এডিটর’স নোট: নারীদেরকে ইসলাম যেভাবে স্বাধীন সত্তা, আত্মমর্যাদা, অধিকার ও দায়িত্বসম্পন্ন এজেন্সি হিসেবে বিবেচনা করে, দুঃখজনক হলেও সত্য, মুসলিম সমাজে এর ব্যত্যয় ঘটেছে। নারীদের ব্যাপারে এই দৈন্যতা তৈরি হয়েছে মূলত মুসলিম সভ্যতার পতনকালে এবং ঔপনিবেশিক যুগে, যা এখনো চলমান। সুদানের ইসলামী চিন্তাবিদ ড. হাসান তুরাবী এ বিষয়ে ১৯৭৩ সালে আরবীতে একটি পুস্তিকা লেখেন। এই বইটিতে নারীদের ব্যাপারে ইসলামের প্রকৃত অবস্থান তিনি তুলে ধরেছেন, যা অনেক ক্ষেত্রেই এখনকার মুসলিম সমাজের প্রচলিত ধ্যানধারণার বিপরীত। যুক্তরাষ্ট্রের সাউন্ড ভিশন ফাউন্ডেশন ‘Women in Islam and Muslim Society’ শিরোনামে বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য সেখান থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন ফাইজা তাবাসসুম ও মাসউদুল আলম।

*****

প্রথম অধ্যায়: বিশ্বাসের স্বাধীনতা

বইটির আরবী সংস্করণের প্রচ্ছদ

দ্বীন ইসলামে নারী একটি স্বাধীন সত্তা। ফলত পুরোপুরি দায়িত্বশীল একজন মানুষ। ইসলাম নারীকে সরাসরি সম্বোধন করে এবং তার কাছে পৌঁছানোর জন্য কোনো পুরুষকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে না। প্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারী যখন ইসলামের বাণী গ্রহণ করে নেয়, তখন তাকে সম্পূর্ণ সমর্থ ও দায়িত্বশীল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অধিকন্তু, কোনো নারী যদি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ না করে, তাহলে সত্যিকার অর্থে সে ইসলাম গ্রহণ করেছে– এমনটা বলা যাবে না। ঈমান আনার বিষয়টি একান্তই ব্যক্তিগত একটি ব্যাপার। অন্য কারো মাধ্যমে কখনো ঈমান আনা যায় না। তাই পিতা, স্বামী কিংবা অন্য কোনো পুরুষের সাথে সম্পর্ক থাকার কারণেই কোনো নারী মুসলিম হয়ে যায় না।

তৎকালে মুসলমানদের প্রত্যেকেই ব্যক্তিগত ও স্বতন্ত্রভাবে মহানবী মুহাম্মদের (সা) কাছে এসে নিজের আনুগত্যের শপথ শপথ পেশ করতেন। পুরুষদের মতো নারীরাও মহানবীর (সা) কাছে এসে ইসলাম ও নবীর প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্য স্বীকার করতেন।

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মহানবীর (সা) প্রতি ইরশাদ করেছেন:

يٰٓأَيُّهَا النَّبِىُّ إِذَا جَآءَكَ الْمُؤْمِنٰتُ يُبَايِعْنَكَ عَلٰىٓ أَن لَّا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْـًٔا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلٰدَهُنَّ وَلَا يَأْتِينَ بِبُهْتٰنٍ يَفْتَرِينَهُۥ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِينَكَ فِى مَعْرُوفٍ ۙ فَبَايِعْهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

“হে নবী! যখন মুমিন নারীরা তোমার কাছে এসে বাইয়াত করে যে, তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তান হত্যা করবে না, কারো নামে কুৎসা রটাবে না এবং সৎ কাজে তোমার অবাধ্যতা করবে না; তাহলে তুমি তাদের বাইয়াত গ্রহণ করো এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো; আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, বড়ই দয়ালু।” (সূরা মুমতাহিনা ৬০:১২)

পুরুষ এবং নারী আত্মীয়দের মধ্যে ধর্মীয় ব্যাপারে ভিন্ন অবস্থান থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, খাত্তাবের কন্যা ফাতেমা যখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তার ভাই ওমর তখন পর্যন্ত কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে ইবনে আব্বাসের (রা) প্রশ্নের জবাবে ওমর (রা) বলেন, “হামজা (রা) ইসলাম গ্রহণের তিনদিন পর আমি বাড়ি থেকে বের হলাম। হঠাৎ মাখজুমী গোত্রের এক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ হয়ে গেলো। তাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম: “তুমি কি তোমার নিজের পূর্বপুরুষদের চেয়ে মুহাম্মাদের বিশ্বাসকে প্রাধান্য দিচ্ছো?” সে বললো, “আমার চেয়েও তোমার আরো কাছের মানুষ এই একই বিশ্বাস স্থাপন করেছে।” আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কে সেই ব্যক্তি?” মাখজুমী গোত্রের ব্যক্তিটি জবাব দিলো, “তোমার বোন এবং ভগ্নিপতি।” আমি দ্রুত সেখান থেকে ফিরে বোনের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলাম। তার ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিলো এবং ভেতরে গুনগুনিয়ে কিছু একটা গাইতে শুনলাম। দরজা খোলার পর ভেতরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করলাম: “এতক্ষণ আমি কী শুনতে পাচ্ছিলাম?” আমার বোন বললো, “তুমি কিছুই শুনতে পাওনি।” উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের এক পর্যায়ে আমি তার মাথায় আঘাত করলাম এবং তখন সে তেজস্বী কণ্ঠে বলে ওঠলো: “তোমার পছন্দ হোক বা না হোক, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি।” তার গা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়তে দেখে আমি অনুশোচনায় ভুগতে লাগলাম। আমি তাকে বললাম: “আমাকে লেখাটি দেখাও।” ওমর (রা) নিজেই পুরো ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। (আল-ইসাবাতু ফি তাময়িজাস সাহাবা – ইবনে  হাজার আসকালানী। পরবর্তীতে ‘আল-ইসাবা’ হিসাবে উদ্ধৃত।)

অপর একটি ঘটনা থেকে আমরা জানতে পারি, আবু সুফিয়ানের কন্যা উম্মে হাবিবা (রা) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। যদিও তার পিতা তখন পর্যন্ত পৌত্তলিক ছিলেন। আবু সুফিয়ান উম্মে হাবিবার সাথে দেখা করার জন্য মদীনায় তাঁর গৃহে গমন করেন। তিনি যখন বিছানায় বসতে যাচ্ছিলেন, তখন তার কন্যা তাকে সেখানে বসতে না দিয়ে বিছানা গুটিয়ে ফেললেন। এমন আচরণে মনঃক্ষুণ্ন হয়ে আবু সুফিয়ান মেয়েকে বললেন: “আমি এই বিছানায় বসার যোগ্য নই, নাকি এই বিছানা আমার যোগ্য নয়?” উম্মে হাবিবা কঠোরভাবে পিতাকে জবাব দিয়েছিলেন: “এটা হলো নবীর (সা) বিছানা, আর আপনি হলেন অপবিত্র মুশরিক। আপনি এটার উপর বসেন, তা আমি চাই না।” এ কথা শুনে আবু সুফিয়ান রাগান্বিত হলেন এবং মেয়েকে তিরস্কার করে বললেন: “আমার অবর্তমানে তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।” (তাবাকাতে ইবনে সাদ)

একজন অবিশ্বাসী স্বামীর স্ত্রীও বিশ্বাসী মুসলিম নারী হতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, স্বয়ং মহানবীর (সা) কন্যা জয়নবের (রা) কথাই ধরুন! মামাতো ভাই আবুল আস বিন রাবীর সাথে তাঁর বিয়ে হয়েছিলো। স্বামী নিজ ধর্মে স্থির থাকলেও তিনি ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করেন। বদর যুদ্ধে তাঁর স্বামী যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটক হন। জয়নব তাকে মুক্ত করতে মুক্তিপণ পাঠিয়েছিলেন। (মুক্তিপণ হিসেবে তিনি খাদীজার (রা) গলার হার পাঠিয়েছিলেন, রাসূল (সা) যা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। – অনুবাদক) মক্কায় ফিরে গিয়ে তিনি জয়নবকে মদীনায় পাঠিয়ে দেবেন– এই অঙ্গীকারের ভিত্তিতে আবুল আসকে মুক্তি দেয়া হয়। তিনি মক্কায় ফিরে যাওয়ার পর জয়নব মদীনায় হিজরত করেন। তাঁর স্বামী আবুল আস অবশ্য পরে আরো একবার মুসলমানদের হাতে যুদ্ধবন্দী হয়ে আসেন। তখন জয়নব তাকে আশ্রয় দেন ও নিজের অধীনে নিরাপত্তা দেন। অবশেষে তিনি তিনি মক্কায় ফিরে গিয়ে তার ব্যবসা গুছিয়ে নেন এবং মদীনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেন।

এ ধরনের আরেকজন নারী হলেন উম্মে সুলাইম বিনতে মিলহান (রা)। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি মালিক বিন নাদিরকে বিয়ে করেছিলেন। উম্মে সুলাইম ছিলেন একদম শুরুর দিকে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে একজন। ইসলাম গ্রহণকে তাঁর স্বামী মেনে নিতে তো পারেননি, উল্টো প্রচণ্ড রাগারাগি করতেন। এক পর্যায়ে তাঁর স্বামী সিরিয়া চলে যান এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। (আল-ইসাবা)

উম্মে হানী বিনতে আবু তালিবের (রা) বিয়ে হয়েছিলো হুবাইরা বিন আমরের সাথে। তিনি নবীজির (সা) চাচা আবু তালিবের কন্যা। মক্কা বিজয়ের সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ধর্মের এই পরিবর্তনের কারণে স্বামী থেকে তাঁকে পৃথক হয়ে যেতে হয়েছিলো। হুবাইরা নাজরানে পালিয়ে যান। (আল-ইসাবা)

হাওয়া বিনতে ইয়াজিদও (রা) ছিলেন এমন একজন নারী, যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর স্বামী কায়েস বিন হাতিম ছিলেন তখনকার বিখ্যাত কবি। ইসলাম গ্রহণের কারণে স্বামী তাঁকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করতেন। তিনি ধৈর্য ধরে তা সহ্য করতেন। মহানবীর (সা) সাথে একবার বাজারে কায়েসের দেখা হয়। তখন তিনি তাকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানান। … মহানবী (সা) তাকে বললেন, “আমি শুনেছি, তোমার স্ত্রী হাওয়া তোমার ধর্ম ত্যাগ করার পর থেকে তুমি তার সাথে ভালো ব্যবহার করছো না। আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার এই কথাটা মনে রাখো। তোমার স্ত্রীকে বিরক্ত করবে না।” রাসূলের (সা) ব্যক্তিত্বের প্রভাবে তিনি সম্মতি প্রদান করেন এবং স্ত্রীর কাছে ফিরে গিয়ে বলেন, “হাওয়া, তোমার সহযোগী মুহাম্মদের সাথে আমার দেখা হয়েছে। তিনি আমাকে তোমার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। আল্লাহর শপথ! আমি তাঁকে দেয়া আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবো। তোমার ব্যাপারে আমি আর হস্তক্ষেপ করবো না এবং আমার দ্বারা তোমার কোনো ক্ষতিও হবে না।” তারপর হাওয়া (রা) প্রকাশ্যে কালেমার ঘোষণা দেন, যা তিনি এতদিন গোপন রেখেছিলেন। লোকেরা বিষয়টি নিয়ে কায়েসের সাথে অনেক কথা বলেছে। কিন্তু তিনি তার স্ত্রীর কোনো ক্ষতি করতে রাজি ছিলেন না। (তাবাকাত)

উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা বিন আবু মুয়ায়েত (রা) নামে আরেকজন নারী ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, যদিও তার পুরো পরিবার তখন পর্যন্ত পৌত্তলিক ধর্মে অবিচল ছিলো। তিনি মদীনায় হিজরত করেছিলেন। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে ইসহাক বলেছেন, উম্মে কুলসুম যখন মদীনায় মহানবীর (সা) কাছে হিজরত করেন, তখন হুদায়বিয়ার সন্ধি কার্যকর ছিলো। কারো সঙ্গ ছাড়া একাই তিনি মক্কা ত্যাগ করেছিলেন। এই বিবেচনায় কার্যত তিনি ছিলেন রাসূলকে (সা) অনুসরণ করে মদীনায় হিজরতকারী প্রথম নারী। তার ভাই আমারা এবং ওয়ালিদ মহানবীর (সা) কাছে গিয়ে হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি অনুসারে তাকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানান। কিন্তু রাসূল (সা) নারীদেরকে চুক্তির শর্তের আওতায় বিবেচনা করতে অস্বীকৃতি জানান। (তাবাকাত)

নারীদের স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করা এবং এর প্রেক্ষিতে নির্যাতন সহ্য করার বিভিন্ন ঘটনা আমরা জানি। যেমন, উম্মে উবাইসের (রা) বোন হারিসা বিনতে মুয়াম্মিল (রা) ছিলেন একজন দাসী। তিনি জুনাইরা আল-রুমিয়া নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম দিকের মুসলমানদের মধ্যে একজন। আবু জাহেল তাকে প্রচণ্ডভাবে মারধোর  করতো। একইভাবে ওমরও (রা) ইসলাম গ্রহণের আগে তাকে প্রহার করতেন। ইসলাম গ্রহণের কারণে এই দরিদ্র নারীটি এত বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন যে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। এই সুযোগে মক্কার মুশরিকরা তাকে অপদস্ত করার জন্য তার এই দুর্ভাগ্যকে অযুহাত হিসেবে কাজে লাগাতো। তারা বলতো, “লাত ও উজ্জার (মক্কার লোকদের দুটি দেবতা, পবিত্র কাবায় তারা এগুলোর পূজা করতো) অভিশাপে তুমি অন্ধ হয়ে গেছো।” কিন্তু তিনি সবসময় বলতেন, “তারা মিথ্যা বলছে। আল্লাহ সাক্ষী, এই মূর্তিগুলো কোনো লাভ-ক্ষতির কারণ হতে পারে না।” শেষ পর্যন্ত তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছিলেন।

শহীদ সুমাইয়া বিনতে খুব্বাত (রা) ছিলেন আম্মার বিন ইয়াসিরের (রা) মা। তিনি ইসলাম গ্রহণকারী সপ্তম ব্যক্তি ছিলেন। বনু মাখযুম গোত্র তাঁকে প্রায়ই নির্যাতন করতো। আসা-যাওয়ার পথে লোকেরা মক্কার উত্তপ্ত বালিতে স্বামী ও ছেলের সাথে তাঁকেও নির্যাতিত হতে দেখতো। মহানবী (সা) তাঁদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন, “হে ইয়াসিরের পরিবারবর্গ! ধৈর্য ধরে এই কষ্ট সহ্য করো। আল্লাহ তোমাদেরকে এর বিনিময়ে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।” তিনি ছিলেন বয়স্ক এবং শারীরিকভাবেও দুর্বল। অত্যাচারীদের মধ্যে আবু জাহেলও ছিল। অতিরিক্ত অত্যাচারের কারণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং ইসলামের প্রথম শহীদ হিসেবে মর্যাদা লাভ করেন। (আল-ইসাবা)

আবু সুফিয়ানের কন্যা উম্মে হাবিবা (রা) ছিলেন এমন একজন নারী, যিনি নির্বাসিত অবস্থায়ও দৃঢ়ভাবে ইসলামের উপর অটল ছিলেন। নিপীড়ন থেকে বাঁচতে তিনি স্বামীর সাথে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁর স্বামী ইসলাম পরিত্যাগ করেন এবং আবিসিনিয়ার প্রচলিত খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হন। স্ত্রীকেও খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা নেয়ার জন্য তিনি চাপ দিতেন। তবে নির্বাসিত জীবনের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেও তিনি ইসলামকে অবিচলভাবে ধারণ করেছিলেন। (তারিখে তাবারী)

ঈমানের শক্তিতে বলিয়ান হয়ে মুসলিম নারীরা ইসলাম প্রচারে কাজ করতেন। তাদের অনেকেই কথাবার্তা ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিজস্ব পারিবারিক পরিমণ্ডলে ইসলাম প্রচারে সহায়তা করতেন। আরওয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব (রা) ছিলেন এমনই এক নারী। তিনি রাসূলকে (সা) সমর্থন করতেন এবং তাঁর পক্ষে কথা বলতেন। তিনি সবসময় রাসূলকে (সা) সাহায্য করার জন্য তাঁর পুত্রকে তাগাদা দিতেন। রাসূল (সা) যে ধরনের সহায়তাই চান না কেন, তা যেন তা করা হয়, ছেলেকে সেই উপদেশ দিতেন। এ রকম আরেকজন নারী ছিলেন উম্মে শুরাইক (রা)। তিনি ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে কুরাইশ নারীদের কাছে গোপনে যেতেন। তাঁর এই গোপন কার্যক্রম প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আগেই তিনি অনেককে ইসলামে দীক্ষিত করে ফেলতে পেরেছিলেন। তাঁর কারণে তাঁর আত্মীয়স্বজনেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মক্কার লোকেরা তাঁকে হুমকি দিতো। (আল-ইসাবা)

মুসলিম নারীদের কেউ কেউ তাঁদের পাণিপ্রার্থীদেরকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং একে বিয়ের পূর্বশর্ত হিসেবে জুড়ে দিয়েছিলেন। উম্মে সুলাইম (রা) ছিলেন এমন একজন নারী। প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর আবু তালহা আল-আনসারী বিয়ের প্রস্তাব দিলে তিনি বলেছিলেন, “আল্লাহর কসম! তোমার মতো কাউকে তো প্রত্যাখ্যান করা যায় না, তবে তুমি তো মুশরিক আর আমি একজন মুসলিম নারী। তোমাকে বিয়ে করা আমার পক্ষে মোটেও বৈধ নয়। তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ করো, তবে সেটাকে আমি তোমার কাছ থেকে বিয়ের মোহরানা হিসাবে গ্রহণ করতে রাজি আছি।” উম্মে সুলাইমের (রা) ছেলে আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত রয়েছে যে আবু তালহা ইসলাম গ্রহণের আগে উম্মে সুলাইমকে (রা) বিয়ের প্রস্তাব দেন। তখন তিনি বললেন, “আবু তালহা, তুমি যে মূর্তির উপাসনা করো সেগুলো যে মাটির তৈরি, তা কি তুমি জানো না?” আবু তালহা জবাব দিলেন, “হ্যাঁ, নিশ্চয় জানি।” তিনি তখন বললেন, “তুমি কি সেগুলোর পূজা করতে লজ্জাবোধ করো না? তবে তুমি ইসলাম গ্রহণ করলে মোহরানার ব্যাপারে আমি তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবো না।” আবু তালহা বিষয়টি নিয়ে ভেবে জানানোর আগ পর্যন্ত তাঁকে অপেক্ষা করার অনুরোধ করে চলে গেলেন। পরে তিনি ফিরে এসে ঘোষণা করলেন, “আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মোহাম্মদ (সা) তাঁর রাসূল।” তারপর উম্মে সুলাইম (রা) চিৎকার করে বলে উঠল, “হে আনাস! আবু তালহার বিয়ের ব্যবস্থা করো।” (আল-ইসাবা)

ইসলামী ট্র্যাডিশনে কোনো নারীর ইসলাম গ্রহণ করাটা যেহেতু একান্ত ব্যক্তিগত একটি বিষয় এবং এটি যেহেতু অন্য কারো প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে করা যায় না, তাই ইসলাম নির্দেশিত সকল আবশ্যিক কাজ ও কর্তব্যগুলো পালন করাও তার নিজেরই দায়িত্ব। তার হয়ে অন্য কেউ এ কাজগুলো করে দিতে পারে না। সম্পূর্ণ নিজের অভিপ্রায়ের উপর ভিত্তি করে আল্লাহর ইবাদত পালন করতে হয়। এ কারণে ইসলামে এগুলোকে একান্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ কথার পক্ষে আল্লাহর বক্তব্য হচ্ছে:

أَنِّى لَآ أُضِيعُ عَمَلَ عٰمِلٍ مِّنكُم مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثٰى ۖ بَعْضُكُم مِّنۢ بَعْضٍ

“আমি তোমাদের কোনো পরিশ্রমকারীর পরিশ্রমই বিনষ্ট করি না, তা সে পুরুষ হোক কিংবা নারী; তোমরা সবাই একে অপরের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা আলে ইমরান ৩:১৯৫)

مَنْ عَمِلَ صٰلِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثٰى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُۥ حَيٰوةً طَيِّبَةً ۖ وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

“যে সৎ কাজ করে – সে পুরুষ হোক কিংবা নারী – এবং এবং যে মুমীন, তাকে আমি পবিত্র জীবন দান করবো; আর অবশ্যই তারা যা করে তারচেয়ে উত্তম প্রতিফল তাদেরকে দান করবো। (সূরা নাহল ১৬:৯৭)

নিজ কৃতকর্মের ভিত্তিতেই কোনো নারী পুরস্কার লাভ বা শাস্তি ভোগ করে। পুরুষকে কোনো নারীর পক্ষ হয়ে কৈফিয়ত প্রদান বা মধ্যস্থতা করার অনুমোদন যেমন নেই; তেমনি কোনো নারীর কর্ম ও কর্মফলের দায়ও পুরুষের উপর বর্তায় না। চূড়ান্ত হিসাব গ্রহণের দিন সম্মিলিত দায়দায়িত্বের (collective responsibility) জন্য পরিবারকে একটি ইউনিট ধরে জিজ্ঞাসা করা হবে না। এর পরিবর্তে নারী বা পুরুষ প্রত্যেককে স্বাধীন সত্তা হিসেবে নিজ কৃতকর্ম কিংবা সম্মিলিত কৃতকর্মের ক্ষেত্রে নিজের অংশটুকুর হিসাব দেয়ার জন্য আল্লাহর সামনে পৃথকভাবে দাঁড়াতে হবে।

وَكُلُّهُمْ ءَاتِيهِ يَوْمَ الْقِيٰمَةِ فَرْدًا

“কেয়ামতের দিন তাদের প্রত্যেকেই তাঁর কাছে আসবে একাকী অবস্থায়।” (সূরা মরিয়ম ১৯:৯৫)

শেষ বিচারের দিন স্বামী-স্ত্রীকে একত্রে জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন করা হবে না। একজনকে অন্যজনের কৃতকর্মের জন্য দায়ী করা হবে না, আবার একজনের উসিলায় অন্যজনকে তার অপরাধের শাস্তি থেকে নিষ্কৃতিও দেয়া হবে না। নিছক লিঙ্গগত পার্থক্যের কারণে কোনো ঈমানদারের সাথে অন্যায্য আচরণ করা হবে না। আল্লাহ তায়ালার দৃষ্টিতে সমগ্র মানবজাতি সমান। তিনি বলেছেন:

يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ – وَأُمِّهِۦ وَأَبِيهِ – وَصٰحِبَتِهِۦ وَبَنِيهِ – لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ

“সেদিন মানুষ পালিয়ে যাবে তার ভাই থেকে, তার মা, তার বাপ, তার স্ত্রী ও তার সন্তান থেকে, সেদিন তাদের প্রত্যেকেই শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকবে।” (সূরা আবাসা ৮০:৩৪-৩৭)

ব্যক্তি-মর্যাদার দিক থেকে নারী ও পুরুষের সমতা, বিশেষ করে নারীর স্বতন্ত্রতা ইসলামের একটি অন্যতম মূলনীতি।

ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِّلَّذِينَ كَفَرُوا امْرَأَتَ نُوحٍ وَامْرَأَتَ لُوطٍ ۖ كَانَتَا تَحْتَ عَبْدَيْنِ مِنْ عِبَادِنَا صٰلِحَيْنِ فَخَانَتَاهُمَا فَلَمْ يُغْنِيَا عَنْهُمَا مِنَ اللَّهِ شَيْـًٔا وَقِيلَ ادْخُلَا النَّارَ مَعَ الدّٰخِلِينَ – وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِّلَّذِينَ ءَامَنُوا امْرَأَتَ فِرْعَوْنَ إِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِى عِندَكَ بَيْتًا فِى الْجَنَّةِ وَنَجِّنِى مِن فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِۦ وَنَجِّنِى مِنَ الْقَوْمِ الظّٰلِمِينَ – وَمَرْيَمَ ابْنَتَ عِمْرٰنَ الَّتِىٓ أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِيهِ مِن رُّوحِنَا وَصَدَّقَتْ بِكَلِمٰتِ رَبِّهَا وَكُتُبِهِۦ وَكَانَتْ مِنَ الْقٰنِتِينَ

“কাফেরদের জন্য আল্লাহ তায়ালা নূহের স্ত্রী এবং লুতের স্ত্রীর উদাহরণ দিচ্ছেন। তারা দুজনই ছিলো আমার দুজন নেককার বান্দার গৃহে। অতঃপর তারা দুজনই স্বামীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো। ফলে তাদের সম্মানিত স্বামীরা তাদেরকে আল্লাহর গজব থেকে রক্ষা করতে পারলো না। এবং তাদেরকে বলা হলো: অন্যান্য জাহান্নামীদের সাথে জাহান্নামে চলে যাও।

এবং ঈমানদারদের জন্য আল্লাহ ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়ার উদাহরণ তুলে ধরছেন। সে দোয়া করলো: “হে আমার রব! আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্য একটি ঘর বানিয়ে দিন এবং আমাকে ফেরাউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে জালেম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন।

এবং ইমরানের কন্যা মরিয়মের উদাহরণও পেশ করছেন, যে তার সতীত্ব বজায় রেখেছিলো। অতঃপর আমি আমার পক্ষ থেকে তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম। সে তার পালনকর্তার আদেশ ও কিতাবসমূহের সত্যতা প্রতিপন্ন করেছে। সে ছিল অনুগত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা তাহরীম ৬৬:১০-১২)

(চলবে)

[মূল: হাসান তুরাবী, অনুবাদ: ফাইজা তাবাসসুম ও মাসউদুল আলম]

হাসান তুরাবী
ড. হাসান তুরাবী (১৯৩২-২০১৬) শীর্ষস্থানীয় একজন ইসলামী স্কলার। প্রচলিত ইসলামী শিক্ষাগ্রহণের পাশাপাশি আইন বিষয়ে পড়াশেনা করেছেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফ্রান্সের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পিএইচডি করেছেন। তিনি ছিলেন একইসাথে স্কলার এবং সুদানের রাজনৈতিক নেতা। পার্লামেন্টের স্পিকার, অ্যাটর্নি জেনারেল, আইনমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ইসলামের মৌলিক আকীদা, নারী অধিকার ও ইসলামের রাজনৈতিক বিষয়ের উপর তিনি এক ডজনের অধিক বই লিখেছেন।

১টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন