মসজিদে যেতে হলে নারীদের কি বিশেষ কোনো পোশাক পরিধান করতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর হলো– না। পাবলিক প্লেস, নামাজ আদায় বা মসজিদে যাওয়ার সময় নারী-পুরুষের পোশাকের কোনো পার্থক্য আছে বলে রাসূলের (সা) সুন্নাহ থেকে কোনো ধরনের প্রমাণ মেলে না।

এটা সত্য যে আয়েশা (রা) বলেছেন:

“প্রাথমিক যুগের মুহাজির মহিলাদের আল্লাহ উপর রহম করুন। যখন ‘তারা যেন ওড়না দিয়ে বক্ষদেশ আবৃত করে নেয়’ শীর্ষক আয়াতটি নাযিল হলো, তখন তারা নিজের পরিধেয় কাপড় কেটে ওড়না বানিয়ে নেন। … মুমিন নারীরা তাদের ওড়না দিয়ে নিজেদের ঢেকে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে ফজরের নামাজ পড়তে যেতেন এবং নামাজ শেষ হওয়ার পর পরই ঘরে ফিরে আসতেন।”[1]

অবশ্য “যা প্রকাশিত হয়ে পড়ে” (সূরা নূর ২৪:৩১), তা ব্যতীত নারীদের অলঙ্কার ও সৌন্দর্য ঢেকে রাখার জন্য কোরআনের যে নির্দেশনা রয়েছে, তা মসজিদসহ সকল পাবলিক প্লেসের জন্যই প্রযোজ্য।

তবে মসজিদে যাওয়ার প্রসঙ্গে কোরআনের বিশেষ নির্দেশনা হলো, নারী বা পুরুষরা মসজিদে যাবে উত্তম পোশাক পরিধান এবং ‘সাজসজ্জা গ্রহণ’ করে। আল্লাহ বলেছেন: “হে বনী আদম! তোমরা প্রত্যেক নামাজের সময় সাজসজ্জা করে নাও।” (সূরা আরাফ ৭:৩১)

কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ থাকার জন্য ইসলাম মুমিনদেরকে দুই প্রান্তিকতার মাঝখানে অবস্থান করতে উৎসাহিত করে। একটা প্রান্তিকতা হলো কোনো ধরনের সাজসজ্জা গ্রহণ না করা, আর অন্য প্রান্তিকতাটি হলো অতিরিক্ত সাজসজ্জা গ্রহণ করা। এ সম্পর্কিত সমস্ত বর্ণনা অধ্যয়ন এবং এসব বর্ণনাকে সামগ্রিক অর্থে বিবেচনা করে এটাকেই ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়।

উদাহরণ হিসেবে, পারফিউম তথা সুগন্ধির ব্যবহারযুক্ত সাজসজ্জা সংক্রান্ত হাদীসগুলোকে সামগ্রিক বিবেচনায় নিলে আমরা দেখবো, রাসূল (সা) ঠিক এই মধ্যপন্থা অনুসরণেরই উৎসাহ দিয়েছেন।

বাড়াবাড়ির দিকটি হলো, রাসূল (সা) একজন নারীকে পাবলিক প্লেসে মাত্রাতিরিক্ত পারফিউম বা সুগন্ধি ব্যবহার করতে নিষেধ করেছিলেন, যাতে তার পারফিউমের কারণে পুরুষদের মাঝে আকর্ষণ বা কামনা তৈরি না হয়। আবু মুসা আল আশয়ারী (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন:

“যদি কোনো নারী সুগন্ধি ব্যবহার করে এবং তার সুগন্ধির ঘ্রাণ দিয়ে পুরুষদের মনোযোগ আকর্ষণের উদ্দেশ্যে তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়, তাহলে সেই নারী হলো এমন এমন…।”[2]

এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বুঝতে পারি যে মসজিদে যাওয়ার সময় নারীদের পারফিউম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের (রা) স্ত্রী জয়নব (রা) বর্ণনা করেছেন:

“রাসূল (সা) আমাদেরকে বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন মসজিদে আসে, তখন সে যেন সুগন্ধি ব্যবহার না করে।’”[3]

একই বিষয়ে আবু হুরায়রা (রা) আরো কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন। যেমন,

“কোনো নারী যদি সুগন্ধি ব্যবহার করে, তাহলে আমাদের সাথে এশার নামাজে অংশগ্রহণ করা তার উচিত নয়।”[4]

আরেকটি হাদীসে এসেছে,

“এই মসজিদে সুগন্ধি ব্যবহারকারী নারীর নামাজ কবুল হয় না।”[5]

আবু হুরায়রা (রা) কর্তৃক এ ধরনের আরো হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

স্কলারদের কেউ কেউ এই নির্দেশনাগুলোকে প্রান্তিক অর্থে বিবেচনা করেছেন। ফলে তারা যে কোনো ধরনের সুগন্ধি ব্যবহার করা নারীদের জন্য নিষিদ্ধ করেছেন। উপর্যুক্ত হাদীসগুলোর ব্যাখায় আন্দালুসীয় স্কলার ইমাম ইবনে হাযম বলেছেন, কোনো নারীর শরীর থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত ‘দুর্গন্ধ’ (সায়্যিআতুর রীহ) বের না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার মসজিদে যাওয়ার অনুমতি নেই![6] ইবনে হাযম হলেন জাহেরী মাযহাবের প্রবর্তক। আক্ষরিক ব্যাখ্যা যে কতটা কদর্য ও ইসলামের নীতিমালার পরিপন্থী হতে পারে, এর একটা অকাট্য উদাহরণ হলো ইবনে হাযমের এই মন্তব্য।

অক্ষরবাদিতার নামে ইবনে হাযম ও অন্যান্য স্কলারগণ যে বিষয়টি উপেক্ষা করে গিয়েছেন তা হলো, রাসূল (সা) নিজেই অনেক সময় নারী সাহাবীদেরকে সুগন্ধি ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে এতে যেনো বাড়াবাড়ি না হয়। নিচে বর্ণিত হাদীসগুলোতে এ বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে।

আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত:

“আসমা (রা) রাসূলের (সা) নিকট হায়েয শেষ হওয়ার পরে কীভাবে গোসল করতে হবে, তা জানতে চান। রাসূল (সা) তাকে পরামর্শ দেন, ‘কিছু পানি এবং কিছু বরই পাতা নিবে। সেগুলো দিয়ে খুব ভালো করে গা এবং চুল পরিষ্কার করে নিবে। এরপর গায়ে পানি ঢেলে দিবে। এরপর সুগন্ধিযুক্ত একটি তুলা বা কাপড় ব্যবহার করবে।’ আসমা (রা) বললেন, ‘কোথায় আমি সুগন্ধি ব্যবহার করবো?’ রাসূল (সা) বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ’ এবং তিনি কোনো উত্তর দেননি। তবে আয়েশা (রা) (তাকে কানে কানে) বললেন, ‘যেখান দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয়।’”[7]

আনাস (রা) বর্ণনা করেছেন:

“মসজিদের একটি দেয়ালে থুথু দেখে রাসূল (সা) খুব রাগান্বিত হলেন। (তা দেখে) একজন আনসার নারী থামলেন এবং দেয়ালের দিকে গিয়ে থুথু মুছে দিলেন। তারপর সেখানে কিছু সুগন্ধি লাগিয়ে দিলেন। তখন রাসূল (সা) বললেন, “এটি কতই না চমৎকার ব্যাপার!”[8]

আয়েশা বিন আবদুল্লাহ (রা) বর্ণনা করেছেন:

রাসূল (সা) তাকে নির্দেশনা দিয়েছেন, নবজাতক শিশুকে যখন অভ্যর্থনা জানানো হয়, তখন যেন তার মাথায় সুগন্ধি দেয়া হয়।[9]

পরিশেষে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীস তুলে ধরা হলো। তিনি বর্ণনা করেছেন,

“এক নারী একটি ভাঁজ করা কাগজ নিয়ে রাসূলের (স) কাছে আসলেন এবং পর্দার আড়াল থেকে রাসূলকে (সা) তা দিলেন। রাসূল (সা) জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কি পুরুষের হাত নাকি নারীর হাত?’ নারীটি বললো, ‘একজন নারী।’ রাসূল (সা) বললেন, ‘তুমি যদি নারী হয়ে থাকো, তাহলে অন্তত তোমার আঙ্গুলে কিছু মেহেদী লাগাও।’”[10]

(চলবে)

[মূল: জাসের আওদা, অনুবাদ: জোবায়ের আল মাহমুদ]

অন্যান্য পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

রেফারেন্স:

[1] সহীহ বুখারী, নামাজ অধ্যায়, ২/১৯৫; এবং সহীহ মুসলিম, মসজিদ অধ্যায়, ২/১১৮।

[2] মুস্তাদরাক আল-হাকীম, ২/৪৩০। আল-হাকীম বলেছেন, বুখারী ও মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা না করলেও এর ইসনাদ তথা বর্ণনার ধারবাহিক পরম্পরা বিশুদ্ধ।

[3] সহীহ মুসলিম, নামাজ অধ্যায়, ২/৩১; এবং সহীহ ইবনে খুজায়মা, ৩/৯০।

[4] সহীহ মুসলিম, ১/৩২৮; মুসনাদে মুসতাখরাজ আলাল মুসলিম, আবু নাঈম, ২/৬৫ এবং অন্যান্য সূত্র।

[5] আবু দাউদ, ৪/৭৯।

[6] ইবনে হাযম, আল-মুহাল্লা, কিতাবুস সালাত, হাদীস নং ৪২৭।

[7] সহীহ মুসলিম, ৫০৫।

[8] ইবনে খোজায়মা, ১২২৯, ইবনে মাজাহ, ৭৬২ এবং নাসায়ী, ৭৯৭।

[9] ইবনে হিব্বান, ৫৩০৮।

[10] তাবারানী, ৩৭৬৫; বায়হাকী, ১২৫০১।

জাসের আওদা
মাকাসিদে শরীয়াহর উপর একজন শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ। ‘মাকাসিদ ইনস্টিটিউট গ্লোবাল’ নামক একটি থিংকট্যাংকের প্রেসিডেন্ট। ফিকহ কাউন্সিল অব নর্থ আমেরিকা, দ্য ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফতওয়া এবং ফিকহ একাডেমি অব ইন্ডিয়ার সদস্য। পড়াশোনা করেছেন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলস এবং কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলু থেকে ইসলামী আইন ও সিস্টেম অ্যানালাইসিসের উপর দুটি পিএইচডি করেছেন। বিভিন্ন দেশের বেশ কটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। আরবী ও ইংরেজিতে প্রায় ২৫টি বইয়ের লেখক।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন