ইউসুফ আল কারযাভীর দৃষ্টিতে মাওলানা মওদূদীর ইসলামী রাষ্ট্র প্রকল্প তথা হাকিমিয়্যাহ তত্ত্ব

এডিটর’স নোট: হাকিমিয়্যাহ’র ধারণা নিয়ে সমাজে অনেক ভুল বুঝাবুঝি প্রচলিত আছে। সাম্প্রতিককালে এমনই কিছু আলোচনা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তাই এই বিষয়ে ধারণা পেতে আগ্রহী পাঠকদের জন্য সমসাময়িক কালের অন্যতম প্রভাবশালী আলেম ড. ইউসুফ আল-কারযাভী লিখিত ‘সেক্যুলার ও ইসলামপন্থিদের বয়ানে ইসলাম ও রাজনীতি’ (الدين والسياسة: تأصيل ورد شبهات) বইয়ের সংশ্লিষ্ট অধ্যায় (পৃষ্ঠা: ২০২-২০৮) প্রকাশ করছি। বাংলায় বইটি গার্ডিয়ান প্রকাশনী কতৃক প্রকাশিত ও সাইয়েদ মাহমুদুল হাসান কতৃক অনুদিত।

*****

হাকিমিয়াতের প্রকৃত শরয়ি অর্থ হচ্ছে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বান্দার জন্য শরিয়াহ প্রণয়নের একচ্ছত্র ক্ষমতা রাখেন। তিনিই কেবল তাদের বিভিন্ন বিষয়ে আদেশ ও নিষেধ করতে পারেন। তিনিই হালাল ও হারামের সীমারেখা নির্ধারণ করেন।

অতএব, এ চিন্তা আল্লামা মওদুদী কিংবা সাইয়্যেদ কুতুবের নিজস্ব সৃষ্টি নয়; বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কাছে বিষয়টি পূর্ব থেকেই স্বীকৃত। এজন্য আলি (রা.) যখন খারেজিদের মন্তব্য শুনলেন, মৌলিকভাবে এ কথার ওপর কোনো আপত্তি তোলেননি। তিনি বরং এ মন্তব্যের পেছনে তাদের হীন উদ্দেশ্যকে নাকচ করেছিলেন। জবাবে তিনি বলেছিলেন—তাদের বক্তব্য সত্য, কিন্তু এর দ্বারা তারা ভুল ব্যাখ্যাকে উদ্দেশ্য করেছেন।

উসুল শাস্ত্রবিদগণ উসুলে ফিকহসংক্রান্ত তাদের কিতাবাদির শুরুতে এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। শরিয়ার বিধান, শরিয়াহপ্রণেতা, যার ওপর হুকুম আবর্তিত হবে এবং বান্দার যে আমল বিবেচনায় হুকুম দেওয়া হবে ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়ে হাকিমিয়াতের কনসেপ্টকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

আমরা এক্ষেত্রে উসুলবিদদের অন্যতম ইমাম, হুজ্জাতুল ইসলাম আবু হামিদ আল গাজালি (রহ.)-এর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে পারি। তিনি আল মুসতাশফা মিন ইলমিল উসুল নামক তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে হাকিমিয়াত প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন—‘উসুলের প্রথম অধ্যায় হচ্ছে আল হুকুম, যা দ্বারা মূলত শরিয়াহপ্রণেতার বক্তব্য ও নির্দেশনাকে উদ্দেশ্য করা হয়। তার বক্তব্য আসার পূর্বে তা কখনো হুকুম হতে পারে না। এজন্য হাকিমের সাথে তার মূল সংযোগ। আর তিনি হচ্ছে শরিয়াহপ্রণেতা। এ ছাড়াও বান্দা ও তার আমলের সাথে হুকুমের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।’[i] 

অতঃপর তিনি হাকিম বা বান্দার উদ্দেশ্য বিধান আরোপকারী মহান স্রষ্টার প্রসঙ্গে আলাপ আনেন। তিনি উল্লেখ করেন—বিধান প্রবর্তনের হক কেবল তাঁরই থাকে, যিনি তাদের সৃষ্টি করেন। অতএব, খালিক বা স্রষ্টা হিসেবে একমাত্র মহান আল্লাহই হাকিম বা বিধানদাতা হতে পারেন। আর নবি করিম (সা.)-এর পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা যদি দেওয়া হয় কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান, পিতা বা স্বামী যদি কোনো বিষয়ের আদেশ করেন, তবে তাদের আনুগত্য করা আল্লাহর নির্দেশনারই শামিল। কেননা, মহান আল্লাহই তাদের আনুগত্যের এ নির্দেশনা দিয়েছেন। যদি বিষয়টি তেমন না হতো, অর্থাৎ বিধান প্রবর্তনের অধিকার আল্লাহ ছাড়া অন্যদের দেওয়া হতো, তবে সকলেই অন্যের ওপর বিধান আরোপের প্রয়াস চালাত। অথচ মানুষের মধ্যে কেউ কারও ওপর শ্রেষ্ঠত্ব ও আধিপত্য বিস্তারের দাবি রাখে না। অতএব, আবশ্যক হচ্ছে কেবল মহান আল্লাহর আনুগত্য করা এবং যাদের আনুগত্যের বিষয়ে তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন, তাদের আনুগত্য করা।[ii]

আল্লামা মওদূদী ও সাইয়্যেদ কুতুব (রহ.) হাকিমিয়াত বা বিধান প্রবর্তনের একমাত্র হকদার হিসেবে মহান আল্লাহকে নির্ধারণ প্রসঙ্গে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার মানে এ নয়—তিনিই রাষ্ট্রের প্রধানকে নির্ধারণ করে দেবেন, যারা তাঁর নামে পৃথিবীতে শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। এ পরিভাষা দিয়ে বরং বোঝানো হচ্ছে, শরয়ি বিধান প্রবর্তনে মহান আল্লাহর একক সিদ্ধান্ত ও অধিকার।

আর রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের যে অধিকার, তা জনগণের ওপর বর্তাবে। তারাই তাদের শাসককে নির্বাচিত করবেন। একইভাবে রাষ্ট্রের বিচ্যুতিকে সংশোধন কিংবা সমালোচনার পূর্ণ অধিকারও তারা রাখেন। প্রয়োজনে ক্ষমতা থেকে তাকে অপসারণের বিষয়েও তারা ভূমিকা রাখতে পারেন।

এ দুটি ভিন্নতর অবস্থানকে আমাদের সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে। এ পার্থক্য সৃষ্টিতে আমরা যদি ব্যর্থ হই, তবে তা আমাদের বিচ্যুতির দিকে ঠেলে দেবে। অতএব, হাকিমিয়ার অর্থ কখনোই ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি নয়। আল্লামা মওদূদী ও সাইয়্যেদ কুতুব (রহ.) তাঁদের বক্তব্য দ্বারা এটিকে উদ্দেশ্য করেননি। যেমন, সাইয়্যেদ কুতুব (রহ.) তাঁর মাআলিম ফিত তারিক কিতাবে উল্লেখ করেন—এ জমিনে আল্লাহর রাজত্ব প্রতিষ্ঠা দ্বারা এটি উদ্দেশ্য নয় যে, হুকুমতের মসনদে কেবল ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরাই অধিষ্ঠিত হবেন, যেভাবে ইউরোপের পাদরিসমাজ দীর্ঘকাল শাসন পরিচালনা করেছেন। আবার এটিও উদ্দেশ্য নয়, তারা (ধর্মীয় শাসকগণ) স্রষ্টার নাম ভাঙিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্তগুলোকে সাধারণ মানুষের ওপর আরোপ করবেন। তৎকালীন ইউরোপে Theocracy কিংবা Divine Right of Kings-এর নামে আরোপ করা হতো। ইসলামি রাষ্ট্রে বরং আল্লাহর শরিয়াহই চূড়ান্ত ফয়সালা বলে বিবেচিত হবে। প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশনার দিকেই প্রত্যাবর্তন করা হবে।[iii]

আর মাওলানা মওদূদী (রহ.)-এর বিষয় হচ্ছে, কিছু মানুষ তাঁর বক্তব্যকে ভুল অনুধাবন করেন। তাঁর লেখনী থেকে এমন সব সিদ্ধান্তে তারা উপনীত হন, যা আদৌ তিনি উদ্দেশ্য করেননি। ফলে তাঁর সাথে চিন্তাগত দূরত্বের সৃষ্টি হয়। আর কারও অগণিত সাহিত্যভাণ্ডারের সবকিছুর সাথে ঐকমত্য সাধিত হওয়া সম্ভবও নয়। মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর বক্তব্যের ক্ষেত্রেও একই বিষয় ঘটেছে। তাঁদের বক্তব্যের মূল ব্যাখ্যাকে নানাভাবে অনুধাবন করা হয়েছে। শব্দচয়ন ও বাক্যবিন্যাসের উদ্দেশ্যের মাঝে সমন্বয় না করে ভিন্ন অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। স্রষ্টার বক্তব্য অনুধাবনে এমন ভুলের সৃষ্টি হলে মানুষের বক্তব্যে তা আরও স্বাভাবিক।

মাওলানা পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে আলোচনা টেনে উল্লেখ করেন—আপনি মনে করছেন, এ গণতন্ত্রের সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্কই নেই। অতএব, ইসলামের রাষ্ট্রনীতির ওপর গণতন্ত্র শব্দের প্রয়োগ কোনোভাবেই সমীচীন নয়। এর চেয়ে বরং Theocracy বা হুকুমতে ইলাহি শব্দকেই অধিক যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়।

তিনি এ চিন্তাকে কিছুটা সংশোধনপূর্বক উল্লেখ করেন, তবে ইউরোপিয়ান যে Theocracy পাশ্চাত্য ইতিহাসে চর্চিত হয়েছে, ইসলামিক Theocracy তথা হুকুমতে ইলাহিয়া তার সম্পূর্ণ বিপরীত পন্থা অবলম্বন করে। কেননা, ইউরোপের ধর্মীয় শাসনে এমন একটি পোপকেন্দ্রিক একনায়কতন্ত্র গড়ে উঠেছিল, যারা খোদার নামে নিজেরাই শরিয়াহ রচনা করতেন।[iv] প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং বিভিন্ন স্বার্থ হাসিলের মাধ্যম হিসেবে তারা নিজেদের সৃষ্ট আইনগুলো মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতেন। তারা মূলত নিজেদের ইলুহিয়াতকে জাহির করার প্রয়াস চালাতেন আসমানি অনুশাসনের ছদ্মাবরণে। অতএব, পাশ্চাত্যের এ শাসনব্যবস্থাকে ধর্মীয় শাসন না বলে শয়তানি হুকুমত বলাটাই অধিক যুক্তিযুক্ত।

আর ইসলাম যে Theocracy বা ধর্মীয় শাসনের কথা বলে, সেখানে আলিমসমাজ কিংবা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের একনায়কতন্ত্র চর্চার কোনো সুযোগ নেই। তারা চাইলেই নিজস্ব সিদ্ধান্তকে মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন না; বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার মুসলিম জনসাধারণের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। তারাই নিজেদের শাসককে মনোনীত করবেন এবং তার প্রতিটি কর্ম ও সিদ্ধান্তকে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনার আলোকে যাচাই-বাছাই করবেন।

ইসলামের এ পদ্ধতি অনুধাবনের সহজার্থে আমি নতুন একটি পরিভাষাকে ব্যবহার করতে চাই। তা হচ্ছে, Democratic Theocracy বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় শাসন। কেননা, এতে মুসলমানদের হাতে অসংখ্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র কিংবা দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিষয়ে সকলের মতামত এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এমনকি রাষ্ট্রপ্রধান অপসারণের বিষয়টিও জনগণের সমন্বিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। শরিয়ার সুস্পষ্ট ও অকাট্য নির্দেশনা নেই—এমন সকল বিষয়ে মুসলমানদের ইজমা বা সম্মিলিত মতামত কার্যকর রূপ লাভ করে। তবে জনসাধারণের মতামত কিংবা সিদ্ধান্ত অবশ্যই শরিয়াহ নির্দেশিত গণ্ডির আওতাভুক্ত হতে হবে।

যখনই কুরআন ও সুন্নাহর কোনো নসকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ কিংবা ইসলামি কোনো আইনকে সুস্পষ্টকরণের প্রয়োজন হবে, কেবল নির্দিষ্ট কোনো স্তর, গোত্র বা পরিবারের হাতেই তার একক নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়া হয় না। বরং মুসলিম জনসাধারণের যারাই ইজতিহাদের যোগ্যতা রাখেন, তারাই এর ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে পারবেন। এ সকল দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামি হুকুমতকে গণতান্ত্রিক বলা যেতে পারে।[v]

মাওলানা মওদূদী (রহ.)-এর সামগ্রিক লেখনী থেকে উক্ত সারনির্যাস প্রতীয়মান হয়। তবে তিনি ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে হুকুমতে ইলাহিয়া বা Theocracy পরিভাষা ব্যবহারের কারণে অনেকে সন্দিহান হয়েছেন। পাশ্চাত্যের Theocracy বা ধর্মীয় শাসনের সাথে ইসলামকে গুলিয়ে ফেলেছেন বলে অনেকে তির্যক মন্তব্য করেছেন। অথচ তিনি স্পষ্ট ভাষায় পোপতান্ত্রিক এ শাসনের কঠোর সমালোচনা করেছেন।

শরিয়াহ প্রণয়নের হাকিমিয়াত বা একচ্ছত্র হুকুমদাতা হবেন কেবল মহান আল্লাহ। সৃষ্টিজগতের কেউ এ যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না। হ্রাস-বৃদ্ধি কিংবা পরিবর্তন-পরিমার্জনের মাধ্যমে এতে কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারে না। আর এটাই হচ্ছে চূড়ান্ত হাকিমিয়াত, যা মহান আল্লাহর একক উলুহিয়াতের অন্যতম দলিল। হাকিমিয়াতের এ অর্থ দ্বারা এটি উদ্দেশ্য নয়—শরিয়ার হুকুম নির্ধারণে বান্দার কোনো ভূমিকা থাকবে না; অথচ মহান আল্লাহ তাদের সে অনুমতি দিয়েছেন। বরং সে অবস্থানকে নাকচ করা হয়েছে, যেখানে মানুষ আল্লাহর অনুমোদিত পন্থার তোয়াক্কা না করে স্বাধীন চিন্তায় শরিয়ার হুকুম সৃষ্টি করে; বিশেষ করে ধর্মচর্চার মৌলিক বিষয়াবলিতে। যেমন: ইবাদত পালনসংক্রান্ত বিষয়ে শরিয়াহ প্রণয়ন। নিজেদের মনগড়া নিত্যনতুন ইবাদত সৃষ্টির মাধ্যমে এ চর্চা হতে পারে।

তাছাড়া নির্ধারিত শরিয়ায় হ্রাস-বৃদ্ধির মাধ্যমেও আল্লাহর হাকিমিয়াতে হস্তক্ষেপ হতে পারে। সেটি বিধান পালনের সংখ্যা কিংবা ধরন উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিংবা বিধান পালনের সময়, স্থান ও প্রকৃতিতে পরিবর্তন সাধনের মাধ্যমে এর অপচর্চা হতে পারে। যেমন: হালাল-হারামের ক্ষেত্রে তা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। আল্লাহর নির্ধারিত হারাম বিষয়াবলিকে হালাল এবং হালালকে হারাম সাব্যস্ত করা। এ কাজে হস্তক্ষেপ করাকে রাসুল (সা.) রুবুবিয়াতের শিরক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মূলত আহলে কিতাবদের প্রসঙ্গে নাজিলকৃত নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি এমন মন্তব্য করেছেন—

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِن دُونِ اللَّهِ

‘তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের পণ্ডিত-পুরোহিতদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে।’ (সূরা তাওবা: ৩১)

যে সকল বিষয় সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ নস দ্বারা সাব্যস্ত, সেক্ষেত্রে ভিন্ন হুকুম আরোপ করা আল্লাহর হাকিমিয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক। যেমন: মুনকারাত বা ক্ষতিকর বিষয়গুলো আইনের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়া। সামাজিকভাবে অশ্লীলতার প্রচার-প্রসারে ভূমিকা পালন করা। আল্লাহর নির্ধারিত ফারায়েজ বা আবশ্যকীয় আমল পালনে বাধার সৃষ্টি করা। কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত ইসলামের হুদুদ বা ফৌজদারি দণ্ডবিধিকে বাতিল করা। অথচ এ সকল অকাট্য বিধানের অন্তর্গত, যেখানে হস্তক্ষেপের কোনো ইখতিয়ার মানুষকে দেওয়া হয়নি।

মৌলিক ও নির্ধারিত এ সকল বিধান ছাড়া বাকি বিষয়ে মুসলিম উম্মাহ নিজেদের প্রয়োজন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী বিধান নির্ধারণ করতে পারেন। এটি হচ্ছে মূলত ইজতিহাদের সে প্রশস্ত গণ্ডি, যেখানে মৌলিকভাবে কোনো নস পাওয়া যায় না। উম্মাহর ওপর রহমত ও ক্ষমার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে শরিয়াহপ্রণেতা এ বিষয়গুলোতে বিধান নির্ধারণে বিরত থেকেছেন। যেমনটা হাদিসে এসেছে—

مَا أَحَلَّ اللَّهُ فِي كِتَابِهِ فَهُوَ حَلَالٌ وَمَا حَرَّمَ فَهُوَ حَرَامٌ ، وَمَا سَكَتَ عَنهُ فَهُوَ عَفُوٌّ

‘আল্লাহ তায়ালা তার কিতাবে যা কিছু হালাল করেছেন, তা হালাল হিসেবে গণ্য। আর যা হারাম করেছেন, তা হারাম হিসেবে গণ্য। আর যেসবের ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করেছেন, তা ক্ষমাযোগ্য।’[vi]

এভাবে শরিয়াহপ্রণেতার অনুমতিসাপেক্ষে মুসলিম গবেষকগণ মানবজীবনের বৃহৎ অঙ্গনের নানা দিকের নীতিমালা নির্ধারণ করতে পারেন। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক নানাবিধ বিষয়ে সৃষ্ট সমকালীন পরিস্থিতি ও সংকটে সমাধান পেশ করতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই ইসলামি শরিয়ার মৌলিক মাকাসিদ ও সর্বজনীন উসুলকে তাদের বিবেচনায় রাখতে হবে, যা মূলত মানুষের সার্বিক কল্যাণসাধন ও অকল্যাণ দূরীকরণের উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রয়োজন পূরণকে এ সকল উসুল ও মাকাসিদে বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

বর্তমান সময়ে এমন অসংখ্য আইনকানুন প্রণীত হয়েছে, যা শরিয়ার মৌলিক মাকাসিদের সাথে সাংঘর্ষিক নয় কিংবা নির্দিষ্ট বিধান ও তার উদ্দেশ্যের সাথেও বিবোধপূর্ণ হয় না। তা বরং মানুষের কল্যাণসাধন, অকল্যাণ দূরীকরণ, জীবন পদ্ধতির সহজীকরণ ও সামাজিক বিভিন্ন ইতিবাচক রীতিনীতির সংরক্ষণে প্রণয়ন করা হয়েছে। যেমন: যাতায়াত ও গাড়ি চালনাসংক্রান্ত নীতিমালা, সমুদ্র ও আকাশপথে যান পরিচালনা ও রাডার সিস্টেম, শ্রম, স্বাস্থ্য, কৃষি ইত্যাদি বিষয়ের সার্বিক নীতিমালা। এভাবে মানবকল্যাণের প্রশস্ত জগতে নিজস্ব চিন্তা ও গবেষণার আলোকে কাজ করা যেতে পারে।[vii]

এছাড়া ইসলামের মুবাহ বা বৈধতার গণ্ডিতে সাময়িকভাবে বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। রাষ্ট্র ও দেশের সার্বিক প্রয়োজন বিবেচনায় রাষ্ট্রপ্রধান আলিমদের পরামর্শে এ বিধান আরোপ করবেন। যেমন, উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) পশু জবেহ করাকে কিছুদিনের জন্য নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিছু সাহাবিকে তিনি আহলে কিতাব নারীদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে বারণ করেছিলেন, যেন তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা সংকটের মুখে আপতিত না হয়। আর মুসলিম নারীদের ওপরও যেন তা বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি না করে।

মাওলানা মওদূদী (রহ.) হাকিমিয়াতের বিষয়ে সবচেয়ে জোরালো আওয়াজ তুলেছেন। তবে তিনি এটি সুস্পষ্ট করেছেন—ইসলামের কাতয়িয়াত বা অকাট্য বিষয়গুলো, সাওয়াবিত বা সাব্যস্তকৃত বিধানগুলো এবং হুদুদ বা নির্ধারিত দণ্ডবিধি ছাড়া বাকি বিশাল ও প্রশস্ত অঙ্গনে মানুষ নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে। আর এটি প্রণীত হবে কুরআন ও সুন্নাহর নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, কিয়াস, ইসতিহসান ও ইজতিহাদের মাধ্যমে।[viii]

[মূল: ইউসুফ আল-কারযাভী, অনুবাদ: সাইয়েদ মাহমুদুল হাসান]

নোট ও রেফারেন্স:

[i] আল মুসতাশফা, দারুস সাদির বৈরুত থেকে প্রকাশিত, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ০৮

[ii] আল মুসতাশফা, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮৩

[iii] মাআলিম ফিত তারিক, সাইয়েদ কুতুব, দারুশ শুরুক, কায়রো, পৃষ্ঠা: ৬০

[iv] তৎকালীন পোপতান্ত্রিক খ্রিষ্টবাদের মাঝে শরিয়ার কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। ঈসা মাসিহের নামে প্রচলিত কিছু নসিহতনামা কেবল তখন প্রচলিত ছিল। এ সুযোগে ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গ নিজেদের ইচ্ছানুসারে শরিয়াহ রচনা করতেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত বলে তা সমাজের মানুষের মাঝে চালিয়ে দিতেন। যেমনটা আল কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে—‘অতএব, তাদের জন্য আফসোস! যারা নিজ হাতে গ্রন্থ রচনা করে এবং বলে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।’ সূরা বাকারা: ৭৯

[v] পড়ুন, নাজারিয়াতুল ইসলাম ওয়া হাদইয়ুহু ফিস সিয়াসাতি ওয়াল কানুনি ওয়াদ দাসতুর, আবুল আলা মওদূদী, দারুল ফিকির, পৃষ্ঠা: ৩৪-৩৬

[vi] সুনানে দারাকুতনি: ২/১৩৭

[vii] পড়ুন, আমার লিখিত গ্রন্থ আল হাল্লুল ইসলামি ফারিদাহ ওয়া দারুরাহ, মাকতাবাতুল ওয়াহবা, কায়রো, পৃষ্ঠা: ৮৬

[viii] পড়ুন, নাজারিয়াতুল ইসলাম ওয়া হাদইয়ুহু ফিস সিয়াসাতি ওয়াল কানুনি ওয়াদ দাসতুর, পৃষ্ঠা: ১৭১

এ ধরনের আরো লেখা