রবিবার, নভেম্বর ১৯, ২০১৭
হোম > সমসাময়িক > তিউনিশিয়ার স্বপ্ন

তিউনিশিয়ার স্বপ্ন আন নাহদার দশম বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে ঘানুশীর বক্তব্য

এডিটরস নোট

২০১১ সালে আরব বসন্তের সূচনা হয়েছিল তিউনিশিয়ায়। বিপ্লবোত্তর তিউনিশিয়ার প্রথম সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিল ইসলামপন্থী আননাহদা। তিউনিশিয়ার গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও রাজনৈতিক সহাবস্থানমূলক পরিবেশ তৈরিতে দলটির অগ্রগণ্য ভূমিকা রয়েছে। গত ২১-২৫ মে পাঁচ দিনব্যাপী আননাহদার দশম কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এই কনফারেন্সে ধর্ম ও রাজনীতির পৃথকীকরণ, রাজনৈতিক ইসলামের পরিচয় ত্যাগ করে মুসলিম গণতন্ত্রী পরিচয় ধারণসহ এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আননাহদা গ্রহণ করে, যা বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়। সেই প্রেক্ষিতে সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে দলটির প্রেসিডেন্ট রশিদ ঘানুশীর ভাষণটি গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ভাষণটি বিপ্লবোত্তর একটি দেশের ঐক্য ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা ও দিকনির্দেশনার নজিরও তৈরি করেছে। এসব বিবেচনায় সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য ঘানুশীর ভাষণটির সংক্ষিপ্ত ও পরিমার্জিত অনুবাদ প্রকাশ করা হলো।



আননাহদা চরমপন্থীদের বিপক্ষে
আমরা চরমপন্থী ISIS ও ‘তাকফিরি’দের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের চলমান লড়াইয়ের পক্ষে আননাহদার পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছি। তিউনিশিয়ার জনগণ অনেক ত্যাগস্বীকার করেছে। যার কারণে ঘৃণা-বিদ্বেষের চেয়ে জনগণের শক্তি অধিকতর শক্তিশালী। চরমপন্থীরা পরাজিত হবে, ইনশাআল্লাহ। বেন গার্ডেন নগরী অসাধারণ এক নজির তৈরি করেছে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে, সন্ত্রাসবাদের কাছে জনগণ কখনোই পরাজিত হবে না। কেননা, আমাদের জাতীয় ঐক্য অত্যন্ত শক্তিশালী ও রাষ্ট্র সম্পর্কে আমাদের  ধারণা খুবই স্বচ্ছ। কেউ চাইলে রাষ্ট্রীয় কোনো পদক্ষেপের বিরোধিতা বা সমালোচনা করতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার মতো কোনো কিছুকে জনগণ কখনো সমর্থন করবে না।

রাজনৈতিক সফলতা, নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক সংহতি শক্তিশালীকরণ, National Dialogue Quartet-এর নোবেল শান্তি পুরস্কারের সম্মান লাভ – এসব কিছুই বিপ্লবের পথ ধরে এসেছে। আরব বসন্তের দেশগুলোর মধ্যে তিউনিশিয়াই এখনো বিপ্লবের আলোকশিখা জ্বালিয়ে রেখেছে। আরব বিশ্বেও যে গণতন্ত্র সম্ভব, আমরা তা দেখাতে পেরেছি।

ঐক্যই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ
ঐক্যের নীতির প্রতি আননাহদার পূর্ণ সমর্থনের কথা আমি পুনর্ব্যক্ত করছি। যারা আননাহদার সাথে শত্রুতা বজায় রেখে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চান তাদেরকে বলতে চাই – দেশকে বিভক্ত করবেন না। সবার প্রতিই আমাদের ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। ঐক্যই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ। তিউনিশিয়ার তরীটি তখনই কেবল নিরাপদে তীরে ভীড়তে পারবে, যখন তা সকল তিউনিশিয়ানকেই বহন করবে।

সংস্কারের প্রতিশ্রুতি
বিপ্লবের আগের ও পরের ভুলত্রুটিগুলো থেকে শিক্ষা নেয়ার ব্যাপারে আননাহদা আন্তরিক। আমরা আমাদের ভুলগুলো স্বীকার করি এবং সেগুলোকে সংশোধন করার জন্য আগ্রহী। এ ব্যাপারে আমরা অকপট। আজকের কনফারেন্সে আমরা একটি ‘পর্যালোচনা পর্ব’ রেখেছি। আমরা এমন একটি দল, যারা স্বপ্রণোদিত হয়ে পরিবর্তন ও সংস্কারকে গ্রহণ করে। নিজেদের ভুলত্রুটি স্বীকার করার ব্যাপারে আমরা মোটেও ভীত নই।

আমরা যখন স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলাম, আমাদের আদর্শিক আন্দোলনের আইডেন্টিটি যখন হুমকির মুখে ছিল, সেই সত্তরের দশক থেকে আজ পর্যন্ত আমরা কখনোই নিজেদের বিকাশের (evolve) দরজা বন্ধ করে দেইনি। একটি জাতীয় গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আমরা ইসলামী মূল্যবোধ, দেশের শাসনতন্ত্র ও যুগের চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে সংস্কারের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংস্কারের এই প্রতিশ্রুতি ইসলামী বৈশিষ্ট্যের দাবিদার চরমপন্থী ও সহিংস ধারার অনুসারী এবং মুসলিম গণতন্ত্রীদের মধ্যে একটা স্পষ্ট ও চূড়ান্ত পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।

সংস্কার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া
রাজনৈতিক ও অন্যান্য সামাজিক তৎপরতার মধ্যে পৃথকীকরণ ও বিশেষায়িতকরণ কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত কিংবা সাময়িক চাপের কাছে নতি স্বীকারের কারণে হয়েছে, এমন নয়। বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কাজ থেকে আলাদাভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার যে ঐতিহ্য আমাদের রয়েছে, এটা তারই ঐতিহাসিক বিকাশের একটা পর্যায় মাত্র।

আমরা ধর্মকে রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রাম থেকে দূরে রাখতে চাই। আমরা মসজিদগুলোকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ থাকার আহ্বান জানাই। আমরা চাই না, মসজিদগুলো রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হোক। এই দৃষ্টিভঙ্গির ফলে মসজিদগুলো দলীয় বিভাজনের পরিবর্তে জাতীয় ঐক্য গঠনে অধিকতর ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।

ইসলামী মূল্যবোধের উপর গুরুত্বারোপ
যাইহোক, জনজীবন থেকে ধর্মকে বাদ দেয়ার কারো কারো প্রচেষ্টা দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছি। অথচ বাস্তবতা হলো – উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে পরিচালিত সংগ্রামে আমাদের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের নেতৃবৃন্দ ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজে লাগিয়েছিলেন। একইভাবে, বর্তমানে আমরাও কর্মতৎপরতা, ত্যাগস্বীকার, সত্যবাদিতা ও সততায় উৎসাহ প্রদান এবং উন্নয়নের সহায়ক হিসেবে ইসলামী মূল্যবোধকে কাজে লাগাতে পারি। ISIS ও অন্যান্য চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ের পক্ষে ইসলাম একটি ইতিবাচক শক্তি। উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রের প্রচেষ্টার সমর্থনেও আমরা ইসলামী মূল্যবোধকে নিতে পারি। ইসলামের প্রতিনিধি দাবিদার ISIS-কে ইসলামী মূল্যবোধের জায়গা থেকেই প্রতিরোধ  করতে হবে। এ জন্য আমাদের এমন আলেম দরকার, যারা ইসলামী মধ্যপন্থাকে সমর্থন করেন এবং ইসলামের নামে পরিচালিত চরমপন্থাকে প্রত্যাখ্যান করেন।

রাষ্ট্রের সাথে আননাহদার সম্পর্ক
দমননীতি, অপবাদ এবং ভয়ের সংস্কৃতি তৈরির মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকার আননাহদার সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আননাহদা ও রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা তৈরি করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। বিপ্লবের পর আমাদের সরকার গঠনের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, আননাহদা রাষ্ট্রের অংশ এবং গুরুত্বপূর্ণ সমর্থনের উৎস। আননাহাদ পরিচালিত সরকার সে সময়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। এ থেকে প্রমাণ হয়, আমরা ক্ষমতালিপ্সু, কর্তৃত্বপরায়ণ কিংবা ক্ষমতার একচ্ছত্র অধীকারী হতে ইচ্ছুক নই।

সুষম রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমই লক্ষ্য
তিউনিশিয়ান রাষ্ট্র এমন একটি জাহাজ, যা সর্বাবস্থায় কোনো ধরনের বৈষম্য ও প্রান্তিকীকরণ ব্যতিরেকে সর্বস্তরের তিউনিশিয়ান নারী-পুরুষকে ধারণ করবে।

আমরা এমন একটা সুষম রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করতে চাই, যে রাষ্ট্র আইন পরিষদ ও বিচারিক ক্ষমতার তত্ত্বাবধান এবং সিভিল সোসাইটি ও মিডিয়ার পর্যবেক্ষণের মধ্যে থেকে আইনের প্রয়োগ ও সংবিধানের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে সক্ষম হবে এবং এর মাধ্যমে মানুষের স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। তা না করা গেলে রাষ্ট্র গঠনটাই উদ্দেশ্য ও মূল্যহীন হয়ে পড়বে।

[পড়ুন: ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ অথবা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র]

প্রশাসনিক সংস্কার
স্বাধীনতা মানে নৈরাজ্য নয়। অন্যদিকে, রাষ্ট্রক্ষমতা মানে দমনপীড়ন ও কণ্ঠরোধ করা নয়। আমাদের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও  রাষ্ট্রের কর্মচারীদের ভূমিকা পুনর্মূল্যায়ন করা, তাদের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করা, রুটিন কাজের মানসিকতা দূর করা ও কর্মক্ষমতা বাড়াতে নানা ধরনের উৎসাহ প্রদান করা বিপ্লবের পরিপূর্ণতার জন্যই দরকারী। অতীতের মতো  ‘আগামীকাল আসুন’, ‘আজকে আর হচ্ছ না’, ‘কিছু উপরী দেন’ এ ধরনের কথা বলা যাবে না।

জনপ্রশাসনের কর্মচারীদের মর্যাদা রাষ্ট্রের মর্যাদারই অংশ। কোনো অর্থনৈতিক বা সামাজিক পুনর্জাগরণই সত্যিকারের প্রশাসনিক সংস্কার ব্যতীত স্থায়ী হতে পারে না। এই সংস্কারের মধ্যে রয়েছে মান্ধাতার আমলের কাগুজে প্রশাসনকে (paper administration) পরিপূর্ণ ডিজিটাল প্রশাসনে রূপান্তর করা। এই সংস্কার তখনই স্বার্থক হবে, যখন একজন ব্যবসায়ী কিংবা তরুণ উদ্যোক্তা এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে দৌড়াতে দৌড়াতে জীবন ক্ষয় করে ফেলার পরিবর্তে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় একটি নতুন কোম্পানি তৈরি করতে পারবেন।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা
রাষ্ট্র নিয়ে আমরা গর্বিত। রাষ্ট্রের কাছে আমরা ন্যায্য অধিকার চাই এবং আমরাও আমাদের দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করবো। তবে এই বিবেচনাবোধের পূর্বশর্ত হচ্ছে – আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি এবং কেউই আইনের দণ্ড থেকে অব্যাহতি পাবে না।

আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আননাহদা দুর্নীতি, ঘুষ, কর ফাঁকি এবং জনগণের সম্পদ অপচয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিরোধ মীমাংসার জন্য আমাদের আহ্বানের অর্থ দুর্নীতি আড়াল করা বা একে ন্যায্যতা দেয়া কিংবা দুর্নীতির নতুন কোনো রাস্তা তৈরি করা নয়।

আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ট ব্যবসায়ী এবং গুটিকতক দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য গড়ে তোলা এবং দুর্নীতিবাজদেরকে তাদের অপরাধ স্বীকার, ক্ষমা প্রার্থনা এবং অবৈধভাবে তারা যা কামিয়েছে তা ফেরত দেওয়ার একটা সুযোগ দেয়া। এই প্রক্রিয়া স্বাধীন অর্থনৈতিক উদ্যোগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।

সার্বজনীন ঐক্যের আহ্বান
আমরা বারংবার বলে আসছি – আমরা এমন একটি সার্বজনীন জাতীয় ঐক্য, সহযোগিতা ও সংহতি গড়ে তুলতে চাই; যেখানে বিপ্লব ও শহীদ বিপ্লবীদের যথাযথ স্বীকৃতি দেয়া হবে ও সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকবে। ইসলামপন্থী, দস্তুরিয়াপন্থী[1], বামপন্থীসহ বিপ্লবকে মূল্যায়ন করে এমন সকল বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক ধারার জন্যই একটি অংশীদারিত্বমূলক অবস্থান গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই আমরা চাইলে সবাই মিলে ঘৃণা ও বর্জনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি ভবিষ্যত গড়ে তুলতে পারি।

এটা কোনো ‘গোপন সমঝোতা’ নয়। বরং এটি হচ্ছে রাষ্ট্র বনাম নাগরিক, রাষ্ট্রের সুবিধাপ্রাপ্ত বনাম বঞ্চিত অঞ্চল, বিপরীতমুখী দুই রাজনৈতিক পক্ষ এবং অতীত বনাম বর্তমানের মধ্যে বিরোধ মিটিয়ে ফেলার জাতীয় আকাঙ্খার বহিঃপ্রকাশ। আননাহদা বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্য প্রক্রিয়ার পক্ষের শক্তি।

কার্যকর সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি
মিডিয়ায় রাজনীতিবিদদের বিতর্ক শুনতে শুনতে জনগণ ত্যক্তবিরক্ত। নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দরিদ্র্, বঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম তাদের কাছে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। আননাহদার সদস্য ও সমর্থকবৃন্দ, আপনাদেরকে অবশ্যই উচ্চমার্গীয় আদর্শগত বিষয়ে তর্ক করার পরিবর্তে নাগরিকদের কাছে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সচেতন হতে হবে। নিছক আদর্শ, বড় বড় শ্লোগান ও রাজনৈতিক ঝগড়া-বিবাদ দিয়ে কোনো আধুনিক রাষ্ট্র চলতে পারে না। সবার জন্য নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার মতো সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি ও সেসবের বাস্তবায়নের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। অতীত আদর্শনির্ভর তাত্ত্বিক অবস্থান হতে আননাহদা নিজেকে সরিয়ে এনে গণতান্ত্রিক উত্তরণ নিশ্চিতকরণকে লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। অর্থনৈতিক উন্নতি এখন এর প্রাথমিক ফোকাস।

নারী অধিকার
শহর-গ্রাম, দেশ-বিদেশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-কর্মক্ষেত্র এবং ঘরে-বাইরের সকল তিউনিশিয়ান নারীদেরকে আমি অভিবাদন জানাই। তিউনিশিয়ান নারীদের অধিকার ও উন্নতিতে আমরা গর্বিত। তাদের সম্ভাবনার বিকাশ এবং আরো বেশি স্বাধীনতা প্রদানের পক্ষে আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। একইসাথে ঐক্য ও সংহতির ভিত্তি হিসেবে সামাজিক কাঠামো ও পরিবার প্রথার সংরক্ষণকেও আমরা সমর্থন করি।

শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার
শিক্ষা হচ্ছে তিউনিশিয়ানদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। জ্ঞান ও নৈতিকতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এবং কর্মসংস্থান উপযোগী শিক্ষার নিশ্চয়তার লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের জাতীয় আকাঙ্খার সাথে একমত পোষণ করাকে আমরা জরুরি মনে করছি। মাদক ও  সহিংসতাসহ তরুণদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো আমাদেরকে চিহ্নিত করতে হবে। সন্ত্রাসবাদের দুষ্ট চক্রের ফাঁদে পড়ে তারা যেসব উপায়ে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলোও চিহ্নিত করতে হবে। শিক্ষা কীভাবে একজনকে চাকরির বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তাও আমাদেরকে চিহ্নিত করতে হবে।

জোড়াতালি মার্কা সংস্কারের সংস্কৃতি থেকে আমাদেরকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। একইসাথে গুণগত মানের পরিবর্তে সংখ্যাধিক্যকে প্রাধান্য দেয়ার প্রবণতা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। বেকারত্বের রাস্তা নয়, শিক্ষাকে হতে হবে কর্মসংস্থানের প্রবেশ দ্বার – এই ধারণার উপর আমাদেরকে জোর দিতে হবে।

সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ
সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। তাই দেশের সর্বত্র, বিশেষ করে প্রান্তিক অঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ শহরতলীতে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রচলন ঘটাতে হবে। প্রতিটি ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে আমরা একটি সুইমিং পুল, একটি ক্রীড়া কেন্দ্র এবং একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র দেখতে চাই।

বেকারত্ব দূরীকরণ
ভোকেশনাল ট্রেনিং সিস্টেমকে শক্তিশালীকরণ, একে প্রমোট করা এবং এর গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করা নিঃসন্দেহে আমাদের সংস্কার পরিকল্পনার অংশ।

নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আঞ্চলিক উন্নয়নের ভারসাম্যতা অর্জন, কর্ম-উদ্যোগের উপর গুরুত্বারোপ এবং ব্যক্তি-উদ্যোগে উৎসাহ প্রদানের মতো বিনিয়োগনির্ভর অর্থনৈতিক মডেলই বেকারত্ব দূর করতে পারে।

আঞ্চলিক উন্নয়ন
দেশের বঞ্চিত অঞ্চলের উন্নতির জন্য সংবিধানে যে ‘গঠনমূলক বৈষম্যের নীতি’ সংরক্ষিত আছে, আমরা তা বাস্তবায়ন করার উপর গুরুত্বারোপ করছি। আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিকেন্দ্রীকরণের যে প্রক্রিয়া শুরু হবে, আমরা তা সমর্থন করি এবং একে স্বাগত জানাই। দেশের অঞ্চলগুলোর স্ব স্ব প্রাকৃতিক সম্পদের অনুপাত অনুসারে আঞ্চলিক উন্নয়নের নীতিকে আমরা সমর্থন করি।

আগামী পাঁচ বছরে প্রতিটি জেলার নিজস্ব অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে একটি করে বৃহৎ অর্থনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি। তরুণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে জাতীয় ভূমি বণ্টন শুরু করা, বিনিয়োগ ও উদ্যোগের উপর প্রশাসনিক ও আইনি নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করা দরকার। এ জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরকারের কাজ করা প্রয়োজন। 

সমাজকল্যাণ
সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়াও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। বিশেষ করে কৃষি শ্রমিকদের জন্য এটা বেশি দরকার। তাদেরকে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি দেয়া জরুরি। কাজ করার সামাজিক অভ্যাস তৈরি  করতে হবে। প্রত্যেকের যেমন নির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে, তেমনি নিজস্ব দায়দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।

গণতন্ত্রের গুরুত্ব
দ্বন্দ্ব-সংঘাত সমাধানের পথ হলো ঐক্যমত্য গড়ে তোলা এবং সহাবস্থানের ভিত্তি স্থাপন করা। এটা এখন প্রমাণিত। এ সংক্রান্ত তিউনিশিয়ার সাম্প্রতিক ভূমিকা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি অর্জন করেছে। আমরা এ জন্য গর্বিত। আরব বিশ্বে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, তিউনিশিয়া প্রমাণ করেছে। দুর্নীতি, ঘুষ, স্বৈরতন্ত্র, বিশৃঙ্খলা ও সন্ত্রাসবাদ থেকে মুক্তির সমাধান যে গণতন্ত্র, আমরা তা দেখাতে পেরেছি। পশ্চাৎপদ একনায়কতন্ত্রকে সমর্থন করার চেয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা অপেক্ষাকৃত ভালো ও অধিক ফলপ্রসু।

ধনী ও গরিব, উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল, সংস্কৃতি ও সভ্যতা এবং বিভিন্ন বিশ্বাসের বিরোধ মীমাংসা করার মধ্যেই সমাধান নিহিত রয়েছে। বর্তমান দুনিয়ার জন্য দরকার পারস্পরিক বোঝাপড়া, শান্তি, সংহতি, নিরাপত্তা ও সহিষ্ণুতা।

আত্মসমালোচনা
অসংখ্য ত্যাগ, অশ্রু ও রক্তের বিনিময়ে আননাহদার সদস্যরা শেষ পর্যন্ত ধৈর্য্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা আমাদেরকে নিজেদের ভুলগুলো স্বীকার করা এবং আত্মম্ভরিতা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের পলিসির পুনর্মূল্যায়ন করার সাহস অর্জন করতে শিখিয়েছে।

বর্তমান যুগে এগিয়ে যাবার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো আত্মসমালোচনা করা। আমাদের ঐহিত্য অনুযায়ী আমরা সাধারণত তা করে থাকি। এবারের দশম সম্মেলনে আমরা একে আরো সংহত করবো। কারণ, আমাদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

ঐক্যবদ্ধ নয়া আননাহদা
এই সম্মেলনের প্রাথমিক সফলতা হচ্ছে এক নতুন ও ঐক্যবদ্ধ আননাহদাকে জনগণের কাছে উপস্থাপন করা। এই আননাহদা তিউনিশিয়ার সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করতে সক্ষম। এই দল জাতীয় আশা-আকাঙ্খার দল। এই দলটি জাতীয় উদ্দেশ্য মূল্যায়ন ও গঠনমূলক সমালোচনা করতে সক্ষম, যা দেশে বিকল্প গণতান্ত্রিক শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক। দলটির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ স্বচ্ছতার নীতি দ্বারা পরিচালিত। এর সকল সামর্থ্য ও সম্ভাবনা সবার জন্য উন্মুক্ত। দলটি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তার সকল সদস্যের জন্য গর্বিত।

মেজরিটি-মাইনরিটির ভিত্তিতে নয়, বরং ঐক্যমত্য ও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতেই আসন্ন বছরগুলোতে তিউনিশিয়া শাসন করতে হবে।

তিউনিশিয়ার স্বপ্ন
আমি তিউনিশিয়ায় দীর্ঘদিনের জন্য নিষিদ্ধ ছিলাম। বিশ্বের যে কোনো এয়ারপোর্টে যখনই আমি তিউনিশ এয়ারের কোনো বিমান দেখতাম, তখনই আমি দেশে ফেরার স্বপ্নে বিভোর হতাম। এমন স্বপ্ন, যা ছিল বাস্তবতা থেকে বহু দূরে!

আমি কি কোনোদিন বাড়ি ফিরতে পারবো?

আমি কি আর একটা বার আমাদের পুত্র-কন্যাদের সাথে দেখা করতে পারবো, যারা অসংখ্য কারাগার ও নির্বাসনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে?

আমার দেশের রাস্তায় হাঁটাচলা করার অধিকার কি আমার আর কোনোদিন হবে? ঈদ-উৎসবে পরিবার, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মীদেরকে শুভেচ্ছা জানানোর সুযোগ কি আর হবে?

আল্লাহর রহমতে সেই স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। সেই স্বপ্ন এখন দিক পরিবর্তন করে তিউনিশিয়ার জন্য একটি নতুন আগামী তৈরির স্বপ্নের দিকে বাঁক নিয়েছে। স্বপ্নটা আমার ভেতরে ক্রমাগত বেড়েই চলছে।

একটি সুন্দর ও ঐক্যবদ্ধ তিউনিশিয়া গড়ার স্বপ্ন! একটি গণতান্ত্রিক, উন্নত ও সমন্বিত তিউনিশিয়া গড়ার স্বপ্ন!

আমাদেরকে অবশ্যই দেশবাসীর সাথে এই স্বপ্ন ভাগ করে নিতে হবে। সেইসাথে অতীতকে পেছনে ফেলে ভবিষ্যতের উপর ভরসা করে আমাদেরকে আশাবাদী ও সংকল্পবদ্ধ হতে হবে।

এটাই হচ্ছে তিউনিশিয়ার স্বপ্ন। বিপ্লবের আকাঙ্খা বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য এই স্বপ্ন আমাদেরকে কঠোর পরিশ্রম ও ত্যাগস্বীকার করতে অনুপ্রাণিত করে।

সকল প্রকার জটিলতা নিরসন ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আপনারা, তিউনিশিয়ান নারী-পুরুষেরা, অনেক বেশি শক্তিশালী।

যাত্রা শুরু করার জন্য তিউনিশয়ান জাহাজের এখনই সময়; যে যাত্রা হবে উন্নয়ন ও অগ্রগতির; ব্যক্তি বা  গোষ্ঠী বিশেষের নয়, সব মানুষের।

আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা করে আমরা এই সম্মেলনের উদ্বোধন করছি। আমাদের দেশ ও আমাদের সকলের ভবিষ্যতের জন্য যা সবচেয়ে ভালো, আমরা যেন তা-ই বাছাই করতে পারি। আল্লাহর কাছে সেই তওফিক কামনা করছি।

নোট:

[1] ২০১১ সালে বিপ্লবের পর স্বৈরশাসক বেন আলীর দল ‘ডেমোক্রেটিক কনস্টিটিউশনাল র‍্যালী’ বিলুপ্ত হয়ে যায়। দলটি আরবীতে ‘আত-তাজাম্মুয়ু দস্তুরিয়্যু দেমোক্রাতিয়্যু’ নামে পরিচিত ছিল। আরবী শব্দ ‘দস্তুর’ এর অর্থ সংবিধান। বিলুপ্ত দলটির নেতৃবৃন্দ বিপ্লবের পর ‘দস্তুরিয়ান মুভমেন্ট’ নামে নতুন দল গড়ে তোলেন। তিউনিশিয়ায় দলটির নেতাকর্মীরা ‘দস্তুরিয়ান’ তথা দস্তুরিয়াপন্থী হিসেবে পরিচিত।


আরো পড়ুন:

১। সেক্যুলারিজম এবং ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক

২। তিউনিশিয়া: মধ্যপ্রাচ্যের জন্য দৃষ্টান্ত || কেন প্রথম আরব বসন্তের উত্তরণ ফলপ্রসূ হয়েছে?

৩। আমার সতের বছরের জেল জীবন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *