দ্বিতীয় পর্ব

৪) কল্যাণকামী রাষ্ট্র
যে কল্যাণকামী রাষ্ট্রে জনগণ একত্রিত হয়ে পরস্পরকে সৎকাজ সম্পাদন, সদগুণাবলি ও সুখ অর্জনে সহায়তা করে তাকে সদগুণসম্পন্ন আদর্শ রাষ্ট্র বলে। এ রাষ্ট্রে মানুষের চূড়ান্ত সাফল্য সম্পর্কে জ্ঞান এবং ভালো-মন্দ, সদগুণ, অসদগুণের মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এখানে শাসক ও নাগরিক সকলেই এসব বিষয় সম্পর্কে নিজেরা জ্ঞান অর্জন করে এবং অপরকে জ্ঞান দান করে, আর সেসব চারিত্রিক সদগুণ অর্জনে তৎপর হয়, যা সুখ অর্জনে সহায়ক এবং সৎকাজের উন্মেষ ঘটায়।[6]

কল্যাণকামী রাষ্ট্রের শাসকদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত জোরালো। তাদের ধ্যান-ধারণা ও কার্যাবলি একই সূত্রে গাঁথা। একই সময়ে অনেক শাসক বিভিন্ন রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন, কিন্তু তাঁদের মৌলিক নীতিমালা বাস্তবায়নের ব্যাপারে তাঁরা একতাবদ্ধ। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁরা সুসংগঠিত।[7]

কল্যাণকামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে রয়েছেন দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী, কবি, সাহিত্যিক, ভাষ্যকার, প্রবন্ধকার, শিল্পী, হিসাববিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ, পরিসংখ্যানবিদ, জ্যোতিষী, ডাক্তার, ব্যবসায়ী ও কৃষকশ্রেণি ইত্যাদি।[8]

আদর্শ শাসকের গুণাবলির ভিত্তিতে কল্যাণকামী রাষ্ট্রকে চারভাগে বিভক্ত করা হয়েছে।[9]

৪.১) প্রথম কল্যাণকামী রাষ্ট্র: যে রাষ্ট্রের শাসকদের মধ্যে আদর্শ শাসকের জন্য নির্ধারিত সব গুণ বিদ্যমান তাকে প্রথম পর্যায়ের কল্যাণকামী রাষ্ট্র বলে।

৪.২) দ্বিতীয় কল্যাণকামী রাষ্ট্র: আদর্শ শাসকের গুণাবলি যদি একত্রে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে পাওয়া যায় এবং তাঁরা দেশ শাসন করেন তবে শাসকবৃন্দকে দ্বিতীয় পর্যায়ের আদর্শ শাসক এবং তাঁদের দ্বারা শাসিত রাষ্ট্রকে দ্বিতীয় পর্যায়ের কল্যাণকামী রাষ্ট্র বলে।

৪.৩) তৃতীয় কল্যাণকামী রাষ্ট্র: আদর্শ শাসকের জন্য নির্ধারিত গুণাবলি যদি দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে না পাওয়া যায়, কিন্তু এমন ব্যক্তি যদি পাওয়া যায় যার মধ্যে আদর্শ শাসকের গুণ না থাকলেও তাঁর প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা থাকে, এরূপ ব্যক্তি তৃতীয় পর্যায়ের শাসক; আর এ জাতীয় রাষ্ট্র তৃতীয় কল্যাণকামী রাষ্ট্র। এক্ষেত্রে শাসকের মধ্যে যে ছয়টি গুণ থাকা প্রয়োজন তা নিম্নে বর্ণিত হলো:

(ক) বিজ্ঞ দার্শনিকের মতো গুণাবলি অর্জন।

(খ) শরীয়তের নিয়ম-কানুনের উপর বিশেষজ্ঞ হওয়া এবং শিক্ষাদীক্ষার মাধ্যমে তাঁর পূর্ববর্তী আদর্শ শাসকের মতো সুচারুরূপে সমস্যাবলি সমাধানের ক্ষমতা অর্জন করা।

(গ) নতুন পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত যেসব সমস্যা সমাধানের জন্যে শরীয়তের সরাসরি কোনো নিয়ম বর্ণিত হয়নি, সেসব সমস্যা সমাধানকল্পে নিয়ম-কানুন বিশ্লেষণের ক্ষমতা অর্জন।

(ঘ) দূরদর্শিতা এবং সমাজ সংস্কারের জন্যে গৃহীত নির্দেশাবলিকে বাস্তবে রূপদানের শক্তি।

(ঙ) সুন্দর ভাষায় শরীয়তের বিধি-বিধান জনসাধারণের কাছে হৃদয়গ্রাহী করে উপস্থাপনের ক্ষমতা ও বলিষ্ঠভাবে বক্তব্য প্রদানের ক্ষমতা অর্জন।

(চ) সমরাস্ত্র ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত ও জিহাদ পরিচালনায় পারদর্শিতা অর্জন।

৪.৪) চতুর্থ কল্যাণকামী রাষ্ট্র: আদর্শ একজন প্রতিনিধির মধ্যে নেতা হবার গুণাগুণ পাওয়া না গেলে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে যদি ঐ গুণগুলো পাওয়া যায় এবং তাঁরা যদি প্রথম আদর্শ শাসকের গুণাবলির ভিত্তিতে একত্রে মিলেমিশে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তাহলে শাসকবৃন্দকে চতুর্থ পর্যায়ের আদর্শ শাসক বলা হবে এবং রাষ্ট্রকে চতুর্থ পর্যায়ের কল্যাণকামী রাষ্ট্র বলা হবে।

প্রথম পর্ব, তৃতীয় পর্ব, চতুর্থ পর্ব এবং শেষ পর্ব

1
2
3
4
5
মুহাম্মদ শাহজাহান
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। মুসলিম দর্শন, বিশেষ করে আল-ফারাবীর উপর আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন