শেষ পর্ব

৮) কল্যাণকামী রাষ্ট্রে স্বার্থান্বেষী মহলের তৎপরতা
আদর্শ রাষ্ট্রে বিভিন্ন শ্রেণির অবাঞ্ছিত ব্যক্তির আনাগোনা দেখা যায়। আল ফারাবী এসব লোককে কল্যাণকামী রাষ্ট্রের আগাছা বলে উল্লেখ করেছেন। আগাছা যেমন একটা সুন্দর প্রাণবন্ত চারাগাছের স্বাভাবিক বিকাশের অন্তরায় তেমনি রাষ্ট্রে আগাছাধর্মী এসব অবাঞ্ছিত ব্যক্তি কল্যাণকামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক। তাদের মধ্যে –

(ক) এক শ্রেণির লোক আছে যাদের কার্যাবলি রাষ্ট্রের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে সহায়ক। কিন্তু তারা সম্মান, শাসনক্ষমতা ও ধনসম্পদ অর্জনের জন্য এসব কাজ করে থাকে। এরা হচ্ছে সুবিধাবাদী দল।

(খ) কেউ কেউ আদর্শচ্যুত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি অনুরাগী। যখন তাদেরকে রাষ্ট্রীয় আইন বা ধর্মীয় বিধিবিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়ে থাকে, তখন তারা স্বপক্ষ সমর্থনের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ঐসব বিধিবিধানের ভুল ব্যাখ্যা করে। এই শ্রেণির লোক অপব্যাখ্যাকারী হিসেবে পরিচিত।

(গ) এমন কিছু সংখ্যক লোক আছে যারা সুখ অর্জন ও তার মূলনীতি সম্পর্কে শুধু কল্পনা করতে পারে, কিন্তু তা যথাযথভাবে অনুধাবনে অক্ষম। অতএব, তারা সত্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে না। তাদের ভ্রান্ত অনুমানের ফলশ্রুতিতে সত্যদর্শীকেও তারা অসত্যবাদী প্রতারক বলে আখ্যায়িত করে। এমনকি তারা এমন ধারণাও পোষণ করে যে, যেসব ব্যক্তি সত্যের অনুসন্ধান করে তারা ভ্রান্ত।

(১) তাদের কেউ কেউ বলে যে, প্রতিটি বস্তুর মধ্যে জটিলতা রয়েছে।

(২) তাদের কেউ কেউ চিন্তা করে যে, সত্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয় এবং যারা সত্যের অনুসন্ধান করছে বলে দাবি করে তারা প্রকৃতপক্ষে মিথ্যা কথা বলে। কেননা সত্য সম্পর্কে তারা যা ভাবে, তা সম্পর্কে নির্দিষ্ট কিছু বলতে পারে না।

(৩) তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই চিন্তা করে যে, প্রতিটি ব্যক্তির সম্মুখে যা প্রতিভাত হয় তাই সত্য, সে যা চিন্তা করে তাই সঠিক।

(৪) কেউ কেউ এই চিন্তা করে যে, আসলে সত্যের বাস্তব আস্তিত্ব রয়েছে, কিন্তু তা এ পর্যন্ত অনুকরণ করা সম্ভব হয়নি।

(৫) কেউ কেউ এই ধারণা পোষণ করে যে, সত্যের বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে এবং সত্যানুসন্ধানী ব্যক্তিরা সত্য অনুধাবনে সক্ষম। কিন্তু তারা (আগাছাধর্মী ব্যক্তিবর্গ) এই সত্য অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে। কেননা, তারা মনে করে সত্য অনুধাবনের জন্য যে কষ্ট, পরিশ্রম ও সাধনার প্রয়োজন, সেসব প্রয়োজনীয় গুণাবলি তাদের নেই, অথবা তারা আনন্দ-উল্লাসে বিভোর বিধায় শক্তি থাকা সত্ত্বেও এই সুদূর পথপরিক্রমা ও কঠোর সাধনার প্রতি তাদের আগ্রহ নেই। পরিণামে তারা সত্যাদর্শী লোকদের ভণ্ড, মিথ্যাবাদী, পদলোভী ও স্বার্থান্বেষী বলে আখ্যায়িত করে। তাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা নিজেদের ভুল বুঝতে পারে এবং অনুতাপ করে, কিন্তু এমন কোনো বিজ্ঞানসম্মত পথের সন্ধান পায় না, যা তাদের সত্যপথ প্রাপ্তির সহায়ক হয়। তারা তখন হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় স্থুল আনন্দ লাভের নেশায় ছুটে বেড়ায় এবং রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের বিশৃংখলার সৃষ্টি করে। এসব হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি আনন্দ-উল্লাসে বিভোর হয়ে জীবনের দুঃখ-কষ্ট ভুলে থাকতে চায়। তারা সমাজের কোনো কাজে অংশ গ্রহণ করতে পারে না।[19]

এই হলো আগাছাধর্মী ব্যক্তিবর্গের বিভিন্ন শ্রেণির বর্ণনা। তাদের গুণাবলি দিয়ে কোনো আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কিংবা বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সৃষ্টি হতে পারে না।

কল্যাণকামী রাষ্ট্রের আদর্শ শাসকের উচিত এসব অবাঞ্ছিত ব্যক্তির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা। তাদেরকে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রাখার জন্য এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যা তাদের পরিশুদ্ধিকরণে সহয়ক হয়। যেমন, (ক) রাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা, (খ) শাস্তি প্রদান, (গ) কারাগারে আটক রাখা, (ঘ) সৎকাজ সম্পাদনে বাধ্য করা ইত্যাদি।

উপসংহার
ফারাবীর রাষ্ট্রদর্শন রচনার পদ্ধতি অনন্য। ভাষা বলিষ্ঠ ও তাৎপর্যপূর্ণ। জোরালো যুক্তি রয়েছে, পুনরাবৃত্তি নেই। ক্ষেত্র বিশেষে গ্রিক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হলেও ইসলামের মৌলিক ভাবধারাপুষ্ট। ফারাবীর রাষ্ট্রদর্শনে প্লেটোর প্রভাবের চেয়ে ইসলামের প্রভাবই বেশি। এ প্রসঙ্গে রিচার্ড ওয়ালযার যথার্থই বলেছেন:

“It is obvious that Al-Farabi did not intend to proclaim a Utopian philosopher king by taking up Plato’s programme of a perfect state under philosophical rule. He did not mean to compose a philosophical novel, but he rather had in mind the contemporary caliphate, the specific type of supreme rule which Islam had in mind the contemporary caliphate, the specific type of supreme rule which Islam had brought into existence and gradually developed.”[20]

ফারাবী রাষ্ট্রপ্রধানকে ইমাম হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং ইমাম ও রাসূলকে একই সূত্রে গেঁথে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাসূলের কথাও বলেছেন। তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য কতগুলো গুণাবলি নির্ধারণ করেছেন এবং সেই গুণাবলির অভাব দেখা দিলে সদগুণসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ সমষ্টিগতভাবে যাতে দেশ শাসন করতে পারেন, তার বিধান রেখেছেন। প্রজ্ঞা, প্রত্যাদেশ ও অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে কল্যাণকামী রাষ্ট্র গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর অভিমত বাস্তবসম্মত। এই পৃথিবীতে এর দৃষ্টান্ত আছে। হযরত মুহাম্মদ (সা) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে এমন রাষ্ট্র ছিল। চেষ্টা করলে এখনও এ জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

ই আই জি রোজানথাল বলেন, ফারাবী মানুষের কল্যাণের জন্য যে কথা বলেছেন তা একমাত্র ইসলামী অনুশাসন অর্থাৎ শরীয়াহর মাধ্যমে সম্ভব। রোজেনথালের ভাষায়, “This happiness is guaranteed by Shariah alone”।[21] নৈতিকতা ও অধিবিদ্যার ভিত্তির উপর ফারাবীর রাষ্ট্রদর্শন রচিত ও প্রতিষ্ঠিত। তিনি মদিনাতুল ফাজীলাহ এবং সিয়াসাতুল মাদানীয়াহ গ্রন্থ দুটোর শুরুতেই রাষ্ট্রের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ভিত্তি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। যেমন– খোদার অস্তিত্ব, খোদার গুণাবলি, ঐশীবাণীর প্রকৃতি, কার্যকারণ সম্পর্ক, বিশ্বসৃষ্টি প্রক্রিয়া, পৃথিবীতে মানুষের মান ও অবস্থান, কল্যাণকামী সমাজ প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। মানবিক গুণাবলির পূর্ণ বিকাশ ও মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠা এবং সার্বিক শান্তি অর্জন একমাত্র রাষ্ট্রের মাধ্যমেই সম্ভব। অসীমের সাথে সসীমের সংযোগ সাধন করে, ইহকাল ও পরকালের শান্তি অর্জনের জন্য কল্যাণকামী রাষ্ট্র গঠন ও বাস্তবায়নের প্রতি তিনি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। রাষ্ট্র গঠনে মাতৃভাষার ভূমিকা, প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রভাব প্রভৃতির কথা তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।

মানুষের প্রকৃতি, মানবজীবনের উদ্দেশ্য, উদ্দেশ্য সাধনের উপায়, সমাজ ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি, বিকাশ, মানবজাতির সার্বিক কল্যাণ, কল্যাণকামী রাষ্ট্রের স্বরূপ, আদর্শচ্যুত রাষ্ট্রের শ্রেণিবিন্যাস, নেতা ও নাগরিকের দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যপরায়ণতা সম্পর্কে তিনি যে রূপরেখা প্রণয়ন করেছেন তা বস্তুনিষ্ঠ ও বাস্তবসম্মত। শুধু যশখ্যাতি, ধনসম্পদ ও স্থুল আনন্দলাভ যাদের উদ্দেশ্য, তারা মানুষের কল্যাণ সাধন করতে পারে না। তিনি কল্যাণকামী রাষ্ট্র গঠনের অন্তরায় পরগাছাধর্মী কায়েমী স্বার্থবাদী মহলের চেষ্টাকে নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য জোরালো বক্তব্য পেশ করেন। তাঁর মতে, কল্যাণকামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কল্যাণকামী নেতা ও জাগ্রত জনতা উভয়েরই প্রয়োজন। প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে তাঁর প্রভাব ছিল অসামান্য। ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ, ইবনে খালদুন, মাইমুনিডীস, থমাস একুইনাস, হবস, জামাল উদ্দিন আফগানী, শেখ মুহাম্মদ আবদুহ ও ইকবাল তাঁর রাষ্ট্রদর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। উর্দু, ফার্সী, তুর্কি, ল্যাটিন, ইংরেজি, জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ, এমনকি রুশ ভাষায় ফারাবীর রাষ্ট্রদর্শনের উপর বহু প্রবন্ধ রচিত হয়েছে এবং তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ অনূদিত হয়েছে। উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এ কথা অনুমান করা যেতে পারে যে, রাষ্ট্রদর্শনে আল ফারাবীর অবদান বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও প্রশংসিত।

প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব এবং চতুর্থ পর্ব


তথ্য নির্দেশিকা

[1] Al-Farabi, Kitab al-Siyasah al-Madaniyyah, Op.Cit., p.39.

[2] Al-Farabi, Kitab are’ahl al-Madinah al-Fadilah, 3rd ed. Bir Nasir Nadir, (Beirut, 1973) p. 61.

[3] M.MSharif, ed., A History of Muslim Philosophy, Op.Cit., p. 704.

[4] Al-Farabi, Siyasah al-Madaniyyah, Op.Cit., p. 79.

[5] Al-Farabi, Madinah al-Fadilah, Op.Cit., pp. 64-65.

[6] Leo. Strauss and Joseph Cropsay, ed., Op.Cit., pp. 160-180.

[7] Al-Farabi, Madinah al-Fadilah, Op.Cit., pp. 70

[8] Al-Farabi, Fusul al-Madini, ed.,D.M. Dunlop, (Cambridge, 1961) Section p. 53.

[9] Al-Farabi, Fusul al-Madini, Op.Cit., Section 53-54, E.I.J. Rosenthal, “The Place of Politics in the Philosophy of al-Farabi”, Islamic Culture, 29, (1955) p. 167, Saiyid Ali Sajjad “Al-Farabi’s Classification of State with Particular reference of his Imam State”, Islamic Culture, Vol. 58, (1983) pp. 253-362.

[10] Al-Farabi, Siyasah al-Madainyyah, Op.Cit., p.88.

[11] Loc. Cit.

[12] Ibid, pp. 88-89.

[13] Ibid, p. 89.

[14] Ibid, pp. 90-94.

[15] Ibid, p. 94.

[16] Ibid, pp. 99-101.

[17] Ibid, p. 102.

[18] Ibid, p. 104.

[19] Ibid, pp. 104-106.

[20] Al-Farabi’s Al-Farabi on the Perfect State (Kitab’ara Ahl al-Madinah al-Fadilah), translated into English by Richard Walzer, (Oxford University Press, 1985) pp. 16-17.

[21] E.I.J. Rosenthal, “The Place of Politics in the Philosophy of Al-Farabi” Op.Cit., p. 160.

1
2
3
4
5
মুহাম্মদ শাহজাহান
লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। মুসলিম দর্শন, বিশেষ করে আল-ফারাবীর উপর আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন