তৃতীয় পর্ব

যেসব রাষ্ট্র কল্যাণধর্মী নয়, সেই সব রাষ্ট্রকে আল ফারাবী তিনভাগে ভাগ করেছেন। যথা–

  • অকল্যাণকামী রাষ্ট্র,
  • অনৈতিক রাষ্ট্র
  • ভ্রান্ত রাষ্ট্র

৫) অকল্যাণকামী রাষ্ট্র (আল মদীনা আল জাহেলিয়াহ)
কল্যাণকামী রাষ্ট্রের শাসক হচ্ছেন বিচক্ষণ ও বিজ্ঞ ব্যক্তি, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে রাষ্ট্রের উন্নতি ও সার্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা, যদি রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র জনগণের কল্যাণ সাধনে ব্যর্থ হয় এবং শাসকদের রাষ্ট্র শাসনের প্রয়োজনীয় গুণাবলি না থাকে তবে সেই রাষ্ট্রকে অকল্যাণকামী রাষ্ট্র বলা যেতে পারে। তিনি অকল্যাণকামী রাষ্ট্রকে ছয় শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। যথা–

  • প্রয়োজনাত্মক রাষ্ট্র
  • ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র
  • ভোগবিলাসী রাষ্ট্র
  • গৌরব-প্রত্যাশী রাষ্ট্র
  • আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র
  • গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

পরিশেষে, কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মধ্যে পরগাছাধর্মী স্বার্থান্বেষী মহলের অশুভ তৎপরতা সম্পর্কে ফারাবী আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে সিয়াসাতুল মাদানীয়াহর অনুসরণে আমরা প্রথমে অকল্যাণকামী রাষ্ট্রের ছয়টি বিভাগ আলোচনার পরে অনৈতিক ও ভ্রান্ত রাষ্ট্র সম্পর্কে বর্ণনা দেব এবং সর্বশেষে কল্যাণকামী রাষ্ট্রে স্বার্থান্বেষী মহলের অশুভ তৎপরতা সম্পর্কে আলোচনা করব।[10]

৫.১) প্রয়োজনাত্মক রাষ্ট্র (আল মদীনা আল জরুরীয়াহ)
যে রাষ্ট্রের নাগরিক শুধুমাত্র দেহের অস্তিত্ব সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় সামগ্রী অর্জনে পরস্পরকে সাহায্য-সহযোগিতা করে, তাকে প্রয়োজনাত্মক রাষ্ট্র বলে। প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহের পথ অনেক। যেমন, কুটির শিল্প স্থাপন, শিকার, দস্যুবৃত্তি ইত্যাদি। প্রকাশ্য বা গোপনে উভয় প্রকারেই শিকার, দস্যুবৃত্তি চরিতার্থ করা যেতে পারে। কিছু প্রয়োজনাত্মক রাষ্ট্র আছে যেখানে প্রয়োজনীয় সামগ্রী উৎপাদনের ব্যবস্থা আছে। নাগরিকদের জন্যে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহে পারদর্শী ব্যক্তি শাসক হিসেবে বিবেচিত হন।[11]

৫.২) ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র (আল মদীনা আল নাযালাহ)
যে রাষ্ট্রের নাগরিক শুধুমাত্র অঢেল টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদ অর্জন, সংরক্ষণ ও সঞ্চয়ের জন্যে রাষ্ট্র গঠন করে সেই রাষ্ট্রকে ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে। কেবল দৈহিক চাহিদা অনুযায়ী তাঁরা খরচ করেন। সমাজের কল্যাণমূলক কাজে তাঁরা কিছুই ব্যয় করতে নারাজ। ধন-সম্পদ অর্জনে যে ব্যক্তি পারদর্শী সেই ব্যক্তি উত্তম বলে বিবেচিত। অর্থাৎ যে ব্যক্তি নাগরিকদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে ধন-সম্পদ অর্জনে পারদর্শী সেই উত্তম ব্যক্তি বলে বিবেচিত। যে নাগরিকদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে ধন-সম্পদ অর্জন ও সঞ্চয়ের ব্যবস্থা করতে পারবেন তিনিই হবেন ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসক।[12]

৫.৩) ভোগবিলাসী রাষ্ট্র (আল মদীনা আল খাসসাহ)
যে রাষ্ট্রের নাগরিক দৈহিক ও কাল্পনিক সুখ লাভ ও আনন্দ উপভোগের উদ্দেশ্যে একে অপরকে সাহায্য করে, তাকে ভোগবিলাসী রাষ্ট্র বলে। তাঁরা খাদ্য, পানীয়, কামনা ও বাসনার তৃপ্তি সাধনের মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ করে থাকে। তাঁরা খেলাধুলা, আমোদ-প্রমোদে দিন কাটায়। তাঁরা মনে করেন, যে ব্যক্তির ভোগ-বিলাস ও আমোদ-প্রমোদের যত বেশি উপকরণ রয়েছে সে তত ভাগ্যবান।[13]

৫.৪) গৌরব-প্রত্যাশী রাষ্ট্র (আল মদীনা আল কারামিয়া)
যে রাষ্ট্রের নাগরিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কথা ও কাজে সম্মান অর্জন ও সম্মান প্রদানের জন্য একে অপরকে সাহায্য করে থাকে, তাকে গৌরব-প্রত্যাশী রাষ্ট্র বলে।[14]

৫.৫) আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র (আল মদীনা আল তাগাল্লাব)
যে রাষ্ট্রের জনগণ দেশে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা কায়েম করার জন্য একে অপরকে সাহায্য করে, তাকে আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র বলে। আধিপত্যবাদীরা বিভ্ন্নি উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তাঁদের শাসনযন্ত্র পরিচালিত করে। কারও ইচ্ছা খেয়াল-খুশি মতো রক্তপাত, কারও ইচ্ছা ভূমি জবর-দখল, আবার কারও ইচ্ছা মানুষকে দাসানুদাসে পরিণত করা। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বল ও কৌশল উভয়পন্থা একসাথে প্রয়োগ করে স্বৈরশাসন পরিচালনা করে। স্বৈরাচারীরা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং বাইরের শত্রু আক্রমণের সময় সমবেতভাবে একে অপরকে রক্ষা করে। জনগণের উপর প্রভুত্ব বিস্তারের জন্য যে ব্যক্তি তাঁর অধীনস্ত স্বৈরাচারী শাসকদেরকে দক্ষতার সাথে পরিচালনা করতে সক্ষম, তিনিই হলেন যোগ্য শাসক। তিনি চিরদিন শাসক হয়ে বেঁচে থাকতে চান। কোনোদিন শাসিত হয়ে জীবনযাপন করতে রাজি নন। প্রভুত্ব বিস্তারের প্রকৃতি, সামরিক সজ্জার বহর ও যুদ্ধাস্ত্রের প্রাচুর্যকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে বাদানুবাদ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিবাদের সৃষ্টি হয়। এসব শাসকেরা নিষ্ঠুর, অতিরাগী, অপব্যয়ী, অতিলোভী, ভোজনবিলাসী, নেশাগ্রস্ত, কামাসক্ত হয়ে পড়ে। অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদের মালিকানা নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত হয় এবং সবসময় আধিপত্য বিস্তারের ফিকির-ফন্দিতে ব্যস্ত থাকে।

(১) কোনো কোনো সময় সারা দেশের জনগণ বৃহত্তর সমাজ গঠনের উদ্দেশ্যে অন্য দেশের উপর অধিপত্য বিস্তারের জন্য তৎপর হয়।

(২) কখনও কখনও বিজয়ী ও বিজিত উভয় দল একসাথে সমমর্যাদা নিয়ে বসবাস করে। আবার কখনও কখনও বিজয়ীরা গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করে বিজিতদেরকে শোষণ করে।

(৩) কোনো কোনো সময় মাত্র একজন আধিপত্যবাদী শাসক থাকেন। আর প্রশাসন পরিচালনার জন্যে তাঁর সাথে থাকে কিছু সহচর। তিনি এসব সহচরের মাধ্যমে দেশ শাসন করেন। দেশ থেকে প্রাপ্ত সম্পদ দিয়ে তিনি বিলাসী জীবনযাপন করেন এবং সহচরদের ধনসম্পদ অর্জনের সুযোগ দেন। আর দেশের জনসাধারণ শাসকের ইচ্ছানুযায়ী বসবাস করেন। তাঁরা বিনয়ী কিন্তু অবহেলিত। তাঁদের নিজের বলতে কিছুই নেই। তাঁদের কেউ চাষী, কেউ বা ব্যবসায়ী। তাঁরা শাসকহীন মনোবৃত্তির বশীভূত হয়ে জনগণকে শোষণ করে আনন্দ লাভ করেন। আর নাগরিকদের তাঁরা অবদমিত, বিনীত ও নম্র অবস্থানে দেখতে চান; স্বাধীনচেতা ও মহৎ মনের মানুষ সৃষ্টি করা তাঁর কাজ নয়। নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যে শাসকেরা সাধারণ মানুষের সার্বিক উন্নতি কামনা করে না।[15]

প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, চতুর্থ পর্ব এবং শেষ পর্ব

1
2
3
4
5
মুহাম্মদ শাহজাহান
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। মুসলিম দর্শন, বিশেষ করে আল-ফারাবীর উপর আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন