোরআনে পাবেন।

এখানে আমার একটি প্রশ্ন আছে। হুদুদ সম্পর্কিত কোরআনের এই দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব প্রতিফলন কোথায়? আমাদের আইনশাস্ত্রের পুরো ইতিহাস ঘাটলে আমরা দেখবো, হুদুদকে আমরা একটি নির্ধারিত ও বাধ্যতামূলক শাস্তি হিসেবে বিবেচনা করেছি। অথচ কোরআনকে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির জায়গা থেকে দেখলে বুঝা যাবে, অনুশোচনা, সংশোধন ও ক্ষমার সুযোগ সেখানে আছে। কিন্তু হুদুদ আইনের ক্ষেত্রে কোরআনের এই প্রশস্ততাকে বিবেচনা করা হয়নি। প্রচলিত আইন অনুযায়ী, অপরাধ প্রমাণ হওয়ার পর যথাসম্ভব দ্রুততার সাথে হদ প্রয়োগ করা হয়। এক্ষেত্রে বিচারকের সতর্কতাকে উপেক্ষা করা হয়। হুদুদ সম্পর্কে কোরআনে আমি যা পেয়েছে, তার সাথে এটি সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

মোহাম্মদ ইউনুস: এসব নিয়ে আসলে সমাজে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। তাই হতে পারে কোনো মুসলিম বা এমনকি অমুসলিম ব্যক্তি এসে বললো– দেশের সিভিল আইন তথা দণ্ডবিধি পর্যালোচনা করলে আপনি দেখতে পাবেন, তাতে কোনো অপরাধের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন শাস্তির বিধান রাখা আছে। এর পাশাপাশি বিচারককেও নিজস্ব বিবেচনা প্রয়োগ করে শাস্তি নির্ধারণের এখতিয়ার দেয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে চুরির কথাই বলা যাক। অপরাধী অন্যায়টি প্রথমবারের মতো করে থাকলে, কিংবা অপরাধী অল্পবয়স্ক হলে বিচারক নিজস্ব বিবেচনায় রায় দিতে পারেন।

কিন্তু সবচেয়ে ভালো হচ্ছে আপনি যেটা বলেছেন, অর্থাৎ ন্যায়বিচারের এইসব মূলনীতি ও ধারণাসমূহ কোরআনে ইতোমধ্যেই বলা আছে। কোরআনে একদিকে কঠোর শাস্তির কথা যেমন বলা হয়েছে, অন্যদিকে আবার ক্ষমার কথাও বলা হয়েছে। তাহলে আপনার উপসংহার হলো, নিজস্ব বিচার-বিবেচনা প্রয়োগ করে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী রায় নির্ধারণের সুযোগ কোরআনে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দিয়েছেন। তাই তো?

হাশিম কামালী: ‘হদ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে সর্বোচ্চ সীমা। এর নিচের  পর্যায়কে ‘তাজীর’ বলা হয়। হদ প্রয়োগের সবগুলো পূর্বশর্ত যদি যথাযথভাবে পূরণ করা যায়, সন্দেহাতীতভাবে যদি অপরাধ  প্রমাণ করা যায়, তাহলে হদ প্রয়োগ করা যাবে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হদ প্রয়োগের পূর্বশর্তগুলো পূরণ করা খুব কঠিন। তখন হদ প্রয়োগ না করে তাজীর প্রয়োগ করতে হয়। শাস্তির যে বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে, এ কথাটাই আমরা জোর দিয়ে বলছি। সেক্ষেত্রে হদ হচ্ছে সর্বোচ্চ শাস্তি। আর শাস্তির অন্যান্য পর্যায়গুলোর মধ্যে নমনীয়তা রয়েছে।

মোহাম্মদ ইউনুস: মোটকথা হলো, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং….

হাশিম কামালী: সেটাই। তাজীরের ক্ষেত্রে বিচারকদের নিজস্ব বিবেচনা কাজে লাগিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার স্বাধীনতা রয়েছে। অপরাধীর সার্বিক অবস্থা ও পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করে বিচারক তেমন ধরনের শাস্তি নির্ধারণ করতে পারেন, যার মাধ্যমে অপরাধীকে অপরাধকর্ম থেকে বিরত থাকার ব্যাপারটি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

আইয়ুব আলী
আইয়ুব আলী
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়নরত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *