রবিবার, অক্টোবর ২২, ২০১৭
হোম > সমসাময়িক > পলিটিক্যাল ইসলামের আবেদন কি সমাপ্তির পথে?

পলিটিক্যাল ইসলামের আবেদন কি সমাপ্তির পথে?

এডিটর’স নোট:

সমসাময়িক বিশ্বে ইসলাম নিয়ে যৌক্তিক ও জোরালো বক্তব্যের জন্য তারিক রমাদান খুব পরিচিত ব্যক্তিত্ব। তিনি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির কনটেম্পোরারি ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক। অক্সফোর্ডের ধর্মতত্ত্ব অনুষদের ফ্যাকাল্টি মেম্বারও তিনি। তারিক রমাদান বিশ্বের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর। কাতারভিত্তিক Research Centre for Islamic Legislation and Ethics (CILE)-এর তিনি পরিচালক। তাঁর বিখ্যাত বইগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো Radical Reform: Islamic Ethics and Liberation; The Quest for Meaning: Developing a Philosophy of Pluralism; The Arab Awakening: Islam and the New Middle East। ২০১২ সালে প্রকাশিত Islam and the Arab Awakening বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ের একটি অনুচ্ছেদ সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছেন আবিদুল ইসলাম  চৌধুরী


‘রাজনৈতিক ইসলামের দিন কি সমাপ্তির পথে?’ গত বিশ বছরের বেশি সময় ধরে এ ধরনের প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ইরান, আলজেরিয়া এবং মিশরের মতো দেশগুলোর নাজুক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে অলিভার রয় তার The Failure of Political Islam বইয়ে এ ধরনের একটা উপসংহার টানার চেষ্টা করেছেন। অথচ ‘ইসলামিজম’ এবং ‘পলিটিক্যাল ইসলাম’ (রাজনৈতিক ইসলাম) নিয়ে স্কলারগণ পরিষ্কার কোনো সংজ্ঞাই এ পর্যন্ত দাঁড় করাতে পারেননি! ‘ইসলামিজম’ এবং ‘পলিটিক্যাল ইসলাম’- এ শব্দদ্বয়ের দু’ধরনের বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে। সেগুলো বিশ্লেষণ করলে এই প্রশ্নটা উঠে আসে: কীসের ভিত্তিতে ‘পলিটিক্যাল ইসলামের’ পতন সম্পর্কে পূর্বাভাস (?) করা হচ্ছে?

সাংঘর্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি
সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামোবিহীন, সুস্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যহীন বিশৃঙ্খল এমন কিছু গ্রুপ, যারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে নিরীহ মানুষ হত্যা করে চলছে- তাদের কর্মকাণ্ডকে ‘পলিটিক্যাল ইসলাম’ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা কি যথাযথ কাজ? অন্যদিকে, এই ধারার বিপরীত চিত্র হলো ক্রমবিকাশমান তুরস্ক ‘মডেল’। এই ধারা নাজিমুদ্দিন এরবাকান থেকে এরদোয়ান পর্যন্ত বিবর্তিত হয়ে আজকের জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। তাই কোন যুক্তিতে একেপি’র মতো দলকে ‘পলিটিক্যাল ইসলামে’র উদাহরণ হিসাবে বিবেচনা করা হবে না? এ প্রসঙ্গে আরো কিছু প্রশ্ন উঠে আসে।

বিশ শতক থেকে শুরু করে আজকের একুশ শতক পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলনগুলোতে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে? তাদের কি এখনো পলিটিক্যাল ইসলামের ধারক-বাহক হিসেবে অভিহিত করা যাবে? একইসাথে ইসলামের নামে গণতন্ত্র ও নির্বাচন প্রত্যাখ্যানকারী সৌদি আরবসহ রাজতান্ত্রিক শাসকদের চাপিয়ে দেয়া আদর্শকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? এ ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত নিছক রাজনৈতিক আদর্শ প্রভাবিত নয় কি? এটাও কি এক ধরনের রাজনৈতিক আদর্শ নয়, যা ইসলামের একটা নির্দিষ্ট বুঝজ্ঞানের আলোকে গড়ে উঠেছে? যে কোনো পশ্চিম বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য ইসলামকে কাছে টানা একটা চমৎকার কৌশল। এতেও অনেকের গায়ে ‘ইসলামিস্ট’ লেবেল লেগে যায়।

যাহোক, ‘পলিটিক্যাল ইসলামে’র পতন ঘোষণা করার আগে সংশ্লিষ্ট গবেষকদের উচিৎ ছিল এর একটি সর্বসম্মত সংজ্ঞা দাঁড় করানো। যাতে করে সকলে বুঝতে পারেন, এই টার্মটা আসলে কী ধরনের অর্থ বহন করে। অথচ এখনো পর্যন্ত এ ব্যাপারে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজতত্ত্ববিদসহ অন্যান্য পণ্ডিতরা ন্যূনতম ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছেন।

পলিটিক্যাল ইসলামের বিবর্তন
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বিশ ও একুশ শতকের শুরুতে ইসলামী সংগঠন এবং আন্দোলনগুলো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সময় পার করেছে। জামালুদ্দিন আফগানী ও মুহাম্মদ আবদুহ’র মতো উপনিবেশবিরোধী নেতৃস্থানীয় এবং সমসাময়িক ইসলামপন্থীদের কর্মপন্থা বিবেচনা করলে পার্থক্যগুলো সহজে ধরা পড়বে। দেখা যায়, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে ইসলামিস্টরা তাদের মতাদর্শ ও কর্মপন্থার পরিধিকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করেছেন। এতে অবশ্য সফলতা ও ব্যর্থতা- উভয়ই ছিল।

মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুডের সর্বোচ্চ পরিষদ ‘দ্যা গাইডেন্স ব্যুরো’ (মাকতাব আল-ইরশাদ) গত একশত বছরে তাদের পুরোনো অবস্থান থেকে সরে এসেছে। গণতন্ত্র, নারী অধিকার, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ এবং সুশীল সমাজের ভূমিকার ব্যাপারে ব্রাদারহুডের এই শীর্ষ পরিষদ নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবতার আলোকে পরিবর্তন করেছে। দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মকৌশলের ক্ষেত্রে পুরাতনদের সাথে নতুন প্রজন্মের মিল না থাকায় স্বভাবতই মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়। ব্রাদারহুডের নেতৃত্ব পর্যায়ে নতুনরা যখন আসতে থাকে তখন পুরো সংগঠনটিতে একটা অব্যাহত পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। তাহলে কি বলবো, নতুন প্রজন্ম পূর্বসূরীদের আদর্শকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে? নতুন প্রজন্ম কি ‘ইসলামপন্থী’ নয়? এ ধরনের চূড়ান্ত উপসংহার টানা বোধহয় উচিত হবে না।

তবে এটা স্বীকার করতে হবে যে, পলিটিক্যাল ইসলামের ধারক-বাহকদের একটা গ্রহণযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এ পরিবর্তন শুধু যে পরিভাষাগত- তা নয়, বরং মতাদর্শ এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে প্রাধান্য দেয়ার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেও তা নিহিত।

গত একশত বছরে যেসব বাধা-বিপত্তি ও প্রতিকূলতা ছিল, তাতে এরচেয়ে বেশি আর কী হতে পারতো? মরক্কো থেকে মিশর, তিউনিশিয়া-আলজেরিয়া থেকে লিবিয়া, সিরিয়া; এমনকি পাকিস্তান, ভারত, ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়াসহ সব জায়গায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

এর আলোকে ইরানের অভিজ্ঞতাও শিক্ষণীয় বলা যায়। দার্শনিক আবদুল করিম সুরাশ থেকে শুরু করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মীর হোসাইন মুসাভীর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরাও তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হওয়ার আগ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবকে সমর্থন করেছিলেন। পরবর্তীতে তাদের অবস্থানের পরিবর্তন হয় এবং বিপ্লবী শাসনব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনার পক্ষে তারা আওয়াজ তোলেন। নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কারণে অনেকেই ইসলামের রাজনৈতিক দিকটি প্রয়োগের পক্ষপাতি নন। মুসাভী, মেহেদী কারোবী, সংস্কারপন্থী নয়া প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানীসহ সংস্কারপন্থীদের অনেকেই একে সমর্থন করে বিপ্লবী চেতনার মৌলিক আদর্শের উপর আস্থাশীল রয়েছেন বলে দাবি করেন। তবে ক্ষুদ্র একটা ধর্মীয় গ্রুপ কর্তৃত্ববাদী শাসনের ছড়ি ঘুড়াবে- এমনটাও তারা চাননি। তাদের মতে, এ ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা মৌলিকভাবেই বিপ্লবী চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক।

একটা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রূপরেখা কী হওয়া দরকার, এ নিয়ে তাদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। কিন্তু এ জন্য তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তারা ‘ইসলামে’র চেতনাকে বাদ দিতে রাজি নন। প্রকৃতপক্ষে, তারা শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং নির্বিচারে গ্রেফতার, অযাচিত বিধি-নিষেধ আরোপ এবং পুরোহিততান্ত্রিক স্বজনপ্রীতি বন্ধ করার দাবি জানান। বস্তুত এ ধরনের নেতিবাচক পদক্ষেপগুলো শুধুমাত্র ইসলামের মূলনীতিকেই শুধু লঙ্ঘন করে না, ৭৯’র বিপ্লবের মূলনীতির বিরুদ্ধাচরণও বটে। অথচ ইসলামের নামে সেই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতি চর্চা করার জন্যে, ক্ষমতার দাপট দেখাতে নয়।

ইসরাইলের ডেইলি হারেৎজ এবং রয়টার্সের (তৎকালীন) এক ভাষ্য অনুযায়ী, আহমদিনেজাদ এবং মুসাভীর নীতির মধ্যে বারাক ওবামা কোনো পার্থক্য দেখতে পান না। দু’জনের যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, দু’দেশের ভবিষ্যত সম্পর্ক হতে পারে উত্তেজনাপূর্ণ। বাস্তবতা হচ্ছে ইরানের শাসনব্যবস্থা আগের চেয়ে শক্তিশালী। এ অবস্থায় দেশ দুটো ভবিষ্যতে একসাথে কাজ করবে এমনটা আশা করা যায় না। লেবাননের হিজবুল্লাহ আর সিরিয়ার সাথে ইরানের রাজনৈতিক মিত্রতাও এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় বটে।

তুরস্কের উদাহরণটাও ফেলে দেয়ার মতো নয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এরদোয়ান এবং তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক গুরু সাবেক প্রধানমন্ত্রী এরবাকানের মধ্যে সুস্পষ্ট ও বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। এরবাকান যখন ক্ষমতায় আসলেন ততদিনে তিনি একজন পুরোদস্তুর অর্থনীতিবিদ। বিংশ শতকের প্রথম দিকে জন্ম নেয়া ‘ইসলামিজম’এবং ‘প্যান-ইসলামিজম’র চেতনা তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। ফলে তিনি জি-৮ এর পাল্টা একটি অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরিতে উদ্বুদ্ধ হন। এ লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে তিনি তুরস্কের অর্থ ও পররাষ্ট্রনীতিকে দক্ষিণ ও পূর্বমুখী করে তোলেন। তারপর তিনি মিশর, ইরান, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও পাকিস্তানকে নিয়ে গঠন করেন ডি-৮।

অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভরকেন্দ্র পরিবর্তনে মুসলিম প্রধান দেশগুলো পরস্পর একসাথে কাজ করবে– এ প্রত্যাশায় ডি-৮ গঠন করা হয়েছিল। সে সময় এরবাকান বলেছিলেন, “ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের হার যেখানে ৭০-৮০ শতাংশ, সেখানে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের হার মাত্র ৭ শতাংশ। আমাদেরকে অবশ্যই বাণিজ্যের এই হার বাড়াতে হবে।”

উদ্দেশ্যটা ছিল পরিষ্কার- নিজ দেশে ইসলামীকরণ নীতির পাশাপাশি বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থার মধ্যেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে একটা নতুন ‘ইসলামী’ ক্ষমতা বলয় তৈরি করা। যদিও সেই প্রজেক্টটা ব্যর্থ হয়েছে, তবে এর মাধ্যমে এরদোয়ান এবং তার সাবেক গুরু এরবাকানের মধ্যকার পার্থক্যগুলো দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এরবাকান ছিলেন ইসলামপন্থী। তিনি কঠোরভাবে পুঁজিবাদবিরোধী নীতি অনুসরণ করতেন। তবে তার মতে, সেটা কমিউনিজমের নীতি নয়, বরং ‘অন্য কোনো উপায়’। এরদোয়ান অবশ্য ভিন্ন পথে চলেছেন। তিনি তুরস্কের বৈদেশিক নীতিকে ইউরোপ ও পাশ্চাত্যের দিকে ফিরিয়ে নেন। মূলত অর্থনৈতিক কারণে তিনি তুরস্ককে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে আবেদন করেন। সেক্যুলারিজমকে মেনে নিয়ে সাংবিধানিক সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন এবং পুরনো ইসলামী স্লোগানগুলো পরিহার করেন। এসবের মাধ্যমে এরদোয়ান তুরস্কের অগ্রাধিকারগুলোকে ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে তুরস্কের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে হবে। বৈশ্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য নিয়মকানুনগুলো অনুসরণ করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তুরস্ক অপরিহার্য শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ‘জিরো প্রবলেম’ নীতি এর একটা উদাহরণ।

পুঁজিতান্ত্রিকতা ও পলিটিক্যাল ইসলাম
তুরস্কের ঘরোয়া রাজনীতিতে একেপি একটি রক্ষণশীল দল। দলটি ইসলামের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং নৈতিক অনুশাসনের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে একেপি কোনোভাবেই সৌদি আরবের মতো ইসলামের আক্ষরিক বয়ান প্রচারের পক্ষে নয়। তারা বরং ইসলামের সংস্কারপন্থী ধারার পক্ষে। তবে উভয়েরই রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক এমন মিল রয়েছে, যা আলাদা করে চিহ্নিত করা যায় না। উভয় পক্ষই আদর্শের জায়গায় ইসলামকে নয়া উদারবাদী পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সাথে সমন্বয় করে নেয়।

দেখা যায়, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো রাষ্ট্রে এই পরিস্থিতির উদ্ভব হলে একে ‘ইসলামপন্থী’ হিসেবে অভিযুক্ত করতে পাশ্চাত্য এক ধরনের অস্বস্তিতে ভোগে। অবস্থাটা এমন যেন, পুঁজিবাদ বিরোধিতার মাত্রা যে দেশে যত কম, সেই দেশ তত কম ইসলামপন্থী। অন্যভাবে বলা যায়, পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থাকে মেনে নিয়ে ইসলাম নিজেকে যতটুকু মেলে ধরতে সক্ষম হয়, রাজনীতি বিজ্ঞানে ইসলামের মাত্রা ততটুকু পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য। বাজার ব্যবস্থার এই শর্ত মেনে নিলে ইসলামপন্থীদের আর রক্ষণশীল বা অগণতান্ত্রিক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় না। যেমন, তেলসমৃদ্ধ রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর রক্ষণশীলতাকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে মেনে নেয়া হয়। সেখানকার শাসন ব্যবস্থাকে সব দিক থেকে ‘নব্য উদারপন্থা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এগুলো আসলে নতুন কোনো বিষয় নয়। জামালুদ্দিন আফগানীর ‘প্যান ইসলামিজম’ আদর্শ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে, বিংশ শতকের শুরুর দিকে যেসব ইসলামপন্থী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল সেগুলোর বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছিল। সে সময় জামালুদ্দিন আল আফগানীর ‘প্যান-ইসলামিজমে’র ধারণাকে অত্যন্ত ভয়ংঙ্কর আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কারণ সেটা তখন মুসলিম বিশ্বকে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে চেষ্টা করেছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল উপনিবেশবাদী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

তার অনেক বছর পর মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল বান্না মিশরের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক আকারে ভূমি-সংস্কার আন্দোলন গড়ে তোলেন। বাজার অর্থনীতির খপ্পর থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের উদ্যোক্তাদের বাঁচাতে গড়ে তোলা হয়েছিল এই আন্দোলন। ব্যাপক সাফল্যের পরেও পরবর্তী কয়েক বছরে আন্দোলনটি স্তিমিত হয়ে পড়ে। কারণ জামাল আব্দুল নাসের সমাজতান্ত্রিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের গড়ে তোলা বিকল্প ব্যাংক ব্যবস্থা এবং ফার্মগুলো বন্ধ করে দেন।

এ দৃষ্টিকোণ থেকে, ফ্রান্সিসকনের যাজক লিওনার্দো বফ ও আর্চবিশপ হেল্ডার কামারা এবং পেরুর যাজক গুস্তাব গুটিয়্যর্জ- এই তিনজন সত্তরের দশকে খ্রিস্টান লিবারেশন থিওলজির যেসব মূলনীতি প্রণয়ন করেন, তার সাথে পলিটিক্যাল ইসলামের সম্পর্ক খুবই কাছাকাছি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাইয়েদ কুতুব পুঁজিবাদের মৌলিক সমালোচনা করে গেছেন। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম প্রবক্তা আলী শরীয়তীও (তাকে কেউ কেউ ‘ইসলামী মার্কসবাদী’ মনে করেন) একই ধারায় পুঁজিবাদের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু সারা বিশ্বের ইসলামপন্থীরা, এমনকি মুসলিম ব্রাদারহুডও সাইয়েদ কুতুবের এই কর্মপন্থা সব সময় অনুসরণ করেনি। বরং তা থেকে তারা অনেক দূরে সরে গেছে। সিরিয়ার ব্রাদারহুড নেতা মোস্তফা আস-সিবায়ি ‘সমাজতান্ত্রিক ইসলামে’র ধারণাটা নিজের লেখনীর মাধ্যমে সবার কাছে তুলে ধরেন। এ ধরনের কাজ সমসাময়িক অন্যান্য ইসলামপন্থী নেতাদের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি।

সময়ের আবর্তনে সবকিছু খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যায়। যেমনটা হয়েছে বিশ্বের পুরোনো এবং নতুন প্রজন্মের ইসলামপন্থীদের প্রভাবশালী ধারাটির পরিবর্তনের ক্ষেত্রে। উভয় প্রজন্ম বেশ সোৎসাহে রাজনৈতিক সংস্কারের পক্ষে জোরালো আওয়াজ তুলছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। তারা যতই গলা ফাটিয়ে সমালোচনা করুক না কেন, প্রচলিত অর্থনৈতিক (পুঁজিতান্ত্রিক) ব্যবস্থার ব্যাপারে তাদের কোনো আপত্তি নেই।

এতে কোনো সন্দেহ নেই- গণতন্ত্র, আইনের শাসন, নাস্তিকতা ও নারীর ক্ষমতায়ন- এসবই এখন প্রধান ইস্যু হিসেবে বিদ্যমান। পলিটিক্যাল ইসলামের ধারণা খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতিকে প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে ঐক্যমত তৈরি হয়েছে। তাই এই বিবর্তনকে পলিটিক্যাল ইসলাম হিসেবে বিবেচনা করা আর সম্ভব নয়- এহেন উপসংহার টানা নিশ্চিতভাবেই ত্বড়িত পদক্ষেপ ও দুঃসাহসিক কাজ।

রূপান্তরের ধারায় চলতে থাকলে ‘ইসলামিজমে’র ফল হবে ইতিবাচক। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে এর মৌলিক বিশ্বাস বা আবেদন এখনো রয়ে গেছে। ‘ইসলামিজম’ সম্পর্কিত তর্ক-বিতর্ক যে আবারো শুরু হয়েছে, মিশর ও তিউনিশিয়ায় রাজনৈতিক উত্থান পরবর্তী ঘটনাই হলো তার প্রমাণ। পলিটিক্যাল ইসলামের সমর্থকরা ঐতিহাসিকভাবেই নানা বাধার সম্মুখীন হয়ে আসছে। বিরোধী স্বৈরশাসকরা বিভিন্ন মেয়াদে তাদেরকে বছরের পর বছর কারাদণ্ড, শারীরিক নির্যাতন এবং নির্বাসনে যেতে বাধ্য করেছে। যা কিছুই ঘটুক না কেন, কেউ ইসলামপন্থী হোক কিংবা না হোক, সবার সামাজিক এবং রাজনৈতিক জীবনে ‘ইসলাম’ এখনো প্রাসঙ্গিক হিসেবে রয়ে গেছে।

ইসলামের উৎস বা রেফারেন্সের ভবিষ্যৎ কী দ্বারা নির্ধারিত হবে- তা নির্ভর করবে ইসলামের শক্তি এবং প্রেরণার উপর। মানুষ নিজের মধ্যে এই প্রেরণা ও শক্তি ধারণ করতে শুরু করেছে। তারা রাষ্ট্র পরিচালনা, স্বাধীনতা, মুক্তি, বহুত্ববাদিতা, প্রযুক্তিগত ও সাংস্কৃতিক বিশ্বায়নসহ আধুনিক সময়ের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে শিখেছে। শুধু তাই নয়, যে সংকট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে, তাকেও মোকাবেলা করার সাহস করছে। আসল ব্যাপার হলো, ইসলাম নিজে থেকেই এসব বিষয়ে মূল্যায়ন বা ব্যাখ্যা দিতে পারে। আর এটাই প্রমাণ করে যে পলিটিক্যাল ইসলাম এখনো নিঃশেষ হয়ে যায়নি। তবে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সন্ধিক্ষণের মুখোমুখি হচ্ছে। গতিশীল ইতিহাসের নানা পরিবর্তনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পলিটিক্যাল ইসলাম ভারসাম্য বজায় রাখতে পেরেছে। নয়া রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ভূ-কৌশলগত পরিবেশের সাথেও নিজেকে মানিয়ে নিতে পেরেছে।

আবিদুল ইসলাম চৌধুরী
আবিদুল ইসলাম চৌধুরী
লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তজার্তিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

One thought on “পলিটিক্যাল ইসলামের আবেদন কি সমাপ্তির পথে?

আপনার মন্তব্য লিখুন