'রিক্লেইমিং দ্যা মস্ক' বইয়ের ধারাবাহিক অনুবাদ: পর্ব-১৮

নারীরা কি মসজিদে পুরুষদের উদ্দেশ্যে লেকচার দিতে পারবে?

রাসূল (সা) সাধারণত তাঁর মসজিদে মানুষদেরকে শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা দিতেন। তাঁর ইন্তেকালের পর সাহাবীগণও তা অব্যাহত রাখেন। অবশ্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার যে প্রথা, সে অনুযায়ী রাসূলের (সা) যুগে কোনো নারী বা পুরুষ শিক্ষা দিয়েছেন বলে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে ইসলামের প্রথম যুগে রাসূলের (সা) হাজার হাজার হাদীস নারীদের মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। নারী সাহাবীগণ, বিশেষত রাসূলের (সা) স্ত্রীগণ হলেন তাঁর সুন্নাহ সম্পর্কে জানার অন্যতম প্রধান উৎস।

বাস্তব সত্য হলো, রাসূলের (সা) যুগ পরবর্তীকালে পাণ্ডিত্য অর্জনের অন্যতম একটি দিক ছিলো, পুরুষ মুহাদ্দিসগণ সাধারণত নারী সাহাবী ও তাঁদের ছাত্রদের নিকট থেকে হাদীস শিখতেন।

‘প্রথম তিন শতাব্দীতে হাদীস চর্চায় নারীদের ভূমিকা’ শীর্ষক অসাধারণ একটি বই লিখেছেন আমাল কুরদাশ। সেখানে তিনি হাদীস বর্ণনাকারী অনেক নারীর নাম উল্লেখ করেন, যারা বড় বড় পুরুষ মুহাদ্দিসকে শিক্ষা দিয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম মালিক ইবনে আনাসের কন্যা ফাতিমা, খাদিজা উম্মে মুহাম্মদ, জয়নব বিনতে সুলাইমান আল-হাশিমিয়্যাহ, জয়নব বিনতে সুলাইমান ইবনে আবু জাফর আল-মানসুর, উম্মে ওমর আল-তাকাফিয়্যাহ, আসমা বিনতে আসাদ ইবনে আল-ফুরাত, সুলাইহা বিনতে আবু নাঈম, সামানাহ বিনতে হামদান আল-আনবাইয়াহ, আবদাহ বিনতে আব্দুর রহমান ইবনে মুসয়াব প্রমুখ।

কতজন নারী সাহাবীর কাছ থেকে বড় বড় ইমামগণ হাদীস বর্ণনা করেছেন, সেই হিসাবও তিনি বের করেছেন:

  • ইমাম বুখারী তাঁর হাদীস গ্রন্থে ৩১ জন নারী সাহাবী থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
  • ইমাম মুসলিম তাঁর হাদীস গ্রন্থে ৩৬ জন নারী সাহাবী থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
  • ইমাম আবু দাউদ তাঁর সুনানে ৭৫ জন নারী সাহাবী থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
  • ইমাম তিরমিযী তাঁর সুনানে ৪৬ জন নারী সাহাবী থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
  • ইমাম নাসায়ী তাঁর সুনানে ৬৫ জন নারী সাহাবী থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
  • ইমাম ইবনে মাজাহ তাঁর সুনানে ৬০ জন নারী সাহাবী থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

এই নারী লেখক তাঁর বইয়ে আরো বলেন,

“রাসূলের (সা) সকল স্ত্রীর ইন্তেকালের পরেই কেবল নারীদের নিকট থেকে হাদীস বর্ণনার ধারা স্তিমিত হয়ে আসে। নারী স্কলারগণ নিয়মিতই রাসূলের (সা) স্ত্রীগণের নিকট আসা-যাওয়া করতেন। পরবর্তীতে নারীদের হাদীস চর্চা কমে আসলেও আনাস (রা), আব্দুল্লাহ ইবনে আওফা (রা), ইবনে ওমরের (রা) মতো কনিষ্ঠ সাহাবীগণ যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন পর্যন্ত এ ধারাটি অব্যাহত ছিলো।”[1]

গবেষকদের মতে, নারীদের হাদীস চর্চা কমে যাওয়া মূলত ইসলামী সভ্যতার পতনের সাথে সম্পর্কিত। বিভিন্ন অঞ্চলে নারীদেরকে মসজিদে যেতে নিষেধ করার সংস্কৃতির সাথেও এর স্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে।

তারপরও সোনালী যুগের মুসলিম নারী স্কলারদের যেসব তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে, তা থেকে বুঝা যায়, শিক্ষা ও জ্ঞানের ক্ষেত্রে মুসলিম নারীগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণার মাধ্যমে ড. মোহাম্মদ আকরাম নদভী সম্প্রতি নারী মুহাদ্দিসগণের (আল-মুহাদ্দিসাত) জীবনী সংকলন করেছেন; এবং বর্তমানে ইসলাম সম্পর্কে আমরা যা জানি, তার পেছনে নারী স্কলারদের অবদান যে কত অমূল্য ছিলো, সেটি বিশ্লেষণ করেছেন। ৪৩ খণ্ডের এই জীবন-ইতিহাস ভিত্তিক অভিধানটির ভূমিকা হিসেবে প্রথম খণ্ডটি ইংরেজিতে আলাদাভাবে প্রকাশিত হয়েছে।[2] ইসলামের ইতিহাসের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে নারীদের বুদ্ধিবৃত্তি চর্চা সম্পর্কে একটি পরিপূর্ণ ধারণা লাভের জন্য এই গবেষণাকর্মটি বিস্তারিতভাবে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। শিক্ষক হিসেবে নারী স্কলারদের ভূমিকা সম্পর্কিত যে প্রশ্নটির জবাব আমরা এই অধ্যায়ে খুঁজছি, তার সাথে সম্পর্কিত একটি অনুচ্ছেদ নিচে উদ্ধৃত করছি:

“নারীদের মধ্যে যারা দ্বীনের জ্ঞান রাখতেন, তারা নারীদের পাশাপাশি পুরুষদের মাঝেও সেই জ্ঞান বিতরণ করতেন। বাস্তবে হাদীস শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই যেহেতু পুরুষ ছিলো, তাই আমরা ধরে নিতে পারি যে নারী মুহাদ্দিসদের অধিকাংশ ছাত্রই ছিলো পুরুষ। নারী শিক্ষকগণের সংখ্যা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম ছিলো। তবে কোনো কোনো সময়কালে তাঁরা সংখ্যায় অনেক বেশি ছিলেন। উদাহরণ হিসেবে ইমাম  যাহাবীর একটি বর্ণনার কথা বলা যায়। ইবনে আল-সা’তীর সূত্রে হাফেজ আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মাহমুদ ইবনে নাজ্জারের (মৃত্যু ৬৪৩) ব্যাপারে তিনি বর্ণনা করেছেন, তাঁর তিন হাজার পুরুষ এবং চারশতম নারী শিক্ষক ছিলেন। রাসূলের (সা) সুন্নাহ সংরক্ষণ ও প্রচারের ক্ষেত্রে নারীদের অবদানের প্রমাণ হিসেবে এটুকু বলাই যথেষ্ট যে রাসূলের (সা) মহান কিছু সাহাবী এবং তাঁদের পর ইসলামী জ্ঞানজগতের মহান কিছু ইমাম ও ফকীহ নারী শিক্ষকদের উপর নির্ভর করেছেন।”[3]

মসজিদে নারীদের শিক্ষকতা প্রসঙ্গে কথা হলো, নারীরা মসজিদে পুরুষ ও নারীদেরকে শিক্ষাদান করতে পারবে না মর্মে কোনো দলীল নেই। ইতিহাসে বরং উল্টোটাই দেখা যায়। অর্থাৎ, ইসলামী জ্ঞানজগতে, বিশেষত মসজিদে, নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের ফলে ইসলামী সভ্যতা এবং জ্ঞানচর্চার সকল ধারা সমৃদ্ধ হয়েছে। বর্তমানে ইসলামী জ্ঞানের পুনর্জাগরণ ঘটাতে চাইলে মসজিদকে আবারো জ্ঞানচর্চার মূল ভূমিকায় ফিরিয়ে আনা উচিত।

[মূল: জাসের আওদা, অনুবাদ: জোবায়ের আল মাহমুদ]

অন্যান্য পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

রেফারেন্স:

[1] দাউরুল মারআতি ফি খিদমাতিল হাদীসি ফিল কুরুনীল সালাসাতিল উলা (প্রথম তিন শতাব্দীতে হাদীস চর্চায় নারীদের ভূমিকা), আমালা কুরদাশ বিনতে আল-হুসাইন, আল-উম্মাহ বুক, ওয়াকফ ও ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স বিষয়ক মন্ত্রণালয়, গবেষণা ও অধ্যয়ন কেন্দ্র, কাতার, খণ্ড- ৭০, ১৯৯৯।

[2] মোহাম্মদ আকরাম নদভী, আল মুহাদ্দিসাত: দ্যা ওইমেন স্কলারস ইন ইসলাম (অক্সফোর্ড: ইন্টারফেস পাবলিকেশন্স, ২০০৭)।

[3] আল-মুহাদ্দিসাত, ১৩৮।

জাসের আওদাhttp://www.jasserauda.net
মাকাসিদে শরীয়াহর উপর একজন শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ। ‘মাকাসিদ ইনস্টিটিউট গ্লোবাল’ নামক একটি থিংকট্যাংকের প্রেসিডেন্ট। ফিকহ কাউন্সিল অব নর্থ আমেরিকা, দ্য ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফতওয়া এবং ফিকহ একাডেমি অব ইন্ডিয়ার সদস্য। পড়াশোনা করেছেন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলস এবং কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলু থেকে ইসলামী আইন ও সিস্টেম অ্যানালাইসিসের উপর দুটি পিএইচডি করেছেন। বিভিন্ন দেশের বেশ কটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। আরবী ও ইংরেজিতে প্রায় ২৫টি বইয়ের লেখক।

সাম্প্রতিক

এ ধরনের আরো নিবন্ধ