On Being প্রোগ্রাম থেকে আমি ক্রিস্টা টিপেট বলছি। আজ আমরা এসেছি ইস্তান্বুল শহরে। ধর্ম এবং গণতন্ত্রকে সমন্বয় করে গড়ে ওঠা উদীয়মান তুর্কি মডেলকে এগিয়ে নেয়ার পেছনে কোন বিষয়গুলো কাজ করছে- সেগুলো নিয়ে কথা বলছি মোস্তফা আকিউলের সাথে। ২০০২ সালে এরদোয়ানের মতো ধার্মিক মুসলিম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় অনেকেই নাখোশ হয়েছিলেন। পশ্চিমা এবং তুর্কি রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এ দেশের রাজনীতিতে ‘ইসলামিজম’ অনুপ্রবেশের আশঙ্কার কথা প্রচার করে ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তবে বর্তমান আধুনিক তুরস্কে এক অভিনব পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একদিকে রয়েছে আতাতুর্কের সেক্যুলার সংস্কৃতি আর অন্যদিকে এরদোয়ান প্রবর্তিত ধর্মীয় স্বাধীনতা। কট্টর সেক্যুলারিজমের প্রভাবের মধ্যে ধর্মীয় স্বাধীনতা চর্চার পরিবেশ তৈরি করেছেন এরদোয়ান। তুমুল জনপ্রিয়তার কারণে টানা তিন বার সাধারণ নির্বাচনে জয় লাভ করেছেন তিনি। সে হিসেবে তুরস্কের ইতিহাসে এরদোয়ান দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা একমাত্র নেতা। অথচ একটা সময় ছিল যখন তুরস্কে আতার্তুকের কট্টর সেক্যুলারিজমের উত্তরসূরী শাসকরা জনসম্মুখে সব ধরনের ধর্মীয় আচার নিষিদ্ধ করেছিল। সে সময়কার বিতর্কিত আইনের কারণে ধার্মিক মুসলিম নারীরা এমনকি স্কার্ফের উপর পরচুলা লাগিয়ে রাস্তায় বের হতেন। আজ সে বিতর্কের স্রোত উল্টো দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী নিজেই এখন হেডস্কার্ফ পরিধান করেন।

ক্রিস্টা টিপেট: আপনার মতে, তুরস্কে সেক্যুলারিজম ছিল সরকারী পর্যায়ে। আর এটা ছিল সেক্যুলারিজমের ফ্রান্স মডেল। অর্থাৎ ধর্মীয় আওতা থেকে সর্বোত প্রকারে মুক্ত হওয়া। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সেক্যুলারিজম মানে হলো চার্চ এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের পৃথকীকরণ ব্যবস্থা। যেখানে ধর্মগুলো থাকবে স্বাধীনভাবে।

মোস্তফা আকিউল: আমি মনে করি, বিংশ শতকটা ছিল মুসলিম বিশ্বের জন্যে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম জনপদগুলো কখনো যুক্তরাষ্ট্রের মতো উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চর্চা করার সুযোগ পায়নি। উল্টো তারা তথাকথিত আধুনিক

মোস্তফা কামাল পাশা
মোস্তফা কামাল পাশা

সেক্যুলারিজমের ছদ্মবেশী স্বৈরশাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে এসেছে। যেমন তুরস্কে কামালবাদী সেক্যুলারিজম, মিশরে নাসের এবং মুবারকের একনায়কতন্ত্র, তিউনিশিয়ায় বেন আলীর মতো স্বৈরশাসকরা শাসন করেছে শতাব্দীর অধিকাংশ সময় ধরে। যার ফলে মানুষের মনে জন্ম নিয়েছে ক্ষোভ আর হতাশা। স্বৈরশাসনের বিকল্প প্লাটফরম হিসেবে গড়ে উঠেছে কট্টর ইসলামপন্থা। টিকে থাকার জন্যে তারা চরমপন্থা অবলম্বন করেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য কর্তৃত্ববাদী সেক্যুলারিস্ট ও কর্তৃত্ববাদী ইসলামপন্থীদের মাঝে আটকে ছিল। উভয়পক্ষের কট্টরবাদীতার কারণে, বহুত্ববাদ (pluralism) আর উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির মতো মধ্যপন্থী ব্যবস্থা চর্চা করার সুযোগ এ অঞ্চলের মানুষ খুব একটা পায়নি।

ইতোমধ্যে আরব বসন্তের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের দাবি উঠছে। দেখে সত্যি ভাল লাগছে। এটাকে আমি উদার গণতন্ত্রের আকস্মিক উত্থান বলবো না। তবে বলা যায়, এটি মুসলিম বিশ্বের জন্যে রাজনৈতিক উদারতাবাদের প্রথম ঊষালগ্ন। তুরস্কে আমরা একটা কারণে ভাগ্যবান, আরবরা তা থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। তারা একদলীয় শাসনের অধীন ছিল। আমাদের ভাগ্য ভালো এ জন্য যে, ১৯৫০ সালে প্রথমবারের মতো একটা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছিল। তখন থেকে তুর্কি জনগণ একটা কার্যকরী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পেয়েছে। যদিও অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে, সামরিক হস্তক্ষেপ ছিল; তারপরও উদারপন্থী আইন ও বাক স্বাধীনতা বিদ্যমান রয়েছে। অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের তুলনায় বহুদলীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ আমাদের অনেক বেশি ছিল। মিশর মাত্র মাস ছয়েক ধরে এটা শুরু করেছে।

ক্রিস্টা টিপেট: মিশরের জন্যে একেবারেই প্রাথমিক অবস্থা বলা যায়।

মোস্তফা আকিউল: হ্যাঁ, মিশরীয়দের জন্যে এটা নতুন অভিজ্ঞতা।

ক্রিস্টা টিপেট: আমার মনে হয়, আপনার বাবা-মায়ের চেয়ে আপনি অনেক বেশি ধার্মিক। নাকি শুধু পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণেই ইসলামের প্রতি আপনার সহানুভূতি কাজ করছে?

মোস্তফা আকিউল: বাবা-মায়ের তুলনায় ইসলামের তাত্ত্বিক বিষয়গুলো আমাকে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিয়ের আগে তাঁরা প্রেম করেননি। ২২ বছর বয়সে তাঁরা বিয়ে করেছেন। অবশ্য সামাজিক জীবনে আমি তাঁদের চেয়ে আরো বেশি উদার মনোভাব পোষণ করি। বর্তমান সময়টা হলো বিশ্বায়নের। সময়ের সাথে আমাকে দৌঁড়াতে হচ্ছে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে। বিভিন্ন দেশের নানা বন্ধু-বান্ধবদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হয় সবসময়। এরকম আরো কত কিছুর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হচ্ছে- তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ক্রিস্টা টিপেট: কখন থেকে ইসলামী ধর্মতত্ত্ব আপনাকে অনুপ্রাণিত করে?

বদিউজ্জামান সাঈদ নূরসী
বদিউজ্জামান সাঈদ নূরসী

মোস্তফা আকিউল: যখন আপনি পরিবারের সাথে থাকবেন, তখন আপনার বেড়ে ওঠা, আপনার পরিবার, সংস্কৃতি, পরিপার্শ্ব– এসব দ্বারাই আপনার পরিচয় নির্ধারিত হবে। যেমনটা আমার ক্ষেত্রে হয়েছে। আমার মনে মাঝেমধ্যেই নানা প্রশ্ন উঁকিঝুকি দিত। আমাদের পরিচয় কী, জীবন চলার সঠিক পথ কোনটি, জীবনের উদ্দেশ্য কী– এ প্রশ্নগুলো নিয়ে আমি খুব ভাবতাম। হাইস্কুলের শেষ বছর নূরসীর ধর্মীয় আন্দোলনের সাথে আমার সাথে পরিচয় ঘটে। এ আন্দোলনটা গড়ে উঠেছিল মূলত বদিউজ্জামান সাঈদ নূরসীর বইয়ের পাঠকদের দ্বারা। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম । ১৯৬০ সালে তিনি মারা যান। আমি তাঁদের শিক্ষা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছি। তখন থেকে ব্যক্তিগত জীবনে আমি ধার্মিক হয়ে উঠি।

সময়ের পরিক্রমায় সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি কোনো নির্দিষ্ট মাজহাব বা সম্প্রদায়ের অনুসারী হবো না। এজন্যে আমি নিজেকে একজন মুক্তচিন্তার মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ইসলামের মৌলিক বিষয়ের ওপর আমার ঈমান ও আস্থা অবিচল আছে এবং তা আজীবন অটুট থাকবে।

ক্রিস্টা টিপেট: আমি মাঝেমধ্যে একটা তুলনা করতে পছন্দ করি– যদিও তা যথেষ্ট নিখুঁত নয়– তারপরও আমি মনে করি এ সম্পর্কে কথা বলার জন্য এটা কার্যকরী। আবারো বলছি, সবকিছুই আপেক্ষিক এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের পরিস্থিতিও খুবই আলাদা। বিশ শতকের শেষাংশে যুক্তরাষ্ট্রও একটা সেক্যুলার কাল পার করে এসেছে, তখন এলিট শ্রেণী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সেক্যুলারে পরিণত হয়েছিল। তখন সরকার ব্যবস্থা এবং এর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রগুলোকে সেক্যুলার হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছিল। কিন্তু সত্য কথা হলো, সাধারণ মানুষ তখনো ধার্মিক ছিল। আপনি নিশ্চয় জেনে থাকবেন, নানা বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও ধর্ম দিন দিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রসার লাভ করছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, তুরস্কেও ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটেছে! এক সময় তুরস্কেও সেক্যুলার শাসন ছিল এবং সরকারীভাবে সেক্যুলার সংস্কৃতি ছিল। কিন্তু এখনকার মতো তখনো মানুষ ইসলামের অনুসারী ছিল। আপনি নিজেই এর চমৎকার দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন।

মোস্তফা আকিউল: এই দিক বিবেচনায় তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে বেশ মিল রয়েছে। আস্তিক ও ধর্মপালনকারী মানুষ বিবেচনায় দেশ দুটিতে মিল আছে। প্রখ্যাত মার্কিন সমাজতত্ত্ববিদ পিটার বার্গার একবার বলেছিলেন, “যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে এলিট সুইডিশদের দ্বারা শাসিত একটি ভারতীয় দেশ”। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষেরা ভারতীয়দের মতো ধর্মভীরু, তবে তাদের শাসন ব্যবস্থা সুইডেনের মতো সেক্যুলার। আমি বার্গারের উক্তিকে তুরস্কের প্রেক্ষাপটে এভাবে বলতে আগ্রহী, “তুরস্ক হচ্ছে একদল উত্তর কোরিয়ান দ্বারা শাসিত একটি ভারতীয় দেশ”। আমি বলতে চাচ্ছি, সুইডিশরা অন্তত উদার প্রকৃতির। কিন্তু কোরিয়ান শাসকদের রীতিমতো পূজা করতে হয়, তারা কট্টর স্বৈরশাসক। তুরস্কেও সাম্প্রতিক অতীতে এমন অবস্থা ছিল।

তো, প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের সময়ে আমেরিকার হৃৎপিণ্ড বলে পরিচিত নিউইয়র্ক, সানফ্রান্সিসকোর মতো শহরগুলোতে খ্রিস্টান ডানপন্থীদের উত্থান ঘটে। তারা সেক্যুলার আমেরিকানদের চ্যালেঞ্জ করা শুরু করে। তুরস্কেও অনেকটা একইভাবে ইসলামী শক্তির উত্থান ঘটেছিল।

অবশ্য তুরস্কের ইসলামপন্থীদের উত্থান ইরানের মতো হয়নি। সে রকম হলে- তা বাজে একটা ব্যাপার হতো। আপনি নিশ্চয় জানেন, ইরানে এক স্বৈরশাসকের কাছ থেকে আরেক স্বৈরশাসকের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছে মাত্র। সেখানে আগের মতোই এখনো স্বৈরশাসন বলবৎ রয়েছে। রেজা শাহ হেডস্কার্ফকে নিষিদ্ধ করেছিলেন। তারপর খোমেনী এসে বললেন, এখন থেকে সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে হেডস্কার্ফ পরতে হবে; কারণ, এটা তাঁর আইন। তুরস্কে যে এমনটা ঘটেনি এ জন্যে আল্লাহকে ধন্যবাদ। আমাদের গণতন্ত্র চর্চার অভিজ্ঞতার ফলেই হয়তো ইসলামপন্থীরা ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একীভূত হচ্ছে। যদিও সেক্যুলারদের বিবেচনায় তারা এখনো বেশ রক্ষণশীল রয়ে গেছে।

গর্ভপাত নিয়ে এরদোয়ান সম্প্রতি যে নয়া সাংস্কৃতিক যুদ্ধ শুরু করেছেন, রক্ষণশীলতার উদাহরণ হিসেবে এটি উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও গর্ভপাত নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তুরস্কে একথা কেউ বলবে না যে, গর্ভপাতের কারণে কোনো নারীকে পাথর নিক্ষেপ করা হোক। গর্ভপাতের ব্যাপারে ব্যক্তির স্বাধীনতা থাকবে নাকি থাকবে না– এটা হলো মূল বিষয়। আমি মনে করি, এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা থাকা উচিৎ। কিন্তু কোনো স্বাধীন ও মুক্ত সমাজেই এসব বিষয় বিতর্কমুক্ত থাকে না।

ক্রিস্টা টিপেট: তা অবশ্য ঠিক।

মোস্তফা আকিউল: মধ্যপ্রাচ্যে আধুনিকতার বিকাশ বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণ হলো এ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা। এ অঞ্চলের মুসলিমদের ধারণা হলো, আধুনিক হতে চাইলে আপনাকে ধর্মীয় বিশ্বাস বাদ দিতে হবে, সমাজকে ধর্মমুক্ত করতে হবে, অনেক বেশি সেক্যুলার হতে হবে ইত্যাদি। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র একটা গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আমার এক রক্ষণশীল মুসলিম বন্ধু কিছুদিনের জন্য আমস্টারডাম গিয়েছিল। ফিরে এসে বলল, “আমরা সেখানকার মানুষগুলোর মতো হতে চাই না। কারণ তারা খুব বেশি সেক্যুলার। যদিও আমি তাদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাপোষণ করি”। সেই বন্ধুর কথা শুনে বুঝতে পারলাম, পশ্চিমা জনগণ এতটাই সেক্যুলার যে, এ অঞ্চলের ধর্মবিশ্বাসী মানুষগুলো তাদের মতো করে আধুনিক হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে না।

তবে আমি মনে করি, পশ্চিমাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ব্যতিক্রমী উদাহরণ। ধর্মের প্রতি নিষ্ঠাবান সমাজ সেখানে রয়েছে। একই সাথে তারা খুবই উদার ও চিন্তাধারায় আধুনিক প্রকৃতির। এর ফলে সেখানে ধর্ম ও আধুনিকতা নিয়ে যে কোনো ধরনের মুক্ত আলোচনা চলতে পারে। তাই আমি বিশ্বাস করি, আধুনিকতাকে গ্রহণ করার জন্যে এ অঞ্চলের মানুষের কাছে যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলক ভালো উদাহরণ হতে পারে।

ক্রিস্টা টিপেট: আপনার জানা থাকার কথা, তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেবে, নাকি দেবে না- তা নিয়ে গত ১০ বছর ধরে সবচেয়ে বেশি মাতামাতি হচ্ছে। অথচ তুরস্ক এখন এমন একটা পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে, ইইউ’তে যোগ দেয়ার বিষয়টা আর তেমন গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হচ্ছে না।

মানচিত্রে তুরস্কের অবস্থানটা দেখলে মনে হয়, তুরস্ক বিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। সবখানেই পরিবর্তন ঘটছে, তাই না? মিশর ও তিউনিশিয়ায় নিকট ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে, কে জানে! তবে ইতোমধ্যে এসব দেশে পরিবর্তন শুরু হয়েছে। শুধু তাই নয়, ইউরোপেও এই পরিবর্তনের হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। আর এই সমস্ত রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে তুরস্ক। একজন তুর্কি হিসেবে এসব নিয়ে আপনি কী ভাবছেন?

মোস্তফা আকিউল: হ্যাঁ, সেটাই। একজন তুর্কি নাগরিক হিসেবে এ জন্যে আমি খুবই গর্বিত, এর আগে এমন গর্ব করার সুযোগ হয়নি। তবে তুরস্কের সব ব্যাপার নিয়ে আমি সন্তুষ্ট নই। বাক-স্বাধীনতার প্রশ্ন তো আছেই, এছাড়াও আমাদের অনেক সমস্যা রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের কথা বাদই দিলাম, আমরা এখনো সংখ্যালঘুদের সমস্যার সমাধানই করতে পারিনি। বলা যায়, আমাদের দেশে গণতন্ত্র চর্চায় এখনো অনেক ভুল-ভ্রান্তি রয়ে গেছে। সব সমস্যা অলৌকিকভাবে একদিন সমাধান হয়ে যাবে বলে যারা মনে করেন, আমি তাদের সাথে একমত নই।

ক্রিস্টা টিপেট: এসব ভুল-ভ্রান্তি অতিক্রম করেই তো গণতন্ত্রের ভিত্তিটা মজবুত হবে, তাই না?

মোস্তফা আকিউল: এজন্যে কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষপ গ্রহণ করা জরুরি। ইসলামী বিশ্বাসের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মানুষগুলো এই সংস্কার কাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আমাদের দেশের সংকটময় মুহূর্তে এরদোয়ানের পদক্ষেপ একটা ভালো উদাহরণ। তিনি ঘোষণা করেছেন যে, তুর্কি স্কুলে কুর্দিদের জন্যে ক্লাসের ব্যবস্থা থাকবে। এটাকে চমৎকার একটা পদক্ষেপ বলা যায়। কিন্তু দু’দিন আগেও আমরা এমন সব কাজ করছিলাম যা উদার দৃষ্টিভঙ্গিতে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। অবশ্য এরদোয়ানের শাসনব্যবস্থার ভালো-মন্দ দু’টি দিকই রয়েছে। কোন দিকটা শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে আমি জানি না।

ক্রিস্টা টিপেট: এভাবে বলাটা মনে হয় ঠিক নয়। আমেরিকান রাজনীতিবিদরা কিন্তু এসব ব্যাপারে খুবই কঠোর… (হাসি)

মোস্তফা আকিউল: একবিংশ শতকের সূচনালগ্নে তুরস্কে যে জাগরণ শুরু হয়েছে, তার উৎস খুঁজতে হলে তুরস্কের ইতিহাসকে আগে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমানে তুরস্ক তার ঐতিহাসিক পরিচয় এবং উসমানীয় ঐতিহ্যকে ধারণ করতে শুরু করেছে। এতেই তারা উন্নতি ও সমৃদ্ধির প্রেরণা খুঁজে পেতে চাচ্ছে।

তার মানে এই নয় যে, আমরা আবারো সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছি। যেমনটা অনেকে মনে করেন যে, তুরস্ক পুরোপুরি পাশ্চাত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে প্রাচ্য অভিমুখী হচ্ছে। আসলে তা নয়, বরং তুরস্ক দিন দিন উদার হচ্ছে। এক সময় এ অঞ্চলের সবার সাথে তুরস্কের সু-সম্পর্ক বজায় ছিল। সেই আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে তুরস্ক কাজ করছে। এর পেছনে যে বিষয়টি প্রেরণা দিচ্ছে তা হলো ‘মুসলিম পরিচয়’। মাঝখানে কিছু সময় তুরস্কে মুসলিম পরিচয়ের কারণে মানুষ দমন-পীড়নের শিকার হয়েছিল। কিন্তু আজকের তুরস্ক পাল্টে গেছে। এখন মুসলিম পরিচয় দিতে মানুষ গর্ববোধ করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সফলতা আসবে তখনই, যখন আমরা তুরস্কের এই পালাবদলের সময়কে গণতান্ত্রিক কাঠামোতে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারবো এবং সেক্যুলার ও অমুসলিমদের প্রাপ্য অধিকারসমূহ নিশ্চিত করতে পারবো। কারণ, পাশ্চাত্য নাকি প্রাচ্য– এ ধরনের প্রান্তিক ভেদ-জ্ঞান নিয়ে বসে থাকার দিন আর নেই।

ক্রিস্টা টিপেট: মডেলটা একটু ভিন্ন ধরনের মনে হচ্ছে।

মোস্তফা আকিউল: হ্যাঁ। তবে এর জন্যে শর্ত হলো, গণতন্ত্রকে তার নিজের সুরে বাজতে দেয়া। একদল জেনারেলের শাসনাধীনে ধার্মিকদের উপর নিপীড়ন চালানো হবে– এটা তুর্কি ইসলামী গণতন্ত্রের উদাহরণ হতে পারে না। তুরস্ক তখনই সত্যিকার অর্থে ইসলামী গণতন্ত্রের উদাহরণ হয়ে উঠবে, যখন ধার্মিক জনগণ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধারণ করবে এবং তা এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। আমি মনে করি, এক্ষেত্রে আমরা অনেকটা অগ্রসর হয়েছি।

ক্রিস্টা টিপেট: এরদোয়ানের একটা কথা আমি লিখে রেখেছিলাম। যা অনেকটা মার্কিন রাজনীতিবিদদের কথার মতো শোনায়। সেটা হলো, “যখন আমি ঘরে থাকি, তখন আমি একজন মুসলিম। আর যখন অফিসে থাকি, তখন আমি গণতন্ত্রের জন্যেই কাজ করি”।

মোস্তফা আকিউল: আসল কথা হচ্ছে, তুরস্ককে বিশ্বশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা এবং গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে এরদোয়ান সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে চান। তুরস্কের অর্থনীতিতে গতি আনতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। এছাড়া তাঁর গৃহীত উদ্যোগের অনেকগুলো ইতোমধ্যে সফলতার মুখ দেখেছে। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কতটুকু ইতিবাচক– সেটাই আসল প্রশ্ন। আমার মনে হয়, ক্ষমতায় টিকে থাকার আকাঙ্ক্ষা তাঁর গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতিকে মাঝেমধ্যে ম্লান করে দেয়। তাঁকে একেক সময় একেক রূপে দেখা যায়। একদিন ঘুম থেকে ওঠে হয়তো দেখবেন এরদোয়ান খুব উদারবাদী। কিন্তু দু’দিন পর আবারো ঘুম থেকে ওঠে দেখবেন এরদোয়ানের মেজাজ বেশ চড়া। মনেই হবে না তিনি কোনো গণতান্ত্রিক দেশের নেতা।

ক্রিস্টা টিপেট: এরদোয়ানের আচরণের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, তুরস্কে গণতন্ত্রের ক্রমবিকাশটা কীভাবে হয়েছিল? গণতান্ত্রিক পরিপক্কতা অর্জনের অভিজ্ঞতাইবা কতটুকু?

মোস্তফা আকিউল: শুধু তাই নয়, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কতটুকু সমন্বয় করতে পারছি, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এছাড়া কীভাবে আমরা ‘হার-জিতের’নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো- সে প্রশ্নও রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তুরস্কে একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘যদি আপনি হাত বাড়িয়ে দেন তাহলে পুরো হাতটাই আপনাকে হারাতে হবে’। আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো দরকার। তাই আমি বলতে চাই, ‘আপনি যদি হাত না বাড়ান, তাহলে আপনি কখনো বন্ধুত্বই করতে পারবেন না’। আপনি যদি কিছু ইস্যুতে ছাড় না দেন, তাহলে কখনোই ঐক্যমত্যে পৌঁছতে পারবেন না। ‘কুর্দি নাকি তুর্কি, ইসলামপন্থী নাকি সেক্যুলারপন্থী’– এসব বিতর্ক নিরসনে এখন পর্যন্ত আমরা কোনো ধরনের ঐক্যমত্যে আসতে পারিনি। আমি মনে করি, সেক্যুলারিজম প্রশ্নে এবং প্রাত্যহিক জীবনের মৌলিক ব্যাপারগুলোতে আমাদের ঐক্যমতে আসতে হবে। যদিও কিছু ইস্যুতে সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব বিরাজ করছে। তবে আমি মনে করি, কেউ স্কার্ফ পড়তে চাইলে তাকে সে সুযোগ দেয়া উচিৎ। কেউ চায় তো মিনিস্কার্টও পড়তে পারে। এই ব্যাপারটা তুরস্কের অধিকাংশ জনগণই মেনে নিয়েছে।

ক্রিস্টা টিপেট: আপনি কি এ বিষয়গুলোকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করছেন?

মো. আকিউল: অবশ্যই, আপনি তো তা দেখতেই পাচ্ছেন। আপনাকে আরো একটা উদাহরণ দেই। আরবদের কাছে তুরস্ক দিন দিন অর্থবহ হয়ে উঠছে। আপনি দেখতে পাবেন তুরস্কে অনেক আরব পর্যটক ভ্রমণ করতে আসে। তারা দেখছে, এখানে অনেক মসজিদ আছে এবং নামাজের সময় প্রচুর মুসল্লী সেখানে যায়। আবার অনেক মদের বারও আছে। সেখানেও প্রচুর লোক সমাগম তাদের চোখে পড়ে। আসলে এগুলো নিয়েই বর্তমান তুরস্ক। আমার ধারণা, আরবরা চায় তাদের দেশটাও এভাবেই গড়ে উঠুক।

তৃতীয় পর্ব

1
2
3
4
মোস্তফা আকিউল
তুর্কি সাংবাদিক ও লেখক। 'ইসলাম উইদাউট এক্সট্রিমস, 'দ্য ইসলামিক জেসাস' তাঁর উল্লেখযোগ্য বই। হুররিয়াত ডেইলি নিউজ, আল মনিটর, নিউ ইয়র্ক টাইমসের নিয়মিত কলাম লেখক।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন