চতুর্থ পর্ব

৫.৬) গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র (আল মাদীনাতুল জামাআইয়া)
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হচ্ছে সেই রাষ্ট্র যেখানে মানুষের রয়েছে অবাধ স্বাধীনতা, নাগরিকরা সবাই সমান। কোনো দিক দিয়েই একজন অন্যজন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর হতে পারে না। ফলে গড়ে ওঠে বিভিন্নধর্মী মনমানসিকতা, জন্ম নেয় নানা ধরনের নৈতিক প্রবণতা, এতেই মানুষ আনন্দ লাভ করে। নাগরিকেরা অসংখ্য দলে উপদলে বিভক্ত। সম্ভ্রান্ত ও অসম্ভ্রান্ত সব গোষ্ঠীর মিলনস্থল এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রে শাসক ও শাসিতের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই । বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শাসিতরাই শাসকদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে। অবশ্য যেসব নেতৃবৃন্দ জনগণের স্বাধীনতা সংরক্ষণ করে, ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সহায়তা করে, অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও বহিঃশত্রুর আক্রমণের সময় নিরাপত্তা বিধান করে, নাগরিকেরা সেসব নেতৃবৃন্দের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে।

আদর্শচ্যুত রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুরোপুরিভাবে বিদ্যমান। আদর্শচ্যুত রাষ্ট্রের মধ্যে তুলনামূলকভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি শান্তিপূর্ণ। তাই তা প্রশংসার দাবিদার। আপাতদৃষ্টিতে কারুকার্যখচিত চাকচিক্যময় পোশাকের মতোই মনে হয়। সবাই গণতান্ত্রিক দেশে বসবাসে আগ্রহী। কেননা, গণতান্ত্রিক দেশে সবার মনের বাসনা পূরণের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অন্য দেশের নাগরিকেরা সেখানে সুখে-শান্তিতে বসবাসের আশায় ভিড় করে এবং আশাতীতভাবে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন জাতির আগমন ও বহুমুখী শিক্ষার সংমিশ্রণে বৈচিত্র্যময় মনমানসিকতার উন্মেষ ও বিকাশ ঘটে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্থায়ী বাসিন্দা এবং বহিরাগতদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। সবাই মিলেমিশে একসাথে বাস করে। জীবনধারণের উপকরণ সেখানে সহজেই অর্জন করা যায়। এই পরিবেশে কালক্রমে সদ্গুণসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের আবির্ভাব খুবই স্বাভাবিক। আর সেখানে বসবাস করবে দার্শনিক, অলংকারশাস্ত্রবিদ, কবি-সাহিত্যিকদের মতো জ্ঞানীগুণী সুধীজনবৃন্দ। এখান থেকে আদর্শ রাষ্ট্রের জন্য কিছু মহৎ ব্যক্তি বাছাই করা যেতে পারে। অতএব, দোষগুণের সমাহারে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। যে রাষ্ট্র যত বড় সে রাষ্ট্র তত বেশি সভ্য, জনবহুল, উৎপাদনশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। এখানে সৎ ও অসৎ উভয় প্রকার লোক সমভাবে বিদ্যমান।

আদর্শচ্যুত রাষ্ট্র যেমন নৈতিকতা বিবর্জিত, আদর্শহীন নেতৃত্বও তেমনি নীতি বর্জিত। আদর্শহীন নেতৃত্বের উদ্দেশ্য হলো জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ, আনন্দ উপভোগ, সম্মান, খ্যাতি, প্রশংসা, আধিপত্য অথবা অবাধ স্বাধীনতা অর্জন। অতএব, এ জাতীয় নেতৃত্ব টাকা দিয়ে কেনা যায়। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসকদের পদমর্যাদার ক্ষেত্রে এ নীতি অধিক প্রযোজ্য। কেননা, এই রাষ্ট্রে পদমর্যাদার দিক থেকে সবাই সমান। কেউ কারো চেয়ে বড় নয়। গণতান্ত্রিক দেশে শাসকেরা নাগরিকদের অনুকম্পায় তাঁদের পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। এর বিনিময়ে তাঁরা নগদ টাকা কিংবা মূল্যবান ব্স্তু দিয়ে নাগরিকদের খুশি রাখেন। জনগণের দৃষ্টিতে আদর্শ নেতা হচ্ছেন এমন ব্যক্তি যার সঠিক বিচারক্ষমতা রয়েছে এবং তিনি সুপরিকল্পিত উপায়ে এমনভাবে দেশ শাসন করবেন যেন তাঁদের সব ইচ্ছাই পূরণ হয়, সদা-সর্বদা শত্রুর কবল থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারেন ও জানমালের নিরাপত্তা থাকে। যদি কোনো আদর্শ ব্যক্তি তাঁদের নেতা হন এবং সার্বিক সুখ লাভের চেষ্টা করেন, তবে জনগণ তাঁকে প্রশাসকের পদে অধিষ্ঠিত করতে নারাজ। এসব শাসক নাগরিকদের হাতে নিহত হন বা ক্ষমতাচ্যুত হন অথবা সবসময় তাঁর জানমালের নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন থাকে। এক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ও অন্যান্য রাষ্ট্রের অবস্থা একইরূপ। কেননা, সব আদর্শচ্যুত রাষ্ট্রের নাগরিকরা এমন শাসক কামনা করেন যাঁরা তাঁদের ইচ্ছাপূরণ ও স্বার্থসিদ্ধির পথ সুগম করে দেন। তাই তারা মহৎ লোকের শাসন বর্জন করেন। তবুও একথা স্মরণ রাখা কর্তব্য যে, অন্যান্য আদর্শচ্যুত রাষ্ট্রের তুলনায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মাধ্যমে আদর্শ রাষ্ট্রে উত্তরণ ও আদর্শ শাসকের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সহজ ও ফলপ্রসূ। তাই আদর্শ রাষ্ট্রের পরই গণতন্ত্রের স্থান।[16]

অকল্যাণকামী রাষ্ট্রের নাগরিকরা মানবিক কল্যাণকে সম্মানের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে না। তাঁদের মতে সম্মানের মানদণ্ড হলো:

(ক) সম্পদ
(খ) খেলাধুলা ও আনন্দদানের উপকরণ লাভের ক্ষমতা
(গ) জীবন চলার পথে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী অর্জন
(ঘ) অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তারের ক্ষমতা।

শেষোক্ত বিষয়টিকেই অধিকাংশ লোক বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এমনকি আধিপত্য বিস্তারের শক্তি এবং অন্যকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা অনেকের ঈর্ষার কারণ হয়ে থাকে। অতএব, জনগণের উপর প্রভাব বিস্তার ও রাষ্ট্রের উপর আধিপত্য বিস্তারের ক্ষমতা অকল্যাণকামী রাষ্ট্রে একটি বিশেষ গুণ হয়ে থাকে। কেননা, তাঁদের দৃষ্টিতে আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে রাষ্ট্রে খ্যাতি অর্জন করা যায়। আর এই খ্যাতির ব্যাপ্তির উপর নির্ভর করে সম্মানের প্রসার। আর আধিপত্যের মাত্রা নির্ণীত হয় তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ও শক্তির ভিত্তিতে। যাঁর অনুসারীর সংখ্যা ও শক্তি যত বেশি তিনি তত সম্মানের পাত্র। যাঁর শক্তিশালী সমর্থক রয়েছে তিনি তাঁর প্রতিপক্ষের ক্ষতি সাধন করতে পারেন অতি সহজে। যে ব্যক্তি মানুষের যত বেশি ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম সমাজের লোকেরা তাকে সম্মান করে তত বেশি।

অকল্যাণকামী রাষ্ট্রের নাগরিকেরা কোনো কোনো সময় বংশগত ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের ধ্বজাধারী ব্যক্তিকে সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন। কেননা, অভিজাত পরিবারের বংশধরদের ধনসম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সমর্থক থাকে। তাই জনগণ তাঁদেরকে সম্মান প্রদর্শন করে এই আশায় যে, বিনিময়ে কিছু সম্মান ও অর্থসম্পদ লাভ করা যাবে। অকল্যাণকামী রাষ্ট্রের নাগরিকরা মনে করেন যে, তাঁদের দৃষ্টিতে যাঁরা বেশি সম্মানিত তাঁরা হবেন শাসক, আর যাঁরা কম সম্মানিত তাঁরা হবেন শাসিত। ধনসম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, বংশগত ঐতিহ্য ও আভিজাত্যহীন লোকের শাসক হবার কোনো যোগ্যতা নেই।

কোনো কোনো সময় শাসককে সম্মান করা হয় এজন্য যে, তিনি নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী, ধনসম্পদ ও আনন্দের উপকরণ সরবরাহ করতে সক্ষম এবং তিনি তার প্রশাসনের মাধ্যমে নাগরিকদের সম্মান প্রদানের ব্যবস্থা করেন। এ ধরনের শাসককে জনগণ পছন্দ করেন। কেননা, তিনি জনগণের জন্য সবকিছুর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু বিনিময়ে তিনি চান যে, তাঁর জীবদ্দশায় লোকে তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুক এবং মৃত্যুর পরে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করুক।

তিনি সম্মান লাভের আশায় ধনসম্পদ অর্জন করেন। এই জন্যেই কোনো কোনো শাসক দানশীল হন। তাঁরা একদিকে রাষ্ট্র থেকে কর আদায় করেন এবং অন্যদিকে তা জনগণের স্বার্থে খরচ করেন।

কোনো কোনো সময় শাসকেরা চান যে, তাঁর প্রতি এই সম্মান বংশ পরম্পরায় বজায় থাক এবং তাঁর সন্তান-সন্ততি পরবর্তীকালে সম্মান লাভ করুক। তাই কোনো কোনো শাসক জনসাধারণের কথা চিন্তা না করে ভবিষ্যতে তাঁর নিজের ও বংশের সম্মান লাভের আশায় অর্থ সঞ্চয় করেন। শাসকেরা কোনো কোনো দল উপদলের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন এই আশায় যে, তাঁরা বিনিময়ে শাসকদেরকে সম্মান প্রদর্শন করবেন এবং কোনো দল বা উপদলকে সন্তুষ্ট করতে যে সম্পদ ও আনন্দ-উপকরণ প্রভৃতি দরকার তা সরবরাহ করে থাকেন। তাঁরা জৌলুস বৃদ্ধির জন্য কারুকার্যখচিত ঐশ্বর্যমণ্ডিত এমন দালান-কোঠা নির্মাণ করেন, যেখানে জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ। আর তাঁর নিজের ও পরিবারের জন্য তিনি মহামূল্যবান পোষাক ও পদক তৈরি করেন। উপরন্তু তিনি এমনসব আইন প্রণয়ন করেন যাতে বংশানুক্রমে তার সন্তান-সন্ততিরা সেই সম্মনের ভাগী হয়। তাছাড়া, তিনি সেই সমস্ত লোকদের সুযোগ-সুবিধা দান করেন যাঁরা তাঁর সম্মান রক্ষার জন্য কাজ করে থাকেন। তাঁর সম্মান রক্ষার্থে নাগরিকদের মধ্যে যিনি যতটুকু কাজ করেন তাঁকে ততটুকু সুবিধা প্রদান করেন। অপরপক্ষে নাগরিকরা ততক্ষণ পর্যন্ত শাসককে সম্মান প্রদর্শন করেন যতক্ষণ তিনি তাঁদের স্বার্থ সংরক্ষণ করেন। গৌরব-প্রত্যাশী রাষ্ট্র অকল্যাণকামী রাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে ভালো, কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মতো। তবে যখন সম্মন গ্রহণ ও প্রদানের আশা মাত্রাতিরিক্ত হয় তখন তা স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যা ধীরে ধীরে আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রে পরিবর্তিত হয়।

৬) অনৈতিক রাষ্ট্র (আল মদীনা আল ফাসেকাহ)
যে রাষ্ট্রের নাগরিকরা সত্তার অস্তিত্ব ও নীতিমালায় (প্রথম কারণ, দ্বিতীয় কারণ, সক্রিয় বুদ্ধি, কার্যকারণ সম্পর্ক, জড়পদার্থ ও আত্মা) বিশ্বাস করে শান্তির প্রকৃতি ও সুখ অর্জনের পন্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া সত্ত্বেও ঐ সব নীতিমালার উপর আমল করে না এবং ইহকাল ও পরকালে সুখ কামনা করে না, সেই রাষ্ট্রকে অনৈতিক রাষ্ট্র বলে। ঐ রাষ্ট্রের নাগরিকরা অকল্যাণকামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের মতো ধন-সম্পদ আহরণ, সম্মান অর্জন ও আনন্দ উল্লাসে মত্ত থাকে। অকল্যাণকামী রাষ্ট্রের নাগরিক এবং অনৈতিক রাষ্ট্রের নাগরিকদের কার্যাবলি প্রায় একই রকম। তাঁদের মধ্যে পার্থক্য এটুকুই যে, অকল্যাণকামী রাষ্ট্রের নাগরিকরা সত্তার অস্তিত্ব ও নীতিমালায় বিশ্বাস করে না, অপরপক্ষে অনৈতিক রাষ্ট্রের নাগরিকরা এসব নীতিমালায় বিশ্বাসী। অবশ্য, একথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, অকল্যাণকামী রাষ্ট্র এবং অনৈতিক রাষ্ট্রের নাগরিকদের কেউই সুখ অর্জনে সক্ষম নয়।[17]

৭) ভ্রান্ত রাষ্ট্র (আল মদীনা আল দাল্লাহ)
যে রাষ্ট্রের নাগরিকরা সুখ অর্জনের প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা উপেক্ষা করে শুধুমাত্র ধারণার বশবর্তী হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে, সেই রাষ্ট্রকেই ভ্রান্ত রাষ্ট্র বলে। ভ্রান্ত রাষ্ট্রের মাধ্যমে প্রকৃত সুখ অর্জন সম্ভব নয়।[18]

প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব এবং শেষ পর্ব

1
2
3
4
5
মুহাম্মদ শাহজাহান
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। মুসলিম দর্শন, বিশেষ করে আল-ফারাবীর উপর আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন