On being থেকে ক্রিস্টা টিপেট বলছি। ধর্ম, নৈতিকতা ও এ সম্পর্কিত চিন্তা-ভাবনাগুলো নিয়ে বলছিলেন মোস্তফা আকিউল। এ আলোচনায় ধর্ম ও গণতন্ত্র নিয়ে উদীয়মান তুরস্কের পদক্ষেপগুলো কী, তা তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

ক্রিস্টা টিপেট: ইসলামিক ক্যালভিনিস্ট (সংস্কারবাদী) এর ধারণাটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছ। প্রাথমিক পর্যায়ের আমেরিকান গণতন্ত্রের সাথে এর একটা মিল পাওয়া যাচ্ছে। সে সময় রোটারি ক্লাব, দ্যা চেম্বার অব কমার্স, দ্যা ইয়াং ম্যান’স ক্রিশ্চিয়ান এসোসিয়েশনসহ সকল নাগরিক সংগঠনই ছিল খ্রিস্টধর্মভিত্তিক। অবশ্য ধীরে ধীরে কয়েক প্রজন্মের ব্যবধানে এগুলো সেক্যুলার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে যায়।

মোস্তফা আকিউল: ‘ইসলামিক ক্যালভিনিস্ট’ টার্মটা ইউরোপীয় থিঙ্ক ট্যাঙ্ক European Civil Initiative প্রথম ব্যবহার করে। তুরস্কের রক্ষণশীল ব্যবসায়ীদের, বিশেষ করে তুরস্কের মধ্যপশ্চিমাঞ্চল, নিয়ে সংস্থাটি গবেষণা করেছে। যদি আপনি…

ক্রিস্টা টিপেট: রক্ষণশীল বলতে কী বুঝাচ্ছেন? ধর্মীয় নাকি রাজনৈতিক?

মোস্তফা আকিউল: ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল। তাদের ব্যবসা সফল কোম্পানি রয়েছে। তারা রেফ্রিজারেটর, টিভি, ব্লু-জিন্স- এইসব উৎপাদন করে। এগুলো তারা মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকাসহ বিশ্ব জুড়ে রপ্তানী করে। তারা খুবই সফল উদ্যোক্তা এবং পরিশ্রমী ব্যবসায়ী।

বিশেষ করে কোনিয়া এবং কায়সেরি’র মতো তুরস্কের খুব গুরুত্বপূর্ণ শহরের মানুষজন ধর্মীয়ভাবে বেশ রক্ষণশীল। ঐ সব ব্যবসায়ী গোষ্ঠী মূলত এসব শহরে বসবাস করে। তারা নবী মুহাম্মদ (সা) কে যোদ্ধা হিসেবে নয়, বরং একজন ব্যবসায়ী হিসেবে দেখে থাকে। নবী (সা) কে অনুসরণ করে তারাও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে এবং অর্থ উপার্জন করছে। তারা উপার্জিত অর্থকে সামাজিক উন্নয়ন কাজে ব্যবহার করে। এই ব্যবসায়ীরা জনস্বার্থে দাতব্য সংস্থায় অর্থ দান করে, গরীব ছাত্রদেরকে বৃত্তি প্রদান করে। এমনকি তারা দরিদ্রদের জন্যে খাবারের দোকানও খুলেছে। তুরস্কে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়ায় তাদেরকে আমি ধন্যবাদ জানাই। তুরস্কের দাতব্য খাত বেশ বড়। গাজা ফ্লোটিলার মতো কিছু উদ্যোগ অবশ্য রাজনৈতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। তবে এটা একটা উদাহরণ মাত্র। অরাজনৈতিক উদ্যোগই বরং বেশি।

এসব তো দেশের ভেতরকার কথা। তুরস্কের এনজিও এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের বাইরেও তাদের সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আফ্রিকার অবহেলিত অঞ্চলে তারা খাদ্য ও ঔষধপত্র নিয়ে যাচ্ছে। তারা স্কুল চালু করেছে। সুনামী দুর্গত মানুষের জন্যে পৌঁছে দিচ্ছে সহযোগিতা। মূলত এ অঞ্চলের ধর্মীয় রক্ষণশীল মানুষেরাই এ ধরনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা করে যাচ্ছে। তারা মনে করে, প্রতিবেশীকে সহযোগিতা করাটা আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব। আরেকটা ব্যাপার হলো, তুরস্কের এ ধরনের মানুষেরা এরদোয়ানের ভোট ব্যাংক হিসাবে কাজ করে। কারণ তারা দেখতে পাচ্ছে, এরদোয়ানের কর্মকাণ্ডে তাদের মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটছে। এছাড়া এরদোয়োন এসব ব্যবসায়ীদের সহায়তাও করছেন। কারণ, একেপি ব্যবসায়ী পরিচালিত দলও বটে। তাই তার দলীয় নীতির সাথে তুরস্কের আর্থিক ও বানিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার সাযুজ্যতা রয়েছে।

এসব বিবেচনায়, তুরস্কের এই সামাজিক রূপান্তর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় আচার-আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। ইসলামপন্থী সংস্কারবাদীরা তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দিচ্ছে। আসন্ন পরিবর্তনটা যাতে গঠনমূলক হয় সে জন্যে তারা কখনো কখনো বাপ-দাদাদের চেয়েও অনেক বেশি খোলামেলা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দ্বিধাবোধ করছে না। তবে অবশ্যই এটা একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া।

ক্রিস্টা টিপেট: হুম, যুক্তরাষ্ট্রের সমাজেও পরিবর্তন আসতে বেশ সময় লেগেছিল।

মোস্তফা আকিউল: একদম ঠিক বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে চার্চ কর্তৃক যে সব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেগুলো এক সময় সেক্যুলার এবং সার্বজনীন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আমি আশা করি, তুরস্কের সুশীল সমাজও এ ধরনের সার্বজনীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সচেষ্ট আছেন। এর ফলে তুর্কি জনগণ বৈশ্বিকতাকে অনুধাবন করবে এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে উঠবে আরো বাস্তবসম্মত।

ক্রিস্টা টিপেট: অবশ্যই। গত ১০ বছর ধরে ইসলাম নিয়ে আমি বহু লোকের সাথে কথা বলে আসছি। এখন আপনার যে অব্স্থা, অর্থাৎ আপনি ধার্মিক হিসেবে বেড়ে উঠেননি। আপনি বলেছেন, আপনি শুধু ধর্মতাত্ত্বিকভাবে অনুপ্রাণিত। আমার জানতে ইচ্ছে করছে, আপনার মতো যারা আছেন তাদের মনোভাবটা এখন কী রকম হতে পারে?

মোস্তফা আকিউল: প্রথমেই বলা দরকার যে, আমেরিকানরা এমন এক সময়ে ইসলাম সম্পর্কে শুনছে এবং দেখছে, যখন মুসলিমরা ইসলামী মূল্যবোধ থেকে সামগ্রিকভাবে অনেক দূরে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মুসলিমদের অনাকাঙ্ক্ষিত ত্রুটিগুলোই তাদের চোখে পড়ছে। তেমনি মুসলিমরাও সময়ে সময়ে পশ্চিমাদের উগ্রতা দেখেছে। ২০১০ সালে ফ্লোরিডার এক ব্যক্তির কোরআন পোড়ানোর খবরটা তুরস্কে পোস্টার লাগিয়ে প্রচার করা হয়েছে। যদিও ঐ ব্যক্তি পুরো খ্রিস্টান সমাজের হয়ে কাজটা করেনি, তবুও খবরটা এমনভাবে ছড়িয়েছে যেন সব খ্রিস্টানরাই কাজটা করেছে। উগ্রপন্থী কিছু আলেম রয়েছে যারা এ ধরনের খবরগুলো ছড়িয়ে দিয়ে মানুষকে উসকে দেয়। তারা অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করতে জানে না। অবশ্য সে সব আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি মূলধারার ইসলামী সমাজ থেকে বেশ আলাদা।

একথা স্বীকার করতে হবে যে, মুসলিম মানসিকতায় অনেক সংস্কার দরকার। ধর্মীয় স্বাধীনতার ব্যাপারে মুসলিমদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। মধ্যযুগে ইউরোপীয় অঞ্চলে যখন ক্যাথলিক শাসন চলছিল তখন সেখানে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কোনো স্বাধীনতা ছিল না। অথচ সে সময়ের মুসলিম সাম্রাজ্যগুলো ছিল ধর্মীয় স্বাধীনতা চর্চার প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু এখন আর তা নেই। নারী এবং সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে এখনকার মুসলিমরা অনেক সংকীর্ণ হয়ে গেছে। তাই এসব ইস্যুতে আলোচনা হওয়া দরকার, সংস্কার আনা দরকার। কিন্তু মুসলিম দেশগুলো যদি বিদেশী শক্তি বা সেক্যুলার একনায়কতন্ত্রের পদানত হয়ে থাকে, তাহলে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হবে না। এ ধরনের শাসক গোষ্ঠী শুধু ধার্মিক মুসলিম হওয়ার কারণে মানুষকে কারাগারে নিক্ষেপ করে। ফলে এ ধরনের শাসনব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কার প্রক্রিয়াকে বরং বাধাগ্রস্ত করেছে।

তাহলে পরিবর্তনের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো কী কী? গুরুত্বপূর্ণ হলো: ইসলামের প্রতি বিশ্বস্ততা, বৈশ্বিক পরিবর্তন সম্পর্কে বাস্তববাদী জ্ঞান ও যৌক্তিক চিন্তা। মানসিকতা হতে হবে উদার। আর এসব বিষয় নির্ভর করবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কী ধরনের মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠছে- তার ওপর। এছাড়া শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ এবং জননেতৃবৃন্দ সামাজিক মূল্যবোধের ওপর কতটুকু আস্থাশীল- সেটাও বিবেচনার বিষয়। কেউ যদি পরিবর্তনের কথা বলে তাকে অবশ্যই উদারতার কথাও বলতে হবে। আর এ দায়িত্বটা পালন করতে হবে তার মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের জায়গা থেকে, শুধুমাত্র বিশ্বাস প্রচার করার উদ্দেশ্যে নয়।

যুক্তরাষ্ট্রে ইদানীং কিছু লোক নাম কামিয়েছেন, যারা এক সময় মুসলিম ছিলেন। তারা বলছেন, ‘ইসলাম খুবই বাজে ধর্ম। তাই আমি এ ধর্ম পরিত্যাগ করেছি।’ আমি অবশ্য তাদের মতামতকে শ্রদ্ধা করি, যদিও তাদের সাথে এ ব্যাপারে একমত নই। পশ্চিমারা ভাবছে, তারা বুঝি মুসলিম সংস্কারক। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব? মুসলিম সংস্কারককে তো আগে ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, তারপরই না সংস্কার!

ক্রিস্টা টিপেট: তার মানে হলো, নামেমাত্র মুসলিম হওয়াটা সংস্কারের জন্যে যথেষ্ট নয়। সবার আগে জিনিসটাকে ধারণ করা জরুরি?

মোস্তফা আকিউল: যারা ইসলামের বদনাম করে বেড়ায় তারা মুসলিম বিশ্বের ইতিবাচক পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেবে– এটা আপনি আশা করতে পারেন না। আসলে তারা চায় না কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসুক। ইসলামের বিরুদ্ধাচারণকে সাধারণ মুসলিম জনগণ ইসলামের ওপর সরাসরি আঘাত বলে মনে করে। ফলে ইসলাম প্রশ্নে তারা আরো রক্ষণশীল হয়ে পড়ে।

ক্রিস্টা টিপেট: তুরস্ক সম্পর্ক একটা কথা প্রচলিত আছে যে, তুর্কি পরিচয় আর মুসলমানিত্ব- এই দুটি জিনিস নাকি সমার্থক। এ কথাটা আপনার লেখায় পেয়েছি এবং আপনি বলেও থাকেন। কিন্তু এ কথাও সত্য, ইস্টার্ন আর্থোডক্স খ্রিস্টানদের জন্যে তুরস্ক এখনো পূণ্যভূমি হিসেবে বিবেচিত। বিশ্ব জুড়ে এ ধর্মের প্রায় ৩০০ মিলিয়ন অনুসারী রয়েছে। আমরা গত সপ্তাহে আর্চবিশপ বার্থোলমিউর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তুরস্কে মুসলিম যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে খ্রিস্টানদের বসবাস। তাহলে কীভাবে মুসলিম পরিচয় শুধুমাত্র তুর্কি পরিচয়ের সমার্থক?

মোস্তফা আকিউল: অবশ্যই, সেন্ট বার্থোলমিউ (Bartholomew I) তুরস্কের ঐতিহ্য ও সম্পদ। একজন খ্রিস্টান ধর্মীয় নেতা হিসেবে আমি তাঁকে শ্রদ্ধা করি। তিনি ছিলেন জ্ঞানী ব্যক্তি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত পেট্রিয়ার্ক কর্তৃক ধর্মীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে আয়োজিত সংলাপগুলো বেশ গঠনমূলক। সেই প্রতিষ্ঠানটিকেও আমি শ্রদ্ধার চোখে দেখি। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বিশ শতকের কিছু তুর্কি এই প্রতিষ্ঠানটিকে যথাযথ সম্মান দিতে পারেনি। এজন্য ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি নয় বরং জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিই দায়ী ছিল।

কারণ হিসেবে তুরস্কের সাথে গ্রীসের রাজনৈতিক উত্তেজনার কথা বলা যায়। বিরোধটা ছিল সাইপ্রাস নিয়ে। এসব রাজনৈতিক ইস্যুতে তুরস্কে গ্রীক বংশোদ্ভুত লোকদের হেয় প্রতিপন্ন করা হতো। যদিও তারা ছিল তুরস্কেরই নাগরিক। তবে তুরস্কের বেশিরভাগ মানুষ এ ধরনের কাজকে সমর্থন করতো না। অনেকেই তৎকালীন সময়ে নির্যাতিত মানুষগুলোর দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। অন্যদিকে, তৎকালীন সেক্যুলার তুরস্কে পেট্রিয়ার্ক অনুসারীদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা দেয়া হয়নি বলে গ্রীসেও তুর্কি মুসলিমরা পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেনি।

ধর্মীয় স্বাধীনতা না পাওয়া খ্রিস্টান এবং ইহুদীদের মনে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। যা হোক, একবিংশ শতকের শুরুতে তুরস্কের অবস্থা দেখে আশা করতেই পারি, সেই বিপর্যয়ের অবসান ঘটেছে। যদিও বাক স্বাধীনতা ইস্যুতে এখনো একেপি’র সমালোচনা করার যথেষ্ট কারণ আছে। তবে এটাও সত্য যে, এরদোয়ান সরকার তুর্কি খ্রিস্টান ও ইহুদীদের ধর্মপালনের ওপর থেকে বিধি-নিষেধ তুলে নিয়েছে।

ক্রিস্টা টিপেট: পেট্রিয়ার্ক বার্থোলমিউ জানিয়েছেন, তাঁরা সেক্যুলার আমলের চেয়ে ইসলামপন্থী সরকারের আমলে অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করতে পারছেন।

মোস্তফা আকিউল: একদম ঠিক। কারণ তুরস্কের সেক্যুলারিস্ট সরকার সকল ধরনের ধর্মচর্চাকে নিষিদ্ধ করেছিল, এমনকি খ্রিস্টান ধর্মকেও। ফলে সব ধর্মের ধার্মিক জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। কর্তৃত্ববাদী সরকারের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে একমত ছিলেন। সে সময় প্রখ্যাত কিছু মুসলিম ব্যক্তিত্ব পেট্রিয়ার্ক ও সংখ্যালঘু ইহুদীদের ওপর যে কোনো ধরনের জাতীয়তাবাদী বা সাম্প্রদায়িক আচরণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। ব্যাপারটা ভাবতেই ভাল লাগে। তাঁদের মতো করে এখন আমাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। এছাড়া পেট্রিয়ার্ক কর্তৃক পরিচালিত Halki Seminary স্কুলটাও তুরস্কের জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রতিষ্ঠান…

ক্রিস্টা টিপেট: স্কুলটা এখনো খুলে দেয়া হয়নি।

মোস্তফা আকিউল: অবশ্যই এটা খুলে দেয়া উচিৎ। এখনো পর্যন্ত খুলে না দেয়ার কারণ আমি জানি না। তবে তুরস্কের শিক্ষা আইনে এখনো কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। তুরস্কে কোনো ধরনের বেসরকারী শিক্ষাব্যবস্থার অনুমতি নেই। এসবের মূলে রয়েছে সরকারী নিয়ন্ত্রণ। এমনকি ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থাও সরকারের অধীন। এরদোয়ানের উচিৎ হবে এ ব্যাপারে দ্রুত সংস্কার আনা।

বিশ্বের সামনে ‘নয়া তুরস্ক’কে মডেল হিসেবে দাঁড় করাতে চাইলে আমাদের আগের চেয়ে আরো বেশি গণতান্ত্রিক এবং আরো ভালো মুসলিম হতে হবে। এমনকি আরো উদার হতে হবে। তবে এটা ঠিক যে সমস্যা থাকবেই। সবকিছু একেবারে যথাযথভাবে সমাধান হয়ে যাবে, এমনও নয়। তবে আমি আশা করি, এরদোয়ান সরকারের গৃহীত সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। এসব সংস্কারমূলক পদক্ষেপের ফলে তুরস্কের ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও উপকৃত হবে বলে আশা রাখি।

ক্রিস্টা টিপেট: তুরস্কের পরিবর্তনগুলো সেক্যুলার তুর্কিদের জন্যে শঙ্কার সৃষ্টি করছে। এক্ষেত্রে তাদের জন্যে পদক্ষেপটা কী ধরনের হবে? অর্থাৎ তুরস্কের উদীয়মান রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা তাদের জন্যে কী করবে?

মোস্তফা আকিউল: সেক্যুলারিস্ট তুর্কিদের কথা বলছেন তো? সেক্যুলার এবং সেক্যুলারিস্টদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

ক্রিস্টা টিপেট: আচ্ছা, সেক্যুলার এবং সেক্যুলারিস্ট।

মোস্তফা আকিউল: উদারপন্থী সেক্যুলারদের চিন্তার সাথে সেক্যুলারিস্টদের পার্থক্য রয়েছে।

ক্রিস্টা টিপেট: ও আচ্ছা, অনেকে আবার সেক্যুলার হলেও ব্যক্তিগতভাবে ধর্মে বিশ্বাসী, তাই তো?

মোস্তফা আকিউল: হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। আপনার প্রশ্নটা ছিল সেক্যুলারিস্টদের সম্পর্কে। আসলে তাদের বুঝা উচিৎ, যদি তারা ক্ষমতায় যেতে চায় তাহলে নির্বাচনে জিততে হবে। নির্বাচিত সরকারের বিপরীতে তারা মিলিটারি এবং জুডিশিয়ারির মাধ্যমে এখনো ক্ষমতা ভোগ করছে। এগুলোর জোরেই মূলত তারা তাদের আদর্শটাকে এখনো টিকিয়ে রেখেছে। এজন্যেই হয়তো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তারা ঝিমিয়ে পড়েছে। ভবিষ্যৎ তুরস্ক নিয়ে তাদের কোনো ভিশন নেই। তারা জানে না অর্থনীতি কীভাবে পরিচালনা করতে হয়। কথাগুলো মূলত তুরস্কের বর্তমান প্রধান বিরোধীদলকে নিয়ে যারা তুর্কি সমাজে সেক্যুলারিস্টদের প্রতিনিধিত্ব করছেন। অর্থনৈতিক ভিশন, বৈশ্বিক বুঝজ্ঞান, পররাষ্ট্রনীতি- এসব ব্যাপারে তাদের অবস্থান এরদোয়ানের একেপির তুলনায় খুবই দুর্বল। যদি তারা নির্বাচনে জিততে চায়, তুর্কি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে চায়, তাহলে ইসলামপন্থীদের কাছ থেকে তারা শিক্ষা নিতে পারে।

ক্রিস্টা টিপেট: আমরা মানচিত্রে তুরস্কের বিস্ময়কর ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে কথা বলছিলাম। অর্থাৎ তুরস্ক বিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থান করছে এবং বিশ্বের নেতৃত্ব গ্রহণে প্রস্তুত হচ্ছে।

মোস্তফা আকিউল: তুরস্কের প্রতিবেশীগুলোর দিকে একবার তাকান। সিরিয়ার সাথে রয়েছে আমাদের সবচেয়ে দীর্ঘ সীমান্ত, দেশটা এখন সবচেয়ে অশান্তিতে আছে। তারপর আছে ইরান। এছাড়া ককেশাশের দিকে আছে আজারবাইজান, জর্জিয়া ও আর্মেনিয়া। দুঃখজনকভাবে আর্মেনিয়ার সাথে সীমান্ত যোগাযোগটা বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। আমাদের প্রতিবেশী প্রত্যেক দেশেরই আভ্যন্তরীণ সমস্যা রয়েছে। অপরদিকে ইউরোপীয় প্রতিবেশীদের দিকটা মোটামুটি স্থিতিশীল। অতীত বাদ দিলে গ্রীসের সাথে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ ভালো যাচ্ছে। তবে গ্রীসও এখন ভেঙে পড়ছে। তাই গ্রীসের সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়েও তুরস্ককে ভাবতে হবে। সুতরাং সব দিক বিবেচনা করলে প্রতিবেশীদের নিয়ে তুরস্ককে কঠিন সময় পার করতে হতে পারে।

অবশ্য এ ধরনের পরিবেশে সুবিধা-অসুবিধা- উভয় দিকই রয়েছে। একটা রাষ্ট্র তার প্রতিবেশীকে ইতিবাচকভাবেও প্রভাবিত করতে পারে। যেমন আরব বসন্তের সময় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছিল। সিরিয়ার সাথে বর্তমানে তুরস্কের সম্পর্কে বেশ উত্তেজনাপূর্ণ। কারণ তুরস্ক সরকার যৌক্তিকভাবেই আসাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলছে। কিন্তু আমি মনে করি এ ধরনের ভয়ঙ্কর প্রতিবেশীকে সহায়ক বন্ধুতে পরিণত করে ফেলা যায়। যেমন ইরানের পরমাণু বিতর্কের কূটনৈতিক সমাধানে তুরস্ক বেশ দক্ষতা দেখিয়েছে। সংকট সমাধানে ইরানকে পশ্চিমাদের সাথে আলোচনার টেবিলে বসিয়েছে। অবশ্য সমাধান না আসা পর্যন্ত আলোচনা অব্যাহত রাখতে তুরস্ক চেষ্টা চালিয়ে যাবে। কিন্তু ইরানের সাথে আলোচনা…

ক্রিস্টা টিপেট: আমিও মনে করি তুরস্ক সেটা করতে পারবে।

মোস্তফা আকিউল: হ্যাঁ। ইস্তান্বুলে অনুষ্ঠিত ইরান ও পশ্চিমাদের মধ্যকার আলোচনাটা বেশ ফলপ্রসূ ছিল। বারাক ওবামার সাথে বৈঠক করে এরদোয়ান পরদিন গেলেন আয়াতুল্লাহ খামেনীর সাথে কথা বলতে। তুরস্কের দূতিয়ালির উপর উভয় পক্ষ আস্থা রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এ ধরনের ঘটনা খুবই বিরল বলা যায়। ইরান হয়তো তুরস্কের সীমান্তবর্তী দেশ বলে এক্ষেত্রে সুবিধা অর্জন করতে পেরেছে। আশা করি, এটার ভালো একটা ফলাফল আসবে।

তুরস্ক তার সীমানার অপর পাশটা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভয়ের মধ্যে ছিল। এক সময় স্কুলে আমাদের পড়ানো হতো, ‘তুরস্কের তিন দিকে সমুদ্র আর চতুর্দিকে শত্রুদেশ দিয়ে ঘেরা।’ ৮০’র দশকে স্কুলে আমরা এগুলো শিখেছি। আর প্রধানমন্ত্রী এরদোয়ান এসে বলছেন, তুরস্ক আর আগের মতো নেই। তুরস্ক হতে যাচ্ছে বৈশ্বিক দুনিয়ার অংশীদার। আমি এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাই।

1
2
3
4
মোস্তফা আকিউল
তুর্কি সাংবাদিক ও লেখক। 'ইসলাম উইদাউট এক্সট্রিমস, 'দ্য ইসলামিক জেসাস' তাঁর উল্লেখযোগ্য বই। হুররিয়াত ডেইলি নিউজ, আল মনিটর, নিউ ইয়র্ক টাইমসের নিয়মিত কলাম লেখক।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন