মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭
হোম > সাক্ষাৎকার > আমার সতেরো বছরের জেল জীবন

আমার সতেরো বছরের জেল জীবন তিউনিশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হামাদী জেবালীর সাক্ষাৎকার

এডিটর’স নোট:

তিউনিশিয়ায় জেসমিন বিপ্লবের পর ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন হামাদী জেবালী। তাঁকে বলা হয় তিউনিশিয়ার নেলসন ম্যান্ডেলা। দেশটিতে স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে হামাদী জেবালী ছিলেন অন্যতম। তিনি প্রেসিডেন্ট হাবিব বুরগিবার হুমকির মুখে তিউনিশিয়া থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। বুরগিবাকে ক্ষমতাচ্যুত করে প্রেসিডেন্ট হন জেইন আল আবেদীন বেন আলী। এ সময় হামাদী জেবালী দেশে ফিরে এসে একটি পত্রিকা সম্পাদনার কাজ শুরু করেন। কিন্তু সরকারবিরোধী বিভিন্ন লেখার কারণে তিনি টানা সতেরো বছর কারারুদ্ধ ছিলেন। এর মধ্যে দশ বছর তাঁকে নির্জন কারাবাসে থাকতে হয়।

জেসমিন বিপ্লবের মাধ্যমে বেন আলী ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জেবালী ও তাঁর মধ্যপন্থী ইসলামী দল ‘আন-নাহদা’ জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসে এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। কিন্তু তিনি খুব অল্প সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান। তাঁর দলকে একটি স্বাধীন টেকনোক্র্যাট সরকার পরিচালনায় রাজি করাতে ব্যর্থ হয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি পদত্যাগ করেন। ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা বিবিসি’র ‘আউটলুক’ অনুষ্ঠানে ম্যাথিউ ব্যানিস্টারের সাথে দোভাষীর মাধ্যমে হামাদী জেবালী তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতা, বহু বছরের বন্দী জীবন এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি ১৬ সেপ্টেম্বর প্রথম সম্প্রচারিত হয়। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য এটি ভাষান্তর করেছেন মো. হাবিবুর রহমান হাবীব।


ম্যাথিউ ব্যানিস্টার: রাজনীতিতে আসার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম কোন বিষয়টি আপনাকে উদ্বুদ্ধ করেছিলো?

হামাদী জেবালী: শুরুটা ছিলো… আসলে আমি আমার বাবার দ্বারা ব্যাপক প্রভাবিত হয়েছিলাম। যখন তিউনিশিয়া স্বাধীন হয়, তখন আমার বয়স ছিল মাত্র আট বছর। সে সময় ক্ষমতাসীন দল আরসিডি (কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্রেটিক র‍্যালি) দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। যার একটি অংশের নেতৃত্বে ছিলেন হাবীব বরগিবা এবং অন্য অংশের নেতৃত্বে ছিলেন বিন ইউসুফ। বিন ইউসুফের বিরোধিতা থেকে নিষ্কৃতি পেতে বরগিবা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান। আমার বাবা ছিলেন বিন ইউসুফের অনুসারীদের মধ্যে অন্যতম। বিন ইউসুফের অনুসারীদের বিরুদ্ধে বরগিবা ব্যাপক গ্রেফতার অভিযান চালান, আমার বাবাও তাদের মধ্যে ছিলেন। এর ফলে আমরা সবাই ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হই।

ম্যাথিউ ব্যানিস্টার: জেলখানায় আপনার বাবাকে দেখতে যাওয়ার স্মৃতি আপনার মনে পড়ে?

হামাদী জেবালী: সব কিছুই আমার সুস্পষ্ট মনে আছে। আমি খুবই ছোট ছিলাম। আমার বয়স ছিল প্রায় আট বছর। আমি বাবাকে দেখতে যাওয়ার জন্য প্রায়ই মাকে জ্বালাতন করতাম। এ কারণে তিনি আমাকে বাবার কাছে নিয়ে যেতেন। যখন বাবাকে দেখতে যেতাম তখন আমার ছোট ব্যাগে কিছু খাবার নিয়ে যেতাম। আমি জেলের ভিতরে যাওয়ার সুযোগ পেতাম। জেলের ভিতর অন্ধকারাচ্ছন্ন নির্জন ওয়ার্ডে আমি বাবার সাথে দেখা করতাম।

সেই ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে বাবার সাথে আরো একজন মানুষ থাকতেন। তিনি এবং আমার বাবা ছিলেন আমার জানা মতে স্বাধীনতা পরবর্তী তিউনিশিয়ার প্রথম রাজবন্দী। পরবর্তীতে সেই লোকটিকে বরগিবা মৃত্যুদন্ড দিলেও আলৌকিকভাবে আমার বাবা বেঁচে যান। তাঁকে মৃত্যুদন্ড দেয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ তারা খুঁজে পায়নি।

বুঝতেই পারছেন, সেই সব দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা আমার স্পষ্ট মনে আছে। আর সেগুলো আমার পরবর্তী জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

ম্যাথিউ ব্যানিস্টার:  আপনি তো ফ্রান্সে ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়ালেখা করতে গিয়েছিলেন। আমার জানা মতে, আপনি সেখানে খুবই সক্রিয়ভাবে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তিউনিশিয়ার ঘটনাবলির সাথে যার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল। আপনার জীবনের সেই সময় সম্পর্কে কিছু বলুন।

হামাদী জেবালী: রাজনীতি আমার রক্তের সাথে মিশে আছে। বিশেষ করে আমার বাবা এবং আমার অতীতের প্রভাবে। তাই যখন আমি ফ্রান্সে ইঞ্জিনিয়ারিং তথা এনার্জি বিষয়ে পড়তে যাই তখন আমি ইসলামিক স্টুডেন্ট সোসাইটিতে যোগদান করি। আর এভাবে ইসলামী রাজনীতিতে সক্রিয় হই। ইউরোপ, বিশেষত ফ্রান্সে থাকাকালীন সময়ের ব্যাপক প্রভাব আমার জীবনে রয়ে গেছে। ফ্রান্সে গিয়ে ইসলামের প্রকৃত মর্ম সম্পর্কে জানার সৌভাগ্য হয় আমার। আর তা ছিল গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতার মূলবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ পর্যায়ে আমি গভীরভাবে ইসলামকে জানার চেষ্টা করি এবং অনেক গবেষণা করি। আমি ইসলাম, স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের মধ্যে পরস্পর বিরোধী কিছুই খুঁজে পাইনি।  তাই তিউনিশিয়ায় ফিরে এসে এগুলোর প্রচারণা ও প্রতিষ্ঠার  কাজ শুরু করি।

ম্যাথিউ ব্যানিস্টার: তিউনিশিয়ায় ফিরে আসার পর আপনার রাজনৈতিক কর্মকান্ড আপনাকে সরকারের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ফেলে। আমার জানা মতে, প্রেসিডেন্ট বরগিবা আপনাকে জীবননাশের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন।

হামাদী জেবালী: বুরগিবা যখন সালেহ বিন ইউসুফকে মৃত্যুদন্ড দেয়, তখন আমরা ভেবেছিলাম, বরগিবা তিউনিশিয়ায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। কিন্তু তিনি একনায়কে পরিণত হন এবং একদলীয় শাসন কায়েম করেন। তিনি বামপন্থী, ইসলামপন্থী  কিংবা অন্য  কোনো দলের অনুসারী কাউকে রাজনীতি করার সুযোগ দেননি। উপরন্তু তিনি আমাদের জেলে পাঠালেন। যার ফলে আমরা ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হই।

ম্যাথিউ ব্যানিস্টার:  আপনি বললেন, অনেক ভোগান্তির শিকার হয়েছেন কিংবা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সে সময় আপনি কি ধরনের বঞ্চনার শিকার হয়েছিলেন?

হামাদী জেবালী: বেন আলী ১৯৮৭ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বুরগিবাকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজে প্রেসিডেন্ট হন। এর তিন বছর পর, ১৯৯০ সালে বেন আলীর সময় আমি কারাবন্দী হই। আমাকে ষোল বছরের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয় এবং ‘আল-ফজর’ পত্রিকা প্রকাশের দায়ে আরো এক বছরের সাজা দেওয়া হয়। এভাবে মোট সতের বছর জেলখানায় বন্দী থাকতে হয়।

বুরগিবা এবং বেন আলীর শাসনামলে জেলখানায় বন্দী জীবনের মধ্যে ছিল ব্যাপক পার্থক্য। বরগিবার সময় আমরা ছিলাম রাজনৈতিক বন্দী কিংবা বিশেষ বন্দী এবং আমাদের সাথে ভালো ব্যবহার করা হত। আমরা বেশ কিছু স্বাধীনতা ভোগ করতাম। বলতে গেলে আমাদের উপর কোনো রকম নির্যাতন কিংবা খারাপ ব্যবহার করা হয়নি।

কিন্তু বেন আলীর সময়টা ছিল ভয়াবহ নির্যাতন, নিতান্তই অসম্মানজনক এবং মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আমার সতের বছরের জেল জীবনে দীর্ঘ দশ বছর নির্জন কারাবাসে ছিলাম। বেন আলী প্রায়ই আমাদেরকে আমাদের বাড়ি থেকে বহুদূরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠিয়ে দিতেন। এর ফলে আমাদেরকে দেখতে আসার জন্য আমাদের পরিবারের লোকজনকে শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হত। কিন্তু এত কষ্ট করে আসার পর তাঁরা মাত্র ৪/৫ মিনিট কিংবা সর্বোচ্চ ১০ মিনিট আমাদের সাথে দেখা করার জন্য সময় পেত। আমাদের সাথে কোনো প্রকারের বই রাখা কিংবা নামাজ পড়ার অনুমতি ছিল না। এমনকি পবিত্র কোরআন রাখা পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল। অবস্থা এমন ছিল যে, বেন আলীর  জেলখানায় যাওয়া মানেই ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়া।

ম্যাথিউ ব্যানিস্টার: আপনি নির্যাতন শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আপনি যখন কারাগারে ছিলেন তখন কি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন?

হামাদী জেবালী: না, আমি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হইনি। আমাকে কখনোই শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়নি। আমাদের কর্মী এবং অন্যান্যদেরকে খুবই জঘন্যভাবে নির্যাতন করা হত। তবে আমি সব সময়ই মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছি। বিশেষ করে, তিন মিটার দীর্ঘ এবং দুই মিটার প্রস্থের সেই ছোট্ট কক্ষে নির্জন কারাবাসের সময় আমি ভয়াবহ মানসিক নির্যাতনের শিকার হই। আমি সারাদিনে মাত্র পনের মিনিটের জন্য সেলের বাইরে যেতে পারতাম। এই সময়টুকু ছিল আমার জন্য বিরতি। যখন আমাকে এ বিরতি দেওয়া হত, তখনও আমাকে নির্জন রাখা হত। আমি  কারো সাথে মিশতে পারতাম না। কেউই আমার সাথে কথা বলতে  পারত না, আমাকেও কারো সাথে কথা বলতে দিত না। তাই আমি মনে করি, শারীরিক নির্যাতনের চেয়ে মানসিক নির্যাতন অত্যন্ত ভয়াবহ।

ম্যাথিউ ব্যানিস্টার:  আপনাকে আপনার কমবয়সী মেয়েদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল, যা অবশ্যই একটি দুঃসহ ব্যাপার। আমার জানা মতে, আপনি তাদের জন্য সাবান এবং খেজুরের বিচি দিয়ে উপহার বানাতেন। সে সম্পর্কে কিছু বলুন।

হামাদী জেবালী: ওই সময়টা আমার জন্য ছিল সবচেয়ে দুঃসহ। আমার মেয়ে তিনটি ছিল বয়সে অনেক ছোট। তাদের মায়ের কোনো উপার্জন ছিল না। এ অবস্থায় আমি আমার তিনটি মেয়েকে তাদের মায়ের কাছে দেখাশোনা এবং বড় করার জন্য রেখে এসেছিলাম। পুলিশ বাড়িতে এসে প্রায়ই তল্লাশি চালাতো। আমার বন্ধুরা কিংবা পরিবারের লোকেরা কেউ তাদেরকে স্বাধীনভাবে দেখতে যেতে পারত না। আর কঠোর নজরদারী থাকায় কেউ আমার স্ত্রীকে কোনো ধরনের আর্থিক সাহায্যও করতে পারত না।

আমি অবশ্যই আমার স্ত্রীর প্রতি চির কৃতজ্ঞ। আমি যখন জেলে ছিলাম সে আমাকে মানসিকভাবে উৎসাহ দিয়েছে। সে পুলিশি এবং মানসিক নির্যাতনের পরেও ধৈর্য ধরে ছিল। সে মেয়েদেরকে খুব সযত্মে লালন-পালন করেছে। তারা স্কুলে অনেক ভাল করেছে এবং স্নাতক ডিগ্রিসহ শিক্ষা জীবন শেষ করেছে। কিন্তু সেটা আমার জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয় ছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার স্ত্রীকে বুঝাতে চেষ্টা করতাম যে, আমি তাদের বিষয়ে অনেক বেশি আগ্রহী এবং আমি তার এই ত্যাগকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করি।

আমি জেলে আছি, তাই আমি তাদের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন- এই চিন্তা না করে আমিও আমার মেয়েদের লালন-পালনে যতটুকু সম্ভব নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার চেষ্টা করতাম। এজন্য আমার হাতের নাগালে  যাই পেতাম, তা দিয়ে কিছু একটা করার চেষ্টা করতাম। অন্যান্য বন্দীদের মত আমাকেও প্রতি সপ্তাহে একটা সাবান দেয়া হত। আমি প্রায়ই সাবান খোদাই করে বিভিন্ন খেলনা বানাতাম এবং খেজুরের বিচি খোদাই করে কিছু একটা বানাতাম এবং যখন তারা আমাকে দেখতে আসত, আমি তাদেরকে সেগুলো উপহার দিতাম। এমনকি এভাবে আমি পুরো দাবার গুটির সেট বানিয়ে আমার মেয়েদেরকে দিয়েছিলাম, যা দিয়ে তারা খেলত। যা হোক, আমি আমার স্ত্রীর প্রতি অনেক বেশি কৃতজ্ঞ তার এই অসামান্য ত্যাগের জন্য। আমি আমার মেয়েদেরকে অনেক বেশি ভালবাসি। তারা স্কুলে লেখাপড়ায় অনেক ভাল করেছে। তারা এখন উচ্চ শিক্ষিত।

ম্যাথিউ ব্যানিস্টার:  ২০০৬ সালে জেল থেকে মুক্তির পর আপনার জন্য পরিবারের সাথে পূনর্মিলিত হওয়া নিশ্চয়ই কঠিন কাজ ছিল। বিষয়টি অনেক আনন্দের আবার অনেক কষ্টেরও। কারণ আপনি আপনার মেয়েদের শৈশব থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং তারাও। তাদেরকে আবার ফিরে পেয়েছেন….

হামাদী জেবালী: না, বিষয়টি তেমন কঠিন ছিল না। কারণ জেলে থাকার সময় আমার চারপাশ এবং এ দেশে কি ঘটছে- সবকিছু বুঝার চেষ্টা করতাম। যখন আমি জেল থেকে মুক্তি পেলাম তারপরও তাদের নজরদারী অব্যাহত ছিল। এ ব্যাপারটি আমাকে সাঙ্ঘাতিকভাবে আহত করেছিল।

বলতে গেলে আমার কোনো স্বাধীনতাই ছিল না। তখনও আমার পরিবার এবং বন্ধুদেরকে বিভিন্নভাবে ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছিল। সে সময় আমি জেলে ফেরত যাওয়ার কথা ভাবতাম। কারণ আমি আমার পরিবারের উপর এই ধরনের ভীতি প্রদর্শন এবং নির্যাতন মেনে নিতে পারছিলাম না।

ম্যাথিউ ব্যানিস্টার: জেসমিন বিপ্লব শুরু হয়েছিল যখন মোহাম্মাদ বোজিজি নামে একজন দোকানদার নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আপনি কি সে সময় বুঝতে পেরেছিলেন যে, এটি সেই মুহূর্ত, যা পুরো তিউনিশিয়া জুড়ে পরিবর্তনের সূচনা করতে যাচ্ছে?

হামাদী জেবালী: তিউনিশিয়ার বিপ্লব বোজিজির আত্মদানের মাধ্যমে শুরু হয়নি। অনেক বছর আগেই শুরু হয়েছে। একনায়ক বেন আলী ক্ষমতায় আসার পর অর্থনৈতিক মন্দাসহ তিউনিশিয়ার জনজীবনে ব্যাপক দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের বহু কর্মীকে জীবন দিতে হয়। অনেকে ভয়াবহ নির্যাতন, জেল-জুলুমের শিকার হয়। তিউনিশিয়ার বিপ্লব বোজিজির আত্মদানের মাধ্যমে চরম পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। বলতে গেলে তিনি ছিলেন অগ্নিস্ফূলিঙ্গ, যার মাধ্যমে সব অন্যায় আগুনে পুড়ে ছাড়খার হয়ে যায়। আমি প্রত্যেককে অভিবাদন জানাই, যারা তিউনিশিয়ার বিপ্লবে অংশ নিয়েছেন এবং যাদের মাধ্যমে ‘জেসমিন বিপ্লব’ চরম পরিণতি পায়।

ম্যাথিউ ব্যানিস্টার: আপনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বলেছিলেন যে, আপনার সরকার হবে  তিউনিশিয়ার সকল মানুষের জন্য। কিন্তু আপনার সমালোচকদের অভিযোগ, উগ্রবাদী ইসলামপন্থীদের প্রতি আপনার বিশেষ দুর্বলতা ছিল। এই সমালোচনাটি কতটুকু যৌক্তিক বলে আপনার মনে হয়?

হামাদী জেবালী: না, অবশ্যই সেটির কোনো যৌক্তিকতা নেই। আমি কখনোই চরমপন্থীদের প্রতি দুর্বল ছিলাম না। আমার মত যারা স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায়; তারা কারো প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করতে পারেন না। তাই আমি তিউনিশিয়ার জনগণের উদ্দেশ্যে বলেছিলাম, তারা হতে পারেন বামপন্থী কিংবা ডানপন্থী, সবার স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হবে। কোনো অস্ত্রের ব্যবহার নয়, কারণ অস্ত্র  হাতে নিয়ে সংলাপে বসা সম্ভব নয়। সুতরাং আমি কারো প্রতি বেশি দুর্বল ছিলাম না। আমি সেটা স্পষ্ট করে দেখিয়েছি। যখনই কেউ চরমপন্থার আশ্রয় নিয়েছে, তখনই তাকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে।

ম্যাথিউ ব্যানিস্টার: ঠিক আছে। কিন্তু বিরোধী দলীয় নেতার হত্যাকান্ডের মত এত বড় একটি ঘটনা যা আপনার সরকারের জন্য সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হামাদী জেবালী: না, এটা সে ধরনের সংকটময় মুহূর্ত ছিল না। এই ঘটনা আমার পদত্যাগকে ত্বরান্বিত করেনি। চোকরি বেলায়েতের হত্যাকান্ডের কারণে আমি পদত্যাগ করিনি। কারণ আমি পদত্যাগের বিষয়ে আগে থেকেই ভেবেছিলাম। একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার যে সব কাজ করা উচিত ছিল, আমি সেগুলো করতে পারছিলাম না। আর সেজন্যই আমি পদত্যাগ করেছি।

আমি কখনোই চাইনি অন্তর্বর্তীকালীন সময় বেশি দীর্ঘায়িত হোক। আমার মনে হয়েছিল, এটা খুব বেশি দীর্ঘায়িত হতে চলেছে। আমি চেয়েছিলাম মানুষ স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাক। তাই আমি তিউনিশিয়ার জনগণের স্বার্থে পদত্যাগ করেছি, যেন তারা একটি টেকনোক্র্যাট সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে, যারা আরো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন। আর এ কারণেই আমি পদত্যাগ করেছি।

ম্যাথিউ ব্যানিস্টার: আপনি বহু বছর ধরে তিউনিশিয়ার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন, বহু বছর জেলে থেকেছেন কিন্তু এখন আপনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যেতে পারলেন না, আপনাকে পদত্যাগ করতে হল। এটি অবশ্যই তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং পরস্পর বিরোধী ঘটনা। যেদিন আপনি পদত্যাগ করেছিলেন, সে দিনটি নিশ্চয়ই আপনার জন্য অনেক দুঃখজনক ছিল?

হামাদী জেবালী: না, আমি এ রকম সামান্য একটি কারণে মোটেও কষ্ট পাইনি। আমি তিউনিশিয়া শাসন করব কিংবা প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, এমনকি একজন মন্ত্রী হব- এমন স্বপ্ন কখনোই আমার ছিল না।

আমি একজন বড় ব্যবসায়ী হতে পারতাম। এনার্জি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ বা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আমার অনেক বড় বড় প্রকল্প থাকতে পারত। কিন্তু আমি গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতার জন্য আমার জীবনকে উৎসর্গ করে দিয়েছি। যখন আমি বুঝতে পারলাম আমি আমার লক্ষ্যে কাজ করতে পারছি না, তখন আমি পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

ম্যাথিউ ব্যানিস্টার: আরব বসন্ত এবং তার পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের মাধ্যমে একটা বিষন্নতা এবং মানুষের মাঝে একটা ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে, যারা ক্ষমতায় এসেছেন, তারা তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করছে না। এই অবস্থায় আপনি কি তিউনিশিয়ার ভবিষ্যত নিয়ে আশাবাদী কি না? আপনি পদত্যাগ করেছেন, এর মানে কি আপনি আশাহত?

হামাদী জেবালী: অবশ্যই আমি আশাবাদী, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি তিউনিশিয়ার ব্যাপারে খুবই আশাবাদী। আমি তিউনিশিয়ায় গণতন্ত্র এবং প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অত্যন্ত আশাবাদী। ইসলামের সর্বপ্রথম মূল্যবোধ হলো স্বাধীনতা। তাই আমার মনে হয় আরব বসন্ত তিউনিশিয়ার জনগণ, আরব এবং গোটা বিশ্বে মুসলমানদের জন্য স্বাধীনতা নিয়ে এসেছে। আমি মনে করি, একনায়কতন্ত্র এবং অবিচারের যাঁতাকলে এগুলোর কোনোটিই সম্ভব ছিল না। সুতরাং আমি তিউনিশিয়ার ভবিষ্যত নিয়ে অনেক বেশি আশাবাদী।

মো: হাবিবুর রহমান হাবীব
মো: হাবিবুর রহমান হাবীব
প্রাক্তন শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চবি। সমাজ উন্নয়ন কর্মী। Email: habibircu5@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *