মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭
হোম > চিন্তা > ব্যক্তি ও সমাজের অগ্রাধিকার নির্ণয়ে ইসলাম ও পাশ্চাত্য চিন্তাধারার পার্থক্য

ব্যক্তি ও সমাজের অগ্রাধিকার নির্ণয়ে ইসলাম ও পাশ্চাত্য চিন্তাধারার পার্থক্য

ব্যক্তি আগে? নাকি সমাজ আগে? সমকালীন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মতবাদ হিসাবে পুঁজিবাদ কর্তৃক সমাজের তুলনায় ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেয়ার নীতিকে খণ্ডন করতে গিয়ে এই প্রশ্নটি এসেছে। সাম্যবাদীদের দৃষ্টিতে সমাজ আগে, ব্যক্তি পরে। পুঁজিতান্ত্রিক মতাদর্শে এ সংক্রান্ত বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ বিভিন্ন রকম হলেও মোটের ওপর বলা যায়, ‘সমাজের তুলনায় ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেয়া’ পুঁজিবাদের অন্যতম নীতি। একে উদারনৈতিকতাবাদ বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদও বলা হয়। তবে এই সব ব্যাখ্যা সাপেক্ষ বিষয়ে ফোকাস না করে আমরা ধরে নিচ্ছি, পুঁজিবাদের বিকল্প মতবাদ হিসাবে সাম্যবাদ ব্যক্তিস্বার্থের তুলনায় সামাজিক স্বার্থকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করে।

ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। অতএব, ‘ব্যক্তি আগে, নাকি সমাজ আগে’– এ ধরনের প্রশ্ন আদৌ সঠিক কি-না, তা নিয়েই কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে। ব্যক্তিস্বার্থ তথা ব্যক্তিমানুষকে জলাঞ্জলি দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠন হতে পারে না। আবার সামষ্টিক-স্বার্থ তথা সমাজকে উপেক্ষা করে ব্যক্তির অস্তিত্বও কল্পনা করা যায় না। অতএব, ‘ব্যক্তি আগে, নাকি সমাজ আগে’– এই ধরনের প্রশ্নের মানে হলো, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে ব্যক্তির ওপরে বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে, নাকি সমাজের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে– এই প্রশ্নের মীমাংসা করার চেষ্টা। কথাটা এভাবেও বলা যেতে পারে, ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দেয়ার অর্থ হচ্ছে ব্যক্তিগত উদ্যোগ, সম্পদ ও স্বাধীনতাকে যথাসম্ভব রক্ষা করে উন্নততর সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা। আর সমাজকে অগ্রাধিকার দেয়ার মানে হলো সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় তথা সামষ্টিক উন্নয়নের মাধ্যমেই ব্যক্তির উন্নয়ন ঘটানোর নীতি গ্রহণ। এই দুই কর্মনীতির কোনটি সঠিক তা নিয়ে পুঁজিবাদী ও সাম্যবাদী তাত্ত্বিকদের মধ্যে নানা পর্যায়ে বিরোধ রয়েছে। এই বিরোধের তাত্ত্বিক দিক নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা এই প্রবন্ধের বিষয়বস্তু নয়। এখানে বরং বিষয়নিষ্ঠ পদ্ধতিতে (thematic approach) ‘ব্যক্তি আগে, নাকি সমাজ আগে’– এই প্রশ্নে ইসলামের অবস্থান যাচাই করে দেখা হবে।

এই আলোচনার সারসংক্ষেপ দুইটি। প্রথমত, ব্যক্তি বনাম সমষ্টি– এই ধারায় আলোচনার ব্যাপারটিই অনৈসলামিক। এটি একটি পাশ্চাত্য বিতর্ক এবং ইসলামের ওপর তা আরোপিত। অতএব, এক অর্থে অপ্রাসংগিক। দ্বিতীয়ত, তারপরও ‘ব্যক্তি আগে, নাকি সমাজ আগে’– এই প্রশ্নে ইসলাম কি বলে তা জানার জন্য কেউ খুব বেশি আগ্রহী হলে, অর্থাৎ ব্যক্তি কিংবা সমাজের কোনো একটি অন্যটির আগে হবে– এমন বদ্ধমূল ধারণা নিয়ে কেউ যদি ইসলামের দিক থেকে এর উত্তর ঠিক করতেই চান, তাহলে তার জন্য সঠিক উত্তর হচ্ছে– ইসলামে ব্যক্তি আগে, সমাজ নয়।

যা হোক, সমাজের ওপর গুরুত্বারোপ সংক্রান্ত ইসলামের ভাষ্যগুলোর তালিকা করা হলে তা বেশ দীর্ঘই হবে। সমষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করে কোরআন-হাদীসের সে সব রেফারেন্স পর্যালোচনা করলে মনে হতে পারে, ইসলাম এক ধরনের সর্বাত্মকবাদকেই (totalitarianism) সমর্থন করে। আবার ব্যক্তিমানুষকে মূল বিবেচনায় রেখে ও অধিক গুরুত্ব দিয়ে কোরআন-হাদীসে যেসব অকাট্য সূত্র (নস্) রয়েছে, সেগুলোকে সামনে রেখে বিষয়টিকে কেউ বুঝার চেষ্টা করলে মনে হতে পারে, নিজস্ব ধরনে ইসলাম শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকেই (individualism) সমর্থন করে। বিষয়টি মুসলিম দর্শনের প্রাথমিক যুগে কোরআন-হাদীসের অকাট্য দলীল-প্রমাণের ওপর নির্ভর করে ইচ্ছার স্বাধীনতাপন্থী ও অদৃষ্টবাদী যথাক্রমে কাদারিয়া ও জাবারিয়া নামের দু’টি বিপরীত মতানুসারী ধর্মতাত্ত্বিক-দার্শনিক সম্প্রদায় গড়ে উঠার মতো।

শারীরিক ও বস্তুগত গঠন এবং প্রাকৃতিক নিয়মানুবর্তিতার বিষয়সমূহ ‘ইচ্ছার স্বাধীনতা’ সম্পর্কিত বিতর্কের বিষয়বস্তু নয়। আমাদের কাণ্ডজ্ঞান অনুসারে ‘ইচ্ছার স্বাধীনতা’ বলতে সাধারণভাবে যা বুঝানো হয় ব্যক্তির দিক থেকে তা একটি বাস্তব ব্যাপার। অতএব মানুষ স্বাধীন। আবার জগতের স্রষ্টা ও প্রতিপালক হিসাবে তাওহীদি ধারায় আল্লাহর অস্তিত্বকে স্বীকার করা হলে সেই ধরনের একক পরমসত্ত্বা, স্বয়ং-সর্বজ্ঞানী ও সর্বশক্তিমান হওয়াটাও বাঞ্ছনীয়। যদি তাই হয়, তাহলে তাঁর দিক থেকে মানুষের সাথে তাঁর সম্পর্ক ‘কর্মটি সম্পাদনের পরে জানা যাবে’ (yet to know) ধরনের হতে পারে না। অতএব, আল্লাহর দিক থেকে বিবেচনা করলে মানুষের (খোদায়ী শক্তি বহির্ভূত) ‘স্বতন্ত্র’ ইচ্ছা ও স্বয়ং-স্বাধীনতা (absolute freedom অর্থে) তথা ইচ্ছার স্বাধীনতা থাকা সম্ভব নয়। মানুষ যেহেতু কল্যাণ লাভ করতে চায়, কল্যাণ লাভের একমাত্র পন্থা যেহেতু সৎকর্ম সম্পাদন এবং যেহেতু মানুষ জানে না যে, আল্লাহর পক্ষ হতে তার জন্য কি পরিণতি অপেক্ষমান– তাই মানুষের জন্য একমাত্র যুক্তিসঙ্গত পন্থা হলো সৎকর্মে প্রবৃত্ত হওয়া। মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা রয়েছে– এই ধারণার পক্ষে কোরআন-হাদীসে বর্ণিত রেফারেন্সগুলোকে বুঝতে হবে, ‘জগতের দিক থেকে ঈশ্বর’ (from world to God)– এর দৃষ্টিকোণ থেকে। আর ইচ্ছার স্বাধীনতার বিপক্ষে কোরআন ও হাদীসে উদ্ধৃত সূত্রসমূহকে বিবেচনা করতে হবে ‘ঈশ্বরের দিক থেকে জগত’ (from God to world)– এই দৃষ্টিকোণ হতে। মুসলিম দর্শনের ইতিহাসে আশারিয়া সম্প্রদায় এই ধাঁচেই বিষয়গুলোকে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছে। আবু হামিদ আল গাযালী (১০৫৮-১১১১ খৃস্টাব্দ) এর সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

ইচ্ছার স্বাধীনতা সম্পর্কিত দার্শনিক সমস্যাটির সাথে এই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়ের সংশ্লিষ্টতা কী– তা এই আলোচনার শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামের foundational text-গুলোতে এসব বিষয়ে যা বলা আছে, আপাতদৃষ্টিতে বেশ কিছু ক্ষেত্রে সেগুলো পরষ্পরবিরোধী মনে হতে পারে। আসলে সুন্নাহ’র সার্বজনীন line of consistency-র আলোকে না দেখে ইসলামকে ইসলামের মতো করে বুঝা অসম্ভব। মনে রাখতে হবে, কোনো কিছুকে সমর্থন করা বা সঠিক মনে করা এক জিনিস, আর সেটিকে সঠিকভাবে বুঝতে পারা ও তুলে ধরা ভিন্ন ব্যাপার। যদিও দ্বিতীয় বিষয়টি প্রথমটির পূর্বশর্ত।

আগেই বলা হয়েছে, ইসলামের foundational text-এ ব্যক্তিকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে যেসব দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য রয়েছে তাতে মনে হবে– ইসলাম ব্যক্তিকেই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। আবার সমাজকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে যেসব নস্ রয়েছে তাতে মনে হবে– ইসলামে ব্যক্তি নয়, সমাজই অগ্রগণ্য। বলাবাহুল্য, ইসলামের foundational text তথা কোরআনকে এর সংশ্লিষ্ট প্রেক্ষাপটের আলোকে পাঠের পদ্ধতিই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। শুধু তাই নয়, প্রেক্ষাপট বিবেচনার অংশ হিসাবে রাসূল (সা) সংশ্লিষ্ট আয়াত নাযিল হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কী করেছেন, সাহাবাগণ এ বিষয়ে কী বুঝেছেন ও কী করেছেন তা বিবেচনায় নিয়েই সংশ্লিষ্ট আয়াতকে বুঝতে হবে। হাদীসের ক্ষেত্রেও এটি সমভাবে প্রযোজ্য। এক কথায়, ইসলাম বুঝার জন্য সামগ্রিকতা ও সামঞ্জস্য-বিবেচনা একটি অপরিহার্য বিষয়।

পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদ– এই উভয় মতবাদে ইসলাম সমর্থন করে এমন কিছু বিষয় যেমন আছে; আবার ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কিছু বিষয়ও আছে। যদি তাই থাকে, তাহলে উভয় মতবাদই কোনো কোনো বিষয় বিবেচনায় ইসলামী এবং কোনো কোনো বিষয়ের নিরিখে ইসলামবিরোধী। এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক মতবাদকে যদি কর্মনীতি ও দার্শনিক দিক– এই দুই ভাগে ভাগ করি, তাহলে দেখা যাবে এ দু’টোর কর্মপন্থাগত কিছু দিককে ইসলাম সমর্থন করছে। যেমন, ব্যক্তি-উদ্যোগ ও সম্পত্তির ব্যক্তি-মালিকানা ব্যবস্থাকে ইসলাম সমর্থন করে। অন্যদিকে, সহায়-সম্পদের বিষয়ে যতটা সম্ভব সমতা অর্থে সাম্যের ধারণা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও ইসলাম সমর্থন করে।

এই মতবাদ দু’টির দার্শনিক দিকগুলো আপাতদৃষ্টিতে স্বতন্ত্র মনে হলেও এ দু’টিই অভিন্ন একটি উৎস-মতবাদের ভিন্ন প্রকরণ মাত্র। সমাজবাদ ও ব্যক্তিবাদ উভয়ের উৎস হলো বস্তুবাদ। বস্তুবাদী ধ্যান-ধারণার স্বতন্ত্র আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের ফলে আধুনিক কালে যেসব শাখা-মতবাদের উদ্ভব ঘটেছে, এ দু’টি তার অন্যতম। বস্তুবাদ-উৎসারিত হওয়ায় পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদ– উভয় মতবাদকেই ইসলাম স্বীয় তাওহীদের তাত্ত্বিক জায়গা হতে বিরোধিতা করে। ইসলাম বস্তুবাদকে খণ্ডন করে তাওহীদভিত্তিক একটি একক ও সমগ্র বিশ্বব্যবস্থার ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে। পুঁজিবাদে সমাজ হলো উপায়, ব্যক্তি-মানুষই লক্ষ্য। সাম্যবাদে সামষ্টিক-মানুষ তথা সমাজই লক্ষ্য, আর ব্যক্তি হলো উপায়। লক্ষ্য ও উপায়ের (end and means) এই বাইনারিসহ যে কোনো তাত্ত্বিক বিষয়কে সাদা-কালো বাইনারিতে দেখাটা অন্যতম পাশ্চাত্য ফেনোমেনা। অথচ ইসলামে একদৃষ্টিতে যা উপায়, অন্যদৃষ্টিতে তা-ই লক্ষ্য।

‘from world to God’- এই দৃষ্টিভঙ্গি হতে বিবেচনা করলে ইসলামে আল্লাহই হলেন একমাত্র লক্ষ্য, বাদবাকি সব হলো উপায়। উপায় ও লক্ষ্য– এই বিভাজন শুধুমাত্র সৃষ্টজগতের জন্য প্রযোজ্য। আল্লাহর মহান সত্ত্বার স্বগতদিক (Allah by Himself) থেকে উপায় ও লক্ষ্যের এই বিভাজন অর্থহীন। যা হোক, সামগ্রিকভাবে জগত একটি উপায় হলেও জগতের বিষয়গুলো আবার পরস্পর সাপেক্ষে উপায় ও লক্ষ্যে বিভাজিত। কোনো একটি বিষয়ে যেটি উপায়, ক্ষুদ্রতর (imperfect অর্থে) অবস্থান হতে তারও নিম্নস্তরের কোনো কিছুর জন্য তা লক্ষ্য বটে।

আগেই বলা হয়েছে, ইসলামের জগত ও জীবনদৃষ্টি অখণ্ড, ধারাবাহিক ও সামগ্রিক ধাঁচের। এই দৃষ্টিতে ব্যক্তি ও জগত পরস্পরের পরিপূরক। বিশ্বজগতে পরমসত্ত্বার প্রতিনিধিত্ব করার জন্যই মানুষের সৃষ্টি। অতএব, জগত উপায়, মানুষই লক্ষ্য। আবার মানুষের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো পৃথিবীতে আল্লাহর খেলাফত কায়েম করা। চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এসব কিছুর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। দেখা যাচ্ছে, একটি লক্ষ্য পরবর্তী উচ্চতর লক্ষ্যের নিরিখে উপায় হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে। ইসলামের এই ক্রমসোপানমূলক জগতদৃষ্টিকে বুঝতে না পারার অন্যতম পরিণতি হলো, ইসলামের ওপর ‘ব্যক্তি আগে নাকি, সমাজ আগে’– এই ধরনের প্রশ্ন আরোপ করে যেনতেনভাবে একটি হ্যাঁ/না ‘উত্তর’কে ইসলামের ওপর অযৌক্তিকভাবে চাপিয়ে দেয়া।

জগতের নিরিখে মানুষকে লক্ষ্য বিবেচনা করলে ইসলামের দৃষ্টিতে একক ব্যক্তি ও সামষ্টিক ব্যক্তির মধ্যে লক্ষ্য কোনটি ও উপায় কোনটি? এই প্রশ্নকে সামনে রেখে মানুষের মধ্যকার ব্যক্তি-সমাজ বিভাজনে ইসলামের দৃষ্টিতে সমাজই লক্ষ্য, ব্যক্তি উপায়। অন্য দৃষ্টিকোণ হতে ইসলামে ব্যক্তিই লক্ষ্য, সমাজ তার উপায় মাত্র। দ্বীন কায়েম হিসাবে বলা হোক বা খিলাফত কায়েম হিসাবে বলা হোক অথবা ইসলামী শরীয়াহ’র বাস্তবায়নের কথা বলা হোক, এ সবই মূলত এক এবং তা সামষ্টিকতার ওপরেই অধিকতর গুরুত্বারোপ করে। আবার ইক্বামতে দ্বীনসহ সমস্ত ইবাদতের অভিন্ন ও একমাত্র লক্ষ্য হলো আখেরাতে মানুষের ব্যক্তিগত নাজাতপ্রাপ্তি। আখেরাতে নাজাতপ্রাপ্তির বিষয়টিকে ইসলামের ভেতর থেকে না বুঝার কারণে কিংবা আখেরাতে নাজাতপ্রাপ্তির বিষয়টিকে কার্যত অগ্রাহ্য করে ইসলামকে বৌদ্ধ ধর্মের মতো মনে করার কারণে কোনো কোনো সাম্যবাদী তাত্ত্বিক ‘ইসলামে ব্যক্তি নয়, সমাজ আগে’– এই ভুল ধারণায় নিমজ্জিত হয়েছেন। ‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’র মতো ইসলামে ‘সাম্যে’র গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি দেখেই তাঁরা ইসলামকে সাম্যবাদের সাথে গুলিয়ে ফেলছেন। সাম্যসহ এ ধরনের বেশকিছু চিরন্তন মূল্যবোধজ্ঞাপক পরিভাষা আছে যেগুলোর প্রত্যেকটি স্বতন্ত্রভাবে কোনো কর্মের যথার্থতা কিংবা ভ্রান্তি নিরূপনের মানদণ্ডের ভূমিকা পালন করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই মানদণ্ডগুলো বিরোধপূর্ণ হিসাবে প্রতীয়মান হয়। ওহীর জ্ঞানের সহায়তায় ইসলাম এ ধরনের বিরোধ নিরসন করে।

কথিত আছে, হযরত উমর (রা) বলেছেন, দুনিয়ার সব মানুষ যদি বেহেশতে যায়, তাতে আমার কী লাভ, যদি আমি যেতে না পারি? আর দুনিয়ার সব মানুষ যদি দোযখে যায় তাতে আমার কী ক্ষতি, যদি আমি তা হতে বাঁচতে পারি? কথাটির সূত্রগত-যথার্থতা যাই হোক না কেন, এতে মানুষের জীবনোদ্দেশ্য সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। কর্মে রত হওয়া ও দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সামাজিকতা ও সামষ্টিকতার কথা বললেও ইসলামে দায়বোধের বিষয়টি সদা-সর্বদাই ব্যক্তিগত। হাদীসে বলা হয়েছে, “সাবধান, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” এই দৃষ্টিতে ব্যক্তি-মানুষকে পরীক্ষা করার জন্যই মহান আল্লাহ তায়ালা সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। প্রত্যেকে প্রত্যেকের জন্য পরীক্ষা, প্রতিটি পরিস্থিতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য একটা পরীক্ষা। প্রতিটা পরীক্ষাই তার সৎকর্মশীলতা প্রমাণের একটা সুযোগ।

ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন কোনো কাজ ইসলাম অনুমোদন করে না। বিচ্ছিন্ন ও একক ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে বাস্তব জগতে যে সব সংঘ বা সমিতি গড়ে উঠে, সে সব প্রতিষ্ঠানেও ইসলাম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে যথাসম্ভব রক্ষা করার চেষ্টা করে। তৎসত্ত্বেও সামষ্টিক স্বার্থের বিপরীতে ব্যক্তিবিশেষের বিশেষ কোনো অধিকার একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত ক্ষুন্ন হয় বা হতে পারে এবং হওয়াটাই স্বাভাবিক। ইচ্ছার স্বাধীনতা যেমন মানুষের পাখির মতো উড়ার ক্ষমতাকে বোঝায় না, তেমনি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বলতেও মানুষের যা ইচ্ছা তাই করা বোঝায় না। বরং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য কথাটি ব্যক্তির অধিকারসমূহের ওপর অধিকতর গুরুত্বারোপকে বুঝায়। এমনকি মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির ক্ষেত্রেও ইসলাম ব্যক্তির অধিকারকে সংরক্ষণ করে।

সাংস্কৃতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে বস্তুবাদী চিন্তাধারা প্রভাবিত পাশ্চাত্যের কোনো কোনো দেশে অপরাধ দমনে অনন্যোপায় হয়ে মৃত্যুদণ্ড দানের বিধান জারি রেখেছে বটে। তবে এ বিষয়ে তাদের প্রধান তাত্ত্বিক অবস্থান হলো, অপরাধ যাই হোক না কেন, শাস্তি কার্যকর করার পর সেই ব্যক্তির সংশোধনের সুযোগ থাকে না। তাই মৃত্যুদণ্ড প্রদানের মাধ্যমে ব্যক্তির অধিকার ক্ষুন্ন হয়। অতএব, তা অন্যায়। পাশ্চাত্য ধারায় চিন্তা করলে এমনটা মনে করাই স্বাভাবিক। কারণ, উদ্দেশ্যহীন অন্ধ বিবর্তনের ধারায় সৃষ্ট এই জগতে সামগ্রিক অর্থে আদতে অর্থহীন এই জীবনের পরিসমাপ্তি মানে সব শেষ। অতএব, অপরাধ যাই হোক, মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে ব্যক্তিকে সংশোধন ও উত্তরণের সুযোগ দিতে হবে।

ইসলামে জীবন ও জগতের ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইহজীবনে ন্যায়সংগত বিচারে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তি তওবা করার সুযোগ পায়। আন্তরিকভাবে তওবাকারীর তওবা কবুল হওয়ার ঘোষণা স্বয়ং আল্লাহই দিয়েছেন। স্বেচ্ছায় ব্যাভিচারের স্বীকারোক্তি দিয়ে মৃত্যুদণ্ড গ্রহণকারী মহিলা সাহাবী হযরত গামেদী (রা) সম্পর্কে কোনো এক প্রসঙ্গে কেউ অশোভন মন্তব্য করায় রাসূলুল্লাহ (সা) খুব অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, মদীনার সব অধিবাসীদের মধ্যে যদি তার তওবাকে ভাগ করে দেয়া হয়, তবে তা তাদের প্রত্যেকের জন্য যথেষ্ট হবে।

যে ব্যক্তি অপরাধের পরেও অনুতপ্ত নয়, কিন্তু ভবিষ্যতে সে অনুতপ্ত ও সংশোধন হতে পারে– এই সম্ভাবনার কারণে তাকে প্রাপ্য শাস্তি না দেয়ার মানে হলো সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। মনে রাখতে হবে, ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেয়া মানে সমাজকে অস্বীকার করা নয়। আর ব্যক্তির সংশোধনই শাস্তির একমাত্র লক্ষ্য নয়। অপরাধ স্বীকারে অস্বীকৃত ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে হয় সমাজকে টিকানোর জন্য। অতএব সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষাও শাস্তি প্রদানের অন্যতম উদ্দেশ্য।

ব্যক্তির আকাঙ্খাসমূহ প্রায়ই পরস্পরবিরোধী হয়ে থাকে। এ ধরনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সেগুলোর বাছ-বিচার ও অগ্রাধিকার নির্ণয়ে প্রবৃত্ত হয়। এটি হলো ব্যক্তির ব্যক্তিগত নৈতিকতা নির্ধারণের প্রক্রিয়া। ব্যক্তির সমষ্টি হিসাবে যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলোও ব্যক্তি-আদলে (in an organic way) নিজ নিজ নৈতিকতা গড়ে তোলে। এক কথায়, চাহিদা ও কর্মের ক্রমসোপান নির্ধারণ করা নৈতিকতার মান নির্ধারণ করারই নামান্তর। এভাবে পারস্পরিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে সব পক্ষই সন্তুষ্টি লাভ করে থাকে। ইসলাম অনুসারে মানবজীবনের ধারাবাহিকতা ও নৈতিক ধারাবাহিকতা অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে আবদ্ধ। তাই ইহলৌকিক জীবনকে বাদ দিয়ে পারলৌকিক জীবন বা পারলৌকিক জীবনকে বাদ দিয়ে ইহলৌকিক জীবন– এর কোনোটাই ইসলামসম্মত নয়। আখিরাতে সাফল্য অর্জনের বিষয়কে লক্ষ্য হিসাবে বিবেচনা করলে ইহলৌকিক জীবন হলো মাধ্যম। আবার পারলৌকিক জীবনে উপযুক্ত প্রাপ্তির মাধ্যমে ইহলৌকিক জীবনের অপ্রাপ্তি ও অন্যায়সমূহকে মেটানোর ধারণা প্রমাণ করে, পারলৌকিক জীবন হলো ইহলৌকিক জীবনের যৌক্তিক সমাধান তথা মাধ্যম বা উপায়।

ব্যক্তি বনাম সমাজ– এই দ্বিবিভাজনটি শুধু নয়, পাশ্চাত্য চিন্তার সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যই হলো দ্বান্দ্বিক, সাদা-কালো ধরনের তথা বাইনারি। প্রায়ই তারা মনে করেন, কোনো একটি বিষয়ে কেবল একটি মতই সঠিক হবে। অনেকটা ডিম আগে না মুরগী আগে– এই ধরনের প্রশ্ন বা সংকট। ইসলামের তাওহীদকেন্দ্রিক চিন্তাধারায় এটি বড় কোনো সমস্যা নয়। ডিমের আগে মুরগী হলে তা আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। আবার মুরগীর আগে ডিম হলে তা সৃষ্টি করার ক্ষমতাও তিনি রাখেন।

ধরুন, একটি জায়গায় একজনের জন্য একটি মাত্র ঘর হবে– এই ধারণা নিয়ে কতিপয় ব্যক্তি বিরোধে লিপ্ত হলো। এ ক্ষেত্রে তারা অপর কাউকে বিরোধ নিষ্পত্তিকারী ‘লেভিয়াথান’ মানতে পারে অথবা লটারী করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যদি একটি জায়গায় একজনের থাকার জন্য একটি ঘরই নির্মাণ সম্ভব– এই ধারণার পরিবর্তে একটি জায়গায় একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা সম্ভব– এই ধারণাকে গ্রহণ করা হয়, তাহলে প্রত্যেকেরই একটি করে থাকার ঘর হতে অসুবিধা থাকে না। ইসলাম এ ধরনের সমন্বয়মূলক ও সামগ্রিক চিন্তাধারাকেই প্রমোট করে। দুঃখজনক বিষয় হলো, সব ধরনের তাত্ত্বিক বিষয়েই পাশ্চাত্য চিন্তাধারার মূলস্রোত ভাসা-ভাসা, সাংঘর্ষিক ও দ্বান্দ্বিক কাঠামোর। জ্ঞানতত্ত্ব হতে সমাজতত্ত্ব– সব ক্ষেত্রেই তারা কোনটি সঠিক হবে, তা খুঁজে খুঁজে হয়রান। ইসলামের চিন্তাধারা হলো নিরবচ্ছিন্ন ও ক্রমসোপানমূলক। তাই সমান্তরাল ধাঁচে চিন্তাধারাজনিত (horizontal pattern of thought) গভীর সমস্যায় সমকালীন পাশ্চাত্যমানস সংকটে নিমজ্জিত থাকলেও ইসলাম এই সমস্যা হতে মুক্ত। ‘ব্যক্তি আগে, নাকি সমাজ আগে’– এই ধরনের চিন্তার পক্ষ-বিপক্ষের যুক্তিগুলোকে জানা ও বুঝার চেষ্টা করাটা ইসলাম বুঝা ও মানার জন্য ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। অবশ্য জগতের প্রভাবশালী একটা অংশ কেন এই ধরনের চিন্তা করে ও কীভাবে তা সমাধানের চেষ্টা করে ইত্যাদি বিষয় পড়াশোনা করাটা ইসলাম প্রচার ও জ্ঞানচর্চা বিষয় হিসাবে গুরুত্বের দাবিদার।

আর্থিক উদ্যোগ গ্রহণ ও উপার্জিত সম্পত্তি লাভের অধিকার তথা ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারের নিরিখে ‘ব্যক্তি আগে, নাকি সমাজ আগে’– এই প্রশ্নের সমাধানের ওপর একটি দ্বিরুক্তিমূলক মন্তব্য করে আলোচনার এ পর্যায় শেষ করছি। ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের দু’টি হলো যাকাত ও হজ্ব। এগুলো প্রত্যক্ষভাবে সম্পত্তির ব্যক্তি মালিকানাকে নিশ্চিত করে। তা সত্ত্বেও ইসলামের কোনো অনুসারী কী করে একইসাথে সাম্যবাদেরও অনুসারী হতে পারে, তা আমার বুঝে আসে না। সাম্যবাদের গ্রহণযোগ্য ধারণাবলির কিছু কিছুর সাথে ইসলামের মিল আছে। অতএব, ইসলাম = সাম্যবাদ (communism)! এটি কি অদ্ভুদ সমীকরণ নয়? সাম্যের প্রকৃত তাৎপর্য যদি ইসলামেই থাকে এবং এর পাশাপাশি জরুরি আরো অনেক বিষয় ও সে সবের সর্বোৎকৃষ্ট সমাধানও যদি ইসলামেই থাকে, তাহলে সরাসরি ইসলাম অনুসরণে সমস্যা কী? সাম্যবাদ বা অন্য যে কোনো মতবাদের অনুসারীদের সাথে কৌশলগত ঐক্যের ধারণা; আর ইসলামের মতো করে ইসলামকে বুঝা, গণ্য করা ও অনুসরণের ধারণা– এই দু’টি আলাদা ব্যাপার নয় কি?

উল্লেখ্য, ইসলামী মতাদর্শ ব্যক্তি-মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়ে অধিক গুরুত্বারোপ করা সত্ত্বেও এটি পাশ্চাত্য ধরনে ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদের মতো অবাধ নয়। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়সহ নানাবিধ প্রাসঙ্গিক বিষয়ে ইসলাম ব্যক্তির অধিকারকে তত্ক্ষণ পর্যন্ত সংরক্ষণ করে, যতক্ষণ তা অন্যের অনুরূপ ব্যক্তি অধিকার ক্ষুণ্নের কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। একটি সুস্থ সমাজ গঠনে যুক্তিসঙ্গত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাগুলোকে ইসলামী শরীয়াহ সুসামঞ্জস্যভাবে স্থান দিয়েছে। ইসলামী শরীয়াহ’র সামঞ্জস্যশীল ও অখণ্ড বুঝ-জ্ঞানের মাধ্যমেই ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থাকে অনুধাবন সম্ভব।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক
সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় || পরিচালক, সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র
http://mozammelhoque.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *