মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে ইসলাম ও রাষ্ট্রের সর্ম্পক বিশ্লেষণ

বেশিরভাগ মুসলিম প্রধান দেশ গত শতাব্দীতে স্বাধীনতা লাভ করেছে। আধুনিক রাষ্ট্রের প্রকৃতি ও ইসলামের সম্পর্ক নিয়ে এসব দেশে এক ধরনের টানাপড়েন লক্ষ করা যায়। এ কারণে আলাদা আলাদা ভাবে প্রতিটি দেশের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামো বোঝার সাথে সাথে ঐ দেশে ইসলাম কী ধরনের ভূমিকা রাখছে, তা বুঝা অত্যন্ত জরুরি। মুসলিম প্রধান দেশগুলোর প্রকৃত অবস্থা ভালোভাবে বোঝার জন্য এক ধরনের ক্রমবিন্যাসমূলক চিত্র তুলে ধরা প্রয়োজন যাতে করে এগুলোকে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করে মূল্যায়ন করা যায়।

Understanding relationship between State & Islam in Muslim majority countries
Figure: Understanding relationship between State & Islam in Muslim majority countries

উল্লেখিত ক্রমবিন্যাসে ‘-৬’ থেকে ‘+৬’ পর্যন্ত মুসলিম প্রধান দেশগুলোর রাষ্ট্র প্রকৃতি এবং ক্রমধারানীতি, রাষ্ট্রের বিবর্তন ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে খাপ খাওয়ানোর বিষয়গুলোকে শ্রেণীবিন্যাস করা হয়েছে।

(০) সিভিল স্টেট: এ ধরনের রাষ্ট্রে বর্তমানে নির্দিষ্ট কোনো মতাদর্শের প্রাধান্য নেই বা যদি থেকেও থাকে তবে সেখানে ইসলামী মূল্যবোধ ও মুসলিম সমাজের সাথে খুব বেশি সংঘর্ষ বা বিরোধ নেই। এ ধরনের রাষ্ট্র ইসলামী মূল্যবোধ ও বিধিবিধান প্রবর্তনে সহায়তা করতেও পারে, না করতেও পারে; তবে তা সব ধর্মের ব্যাপারে নিরপেক্ষতা এবং সহনশীলতাকে প্রাধান্য দেয়। যেহেতু এ ধরনের রাষ্ট্রে অধিকাংশ মানুষ একই ধর্মের অনুসারী হয়ে থাকেন, তাই সেখানে রাষ্ট্রের ইচ্ছা বা অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মের উল্লেখেযোগ্য প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যেমন, ভারতে হিন্দু ধর্মের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। মুসলিম প্রধান দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ও লেবানন।

(+১) সেক্যুলার রাষ্ট্র/সিভিল স্টেট, যা ইসলামী মূল্যবোধ প্রবর্তনে সহায়ক: সমাজ ও রাষ্ট্রকে ভালোভাবে পরিচালনার জন্য মুসলমানরা এ ধরনের রাষ্ট্রে বিশেষ বিশেষ ইসলামী মূল্যবোধের প্রচলন করে থাকেন। রাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে সমাজকে ধারণ করার চেষ্টা করে। আর তাই এ মূল্যবোধগুলোকে ঐ সমস্ত দেশে সংবিধানের অনুচ্ছেদ বা আইন অথবা সরকারী কর্মসূচিরূপে রাষ্ট্রীয় মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যেমন: ইন্দোনেশিয়া ও তুরস্ক।

(+২) সেক্যুলার রাষ্ট্র /সিভিল স্টেট যেখানে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম: রাষ্ট্র যেখানে ধর্মীয় ব্যাপারে পক্ষ নেয় এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামকে পৃষ্ঠপোষকতা করলেও অন্যান্য সকল সংখ্যালঘু ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। যেমন: বাংলাদেশ, ফিলিস্তিন (পশ্চিম তীর), তিউনিশিয়া, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপ।

(+৩) মদিনা রাষ্ট্র/আদ-দাওলাহ আল-মাদানিয়্যাহ/ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে সিভিল স্টেট: আরব বসন্তের পরে এ ধারণার উদ্ভব ঘটে। এটি ইসলামপন্থি, উদার সেক্যুলারপন্থি এবং উদার বামপন্থিদের সমন্বিত ধারণা। এ ক্ষেত্রে ইসলামী দলগুলোর মূল অনুপ্রেরণা হলো মদিনা সনদ এবং মুহাম্মদ (সা)-এর প্রতিষ্ঠিত মদিনা রাষ্ট্র (ইসলামী রাষ্ট্র)। উদাহরণ হিসেবে মুরসির সময়ের মিশর এবং বিপ্লব পরবর্তী তিউনিশিয়ার কথা বলা যায়। তবে বিপ্লব পরবর্তী দুই বছরে তিউনিশিয়া তাদের পরিকল্পনা স্থগিত করে ইসলামপন্থী ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে +২ ক্যাটাগরির (রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম) দিকে ধাবিত হয়েছে।

মূলনীতির ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বরাবরই বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে সামাজিক চুক্তিতে আসার চেষ্টা করে। তাই তারা সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে, যেন সেখানে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় কার্যকর করতে রাষ্ট্রীয় বাধা না থাকে। এ ধরনের রাষ্ট্রে ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তার কথা বলা হয়। এবং তাদের পরিকল্পনা হলো ক্রমান্বয়ে শরীয়াহ আইন বাস্তবায়ন করা। +২ থেকে +৩ ক্যাটাগরিতে উত্তীর্ণ হয়েছে এমন দেশ হিসেবে মালয়েশিয়াকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। যদিও দেশটি ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী সিভিল স্টেট কিন্তু তারা একে ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেনি।

(+৪) সাংবিধানিক ইসলামী রাষ্ট্র: কোনো কোনো দেশ নিজেদেরকে সাংবিধানিকভাবে ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছে। যদিও সেসব দেশে শরীয়াহ আইন এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। যেমন: পাকিস্তান ও আরব বসন্ত পরবর্তী সময়ের লিবিয়া।

(+৫) আমীর শাসিত ইসলামী রাষ্ট্র/রাজতন্ত্র/শরীয়াহ আইনের দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র: এ ধরনের রাষ্ট্রে ইতোমধ্যে শরীয়াহ আইন আংশিক বা পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এবং এ ধরনের রাষ্ট্র ইতোমধ্যে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে ধর্মের ভূমিকা বা কর্তৃত্বকে নিয়মানুগভাবে মানিয়ে নিয়েছে। তবে সেখানে ইসলামী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাব রয়েছে। এসব রাষ্ট্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুশীল সমাজ ও অন্যান্য ইসলামপন্থী দলগুলোর সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগির লক্ষ্যে আপসমূলক নীতি গ্রহণ করতে দেখা যায়। এ কারণে সেসব দেশে মাঝে মাঝে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরীর প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। যেমন: উপসাগরীয় দেশগুলো। এছাড়াও বিভিন্ন রাজতন্ত্র যেমন, জর্দান, মরক্কো, সুদান।

(+৬) ইসলামী রাষ্ট্র: এ ধরনের রাষ্ট্রে ইসলামী রাষ্ট্র ধারণাকে সাংবিধানিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। এ কারণে তারা সমাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরী করার মাধ্যমে ইসলামী মূল্যবোধ ও বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং সেখানে শরীয়াহ আইন সুপ্রতিষ্ঠিত। যেমন: ইরান।

(-১) দুর্বল সিভিল স্টেট/সেক্যুলার রাষ্ট্র: এ ধরনের রাষ্ট্র অনেকটা সিভিল স্টেটের (০) মত মনে হলেও সেখানে সীমান্ত সমস্যা, নৃতাত্ত্বিক বিভাজন অথবা গৃহযুদ্ধ ইত্যাদি কিছু কিছু মৌলিক সমস্যা সমাধানে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। রাষ্ট্র হিসেবে তারা দূর্বল। এসব দেশে ইসলামী সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ সমাজিকভাবে প্রভাবশালী হলেও উল্লেখিত বাধার কারণে অধিকাংশ ইসলামী বিধিবিধান রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর করা সম্ভব হয় না। যেমন: সোমালিয়া, মৌরিতানিয়া বা আফ্রিকার অন্যান্য দেশসমূহ।

(-২) সেক্যুলার রাষ্ট্র, যেখানে ইসলামভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ: এ ধরনের রাষ্ট্র ইসলামভিত্তিক রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছে এবং সেখানে ইসলামী রাজনীতির উপর আংশিক বা পরিপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সেখানে ইসলামভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সক্রিয় হওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত কিম্বা একেবারে নেই বললেই চলে। কিন্তু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ইসলামের প্রভাব লক্ষ্যনীয়। যেমন: তাজিকিস্তান, তুর্কেমিনিস্তান।

(-৩) একনায়ক/স্বৈরশাসনাধীন সেক্যুলার রাষ্ট্র: এসব দেশে শাসকগোষ্ঠির নির্ধারিত সীমারেখার বাইরে গিয়ে মুসলমানদের রাজনৈতিক অভিমত প্রকাশের সুযোগ নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শাসকগোষ্ঠি রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে একনায়কতন্ত্রে পর্যবসিত করে। তারা রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ইসলামভিত্তিক রাজনীতি, এমনকি সামাজিক সংগঠনগুলোর উপরেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যেমন: সিরিয়া, আজারবাইজান এবং উজবেকিস্তান।

(-৪) ইসলামী মূল্যবোধ বিরোধী সেক্যুলার রাষ্ট্র: সরকার একনায়কসুলভ না হলেও সমাজে বিদ্যমান নির্দিষ্ট কিছু ইসলামী মূল্যবোধের বিপক্ষে রাষ্ট্রকে অবস্থান নিতে দেখা যায়। সরকার ইসলাম বিরোধী কিম্বা নাস্তিক প্রকৃতির না হলেও বিশেষ কিছু ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি তাদের বিদ্বেষ রয়েছে। যেমন: কাজাখস্তান, কিরগিজিস্তান।

(-৫) প্রকৃত সেক্যুলার রাষ্ট্র/ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্র বা সমাজ: এ ধরনের রাষ্ট্রগুলো ফরাসী সেক্যুলারিজমের ধারণা দ্বারা প্রভাবিত। তারা রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে ধর্মকে আলাদা করতে সবসময় সচেষ্ট। যেমন: আলবেনিয়া ও আলজেরিয়া।

(-৬) নিরীশ্বরবাদী বা নাস্তিক রাষ্ট্র: বর্তমানে মুসলিম প্রধান দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরীশ্বরবাদী বা নাস্তিক রাষ্ট্র না থাকলেও আলবেনিয়া কয়েক দশক আগে নিরীশ্বরবাদী বা নাস্তিক রাষ্ট্র ছিল। সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল স্তর থেকে ইসলামসহ সব ধর্মকে মুছে ফেলতে এ ধরনের রাষ্ট্র সব সময় সচেষ্ট।

মূল ইংরেজি  থেকে অনুবাদ করেছেন মো: হাবিবুর রহমান হাবীব

এই আর্টিকেল নিয়ে জাহিদ রাজনের পর্যালোচনা পড়ুন- আর্টিকেল রিভিউ: মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে রাষ্ট্র ও ইসলামের সর্ম্পক বিশ্লেষণ

Leave a Reply