রাষ্ট্রদর্শনে আল ফারাবীর অবদান

এডিটরস নোট:

আল ফারাবী একজন খ্যাতনামা দার্শনিক। তাঁর পুরো নাম আবু নসর মুহাম্মদ বিন তুরখান বিল আওযালগ আল ফারাবী। আব্বাসীয় শাসনামলে ৮৭০ সালে তুর্কিস্থানের ফারাব শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ৯৫০ সালে দামেস্কে তিনি ইন্তেকাল করেন।

আল ফারাবীর রাষ্ট্রদর্শন নিয়ে লেখা এই নিবন্ধটি ‘আল-ফারাবীর দার্শনিক চিন্তাধারা’ বই থেকে সংকলিত। দর্শনের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহজাহান বইটি লিখেছেন। লেখক ১৯৭৭-৮২ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম দর্শন তথা আল ফারাবী ও আল গাজ্জালীর দর্শনের উপর ব্যাপক অধ্যয়ন ও গবেষণার কাজ করেন। ১৯৮৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আল ফারাবীর নীতিবিদ্যার উপর থিসিস রচনা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

পাঠকদের সুবিধার্থে নাতিদীর্ঘ এই নিবন্ধটি পাঁচটি পর্বে প্রকাশ করা হলো।


প্রথম পর্ব

১) সমাজের প্রয়োজনীয়তা
মানুষ এমনভাবে সৃষ্ট যে তার উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে অনেক কিছুর দরকার হয়। কিন্তু সে একা সেই প্রয়োজন মেটাতে পারে না। তাই প্রয়োজনের খাতিরে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে সমাজ। বিভিন্ন প্রকার উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে বিভিন্ন ধরনের সমাজ গঠিত হয়। সমাজ যত বড় হয়, মানুষ তত বেশি সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারে। মানুষের সমাজ ঘরবাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ধীরে ধীরে ক্রমবিকাশের ধারায় গড়ে ওঠে বস্তি, গ্রাম, শহর ও নগর। মানুষ সমাজের উন্নয়নকল্পে কাজ করে, যা পরবর্তীকালে রাষ্ট্রে পরিণত হয়। রাষ্ট্রে বসবাসকারী জনসমষ্টিকে জাতি (উম্মাহ) বলে আখ্যায়িত করা হয়। ভৌগোলিক পরিবেশ, আবহাওয়া ও জলবায়ু, আচার-আচরণ এবং ভাষার ভিত্তিতে এক জাতিকে অন্য জাতি থেকে পৃথক করা যায়।[1]

মানুষের সমাজ প্রধানত দুই প্রকার: (ক) অপূর্ণ সমাজ ও (খ) পূর্ণ সমাজ। একটি পূর্ণ সমাজ রাষ্ট্রের রূপ পরিগ্রহ করে। পূর্ণ সমাজ বা রাষ্ট্র আবার তিন ধরনের হতে পারে। যথা: বড়, মধ্যম ও ছোট। যখন সারা বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে মানব কল্যাণের জন্যে সুসংঘবদ্ধভাবে কাজ করে তখন গড়ে ওঠে বৃহত্তম বিশ্ব রাষ্ট্র। মাঝরি ধরনের সংগঠন বা রাষ্ট্র হচ্ছে সাম্রাজ্য ও খিলাফত, যা পৃথিবীর কোনো বৃহত্তর অংশে স্থাপিত হয়। আর নগরের জনসমষ্টি নিয়ে গঠিত হচ্ছে সবচেয়ে ছোট রাষ্ট্র। গ্রাম, বস্তি বা কোনো রাজপথভিত্তিক সংগঠনকে বলা যেতে পারে অপূর্ণ সমাজ।

মানুষের জীবনে কল্যাণ অথবা অকল্যাণ মূলত তাদের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্যের উপর নির্ভরশীল। যে সমাজের জনগণ প্রকৃত সুখ অর্জনের উদ্দেশ্যে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে কাজে অগ্রসর হয় তাকে বলা হয় আদর্শ সমাজ। এই মনোভাবাপন্ন রাষ্ট্রকে বলা হয় আদর্শ রাষ্ট্র আর জাতিকে আদর্শ জাতি বলে আখ্যায়িত করা হয়।[2] এরূপ রাষ্ট্রে নাগরিকরা সদগুণসম্পন্ন হবার জন্যে পরস্পরকে সহযোগিতা করে এবং পরিণামে তাদের জীবন সুন্দর ও কল্যাণময় হয়ে ওঠে।[3]

২) রাষ্ট্রপ্রধান
একথা সত্য যে সবাই নেতা হতে পারে না। শারীরিক ক্ষমতা, মানসিক শক্তি, সৎচিন্তা, সদিচ্ছা ও সৎকাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে সবাই সমান নয়। প্রতিটি পেশায়, প্রতিটি বিভাগে নেতৃত্বের প্রয়োজন। সুস্থ শরীর, মুক্ত মন, সুন্দর আচরণ, মোহনীয় ব্যক্তিত্ব, সুদূর প্রসারী কল্পনাশক্তি, সাহসিকতা, মনোযোগ, সৃজনী প্রতিভা, সঠিক নির্দেশদানের ক্ষমতা প্রভৃতি গুণাবলি যে ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান তিনিই নেতা হিসেবে পরিচিত। নেতারা প্রথম সারির লোক। তাঁদের গুণাবলি ও কার্যক্ষমতা দ্বারা জনসাধারণকে তাঁরা পরিচালিত করেন সত্যের দিকে, সুন্দরের পথে। বিভিন্ন পেশার ভিত্তিতেও নেতৃত্ব গড়ে ওঠে। যেমন কৃষি, ব্যবসা, শিক্ষকতা ইত্যাদি। রাষ্ট্রপ্রধান হবেন সেই ব্যক্তি যিনি রাষ্ট্রের কার্য পরিচালনায় পারদর্শী। তাঁর জন্যে বিজ্ঞান এবং কলা বিষয়ক জ্ঞানের অধিকারী কোনো ব্যক্তিবিশেষের কাছ থেকে কোনো রকম দিকনির্দেশনার প্রয়োজন নেই।[4] এসব গুণাবলির উল্লেখ দ্বারা আল ফারাবী সম্ভবত প্রধান নেতা হযরত মুহাম্মদ (সা) এর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। কল্যাণকামী রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপ্রধান হবেন সেই ব্যক্তি যিনি নেতৃত্বের সবদিকেই পারদর্শী। আদর্শ রাষ্ট্রের মাধ্যমে সম্পূর্ণতা ও চরম শান্তি অর্জনের জন্যে তাঁর কাজ হবে সবার সেবা করা। তিনি কারও অনুগত হবেন না। তিনি হবেন সর্বগুণে গুণান্বিত। তিনি তাঁর ধ্যানে, কর্মে, জাগ্রত অবস্থায়, এমনকি নিদ্রিত অবস্থায় সক্রিয় বুদ্ধি থেকে সহযোগিতা পেয়ে থাকেন। তিনি তাঁর আত্মাকে ভালো ভাবে জানেন। তিনি অর্জিত বুদ্ধির অধিকারী। অর্জিত বুদ্ধির অবস্থান হচ্ছে নিষ্ক্রিয় ও সক্রিয় বুদ্ধির মাঝখানে। তিনি সাধনা বলে জাগতিক স্তর থেকে নিজেকে মুক্ত করে আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নীত হন এবং সক্রিয় বুদ্ধি থেকে অনুকম্পা লাভ করেন। জড় থেকে মুক্তি এবং সক্রিয় বুদ্ধির অনুকম্পা এই দুইয়ের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় অর্জিত বুদ্ধি। তিনি সেই অর্জিত বুদ্ধির অধিকারী মহামানব।[5] আল্লাহ তায়ালা সক্রিয় বুদ্ধির (হযরত জিবরাঈল (আ) কে আল ফারাবী সক্রিয় বুদ্ধি বলে উল্লেখ করেছেন) মাধ্যমে তাঁর কাছে বাণী পাঠান, মানবতার চরম শীর্ষে তাঁর স্থান, তিনি খোদার আশীর্বাদপুষ্ট। তিনি ভালোভাবে জানেন কোন পথে চললে সুখ অর্জন সম্ভব; তাঁর আত্মা হবে সমুন্নত।

৩) আদর্শ রাষ্ট্রের প্রধান শাসকের গুণাবলি

(১) সুন্দর স্বাস্থ্য, প্রফুল্ল মনের অধিকারী হওয়া এবং নিখুঁত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুষ্ঠু ব্যবহার ও অন্যান্য প্রবৃত্তির সাথে এর স্বাভাবিক সমন্বয় সাধনে সক্ষম হওয়া।

(২) এমন তীক্ষ্ণ বুদ্ধি বরং প্রজ্ঞার অধিকারী হওয়া যাতে স্থান-কালের প্রেক্ষিতে তিনি কোনো বক্তার উদ্দেশ্য বুঝতে সক্ষম হন।

(৩) এমন স্মরণশক্তির অধিকারী হওয়া যাতে করে তিনি যা দেখেন, শুনেন, বোঝেন ও প্রত্যক্ষ করেন তা স্মরণ রাখতে সক্ষম হন।

(৪) এমন বিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হওয়া যাতে করে তিনি উদ্ভূত সমস্যার দৃষ্টিকোণ ও প্রেক্ষিত বুঝতে পারেন।

(৫) এমন বাগ্মিতা ও বাকপটুতার অধিকারী হওয়া যার মাধ্যমে তিনি তাঁর মনোভাব সঠিকভাবে ব্যক্ত করতে পারেন।

(৬) শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি অনুরাগ এবং সহজ, সরল, স্বাভাবিকভাবে ও ধৈর্য সহকারে জ্ঞান লাভের অভ্যাস।

(৭) কাজকর্মে ভারসাম্যবোধ, পানাহার ও যৌন ইচ্ছার উপর নিয়ন্ত্রণ, অত্যধিক আনন্দের প্রতি অনীহা।

(৮) সত্য গ্রহণ এবং সত্যাশ্রয়ী লোকের সাথে বন্ধুত্ব এবং মিথ্যা বর্জন ও মিথ্যাশ্রয়ী লোকের নিন্দা জ্ঞাপন করার ক্ষমতা অর্জন।

(৯) মহৎ মন, প্রশস্ত অন্তরসম্পন্ন হয়ে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে থেকে মহানুভবতা ও উদারতার অধিকারী হওয়া।

(১০) ধনসম্পদ, দিনার-দিরহাম অর্জনের প্রতি অমনোযোগী হওয়া।

(১১) প্রকৃতিগতভাবে ন্যায় এবং ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির প্রতি অনুরক্ত হওয়া এবং অন্যায় অত্যাচার ও অত্যাচারীর কাছ থেকে দূরে অবস্থান করা।

(১২) নিঃসংকোচ, নির্ভয় ও বিনা দ্বিধায় যা ভালো তা কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করার ক্ষমতা; দৃঢ় সিদ্ধান্ত, অটুট মনোবল এবং সাহসিকতা অর্জন ও প্রয়োজনবোধে জিহাদ পরিচালনার ক্ষমতা।

দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব, চতুর্থ পর্ব এবং শেষ পর্ব

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন