রবিবার, নভেম্বর ১৯, ২০১৭
হোম > সমসাময়িক > তিউনিশিয়ায় ইসলামপন্থীদের মতাদর্শিক সমঝোতা (পর্ব-১)

তিউনিশিয়ায় ইসলামপন্থীদের মতাদর্শিক সমঝোতা (পর্ব-১)

এডিটরস নোট:

বিশ্বব্যাপী ইসলামপন্থা একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশনের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাদি হামিদ তার Islamic Exceptionalism: How the Struggle Over Islam Is Reshaping the World শীর্ষক বইয়ে এই পরিবর্তনের একটি চিত্র এঁকেছেন। Tunisia: Islamists Conceding Their Islamism শিরোনামে বইটিতে একটি চ্যাপ্টার রয়েছে। তিউনিশিয়ার রাজনীতি, বিশেষত সেখানকার ইসলামপন্থীদের কর্মকৌশল বোঝাপড়ার একটা চেষ্টা আমরা করে যাচ্ছি। এরই অংশ হিসেবে সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য এই চ্যাপ্টারটির ধারাবাহিক অনুবাদ করছেন মাসউদুল আলম। আজ ছাপা হলো প্রথম পর্ব।


দ্বিতীয় পর্ব | তৃতীয় পর্ব | শেষ পর্ব


রাষ্ট্র নিয়ে ইসলামপন্থীদের মধ্যে এক ধরনের অবশেসন রয়েছে। এ কারণে মিশরে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। এর ফলে তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। নিজেদের কর্মী তো বটেই, আরব অঞ্চলের ব্রাদারহুড ঘরানার অন্যান্য সংগঠনের আপত্তি সত্ত্বেও মুসলিম ব্রাদারহুড প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়। যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জটিল রাষ্ট্রগুলোর একটি পরিচালনার দায়িত্ব গত শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসলামপন্থী সংগঠনটির কাঁধে এসে পড়ে।

যে আন্দোলনটি এক ধরনের নীতি-নৈতিকতা মেনে চলার চেষ্টা করতো, এই সিদ্ধান্তটি সে আন্দোলনকে এক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। তাদের নীতিগত অবস্থান হলো, ইসলামের স্বার্থকে দল ও রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে বিবেচনা করতে হবে। ইসলামপন্থীরা প্রায়ই বলে থাকেন, তারা নিজেদের স্বার্থে ক্ষমতায় যাওয়ার পরোয়া করেন না। বরং তারা যে আদর্শের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, সেটাই তাদের নিকট গুরুত্বপূর্ণ। অন্য কেউ যদি এই চিন্তাধারা বাস্তবায়নে অগ্রসর হয় তাহলে তারা সর্বোতভাবে তাদেরকে সমর্থন করবে। (অথচ এখন, ক্ষমতা ও পদের প্রতি আগ্রহ খুব সহজেই ব্রাদারহুড আন্দোলনে একটি কলঙ্কতিলক এঁকে দিলো। তারা বলতো, পদ চাওয়া একটা নিন্দনীয় কাজ। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরাই কাউকে মনোনীত করবে।)

সমাজে যা ঘটে তার প্রতিফলনই কোনো না কোনোভাবে রাষ্ট্রে ঘটে। রাষ্ট্র সমাজের উপর নির্ভরশীল। কারা ক্ষমতায় যাবে এবং কীভাবে ক্ষমতা পরিচালনা করবে– এটি নির্ভর করে সমাজের দীর্ঘ ও ক্রমাগত পরিবর্তনের চূড়ান্ত ফলাফলের উপর। তাই, তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রেসিডেন্ট পদ গ্রহণ করা খুব আর্জেন্ট ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল না বলেই মনে হয়। ক্ষমতার জন্য এই বেপরোয়া ভাব দেখানো এক দৃষ্টিতে ব্রাদারহুডের প্রকৃত প্রস্তাবনার (পরিবর্তন শুরু করতে হবে ব্যক্তি থেকে) বিপরীত ধারণাকেই গ্রহণ করার নামান্তর। মনে হচ্ছে, ব্রাদারহুড যেন গোড়া থেকে পরিবর্তনের (bottom-up transformation) যে সম্ভাবনা, তার উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে।

তুরস্কে এরদোয়ান ও একেপি যেভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, তা উঠতি ইসলামী প্রজন্মের কাছে কাজের ধরন হিসেবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।[1] অবশ্য ‘আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার’ মধ্যে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। কারণ, এতে মসজিদ, পরিবার ও কমিউনিটির জন্য নির্ধারিত দায়িত্বগুলো রাষ্ট্র কর্তৃক গ্রহণ করার একটা আশংকা থাকে। একটি বিশেষ দলের সাথে এ ধরনের নিছক ধর্মীয় তৎপরতার সংশ্লিষ্টতা ঝুঁকিপূর্ণ। রাজনীতিতে ইসলামের ভূমিকা কিংবা নিছক ধর্মীয় ব্যাপারগুলোর ভূমিকা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার জন্য কাজ করা যদি একটি নির্দিষ্ট দলের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়ে, তাহলে ধার্মিকদের ধর্মভীরুতার উপর দলটির রাজনৈতিক ব্যর্থতা এবং ভুল পলিসির নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়কারী মুসলমানদের ৭৪ শতাংশ ২০১৪ সালে এরদোয়ানকে সমর্থন দিয়েছিল। ২০১০ সালে তা ছিল ৬৭ শতাংশ।[2] ২০১৫ সালের জুনের নির্বাচনে একেপির রক্ষণশীল ভিত আরো বৃদ্ধি পেলেও তা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের মতো যথেষ্ট বাড়েনি। সামগ্রিকভাবে বরং দলটির জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছে। যতদিন পর্যন্ত ইসলামপন্থীরা সাফল্যের দেখা পেয়েছে, ততদিন পর্যন্ত চিন্তার কিছু ছিল না। কারণ, একেপির শাসনামলে মাথাপিছু জিডিপি বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে এবং ১০ বছরের মধ্যে গড় জিডিপি বেড়ে প্রায় তিনগুণ হয়েছে। সুশাসন ও জীবনমানের উন্নতির সাথে তুর্কি ইসলামপন্থীদের নাম যুক্ত হয়ে পড়েছে।[3] কিন্তু তাদের নাম যদি রাজনৈতিক বিভেদ, সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ এবং একটি নিম্নমুখী অর্থনীতির সাথে জড়িয়ে যায়, তাহলে এর পরিণতি কী?

এরদোয়ানের স্বৈরাচারী আচরণের কারণে ‘ইসলামপন্থার প্রথম বড় ধরনের সম্ভাবনা’ একেপির পতন ঘটলে তিউনিশিয়ার ইসলামপন্থীরা ‘ইসলামপন্থার পরবর্তী বড় ধরনের সম্ভাবনা’ হিসেবে বিবেচিত হবে। স্বৈরাচারী শাসন ও গৃহযুদ্ধের উপর বিতৃষ্ণ আরব অঞ্চলের মানুষের নিকট তিউনিশিয়া একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ হয়ে ওঠেছে। যার ফলে তিউনিশিয়ার প্রধান ইসলামী দল আন নাহদার (যার অর্থ হচ্ছে ‘রেনেসাঁ’) সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতার কারণে গণমানুষের প্রত্যাশা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

দ্যা গ্রেট ইসলামিস্ট হোপ

আন নাহদার সম্ভাবনা সহজেই অনুমেয়। আরব অঞ্চলের অন্যান্য ইসলামপন্থী দলে তরুণ সদস্যদের যেখানে প্রতিনিয়ত টিকে থাকার সংগ্রাম করতে হয়, আন নাহদা সেখানে নতুন প্রজন্মের নেতাকর্মীদের গড়ে তুলছে। যাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও বক্তব্য বয়স্কদের চেয়ে ভিন্ন।

ইংরেজি ও ফরাসী ভাষায় পারদর্শী, মাত্র আটাশ বছরের তরুণী  সাইয়েদা ওয়ানিসি তিউনিশিয়ার তরুণ সংসদ সদস্যদের অন্যতম। তার বাবা আন নাহদার সদস্য ছিলেন। সরকারের নির্যাতনের মুখে তিনি পরিবারসহ প্যারিসের উদ্দেশ্যে তিউনিশিয়া ত্যগ করেন। তখন ওয়ানিসির বয়স ছিল মাত্র নয় বছর।[4] প্যারিসের প্রবাস জীবনে তিনি বেড়ে ওঠেন। একজন ফিলিস্তিনী-আমেরিকান বিশেষজ্ঞের বাসায় ২০১৫ সালের শুরুর দিকের এক সকালে জম্পেশ নাস্তা শেষে কফি পান করতে করতে তার সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তার পরনে ছিল ফ্যাশনেবল হেডস্কার্ফ। রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের ব্যবহার অর্থাৎ কোরআন-হাদীসের বক্তব্য অতিরঞ্জিত করে নেতৃবৃন্দ যেসব রাজনৈতিক বক্তব্য দিতো আন নাহদা কিছুদিন আগে তা ‘পরিত্যাগ’ করেছে, যদিও সেক্যুলার দলগুলো রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে। ওয়ানিসি এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। তবে নিজ পরিচয় সম্পর্কে তিনি সচেতন। বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথাবার্তা বলে তিনি আলোচনাকে ভারাক্রান্ত করার প্রয়োজন মনে করেননি। কিন্তু তার নিজের ব্যাপারে বড় সমস্যা হলো– সরাসরি নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা যার রয়েছে, তেমন ব্যক্তির মনে সেই কালো দিনগুলো ফিরে আসার যে আশংকা সবসময় কাজ করে, তেমন অভিজ্ঞতা তার নেই।

ধর্মকে ‘ব্যবহার’ করলে সাময়িকভাবে হয়তো লাভবান হওয়া যায়, কিন্তু এটা খুব সহজে বুমেরাংও হতে পারে। তিনি বলছিলেন, “আমরা, অর্থাৎ আন নাহদার তৎপরতা যদি কাউকে কখনো হতাশও করে, তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে নামাজ ছেড়ে দেয়াটা কারো জন্য প্রাসঙ্গিক বিবেচিত হবে না। যদি কোনো দিন আমরা জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলি, এমনকি ১০ শতাংশের বেশি ভোট নাও পাই; আমরা চাই, তেমন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও মসজিদগুলো যেন আক্রান্ত না হয়, হিজাব পরিহিত নারীরা রাস্তায় বেরিয়ে যেন বিপদে না পড়ে।”[5]

অন্যান্য ইসলামপন্থী দলগুলোর মতো আন নাহদাও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলকেই একমাত্র কৌশল মনে করতো। কিন্তু ২০১১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৩ সালের শেষ পর্যন্ত দুটি সেক্যুলার দলের সাথে কোয়ালিশন করে স্বল্প সময়ের জন্য ক্ষমতায় থাকার অভিজ্ঞতা ছিল আন নাহদার জন্য খুবই চ্যালেঞ্জিং ও সংকটপূর্ণ, যা তাদের অতীত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সাথে খাপ খায় না। বেন আলী ক্ষমতায় এসে সংগঠনটিকে ক্রমান্বয়ে নিঃশেষ করে দিয়েছিলেন। ফলে নব্বই পরবর্তী এক দশকে আন নাহদার কার্যকর কোনো অস্তিত্ব ছিলই না বলা যায়। দলের নেতৃবৃন্দকে জেলে পুরে রাখা হয়েছিল। অনেকে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইটালিতে নির্বাসিত জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছিল। আরব বসন্তের প্রথম ধাক্কাতেই বেন আলীর পতন ঘটে। তারপর দেশটির প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে আন নাহদা জয়লাভ করে। দল থেকে একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দলটির এই ক্ষমতা লাভকে আকস্মিক ঘটনাই বলা চলে। তবে পেছনে ফিরে তাকালে বুঝা যায়, তারা কিছু কৃতিত্বের দাবি করতেই পারে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে সেক্যুলারদের সাথে ইসলামপন্থীদের ক্ষমতা ভাগাভাগি করা সম্ভব। তিউনিশিয়ার বেশিরভাগ প্রতিবেশী দেশের ক্ষেত্রে যা কল্পনাও যায় না। তবে সম্ভবত তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হচ্ছে, ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে বৃহত্তর ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে তুলনামূলকভাবে উদার একটি সংবিধান পাশ করানো।

তারপরেও দলটি যে কোনো সময় ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। ২০১৩ সালে তা প্রায় হয়েও গিয়েছিল। দুজন বিশিষ্ট বামপন্থী নেতা আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পর তিউনিশিয়ায় নজিরবিহীন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হয়। পপুলার ফ্রন্টের মতো বামপন্থী দলগুলো অভিযোগ করে, এই হত্যাকাণ্ডের জন্য আন নাহদা পরোক্ষভাবে দায়ী। তাদের যুক্তি হলো, আন নাহদাই চরমপন্থীদেরকে তৎপরতা চালানোর সুযোগ করে দিয়েছে।[6] এই পরিস্থিতিতে তিউনিশিয়ার ইসলামপন্থীদের মধ্যে আবারো নির্যাতনের যুগ ফিরে আসার ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে মিশরে সেনা অভ্যুত্থানের ফলে এই ভীতি আরো বেড়ে যায়। বহু কষ্টে অর্জিত গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়াকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আন নাহদার নেতৃবৃন্দ যে কোনো ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিকে এড়িয়ে চলতে থাকেন। অধিকাংশ বিরোধী সেক্যুলার দল দাবি করতে থাকে– হয় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সংবিধান সভা ভেঙ্গে দিতে  হবে, নয়তো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ভেঙ্গে দিতে হবে। না হলে উভয়টিই ভেঙ্গে দিতে হবে। ঠিক যেন মিশরের ঘটনার প্রতিধ্বনি! বিরোধী পক্ষগুলো পরোক্ষভাবে আন নাহদাকেই সরিয়ে দিতে চাচ্ছিল। মুরসির পতনের লক্ষ্যে মিশরে সংঘটিত তামাররুদ (বিদ্রোহ) আন্দোলনের পর তিউনিশিয়ায়ও একইভাবে তামাররুদ আন্দোলন শুরু হয়। মিশরের ‘ন্যাশনাল স্যালভেশন ফ্রন্ট’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিউনিশিয়ার ‘স্যালভেশন ফ্রন্ট’ আন নাহদা সরকারের নিয়োগকৃত স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অপসারণের লক্ষ্যে আন্দোলনের ডাক দেয়।[7]

ইসলামপন্থীরা নির্বাচনে জিতে এলেও তাদেরকে কখনোই সরকার চালাতে দেয়া হবে না– আন নাহদার এই আশংকা যে সঠিক, মিশরের পরিণতি থেকে তা নিশ্চিত হওয়া যায়।[8] ২০১৫ সালের শুরুর দিকে আন নাহদার নেতা ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা রশিদ ঘানুশীর সাথে যখন কথা বলছিলাম, ততদিনে মিশরের ঘটনা ম্রিয়মান হয়ে গেছে। কিন্তু তার কাছে মিশরের ক্যু যেন তখনো খুব তাজা ছিল। তিনি বলছিলেন, মিশরের ফলাফল দেখে “এখানেও বিরোধীরা উচ্চাকাঙ্খী হয়ে উঠলো এবং ক্ষমতাসীনদেরকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে লাগলো…। এমনকি মিশরের মতো একই নামে তারা নিজেদেরকে অভিহিত করলো!”[9]

আমার ধারণা ছিল, আমার মতো পশ্চিমা দেশে বসবাসকারী গবেষকের সাথে কথা বলার সময় আন নাহদার কর্তাব্যক্তিরা গণতন্ত্রের প্রতি নিজেদের মহানুভবতা দেখাতে সচেষ্ট থাকবেন। কিন্তু আন নাহদার বেশিরভাগ নেতা তাদের সহযোগী আরব ইসলামপন্থীদের পতনের ব্যাপারে স্পষ্টতই আবেগতাড়িত ও ব্যক্তিগত মন্তব্য করেছেন। সংবিধান সভার ভাইস প্রেসিডেন্ট মেহেরজিয়া লাবিদী বলেন, “রাবেয়া স্কয়ারের ঘটনায় আমি ক্ষুব্ধ হয়েছি। ISIS-এর লোকেরা যে অমানবিক তাতে সন্দেহ  নেই, কিন্তু মিশরে স্বয়ং রাষ্ট্রই বর্বর হয়ে উঠেছে। মিশরীয় সংঘাতের এই নিষ্ঠুরতা তিউনিশিয়াতেও বিশাল ধ্বংসাত্মক শক্তি হয়ে ওঠার আশংকা  ছিল। কিন্তু তিউনিশিয়ার কেউই এটি চায়নি। তাই রাজনীতিবিদরা সংলাপের জন্য আলোচনার টেবিলে বসেছেন।[10] এবার আন নাহদার সংসদ সদস্য ত্রিশ বছর বয়সী তরুণী ইমান বেন মোহাম্মদের কথা বলা যাক। তিনি বলেছেন, “মিশরের ঘটনার জন্য আমরা মর্মাহত। তবে আমাদের সমর্থকদেরকে কনভিন্স করার জন্য এই ঘটনা ইতিবাচক হয়েছে বলা যায়। তারা দেখেছে, অতি উৎসাহী কর্মকাণ্ড থেকে ব্রাদারহুড সাময়িকভাবে লাভবান হলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত  হয়েছে। অথচ গণতন্ত্র থাকার উপরেই নির্ভর করছে আপনার রাজনৈতিক অস্তিত্ব।[11]

সমঝোতার মাধ্যমে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ায় হয়তো আন নাহদার পতন ঘটতে পারতো। তিউনিশিয়ার প্রেক্ষাপট তেমনই বলে। তারপরও এত বড় ঝুঁকি নেয়ায় এর কৃতিত্ব দলটির প্রাপ্য। সবচেয়ে বড় কথা হলো, যে কোনো ধরনের খারাপ পরিস্থিতিকে তারা এড়াতে পেরেছে। ‘স্বাভাবিক’ গণতান্ত্রিক পরিবেশেও এতটা আশা করা যায় না। অথচ আন নাহদা কিন্তু একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছিল। সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি হিসেবে বিরোধী পক্ষ সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামাতে চাইলে অনাস্থা ভোট আয়োজনের চেষ্টা করতে পারতো। সেক্ষেত্রে আন নাহদার দায়িত্ব ছিল জনগণের এ ধরনের কোনো ইচ্ছা থাকলে, তা ব্যক্ত করার সুযোগ দেয়ার জন্য আগাম নির্বাচনের আয়োজন করা। কিন্তু সেখানে এসব কিছুই ঘটেনি। একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েও সেক্যুলাররা তা কাজে  লাগাতে মোটেও রাজি ছিল না। ফলে আন নাহদা ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, অন্যসব অগ্রগতি সত্ত্বেও অতীতে তো বটেই, এমনকি বর্তমানেও তিউনিশিয়া একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন পর্যন্ত ‘স্বাভাবিক’ হয়ে ওঠেনি। তাই আন নাহদার মতো ধর্মভিত্তিক দলকে বিকল্প কৌশল অবলম্বন করে চলতে হচ্ছে। এই জটিল পরিস্থিতিকে সাইয়েদা ওয়ানিসি তুলনা করেছেন পরস্পরের প্রতি প্রচণ্ড গতিতে ধাবমান দুটি হাই-স্পিড ট্রেনের সাথে। বলাবাহুল্য, ট্রেন দুটি হচ্ছে অনমনীয় সেক্যুলার ও ইসলামপন্থী পক্ষ। ফলে এক পক্ষকে নিরাপদ পথ বেছে নিতে হয়েছিল। ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত তাদের ছাড় দেওয়া অব্যাহত  রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে দেশটির সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে সুসংগঠিত দল আন নাহদা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এমনকি অন্য কোনো প্রার্থীকেও তারা সমর্থন দেয়নি। তারপর ২০১৪ সালে সংসদ নির্বাচনের সময় একটি অদ্ভূত দৃশ্য দেখা গেলো– পরাজিত দল নিজেদের পরাজয়কে উদযাপন করছে! অবশ্য ইসলামপন্থী দলগুলোর ‘ইচ্ছাকৃত পরাজয়ের’ ব্যাপারটি আরব বসন্তের আগে থেকেই খুব অস্বাভাবিক কিছু ছিল না।[12] আন নাহদার একজন জ্যেষ্ঠ নেতার উচ্ছ্বাস ছিল এ রকম– আমরা ভারমুক্ত হয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ।[13]

তবে এই ঘটনার পর ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেক্যুলার নিদা তিউনেসের সাথে কোয়ালিশন সরকারে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্তটি ‘দৃষ্টিকটু’ ছিল। ওয়ানিসি অবশ্য ব্যাপারটা স্বীকার করে নিয়ে বলেছেন, আমার মতো আমেরিকানের জন্য নাকি ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পারা কিছুটা কঠিন। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানরা কখনোই একসাথে একই সরকারে থাকতে চাইবে না– তার এই ব্যাখ্যা সম্ভবত ঠিকই আছে। কিন্তু এর ফলে আবারো প্রশ্ন ওঠে, আন নাহদা কেন এমন কিছু করতে গেলো, কোনো ‘স্বাভাবিক’ গণতান্ত্রিক দল যা করবে না? ২০১৪ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে সংসদীয় আসনের ৩১ শতাংশ সিট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও একুশটি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে মাত্র একটি (তাও সেটি হলো তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়) এবং তিনটি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পদের বিনিময়ে আন নাহদা সমঝোতা করেছে। আপনি যদি সরকারে অংশগ্রহণ করতেই চান, তাহলে কেন মাত্র একটি ক্যাবিনেট পদ নিলেন? একা একজন মন্ত্রীর হয়তো প্রতীকী তাৎপর্য আছে, কিন্তু এটি পরিস্কারভাবে প্রমাণ করে দিয়েছে: আন নাহদা তথা ইসলামপন্থীদেরকে অভ্যন্তরীণভাবে কোনঠাসা করা যতটা কঠিন, বাইরে ততটা নয়।

এ ব্যাপারে তৃণমূল পর্যায়ে অসন্তুষ্টি থাকলেও আন নাহদার নেতারা বিশ্বাস করেন– এটাই হলো একমাত্র অনুসরণীয় পন্থা। তাদের এই বিশ্বাস ঈমানের প্রায় কাছাকাছি। এমনই একজন নেতা হলেন সাঈদ ফারজানী। ভূতপূর্ব প্রখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনি শাদীদ ২০১২ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তার ব্যাপারে আলোকপাত করেছিলেন। প্রথম দিকে ফারজানী ছিলেন কিছুটা কট্টরপন্থী। তিউনিশিয়ার ‘জাতির জনক’ হাবিব বুরগিবার বিরুদ্ধে তিনি তখন একটা অভ্যুত্থান প্রায় করে ফেলেছিলেন। কিন্তু বুরগিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বেন আলী অকল্পনীয়ভাবে ফারজানী ও তার সহযোগীদের ডিঙ্গিয়ে, তাদের সতের ঘণ্টা আগেই অভ্যুত্থান করে ক্ষমতায় চলে আসেন। পরে ফারজানী গ্রেফতার হন। তাকে অকথ্য নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনে তার মেরুদণ্ড ভেঙ্গে যায়।[14]

অ্যান্থনি শাদীদের সাথে সাক্ষাৎকারে ফারজানী ১৯৭০-এর দশকে রশিদ ঘানুশীর সাথে তার পড়ালেখার কথা স্মরণ করছিলেন। ফারজানী বলছিলেন, “আমরা মুসলমানরা কেন পিছিয়ে আছি? এর অন্তর্নিহিত কারণ কী? এটাই কি আমাদের নিয়তি? ঘানুশী সবসময় এ জাতীয় বিশ্ব পরিস্থিতি ও রাজনীতি নিয়ে কথা বলতেন।”[15] আধুনিক ইসলামপন্থীদের মধ্যে বহু আগে থেকেই এই প্রশ্নগুলো ছিল। আন নাহদার নেতৃবৃন্দের ধারণা ছিল, তারা নিজেরা এই প্রশ্নগুলোর এক ধরনের সমাধান দিতে পারবেন। যদিও ইতোমধ্যে তাদের কর্মপদ্ধতিতে যথেষ্ট পরিবর্তন এসেছে। কোয়ালিটি অর্জন করাটা দীর্ঘমেয়াদী ব্যাপার। যা হোক, ২০১৪ সালের নির্বাচনের হতাশাজনক সমাপ্তির পর আন নাহদার গৃহীত কৌশলের  কার্যকারিতা নিয়ে আমি ফারজানীকে প্রশ্ন করলে তিনি এক ধরনের সমঝোতার কথা স্বীকার করে নিয়ে বললেন, “সরকারে অংশগ্রহণ এবং একটি মন্ত্রী পদ গ্রহণ করার ফলে কিছুটা জনপ্রিয়তা যে হারাতে যাচ্ছি, তা আমরা জানি।[16] তিনি জোর দিয়ে বলছিলেন, “এটা এক ধরনের অন্তবর্তী সময়।” এই অবস্থা থেকে উত্তরণে পনের থেকে বিশ বছর সময় লেগে যেতে পারে। তার মতে, তারপরই কেবল আন নাহদার কাজকর্ম নিয়ে এ ধরনের প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। তিনি বার বার এ জাতীয় কথাগুলোই বলছিলেন। এখন অন্যরকম একটা সময় চলছে। এই সময়ের লক্ষ্য হলো পরিবর্তন প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা, ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা এবং মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা। এতে করে দলীয় ঐক্যকে কম গুরুত্ব প্রদান কিংবা অস্থিরমনা সমর্থকদের বিরক্তি বেড়ে গেলেও এই কাজগুলো করতে হবে।


দ্বিতীয় পর্ব | তৃতীয় পর্ব |


রেফারেন্স ও নোট:

[1] Alexander Christie-Miller, “Erdogan Launches Sunni Islamist Revival in Turkish Schools,” Newsweek, December 16, 2014,

http://www.newsweek.com/2014/12/26/erdogan-launches-sunni-islamist-revival-turkish-schools-292237.html.

[2] “Turks Divided on Erdogan and the Country’s Direction,” Pew Research Center, July 30, 2014,

http://www.pewglobal.org/2014/07/30/turks-divided-on-erdogan-and-the-countrys-direction/; “Turks Downbeat about Their Institutions,” Pew Research Center, September 7, 2010, http://www.pewresearch.org/2010/09/07/turks-downbeat-about-theirinstitutions/.

[3] “World Data Bank: World Development Indicators,” World Bank, http://databank.worldbank.org/data/views/reports/tableview.aspx.

[4] প্রকৃতপক্ষে ওয়ানিসির বয়স তখন ছিল ছয় বছর। লেখক সম্ভবত ভুলবশত নয় বছর উল্লেখ করেছেন। – অনুবাদক

[5] লেখকের সাথে আলাপচারিতা, সাইয়েদা ওয়ানিসি, ফেব্রুয়ারি ৬, ২০১৫।

[6] Monica Marks, “Tunisia Opts for an Inclusive New Government,” Washington Post, February 3, 2015,

http://www.washingtonpost.com/blogs/monkey-cage/wp/2015/02/03/tunisia-opts-for-an-inclusive-new-government/.

[7] Nissaf Slama, “‘Irhal’ Campaign Attempts to Oust Ennahda Officials,” Tunisia Live, August 14, 2013, http://www.tunisialive.net/2013/08/14/erhal-campaignattempts-to-oust-enahdha-officials/.

[8] মিশরীয় সামরিক ক্যুর পর আন নাহদার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আরো জানতে দেখুন Monica Marks, “Tunisia’s Ennahda: Rethinking Islamism in the Context of ISIS and the Egyptian Coup,” working paper, Brookings Institution, Rethinking Political Islam series, August 2015, http://www.brookings.edu/~/media/Research/Files/Reports/2015/ 07/rethinking-political-islam/Final-WorkingPapers/Tunisia_Marks_FINALv.pdf?la=en.

[9] লেখকের সাথে আলাপচারিতা, রশিদ ঘানুশী, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৫।

[10] লেখকের সাথে আলাপচারিতা, মেহেরজিয়া লাবিদী, ফেব্রুয়ারি ৬, ২০১৫।

[11] লেখকের সাথে আলাপচারিতা, ইমান বেন মোহাম্মদ, ফেব্রুয়ারি ৯, ২০১৫।

[12] দেখুন, Shadi Hamid, “Arab Islamist Parties: Losing on Purpose?” Journal of Democracy 22 (2011), pp. 68–80.

[13] লেখকের সাথে আলাপচারিতা, আন নাহদার একজন জেষ্ঠ্য কর্মকর্তা, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৫।

[14] Anthony Shadid, “Islamists’ Ideas on Democracy and Faith Face Test in Tunisia,” New York Times, February 17, 2012, http://www.nytimes.com/2012/02/18/world/africa/tunisia-islamists-test-ideas-decades-in-the-making.html.

[15] Ibid.

[16] লেখকের সাথে আলাপচারিতা, সাঈদ ফারজানী, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৫।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *