ইউসুফ আল কারযাভী: ইসলাম ও আধুনিকতা (পর্ব ১)

এডিটর’স নোট:

সমসাময়িক বিশ্বে সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসলামী স্কলারদের মধ্যে ইউসুফ আল কারযাভী শীর্ষস্থানীয় একজন। কারযাভীকে নিয়ে Yusuf Al-Qaradawi: Islam and Modernity শীর্ষক একটি গবেষণামূলক বই লিখেছেন স্যামুয়েল হেলফন্ট। ২০০৯ সালে তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের মোশে দায়ান সেন্টার থেকে এটি প্রকাশিত হয়। আমরা বইটির অংশবিশেষের ধারাবাহিক অনুবাদ প্রকাশ করছি। অনুবাদ করেছেন আইয়ুব আলী। আজ বইটির ভূমিকার অনুবাদ প্রকাশ করা হলো।


অন্যান্য পর্ব: দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব এবং  চতুর্থ পর্ব


ভূমিকা

৯/১১-র পর ইসলাম নিয়ে লেখালেখি করা ভীষণ স্পর্শকাতর ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারো কারো মতে, ইসলাম শান্তির ধর্ম। নিউইয়র্ক, মাদ্রিদ, লন্ডনসহ বিভিন্ন স্থানে হামলাকারী উগ্রপন্থীরা ইসলামকে কলুষিত করেছে। অন্যদের মতে, ইসলাম আসলে একটি সহিংস ধর্ম। যারা শান্তির ধর্ম হিসেবে ইসলামকে উপস্থাপন করছে তারা মূলত আত্মপক্ষ সমর্থন করছে। মুসলমানদের একপাক্ষিক ইতিহাস ও রক্ষণশীল ধারার আলোকে এই ধরনের বিশ্লেষণগুলো করা হয়। অথচ যে কোনো ধর্মেরই নির্ভরযোগ্য ইতিহাস থাকে। যে কোনো ধর্ম বা বিশ্বাস ব্যবস্থার মতো ইসলামেও ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে। মুসলিমগণ একই উৎস থেকে ইসলামকে জানলেও স্বীয় বিশ্বাস সম্পর্কে তাদের উপলদ্ধি ভিন্নরকম হয়। এরই আলোকে আলোচ্য গবেষণাটি ইসলামকে বুঝার একটি প্রচেষ্টা মাত্র। ইসলামকে সংজ্ঞায়িত করা এর উদ্দেশ্য নয়। এই দায়িত্ব পাশ্চাত্য, অমুসলিম স্কলার বা অন্য কারো নয়। ইসলামকে সংজ্ঞায়িত করা মুসলমানদেরই দায়িত্ব।

বলা যায়, অমুসলিমদের জন্য সমসাময়িক ইসলামকে বুঝার অনেক পথ খোলা রয়েছে। মুসলিমরা কী বিশ্বাস করে এবং তাদের ধর্মকে কীভাবে পালন করে – তা পর্যবেক্ষণ করা ইসলামকে বুঝার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি। ইসলামের অনেক ধরনের ব্যাখ্যা থাকায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে – ইসলামকে বুঝতে কোন ধরনের মুসলিমদের পর্যবেক্ষণ করা উচিত। যদিও ইসলামকে বুঝতে আগ্রহীদের কাছে সব ঘরানার ব্যাখ্যাই মূল্যবান, তবে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় ইসলামী স্কলারদের মতামত দিয়ে শুরু করাই যুক্তিযুক্ত।

বর্তমানে অনেক ইসলামী স্কলার রয়েছেন, যারা বেশ প্রভাবশালী। এদের মাঝে যে কোনো বিবেচনায় অন্যদের চেয়ে এগিয়ে আছেন ইউসুফ আল কারযাভী। International Association of Muslim Scholars প্রতিষ্ঠায় কারযাভী মূখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। European Council on Fatwa and Research-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।[1] জায়েলস ক্যাপলের মতে, “বিশ্ব জুড়ে খুতবা দেয়ার ক্ষেত্রে কারযাভী আরবী ভাষাভিত্তিক একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছেন।”[2] Muslim Council of Britain মনে করে, “তিনি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী স্কলার।”[3] বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্কলারদের অন্যতম হিসেবে কারযাভীর যেমন প্রচুর সমর্থক রয়েছে, তেমনি সমালোচকও রয়েছে।

জন এসপোজিটো ও ক্যারেন আর্মস্ট্রংয়ের মতো সুপরিচিত কয়েকজন পশ্চিমা স্কলার কারযাভীকে মধ্যপন্থা অনুসারী ও সংস্কারপন্থী[4] মনে করলেও অন্যরা ঠিক এর বিপরীত ধারণাই পোষণ করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০০৪ সালে তেইশটি দেশের প্রায় আড়াই হাজার মুসলিম বুদ্ধিজীবী একটি পিটিশনে স্বাক্ষর করে। সেখানে ‘সন্ত্রাসবাদী ধর্মতাত্ত্বিক’দেরকে বিচারের মুখোমুখী করার জন্যে তারা জাতিসংঘের নিকট আহ্বান জানায়। এই পিটিশনে ইউসুফ আল কারযাভীর নাম রয়েছে এবং তাকে ‘sheiks of death’-এর একজন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।[5]

২০০৫ সালের দিকে এই বিতর্কটি তু্ঙ্গে উঠে। ‘বৃহত্তর লন্ডন কর্তৃপক্ষ’ কর্তৃক আয়োজিত এক কনফারেন্সে তৎকালীন লন্ডন শহরের মেয়র কেন লিভিংস্টোন কারযাভীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। এই ঘটনায় ব্রিটিশ মিডিয়া কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখায়। Coalition of Many of London’s Diverse Communities নামের একটি গ্রুপ অভিযোগ করে যে, মেয়র এমন এক ব্যক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন যিনি সন্ত্রাসবাদ, নারীদের খতনা ও স্ত্রী প্রহারের সমর্থক, সমকাম বিরোধী এবং ইহুদী বিদ্বেষী।[6] অবশ্য মেয়র লিভিংস্টোন নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে অটল থাকেন। কারযাভীর প্রতি আরোপিত অভিযোগকে খণ্ডন করতে গিয়ে বলেন – “ইহুদীবিদ্বেষ, সমকামীদের মৃত্যুদণ্ড এবং পারিবারিক নির্যাতনের সমর্থনসহ কারযাভীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো কাটতি বাড়াতে মিডিয়ার অপ্রপ্রচার ছাড়া কিছুই নয়।” তিনি আরো বলেন, “তাকে সন্ত্রাসবাদের সমর্থক বলা হয়! অথচ বাস্তবতা হচ্ছে যেসব ইসলামী স্কলার আল কায়েদার মতো সন্ত্রাসবাদী গ্রুপগুলোর নিন্দা করেন, তাদের মধ্যে কারযাভী সবচেয়ে স্পষ্টভাষী।[7]

কারযাভীর সমর্থক এবং সমালোচকদের মাঝে কিছু মৌলিক মতপার্থক্য রয়েছে। এই গবেষণায় ক্রমান্বয়ে সেগুলো আলোচনা করা হবে। কোন দৃষ্টিকোণ থেকে কারযাভীকে বিবেচনা করা হচ্ছে, তা-ই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের পরিবর্তে ইসলামী স্কলারদের মানদণ্ডে দেখলে তাকে অনেক বেশি মধ্যপন্থী মনে হয়। এরপরও কারযাভীর সমর্থক ও সমালোচকদের মাঝে বিদ্যমান মতবিরোধগুলোর মূলে যে প্রশ্নটি থেকে যায় তা হলো – তাকে কোন মানদণ্ডে বিচার করা হবে? ইসলামী নাকি পশ্চিমা? কারযাভীকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করার পর আমার দৃষ্টিতে তার অবস্থান পুরোপুরিভাবে পশ্চিমাও নয়, ইসলামীও নয়। বরং আধুনিকতার কাঠামোর মধ্যে একজন ইসলামী স্কলার হিসেবে আমি তাকে বুঝার চেষ্টা করেছি। কারযাভীর রচনাগুলো মূলত আধুনিক ধ্যানধারণায় পরিপূর্ণ। যেমন – গণতন্ত্র ও নারীবাদ। ইসলামের সাথে এগুলোর সম্পর্ক নির্ণয় করা তার কাজের অন্যতম বিষয়। কেউ কেউ বলতে পারেন,এই দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে বিচার করা এক ধরনের হেজেমনিক ব্যাপার এবং আমি হয়ত মধ্যপ্রাচ্যের একজন স্কলারের ওপর পশ্চিমা মূল্যবোধ চাপিয়ে দিচ্ছি। হয়তো এটা সত্যি যে, গণতন্ত্রের মতো ধ্যানধারণাগুলোর উৎপত্তি পশ্চিমে। কিন্তু শুধু আমি একাই কারযাভীর ওপর এসব ব্যাপার চাপিয়ে দিচ্ছি না। আধুনিক বিশ্বের আনাচে-কানাচে এসব ধ্যানধারণা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। কারযাভী তার অধিকাংশ কাজের ক্ষেত্রে এসব ধারণাকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

আধুনিকতার সংজ্ঞায়ন

এই গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে আধুনিকতার ধারণা। তাই পরিভাষাটির একটি বিশদ সংজ্ঞা প্রদান করা প্রয়োজন। আধুনিকতা নিয়ে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিতর্ক চলছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে একটি বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, পৃথিবী নিরন্তর আধুনিকতার দিকে এগিয়ে চলছে। এই বিশ্বাসের পাশাপাশি আরেকটা প্রচলিত ধারণা ছিল – আধুনিক মানেই ভালো কিছু। ডেরেক হপউড এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন,‍‍‍‌‌‌ “ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ডে এ ধরনের মতাদর্শে বিশ্বাসীরা ভাবতো – তারা কতো ভালো জীবনযাপন করছে এবং দিনকে দিন এর জৌলুস বাড়ছে। অথচ ইউরোপের বাইরের লোকেরা কত পিছিয়ে…! তাদের এই বিশ্বাস অনুযায়ী, পিছিয়ে পড়া গতানুগতিক তথা প্রাচ্যের লোকেরা যত বেশি ইউরোপীয় হয়ে উঠতে পারবে, তাদের জন্যে তা তত ভালো।”[8]

বিংশ শতাব্দীতে এসে এই দৃষ্টিভঙ্গি বড় ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিকতা শুধু ঔষধ ও বিদ্যুত নয়, বরং পারমানবিক অস্ত্র এবং গ্যাস চেম্বারও তৈরি করেছে। এই বাস্তবতা আধুনিকতার প্রচলিত ধারণাকে অনেকটা হালকা করে দিয়েছে। তারপরেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এই ধারণা রয়েছে যে, আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিশ্ব এগিয়ে চলছে এবং এই প্রক্রিয়াটি নিরন্তর ও সর্বজনীন। এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে ‘আধুনিকতা তত্ত্ব’ গড়ে ওঠে। এই তত্ত্বের সারকথা হচ্ছে – “আধুনিক ইউরোপে আধুনিকতার সাংস্কৃতিক আবহ ও একগুচ্ছ মৌলিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে। এগুলো গড়ে উঠার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত আধুনিকতাই যে কোনো সমাজের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে। আধুনিকতার বিস্তৃতির সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী এসবের প্রচলন ঘটবে।”[9]

তারপরও বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক সমাজ আধুনিকতার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেলেও আধুনিকতা তত্ত্বের দেয়া এই ধারাকে অনুসরণ করেনি। এস এন আইজেনস্ট্যাড এ ব্যাপারে মনোযোগ আকর্ষণ করে বলেন, “অপশ্চিমা সমাজের অনেক আন্দোলন পাশ্চাত্যবিরোধী, এমনকি আধুনিকতাবিরোধী কোনো কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেছে। যদিও এসব আন্দোলন স্পষ্টতই আধুনিক।”[10] আইজেনস্ট্যাড খুব সাদামাটাভাবে দাবি করেছেন, “আধুনিকতা আর পাশ্চাত্যকরণ একই ব্যাপার নয়।”[11]

আধুনিকতা তত্ত্বের সেক্যুলারিজমের প্রতি পক্ষপাত ছিল। এই গবেষণার এটাও একটা বিশেষ আগ্রহের বিষয়। এই প্রবণতায় বিশ্বাসী লোকেরা মনে করে, ধর্ম হচ্ছে গতানুগতিক সমাজের ধ্বংসাবশেষ এবং সমাজ আধুনিক হওয়ার সাথে সাথে ধর্ম হারিয়ে যাবে। উদাহরণ হিসেবে রিচার্ড পি মিশেলের গুরুত্বপূর্ণ বই The Society of Muslim Brothers-এর কথা বলা যায়। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে লেখা এই বইটি নিঃসন্দেহে আধুনিকতা তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত। এর ভূমিকায় লেখক দাবি করেছেন, এতদিন মুসলিম ব্রাদারহুড সত্যিকার অর্থে ইন্টারেস্টিং একটি ব্যাপার ছিল। “যেটি এখন মুসলমানদের নিকট ততটা জনপ্রিয় ‘অবস্থানে’ নেই।” এটি আসলে এমন একটি বিষয় ছিল যার সময় এসেছিল এবং চলেও গেছে। তারপর তিনি বললেন, আমাদের আবেগকে ক্ষণিক সময়ের জন্যে অন্য কেউ ব্যবহার করে ফেলে। আমাদের উপলব্ধি হচ্ছে, আরব বিশ্বে জাতীয়তাবাদের মতো অপরিহার্য একটা সেক্যুলার সংস্কার জনপ্রিয়তা পেয়েছে। শুরুর দিকে ব্রাদারহুড যে আবেদন তৈরি করেছিল, তা নিঃশেষ করেই জাতীয়তাবাদের এই সংস্কার থামবে।”[12] প্রায় চল্লিশ বছর আগে মিশেলের এই বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। অথচ অন্যান্য ইসলামী গ্রুপগুলোসহ ব্রাদারহুড সবসময়ের মতো এখনো জনপ্রিয়।

‘আধুনিকতা কী নয়’ – এতক্ষণে তা বুঝা গেছে। কিন্তু ‘আধুনিকতা কী’ সেই প্রশ্নটা এখনো রয়ে গেছে। সমসাময়িক কয়েকজন স্কলার এই প্রশ্নের জবাব পেতে আধুনিকতা তত্ত্বের আগের কিছু তত্ত্বের দিকে নজর দেয়া দরকার বলে মনে করেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী চিন্তাবিদ সম্ভবত জার্মান দার্শনিক ইউগেন হেবারমাস।

হেবারমাস দাবি করেন, আধুনিক ইউরোপের শুরুর দিকে নগরায়ন, শিল্পায়ন, গণশিক্ষা ও এনলাইটেনমেন্ট মিলে আধুনিকতাকে তৈরি করলেও এগুলো স্বয়ং আধুনিকতার মৌলিক কোনো বিষয় নয়। এক্ষেত্রে মানুষ যা ধারণা করে হেগেলের মতে তা হলো ‘সাবজেক্টিভিটি’। হেগেলের অনুমানকে হেবারমাস এভাবে তুলে ধরেন:

“সাবজেক্টিভিটির মূলত চারটি রূপ রয়েছে:

(ক) ব্যক্তি স্বাতন্ত্রতা: আধুনিক বিশ্বে লাগামহীন ব্যক্তি স্বাধীনতা উচ্চ সামাজিক মর্যাদা দাবি করে বসতে পারে (in the modern world, singularity particularized without limit can make good pretenstions);

(খ) সমালোচনা করার অধিকার: আধুনিক বিশ্বের মূলনীতি দাবি করে যে, কেউ যদি কোনো কিছুর স্বীকৃতি দেয় তাহলে এটি তার নিজের কাছে অবশ্যই স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য বলে গণ্য হবে (the principle of the modern world requires that what anyone is to recognize shall reveal itself to him as something entitled to recognition);

(গ) কর্মের স্বাধীনতা: আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী, আমরা যা করি সে ব্যাপারে আমরা দায়বদ্ধ থাকবো।

(ঘ) ভাববাদী দর্শন: হেগেল মনে করতেন, আত্মচেতনার ধারণা দর্শনে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হওয়াটা আধুনিকতার অবদান।”[13]

হেবারমাস হেগেলের এই তত্ত্বের ব্যাখ্যা করেছেন, আধুনিকতার মূল কথা হলো ব্যক্তির আত্মসচেতনতা। এটি প্রত্যেক ব্যক্তিকে স্বীয় কল্যাণ সাধনকে লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেয়ার কথা বলে।[14] এর বিপরীতে জন্মগতভাবে বা ঐতিহ্য হিসেবে ব্যক্তি যা কিছু পেয়েছে শুধুমাত্র সেসব বিষয়কে অনুসরণ করবে। ফারজিন ভাহদাত তার God and Juggernaut বইয়ে একই কথা বলেছেন। কান্ট এবং হেগেলের দর্শন নিয়ে বিস্তর পড়াশোনার পর তার উপসংহার হচ্ছে,

“প্রাক-আধুনিক সমাজে … সমাজ জীবন ও চলাফেরায় ব্যক্তির স্বতন্ত্র পরিচয় ছিল। তবে ব্যক্তির এই স্বাধীনতা ছিল খুবই সীমিত এবং সমাজের অল্পকিছু লোকই এই সুবিধা ভোগ করতো। আধুনিক সমাজে ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সামষ্টিকতা, সমাজ জীবন ও প্রতিষ্ঠানের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়। এর ফলে ব্যক্তি এক ধরনের বিচ্ছিন্নতায় ভোগে।”[15]

আধুনিকতার এই ধারণাকে আইজেনস্ট্যাড ‘মাল্টিপল মডার্নিটি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।[16] আধুনিকতা হতে পারে ধর্মীয় কিংবা সেক্যুলার, পুঁজিবাদী কিংবা সমাজতান্ত্রিক, পশ্চিমা কিংবা পাশ্চাত্যবিরোধী। এক্ষেত্রে এই বুঝজ্ঞান থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ যে, আধুনিক মানুষ অনেকগুলো বিকল্প থেকে যে কোনো একটা বেছে নিতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আধুনিক কায়রোতে জন্মগ্রহণকারী একজন সুন্নী মুসলিম চাইলে সেক্যুলার হতে পারে, কিংবা ইউরোপ বা আমেরিকায় অভিবাসী হয়ে পশ্চিমা জীবনযাপনও করতে পারে। আবার সে চাইলে কায়রোতেই আচারনিষ্ঠ সুন্নী মুসলিম হিসেবে জীবনযাপন করতে পারে। প্রত্যেকটাই তার জন্যে গ্রহণযোগ্য বিকল্প। প্রাক-আধুনিক কায়রোর অধিবাসীদের মধ্যে এভাবে জীবনযাপন পদ্ধতি বেছে নেয়ার প্রচলন ছিল না। তারা জানতোই না যে, জীবনযাপন করার এ ধরনের একাধিক উপায় রয়েছে। নিজের ব্যাপারে ও অন্যের ব্যাপারে এই সচেতনতা মূলত আধুনিকতারই ফল। আধুনিকতার এই বিস্তার লাভের পেছনে সাক্ষরতা ও শিক্ষার হার বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

এই ব্যাপারগুলোও সচেতনতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। হেবারমাস একে ‘আধুনিকতার সময় সচেতনতা’ (modernity’s consciousness of time) হিসেবে অভিহিত করেছেন।[17] ব্যক্তিচেতনা নিঃসৃত এই চিন্তার ফলাফল হচ্ছে, সে মনে করে সমসাময়িক যে কোনো পথই তার জন্যে খোলা রয়েছে। এর সারকথা হলো, ব্যক্তি যদি বর্তমানের চেয়ে বেশি সুযোগ পেতে চায় তাহলে তাকে ভবিষ্যতের দিকেই যেতে হবে। এ কারণেই হেবারমাস দাবি করেছেন, “অতীতের সাথে আধুনিক বিশ্বের পার্থক্য হচ্ছে, বর্তমান বিশ্ব নিজেই ভবিষ্যতের দ্বার উন্মুক্ত করে।”[18]

ভাহদাত আরো একধাপ এগিয়ে হেগেলের সাবজেক্টিভিটি তত্ত্বের সার্বজনীন বৈশিষ্ট্যের উপর আলোকপাত করেন।[19] তিনি যুক্তি দেন, যখন একজন ব্যক্তি তার নিজের সাবজেক্টিভিটি বুঝতে পারে তখন সে অনুধাবন করে, অন্যদেরও একই রকম ব্যাপার রয়েছে। কিছুক্ষেত্রে এটা এক ধরনের সার্বজনীন সমতা রক্ষায় ভূমিকা পালন করে। এইভাবে আধুনিকতার একেকটা উপাদান সার্বজনীন সাবজেক্টিভিটির চেতনা হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

উপর্যুক্তভাবে সংজ্ঞায়িত আধুনিকতা কীভাবে ইসলাম, বিশেষত কারযাভীকে প্রভাবিত করেছে, তা এই গবেষণার মূল বিষয়। তদুপরী আধুনিকতা একটা ফেনোমনা আকারে কীভাবে পাশ্চাত্যে গড়ে ওঠেছে, তারপর মধ্যপ্রাচ্যকে প্রভাবিত করেছে – এটাও নিরীক্ষা করা দরকার।

রেফারেন্স:

[1] Bettina Graef, “Yusuf al-Qaradawi and the Foundation of a ‘Global Muslim Authority’,” Qantara Website, (29 April 2005), <http://www.qantara.de/webcom/show_article.php/_c-476/_nr-363/i.html> (accessed 30 July 2007).

[2] Gilles Kepel, Bad Moon Rising: A Chronicle of the Middle East Today, trans. Pascale Ghazaleh (London: Saqi Books, 2003), p. 60.

[3] “Why the Mayor of London will maintain dialogues will all of London’s Faiths and Communities,” (London: Greater London Authority, January 2005), p. 5.

[4] Karen Armstrong, Islam: A Short History (New York: Random House, 2002), pp. 185–6. and John L. Esposito, “Practice and Theory: A response to ‘Islam and the Challenge of Democracy’,” Boston Review, April–May 2003, <http://bostonreview.net/BR28.2/esposito.html> (accessed 30 July 2007).

[5] “Stop Terror Sheikhs, Muslim Academics Demand,” Arab News (Saudi Arabia), 30 October 2004, <http://www.arabnews.com/?page=4&section=0&article=53683&d=30&m=10&y=2004> (accessed 30 July 2007).

[6] “Mayor Livingstone and Sheikh Qaradawi,” A Coalition of Many of Londons Diverse Communities, (9 November 2004), <http://www.londoncommunitycoalition.org/> (accessed 30 July 2007).

[7] “Why the Mayor of London will maintain dialogues will all of London’s Faiths and Communities,” pp. 1–2.

[8] Derek Hopwood, “The Culture of Modernity in Islam and the Middle East,” in John Cooper, Ronald L. Nettler and Mohamed Mahmoud (eds.) Islam and Modernity: Muslim Intellectuals Respond (London: I.B. Tauris. 1998), p. 1.

[9] S. N. Eisenstadt, “Multiple Modernities,” Daedalus 129, No. 1 (Winter 2000), p. 1.

[10] Ibid. p. 1.

[11] Ibid. p. 2.

[12] Richard P. Mitchell, The Society of Muslim Brothers, (Oxford: Oxford University Press, 1993), pp. XXIII–XXIV.

[13] Jürgen Habermas, The Philosophical Discourse of Modernity: Twelve Lectures, trans. Fredrick Lawrence (Cambridge: Polity Press, 1987), p. 17.

[14] Ibid., p. 18.

[15] Farzin Vahdat, God and Juggernaut: Irans Intellectual Encounter with Modernity (Syracuse: Syracuse University Press. 2002), p. 19.

[16] Eisenstadt, p. 1.

[17] Habermas, p. 1.

[18] Ibid., p. 6.

[19] Vahdat, P. 1.

Leave a Reply