মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭
হোম > লেকচার অনুবাদ > আগামী দিনের ইসলাম (পর্ব-১)

আগামী দিনের ইসলাম (পর্ব-১)

এডিটর’স নোট:

ড. তারিক সোয়াইদান আরব বিশ্বের খ্যাতিমান একজন স্কলার ও বক্তা। বেশ কয়েক বছর আগে অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থীদের এক প্রোগ্রামে ‘দ্যা ফিউচার অব ইসলাম’ শিরোনামে তিনি একটি বক্তৃতা করেন। বলা যায়, ইসলাম সম্পর্কে এটি একটি কম্প্রেহেনসিভ আলোচনা। প্রথমে তিনি বিশ্বসভ্যতাগুলোর উত্থান-পতনের কারণগুলো আলোচনা করেছেন। তারপর ইসলামের আগমন, উত্থান ও পরবর্তীতে খেলাফতের পতনের কারণ আলোচনা করেছেন। সবশেষে, আগামী দিনে ইসলাম কীভাবে পুনরায় বিশ্বসভ্যতা হিসেবে পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেবে, তার রূপরেখা ব্যক্ত করেছেন।

সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য লেকচারটি ইংরেজিতে অনুলিখন ও বাংলায় অনুবাদ করেছেন মো: হাবিবুর রহমান হাবীব। এটি ধারাবাহিক অনুবাদের প্রথম পর্ব।


দ্বিতীয় পর্বতৃতীয় পর্ব | শেষ পর্ব


ভূমিকা

بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ- وَالْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ، وَالصَّلوٰةُ وَالسَّلاَمُ عَلىٰ سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍنِالنَّبِيِّ الْكَرِيْمِ، وَعَلىٰ آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِيْن. رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَّدُنْكَ رَحْمَةً، إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ. اَللّٰهُمَّ أَرِنَا الْحَقَّ حَقًّا وَارْزُقْنَا اتِّبَاعَه، وَأَرِنَا الْبَاطِلَ بَاطِلاً وَارْزُقْنَا اجْتِنَابَه. وَبَعْدُ.

প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোনেরা,

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

আজ রাতে আপনাদের সাথে থাকতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। আজকের অনুষ্ঠানের আয়োজক Federation of Australian Muslim Students & Youth (FAMSY), একটি লেবানিজ সংগঠন এবং আপনারা যারা এই চমৎকার মসজিদে উপস্থিত আছেন– সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। মাশাআল্লাহ, অস্ট্রেলিয়ায় এত বড় মসজিদ রয়েছে, তা কল্পনাও করিনি।

চারদিন ধরে আমি অস্ট্রেলিয়ায় আছি। গত কয়েকদিন মেলবোর্নে ছিলাম, সিডনিতে আজকেই প্রথম। এটাই আমার প্রথম অস্ট্রেলিয়া সফর। এ দেশে ইসলামী কার্যক্রম এবং ইসলামের প্রতি কমিটেড মুসলমানের সংখ্যা দেখে আমি অভিভূত, আলহামদুলিল্লাহ। আজ রাতে আপনাদের এই উপস্থিতিও তা প্রমাণ করছে।

রাসূলের (সা) একটি প্রসিদ্ধ হাদীস রয়েছে,

وَاللهِ لاَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى يَبْلُغَ هذَا الدِّيْنُ مَا بَلَغَ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ

আল্লাহর শপথ! ততদিন পর্যন্ত কিয়ামত আসবে না, যতদিন পর্যন্ত না এই দ্বীনের ব্যাপ্তি দিন রাতের দূরত্বে পৌছবে

আপনারা মক্কা থেকে সবচেয়ে দূরত্বে অবস্থান করছেন। যা এতটাই দূরে যে, সেখানে যেতে একদিন এক রাত সময় লেগে যায়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পরও বেশ কয়েকবার আমি সেখানে গিয়েছি। মক্কা থেকে অস্ট্রেলিয়া যেদিকে,  যুক্তরাষ্ট্র ঠিক তার বিপরীত দিকে অবস্থিত। এমনকি হাওয়াই স্টেটে পর্যন্ত কিছু মুসলমান রয়েছেন। রাসূলের (সা) ভবিষ্যৎবাণী সত্য হয়েছে।

যা হোক, আমি আগামী দিনের ইসলামের প্রকৃত অবস্থা আপনাদের সাথে আলোচনা করতে চাই। বিশেষ করে, ৯/১১-র পর ইসলাম ও মুসলিমরা একটা চাপে পড়েছে। ওই ঘটনার পর অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের সর্বত্র মুসলিমদেরকে এই চাপের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এসব ঘটনা আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? এই দ্বীনের ভবিষ্যৎ কী?

এ সম্পর্কে জানতে গিয়ে ইতিহাস নিয়ে আমি ব্যাপক গবেষণা করেছি। যদিও আমি পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উপর পিএইচডি করেছি। এর পাশাপাশি ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়েছি। তবে শরীয়াহ এবং ইতিহাস হচ্ছে আমার অন্যতম পছন্দের বিষয়।

গবেষণা করতে গিয়ে আমি লক্ষ্য করেছি, ইতিহাসের একটি ধারাবাহিক গতিধারা আছে এবং সময়ের ব্যবধানে এর পুনরাবৃত্তি ঘটে। এ বিষয়ে আমার চিন্তাভাবনাগুলো এখন আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই।

যে কোনো সভ্যতা তার নিজস্ব ধারায় গড়ে ওঠে। প্রতিটি সভ্যতাই শুরুতে দুর্বল থাকে। তারপর বছরের পর বছর ধরে ক্রমান্বয়ে এটি বিকশিত হতে থাকে। উৎকর্ষের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছতে সাধারণত শত শত বছর লেগে যায়।

উদাহরণ হিসেবে ইসলামের অব্যবহিত আগের পারস্য সভ্যতার কথা বলা যায়। শুরুতে তারা দুর্বল ছিল। তারপর ক্রমাগত বিকশিত হতে হতে দুই হাজার বছর পর তারা সভ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে যায়। বাইজেন্টাইন বা রোমান সভ্যতাকে এ পর্যায়ে পৌঁছতে সময় লেগেছে প্রায় ১২’শ বছর। খেয়াল করলে দেখা যায়, আরো অনেক সভ্যতার বিকাশ লাভের জন্য একই ধরনের সময় লেগেছে। তবে একটা সভ্যতা গড়ে উঠতে অনেক সময় লাগলেও এর পতন যে খুব দ্রুতই হয়ে থাকে, এটি অনেকেই মানতে চান না। কয়েকটা উদাহরণ দিয়ে এ বিষয়টাই আমি ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করবো।



সমসাময়িক সভ্যতাগুলোর উপর ইসলামের বিজয়

আক্রমণের মুখে পারস্য সভ্যতা

সীমানা
পারস্য সভ্যতার উদাহরণ দিয়েই শুরু করি। আমরা জানি, বৈশ্বিক পরাশক্তি হয়ে ওঠতে তাদের দুই হাজার বছর সময় লেগেছিল। তৎকালীন বিশ্বে শুধুমাত্র রোমানরা তাদের সমকক্ষ সভ্যতা ছিল। তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ড ছিল বিশাল। ভারত থেকে শুরু করে তুরস্ক, ইরাক ও আরব বিশ্বের অংশবিশেষ পর্যন্ত এর বিস্তৃতি ছিল। আরব উপদ্বীপের অংশবিশেষ ছিল তাদের মিত্র। ইরাকের মাদায়েন ছিল এই বিশাল সাম্রাজ্যের রাজধানী।

সামরিক শক্তি
পারস্যের সেনাবাহিনী ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী। মুসলমানদের সাথে সংঘটিত প্রতিটি যুদ্ধে তাদের সৈন্য সংখ্যা ছিল সাধারণত আড়াই, তিন কিংবা সাড়ে তিন লক্ষ। আমরা ১৪’শ বছর আগের কথা বলছি! বর্তমানকালেও এই সংখ্যাটা বিশাল! বর্তমানে বিশ্বের কয়টা সেনাবাহিনীর এত বিপুল সৈন্য আছে? তাছাড়া এটা তাদের সেনাবাহিনীর পুরোটা নয়, একটা অংশ মাত্র। কী বিশাল সেনাবাহিনী ছিল তাদের! অত্যন্ত শক্তিশালী একটি সভ্যতা! 

তাদের সেনারা ছিল তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। তাদের ছিল সর্বোৎকৃষ্ট যুদ্ধ সরঞ্জাম। তারা শুধু পারস্যের প্রযুক্তিই ব্যবহার করত না, রোমান ও ভারতীয় প্রযুক্তিও ব্যবহার করত। সমসাময়িক সব প্রযুক্তিই তাদের আয়ত্বে ছিল। আমরা বিজ্ঞান, দর্শন বা কলা – যে বিষয় নিয়েই কথা বলি না কেন, তারা ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ। তারা শুধু রোমানদের সাথে তুলনীয় ছিল।

তারমানে, মুসলমানরা যখন তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করে তখন তারা মোটেও দুর্বল ছিল না। তাদের মধ্যে কোনো অন্তর্কোন্দলও ছিল না। একজন মাত্র সম্রাটের অধীনে তারা ঐক্যবদ্ধ ছিল। এই বিশাল সাম্রাজ্য ছিল খুবই শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ। এক কথায় পরাশক্তি।

ক্র্যাকডাউন
পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটতে কত সময় লেগেছিল? ১২ হিজরীতে আবু বকর সিদ্দিকের (রা) খেলাফতকালে মুসলমানরা পারস্যে প্রথম অভিযান পরিচালনা করে। তিনি দুইটি সেনাদল পাঠিয়েছিলেন। খালিদ ইবনে ওয়ালিদের (রা) নেতৃত্বে একটি দল ইরাকের দক্ষিণাংশে এবং মুসান্না ইবনে হারিসার (রা) নেতৃত্বে আরেকটি দল ইরাকের উত্তরাংশে অভিযান চালায়।

উভয় সেনাদল ১২ হিজরীতে অভিযান শুরু করে। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা) দুর্বার গতিতে দক্ষিণ ইরাক হয়ে রাজধানী মাদায়েনের দিকে এগুতে থাকেন। মুসান্না ইবনে হারিসা (রা) খালিদের মত এগুতে পারছিলেন না। তিনি তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হন। সামরিক দিক থেকেও তিনি খালিদের মতো সক্ষম ছিলেন না। তাই খালিদ (রা) উত্তর দিক থেকে এগুতে থাকলেও মুসান্না (রা) দক্ষিণ দিক থেকে এগিয়ে যেতে পারছিলেন না।

অভিযান চলাকালেই আবু বকর সিদ্দিক (রা) খালিদকে (রা) ফিলিস্তিনে পাঠানোর প্রয়োজনবোধ করলেন। তাই খলিফা তাঁকে ইরাক ত্যাগ করে ফিলিস্তিনে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরে বলবো। যাইহোক, খলিফা চলমান অভিযানের নেতৃত্বের জন্যে রাসূলের (সা) চাচা সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাসকে (রা) নিয়োগ দেন। তিনি অভিযান চালিয়ে যেতে থাকলেন। তাঁর নেতৃত্বে উভয় সেনাদল একত্রিত হয় এবং বিখ্যাত কাদেসিয়ার যুদ্ধে মুসলমানরা পারস্য বাহিনীর মোকাবেলা করে। কাদেসিয়ার যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ। ১৫ হিজরীতে তারা পারস্যের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে সক্ষম হন।

পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটতে মাত্র তিন বছর সময় লেগেছিল। দুই হাজার বছরের চেয়েও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা একটা সাম্রাজ্যের পতন ঘটে তিন বছরেরও কম সময়ে! কিন্তু কেন? কীভাবে এটি সম্ভব হয়েছিল? তারা তো দুর্বল ছিল না। তাদের ছিল শ্রেষ্ঠ প্রযুক্তি ও সেনাবাহিনী। রাজনৈতিকভাবে ছিল শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ। কলা, বিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, কাব্য– সকল ক্ষেত্রে তারা ছিল এগিয়ে। তারা ছিল বিশ্বের অন্যতম সেরা সভ্যতা। তাহলে কী জন্যে তাদের পতন ঘটে? এই প্রশ্নটি সমাধানের আগে চলুন আমরা আরেকটি সভ্যতা নিয়ে কিছু কথা বলি।

রোমান সভ্যতার বিরুদ্ধে অভিযান

বিশাল সাম্রাজ্য
রোমান সভ্যতার তৎকালীন সম্রাট ছিলেন সিজার। তারা ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পরাশক্তি। পারস্যের সাথে তাদের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। রোমানদের তিনটি রাজধানী ছিল: সাম্রাজ্যের উত্তরাংশের জন্যে কনস্টান্টিনোপল (বর্তমানে ইস্তাম্বুল), পূর্বাংশের জন্যে জেরুজালেম (আল কুদস) এবং উত্তর আফ্রিকা, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, তুরস্ক ও আশপাশের অঞ্চলের জন্যে আলেকজান্দ্রিয়া। কী বিশাল সাম্রাজ্য!

শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব
পুরো সাম্রাজ্য ছিল একজন নেতার কর্তৃত্বে। তিনি হলেন সিজার। তিনি সাধারণত ইস্তাম্বুলে থাকতেন। তবে মাঝেমধ্যে জেরুজালেমে থেকেও সাম্রাজ্য পরিচালনা করতেন। রাসূল (সা) যখন সিজারের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, তখন সিজার জেরুজালেমে ছিলেন। যাইহোক, আবারো শক্তিশালী অদম্য এক সভ্যতা, বিশাল সেনাবাহিনী। ইয়ারমুকের যুদ্ধে রোমানদের সৈন্য সংখ্যা ছিল তিন লক্ষ চল্লিশ হাজার। এটা ছিল রোমান সেনাবাহিনীর একটা অংশ মাত্র।

চিন্তা করে দেখুন, কত শক্তিশালী একটা সভ্যতা ছিল! দর্শন, কাব্য, যুক্তিবিদ্যা– এসব ক্ষেত্রে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। কী বিশাল সভ্যতা! পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সভ্যতা। সামরিক, রাজনৈতিকসহ সবদিক থেকেই তারা ছিল শক্তিশালী সাম্রাজ্য।

অভিযানের শুরু
আবু বক্কর সিদ্দিকের (রা) খেলাফতকালে ১২ হিজরীতে রোমানদের বিরুদ্ধে মুসলমানরা সর্বপ্রথম অভিযান পরিচালনা করে। খলিফা সে অঞ্চলে চারটি সেনাদল পাঠিয়েছিলেন। ফিলিস্তিন ও জর্ডান অঞ্চলে আমর ইবনুল আস (রা), সিরিয়ায় জিহাদ ইবনে আবি (রা),  ফিলিস্তিন ও লেবাননে সারাহবিল ইবনে হাসানাহ (রা) এবং ফিলিস্তিনের উত্তরাংশ ও সিরিয়ার বাকি অংশে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহর (রা) নেতৃত্বে সেনাদল পাঠানো হয়। এই চারটি সেনাদল মিলে সৈন্য সংখ্যা ছিল মোটের উপর চৌত্রিশ হাজার। অন্যদিকে, রোমান সেনাবাহিনীর মাত্র একটি অংশের সৈন্য সংখ্যাই ছিল তিন লক্ষ চল্লিশ হাজার।

যাই হোক, মুসলিম বাহিনীর আগমনের কথা জানতে পেরে সিজার তৎক্ষণাৎ জেরুজালেম ত্যাগ করে দামেস্কে পালিয়ে যান। মুসলিম বাহিনী আরো এগিয়ে গেলে তিনি দামেস্ক ছেড়ে ইস্তাম্বুলে পালিয়ে যান। এই নয়া শক্তি সম্পর্কে তিনি আগে থেকেই সচেতন ছিলেন। তিনি বেশ চালাক ছিলেন। সিরিয়া ত্যাগের সময় তার স্বগোতোক্তি ছিল, ‘চির বিদায় সিরিয়া’। অর্থাৎ, তিনি জানতেন…!

মুসলিম বাহিনীর রণকৌশল
মুসলিম বাহিনী একে একে ফিলিস্তিন ও আশপাশের এলাকা জয় করতে থাকে। এ অবস্থায় সিজার তার সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাদল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি তিন লক্ষ চল্লিশ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী পাঠালেন। অন্যদিকে, মুসলিম বাহিনীর এক একটি দলে মাত্র আট থেকে দশ হাজার করে সৈন্য ছিল। এই অবস্থায় আবু উবাইদা (রা) চারটি সেনাদলকে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানালেন। তারা একত্রিত হলো, তবে চারটি দলই স্বতন্ত্রভাবে অবস্থান গ্রহণ করল।

আবু বকর সিদ্দিক (রা) বিশাল শত্রুবাহিনী আগমনের সংবাদ পেয়ে বুঝতে পারলেন অনেক বড় বিপদ আসছে। মুসলমানরা এর আগে এত বিশাল শত্রুবাহিনীর মুখোমুখি হয়নি। তাই তিনি খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে (রা) ইরাক ছেড়ে দ্রুত ফিলিস্তিনে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। খালিদ (রা) ঝড়ের গতিতে ফিলিস্তিনের ইয়ারমুকে পৌঁছলেন।

খালিদের (রা) নেতৃত্ব
তিনি ইয়ারমুকে গিয়ে দেখতে পেলেন চারজনের নেতৃত্বে চারটি সেনাদল স্বতন্ত্রভাবে অবস্থান নিয়েছে। তিনি বললেন, “এভাবে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। আপনাদেরকে অবশ্যই একজন সেনাপতির নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।” তিনি আশংকা করছিলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব নিয়ে বিবাদ দেখা দিতে পারে। বর্তমানে মুসলমানরা যেমন সব জায়গায় নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে লিপ্ত।

এটা বুঝতে পেরে তিনি সবাইকে ডেকে বললেন, “আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে  হবে। প্রতিদিন আমাদের মধ্য থেকে একজন করে নেতা হবেন।” সবাই বললো, “ঠিক আছে, তাই হবে।” এভাবে চারটি সেনাদল ঐক্যবদ্ধ হলো। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা) যুদ্ধের প্রথম দিন নেতৃত্ব দেন। সবার সিদ্ধান্তক্রমে পরদিন থেকে খালিদই (রা) নেতৃত্বে বহাল থাকেন। কারণ, সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে তার সমকক্ষ আর কেউ ছিল না।

১৪ হিজরীতে ইয়ারমুকের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। মাত্র দুই বছরের মধ্যে রোমান সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলের পতন ঘটে। মুসলিম বাহিনী বাকি অঞ্চল খুব সহজেই জয় করে। সত্যিকার অর্থে, ইয়ারমুকে তেমন বড় কোনো যুদ্ধ হয়নি। একটি মহা প্রতাপশালী সভ্যতার পতন ঘটলো মাত্র দুই বছরে। কীভাবে এটা সম্ভব হয়েছিল?

ইয়ারমুক যুদ্ধের সময় সংবাদ এলো আবু বকর সিদ্দিক (রা) ইন্তেকাল করেছেন এবং ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা) খলিফা নিযুক্ত হয়েছেন। স্বভাবতই ওমর ইবনুল খাত্তাবই (রা) মদীনা থেকে তখন পারস্য এবং রোমে অভিযানরত সেনাবাহিনীকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন।

মিশর বিজয়

এদিকে, আমর ইবনুল আস (রা) ওমরকে (রা) একটি পরামর্শ বার্তা পাঠালেন। বার্তায় তিনি বললেন, আমাকে মিশর জয় করার অনুমতি দিন। ওমর (রা) এ নিয়ে দ্বিধান্বিত ছিলেন। তিনি জবাব পাঠালেন, আপনি সেনাবাহিনী নিয়ে মিশরের দিকে অগ্রসর হতে থাকুন। পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে আপনাকে যথাসময়ে জানিয়ে দেবো। আমর ইবনুল আস (রা) ছিলেন মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমানদের একজন। তাই তিনি মিশরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন। এটা ১৮ হিজরীর ঘটনা।

মিশরে প্রবেশের পূর্বে ওমরের (রা) নির্দেশনা সংক্রান্ত চিঠি নিয়ে একজন দূত এলো। আমর ইবনুল আস (রা) এটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। তিনি দূতকে বললেন, “অপেক্ষা করুন। আমি চিঠিটি পরে নেবো।” দূত বললেন, “এ চিঠি স্বয়ং খলিফা পাঠিয়েছেন।” আমর (রা) জবাব দিলেন, “আমি জানি, আপনি অপেক্ষা করুন। আমি আপনার সাথে পরে দেখা করবো।”

আমর ইবনুল আসের (রা) কৌশল ও নেতৃত্ব
আমর (রা) এগিয়ে যেতে থাকলেন। দূত তাঁর সাথে আবার দেখা করতে চাইলেন। কিন্তু আমর (রা) তাকে ফিরিয়ে দিলেন। অবশেষে মিশর সীমান্ত অতিক্রম করার পর তিনি দূতকে ডেকে বললেন, “আমাকে খলিফার চিঠিটা দিন।” তারপর তিনি খলিফার চিঠি পড়লেন। ওমর (রা) তাঁকে লিখেছেন, “আপনি মিশরের সীমান্ত অতিক্রম করে থাকলে এগিয়ে যান, আর না করে থাকলে ফিরে আসুন।”

আমর ইবনুল আস (রা) তাঁকে ফিরতি চিঠিতে লিখলেন, “আমরা সীমান্ত অতিক্রম করেছি।… আমরা মিশর জয় করতে প্রস্তুত। কিন্তু আমার সাথে মাত্র চার হাজার সৈন্য আছে।”

চারহাজার সৈন্যের বিপরীতে চারজন!
তৎকালে যুদ্ধ করতে সক্ষম লোকের সংখ্যা পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়। এতো আগের পরিসংখ্যান কীভাবে জানা যাবে? জিযিয়া সংক্রান্ত হিসাব থেকে এটা জানা সম্ভব। জাকাতের (ধনী মুসলিমদের জন্যে বাধ্যতামূলকভাবে প্রদেয় নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ) পরিবর্তে অমুসলিমদেরকে জিযিয়া দিতে হয়। জিযিয়া নেয়া হয় শুধু যুদ্ধ করতে সক্ষম অমুসলিম পুরুষদের কাছ থেকে। নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা জিযিয়ার আওতার বাইরে।

আমর ইবনুল আসের (রা) কাছে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা) জানতে চেয়েছিলেন, কয়জনের কাছ থেকে জিযিয়া আদায় করা যাবে। আমর (রা) জানালেন, দশ লক্ষ। অর্থাৎ তখন যুদ্ধ করতে সক্ষম লোকের সংখ্যা ছিল দশ লক্ষ।

আমর ইবনুল আস (রা) মাত্র চার হাজার সৈন্য নিয়ে দশ লক্ষ সৈন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে যাচ্ছেন। এমতাবস্থায় তিনি ওমরের (রা) নিকট পত্র পাঠালেন, আমার সৈন্য সংখ্যা মাত্র চার হাজার। আমার প্রচুর সৈন্য দরকার। তখন ওমর (রা) কিছু সৈন্য পাঠালেন।

তবে ওমরের (রা) কাছে যথেষ্ট সৈন্য ছিল না। তখনো মুসলমানরা সংখ্যায় ছিল অনেক কম। তাছাড়া মুসলিম বাহিনী তখন সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে মোতায়েন ছিল এবং নতুন নতুন অঞ্চল জয় করে যাচ্ছিল। সেনাবাহিনী প্রায় ভারতের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। এই পুরো অঞ্চল ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। সব মিলিয়ে মুসলিম সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র ষাট হাজার।

তাই আমর ইবনুল আসের (রা) জন্যে সৈন্য সংগ্রহ করা নিয়ে ওমর (রা) চিন্তিত ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি বেদুঈনসহ যাদেরকেই পেয়েছেন, তাদেরকেই একত্রিত করলেন। এরা আগে কখনো জিহাদ করেনি। তাদেরকে তিনি মিশরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। তারপর আমর ইবনুল আসকে (রা) পত্র মারফত জানালেন, আপনার জন্যে আট হাজার সৈন্য পাঠালাম।

আমার ইবনুল আস (রা) মদীনা থেকে আসা মুসলমানদের সংখ্যা গুনে দেখলেন মাত্র চার হাজার। তাই ফিরতি চিঠিতে তিনি ওমরের (রা) কাছে জানতে চাইলেন, বাকি সৈন্যরা কোথায়? আপনি তো বলেছেন আট হাজার সৈন্য পাঠিয়েছেন। ওমর (রা) জবাব দিলেন, এই চার হাজার সৈন্যের মাঝে চারজন ব্যক্তি আছেন যারা প্রত্যেকে এক হাজার সৈন্যের সমকক্ষ। তাঁরা হলেন মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা), জুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা), উবাদা ইবনুস সামিত (রা) এবং মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা)।

বর্তমানে কি আমরা এমন কাউকে দেখি, যিনি এক হাজার লোকের সমকক্ষ? এখনকার অধিকাংশ লোক একজনের সাথেই কুলিয়ে ওঠতে পারে না। কিন্তু তাদের প্রত্যেকেই এক হাজার লোকের সমকক্ষ ছিলেন!

ইসলামই ছিল সাফল্যের চাবিকাঠি
সর্বসাকুল্যে মাত্র আট হাজার সৈন্য মিশরের মুখোমুখি হয়েছিল। মিশর তখন সুবিশাল রোমান সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত। রোমান সেনাবাহিনী তখন যুদ্ধজাহাজসহ আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থান করছিল। এই বন্দরের সাথে তখন রোমান সাম্রাজ্যের মূল রাজধানী ইস্তাম্বুলের নৌপথে সরাসরি যোগাযোগ ছিল। সভ্যতা, সামরিক শক্তিসহ সবদিক থেকেই তারা তখন শক্তিশালী।

তারমানে হচ্ছে, আমর ইবনুল আস (রা) কোনো দুর্বল শক্তির মোকাবেলা করেননি। মিশর জয় করে দেশটির রাজধানী আলেকজান্দ্রিয়ায় প্রবেশ করতে তাঁর কত সময় লেগেছিল? চার বছর? না, মাত্র চার মাস!

কীভাবে এই অসাধ্য সাধন সম্ভব হলো? যে পরাশক্তিটি ভাবতো পুরো বিশ্ব তাদের হাতে মুঠোয়, সেই সভ্যতার কী এমন হলো? তারাই তো গোটা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করতো। যে কোনো সময়, যে কোনো অঞ্চলে আক্রমণ করতো। তাদের হঠাৎ কী হলো যে, এত দ্রুত তাদের পতন ঘটলো? কেন? আপনারা অনেকে হয়ত বলবেন, তাঁরা তো রাসূলের (সা) সাহাবী ছিলেন, তাই এটা সম্ভব হয়েছে। না! শুধু এ কারণেই তাদের পতন হয়নি।

ইউরোপে মুসলিম অভিযান

এসব ঘটনার অনেক বছর পরের আরেকটি ঘটনা পর্যালোচনা করা যাক। ৯২ হিজরীতে মুসলমানরা সর্বপ্রথম স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। তখন কোনো সাহাবী ছিলেন না। এমনকি মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ ছিলেন একজন অনারব। তিনি যে সাহাবী ছিলেন না, তা নিশ্চিত।

৯২ হিজরীতে অভিযান শুরু করে ৯৫ হিজরীতেই তারা স্পেন ও পর্তুগাল দখল করেন এবং ফ্রান্সে আক্রমণ শুরু করেন। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মুসলমানরা প্যারিসের ষাট কিলোমিটারের মধ্যে চলে এসেছিল।

এমন কী হলো, যাতে মাত্র তিন বছরেই এ সভ্যতার পতন ঘটলো? ফরাসিরা কেন মুসলমানদের থামাতে পারলো না? মুসলমানরা প্রায় তাদের রাজধানী পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলো। কীভাবে তা সম্ভব হয়েছিল?

প্রিয় ভাই ও বোনেরা! আমরা কয়েকশ বছরের ইতিহাস বলছি না। মাত্র এক কি দুই বছর, সর্বোচ্চ তিন বছরের ইতিহাস নিয়ে কথা বলছি! এই অল্প সময়ে এত বড় পরিবর্তনের রহস্যটা কী?

সভ্যতার পতনের মূল কারণ

এই সবগুলো সভ্যতার পতনের পেছনে নির্দিষ্ট কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার রয়েছে। এগুলোর পতন হয়েছে মূলত দুটি কারণে। যে কোনো সভ্যতার পতনের ক্ষেত্রেই এই দুটি কারণ সমভাবে প্রযোজ্য।

১। নৈতিক সংকট:
প্রথম কারণটি হলো তাদের নৈতিক অধঃপতন। তাদের কোনো নীতি-নৈতিকতা ছিল না। ভেতরে ভেতরে তারা একদম নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। নৈতিকভাবে কলুষিত হয়ে পড়েছিল। তারা যে বস্তুবাদী সভ্যতা গড়ে তুলেছিল, সেখানে ছিল অবাধ যৌনাচার। এতে তাদের পারিবারিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছিল। সবাই হয়ে পড়েছিল আত্মকেন্দ্রিক।

বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতার সাথে এর বেশ মিল রয়েছে। তবে এসব সভ্যতার পতনের পেছনে শুধু এগুলোই যথেষ্ট কারণ ছিল না। তারা তো অনেক বছর ধরেই অধঃপতিত ছিল। তাই পতনের জন্যে এটাই যথেষ্ট কারণ নয়। অবশ্যই আরো কোনো কারণ রয়েছে।

২। আরো উন্নত বা শক্তিশালী সভ্যতা কর্তৃক আক্রমণ:
অন্য কারণটি হলো, এই পরিস্থিতিতে আরো উন্নত কিংবা শক্তিশালী কোনো সভ্যতা তাদেরকে আক্রমণ বা চ্যালেঞ্জ করেছে। নতুন সভ্যতাটি হয় নৈতিকতার মানদণ্ডে তাদের চেয়ে ভালো, নয়তো বস্তুগতভাবে শক্তিশালী।

এ কারণেই আমরা দেখি, মঙ্গোলিয়ানরা ইউরোপ জয় করতে পেরেছিল। তারা নৈতিকভাবে ইউরোপের চেয়ে উন্নত ছিল না। তারাও মন্দ প্রকৃতির ছিল। তবে সামরিকভাবে তারা অধিকতর শক্তিশালী ছিল। এই একই ঘটনা ইতিহাসে বার বার ঘটেছে।

তবে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন,

لَا يَغُرَّنَّكَ تَقَلُّبُ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي الْبِلَادِ – مَتَاعٌ قَلِيلٌ

“পৃথিবীতে অবিশ্বাসীদের ক্ষমতা দেখে বেকুব বনে যেও না। তা ক্ষণস্থায়ী, বেশিদিন টিকে না।” (সূরা আলে ইমরান: ১৯৬-১৯৭)

মো: হাবিবুর রহমান হাবীব
মো: হাবিবুর রহমান হাবীব
প্রাক্তন শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চবি। সমাজ উন্নয়ন কর্মী। Email: habibircu5@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *