সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই কি ইসলামের লক্ষ্য?

প্রথম পর্ব: মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার

সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার– এই তিনটি বিষয় মূলত একই দৃষ্টিভঙ্গীর বহিঃপ্রকাশ। আলোচনার সুবিধার্থে এই তিনটি ধারণাকে বিশ্লেষণ করতে নমুনা হিসাবে আমরা সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণাটিকে গ্রহণ করতে চাই। বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা একটি ‘ইসলামী মতাদর্শভিত্তিক বাংলাদেশ’ই চান, তা যে আঙ্গিকেই হোক না কেন। সেক্ষেত্রে তাদের কেউ কেউ মনে করতে পারেন, বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে (১৭ এপ্রিল, ১৯৭১) ‘অপরপক্ষ’ কর্তৃক সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিলো বিধায় এ সবের আবরণে এদেশে ইসলামী মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ কার্যকর কৌশল হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটেই বর্তমান আলোচনা। আগের পর্বে এর রাজনৈতিক দিকের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। এই পর্বে এ ধরনের শাশ্বত মূল্যবোধগুলোর প্রয়োগযোগ্যতার ইসলামী প্রেক্ষিত বিশ্লেষণ করা হবে।

ইসলামকে যদি আমরা একটি বৃত্ত হিসেবে বিবেচনা করি; তাহলে তার ভেতরে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের ধারণাসহ এ ধরনের আরো অনেক বিষয় রয়েছে। সাম্যবাদ তথা কমিউনিজমের মধ্যেও এ বিষয়গুলো আছে। অন্যান্য মতবাদের মধ্যেও এসব বিষয় আছে। এগুলো সদা-সর্বদা তিনটিই হবে, এমন কথা নাই। যে কেউ চাইলে মৈত্রী, স্বাধীনতা, কল্যাণ ইত্যাদি শব্দগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। আমরা জানি, সংবিধান বা এ ধরনের মৌলিক কোনো দলীলে ব্যবহৃত শব্দাবলির আক্ষরিক অর্থের চেয়ে এর দ্যোতনাই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। অতএব, এ ধরনের শাশ্বত মূল্যবোধসমূহের ওপর নির্ভর করে পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় এক একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র ও জাতি গঠন হতে পারে। আবার কোনো রাষ্ট্র ও জাতিই যেহেতু এগুলোকে অস্বীকার করে না সেহেতু শুধু এসব ব্যাপক অর্থবোধক মূল্যবোধের ভিত্তিতে পৃথিবীর নির্দিষ্ট একটি ভূখণ্ডে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র ও জাতি গঠনের বিশেষত্ব কী– এ প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক।

সাম্য ও ন্যায়বিচারের চেতনাকে মূলনীতি বিবেচনা করে অন্যান্যদের সাথে ইসলাম অনুসারীদের সাধারণ রাজনৈতিকতায় (polity) অংশগ্রহণ করা কিংবা না করার বিষয়টি ব্যাখ্যা-সাপেক্ষ। পথিমধ্যে একত্রিত হওয়া যাত্রীদের দৃশ্যমান ঐক্যবদ্ধতাকে তাদের যাত্রা ও গন্তব্যের একত্ব হিসাবে মনে করা যে ধরনের ভুল, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই ইসলামের লক্ষ্য– এ কথা মনে করাও তেমন ধরনের ভুল। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষিতে ইসলাম কিংবা সেক্যুলারিজম বা কমিউনিজমের দোহাই দিয়ে আমরা যা কিছু অর্জন করতে চাচ্ছি, উন্নত রাষ্ট্র হিসাবে বিবেচিত রাষ্ট্রগুলোতে কম-বেশি তা সবই ইতোমধ্যে বিদ্যমান। বৈষয়িক এসব উন্নতি অর্জনই ইসলামের লক্ষ্য– এমন দাবির মর্ম মোতাবেক পাশ্চাত্য দেশগুলো এক একটি উন্নততর বা তুলনামূলকভাবে অনুন্নত মানের বেনামী ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ (?)। তা না হলে চতুর সমাজতন্ত্রীদের প্রচারিত এ কথাই মেনে নিতে হয় যে, ইসলামে রাষ্ট্র ধারণা বলতে কিছু নাই বা আধুনিক রাষ্ট্র সংক্রান্ত আলোচনায় ইসলাম প্রসঙ্গ একটি বাহুল্য বিষয়মাত্র। কৃষি = শষ্য, কৃষি + প্রার্থনা = শষ্য, অতএব, প্রার্থনা = শূন্য; কতিপয় বস্তুবাদী-সাম্যবাদীর এই অদ্ভূদ সমীকরণের মতো করে ইসলামও গুণগত দিক থেকে শেষপর্যন্ত ‘শূন্য’ হয়ে দাঁড়ায়, যদি জনপ্রিয় ও প্রচলিত অর্থে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে ইসলামের লক্ষ্য হিসাবে মনে করা হয়।

কোনোকিছুর মধ্যে কোনোকিছু থাকা মানেই সেটি সে জিনিস হওয়া নয়। যেমন, বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে নারী সন্তানের মা হয়। তা সত্ত্বেও, ‘সন্তান থাকা’ নারীর বৈবাহিক সম্পর্কের প্রমাণ নয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উদ্দেশ্য জ্ঞান লাভ করা। তারমানে এই নয় যে, সনদধারী মাত্রই জ্ঞানী। এই ধারায় আলোচনা করলে দেখা যাবে, কোনো কিছুর মধ্যে কিছু একটা থাকা মানেই কিন্তু সেটি সেই জিনিস হওয়ার প্রমাণ নয়। ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিষয় হলো ন্যায়বিচারের ধারণা। বলা বাহুল্য, ন্যায়বিচারের এই ধারণা জগত, জীবন ও মানুষ সম্পর্কে ইসলামের বিশেষায়িত ধারণার সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত। অতএব, কোনো তত্ত্ব, মতাদর্শ বা কার্যক্রমে ‘ন্যায়বিচার’ প্রসঙ্গ থাকা মানে তা মূলত ইসলাম-ই, এমনটি মনে করা ভুল। উল্লেখ্য, ইসলামসম্মত হতে হলে যে কোনো কিছুকে ‘ইসলাম’ পরিচয়েই হতে হবে এমন কোনো আবশ্যকতা নাই। সামাজিক কার্যক্রম বা মুয়ামালাতের ক্ষেত্রে বিষয়টি ইসলাম মোতাবেক হওয়াই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে কাজটি ইসলাম মোতাবেক হয়েছে বা করা হচ্ছে- এমনটি ঘোষণা করার অপরিহার্যতা নাই। বুঝা যাচ্ছে, এ ধরনের কোনো বিষয়ে কোনোক্রমেই ‘ইসলাম’ এর ঘোষণা দেয়া যাবে না, এমন দাবিও ভুল।

একটি বিষয়ের সাথে অপর কোনো বিষয়ের ইতিবাচক সম্পর্ক থাকার তিনটি অবস্থা হতে পারে: (১) আপতিক সম্পর্ক (occasional relation), (২) আবশ্যিক সম্পর্ক (necessary relation) ও (৩) অভিন্নতার সম্পর্ক (identical relation)। আপতিক সম্পর্কগত বিষয়ে একাধিক বিষয়ের মধ্যকার সম্পর্ক থাকাটা হলো প্রাসঙ্গিক। কখনো থাকতেও পারে আবার কখনো নাও থাকতে পারে। যেমন কাগজের সাথে কলমের সম্পর্ক বা কলমের সাথে কলমের ক্যাপের সম্পর্ক। পরীক্ষার্থীর সাথে সম্ভাব্য ফলাফলের সম্পর্ক। সংক্ষেপে, ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিকভাবে বিষয়গুলো যখন পৃথকভাবে থাকতে পারে, একটির উপস্থিতি অপরটির উপস্থিতিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণ করে না তখন তাদের মধ্যকার সম্পর্ককে বলা হয় আপতিক সম্পর্ক। আবার বিষয়গুলোর মধ্যকার সম্পর্ক যদি এমন হয় যে, একটি ছাড়া অপরটি হতেই পারে না, একটি থাকা মানেই অপরটি থাকা, তখন তাদের মধ্যকার সম্পর্ক হচ্ছে আবশ্যিক। যেমন, হৃৎপিণ্ডের সাথে ফুসফুসের সম্পর্ক। কোনো মানবদেহ এমন হতে পারে না, যেটিতে হৃৎপিণ্ড আছে অথচ ফুসফুস নাই। অনিবার্য সম্পর্কের একটি বিশেষ ধরন হলো অভিন্নতার সম্পর্ক। বাস্তবে হৃৎপিণ্ড আর ফুসফুসের সম্পর্ক অপরিহার্য হলেও দু’টি আলাদা অঙ্গ। কিছু কিছু অনিবার্য সম্পর্ক এমন যে, তা বাস্তবে পৃথক করা সম্ভব না হলেও আদতে তা আলাদা এবং তাত্ত্বিকভাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে আলাদা করা যায়। আবার কিছু কিছু অনিবার্য সম্পর্ক এমন যে, সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে বাস্তবে এবং কল্পনায় বা তত্ত্বে– কোনোভাবেই আলাদাভাবে ভাবা যায় না। আসলে অভিন্ন সম্পর্কের বিষয়গুলো একই বিষয়ের বিভিন্ন নাম বা ভিন্ন ভিন্ন দিক মাত্র।

এই নিবন্ধে এই বিষয়ের আলোচনার প্রসঙ্গ হলো, সাম্য আর ন্যায় বিচারসহ অনুরূপ ধারণাগুলোর সাথে ইসলামের সম্পর্ক কী তা খতিয়ে দেখা। স্পষ্টতই ইসলামেরর সাথে সামাজিক ন্যায়বিচার ইত্যাদি মূল্যবোধ সম্পর্কিত বিষয়াদির সম্পর্ক অভিন্ন নয়, আবশ্যিক। যেসব বিষয়ের সাথে ইসলামের সম্পর্ক অভিন্ন অর্থে আবশ্যিক সেগুলো (কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ্ব ও যাকাত) সম্পর্কে ইসলামের মৌলিক উৎস কোরআন ও হাদীসে স্পষ্ট করে বলা আছে। আমরা জানি, ঈমানের ঘোষণাই হলো কালেমা। হাদীসে জিবরীল অনুসারে ঈমান হলো আল্লাহ, ফেরেশতা, আসমানী কিতাব, রাসূল, আখিরাত ও তাক্বদীরকে সত্য বলে মেনে নেয়া। যে ইসলাম ঈমান নিঃসৃত নয়, ইসলামের পরিভাষায় তা হলো নিফাক্ব বা কপটতা। আলাদাভাবে ইসলামের লক্ষ্য বলে কিছু নাই। এরপরও যদি এভাবে বলা হয় যে, উপরে উল্লেখিত বিষয়াদি ঈমান ও ইসলামের অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য। আর এর বাইরে ইসলামের একটি লক্ষ্য থাকতে পারে যা হলো সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। দার্শনিক চিন্তার সূত্রে দাবি করা এহেন ব্যাখ্যার মৌলিক ভ্রান্তি হলো– এ ক্ষেত্রে ঈমান ও ইসলামের অন্তর্গত বৈশিষ্ট্যের সাথে এসবের কর্মগত দিক বা দাবিসমূহকে সংশ্লিষ্ট চিন্তক এক করে ফেলেছেন। বাস্তবিক পক্ষে ইসলামের বাইরে ইসলামের লক্ষ্য বলে কিছু নাই। তারপরও যদি কেউ ঈমাননির্ভর ইসলামের বাইরে ‘ইসলামের কোনো লক্ষ্য’ আছে দাবি করেন, তাহলে বলতে হয়, আল্লাহর জমীনে আল্লাহর খেলাফত প্রতিষ্ঠাই ইসলামের লক্ষ্য। সাম্য, ন্যায়বিচার ইত্যাদি ইসলামের লক্ষ্য নয়; এগুলো হলো ইসলামের দাবি (necessary implication)।

সাম্য, ন্যায়বিচার এসব সম্পর্কে কার কী ধারণা– এবার তা বিশ্লেষণ করা যাক। শুরুতেই বলা হয়েছে, এসব বিষয় নিয়ে নানা রকমের যুক্তি, এমনকি বিপরীতমুখী কর্মনীতির কথা পাওয়া যায়। এসব কথা শুনতে ভালো লাগে। প্রথমেই মনে হয়, ওসব তো বাস্তবায়নের সমস্যা (not actual problem, but implementary problem)। যেন বিষয়গুলোকে সহজেই বুঝে ফেলা গেছে। আলোচনা ও বিশ্লেষণ শুরু করলে দেখা যায়, এক একজন এক একটি বিষয়কে এক একভাবে বুঝেছে। একই বিষয়ের বুঝ-জ্ঞানে এ ধরনের ব্যাপক তারতম্যের কারণ হলো জীবন, জগত ও বাস্তবতা সম্পর্কে এক একজনের এক একধরনের দৃষ্টিভঙ্গি। তাওহীদ, রেসালত ও আখিরাতকে কোরআন-হাদীসে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এগুলোকে হুবুহু গ্রহণ ও অনুসরণ না করে গড়পড়তা হিসেবে বিবেচনা করা অগ্রহণযোগ্য। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোর মনগড়া ভাষ্যকে যিনি সঠিক মনে করেন তাঁর ধারণায় সাম্য ও ন্যায় বিচার বলতে যা, তা ইসলামের দিক হতে সংজ্ঞায়িত সাম্য ও ন্যায়বিচারের ধারণার সাথে অভিন্ন হতে পারে না। হতে পারে তাঁর অনুসৃত ‘ইসলাম-প্রসঙ্গ’ একটি কৌশলগত ব্যাপার। শুভ, সাম্য, কল্যাণ, ন্যায় ইত্যাদি মৌলিক চিন্তা ইসলামের স্ব-উপস্থাপিত চিন্তাধারা হতে নিঃসৃত হওয়াটা জরুরি নয়– কেউ এমনটা মনে করলে তাওহীদ, রেসালাত, আখিরাতের মতো বিষয়গুলো আদতে বাহুল্যমাত্র (redundant) হয়ে দাঁড়ায়।

বাধ্যগত পরিস্থিতি ও কর্মগত আংশিক সাযুজ্যের ভিত্তিতে সাম্য, ন্যায়, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ইত্যাদি মূল্যবোধসূচক শব্দাবলিকে সামনে রেখে মানুষ এক একটি জনগোষ্ঠী গড়ে তোলে। নিজ নিজ বিবেচনায় কল্যাণলাভ থাকে এর উদ্দেশ্য। যখনই এ ধরনের ব্যাপক অর্থবোধক কোনো কথার (term) ভিত্তিতে জনগণ একত্রিত হয় তখন তারা স্ব স্ব বিবেচনায় কিছু অভিন্ন স্বার্থগত বিষয়কে সামনে রাখে। এই আপাত ঐক্যের ভেতরে চাপা পড়ে থাকা অন্তর্গত অনৈক্যের উপস্থিতি ও বিষয়বস্তু কেবলমাত্র বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রকাশ পায়। মানিয়ে নেয়া মানে ভিন্নতর কিছু আদৌ না থাকা বুঝায় না। সমঝোতা ও নৈতিকতা হচ্ছে মানিয়ে নেয়া বা মেনে চলা।

যাহোক, ইসলামের দৃষ্টিতে জনগণের কল্যাণই রাষ্টের লক্ষ্য। একইভাবে মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠাও রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম ইসলামসম্মত উদ্দেশ্য। এ পর্যায়ে ‘মানুষ’ সম্পর্কে ইসলামের যে বিশেষ ধরনের আন্ডারস্ট্যান্ডিং, তাকে উহ্য রেখে মানুষের ‘কল্যাণ’ বা ‘মানবিক মর্যাদা’র ধারণা অন্তত ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে কি? এর উত্তর যদি নেতিবাচক হয়, তাহলে তা মূল্যবোধসূচক যে কোনো টার্ম সম্পর্কেই প্রযোজ্য। আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বের আলোচনায় ইসলামকে একটি পক্ষ হিসাবে মানতে যারা নারাজ; তারা দৃশ্যত জানেই না যে, মুসলিম ফকীহ, চিন্তাবিদ ও দার্শনিকদের মধ্যে অনেকেই এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা-পর্যালোচনা করেছেন। বিশেষ করে আল ফারাবীর রাষ্ট্রতত্ত্ব এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রণিদানযোগ্য। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবন একটি ধারাবাহিকতা মাত্র। ইহলৌকিক কিংবা পারলৌকিক– এ ধরনের বিভাজন ইসলামের দৃষ্টিতে কখনো মৌলিক হতে পারে না। ইসলামের দৃষ্টিতে জগত সমগ্র। জীবনও অবিরত। মানুষ, জগত ও জীবনের ইসলাম উপস্থাপিত অধিবিদ্যাগত ধারণাকে কার্যত অকার্যকর করে মানবিক মর্যাদা সংক্রান্ত কোনো সিরিয়াস আলোচনা ও কংক্রিট কর্মধারা ইসলাম অনুসারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ইসলাম সম্পর্কে এ ধরনের একটি কঠোর (rigid) ও কর্তৃত্ববাদী নৈতিক, অধিবিদ্যক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থান থেকে জগতের বাদবাকি লোকদের সাথে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কীভাবে কার্যকর সম্পর্ক সম্ভব হতে পারে তা নিয়ে যারা আলোচনার এ পর্যায়ে এসে উৎকণ্ঠিত হচ্ছেন বা শংকাবোধ করছেন, তারা আসলে ইসলামকে ইসলামের মতো করে দেখার একাডেমিক সৎ সাহস হতে নিজেদের বঞ্চিত করছেন।

ইসলামকে জগতের সাথে মেলাতে গেলে নতজানু (apologetic অর্থে) নীতি গ্রহণ করতে হবে– এ ধরনের মনোভাব সঠিক নয়। আবার জগতের তাবৎ ‘অপরে’র সাথে লড়াই করে ইসলামকে বিজয়ী করতে হবে– এ ধরনের চরমপন্থাও সঠিক নয়। এ ব্যাপারে ভারসাম্যপূর্ণ ও সমন্বয়-পন্থা কী হতে পারে, তা ইসলামের মৌলিক উৎসসমূহে স্পষ্ট করা হয়েছে। কেউ সেসব মানবেন কি না– সেটি তার বিবেচনা। শাশ্বত মূল্যবোধসূচক বিষয়গুলোর রূপায়ণে ইসলাম নির্দেশিত কর্মধারা তথা শরীয়াহ’র সনাতনী কাঠামো বর্তমান সময়ে প্রযোজ্য কিনা তা নিয়ে ইসলাম বিষয়ে গবেষণায় নিয়োজিত পণ্ডিতদের পক্ষ-বিপক্ষের মতামত থাকতে পারে। আমার কথা হলো, জেনে-বুঝে যারা একমাত্র জীবনাদর্শ হিসাবে ইসলামকে অনুসরণের ঘোষণা দিয়েছেন, এ ধরনের বিতর্ক থেকে তাঁদের গ্রহণ করার কিছু নাই। যদিও জানার জন্য তা চর্চা করা যেতে পারে। ইসলামপন্থীদের করণীয় হলো, শরীয়াহ’র পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী তথা সমাজ ও রাষ্ট্রকে বস্তুনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা। ইসলামকে কাস্টমাইজ করা যায় না, এটি যেভাবে আছে সেভাবে গ্রহণ করার বিষয়। যদিও আক্বীদাগত (basic conceptuals) বিষয়গুলো ছাড়া অন্যান্য সব বিষয়ে ইসলাম মানিয়ে নেয়ার সুযোগ রেখেছে। অতএব কর্মনীতি গ্রহণ তথা আমলের ক্ষেত্রে ক্রমধারা অবলম্বন করা যেতে পারে।

ইসলামের ভেতরকার এই স্বগত সমন্বয়ধর্মী দৃষ্টিভঙ্গিকে (inherent inclusiveness) বুঝতে না পারার কারণ হলো শত শত বছর ধরে ইসলামকে নিছক ধর্ম হিসাবে তুলে ধরা। ইসলামের অনুসারী ও বিরোধী উভয় পক্ষই এই ভুলটি সমানতালে করেছে। ইসলামকে পরম সমন্বয়ধর্মী (ultra-inclusive) অর্থে অনন্য গণ্য না করে একে চরম সমন্বয়বিরোধী (ultra-exclusive) অর্থে বুঝা ও উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষের মজ্জাগত ধর্মবাদীতা (religiosity) ও ধর্মবাদীতার অনিবার্য পরিণতি হিসাবে চরমপন্থার প্রতি ঝোঁকের কারণে এমন হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মানবিক সৃষ্টিশীলতার সবটুকুকেই ইসলাম ধারণ করে।

ইসলামের কোনো কোনো দিক নিয়ে কিছু একটা করা বা বলা হলে তা ইসলামসম্মত হবে, এমন কোনো কথা নাই। এমনকি হতে পারে তা প্রকৃতপক্ষে বা শেষ পর্যন্ত ইসলামকেই খণ্ডন করে। এই জরুরি কথাগুলোকে তাত্ত্বিক বা জটিল আখ্যায়িত করে বিবেচনার বাইরে রাখলে সাম্য, মৈত্রী, সামাজিক ন্যায়বিচার, কল্যাণসহ শাশ্বত মানবিক মূল্যবোধসমূহের ধারণা সঠিক হতে পারে না। ইসলামের মধ্যে যদি সাম্য, মৈত্রী, মানবিকতাবোধ, কল্যাণ ও ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলো থেকে থাকে, এগুলোর সাথে সাথে যদি আধ্যাত্মিকতা, সৃজনশীলতা ও একটি সুসংবদ্ধ (consistent) জ্ঞানতত্ত্বও থাকে, তাহলে ইসলামকে স্বয়ং একটা অনন্য ব্র্যান্ড হিসাবে মানতে ও উপস্থাপনে সমস্যা কী? ইসলাম যদি আদতে এ রূপ না হয়ে থাকে তাহলে নিজ সম্পর্কে ইসলামের দাবিসমূহের অন্তত অংশবিশেষ ভুল। ইসলাম যেহেতু নিজেকে পূর্ণ সুসংবদ্ধ সমগ্র হিসাবে (consistent as a whole) দাবি করে; সেহেতু ইসলামের বিষয়গুলোর আংশিক অকার্যকারিতা বা ভ্রান্তি উচ্চারিত বা অনুচ্চারিত দাবি আদতে ইসলামকেই খারিজ করে। কোনো কোনো রাষ্ট্রচিন্তক ইদানীং তাই করছেন। জ্ঞান-গবেষণা বাদ দিয়ে ইসলাম কায়েমে আগ্রহীদের অনেকেই না বুঝে এতে সায় দিচ্ছেন।

‘ইসলামী রাষ্ট্র’ ধারণার সমর্থন বা পর্যালোচনা এই আলোচনার বিষয় নয়। পূর্বেই বলা হয়েছে, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই ইসলামের লক্ষ্য– এ ধরনের বক্তব্যের সারব্ত্তা পরখ করাই এই আলোচনার উদ্দেশ্য। মুসলিম হিসাবে কেউ ন্যূনতম শতকরা আড়াই টাকা যাকাত হিসাবে দিবে। অমুসলিম কেউ ‘সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি’র অংশ হিসাবে ন্যূনতম শতকরা আড়াই টাকা দান করতে পারে। বাস্তবে তা একই হলেও মূলত তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইবাদত হিসাবে মুসলমানেরা যা করে সেসবের সুনির্দিষ্ট অনুধ্যানমূলক ফলাফল (meditative effect) আছে। ঈমান ও ইসলামের সুনির্দিষ্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিংকে অন্তর্গতভাবে গ্রহণ না করেও ধর্মীয় শব্দাবলি ও প্রক্রিয়াসমূহকে ব্যবহার করে বা না করে, যে কোনো প্রাসংগিক উপায়ে কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিত্ব-উন্নয়নমূলক ও মনোদৈহিক উৎকর্ষদায়ক অনুধ্যান (contempletion) করতে পারে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ইবাদতের মতো করে কিছু সুনির্দিষ্ট ফল লাভ করবেন, উপকৃত হবেন, এমনকি কমবেশি আধ্যাত্মিক উন্নতিও লাভ করতে করবেন। ব্যাপার যদি বাস্তবে এই হয়, এর ভিত্তিতে কি একথা বলা সংগত হবে যে, ইবাদত ও মেডিটেশন একই জিনিস? ইসলামের ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ হতে এর উত্তর না-সূচক। যদিও ইবাদতের মাধ্যমে মেডিটেশানের কাজ হয় – এটি সত্য।

square-1ইসলাম ও অপরাপর মতাদর্শের আন্তঃসম্পর্ককে পাশের চিত্রের আলোকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। ‘ক’ বৃত্তের অংশবিশেষ ‘খ’ বৃত্তের অংশবিশেষের উপর দিয়ে গেছে। যে অংশটুকু উভয় বৃত্তের অংশ তা হলো ‘গ’। এখন ‘ক’এর সাথে ‘খ’এর সম্ভাব্য সমন্বয় হতে পারে ‘গ’এর মাধ্যমে। ‘ক’ তার ‘গ’ অংশে আসলে কার্যত তা ‘খ’এ আসা হলো। আবার ‘খ’ও যখন তার ‘গ’ অবস্থানে আসে তখন সে তার নিজ অবস্থানেই থাকে যদিও কার্যত তা সমভাবে ‘ক’এরও অবস্থান। নানা রকমের মত-পথের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর রাজনৈতিকতাসহ নানা ধরনের ঐক্যের এটিই একমাত্র শান্তিপূর্ণ উপায়। এর ভিত্তিতে ‘ক’ আর ‘খ’ আসলে একই জিনিস– এমন দাবি করাটা যেমন করে অগ্রহণযোগ্য, তেমনি সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার ধারণা ইসলামের অন্তনির্হিত মর্মবাণীর অন্যতম হওয়া সত্ত্বেও সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই ইসলামের লক্ষ্য– এই দাবিও ভুল। সংখ্যাগরিষ্ঠ, ধর্মনিষ্ঠ, সরলপ্রাণ ও ক্ষেত্রবিশেষে হীনমন্য ইসলামপন্থীদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য সহজিয়া-সাম্যবাদীদের কেউ এ ধরনের ‘তর্ক তুলতে’ পারে। নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সংশ্লিষ্ট নোশনগুলোকে বিশ্লেষণ করলে এহেন উদ্দেশ্যপূর্ণ কথাবার্তার আড়ালের বড় বড় ফাঁকগুলোকে ধরতে ও বুঝতে পারা তেমন কঠিন নয়। ইসলামপন্থীরা ভৌগোলিক-নৃতাত্ত্বিক জাতি ও রাষ্ট্রগঠনে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে সাম্য, কল্যাণ, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের মতো ব্যাপক অর্থবোধক বিষয়সমূহকে ধারণ করবে বা করতে পারে। এর মানে এই নয় যে, এসব হলো ইসলামের লক্ষ্য। এ ধরনের পরিভাষাসমূহ অর্থপূর্ণতার দিক থেকে একই সাথে বহু অর্থবোধক ও সুনির্দিষ্ট অর্থবোধক।

ইসলামকে ইসলামের ভিতর থেকে বুঝা ও উপস্থাপনের চিন্তাপদ্ধতিকে গ্রহণ করতে হবে। গ্রহণ বা বর্জনের বিষয় ভিন্ন ব্যাপার। কোদাল দিয়ে আপনি মাটি কাটেন বা অন্য যাই করেন, কোদাল যে কোদাল বৈ অন্য কিছু নয়, তা তো স্বীকার করতে হবে। তাই না? পৃথিবীতে কোদালের কোনো সার্বজনীন মাপজোক নাই। তা সত্ত্বেও আমরা ‘কোদাল’ শব্দটি ব্যবহার করি, এর অর্থ বুঝতে পারি। মাথায় কী পরিমাণ চুল না থাকলে ‘টাক মাথা’ হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা না থাকা সত্ত্বেও ‘টাক-মাথা’ শব্দটি দুনিয়ার সব ভাষাতেই সুনির্দিষ্ট অর্থপূর্ণতা সহকারেই ব্যবহৃত হয়। ইসলামকে ধর্ম হিসাবে গণ্য করাটা যে ভুল তা স্পষ্ট করতে আমরা এ পর্যায়ে শব্দের (trem অর্থে) অর্থ নির্ণয়ে Vagueness (বহু অর্থবোধকতা) এবং precision (সুনির্দিষ্টতা) নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবো। শুরুতে মনে হতে পারে, মাত্র কতিপয় শব্দ বহু অর্থবোধক, বাদবাকিগুলো সুনির্দিষ্ট অর্থবোধক। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে প্রায় সব শব্দই এক অর্থে vague। precision আরোপ করার জন্য সাধারণত কোনো একভাবে (arbitrarily) একটি পরিমাণকে নির্ধারণ (quantification) করা হয়। ভাষাদর্শনে একে precision through quantification এর নীতি বলে। বাংলা ভাষায় এ বিষয়ে যত ভুল বুঝাবুঝি তার কারণ হলো vague শব্দটির অনুবাদ করা হয় ‘দ্ব্যর্থবোধক’ বা ‘অস্পষ্ট’। এক এক (one to one) অর্থের পরিবর্তে যে শব্দ বহু অর্থবোধক, তা vague। প্রত্যেক শব্দই কোনো অর্থে vague, আবার কোনো অর্থে precise। কার্যক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শব্দটির কোন্ অর্থটি গ্রহণ করা হবে তা প্রেক্ষাপটই নির্ধারণ করে দেয়।

কোরআন-হাদীসে আল্লাহর কাছে ইসলামকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য ‘দ্বীন’ বলা হয়েছে। ‘দ্বীন’ নামক এই পরিভাষাটিকে বাংলায় ‘ধর্ম’ হিসাবে অনুবাদ করাটা ভুল। এর ফলে ধর্ম সম্পর্কে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণাসমূহ অনেকে ইসলামের ওপরও প্রযোজ্য মনে করছেন। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্রসমূহের কত সংখ্যক বা শতাংশ ইসলামকে ধর্ম হিসাবে মনে করছে বা করেছে তারচেয়ে বরং ইসলাম স্বয়ং এ বিষয়ে কী বলে তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম যে ধর্মমাত্র নয় তার প্রমাণ হলো এতে রয়েছে ধর্মের আওতাবহির্ভূত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি। ইসলাম বরং ধর্মের নামে প্রচলিত এমন কিছু প্রতিষ্ঠিত বিষয়ের বিরোধিতা করে। অবশ্য কোনো বিষয়ের আলোচনায় অন্য কোনো বিষয় প্রসঙ্গক্রমে আসার কারণে বিষয়টি একইসাথে দু’টিকেই প্রতিনিধিত্ব করে না। ধর্মের আলোচনায় অর্থনীতি বা রাজনীতির কোনো প্রসঙ্গ আসলে সংশ্লিষ্ট ধর্মটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা একই সাথে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক মতবাদ হিসাবে গণ্য হবে না। এ বিষয়ে ইসলামকে বিষয়গতভাবে বুঝার চেষ্টা করলে দেখা যাবে ইসলামে ধর্মের আওতাবহির্ভূত বিষয়গুলো ধর্ম সংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক আলোচনা হিসাবে আসে নাই। বরং মতাদর্শগত প্রতিটি বিষয় এক একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ তত্ত্ব হিসাবে আলোচিত হয়েছে। নিছক একাডেমিক দৃষ্টিতে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক তত্ত্বে কী কী থাকা দরকার তা ঠিক করে ইসলামে তা আছে কিনা, থাকলে কীভাবে আছে, এসব যাচাই করলে এটি প্রতীয়মান হবে যে, ইসলামের রয়েছে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক তত্ত্ব। এই দৃষ্টিতে ইসলাম একটি রাজনৈতিক মতবাদ বটে। অর্থনীতি, সমাজতত্ত্ব, দর্শনসহ বিভিন্ন মতাদর্শগত তাত্ত্বিক বিষয়ে একই বিষয় পরিলক্ষিত হবে। ইসলামে এ ধরনের দিকগুলো (aspects) অভিন্নও নয়, বিচ্ছিন্নও নয়। ইসলামই একমাত্র মতাদর্শ যাকে একটি বেসিক টেক্সটে আইডেন্টিফাই করা যায়। বাদবাকি বিষয়গুলো, যেমন হাদীস ইত্যাদি উক্ত মূল পাঠ্যগ্রন্থেরই পদ্ধতিগত সম্প্রসারণমাত্র। একটি অনন্য জীবনাদর্শ হওয়ার কারণে ইসলাম একইসাথে ধর্ম, রাজনীতি, দর্শনসহ মানবজীবনের সব দিককে সমন্বিতভাবে ধারণ করে। এর কোনো একটিকে অন্য কোনোটির বিকল্প হিসাবে হাজির করা হলে, তা আর যাই হোক ইসলাম হবে না।

পাশ্চাত্য চিন্তাধারার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি মৌলিক তাত্ত্বিক বিষয়গুলোকে দ্বি-বিভাজন ও দ্বান্দ্বিক কাঠামোতে চিন্তা করে। হয় এটি, নয় ওইটি। এক কথায় পাশ্চাত্য চিন্তার ধরন হলো মুখোমুখি (horizental)। প্রাচ্য চিন্তার, বিশেষ করে ইসলামে চিন্তার প্যাটার্ন হচ্ছে ক্রমসোপানমূলক (vertical or hierarchical)। পাশ্চাত্য চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে কেউ কেউ ইসলামের ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক ব্যাখ্যা হিসাবে দু’টি স্বতন্ত্র ব্যাখ্যা দাবি করছেন। ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক এ রকমের কোনো বিভাজন নাই। ইসলামের ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা হতে স্বাধীন দার্শনিক সমস্যা ও ইসলামে দর্শনের পরিসর নিয়ে ইতোপূর্বে অন্যত্র আলোচনা করেছি।

অখণ্ড ‘দ্বীন’ হিসাবে ইসলামকে ইসলামের মতো করে বুঝলে এটি স্পষ্ট যে, ইসলাম মানে সাম্য বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নয়। অথচ সাম্য ও ন্যায়বিচারসহ এ ধরনের মূল্যবোধগুলোর সর্বোত্তম রূপায়ণে ইসলাম যেসব কর্মপন্থার কথা বলে, তা এসব বিষয় সম্পর্কিত অন্য যে কোনো মতবাদ তথা চিন্তাকাঠামোর তুলনায় অধিকতর সুসামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলাম উপস্থাপিত চিন্তাকাঠামোর (paradigm) ভিত্তি হলো তাওহীদের ধারণা। এর অনুবর্তী হলো আল্লাহর বান্দা হিসাবে মানুষের পরিচয়। মানুষের পরিচয় হলো আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব। অতএব, মানুষ এ বিশ্বে আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি। বিশ্বজগত পরিচালনায় মানুষ যে সব উপায়ের (means or tools) সাহায্য গ্রহণ করে তার অন্যতম হলো সাম্য ও ন্যায়বিচারের ধারণা। ইতোপূর্বে বলা হয়েছে, এ ধরনের শাশ্বত মূল্যবোধসূচক আরো অনেক শব্দ হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এগুলো একই ধারণার বিভিন্ন ধরনের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বাস্তবায়ন কীভাবে করতে হবে তা ইসলামী শরীয়াহ নির্ধারণ করে দিয়েছে।

ইসলাম ভিন্ন জগতের অন্য কোনো মতাদর্শের একক কোনো উৎস গ্রন্থ নাই। তাই ইসলামী শরীয়াহসহ এই আলোচনায় উদ্ধৃত সব পরিভাষা ও বিষয়কে বিষয়ানুগ (thematic) পদ্ধতিতে বুঝতে হবে। অর্থাৎ কোরআন ও হাদীসে যা কিছু আছে সে মোতাবেক ইসলামকে বুঝতে হবে। সমর্থন করা বা না করার বিষয়টি ভিন্ন। ঐতিহাসিক ধারায় (historical approach) ইসলামকে বুঝতে চাওয়াটা ভুল পদ্ধতি। বিষয়ানুগ আলোচনার সহ-উৎস (secondary source) হিসাবে ঐতিহাসিক পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে।

যা হোক, ক্রমসোপানমূলকভাবে দেখলে লক্ষ্য ও উপায়ের (end and means) এই আপাত দ্বন্দ্বের নিরসন সম্ভব। সাম্যের ধারণা হলো মানবিক মর্যাদাবোধের ফলশ্রুতি। অন্যদিকে, সাম্য ধারণার দাবি হলো ন্যায়বিচারের ধারণা। ইসলামের দৃষ্টিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে আল্লাহর হুকুম পালন অর্থে বুঝতে হবে। আল্লাহর হুকুম পালনই ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য। এই ধারায় বিবেচনা করলে দেখা যায়, বিশেষ কোনো কাজকে উপায় ও লক্ষ্য হিসাবে ভাগ করার পর যা এই কাজের লক্ষ্য তা-ই আবার উচ্চতর বা বৃহত্তর কোনো কিছুর উপায়। আবার সেই উপায়েরও একটি লক্ষ্য থাকে। পুরো বিষয়টিকে ইসলামী জগতদৃষ্টিতে (world-view) সুসামঞ্জস্যপূর্ণ-সমগ্র হিসাবে (consistent) উপস্থাপন করা হয়েছে।

“সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই কি ইসলামের লক্ষ্য?” সম্পর্কে ২টি মন্তব্য

  1. জাকারিয়া

    এই মাত্র লেখাটি পড়া শেষ করলাম।বেশ জটিল লিখা এবং ভালো লাগলো। ইসলামের সাথে সাম্য, ন্যায়বিচার ইত্যাদি বহুল আলোচিত বিষয়ের সম্পর্ক নিয়ে নতুন কিছু ভাবনা তৈরী হলো। ধন্যবাদ দীর্ঘ লেখাটির জন্য। এ জাতীয় লেখা অব্যাহত থাকবে এ প্রত্যাশা ও দোয়া করছি।

Leave a Reply