শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭
হোম > পর্যালোচনা > ইসলামপন্থার সাথে বোঝাপড়া (পর্ব–১)

ইসলামপন্থার সাথে বোঝাপড়া (পর্ব–১)

এডিটর’স নোট:

ব্রাসেলসভিত্তিক থিংকট্যাংক ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ নানা বিষয়ে নিয়মিত গবেষণামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। পাশ্চাত্যের নীতি-নির্ধারণী মহল কর্তৃক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে এসব গবেষণা যেন সহায়ক ভূমিকা পালন করে, এই হলো তাদের উদ্দেশ্য। ২০০৫ সালের ২ মার্চ তারা ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইসলামিজম’ শিরোনামে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পাশ্চাত্যের একটি থিংকট্যাংক ইসলামপন্থাকে কোন দৃষ্টিতে দেখে, তা এই প্রতিবেদনে ফুটে ওঠেছে। নানা কারণেই বাংলাদেশে এখন ইসলামপন্থা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হওয়ার পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে। তাই সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটির নির্বাচিত অংশ ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছেন আইয়ুব আলী


সারসংক্ষেপ

১. ইসলাম, ইসলামপন্থা এবং ইসলামিক এক্টিভিজম

২. সুন্নী এক্টিভিজমের প্রধান প্রধান ধারা

৩. সুন্নী রাজনৈতিক ইসলামপন্থা: ‘হারাকাত’ ও ‘হিজব’


সারসংক্ষেপ

৯/১১’র ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া হিসেবে পশ্চিমা পর্যবেক্ষক ও নীতিনির্ধারকদের অনেকের মাঝেই একটি প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তাহলো সকল ধারার ইসলামপন্থাকে তারা একইভাবে বিবেচনা করছে। তাদেরকে উগ্রপন্থী হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা হচ্ছে এবং শত্রু হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি আদতেই ত্রুটিপূর্ণ। ইসলামপন্থা বা ইসলামী এক্টিভিজমের (এ দুটি পরিভাষাকে আমরা সমার্থক হিসেবেই বিবেচনা করছি) অসংখ্য ধারা-উপধারা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে অল্প কয়েকটি ধারাই কেবল উগ্রপন্থা সমর্থন করে। তাদের মধ্যে মাত্র হাতেগোনা কিছু উপধারা সশস্ত্র তৎপরতায় লিপ্ত।

পশ্চিমা বিশ্বকে তাই বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। রাজনৈতিক ইসলামপন্থার ভেতরকার দৃষ্টিভঙ্গির এই বৈচিত্রতাকে বিবেচনায় নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ইসলামপন্থীদের মাঝে সবচেয়ে আধুনিকতাপন্থীরাও আমেরিকার চলমান নীতির ঘোর বিরোধী হওয়া সত্বেও পাশ্চাত্যের সাথে তাদের সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে  আগ্রহী। পশ্চিমা বিশ্বকে এটাও বুঝতে হবে, ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত, ইরাক আগ্রাসন ও ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ’ – এ সবগুলোই আসলে বিপদজনক ও অনাকাঙ্খিত জিহাদী তৎপরতাকেই উসকে দিচ্ছে এবং সেসবকে জনপ্রিয় করে তুলতে ভূমিকা রাখছে।

ইসলামী এক্টিভিজমের ধারাগুলো বুঝতে চাইলে শুরুতেই শিয়া-সুন্নী বিভাজনকে বুঝতে হবে। শিয়াদের তৎপরতার মাধ্যমে ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লব সংঘটিত হয়। সে সময়ই প্রথম ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ ধারণাটি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সে কারণে ‘শিয়া তৎপরতা’কে তখন সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

যাইহোক, শিয়ারা আসলে মুসলমানদের ক্ষুদ্র একটি অংশ। মুসলমানদের শতকরা ৮০ জনই সুন্নী। বিভিন্ন দেশে বসবাসরত শিয়ারা সংখ্যালঘু হওয়ায় তাদের তৎপরতা মূলত গোষ্ঠীস্বার্থ কেন্দ্রিক। অর্থাৎ, তারা অন্য জনগোষ্ঠী, এমনকি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের চেয়েও নিজ সম্প্রদায়ের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। নিজেরা সংখ্যালঘু হওয়া ছাড়াও তাদের এই ঐক্যবদ্ধতার পেছনে আরেকটি কারণ রয়েছে। সেটি হলো, রাজনৈতিক তৎপরতায় শিয়াদের ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও আলেমগণ মূখ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন। সে কারণে তারা সুন্নী মুসলমানদের মতো নানা রকম বিরোধপূর্ণ ধারায় খুব বেশি বিভক্ত হয়ে যায়নি।

তবে সুন্নী ইসলামপন্থার দিকেই পাশ্চাত্যের নজর এখন সবচেয়ে বেশি। তাদেরকেই এখন সবচেয়ে ভীতির চোখে দেখা হয়। গোটা সুন্নী ইসলামপন্থাকে মৌলবাদী, চরমপন্থী ও পাশ্চাত্যের স্বার্থের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হয়। যদিও সুন্নী ইসলামপন্থার সকল ধারা একই ধাঁচের (monolithic) নয়; বরং, তিনটি স্পষ্ট স্বতন্ত্র ধারায় বিভক্ত। প্রতিটি ধারারই নিজস্ব বিশ্বদৃষ্টি (worldview), কার্যপ্রণালী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ (characteristic actors) রয়েছে।

  • রাজনৈতিক ধারা: ইসলামী রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর (আল-হারাকাত আল-ইসলামিয়্যাহ আস-সিয়াসিয়্যাহ) ক্ষেত্রে মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমুন উল্লেখযোগ্য। আলজেরিয়া, জর্ডান, কুয়েত, ফিলিস্তিন, সুদান এবং সিরিয়াসহ সর্বত্র এর শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত। এছাড়া তুরস্কের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (Adalet ve Kalkinma Partisi, AKP) ও মরক্কোর পার্টি ফর জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (Parti pour la Justice et le Développement, PJD) মতো আন্দোলনগুলো স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠিত। এই সবগুলো দলের উদ্দেশ্য হলো জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হওয়া। এ দলগুলো জাতিরাষ্ট্রের ধারণাকে মেনে নিয়ে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে পরিচালিত হয়। বৈদেশিক আগ্রাসনের শিকার না হলে অন্যসব ক্ষেত্রে তারা সংঘাত এড়িয়ে চলে। বৈপ্লবিক আকাঙ্খার পরিবর্তে তারা নিজেদেরকে সংস্কারপন্থী হিসেবে চিন্তা করে। তারা সার্বজনীন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধারণ করে। দলীয়-রাজনৈতিক সক্রিয়তাই এই ধারার চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
  • দাওয়াতী ধারা: ইসলামী দাওয়াতী কাজের প্রধান দুটি ধারা রয়েছে। একটি হচ্ছে তাবলিগী আন্দোলন (তাবলীগ জামায়াত), যা খুবই সংগঠিত। আরেকটি হচ্ছে সালাফী আন্দোলন, যা ব্যাপক বিস্তৃত। এ দুটি ধারার কোনোটিরই রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্য নেই। তাদের কাছে বরং মুসলিম পরিচয় ও ঈমান রক্ষা এবং কুফরী শক্তির বিপরীতে নৈতিক শিক্ষা অর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আলেম ও দ্বীনের দায়ীগণ এই ধারার মুখ্য ব্যক্তি।
  • জিহাদী ধারা: সশস্ত্র ইসলামী সংগ্রাম তথা জিহাদের সাথে তিনটি ধারার সম্পৃক্ততা রয়েছে। এক) অভ্যন্তরীণ ধারা: যারা নিজ দেশে মুসলিম নামধারী অধার্মিক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। দুই) স্বাধীনতাকামী ধারা: যারা দেশকে অমুসলিম শাসকের হাত থেকে উদ্ধার কিংবা দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য জিহাদ করে থাকে। তিন) বৈশ্বিক ধারা: এই ধারার জিহাদীরা পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে। সশস্ত্র মুজাহিদরা এই তিনটি ধারায় সক্রিয়।

সুন্নী ইসলামপন্থার এ সবগুলো ধারাই ঐহিত্য ও আধুনিকতার মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করে। ঐতিহ্যের অপরিহার্য বিষয়গুলোকে আধুনিক যুগের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য তারা নানাভাবে চেষ্টা করে। তারা সবাই ঐতিহ্যকে গ্রহণ করার পাশাপাশি পাশ্চাত্যের কিছু কিছু বিষয়ও অনুসরণ করে। এভাবে তারা আধুনিকতার আলোকে বিষয়গুলোর সমন্বয় করে। তবে মুসলিম বিশ্বের মৌলিক সংকটগুলো কী, তা নিয়ে যেমন তাদের মধ্যে মতভেদ আছে; তেমনি সেগুলো সমাধানের উপায় নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে।

রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা মুসলিম সরকারের অপশাসন ও সামাজিক অবিচারকে মূল সমস্যা মনে করে। এ সমস্যা সমাধানকল্পে  তারা রাজনৈতিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেয়। রাজনৈতিক তৎপরতা তথা নতুন পলিসি দাঁড় করানো, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রভৃতির মাধ্যমে তা অর্জন করা সম্ভব বলে তারা মনে করে।

দাওয়াতী ধারার ইসলামপন্থীদের নিকট ইসলামী মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং ঈমানী দুর্বলতা হচ্ছে মূল সমস্যা। তারা এমন এক ধরনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণের কথা বলে, যার ফলে ব্যক্তির মূল্যবোধের বিকাশ সাধনের মাধ্যমে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি সামষ্টিক নাজাত লাভ করা সম্ভব হবে।

জিহাদী ধারার ইসলামপন্থীরা ইসলামী বিশ্বজুড়ে অমুসলিমদের রাজনৈতিক ও সামরিক আগ্রাসনকে মূল সমস্যা মনে করে। তাই তারা সশস্ত্র প্রতিরোধের উপর গুরুত্বারোপ করে।

এই তিনটি প্রধান ধারার কোনটি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী সময়কাল ধরে প্রভাব বিস্তার করবে সেটা মুসলামানদের জন্য তো বটেই, পশ্চিমা বিশ্বের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামপন্থীরা তাদের মতপার্থক্যগুলোর ব্যাপারে যেন একটা কাছাকাছি অবস্থানে আসতে পারে, সে জন্য পাশ্চাত্য, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যায়সঙ্গত অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। পাশ্চাত্যের পলিসি ইসলামপন্থীদেরকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, সেটা নিয়েও সচেতন হওয়া দরকার। ইসলামপন্থার আধুনিকতাবাদী ও মৌলবাদী – উভয় ধারার ব্যাপারে একইরকম আগ্রাসী মনোভাব পোষণের ফলে আমেরিকান ও ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকরা মূলত দুটি পরিণতির যে কোনো একটিকেই ডেকে আনছেন:  এক) ইসলামিক এক্টিভিজমের ভিন্ন ভিন্ন ধারাকে একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করার প্রতিক্রিয়ায় তাদের নিজেদের মধ্যকার পার্থক্য কমে যাচ্ছে। অথচ এই পার্থক্যকে আরো ফলপ্রসূভাবে কাজে লাগানো যেত। দুই) আধুনিকতাবাদী এবং অহিংস ধারাগুলো জিহাদী ধারার মাঝে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

আইয়ুব আলী
আইয়ুব আলী
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়নরত

আপনার মন্তব্য লিখুন