রবিবার, নভেম্বর ১৯, ২০১৭
হোম > সমসাময়িক > আন নাহদা কি ইসলামপন্থী, নাকি মুসলিম ডেমোক্র্যাট?

আন নাহদা কি ইসলামপন্থী, নাকি মুসলিম ডেমোক্র্যাট?

এডিটরস নোট:

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের দোহা সেন্টার কর্তৃক Rethinking Political Islam শীর্ষক একটি গবেষণা প্রকল্প আরব বসন্তের পর শুরু হয়েছিল। তিউনিশিয়ার আন নাহদাসহ বিশ্বের ১২টি দেশের ইসলামী আন্দোলনকে এই গবেষণার আওতায় আনা হয়। প্রকল্পের প্রথম ধাপে সংশ্লিষ্ট গবেষকগণ প্রতিটি দেশের আন্দোলনের জন্য একটি করে ওয়ার্কিং পেপার তৈরি করেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে গবেষকরা উক্ত প্রবন্ধসমূহের উপর পর্যালোচনামূলক নিবন্ধ লেখেন। এরই ধারাবাহিকতায় Islamists on Islamism Today শিরোনামে একটি নতুন সিরিজ চালু করা হয়। এ পর্যায়ে ইসলামপন্থী এক্টিভিস্ট ও নেতৃবৃন্দ প্রকল্প গবেষকদের কাজের Ounissiব্যাপারে নিজেদের মতদ্বিমতগুলো তুলে ধরবেন এবং গঠনমূলক আলোচনার স্বার্থে রাজনৈতিক ইসলামের উপর শীর্ষস্থানীয় গবেষকদের যুক্তি ও অনুমানগুলোকে চ্যালেঞ্জ করবেন। এরইসাথে তাদের আন্দোলনের ব্যাপারে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিগুলোও তুলে ধরবেন।

এই সিরিজে তিউনিশিয়ার আন নাহদার উপর শীর্ষ বিশেষজ্ঞ, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মনিকা মার্কসের বক্তব্যের জবাব দেন আন নাহদার সংসদ সদস্য সাইয়েদা ওয়ানিসিসিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য প্রবন্ধটি অনুবাদ করেছেন মাসউদুল আলম।


একাডেমিক গবেষণা ও মিডিয়া – উভয় জায়গাতেই আমাদেরকে কীভাবে চিত্রায়িত করা হয়, আন নাহদার একজন সংসদ সদস্য হিসেবে সে ব্যাপারে আমি বরাবরই আগ্রহী। ইসলামপন্থী একটি দল হিসেবে আমাদের প্রকৃত পরিচয় কী এবং আমাদেরকে কীভাবে বিবেচনা করা হয় – এ দুয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে বলে আমি মনে করি।

ব্রুকিংসের ‘Rethinking Political Islam’ প্রকল্পে মনিকা মার্কস[1], আভি স্পিজেল[2] ও স্টিভেন ব্রুক[3] যেসব ইস্যু তুলে এনেছেন, সেগুলোর কোনো কোনোটি নিয়ে আমি একটা স্পষ্ট ধারণা দিতে চেষ্টা করবো। প্রথমে আমি আন নাহদার আদর্শ নিয়ে বলবো। আমাদের আন্দোলনের সাথে সাধারণত মুসলিম ব্রাদারহুডের সম্পর্ক রয়েছে বলে বলা হয়ে থাকে। তাই প্রসঙ্গটি বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। দ্বিতীয়ত, মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ‘লিগালিস্ট অ্যাপ্রোচে’র[4] ব্যর্থতা কী ছিল এবং বাদবাকি আরব বিশ্বে এর পরিণতি কী হয়েছিল, তার উপর আমি আলোকপাত করবো। তিউনিশিয়ার গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়ায় ২০১৩ সালের ৩ জুলাই মিশরে সংঘটিত ক্যুর প্রভাব আসলে কতটুকু ছিল, সেই বাস্তবতাও এই সুযোগে তুলে ধরবো। সর্বশেষ, আমাদের উপর যে ধরনের পরিচয় আরোপ করা হয়, তা পুনর্বিবেচনা করতে অনুরোধ করবো। গতানুগতিক ‘ইসলাপন্থী’ পরিচয়ের পরিবর্তে ‘মুসলিম ডেমোক্র্যাট’ পরিচয় সম্ভবত আন নাহদার জন্য অধিকতর সঠিক।

আন নাহদা কি তিউনিশিয়ান মুসলিম ব্রাদারহুড, নাকি বরগিবার অবৈধ সন্তান?

ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক সমসাময়িক সকল রাজনৈতিক দলকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সংযুক্ত করার একটা গতানুগতিক প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। যেন ব্রাদারহুড এক ধরনের ‘প্যারেন্ট কোম্পানি’। এই দৃষ্টিভঙ্গি যে বাস্তবসম্মত নয়, তা স্বীকার করে নেয়ার সময় হয়েছে বলে আমি মনে করি। বিশেষ করে, এসব দলের গৃহীত সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলোর আলোকে এমনটা বলাই যায়। আন নাহদার প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে রশিদ ঘানুশী কর্তৃক হাসান আল বান্নার মতাদর্শ তিউনিশিয়ায় আমদানী করার চেয়েও অনেক বেশি জটিল পরিস্থিতি এখানে ছিল। ইসলামিক টেনডেন্সি মুভমেন্টের (যা পরবর্তীতে আন নাহদা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে) প্রতিষ্ঠাতাবৃন্দ তিউনিশিয়ার জাতীয় ইস্যুগুলোতে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তিউনিশিয়ার ইসলামী আন্দোলন যে স্থানীয় নিজস্ব বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত, এখান থেকেই তা বুঝা যায়।

তিউনিশিয়ার ইসলামী আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় পটভূমি কী ছিল, তা অনেকভাবেই যাচাই করা যেতে পারে। যেমন, আন নাহদার প্রধান দুই প্রতিষ্ঠাতাই (আবদেল ফাত্তাহ মুরু এবং রশিদ ঘানুশী) ছিলেন জায়তুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট। ৭৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি আরব বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। সামাজিক বাস্তবতার দিকে লক্ষ রাখার ব্যাপারে এর অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। আবদেল ফাত্তাহ মুরু’র আধ্যাত্মিক গুরু শায়খ আহমেদ বেন মিলাদ ছিলেন জায়তুনিয়ান। অথচ কারো কারো ভুল অনুমান হলো, মুরু হলেন সাইয়েদ কুতুবের অনুসারী। এই ব্যাপারটি বুঝতে পারা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তিউনিশিয়ার জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে বেন মিলাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। আধুনিক তিউনিশীয় রাষ্ট্র গঠন এবং এর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য তিনি প্রচণ্ড সংগ্রাম করেছেন। বরগিবার শাসনামলে সংসদ অধিবেশন চলা অবস্থায় সংসদ ভবনের সামনে জায়তুনার একদল স্কলারকে সাথে নিয়ে তোলা মিলাদের একটি ছবি খুব বিখ্যাত।

যাইহোক, শুরুর বছরগুলোতে আন নাহদার ধর্মীয় সার্কেল ছিল শায়খ তাহের বেন আশুরের শিক্ষা ও আইনী মতামত দ্বারা প্রভাবিত। বেন আশুর ছিলেন জায়তুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ও মালেকী মাজহাবের সমর্থক। কোরআনের যৌক্তিক উপস্থাপনা সমৃদ্ধ তাফসীর রচনায় তিনি ছিলেন অন্যতম পথিকৃৎ। মাকাসিদে শরীয়াহর (শরীয়াহর উদ্দেশ্য ও মূলনীতি) গুরুত্বের উপর তিনি জোর দিয়েছেন। অর্থাৎ, তিনি মনে করতেন, ইসলামী আইনের বাহ্যিক কাঠামেরার চেয়ে এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যই হলো অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর এই অবস্থান রক্ষণশীলদের বিরুদ্ধে যাওয়ায় ১৯৬০ সালে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জোরপূর্বক বের করে দেয়া হয়।

রশিদ ঘানুশীসহ আন নাহদার নেতৃবৃন্দের অনেকে রক্ষণশীলদের বিপরীতে আরেক ‘বিতর্কিত’ স্কলার তাহের হাদ্দাদের চিন্তাধারাকে প্রতিষ্ঠিত করতেও কাজ করেছেন। ‘শরীয়াহ ও সমাজের দৃষ্টিতে নারী’ শিরোনামের এক বইয়ে হাদ্দাদ জায়তুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলেমদের অতি রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ট্রেড ইউনিয়ন ও সমাজকল্যাণমূলক কাজকর্মের দিক থেকে তিনি রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন।

এই ব্যক্তিগণ স্পষ্টতই পবিত্র ধর্মগ্রন্থের শিক্ষার আলোকে তিউনিশিয়ার জন্য একটি প্রগতিশীল ও যৌক্তিক ধারা গড়ে তোলার জন্য কাজ করেছেন। রাষ্ট্রীয় আইন, বিশেষত, সামাজিক ও ব্যক্তিগত আইনগুলোর আধুনিকায়ন করার ক্ষেত্রে হাবিব বরগিবার জন্য তারা সহায়ক ভূমিকা পালন করেন।

ইসলামী দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিতর্ক ও ভাবনা আদান-প্রদানের ক্ষেত্র হিসেবে যে সব আন্তর্জাতিক ফোরাম রয়েছে কিংবা হাসান আল বান্নার মতো চিন্তাবিদদের চিন্তাধারার যে ধরন – সে সবের প্রভাবকে অস্বীকার করা এখানে আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু এইসব বাহ্যিক ফ্যাক্টরগুলোর প্রভাব যে মাত্রায় রয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন, সে ধরনের কোনো প্রভাব আসলে আন নাহদার উপর নেই। উল্লেখ্য, বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে এসব ফ্যাক্টর নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ। মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডের সাহিত্য আন নাহদার চিন্তার মৌলিক খোরাক জুগিয়েছে, এটা সত্য। তবে পরবর্তীতে স্থানীয় আদর্শিক পরিবেশ, তিউনিশিয়ার একান্ত নিজস্ব পরিস্থিতি ইত্যাদির আলোকে এসব সাহিত্যের নতুন ব্যাখ্যা এখানে দাঁড় করানো হয়েছে।

আমার বিশ্বাস, ইসলামী আন্দোলনগুলোর মধ্যে যারা তাদের প্রাথমিক প্রস্তাবনাকে আঁকড়ে ধরে রাখার চেয়ে বাস্তব রাজনৈতিক ময়দানে আরো বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে চায়, তাদের জন্য ‘গ্র্যান্ড সুওর’[5] (Grand Soir) হচ্ছে একদম নতুন একটি ধারণা। কেউ বলতেই পারেন, আন নাহদার প্রতিষ্ঠাকালীন প্রজন্ম ছিল বরগিবার ‘অবৈধ সন্তান’। কেউ হয়ত আরেক ধাপ এগিয়ে আরো বলতে পারেন – তারা জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে সামাজিক পুনর্জাগরণ এবং আধুনিক সরকার ব্যবস্থার অপরিহার্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন।

Tunisia’s Ennahda: Rethinking Islamism in the context of ISIS and the Egyptian coup’ শীর্ষক ওয়ার্কিং পেপারে মনিকা মার্কসও বলেছেন, মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শিক ও রাজনৈতিক উভয় অবস্থান থেকেই আন নাহদার সদস্যরা নিজেদেরকে স্বতন্ত্র মনে করে।[6] তারপরেও ২০১১ সালের বিপ্লবের পর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্লেষকরা আন নাহদাকে মুসলিম ব্রাদারহুডের একটি তিউনিশীয় শাখা হিসেবে বিবেচনা করছেন। ২০১১ সালে প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই দলটির পরিচয় নিয়ে এই জাতীয় অপব্যাখ্যা করা হচ্ছে। উপরন্তু, কয়েক দশক গোপন তৎপরতা আন নাহদার নিজস্ব ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক ধ্যানধারণার উপর যে প্রভাব ফেলেছিল, তারচেয়ে গত চার বছরের পরীক্ষামূলক সরকার পরিচালনা, অর্থাৎ প্রকৃত রাজনেতিক তৎপরতার প্রভাব আন নাহদার উপর আরো বেশি পড়েছে।

রাষ্ট্র পরিচালনা করতে  গিয়ে আন নাহদার উদ্দেশ্য ও দৃষ্টিভঙ্গির যে উন্নয়ন ঘটেছে, তার ফলে একটি আইনী সত্তা হিসেবে দলটির অবস্থান মজবুত হয়েছে। তদুপরী, অন্যতম গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দলটি পাবলিক পলিসি তৈরি ও সেসব বাস্তবায়নে সক্ষমতা অর্জন করেছে। আন নাহদার যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, বাইরে থেকে একে অলীক ও অবিশ্বাস্য ব্যাপার বলে মনে হতে পারে; ইসলামপন্থী বা অন্যান্য অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে যেমনটা সাধারণত হয়ে থাকে। অবশ্যই এই পরিবর্তন একটি অপরিহার্য ও দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। ২০১১ সালে বৈধতাপ্রাপ্তি এবং দুটি সেক্যুলার দলের কোয়ালিশনে প্রথমবারের মতো একটি সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আন নাহদার এই অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন প্রক্রিয়া সূচিত হয়।

ইসলামপন্থী অনেক রাজনৈতিক দলই (এক্ষেত্রে মরক্কোর জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (পিজেডি) কথা বলা যেতে পারে) নতুন ধরনের তৎপরতা ও কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করেছে। এ জাতীয় রাজনৈতিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে তারা এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য-উদ্দেশ্য তুলে ধরতে চায়। এ ভিশন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মাঝখানে সম্ভাব্য প্রতিবিপ্লব মোকাবেলা করার জন্য তারা সতর্ক।

২০১৫ সালের জুন মাসে ব্রুকিংস কর্তৃক দোহায় অনুষ্ঠিত ইউএস-ইসলামিক ওয়ার্ল্ড ফোরামে এ প্রসঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের (মিশর, মরক্কো, তুরস্ক, সৌদি আরব, কুয়েত ও জর্ডান) বিভিন্ন দেশের ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের তরুণ ইসলামপন্থী এক্টিভিস্টদের সাথে আমরা আলাপ-আলোচনা করেছিলাম।[7] তাতে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে, প্রতিটি দেশেরই স্থানীয় প্রেক্ষাপট ও নিজস্ব পরিকল্পনা রয়েছে। সবসময় বাইরের উদাহরণ খুঁজে না বেড়ানো সত্বেও বিভিন্ন ধরনের জটিলতা ও সমস্যা মোকাবেলায় অন্যদের মডেলও শিক্ষণীয় ও প্রেরণাদায়ক। যেমন, তুরস্কের একেপি ও মরক্কোর পিজেডি’র কাছ থেকে আন নাহদা রাষ্ট্রের সফল অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে।

এই দল দুটির বাস্তবমুখিতার ব্যাপারে বিশ্লেষকরা বিস্ময় প্রকাশ করলে আমি খুব অবাক হই। এই দলগুলোর আচরণ অন্তর্মুখী এবং সেকেলে ধর্মীয় ভাতৃত্ববোধে উদ্বুদ্ধ – বিশ্লেষকদের কথাবার্তায় এমন মনোভাব লক্ষ করা যায়। পাবলিক পলিসি তৈরিতে এই দলগুলোর অংশগ্রহণ ও রাষ্ট্র পরিচালনা সংক্রান্ত সকল তৎপরতা প্রকাশ্য থাকার পরও তারা এমনটা মনে করেন। উদারহণ হিসেবে আন নাহদার ‘তাজকিয়া’ (এর মাধ্যমে দলের কোনো সদস্য সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে ‘শপথ’ গ্রহণ করেন) প্রক্রিয়ার কথা বলা যায়। এটি কমবেশি একটি সহজ ও শর্তহীন অনুমোদন প্রক্রিয়ায় রূপ নিয়েছে। দল (হিজব) এবং আন্দোলনের (হারাকা) মধ্যকার চলমান বিভাজন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এ ধরনের আরো ব্যবস্থাপনামূলক কর্মপদ্ধতির আধুনিকায়ন করা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের, বিশেষত তিউনিশিয়ার মতো পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশগুলোর রাজনৈতিক দলের পেশাদারিত্বের দিকে আরো গভীর দৃষ্টি দেয়ার সময় এসেছে। রাষ্ট্রের চরিত্র, সামাজিক কাজ এবং ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যকার সম্পর্ক (শরীয়াহকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণের বিষয়টিসহ) সংক্রান্ত বিতর্কগুলো আন নাহদা বিবেচনায় নিয়েছে। ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গঠনতন্ত্র প্রণয়ন প্রক্রিয়া চলার সময় আমরা এগুলোর সমাধান করেছি। এর ফলে যে গঠনতন্ত্র প্রণীত হয়েছে, তা নিয়ে তিউনিশীয়রা খুবই গর্বিত। এটি এমনভাবে প্রণয়ণ করা হয়েছে, যার ফলে নিকট ভবিষ্যতে এতে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। বিদ্যমান সকল ডকুমেন্ট নিয়ে টানা চার বছর ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে এটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।

তারপরও যেসব রাজনৈতিক দল ২০১৪ সালের সংসদীয় নির্বাচনী প্রচারণার সময় সংবিধানের বিভিন্ন ত্রুটিবিচ্যুতি নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছিল, সেগুলোর সমাধানও করা হয়েছে। এমনকি কট্টর বামপন্থী দল ‘পপুলার ফ্রন্টে’র প্রার্থী হাম্মা হাম্মামি পর্যন্ত এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন না করা সত্বেও ভোটারদেরকে আশ্বস্ত করা দরকার মনে করেছেন। তিনি নিজেকে একজন মুসলমান এবং নবী মোহাম্মদকে (সা) ভালোবাসেন বলে দাবি করেছেন। এমনকি নিদা তিউনিসের মতো সেক্যুলার ও ইসলামপন্থা বিরোধী হিসেবে পরিচিত দলও সংসদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রচারণার সময় ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগিয়েছে। আমার মনে আছে, ‘ফ্রান্স ২৪’ চ্যানেলে এক অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ আসার পর নিদা তিউনিসের একজন তরুণ সদস্য আমাকে বলেছিল – ফ্রান্সের সাংবাদিকদের উচিত তাদেরকে ‘laique’ (ধর্ম থেকে রাজনীতির পৃথকীকরণের সমর্থক) বলা বন্ধ করা। কারণ তারা তেমনটি নয় এবং তিউনিশিয়ানদের কাছে নিছক এই পরিচয়ে পরিচিত হতে চায় না।[8]

জনগণের কাছে আন নাহদা যে ধরনের ইস্যুগুলোকে তুলে ধরেছে, তা থেকে এ জাতীয় দলগুলোর বিচক্ষণতা প্রতীয়মান হয়। ইসলাম ও রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের সাথে এর কোনো প্রকার সম্পর্ক নেই। কিংবা গতানুগতিক ‘ইসলামী’ ইস্যুর সাথেও এর সম্পর্ক নেই। বরং দুর্নীতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক সমস্যা ও মানবাধিকারের মতো ইস্যুগুলোর সমাধান করতেই আন নাহদা বদ্ধপরিকর।

লিগ্যাল অ্যাপ্রোচের ব্যর্থতা এবং তিউনিশিয়ায় মিশরীয় ক্যুর প্রভাব

রাজনৈতিক ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠান ও অগ্রাধিকার বিবেচনায় না নিয়ে মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড যে ধরনের ‘লিগ্যাল অ্যাপ্রোচ’ মানুষের কাছে তুলে ধরেছিল, তার ব্যর্থতা আরব বিশ্বের তরুণ প্রজন্মকে প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছে। সেখানকার ইসলামপন্থীরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে চেষ্টা করার পরও তাদেরকে  কখনো গ্রহণযোগ্য মনে করা হবে না। ব্যালট বাক্সের রায়ও সেখানে চ্যালেঞ্জের মুখে। নির্বাচন সেখানে ক্ষমতায় যাওয়ার আসল উপায় নয়। উপরন্তু, ইসলামপন্থীদের উপর সেনাবাহিনীর অকথ্য নির্যাতনের ফলে তারা রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মিশরে নিছক একটি সেনা অভ্যুত্থানই ঘটেনি, রাষ্ট্রের সাথে পুরো প্রজন্মের বিরোধ মিটিয়ে ফেলার যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা নষ্ট করা হয়েছে।  

তরুণ প্রজন্মের সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখানোর ঝুঁকি রয়েই গেছে, যদিও তা শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসু হবে না। অবশ্য ব্রাদারহুডপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত সেনাবাহিনীর নির্যাতনের বিরুদ্ধে সতর্কতার সাথে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। সহিংস কর্মকাণ্ডের ফাঁদে তারা পা দেয়নি। এরমানে হচ্ছে, মিশরে ISIS ও অন্যান্য চরমপন্থী গ্রুপগুলোর যে উত্থান ঘটেছে, তার সাথে সেনা অভ্যুত্থান ও ক্রাকডাউনের এক প্রকার সম্পর্ক রয়েছে। সহিংসতা নতুন সহিংসতারই জন্ম দেয়। এই পৈশাচিক চক্রকে স্বৈরতন্ত্র নিজেই লালন করে; সেই স্বৈরতন্ত্র সামরিক বাহিনী, সেক্যুলার মতাদর্শ কিংবা ইসলাম – যেই নামেই থাকুক না কেন। আরব বিশ্বের দেশগুলোর গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়া, মানবাধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষায় যথেষ্ট উদ্যোগী না হওয়ায় তথাকথিত ‘সার্বজনীন মূল্যবোধে’র বড়াই বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

সচরাচর বলা হয়, মিশরীয় অভ্যুত্থানের ফলেই আন নাহদা একটি টেকনোক্র্যাট সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে; যে সরকারের প্রধান কাজ ছিল এক বছরের মধ্যে সংসদ ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আয়োজন করা। আন নাহদার এই ‘পিছু হটা’র কারণ হিসেবে বলা হয়, মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুডের পতনের ফলে আন নাহদার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেছে। আমি মনে করি, এই ধরনের ব্যাখ্যা থেকে মোটেও পরিস্থিতির পুরো চিত্র উঠে আসে না। বরং, এর মাধ্যমে আসলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে এড়িয়ে যাওয়ারই চেষ্টা করা হয়।

প্রথম কথা হলো, ২০১৩ সালের গ্রীষ্মে তিউনিশিয়ায় যে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল তা মিশরীয় সেনা অভ্যুত্থানের কারণে নয়; বরং তিউনিশিয়ার শীর্ষস্থানীয় বামপন্থী রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ ব্রাহমিকে গুপ্তহত্যার কারণেই শুরু হয়েছিল। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরেক রাজনীতিবিদ শুকরি বেলায়েদকে গুপ্তহত্যার পর যে সংকট তৈরি হয়েছিল, এই ঘটনার পর তা পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মিশরীয় অভ্যুত্থান সম্ভবত এ্ই সংকটকে আরো ঘনীভূত করেছে এবং সেক্যুলার বিরোধী পক্ষকে তাদের দাবির পক্ষে জোরালো হতে ভূমিকা রেখেছে। তবে মোহাম্মদ মুরসীকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার আগেই তিউনিশিয়ার অভ্যন্তরীণ সংকট শুরু হয়েছিল।

এই ঘটনাকে ভালোভাবে বুঝতে হলে আমাদেরকে ২০১১ সালে শুরু হওয়া গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়ার একদম শুরুতে ফিরে যেতে হবে। ২০১১ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়লাভের অব্যবহিত পরের আন নাহদার অবস্থানকে বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। দলটি এককভাবে সরকার পরিচালনা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আদর্শিকভাবে ভিন্ন হওয়া সত্বেও সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী ‘কংগ্রেস ফর রিপাবলিক’ (সিপিআর) এবং সমাজতন্ত্রী ‘আত তাকাতুল’– এর সাথে আন নাহদা ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নিয়েছিল।

আমার মতে, এটি ছিল ২০০৫ সালের ১৮ অক্টোবরে গৃহীত সম্মিলিত সিদ্ধান্তেরই ধারাবাহিকতা। সেদিন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জাইন আল আবেদীন বেন আলীর বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলো সম্মিলিতভাবে কিছু মৌলিক বিষয়ে ঐক্যমত্যে পৌঁছার লক্ষ্যে একটি কার্যকর সংলাপ প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সে সিদ্ধান্তগুলোর সারসংক্ষেপ নিয়ে পরে একটি বইও প্রকাশ করা হয়েছিল। সে বইয়ে রাষ্ট্রের সিভিল চরিত্র, শাসন ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য, নাগরিক স্বাধীনতা ও নারী অধিকারের গুরুত্বসহ আরো কিছু ইস্যুতে গৃহীত সিদ্ধান্তের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে।[9] অন্য কথায়, ক্ষমতা ভাগাভাগি এবং পারস্পরিক হানাহানির ঊর্ধ্বে ওঠে পারস্পরিক সংলাপকে অগ্রাধিকার দেয়া আন নাহদার নীতিরই অন্তর্ভুক্ত। যা মিশরীয় সেনা অভ্যুত্থান, এমনকি ২০১১ সালের অভ্যুত্থানের আগে থেকেই ছিল।

রশিদ ঘানুশী শুরু থেকেই সবসময় ছোট বড় দলগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা না করে, যথাসম্ভব সবাইকে নিয়ে, গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর যুক্তি ছিল, অগ্রগতির পথকে নিরাপদ রাখার এটাই হচ্ছে সবচেয়ে ভালো উপায়। সকল রাজনৈতিক পক্ষকে আমন্ত্রণ জানানোর এই উদ্যোগ থেকে বুঝা যায়, গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে রাজনৈতিক বাধাগুলোকে ন্যূনতম মাত্রায় রাখা আন নাহদা নেতৃবৃন্দের সুস্পষ্ট অঙ্গীকারেরই অংশ। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক উদারতা দেখানো ঘানুশীসহ আন নাহদার অন্যান্য নেতৃবৃন্দের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। পুরানো শাসন ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেয়া হবে কি হবে না, ২০১৩ সালে সৃষ্ট এই বিতর্ক থেকে আমরা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি – উত্তরণ প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখতে চাইলে ‘বর্জনের নীতি’ (exclusion) কোনো সমাধান হতে পারে না। ইরাক ও লিবিয়ায় স্থিতিশীলতা না আসার পেছনেও এ ধরনের শুদ্ধি অভিযানের দায় ছিল। তিউনিশিয়ায় যেন এর পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য আন নাহদার সংসদ সদস্যরা প্রস্তাবিত electoral exclusion law– এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। ঐক্য ও সমাঝোতার পক্ষে আন নাহদার এই আহ্বানে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

সংসদীয় নির্বাচনে আন নাহদার প্রার্থীদের প্রধান হিসেবে আমি জাতীয় ঐক্যের জন্য প্রচারণা চালিয়েছি, কোয়ালিশন সরকারের প্রস্তাবনার পক্ষে কথা বলেছি। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে কার্যকর সংস্কারের স্বার্থে একাধিক রাজনৈতিক শক্তিকে সমর্থন করা গুরুত্বপূর্ণ – ভোটারদেরকে এই ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে বোঝাতে অনেক পরিশ্রম ও সময় ব্যয় করতে হয়েছে। একটি ব্যাপক ও নজিরবিহীন রাজনৈতিক ভারসাম্য দিয়ে কী লাভ হবে, তা বুঝানো খুব একটা সহজসাধ্য ব্যাপার ছিল না।

শুরা কাউন্সিলে ব্যাপক তর্ক-বিতর্কের পর আন নাহদা এই অবস্থান গ্রহণ করেছিল। লিবীয় বিপ্লবীদের নেতিবাচক পদক্ষেপ, ইরাকের অবনতিশীল অবস্থা এবং সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে অধিকাংশ তিউনিশীয় বুঝতে পেরেছে, রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলায় শুদ্ধি অভিযান সবসময় কার্যকর নয়। আমরা সে ধরনেরই একটা সংকট মোকাবেলা করছি।

আরেকটা বিষয় মনে রাখা দরকার। সেটা হচ্ছে, ‘কন্সিটিটিউয়েন্ট এসেম্বলি’র বিলুপ্তি এবং সংবিধান রচনা সংক্রান্ত আলোচনা থেকে আন নাহদা পুরোপুরি বাদ পড়ে যাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি ছিল। এটি ঘটলে, যে কোনো বিবেচনায়ই, তা হতো পুরো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া লাইনচ্যুত হওয়ার মতো ব্যাপার। যাইহোক, অস্থায়ী টেকনোক্র্যাট সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগেই আলী লারায়েদের নেতৃত্বাধীন আন নাহদার সরকার সংবিধান চূড়ান্ত করতে পেরেছিল। এর মাধ্যমে আন নাহদা সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে অক্ষুন্ন রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এই অর্জনকে আন নাহদা একটি বিরাট সফলতা হিসেবে বিবেচনা করে। আন নাহদার আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহের ক্ষেত্রে মিশরীয় পরিস্থিতি শিক্ষণীয় বাস্তব উদাহরণ হিসেবে ক্রিয়াশীল ছিল।

একবিংশ শতাব্দীতে কোনো রাজনৈতিক দলের মুসলিমডেমোক্র্যাট হওয়ার তাৎপর্য

পারস্পরিক মতপার্থক্য থাকা সত্বেও ইসলামপন্থী হিসেবে পরিচিত নানা ঘরানার রাজনৈতিক পক্ষকে মিডিয়া যাতে তাৎক্ষণিক ও সঠিকভাবে বুঝতে পারে, সেই জন্যে রশিদ ঘানুশীই প্রথম এই পরিভাষাটি ব্যবহার করেন। আন নাহদাকে বুঝার জন্য সবচেয়ে সহজ উপায় হলো একে ইউরোপের খ্রিষ্টান-ডেমোক্র্যাট রাজনৈতিক দলগুলোর মতো বিবেচনা করা। যেমন, জার্মানীর ‘ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নে’র মতো দলগুলো একইসাথে গণতন্ত্রের মূলনীতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধারণ করে।

আন নাহদার এই নতুন পরিচয়ে দলটির ভেতর ও বাইরের অনেকেই প্রথমে অবাক হয়েছিল। রাজনৈতিক ময়দানে এই পরিবর্তনের (আদৌ ‘পরিবর্তন’ হয়ে থাকলে আর কি!) কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে তারা উৎসুক ছিলেন। বাস্তবতা হলো, মুসলিম বিশ্বে বর্তমানে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে বিদ্যমান কোনোকিছুকে গ্রহণ করার জন্য আমরা এমন কোনো পরিভাষা ব্যবহার করতে পারি না, যা যথেষ্ট নেতিবাচক হিসেবে ইতোমধ্যে পরিচিতি পেয়েছে। অধিকাংশ মুসলমান মনে করেন, ISIS এবং অনুরূপ অন্যান্য গোষ্ঠী ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে, এর অপব্যবহার করছে। এরা নিজেদের নিষ্ঠুর ও অমানবিক কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সীমাহীন বর্বর যুদ্ধের পক্ষে ধর্মকে একটি মার্কেটিং টুল হিসেবে ব্যবহার করছে। আমরা বিশ্বাস করি, ISIS-এর মোকাবেলায় আমাদের সত্যিকারের ভূমিকা রয়েছে। সহিংসতা, বর্বরতা, আধুনিক রাষ্ট্র, নাগরিক স্বাধীনতা ও শরীয়াহর মূল উদ্দেশ্য (মাকাসিদ আশ-শরীয়াহ) – এই ইস্যুগুলোকে ধর্মীয় ব্যাখ্যার প্রামাণ্য ও স্বীকৃত উৎসগুলোর আলোকে আন নাহদার সদস্যদের মধ্যকার আলেমগণ যাচাই করেছেন।

সহিংস এবং বিপজ্জনক আদর্শের অনুসারী যে কোনো দল থেকে আমরা দূরত্ব বজায় রেখে চলি। আসলে আমরা এর বিরুদ্ধেই লড়ছি। তাই এদের সাথে আমাদের সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে খুব বেশি কথা বলা আমাদের জন্য সময় ও শক্তির অপচয় মাত্র। দেখুন, ফরাসী সমাজতন্ত্রী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদকে কেউই প্রকৃতপক্ষে জর্জ সিপ্রিয়ানির সাথে যুক্ত করে না। যদিও সিপ্রিয়ানি ছিলেন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘অ্যাকশন ডিরেক্টে’র নেতা। এই দুই নেতাই এমন সব রাজনৈতিক গ্রুপ থেকে উঠে এসেছেন, যারা একই মতাদর্শ থেকে অনুপ্রাণিত বলে দাবি করে। অথচ ISIS ও অন্যান্য চরমপন্থীদের সাথে আমাদের পার্থক্য সবার কাছে পরিষ্কার থাকা সত্বেও দুঃখজনকভাবে আমাদের ক্ষেত্রে অনুরূপ ধরনের আচরণ করা হয় না।

আন নাহদাকে এক কথায় ব্যাখ্যা করার জন্য মুসলিম-ডেমোক্র্যাট হলো সবচেয়ে সঠিক পরিভাষা। কারণ দলটি শুরু থেকেই আরব বিশ্বে ইসলাম ও গণতন্ত্রের মধ্যে বিরোধ মীমাংসার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে।

রেফারেন্স ও নোট

[1] Monica Marks, “Tunisia’s Ennahda: Rethinking Islamism in the context of ISIS and the Egyptian coup,” Brookings Institution, August 2015. http://www.brookings.edu/~/media/Research/Files/Reports/2015/07/rethinking-political-islam/Tunisia_Marks-FINALE.pdf?la=en.

[2] Avi Spiegel, “Succeeding by surviving: Examining the durability of political Islam in Morocco,” Brookings Institution, August 2015. http://www.brookings.edu/research/reports2/2015/08//~/media/Research/Files/Reports/2015/07/rethinking-political-islam/Final-Working-Papers/Morocco_Spiegel_FINALv.pdf

[3] Steven Brooke, “The Muslim Brotherhood’s Social Outreach after the Egyptian Coup,” Brookings Institution, August 2015. http://www.brookings.edu/~/media/Research/Files/Reports/2015/07/rethinking-political-islam/Egypt_Brooke-FINALE.pdf?la=en.

[4] ইসলামী শরীয়াহর বিধিবিধান বাস্তবায়ন করার জন্য যারা অধিকতর আগ্রহী এবং এসব বিধিবিধান প্রতিপালিত হওয়ার ভিত্তিতে কোনো সমাজে ইসলাম কতটুকু প্রতিষ্ঠিত আছে, তা পরিমাপ করায় যারা আগ্রহী – ইসলাম সম্পর্কে কারো এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিকে আমরা লিগালিস্ট অ্যাপ্রোচ বলতে পারি। – অনুবাদক

[5] ‘গ্রান্ড সুওর’ এর উৎপত্তিগত অর্থ হলো সাম্যবাদী ও উদ্দেশ্যবাদী (teleological) মতের সমন্বয়ে একটি সামাজিক অভ্যুত্থান, যা প্রাথমিকভাবে পুঁজিবাদকে উৎখাত করে এবং একইসাথে নতুন একটি ব্যবস্থা সমাজে কায়েম করে। – অনুবাদক

[6] Monica Marks, “Tunisia’s Ennahda: Rethinking Islamism in the context of ISIS and the Egyptian coup,” Brookings Institution, August 2015. http://www.brookings.edu/~/media/Research/Files/Reports/2015/07/rethinking-political-islam/Tunisia_Marks-FINALE.pdf?la=en.

[7] “The Arab uprisings and the next generation of Islamists,” Brookings Institution, June 2015. http://www.brookings.edu/research/opinions/2015/06/next-generation-islamists.

[8] “Tunisie : quels sont les défis qui attendent le nouveau pouvoir ? [Tunisia: What are the challenges facing the new government?],” France 24. October 28 2014, https://www.youtube.com/watch?v=M0CYOnO34LU

[9] “Notre voie vers la démocratie [Our path to democracy],” Collectif 18 octobre pour les droits et des libertés en Tunisie [The 18 October Coalition for Rights and Freedoms in Tunisia], June 15, 2010, https://goo.gl/nPTn8s

One thought on “আন নাহদা কি ইসলামপন্থী, নাকি মুসলিম ডেমোক্র্যাট?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *