রবিবার, নভেম্বর ১৯, ২০১৭

কর্মধারা ইসলামী মতাদর্শের আলোকে সামাজিক আন্দোলন: পর্ব-৩

ইসলামের কালোত্তীর্ণ মৌলিকত্ব এবং বিংশ শতাব্দীর প্রধান ইসলামী সংগঠন ও আন্দোলনসমূহের তাৎপর্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রেখে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। যুগোপযোগী সংগঠন ও আন্দোলন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে পুরাতন বা প্রচলিত ‘চিন্তা-কাঠামো’র (paradigm) পুনর্গঠন হলো পূর্বশর্ত। ইসলাম এমন একটি মতাদর্শ, যা মূলত একটি অনন্য সামাজিক আন্দোলন; এর ভিত্তি হলো সুসামঞ্জস্যপূর্ণ তত্ত্ব এবং পরিণতি হলো রাজনৈতিক ব্যবস্থাসহ সমাজের বৃহত্তর লক্ষ্যসমূহ অর্জন।

উপর্যুক্ত দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে ইসলামের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক আন্দোলনের গঠন-কাঠামো ও মৌলিক দিকগুলো নিয়ে একটি পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন সুধী মহলে উপস্থাপন করা হয়েছে। সুধীবৃন্দের পরামর্শের কারণে এর একটি সংক্ষিপ্ত লিখিত ভাষ্য তৈরি করা হয়েছে। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য আজ লিখিত ভাষ্যের  তৃতীয় পর্ব উপস্থাপন করা হলো।

আলোচনা বুঝার সুবিধার্থে প্রেজেন্টেশনটি ডাউনলোড করে নিতে পারেন: পাওয়ারপয়েন্ট, পিডিএফ


 

৩.১.১: বুদ্ধিবৃত্তিচর্চা (Intellectuality)
বুদ্ধিবৃত্তিচর্চা সব রকমের গোঁড়ামিমুক্ত (free from dogma) এবং স্বাধীন বৈশিষ্ট্যের হওয়া উচিতকেউ যদি আল্লাহর অস্তিত্বে অবিশ্বাস করে এর স্বপক্ষে যুক্তি দিতে চায়, সেক্ষেত্রে  তার মতপ্রকাশের পর্যাপ্ত সুরক্ষা থাকা উচিতপক্ষান্তরে কেউ ধরনের যুক্তিকে খণ্ডন করতে চাইলে তারও সে ধরনের মতপ্রকাশ ও বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার অধিকারের পক্ষে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা থাকা জরুরিবলাবাহুল্য, যে কোনো পর্যায়ের বুদ্ধিবৃত্তি চর্চা প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উভয় পর্যায়ের শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে হতে পারে। বুদ্ধিবৃত্তি চর্চা এক পক্ষীয় নিষ্ক্রিয় শিক্ষ(one sided passive learning) পদ্ধতির না হয়েপ্রশ্নোত্তর ও উভয় পক্ষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণমূলক তথা দ্বিপাক্ষিক (Interactive) হতে হবে

জ্ঞান তথা বুদ্ধিবৃত্তিচর্চা সম্পর্কে কোরআন ও হাদীসের পুনঃপুন বর্ণনা হতে এটি স্পষ্ট যে, যাজকতন্ত্রের (priest class system) বিরোধিতা করলেও ইসলাম জ্ঞানের বিশেষায়ণের (specialization of knowledge) ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে প্রচলিত ধারায় ইসলামী আন্দোলনের জনশক্তি ও সচেতন ইসলামপন্থীদের কাছে সেসব বর্ণনা যথেষ্ট পরিচিত বিধায় সেগুলোর উল্লেখ না করে এখানে অপেক্ষাকৃত অপ্রচলিত কিন্তু বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট একটা আয়াত উদ্ধৃত করা হলো,

وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنْفِرُوا كَافَّةًۚ ۚ فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ

অর্থ:মুমিনদের সকলে একসাথে অভিযানে বের হওয়া সমীচীন নয়। তাদের প্রত্যেক দলের একাংশ কেন বের হয় না, যাতে তারা দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান অনুশীলন করতে পারে এবং তাদের সম্প্রদায়ের লোকদেরকে সতর্ক করতে পারে যখন তারা তাদের নিকট ফিরে আসবে। যাতে তারা সাবধান হয়ে চলতে পারে [সূরা তওবা : ১২২]

পাশ্চাত্যের think-tank system সম্পর্কে প্রচলিত ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের উন্নাসিক ভাব লক্ষ্য করা যায়অথচ পবিত্র কোরআনের এই আয়াতটি হলো থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক সিস্টেমের দলীল! দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধ-ফেরত মুজাহিদদের সমালোচনা করবে এমন লোকেরা যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নাই। সূরা আসরে বলা হয়েছে, তারা পরস্পরকে সত্য বিষয়ে পরামর্শ দেয়।দেখা যাচ্ছে, বিজ্ঞ লোকেরা অন্যদের সতর্ক করছে, এমনকি সর্বোচ্চ মর্যাদার মুজাহিদদেরকেও!

.১.২: আধ্যাত্মিকতা (Spirituality)
spirituality তথা আধ্যাত্মিকতা ব্যক্তিগতভাবে চর্চার বিষয়ব্যক্তির সমষ্টি হিসেবে দল,সম্প্রদায় ও রাষ্ট্রসহ সর্বত্র একটি অন্তর্গত অপরিহার্য বিষয় হিসেবে এটি সক্রিয় থাকবে। আধ্যাত্মিকতার বৈশিষ্ট্য হলো একনিষ্ঠতা (sincerity), যার মাধ্যম হলো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান কিম্বা যে কোনো মতাদর্শগত সুনির্দিষ্ট কর্মধারা

যারা ইসলামের অনুসারী তারা ইসলামের ইবাদত পদ্ধতি অনুসরণ করে আধ্যাত্মিকতা চর্চা করবেঅন্যান্য ধর্মের অনুসারীরা স্ব স্ব ধর্মের পদ্ধতি অনুসারে আধ্যাত্মিকতা চর্চা করবে। যারা কোনো ধর্মের অনুসারী নয়, তারা নিজেরা যে মতাদর্শকে ধারণ করে, সে অনুযায়ী আধ্যাত্মিকতার চর্চা করবে। আধ্যাত্মিকতা তথা বস্তুঅতিবর্তীতাকে গ্রহণ ও চর্চার ক্ষেত্রে স্বাধীন জনগোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র্য থাকাই স্বাভাবিক। কেউ অন্যের আধ্যাত্মিকতার ধরনের ওপর হস্তক্ষেপ না করে সহনশীলতার পরিচয় দিবে। বৈচিত্র্যতা ও বৈপরিত্য সত্ত্বেও এই পদ্ধতি জনগোষ্ঠীসমূহের ঐক্যবদ্ধ (integrated) হয়ে বসবাস করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। এই অর্থে এটিকে একাধারে inclusive এবং mutually exclusive বলা যায়

যারা কোনো ধর্মের অনুসারী নয় তারা কিভাবে আধ্যাত্মিকতা চর্চা করবে? এটি একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। এক্ষেত্রেবস্তু-অতিবর্তী তথা আধ্যাত্ম-চেতনাকে নৈতিকতার উৎসস্থল (as the spawning ground of morality) হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে যারা কোনো ধর্মে বিশ্বাস করে না তাদের মধ্যেও নিজস্ব মতাদর্শের আলোকে এক ধরনের নৈর্ব্যক্তিক ঔচিত্যবোধ বা  নৈতিক চেতনা গড়ে উঠেযদিও ধর্মের আচার-পদ্ধতির (ritual) সাথে এবিরোধ দৃশ্যমান। একটা আদর্শ সমাজ ও মূল্যবোধ গঠনের শর্ত হিসেবে প্রত্যেক নাগরিকের কিছু সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি থাকা জরুরি

এই আলোচনার উপসংহার হলো, নৈতিকতা ছাড়া ধর্ম হতে পারে না, কিন্তু ধর্ম ছাড়াও নৈতিকতা হতে পারে। তাই ধর্মে অনুসারীরা ধর্মের ভিত্তিতে নৈতিকতা গড়ে তুলবে; আর যারা ধর্মের অনুসারী নয় তারা তাদের মত করে নিজস্ব মতাদর্শের আলোকে নৈতিকতা গড়ে তুলবে। যেহেতু ব্যক্তিকে ঘিরে সমাজ, তাই সমাজে মিলেমিশে থাকতে হলে প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে একটা সাধারণ ঔচিত্যবোধ গড়ে তুলতে হবে।

.১.৩: মননশীলতা (Creativity)
ইসলামী আদর্শনির্ভর সামাজিক আন্দোলনের সমবাহু ত্রিভুজ মডেলে বুদ্ধিবৃত্তি ও আধ্যাত্মিকতার পরিণতি হিসেবে যে বৈশিষ্ট্যটি গড়ে ঠা অনিবার্য, তা হলো মননশীলতা (creativity)এর মাধ্যম হতে পারে সাহিত্য, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, প্রযুক্তিসহ ধরনের বিষয়াবলিমননশীলতার বৈশিষ্ট্য হবে স্বাধীন এবং এর পদ্ধতি হতে হবে ইতিবাচক বা গঠনমূলক (pro-active)

কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে সমাজ কাঠামোকে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া থাকা উচিতব্যক্তির সমন্বয়ে পরিবার, পরিবারের সমন্বয়ে সমাজ, সমাজ বিকাশের উচ্চস্তরে রাষ্ট্র এরূপ ক্রমধারায় গাঁথুনিগুলোকে শক্তিশালী করে তোলা উচিত অধস্তন কোনো একটা প্রতিষ্ঠানকে যথেষ্ট শক্তিশালী হিসেবে গড়ে না তুলে ঊর্ধ্বতন কোনো প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী বা টেকসই হতে পারে না। পাশ্চাত্যে ভঙ্গুর পারিবারিক ব্যবস্থা সত্ত্বেও এক ধরনের সুষম সমাজ গড়ার একটা প্রচেষ্টা এবং নির্দিষ্ট মাত্রায় এক ধরনের দৃশ্যমান সফলতা আমরা দেখি মানবিকতার বেশকিছু দিকের কার্যকর সফলতা সত্ত্বেও সেখানকার সমাজ ও রাষ্ট্রের কতিপয় মৌলিক অসাঞ্জস্যতা লক্ষ করা যায়।

সাহিত্য-সংস্কৃতিমূলক কার্যক্রমগুলোকে রক্ষণশীলতা বা উদারতার প্রান্তিকতা হতে না দেখে, এটা যেন সমাজ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে, সেদিকে লক্ষ রাখা উচিততাই এখানে ধর্ম নিতান্তই প্রাসঙ্গিক একটা বিষয়অপরিহার্য বিষয় হলো সমাজ গঠনে ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনীতিসহ সব অনুষঙ্গের ইতিবাচক ভূমিকা পালনঅবশ্য এসব ক্ষেত্রে এমন মাত্রায় স্বাধীনতা অনুমোদন থাকা উচিত নয়, যার ফলে মননশীলতা চর্চার নামে তা সমাজের ক্ষুদ্র কিম্বা বৃহত্তর কোনো জনগোষ্ঠীকে আহত করে। এ ধরনের তথাকথিত স্বাধীনতা চর্চাকারো জন্যে সুখকর হলেও অন্যান্যদের জন্য কষ্টের কারণ হতে পারে। ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদ তৎকালীন সময়ে ইতালি জার্মানীর জনগণকে উজ্জীবিত করলেও পৃথিবীর অন্যান্য জনগণের জন্যে তা ব্যাপক ধ্বংস ও ক্ষতির কারণ হয়েছিল।

সুতরাং মননশীলতার জন্যে ইতিবাচকতার parameter বা শর্তারোপ করতে হবে। কাণ্ডজ্ঞানের উপর নির্ভর করে এই ইতিবাচকতা নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট বিষয় ও পরিস্থিতির আলোকে নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি (performance) ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হবে কিনা।

৩.২: সমাজ (Social)
ব্যক্তিগত পর্যায়ের আলোচ্য তিনটা কাজের সমন্বয়ের পর সামাজিক দায়বদ্ধতার উৎপত্তি ঘটেবিশেষ করে ইসলামের দিক থেকে বিবেচনা করলে, মানবিক চেতনার আলোকে সমাজের জন্যে কাজ করতে হবে। কোরআনে আল্লাহর পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে রব্বুল আলামীন, রাসূল (সা)কে বলা হয়েছে রহমাতুল্লিল আলামীনসুতরাং সকল সৃষ্টির জন্যে মানবিক দৃষ্টিকোণ পোষণ করা উচিত। মানুষের জন্যে তো বটেই, বস্তুজগৎসহ সকল সত্ত্বা অস্তিত্বের প্রতি ইতিবাচক, গঠনমূলক, সহমর্মিতাসমতার দৃষ্টিভঙ্গি থাকা উচিত 

জীবন ও পরিবেশের নিরাপত্তাকে অক্ষুন্ন রাখার মাধ্যমে সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করতে হবে। আর সমাজসেবার পদ্ধতি হবে অংশগ্রহণমূলক (participatory) অর্থাৎ এতে প্রত্যেক ব্যক্তি ও গ্রুপ– সকলেরই অংশগ্রহণের মনোভাব থাকা উচিতশুধু ধনীরা সমাজসেবায় অংশগ্রহণ করবে তা নয়, বরং গরীবরাও বিভিন্নভাবে অংশগ্রহণ করবে হোক তা কম বা বেশি। অনুগ্রহ নয়, বরং দায়িত্বানুভূতি থেকে এ কাজে সবাই  অংশগ্রহণ করবে। এ সংক্রান্ত একটি হাদীস মুসলিম শরীফে বর্ণিত রয়েছে,

عَنْ أَبِي مَسْعُودٍ، قَالَ أُمِرْنَا بِالصَّدَقَةِ ‏قَالَ كُنَّا نُحَامِلُ قَالَ فَتَصَدَّقَ أَبُو عَقِيلٍ بِنِصْفِ صَاعٍ قَالَ وَجَاءَ إِنْسَانٌ بِشَىْءٍ أَكْثَرَ مِنْهُ فَقَالَ الْمُنَافِقُونَ إِنَّ اللَّهَ لَغَنِيٌّ عَنْ صَدَقَةِ هَذَا وَمَا فَعَلَ هَذَا الآخَرُ إِلاَّ رِيَاءً فَنَزَلَتْ الَّذِينَ يَلْمِزُونَ الْمُطَّوِّعِينَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لاَ يَجِدُونَ إِلاَّ جُهْدَهُمْ‏

অর্থ: আবু মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা বোঝা বহনকারী শ্রমিক ছিলাম, আমাদেরকে দান-খয়রাত করার জন্য নির্দেশ দেয়া হলো। অতঃপর আবু আকীল অর্ধ সা পরিমাণ সদকা করলো এবং আরেক ব্যক্তি এর চেয়ে কিছু বেশি নিয়ে আসলো। মুনাফিকরা বলতে লাগলো, আল্লাহর কাছে সামান্য দানের কোনো মূল্য নেই এবং তিনি এর মুখাপেক্ষীও নন। আর দ্বিতীয় ব্যক্তি (আবু আকীল) শুধু লোক দেখানোর উদ্দেশ্যেই দান করেছেঅতঃপর এ আয়াত নাযিল হলো: যারা বিদ্রুপ করে স্বেচ্ছায় ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সদকা প্রদানকারী মুমিনদেরকে, আর তাদেরকে যাদের পারিশ্রমিক ছাড়া অন্য কোনো আয় বা সামর্থ নাই (সূরা তওবা : ৭৯)। [সহীহ মুসলিম, তৃতীয় খণ্ড, কিতাবুয যাকাত]


সহযোগিতামূলক কাজে
র ক্ষেত্রে কোনো আদর্শ বা দলীয় দৃষ্টিকোণ , বরং মানবিক দৃষ্টিকোণকে বিবেচনা করতে হবেকোনো মুসলমান কাউকে স্রেফ মুসলমান বলেই সাহায্য করবে না, বরং মানুষ বলেই তাকে সাহায্য করবে। তেমনি একটা প্রাণীকেও সাহায্য করবে আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে। সূরা ফোরকানের ৬৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তারা অকারণে কোনো প্রাণ হত্যা করে না

.৩: রাজনীতি (Politics)
ব্যক্তিগতসামাজিক কাজগুলোর পরবর্তী ধাপ হচ্ছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডসমাজের সকল স্তরে রাজনীতি নিয়ে যে ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, সেদিকে না তাকিয়ে রাজনীতিকে খোলা মনে বুঝতে হবে যে, সামাজি আন্দোলনে রাজনীতি কেন প্রাসঙ্গিকব্যক্তিগত বা অরাজনৈতিক দল গঠন করে সামাজিক কল্যাণের যতই চেষ্টা করা হোক না কেন, এর বিপরীতে বিদ্যমান নেতিবাচক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এই প্রচেষ্টাকে সহজে নস্যাৎ করে দিতে পারে। অন্যদিকে, ইতিবাচক সহযোগিতামূলক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ড সমাজের বৃহ্ত্তর কল্যাণ অতি দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করতে পারে। সুতরাং সমাজের যে চালিকা শক্তি রয়েছে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তার কার্যকর সহযোগীর ভূমিকা পালন করে।

সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সবার জন্যে ভালো, সর্বোচ্চ কল্যাণ, অন্যায় ও অপকর্ম প্রতিরোধের যেসব কথা আমরা বলি সেই কথাগুলোই হলো রাজনীতি। রাজনীতির চর্চা হওয়া উচিত অবাধ এবং সর্বাবস্থায় বহুদলীয় (multi-party) পদ্ধতিতেরাজনৈতিক দল গঠন, নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিরোধী দলীয় ভূমিকা পালনসব ব্যাপারে অনেক ইসলামী চিন্তাবিদ নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। আদতে এ ধরনের মনোভাব অমূলক। সর্বাবস্থায় সমানভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থাননা হলে, প্লুরালিজম না থাকলে; সমাজ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাদের নিজস্ব দায়িত্ব থেকে দূরে সরে যাবেকিম্বা এক সময় তারা এমন একটা কাঠামোর মধ্যে নিজেদের বেঁধে ফেলবে, যা থেকে নিজেরা তো বটেই, দেশ-জাতি কেউ বের হতে পারবে নার পরিণতি হবে total destruction, সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রগুলোর পতনের ফলে যা আমাদের সামনে স্পষ্ট

তাই ইসলামভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন রাষ্ট্রক্ষমতাগেলে বা ক্ষমতায় যাওয়ার আগে-পরে কোনো অবস্থায় যেন সর্বাত্মকবাদী রূপ লাভ না করে, সেজন্যে ব্যক্তি বা দল উভয় পর্যায়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত। আর বাকপ্রকাশের এই স্বাধীনতার পূর্বশর্ত হচ্ছে বহুদলীয় ব্যবস্থা (multi-party system)

৩.৪: রাষ্ট্র (State)
যে সকল ব্যক্তিবর্গ বা দল, ব্যক্তিগত ও সামাজিক দায়িত্বপালনের কর্মধারাকে ন্যূনতম মানে আঞ্জাম দেয়ার পর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে; এক পর্যায়ে তারা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে উপনীত হয়এ জন্য রাষ্ট্র সম্পর্কিত আলোচনা জরুরি। রাষ্ট্র সম্পর্কিত নানাবিধ আলোচনা হতে পারেআইন ও জনপ্রশাসন (law & administration), অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ (control of economy) এবং সশস্ত্র বাহিনী (armed forces) পরিচালনার কাজগুলো এমন যে, শাসনতান্ত্রিক বা রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জন ছাড়া তা সম্ভব নয়। এই দৃষ্টিতে এগুলোকে রাষ্ট্রক্ষমতার লক্ষণ বলা যায়।

.৪.১: আইন ও প্রশাসন (Law & Administration)
সবাই আইন মেনে চলে। কিন্তু আইন তৈরী করতে হলে রাষ্ট্রক্ষমতা থাকা চাই। সেটি যে ফরম্যাটেই হোক না কেন।  ইসলাম একটি গুণবাচক বিষয় হওয়ায় আইন সভার প্রচলিত আকারগুলোর কোনোটাই ইসলামবিরোধী নয় অর্থে ইসলামসম্মত। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বা গত্যন্তর নাই এমন অবস্থায় পরিমাণগত বিবেচনা তথা সংখ্যাধিক্যও গ্রহণযোগ্য। সেক্ষেত্রে পরিমাণকে এক ধরনের গুণ হিসেবে ধরা হয়।

ইসলামী মতাদর্শের আলোকে পরিচালিত রাষ্ট্রের জনপ্রশাসন-কাঠামো যোগ্যতা ভিত্তিতে গড়ে তোলা উচিত; কোনো ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা মতাদর্শের ভিত্তিতে নয়। আর এর পদ্ধতি হবে সমতা ও জবাবদিহিতা (equality & accountability)জনপ্রশাসনে জবাবদিহিতার প্রাসঙ্গিকতা সহজেই অনুমেয় কিন্তু এখানে সমতাপ্রাসঙ্গিকতা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারে।

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সর্বনিম্ন পর্যায়ে কর্তব্যরত  ব্যক্তি- উভয়ই জনগণের সেবক (civil servant),তাদের আচরণের মধ্যে এই চেতনা বজায় থাকতে হবে। তাহলে জনপ্রশাসনের মধ্যে সমতা কাজ করবে। এছাড়া তাদের জবাবদিহিতা শুধু ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের কাছে নয়, জনগণের কাছেও থাকতে হবে।

.৪.২: অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ (Control of Economy)
অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়া রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কর ব্যবস্থা, মুদ্রানীতি, বৈদেশিক বাণিজ্য, ঋণ ব্যবস্থা, কৃষি-শিল্প ইত্যকার অনেক বিষয় আছে যেগুলো শুধু রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষের সর্বোচ্চ কল্যাণ সাধনের জন্যে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে যে বিষয়গুলো থাকা দরকার তার মধ্যে অর্থনীতি একমাত্র কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে তালিকার শুরুতেই অর্থনীতি থাকবে, তা নিয়ে বোধকরি কারো দ্বিমত নাই।

সলামী মতাদর্শভিত্তিক পরিচালিত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরিচালনার বৈশিষ্ট্য হবে সুষম। সুষম বলতে, সমাজের বা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কল্যাণের প্রক্রিয়া বুঝানো হচ্ছে। জনগণের জন্য এটা নিশ্চিত করতে হবে। এটা করতে গিয়ে অর্থনীতি কি পুঁজিবাদী হবে, নাকি সমাজতান্ত্রিক কিম্বা কল্যাণধর্মী হবে- সেদিকে না গিয়েই বলা যায়, ইসলাম কিছু মৌলিক নীতিমালা দিয়েছে, সে অনুসারে স্থান-কাল-সময়ের ভিন্নতা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন মডেল তৈরি সম্ভব। এমনকি, মানুষের বৃহত্তর কল্যাণ বিবেচনায় যে কোনো মতবাদের ইতিবাচক দিকগুলোসমন্বয় করা যেতে পারে, অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক নীতি হবে সমন্বয়মূলক। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে সম্পদের সুষম বন্টনের মাধ্যমে সমাজের সর্বোচ্চ কল্যাণ সাধন করাই অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ হওয়া উচিত।

.৪.৩: সশস্ত্র বাহিনী (Armed Forces)
সশস্ত্র বাহিনীর বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত দক্ষ, এ ব্যাপারে সবাই মোটামুটি একমত। কিন্তু সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে যদি নৈতিকতা না থাকে, তাহলে জনগণ ও রাষ্ট্র উভয়ের জন্যে এক পর্যায়ে তা অকল্যাণ বয়ে আনবে। যেমন: মিলিটারি ক্যু। এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ ও সশস্ত্র বাহিনীর পেশাগত উৎকর্ষতা সাধনের জন্যে টেকসই নৈতিকতা জরুরি। এছাড়া সকল নাগরিককে সামরিকভাবে প্রশিক্ষিত করে গণপ্রতিরক্ষা নীতির মাধ্যমেও সশস্ত্র বাহিনীতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।


অন্যান্য পর্ব:

ইসলামী মতাদর্শের আলোকে সামাজিক আন্দোলন
পর্ব-১: ইসলাম,
পর্ব-২: ইসলামী আন্দোলন,
পর্ব-৩: কর্মধারা,
পর্ব-৪: দ্বীন ও শরীয়াহ,
পর্ব-৫: সমাজ ও রাষ্ট্র,
পর্ব-৬: ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ অথবা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র,
পর্ব-৭: সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া,
পর্ব-৮: সংগঠন কাঠামো

আরো পড়ুন: Social Movement from Islamic Perspective: Analysis & Proposals

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক
সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় || পরিচালক, সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র
http://mozammelhoque.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *