এডিটরস নোট:

২০১১ সালে বিবিসিতে প্রচারিত হয় মহানবীর (সা) জীবনীভিত্তিক ডকুমেন্টারি ‘দ্য লাইফ অব মোহাম্মদ’। তিন পর্বের এই ডকু-ফিল্মটি সম্প্রচারের পর পশ্চিমা বিশ্বে ব্যাপক আলোচিত হয়। এই প্রথম কোনো পাশ্চাত্য মিডিয়া মহানবীর (সা) জীবনীর উপর পূর্ণাঙ্গ কোনো অনুষ্ঠান সম্প্রচার করলো। ডকুমেন্টারিটির স্ক্রিপ্ট লিখেছেন ব্রিটিশ স্কলার জিয়াউদ্দীন সরদার। উপস্থাপনা করেছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক রাগেহ ওমর। ক্রিসেন্ট ফিল্মস নির্মিত ডকুফিল্মটির পরিচালনা করেছেন ফারিস কেরমানী। মহানবীর (সা) জন্মস্থান মক্কা, হেরা গুহাসহ ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে উপস্থাপক দর্শকদের নিয়ে গেছেন। পক্ষ-বিপক্ষের স্কলারদের প্রচুর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। মহানবীর (সা) জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে পাশ্চাত্য একাডেমিয়াতে সাধারণত যেসব প্রশ্ন তোলা হয়, এখানে ধরে ধরে সেসব ‘আপত্তি’ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য এটি অনুবাদ করছেন মাসউদুল আলম।

*****

ভূমিকা

চৌদ্দশ বছর আগে বর্তমান সৌদি আরবের মক্কায় একজন মহান ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ইতিহাসের গতিধারা পাল্টে দেয়া এই ব্যক্তিটি প্রায় দেড়শ কোটি মুসলমানের নিকট সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল, যিনি মানবজাতির কাছে আল্লাহর বাণী নিয়ে এসেছিলেন। তিনি একটি ধর্মের ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন, যার নাম ইসলাম। তাঁর মৃত্যুর পর এটি একটি সংস্কৃতি ও সভ্যতা হিসেবে গড়ে ওঠে, যা কালক্রমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বের অনেকগুলো আশ্চর্য সুন্দর স্থাপত্যশিল্প এই সভ্যতার হাত ধরে গড়ে ওঠেছে।

সে যাই হোক, বর্তমান বিশ্বে ইসলামকে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। বিশ্বজুড়ে একাধিক নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলার সাথে মোহাম্মদের (সা) নামকে জড়ানো হয়েছে।

মুসলমানদের কাছে তিনি হলেন অনুসরণীয় চূড়ান্ত আদর্শ। তাঁর বিস্তারিত জীবনীও মুসলমানরা জানে। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের বাইরে বলতে গেলে কেউই তাঁর সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। তাই তিনি আসলে কে, তিনি কী বার্তা নিয়ে এসেছিলেন, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে বহু মানুষ কেন তাঁর শিক্ষার বিরোধী– এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

মোহাম্মদের (সা) উপর নাজিলকৃত ঐশীবাণী, বহুবিবাহ নিয়ে বিতর্ক, ইহুদীদের সাথে তাঁর সম্পর্ক, যুদ্ধ ও শান্তির সময়ে অনুসৃত নীতি, তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে প্রণীত আইনসহ তাঁর জীবনের বহু জটিল ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ আমি এই সিরিজে তুলে ধরবো। তৎকালীন সময় ও তাঁর জীবনীর উপর আমি একটি নির্মোহ পর্যালোচনা করতে চাই। বর্তমান বিশ্বকে কীভাবে তা প্রভাবিত করছে, সে ব্যাপারটি বুঝতে চাই। তাঁর শিক্ষা আমাদের জন্য ভালো নাকি মন্দ– সেটিও বুঝে নিতে চাই। আমি ইসলামের নবী মোহাম্মদের (সা) সঠিক পরিচয় তুলে ধরতে চাই। আল্লাহ তাঁর উপর শান্তি বর্ষণ করুন।

প্রথম পর্ব: সত্যসন্ধানী

মুসলমানরা অতি সাধারণ দুই টুকরো সাদা কাপড় পরিধান করে মক্কায় হজ ও ওমরা করতে আসে। দৈনন্দিন পরিধেয় কাপড়ের পরিবর্তে পবিত্রতা ও সমতার প্রতীক হিসেবে তারা এই সাধারণ কাপড় তারা পরিধান করে। গত চৌদ্দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে, অর্থাৎ মোহাম্মদের (সা) সময়কাল থেকে এখন পর্যন্ত অব্যাহতভাবে ঐতিহ্যটি পালিত হয়ে আসছে।

জন্মের পর পরই আমার কানে প্রথম যে শব্দগুচ্ছ প্রবেশ করে, তাহলো কালেমায়ে শাহাদাত, ঈমানের সাদামাটা ঘোষণা– ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, মোহাম্মদ আল্লাহর রাসূল’। এই ঘোষণা একইসাথে আমাকে মক্কা এবং ইসলামের প্রতিষ্ঠাতার সাথে সংযুক্ত করে দিয়েছিলো। অধিকাংশ মুসলমানের মতো আমিও বাবা-মায়ের পরিবর্তে মোহাম্মদের (সা) নামই সর্বপ্রথম শুনেছি।

ত্রিশ বছর আগে যখন আমার বয়স ছিলো পাঁচ, তখন পরিবারের সাথে হজ করার উদ্দেশ্যে মক্কায় এসেছিলাম। মক্কার কাবাঘর হলো ইসলামের সর্বাধিক পরিচিত প্রতীক। মুসলমানরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, কাবার দিকে ফিরে প্রতিদিন পাঁচবার তারা নামাজ আদায় করে। আল্লাহর দরবারে নিজেকে সঁপে দিয়ে কাবার চারদিক প্রদক্ষিণ করার মাধ্যমে মুসলমানরা মোহাম্মদের (সা) পদাঙ্ক অনুসরণ করে। কোন একতার টানে সারা দুনিয়া থেকে লোকজন এখানে আসে? এ প্রশ্নের উত্তর হলো, সবাই নবী মোহাম্মদের (সা) জীবনের মতো করে নিজের জীবনকে সাজাতে চায়। খ্রিস্টানদের কাছে যিশু যতটা গুরুত্বপূর্ণ, মুসলমানদের কাছে মোহাম্মদ (সা) ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই মানুষটি তাদের শুদ্ধ পরিচয় নির্ধারণ করেছেন।

তবে তারা যিশুর মতো মোহাম্মদকে (সা) আল্লাহর পুত্র মনে করে না। আর দশজন স্বাভাবিক মানুষের মতোই তাঁর জন্ম হয়েছিলো, যিশুর মতো অলৌকিকভাবে নয়। তিনি সাধারণত কোনো অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন করতেন না। যিশুর মতো তিনি পুনরুত্থিতও হননি। তিনি আমাদের মতোই একজন মানুষ ছিলেন।

মক্কা নগরী

চৌদ্দশ বছর আগে মোহাম্মদ (সা) যেখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেখানকার পরিবেশ ছিলো বসবাসের জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল। সেই তপ্ত মরুভূমি ও রুক্ষ পার্বত্যঞ্চলটি আকারে ছিলো ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ। এর অবস্থান ছিলো তৎকালীন দুনিয়ার দুই বৃহৎ পরাশক্তির মাঝখানে। উত্তরে ছিলো রোমানদের সর্বশেষ সাম্রাজ্য খ্রিস্টান বাইজেন্টাইন। এর রাজধানী ছিলো কনস্টান্টিনোপল। আর পূর্বে ছিলো আরেক প্রাচীন শক্তি, বিশাল পারস্য সাম্রাজ্যের অবশিষ্টাংশ– সাসানীয় সভ্যতা। এর মধ্যবর্তী অঞ্চলে অসংখ্য আরব উপজাতি ও গোত্র আধিপত্য বিস্তার ও টিকে থাকার লড়াইয়ে সর্বদা লিপ্ত থাকতো। পুরো অঞ্চল জুড়ে শহর ছিলো মাত্র গুটিকয়েক। এরমধ্যে অন্যতম হলো তাঁর জন্মস্থান মক্কা।

মোহাম্মদ (সা) ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। জন্মের আগেই তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেন। আর মা আমেনা ছিলেন খুবই দরিদ্র। সবচেয়ে বড় কথা হলো, একজন ‘মেসিয়াহ’র যে আগমন ঘটছে, এর কোনো ইঙ্গিত ছিলো না। তাঁর আগমনে আকাশে বিশেষ কোনো তারকার আবির্ভাব ঘটেনি। তাঁর উপাসনা করতে দূরদূরান্ত থেকে জ্ঞানী লোকদের আগমনও ঘটেনি। মাত্র গুটিকতেক জ্ঞানী ব্যক্তি ব্যাপারটি খেয়াল করেছিলেন। বাদবাকিরা ঘটনাটিকে আদৌ তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনি। মোহাম্মদ (সা) ঠিক কোথায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, এর কোনো চিহ্ন এখন আর নেই। কোনো স্মৃতিসৌধ নেই, যাদুঘর নেই, এমনকি একটি ফলক পর্যন্তও নেই।

কেন মহানবীর প্রতিকৃতি আঁকা হয় না?

বেশিরভাগ মুসলমানই ব্যক্তি মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর প্রচারিত শিক্ষার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য মেনে চলেন। মোহাম্মদ (সা) নিশ্চয় উচ্চ মর্যাদায় আসীন, কিন্তু তাই বলে তিনি উপাসনাযোগ্য নন। তাঁর ইবাদত করা শিরক হিসেবে বিবেচিত। ইসলামে এটি জঘন্য ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। আর তাই মানুষ যাতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করে, সে জন্য মোহাম্মদের (সা) স্মৃতি বিজড়িত বহু স্থানের চিহ্ন মুছে ফেলা হয়েছে। মোহাম্মদের (সা) প্রতিকৃতি আঁকার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাই খ্রিস্টান চার্চগুলোতে ক্রুশবিদ্ধ যিশু ও কুমারী মাতা মেরির অসংখ্য ছবি দেখা গেলেও মসজিদগুলোতে মোহাম্মদ (সা) কিংবা অন্য কারোরই কোনো ছবি নেই। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির কনটেম্পোরারি ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক তারিক রমাদান এ সম্পর্কে বলেন,

ঠিক এ কারণেই মুসলমানদের জন্য ইসলামী একেশ্বরবাদ (যাকে আমরা আরবীতে বলি ‘তাওহীদ’ তথা আল্লাহর একত্ববাদ) সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তাই আমরা আল্লাহর কোনো প্রতিকৃতি বানাই না। এটি খোদার সাথে আমাদের এই বিশেষ সম্পর্কেরই দাবি। আমরা নবীদেরও কোনো ধরনের প্রতিকৃতি বানাই না। কেবল সর্বশেষ নবী মোহাম্মদই (সা) নন, ইব্রাহীম (আ), মুসা (আ), ঈসা (আ) সহ সকল নবীর ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি কমিটমেন্টের কারণেই আমরা কখনো মহানবীর (সা) ইবাদত করি না।

অতীতে কিছু উসমানীয় ও ইরানী মিনিয়েচার পেইন্টিংয়ে মোহাম্মদের (সা) ছবি আঁকা হয়েছিলো। তবে সেগুলোর সবগুলোতেই তাঁর মুখাবয়বকে আড়াল রাখা হয়েছে। অন্যদিকে পাশ্চাত্যের ড্রয়িং ও পেইন্টিংয়ে মোহাম্মদের (সা) প্রতিকৃতি আঁকার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

অতি সম্প্রতি একটি ডেনিশ কার্টুনে পাগড়ির ভেতর বোমা সম্বলিত একজন সন্ত্রাসী হিসেবে মুহাম্মদকে (সা) চিত্রিত করা হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় মুসলিম বিশ্ব জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এই প্রতিবাদের পেছনে নিছক মুখাবয়ব আঁকাই মুখ্য কারণ ছিলো না। এই ধরনের কার্টুন প্রকাশের মাধ্যমে তাঁকে অপমান করাটাই ছিল মূল ইস্যু।

মহানবীর জীবনীর বিশুদ্ধতা কতটুকু?

মোহাম্মদের (সা) ছবি খুব একটা না থাকলেও তাঁর জীবনী সংক্রান্ত অসংখ্য লিখিত বিবরণ রয়েছে। এরমধ্যে প্রথমটি হলো স্বয়ং ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ কোরআন। এছাড়াও মোহাম্মদের (সা) জীবনের অসংখ্য ঘটনা ও নিজের কথা তাঁর মৃত্যু পরবর্তী সময়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এগুলো হাদীস নামে পরিচিত। মুসলিম পণ্ডিতগণ মোহাম্মদের (সা) অসংখ্য বাণী ও তাঁর সম্পর্কে বলা ঘটনাগুলো নানাভাবে যাচাই করে বিশুদ্ধ রেফারেন্সগুলো আলাদাভাবে সংরক্ষণ করেছেন। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজের সিনিয়র লেকচারার ড. আমিরা বেনিসন এ প্রসঙ্গে বলেন,

মুসলিম পণ্ডিতরা সংগৃহীত হাদীসগুলো যাচাই-বাছাই করে বিশুদ্ধ হাদীসগুলো থেকে ভুয়া ও জাল হাদীসগুলো আলাদা করার চেষ্টা করেছেন। এসব বিষয়ে তারা সর্বোচ্চ পরিমাণ সচেতন থাকতেন।

জেরুসালেমে অবস্থিত হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাসের অধ্যাপক রবার্ট হয়ল্যান্ড অবশ্য হাদীসের বিশুদ্ধতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে বলেন,

এ ব্যাপারটি নিয়ে গবেষকরা নানা ধরনের সমস্যায় পড়েন। যেমন একটা সমস্যা হলো, এগুলোর লিখিত ভাষ্য তৈরি হয়েছে অনেক পরে। ৮২০ খ্রিষ্টাব্দের আগে প্রকৃতপক্ষে আমরা কোনো লিখিত বর্ণনা পাই না। অথচ মোহাম্মদ মৃত্যুবরণ করেছেন ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে। তারমানে একটা লম্বা সময় পরে এসে এসব লেখা হয়েছে। হ্যাঁ, মাঝখানের এই সময়টাতে প্রত্যেক যুগের লোকেরা নিশ্চয় হাদীসগুলো পরবর্তী যুগের লোকদের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়ে গেছে। কিন্তু তা ছিল মুখে মুখে। হাদীসগুলোর বিশুদ্ধতার প্রশ্নে এটা একটা সম্ভাব্য দুর্বলতা।

তবে সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদেল হালিম মনে করেন, এই সংশয়ের কোনো ভিত্তি নেই। তাঁর যুক্তি হলো,

ঐতিহাসিকভাবেই আরবরা তাদের স্মৃতিশক্তির উপর নির্ভর করতো। স্মৃতিশক্তির উপর নির্ভর করেই তাদের ইতিহাস, বংশলতিকা ইত্যাদি সবকিছু সময়ের পরম্পরায় চলে এসেছে। আর সেখানে মোহাম্মদ (সা) তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। মৃত্যুর সময় তাঁর অনুসারী ছিলো হাজার হাজার, বিরোধী লোক ছিলো কম। তাঁর অনুসারীরা সবকিছু বলে গেছেন, সংরক্ষণ করে গেছেন। এখন কিছু লোকের ‘এগুলো তো বানোয়াট কথা মাত্র’ কিংবা ‘এগুলোর লিখিত রূপ তো অনেক পরে এসেছে’ নিছক এ জাতীয় বক্তব্যের কারণেই হাদীসের এই সমস্ত সূত্রগুলোকে উপেক্ষা করা যায় না।

হাদীসের বিশুদ্ধতা নিয়ে বিতর্ক চলমান থাকলেও কিছু অমুসলিম সূত্র থেকেও কিন্তু মোহাম্মদের (সা) ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ পাওয়া যায়। এটি অবাক হওয়ার মতো একটি ব্যাপারই বটে। সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের নিয়ার অ্যান্ড মিডল-ইস্ট হিস্ট্রির ইমেরিটাস অধ্যাপক জেরাল্ড হটিং আমাদের জানাচ্ছেন,

মোহাম্মদকে নিয়ে অমুসলিম সূত্রে বর্ণিত তথ্যপ্রমাণ খুব বেশি নেই। অল্পকিছু ঐতিহাসিক দলীল রয়েছে মাত্র। মোহাম্মদের মৃত্যু পরবর্তী ৩০ বছরের মধ্যে গ্রিক, সিরিয়াক ও আর্মেনীয় ভাষায় তাঁর নামের লিখিত রূপ পাওয়া যায়। আমি মনে করি, তাঁর মৃত্যুর ৩০ বছরের মধ্যে এমনটি ঘটা একেবারে কম কিছু নয়।

প্রচলিত তথ্য হলো, ঐতিহাসিক সেবেউস মোহাম্মদের (সা) মৃত্যুর মাত্র ২৪ বছর পর আর্মেনীয় ভাষায় তাঁর সম্পর্কে লিখে গেছেন। তবে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ অনুষদের অধ্যাপক রবার্ট থমসন জানাচ্ছেন,

এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, প্রথমবারের মতো একজন আর্মেনীয় তথা একজন অমুসলিম মোহাম্মদ সম্পর্কে বলেছেন, তাঁর নাম উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর কর্ম সম্পর্কে কিছুটা বিবরণ দিয়েছেন। সেবেউস নিজে এসব বিষয়ে কথা বলেছেন ৬৩০ সালের দিকে। তারমানে এটি প্রকৃতপক্ষে মোহাম্মদের মৃত্যুর আগের ঘটনা।

অবাক করা বিষয় হলো, মোহাম্মদের (সা) পরিচয় ও তাঁর শিক্ষা সম্পর্কে একদম সঠিক তথ্যই সেবেউস তুলে ধরতে পেরেছেন। অধ্যাপক রবার্ট থমসন আর্মেনীয় ভাষায় সেবেউসের লেখা থেকে অনুবাদ করে আমাকে শুনিয়েছেন–

সেই সময় মেহমেত (আর্মেনীয় ভাষায় মোহাম্মদকে মেহমেত উচ্চারণ করা হয়) নামে একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। ঈশ্বরের আদেশপ্রাপ্ত হয়ে তিনি মানুষের কাছে ধর্মপ্রচারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তারপর, বর্তমানে তিনি তাদেরকে অনেকগুলো বিধিনিষেধ দিয়েছেন। যেমন– মৃত প্রাণীর মাংস ভক্ষণ করো না, মদপান করো না, মিথ্যা কথা বলো না, ব্যভিচার করো না ইত্যাদি।

মোহাম্মদের (সা) সময়কাল সম্পর্কে মুসলিমদের বর্ণনার সাথে সেবেউস ও অন্যান্য অমুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনা মোটাদাগে মিলে যায়। কোরআন ও হাদীসের সমন্বয় করলে আমরা মোহাম্মদের (সা) জীবনের বিস্তৃত ও খুঁটিনাটি ঘটনাগুলো খুঁজে পাই।

তৎকালীন আরবের সমাজ কাঠামো

আমরা জানি, তিনি কোরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই গোত্রটি মক্কা নগরী শাসন করতো। আমরা এটিও জানি, তাঁর পরিবার ছিলো গরিব। জন্মের আগেই তাঁর বাবা মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি মোহাম্মদের (সা) মা আমেনার কাছে খুব সামান্য অর্থই রেখে যেতে পেরেছিলেন। তৎকালীন আরব ঐতিহ্য অনুযায়ী জন্মের মাত্র কয়েক মাস পরেই তাঁকে শহরের প্রান্তে এক বেদুইন পরিবারের কাছে লালন-পালনের জন্যে দেয়া হয়। তিনি জীবনের প্রথম চার বছর একজন বেদুইন ধাত্রীর কাছে যাযাবর হিসেবে পালিত হন।

বসবাসের জন্য তৎকালীন আরব ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল একটি জায়গা। সেখানে কোনো আইন ছিলো না, কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিলো না। শান্তি ছিল সুদূর পরাহত। গোত্রীয় আনুগত্য এবং সামাজিক রীতিনীতিই ছিল নিরাপত্তার একমাত্র উপায়। ন্যায়বিচার ছিল দুর্লভ ব্যাপার। কদাচিৎ হয়তো এ ধরনের সুবিধা পাওয়া যেতো। অপরাধের শাস্তি ছিল নৃশংস। যেমন, রুটি চুরি করে কেউ ধরা পরলে প্রায় সময় তাকে মেরে ফেলা হতো। বেঁচে থাকার জন্য নিত্যদিনের কঠোর সংগ্রাম মানুষকে কতটা নিষ্ঠুর করে তুললে এমনটি করা সম্ভব! অধিকাংশ মানুষের ভালোভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ বলতে গেলে ছিলোই না। এই সময়ের বাস্তবতাকে বুঝানোর জন্য মুসলমানরা একটা বিশেষ শব্দ ব্যবহার করে থাকে– ‘জাহেলিয়াত’ তথা অজ্ঞতার যুগ।

সেই সমাজেরও একটি কাঠামো তথা বিশ্বাসব্যবস্থা ছিল। তবে ধর্ম বলতে আমরা এখন যা বুঝি, সে ধরনের সুসংগঠিত কোনো ধর্ম তখন সেখানে ছিলো না। ড. আমিরা বেনিসনের মতে,

আরবের লোকেরা ছিল বহু-ঈশ্বরবাদী। তারা অসংখ্য দেবদেবীর পূজা করতো। সাধারণত প্রত্যেক গোত্রের ভিন্ন ভিন্ন নিজস্ব দেবদেবী ছিলো। পুরো আরব জুড়ে ছিলো একই চিত্র।

মোহাম্মদের (সা) জন্মস্থান মক্কা এই বহু-ঈশ্বরবাদী পূজা-অর্চনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিলো। ‘মোহাম্মদ: অ্যা বায়োগ্রাফি অব দ্যা প্রফেট’ বইয়ের লেখিকা ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

বর্তমানে পৌত্তলিকতা বলতে আমরা যেমনটা বুঝি, তৎকালীন আরবের অধিকাংশ শহর ও অঞ্চলে কার্যত তেমন ধরনের পৌত্তলিকতাই দীর্ঘদিন সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলো। ঘরের মাঝখানে এক ধরনের বর্গাকার বেদি থাকতো। বেদির চারপাশ ঘিরে বিভিন্ন ধরনের দেবদেবীর মূর্তি দাঁড় করিয়ে রাখা হতো। বিশেষ করে শহর ও কৃষিনির্ভর অঞ্চলগুলোতে এই প্রবণতা কিছুটা বেশি ছিলো। আল্লাহকে তারা সর্বোচ্চ খোদা মনে করতো। বেশিরভাগ আরবই অবশ্য খুব একটা ধার্মিক ছিলো না।

মুসলমানদের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, আদমের (আ) সময় স্বয়ং আল্লাহ কর্তৃক কাবাঘর নির্মিত হয়েছিলো। তবে ঘরটির প্রকৃত নির্মাণকাল সম্পর্কে কোনো প্রত্মতাত্ত্বিক বা ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না। মোহাম্মদ (সা) যখন জন্মগ্রহণ করেন, তখন দীর্ঘকাল ধরেই মক্কা ছিলো আরবের লোকদের পৌত্তলিকতা চর্চার কেন্দ্র। তীর্থস্থান বিবেচনা করে লোকেরা সেখানে ভ্রমণ করতো। ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটরের আরব অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক সাজ্জাদ রিজভী বলেন,

মুসলিম বর্ণনা মতে, আল্লাহর ইবাদতের জন্য প্রধান প্রার্থনাগৃহ কাবার অস্তিত্ব স্মরণাতীত কাল থেকে বিদ্যমান। তাই ধারণা করা হয়, আল্লাহর ঘর কাবার প্রথম নির্মাতা ছিলেন আদম (আ)। সেই থেকে পরবর্তীতে অনেক নবী-রাসূল ঘরটির দেখাশোনা করেছেন। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ এক আল্লাহর ইবাদত করা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। তারপর ইবরাহীম (আ) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ) কাবাঘর পুনর্নিমাণ করেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে কাবা নির্মাণের প্রকৃত উদ্দেশ্যটি লোকেরা ভুলে যায়।

মক্কার সাথে ইবরাহীমের (আ) সম্পর্ক নিয়ে কোনো অমুসলিম সূত্রের বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে এটুকু জানা যায়, মোহাম্মদের (সা) জন্মের সময় কাবা ঘরে ৩৬০টিরও বেশি দেবদেবীর মূর্তি ছিলো। তবে এগুলোর মর্যাদার তারতম্য ছিলো। প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হতো, যাতে বিরোধী গোত্রগুলো নির্ভয়ে মক্কায় এসে কাবা প্রদক্ষিণ করতে পারে এবং নিজ নিজ দেবতাদের উপাসনা করতে পারে। এখানে বার্ষিক তীর্থযাত্রাকে কেন্দ্র করে ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছিলো। মোহাম্মদ (সা) কোরাইশ গোত্রে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যাদের হাতে ছিলো কাবার নিয়ন্ত্রণ। ফলে তারা ছিলো ধনী ও ক্ষমতাবান। অবশ্য মোহাম্মদ (সা) স্বয়ং এই সম্পদ ও ক্ষমতাবৃত্তের  বাইরে ছিলেন।

শৈশবে নিঃসঙ্গ মোহাম্মদ

পাঁচ বছর বয়সে মুহাম্মদকে (সা) মক্কায় তাঁর মা আমেনার কাছে ফিরিয়ে আনা হয়। কিছুদিন পর আমেনা মনস্থির করলেন, ইয়াসরিবে নিজের পরিবারের সাথে দেখা করতে যাবেন। শহরটি মক্কা থেকে প্রায় তিনশ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। ফিরতি পথে তিনি ছিলেন বেশ অসুস্থ। তার উপর মরুভূমিতে উটের কাফেলার সাথে চলার কারণে তার অসুস্থতা আরো বেড়ে যায়। এরমধ্যে আবুয়া নামক এক ছোট্ট মরুদ্যানে কাফেলা থামলো। তারা সেখানে মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর মাকে রেখে যায়। তারা ভেবেছিলো, এখানে কিছুদিন বিশ্রাম নিলে তিনি হয়তো সুস্থ হয়ে উঠবেন। কিন্তু আসলে তা হওয়ার ছিলো না। এর কয়েকদিন পরই আমেনা মারা যান। মা-বাবা দুজনকেই হারিয়ে মোহাম্মদ (সা) পৃথিবীতে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি একজন এতিম বালকে পরিণত হন।

এই হৃদয়বিদারক ঘটনা পরবর্তীতে মোহাম্মদের (সা) দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যক্তিত্ব গঠনে বিশাল ভূমিকা রেখেছিলো। ‘দ্যা প্রফেট মোহাম্মদ: এ বায়োগ্রাফি’ বইয়ের লেখক বারনাবি রজারসন বলেছেন,

সেই নির্জন স্থানটিতে মোহাম্মদ কার্যত নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। মায়ের মৃত্যু দেখা ছাড়া তাঁর আর কিছুই করার ছিলো না। একসময় এই পরিচিত যাত্রাপথটিতে আরেকটি কাফেলা আসলেই কেবল তিনি পুনরায় সমাজে ফিরে যেতে পেরেছিলেন। নিঃসন্দেহে এটি ছিল ভয়ংকর, মর্মন্তুদ ও দুঃসহ একটি অভিজ্ঞতা।

শিশু মোহাম্মদের (সা) সামনে আরো স্বজন হারানোর বেদনা অপেক্ষা করছিলো। মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর দাদা তাঁকে দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র দুই বছর পর তিনিও মারা যান। তারপর তাঁকে লালন-পালনের দায়িত্ব নেন চাচা আবু তালেব। তিনি ছিলেন মক্কার অভিজাতদের মধ্যে অন্যতম ক্ষমতাধর একজন ব্যক্তি। পেশায় ব্যবসায়ী। ব্যবসায়িক কাজে তিনি সিরিয়ায় বাণিজ্য কাফেলা পাঠাতেন।

ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে মক্কার গুরুত্ব

ব্যবসায়িক রুট হওয়ার কারণে প্রাচীনকাল থেকেই আশপাশের জনবহুল অঞ্চল ও সভ্যতাগুলোর সাথে আরব অঞ্চলের যোগাযোগ ছিলো। মক্কা ছিলো এই চেইনের একটি লিংক। বারনাবি রজারসনের মন্তব্য,

আমার ধারণা, ব্যবসায়ী কাফেলাগুলো ইয়েমেন থেকে মশলা, সিলভার ও চামড়া বোঝাই করে মক্কায় নিয়ে আসতো। মক্কার কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী তাদের নিকট থেকে এসব কিনে নিতো। তারপর তারা সিরিয়া, গাজা, মিশর, ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এসব নিয়ে বিক্রি করতো। আপনি তখন সেখানে গেলে হয়তো দেখতে পেতেন, পবিত্র ঘরটির পাশেই ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের হই-হট্টগোল চলছে, উটগুলো জড়ো করে মালামাল বোঝাই করা হচ্ছে।

মুসলমানরা মক্কাকে তৎকালীন ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এবং তাদের নবীর জন্মের জন্য উপযুক্ত একটি স্থান হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। তবে কোনো কোনো ইতিহাসবিদ মক্কার ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেন। এমন একজন হলেন লেখক ও ইতিহাসবিদ টম হল্যান্ড। তিনি বলেন,

মুসলমানরা আমাদের সামনে মক্কাকে একটি বিশাল বাণিজ্যিক নগরী হিসেবে তুলে ধরে। তাদের মতে, মক্কা ছিলো পৌত্তলিকদের কেন্দ্রভূমি। কিন্তু সমস্যা হলো, এই দাবির পেছনে ওই যুগের দলিলপ্রমাণ ও প্রত্মতাত্তিক সমর্থন নেই। মক্কা তৎকালীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে থাকলেও (যদি তা আদতেই হয়ে থাকে) সে বিষয়ে ইসলামী যুগের পূর্বেকার কোনো তথ্য আমরা একদমই জানি না।

অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদেল হালিম এ জাতীয় অভিযোগ খণ্ডন করে বলেন,

তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে সহজেই বলা যায়, মক্কা ছিলো মরু-আরবের কেন্দ্র। আমরা জানি, এইসব বিদেশী ঐতিহাসিকদের পক্ষে আরব মরুভূমির মতো প্রতিকূল ভূখণ্ড পেরিয়ে মক্কায় যাওয়া সম্ভব ছিলো না। তারা শুধু সমুদ্র ও উপকূলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন। তাই মক্কা নিয়ে তাদের ধারণা না থাকার বিষয়টি সহজেই অনুমেয়। যেমন ধরুন, এখানকার লোকজন সাধারণত টিম্বাকটুর কথা বলে না, আঠারো শতক বা তার আগের সময়ের প্রসঙ্গে সাধারণত কিছু বলে না। তারমানে এই নয়, এর আগে এসবের অস্তিত্ব ছিলো না।

কোনো কোনো ঐতিহাসিকের অভিযোগ, মোহাম্মদের (সা) মৃত্যুর পর মুসলিম ঐতিহাসিকরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মক্কার গুরুত্ব অতিরঞ্জিত করে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে, এর মাধ্যমে মুসলমানরা দেখাতে চায় মুহাম্মদ (স) এমন একটি উন্নত এবং গুরুত্বপূর্ণ শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যে শহরটির নিজস্ব ধর্মীয় ঐতিহ্য ইহুদি-খ্রিস্টানদের প্রভাবমুক্ত ছিলো। এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে ইমেরিটাস অধ্যাপক জেরাল্ড হটিং বলেন,

মক্কা নামে তখন কোনো স্থানই ছিলো না, এমনটি আমি বলবো না। তবে ইসলাম আসার আগে মক্কার অস্তিত্ব খুব ভালোভাবে প্রমাণিত নয়। আমার ধারণা, ইসলামে যে মক্কার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে, প্রাথমিক যুগের মুসলমানরা তা বুঝতে পেরেছিলো। ফলে ধীরে ধীরে এই ধারণাটি বিকাশ লাভ করেছে। প্রাথমিক যুগ বলতে আমি নবী কিংবা তাঁর তৎকালীন অনুসারীদের কথা বলছি না। ইসলামের উত্থানের সাথে সাথে মধ্যপ্রাচ্যে আরবদের বিজয়ের হাত ধরে যে সমাজ গড়ে ওঠেছিলো, তার কথা বলছি।

মহানবীর বাণিজ্য সফর

যাই হোক, তরুণ বয়সে বাণিজ্য সফরে অংশগ্রহণ ছিল মোহাম্মদের (সা) জন্য একটা বিশাল অভিজ্ঞতা। এ সফরের মাধ্যমে তিনি শুধু দারিদ্র্য থেকে মুক্তিলাভই করেননি, এর মাধ্যমে বহির্বিশ্বের সাথে তাঁর যোগাযোগও ঘটেছিলো। বিস্তীর্ণ মরুভূমি, ছোট ছোট মরুদ্যান, আরব শহর এবং প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসপ্রাপ্ত বিভিন্ন নগরীর মধ্য দিয়ে বাণিজ্য কাফেলাটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতো। এসব নগরীর মধ্যে আরবের নাবাতীয় সভ্যতার রাজধানী পেত্রার কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভয়াবহ ভূমিকম্পে শহরটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো। এই সফর থেকে মোহাম্মদ (সা) হয়তো অন্যান্য জনগোষ্ঠী, সংস্কৃতি ও ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে জেনে থাকবেন। বারনাবি রজারসন এ ব্যাপারে বলেন,

অতি ধার্মিক মুসলমানদের সাথে কথা বলে দেখেছি, তারা এ ধরনের কোনো প্রভাব থাকার কথা একদমই মানতে চায় না। তারা মনে করে, মহানবী হলেন এমন এক সাদা কাগজ, যেখানে প্রতিটি শব্দ স্বয়ং আল্লাহ লিখে দিয়েছেন। কেউ চাইলে এ রকম ভাবতেই পারে। তবে আমি মনে করি, বাণিজ্য কাফেলার সাথে তাঁর সফরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন গোত্র সম্পর্কে জানা, ব্যবসা-বাণিজ্যের অভিজ্ঞতা লাভ, বিশ্বের কাছে মানুষের চাওয়া-পাওয়া ও বিশ্বের নানা ধরনের জটিলতা সম্পর্কে অবহিত হওয়া, পেত্রাসহ বড় বড় আরব সভ্যতাগুলোর ধ্বংসাবশেষ ও দামেস্কের ঐশ্বর্য প্রত্যক্ষ করাসহ দুনিয়ার বিবিধ বিষয়ে অভিজ্ঞতা লাভের মাধ্যমে তিনি আরব বিশ্বের তৎকালীন বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

মোহাম্মদের (সা) দৈহিক বর্ণনা

মুসলিম সূত্র মতে, তরুণ বয়সেই মোহাম্মদ (সা) তাঁর চারিত্রিক সরলতা ও শুদ্ধতার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি আল-আমীন (সত্যবাদী) ও আস-সাদীক (সত্যনিষ্ঠ) হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

এমতাবস্থায় প্রশ্ন জাগতে পারে, যে ব্যক্তিটি এমন সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পেরেছিলেন, তিনি দেখতে কেমন ছিলেন? তাঁর ছবি বা প্রতিকৃতি আঁকা নিষিদ্ধ হলেও প্রচলিত মুসলিম বিবরণ থেকে তাঁর দৈহিক বর্ণনার বিস্তারিত লিখিত রূপ আমরা পাই। তাঁকে নিয়ে লেখা সর্বপ্রথম জীবনীগ্রন্থ অনুযায়ী, তাঁর উচ্চতা ছিলো গড়পড়তার চেয়ে একটু বেশি। তিনি দীর্ঘ পেশীবহুল সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন। আঙ্গুলগুলো ছিলো সরু ও লম্বা। দীর্ঘ ও ঘন চুলগুলো ছিলো হালকা কোঁকড়ানো। চোখ দুটি ছিলো বেশ বড় ও কালো, তবে হালকা বাদামী। দাড়ি ছিলো ঘন। গায়ের রঙ ফর্সা। এক কথায়, বিয়ে করার জন্য তিনি সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন।

খাদীজার সাথে বিয়ে

মোহাম্মদের (সা) বিয়ে করার প্রথম প্রচেষ্টাটি ব্যর্থ হয়েছিলো। কিছুটা অবমাননাকরও ছিলো বটে। তিনি তাঁর চাচাতো বোনকে বিয়ে করার জন্য চাচার কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু একজন এতিম যুবকের তুলনামূলক নিচু সামাজিক অবস্থানের কারণে তাঁর চাচা এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তবে কিছুদিন পরই তাঁর ভাগ্যের নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। একজন বয়স্ক ধনী নারী খাদীজা নিজের ব্যবসায়িক কাজে তাঁকে সিরিয়ায় পাঠিয়েছিলেন। মোহাম্মদ (সা) তার ব্যবসায়িক টার্গেট পূরণ করতে পেরেছিলেন। সিরিয়া থেকে খাদীজা প্রচুর মুনাফা অর্জন করেছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। খাদীজা মোহাম্মদকে (সা) বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। জর্দান রাজপরিবারের প্রিন্সেস বাদিয়া বিনতে আল হাসান এই ঘটনা ব্যাখ্যা করে বলেন,

সায়্যেদিনা খাদীজার (রা) সাথে তাঁর বিয়ে ছিলো খুবই ব্যতিক্রমী ঘটনা। খাদীজা (রা) ছিলেন বয়সে কিছুটা বড়। এছাড়া তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। বর্তমান যুগেও এ ধরনের ঘটনা কিছুটা ব্যতিক্রম। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে এই যুগেও পাশ্চাত্যেরই অনেক পুরুষ একজন সফল নারীকে বিয়ে করতে ভয় পায়। তাই আমি মনে করি, এই বিয়েতে সম্মত হওয়ার মাধ্যমে মহানবীর (সা) অসামান্য চারিত্রিক দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস এবং নারীদের প্রতি তাঁর সম্মান প্রকাশ পেয়েছে। এখনো যদি কেউ এ ধরনের বিয়ে করতে চায়, তাহলে তার মধ্যেও এইসব গুণ থাকতে হবে।

বর্তমান যুগেও মুসলিম বিশ্বে একজন বয়স্ক নারীর পক্ষে কমবয়সী কোনো যুবককে বিয়ে করতে পারা একটি বিরল ব্যাপার। আর তখন তো এমনটি কেউ ভাবতেও পারতো না। ক্যারেন আর্মস্ট্রং ঘটনাটি ব্যাখ্যা করে বলেন,

ইসলাম আসার আগে আরবের অধিকাংশ অঞ্চলে নারীদের সাথে প্রায় পশুর মতো আচরণ করা হতো। নারীদের মানবাধিকার বলতে কিছুই ছিলো না। তবে শহুরে কিংবা ব্যবসায়ী নারীরা কিছুটা সুবিধা পেতো। কুটির শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নারীরা ভূমিকার রাখার মোটামুটি সুযোগ পেতো। খাদীজা ছিলেন এমনই একজন নারী। তিনি বিধবা ছিলেন। খুব সম্ভবত তাঁর স্বামীর ভালো ব্যবসা ছিলো। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি এই ব্যবসার মালিকানা লাভ করেন এবং তা চালিয়ে নিতে সক্ষম হন।

খাদীজার (রা) সাথে মোহাম্মদের (সা) ২৪ বছরের দাম্পত্য জীবন ছিলো। তখন বহুবিবাহ ছিলো অতি সাধারণ সামাজিক প্রথা। তা সত্ত্বেও খাদীজা (রা) যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন তিনি অন্য কোনো নারীকে বিয়ে করেননি। তাছাড়া সংশ্লিষ্ট সকল দলীল থেকে প্রমাণিত, খাদীজার (রা) ব্যবসা পরিচালনায় তিনি কখনোই কোনো বাধা দেননি। অথচ বর্তমান যুগেও বেশিরভাগ মুসলিম সমাজে নারীদেরকে স্বাধীন মর্যাদা লাভের জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। লন্ডনস্থ মুসলিম ইনস্টিটিউটের পরিচালক ম্যারল ওয়েন ডেভিস এ প্রসঙ্গে বলেন,

কমবয়সী কোনো যুবককে বিয়ে করা এখনো একজন বয়স্ক নারীর জন্য কলঙ্কের ব্যাপার। মুসলিম সমাজে ব্যবসা ও রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ করা এখন পর্যন্ত বেশ কঠিন। মুসলিম সমাজ গঠনে নারীরাও যে পুরুষদের সমান অংশীদার, খাদীজা (রা) তা দেখিয়ে গেছেন।

বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার উপর মহানবীর অসন্তোষ

খাদীজাকে (রা) বিয়ে করে মোহাম্মদ (সা) সুখী থাকলেও এই নিস্তরঙ্গ জীবনযাপনে তিনি ব্যতিব্যস্ত ছিলেন না। তিনি তৎকালীন সমাজব্যবস্থার উপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। বারনাবি রজারসন ব্যাপারটি বর্ণনা করেছেন এভাবে,

জীবনের ২৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত সময়কালটি হওয়ার কথা ছিলো তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। কারণ, এ সময় তিনি খাদিজার মতো সম্পদশালী, সুন্দরী ও বিশ্বস্ত নারীকে স্ত্রী হিসেবে পেয়েছেন। চার চারটি ফুটফুটে কন্যার বাবা ছিলেন। তাঁর দুটি ছেলে সন্তান জন্মলাভ করেছিলো। যদিও তারা শিশুকালেই মারা যায়। তিনি ছিলেন একটি সম্মানিত গোত্রের সদস্য। সাপোর্ট দেয়ার মতো তাঁর একটি পরিবারও ছিলো। এতো কিছু থাকার পরেও, এমনকি সমাজের শীর্ষস্থানে থেকেও আশপাশের সবকিছু নিয়ে তাঁর মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তিবোধ  কাজ করতো। তিনি গোত্রতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার সহিংস রূপ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি দেখেছেন, এখানে অর্থকড়ি দিয়ে যে কাউকে কিনে ফেলা যায়।

এসব কারণে সামগ্রিকভাবে মোহাম্মদ (সা) মোটেও সুখী ছিলেন না। আরবের গোত্রতান্ত্রিক সমাজের কদর্য রূপ তিনি দেখেছিলেন। গোত্রীয় জীবনধারার বৈষম্যগুলো তাঁকে বিষিয়ে তুলেছিলো। এসব নিয়ে তিনি খুবই চিন্তিত থাকতেন। প্রাপ্ত সকল বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি এ সময়ে এক ধরনের মানসিক সংকটে ভুগছিলেন। লন্ডনভিত্তিক ইসলামিক এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ একাডেমির চেয়ারম্যান আব্দুর রহীম গ্রীন এ ব্যাপারে বলেন,

সমাজের দরিদ্র, অসহায় ও নির্যাতিত মানুষের দুরাবস্থা দেখে তিনি সত্যিই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। এসব দেখে নিশ্চিতভাবেই সেই গোড়ার প্রশ্নটি তাঁকে ভাবিয়ে তোলে– আমরা কেন পৃথিবীতে এসেছি, জীবনের উদ্দেশ্য কী, আমাদের চারপাশের জগতকে আমরা কীভাবে অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারি, ইত্যাদি।

লন্ডনের স্থানীয় একজন ইমাম আজমল মাসরুর বলেন,

তরুণ বয়সে ইবরাহীম (আ) যেমন পথের দিশা খুঁজে বেড়াতেন, মুসা (আ) যেমন উপত্যকায় ঘুরে বেড়াতেন, ওল্ড ও নিউ টেস্টামেন্টে বর্ণিত অন্যান্য সকল নবী-রাসূল যেমন সঠিক পথের অনুসন্ধান করতেন, ঠিক তেমনি তিনিও এমন একটা পথের অনুসন্ধান করতে বলে আমার মনে হয়।

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক জন এসপোজিটো বলেন,

সমাজ, নৈতিকতা, স্রষ্টার প্রকৃতিবিরোধী ধর্মীয় রীতিনীতি ইত্যাদি সম্পর্কে প্রশ্ন তোলাই কারো জন্য খুব সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

হেরা গুহায় আধ্যাত্মিকতা চর্চা

এই পর্যায়ে মোহাম্মদ (সা) নির্জনে নিয়মিত আধ্যাত্মিকতা চর্চা করতেন। শান্তি ও নির্জনতার খোঁজে ও প্রার্থনার উদ্দেশ্যে তিনি প্রায় সারা বছরই মক্কার পাহাড়-পর্বতে কাটাতেন। তিনি আসলে কীসের অন্বেষণ করতেন? সেখানে গিয়ে কী করতেন? তিনি যে সমাজের দুরাবস্থা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন, তা নিশ্চিত। ফলে তিনি আসলে এক ধরনের ঐশী সত্য খুঁজে ফিরছিলেন।

মোহাম্মদ (সা) ক্রমান্বয়ে নিয়মিতভাবে ও গভীর মনোযোগের সাথে নির্জনে আধ্যাত্মিকতার চর্চা করতে থাকেন। এতে তাঁর অভিব্যক্তি ও চিন্তা আরো শাণিত হতে থাকে। এই কাজের জন্য তিনি শহরের অদূরে ‘জাবালে নূরকে’ বেছে নেন। পাদদেশ থেকে পাহাড়টির চূড়ায় আরোহণ করা সত্যিই দুঃসাধ্য ব্যাপার। তিনি একদম চূড়ায় অবস্থিত একটি গুহায় (যেটি এখন গারে হেরা নামে পরিচিত) অবস্থান করতেন। আরো গভীর ও ঐকান্তিকভাবে ধ্যানমগ্ন হওয়ার লক্ষ্যে তিনি সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাটিয়ে দিতেন।

হঠাৎ একদিন এমন একটা ব্যাপার ঘটে গেলো, যা শুধু তাঁর জীবনকেই বদলে দেয়নি, বরং গোটা পৃথিবীর ইতিহাসই পাল্টে দিয়েছে। এটি ছিলো ৬১০ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা।

ওহীর সূচনা

মোহাম্মদ (সা) তখন অন্যদিনের মতোই ধ্যানমগ্ন থাকতে থাকতে এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়েন। হঠাৎ প্রচণ্ড ভয় পেয়ে তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। তাঁর শরীর প্রচণ্ডভাবে কাঁপছিলো। পরবর্তীতে তিনি এই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন– একজন ফেরেশতা এসে তাঁকে এমন শক্তভাবে জড়িয়ে ধরেছিলেন, যাতে শ্বাসরোধ হয়ে আত্মা বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলো। একদম বিধ্বস্ত অবস্থায় তিনি সেখানে শুয়েছিলেন। এই পর্যায়ে একটি কণ্ঠস্বর শুনতে পান– “ইকরা!” – “পড়ো!” তিনি জবাব দিলেন, “আমি পারছি না। আমি পাঠক নই।” কণ্ঠস্বরটি একই কথার পুনরাবৃত্তি করলো, “পড়ো!” তিনি জবাব দিলেন, “আমি পাঠক নই।” তৃতীয়বারের মতো তাঁকে বলা হলো, “পড়ো!” এবার তিনি জবাব দিলেন, “আমি কী পড়বো?” তখনই এই কথাগুলো ভেসে এলো–

ٱقْرَ‌أْ بِٱسْمِ رَ‌بِّكَ ٱلَّذِى خَلَقَ- خَلَقَ ٱلْإِنسَـٰنَ مِنْ عَلَقٍ- ٱقْرَ‌أْ وَرَ‌بُّكَ ٱلْأَكْرَ‌مُ- ٱلَّذِى عَلَّمَ بِٱلْقَلَمِ- عَلَّمَ ٱلْإِنسَـٰنَ مَا لَمْ يَعْلَمْ

অর্থ: ১. (হে মোহাম্মদ) তুমি পড়ো, (পড়ো) তোমার মালিকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন, ২. যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাটবাঁধা রক্ত থেকে, ৩. তুমি পড়ো এবং (জেনে রাখো) তোমার রব বড় মেহেরবান, ৪. তিনি (মানুষকে) কলম দ্বারা (জ্ঞান) শিখিয়েছেন, ৫. তিনি মানুষকে (এমন কিছু) শিখিয়েছেন যা (তিনি না শেখালে) সে কখনো জানতে পারতো না। (সূরা আলাক: ১-৫)

নবীদের ওহী লাভের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

তিনি ঐশীবাণী লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ওহী নাজিলের সময় যে প্রচণ্ড কষ্ট হয়, বনী ইসরাইলের কয়েকজন নবীর অভিজ্ঞতা থেকেও আমরা তা জানি। এটি কোনো শান্ত-স্নিগ্ধ বা কোমল অভিজ্ঞতা নয়। ওহী নাজিলের সময় শরীরের প্রতিটি তন্ত্রীতে যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ে। নবী জেরেমায়াহ তো চিৎকার করে ওঠেছিলেন, “আহ! ও খোদা! আমি তো কথা বলতে পারছি না! আমি তো শিশুর মতো হয়ে গেছি! তোমার ওহী আমার প্রতিটি কোষে আঘাত করছে।” নবী ঈসা গির্জায় ঈশ্বরের দর্শন লাভ করে বলে ওঠেছিলেন, “আমি একদম শেষ, আমি সর্বশক্তিমান প্রভুকে দেখেছি!” ঐশীবাণী লাভের ঘটনা ভীষণ কষ্টকর ব্যাপার। এর প্রভাব অত্যন্ত প্রবল। এটি আপনার পরিচিত দুনিয়াকে আমূল পাল্টে দেয়।

এ ব্যাপারে বারনাবি রজারসন বলেন,

নবীগণ ঐশ্বরিক ক্ষমতার যে স্পিরিট লাভ করে থাকেন, তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষা ও উপমার মাধ্যমে তাদের কাছে তুলে ধরা হলো নবীদের কাজ। আমার মতে, প্রচণ্ড কষ্টকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মহানবী ওহী লাভ করেছিলেন। তাঁর গোটা সত্ত্বা জুড়ে প্রবাহিত এই বিশেষ অভিজ্ঞতাকে তিনি ভাষায় প্রকাশ করেছেন।

এটি ছিলো মোহাম্মদের (সা) জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। বর্তমানে দুনিয়া জুড়ে ১৫০ কোটিরও বেশি মানুষ তাঁর অনুসারী। তাঁর আনীত ঐশীবাণীর উপর তারা পুরোপুরি বিশ্বাস রাখে। এ কারণেই তাদেরকে মুসলমান বলা হয়।

অবশ্য হেরা গুহায় যখন সর্বপ্রথম ঐশীবাণী নাজিল হয়েছিলো, তখন মোহাম্মদের (সা) প্রতিক্রিয়া ছিলো একেবারেই ভিন্ন। তিনি দৌড়ে গিয়ে তাঁর প্রিয় স্ত্রীকে ডাকছিলেন, “খাদীজা! খাদীজা! আমাকে ঢেকে দাও, আমাকে ঢেকে দাও। আমার সাথে একি ঘটনা ঘটে গেলো? আমি তো এখন জীবন নাশের আশঙ্কা  করছি।” খাদীজা (রা) নিজের চাদর দিয়ে তাঁর প্রায় অবশ শরীরটাকে ঢেকে দিলেন। তারপর মোহাম্মদের (সা) সকল সংশয় সত্ত্বেও খাদীজাই (রা) তাঁর ওহী লাভের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তাঁকে আশ্বস্ত করলেন। খাদীজার (রা) কথাগুলো তাঁর জন্য নিছক সান্তনাবাণী মাত্র ছিলো না। তার কথা শুনেই সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনাটির ব্যাপারে তিনি স্থিরচিত্ত হতে পেরেছিলেন। এভাবে সত্যসন্ধানী ব্যক্তিটি অবশেষে সেই আলোর সন্ধান পেয়ে গেলেন, যা তিনি খুঁজে ফিরছিলেন।

ওহী নাজিলে বিরতি

কিন্তু তারপর দীর্ঘদিন আর কিছুই ঘটলো না। ফলে তিনি মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়লেন। তাহলে কি এসব কিছু নিছকই বিভ্রান্তি ছিলো? ওহীর ব্যাপারটি কি নিছক আবেগের চরম বহিঃপ্রকাশ ছিলো? নাকি সত্যসন্ধানী মোহাম্মদকে (সা) আল্লাহ পরিত্যাগ করেছেন? মহানবীর (সা) তখনকার এ ধরনের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

তিনি চরমভাবে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। একটি বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি এতো বেশি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন যে, পাহাড়ের চূড়া থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে গিয়েছিলেন।

এভাবে সপ্তাহের পর সপ্তাহ, এমনকি মাসও পেরিয়ে গেলো। মোহাম্মদের (সা) জীবন টালমাটাল হয়ে ওঠলো। ওহী লাভের অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর মাঝে সন্দেহ ঘনিভূত হতে লাগলো। এমনকি নিজের ব্যাপারেও তিনি সন্দিহান হয়ে পড়লেন। এভাবে কয়েক মাস কেটে গেলো। তারপর হঠাৎ একদিন সকাল বেলা সকল নীরবতার অবসান ঘটিয়ে পুনরায় ওহী নাজিল হতে থাকলো–

وَٱلضُّحَىٰ- وَٱلَّيْلِ إِذَا سَجَىٰ- مَا وَدَّعَكَ رَ‌بُّكَ وَمَا قَلَىٰ- وَلَلْءَاخِرَ‌ةُ خَيْرٌ‌ۭ لَّكَ مِنَ ٱلْأُولَىٰ- وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَ‌بُّكَ فَتَرْ‌ضَىٰٓ- أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَـَٔاوَىٰ- وَوَجَدَكَ ضَآلًّا فَهَدَىٰ- وَوَجَدَكَ عَآئِلًا فَأَغْنَىٰ- فَأَمَّا ٱلْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ‌- وَأَمَّا ٱلسَّآئِلَ فَلَا تَنْهَرْ- وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَ‌بِّكَ فَحَدِّثْ

অর্থ: (১) শপথ আলোকোজ্জ্বল মধ্য দিনের, (২) শপথ রাতের (অন্ধকারের), যখন তা (চারদিকে) ছেয়ে যায়, (৩) তোমার রব তোমাকে পরিত্যাগ করেননি এবং তিনি (তোমার ওপর) অসন্তুষ্টও হননি; (৪) অবশ্যই তোমার পরবর্তীকাল আগের চেয়ে উত্তম; (৫) অল্পদিনের মধ্যেই তোমার রব তোমাকে (এমন কিছু) দেবেন যে, তুমি (এতে) খুশি হয়ে যাবে; (৬) তিনি কি তোমাকে এতিম অবস্থায় পাননি– অতঃপর তিনি তোমাকে আশ্রয় দিয়েছেন, (৭) তিনি কি তোমাকে (সঠিক পথের সন্ধানে) বিব্রত অবস্থায় পাননি, অতপর তিনি তোমাকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন, (৮) তিনি কি তোমাকে নিঃস্ব অবস্থায় পাননি, অতঃপর তিনি তোমাকে অমুখাপেক্ষী করে দিয়েছেন; (৯) অতএব তুমি কখনো এতিমের ওপর জুলুম করো না; (১০) কোনো প্রার্থীকে কোনো সময় ধমক দিয়ো না; (১১) তুমি তোমার মালিকের অনুগ্রহসমূহ বর্ণনা করে যাও। (সূরা দোহা: ১-১১)

মোহাম্মদ (সা) এবার বুঝতে পারলেন, তাঁর উপর বিশেষ দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। তাঁকে ঐশীবাণী দিয়ে পাঠানো হয়েছে। তাঁর আগের অন্যান্য নবীদের মতো তিনিও বিশ্বাস করলেন, আল্লাহ তাঁকে বিশেষ অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করেছেন। এখন তাঁর দায়িত্ব হলো অন্যদের মাঝে এই বাণীর প্রচার করা; যেন তারা নিজেদের জীবনকে আরো উন্নত করতে পারে।

কোরআনের গুরুত্ব

মোহাম্মদের (সা) উপর নাজিলকৃত ওহীর সমষ্টিই পরবর্তীতে ইসলামের পবিত্র ধর্মগ্রন্থে পরিণত হয়। এটি এখন আমাদের নিকট কোরআন হিসেবে পরিচিত। এর শাব্দিক অর্থ হলো পঠিত। প্রচলিত মুসলিম বিশ্বাস অনুযায়ী, স্বয়ং আল্লাহই কোরআনের লেখক, মোহাম্মদ (সা) মানুষের কাছে তা পৌঁছে দিয়েছেন মাত্র।

বেশিরভাগ মুসলমান মনে করেন, কোরআন হলো আল্লাহর মোজেজা। মোহাম্মদ (সা) সবসময়ই জোর দিয়ে বলে গেছেন, তাঁর কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নেই। কোরআনের আয়াত ব্যতীত অন্য কোনো অলৌকিক ক্ষমতা বা নিদর্শনের সাথে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেননি। তবে এক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন একজন সাধারণ ব্যক্তি মাত্র। আল্লাহর বাণী তথা কোরআনই কেবল মোজেজা হিসেবে বিবেচিত। কোরআনের আয়াতের মাঝেই নিহিত রয়েছে এর আধ্যাত্মিক শক্তি –

اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ-  صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ

অর্থ: আমাদেরকে সঠিক পথ দেখাও, তাদের পথ যাদেরকে তুমি অনুগ্রহ করেছো; তাদের (পথ) নয় যারা (তোমার) ক্রোধের পাত্র; তাদের (পথ) নয় যারা বিপথগামী। (সূরা ফাতেহা: ৬-৭)

উম্মী ধারণাটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

মুসলমানরা বিশ্বাস করেন, মোহাম্মদ (সা) লেখতে-পড়তে জানতেন না। তাঁর নিরক্ষরতার ব্যাপারটি মুসলমানদের ঈমানের অপরিহার্য বিষয়। একটি কারণে ব্যাপারটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো, ইসলামের কোনো কোনো সমালোচক বলে থাকেন, বাণিজ্য সফরের সময় মোহাম্মদ নিশ্চয় ইহুদী-খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থগুলো পড়েছিলেন এবং সেই ধর্মীয় কনসেপ্টগুলোই নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়ে তিনি নিজস্ব ধর্মীয় বাণী হিসেবে প্রচার করেছেন। তাই মুসলমানদের যুক্তি হলো, তিনি যেহেতু লেখাপড়াই জানতেন না, তাই এ ধরনের যে কোনো প্রভাব থেকে তিনি মুক্ত ছিলেন। এবং নতুন ধর্ম ইসলামের ভিত্তি তথা ওহী সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকেই এসেছে। এ ব্যাপারে ইসলামের সমালোচক টম হল্যান্ডের বক্তব্য হলো,

কোরআনের কোনো কথা যে ইহুদী, খ্রিস্টান কিংবা সামারীয়দের থেকে মোহাম্মদ গ্রহণ করেননি, এটি যে সরাসরি আল্লাহরই কথা–তা বিশ্বাস করা মুসলমানদের জন্য জরুরি। ঠিক এ কারণেই মুসলিম বিশ্বাস মতে তিনি ছিলেন নিরক্ষর। অথচ কোরআনে প্রকৃতপক্ষে এর বিপরীতটাই বলা হয়েছে। তাদের এই বিশ্বাসের আরেকটা কারণ হলো, তিনি জন্মেছিলেন মরুভূমির মধ্যখানে। ফলে নিকটপ্রাচ্যের শক্তিশালী এই ধর্মগুলোর সংস্পর্শ থেকে তিনি শত শত মাইল দূরে ছিলেন বলে মনে করা হয়।

এ ব্যাপারে লেখক ও টিভি উপস্থাপক জিয়াউদ্দীন সরদার বলেন,

কোরআন ইহুদি-খ্রিস্ট ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত– এই বিতর্কটাই তো অযৌক্তিক। ইসলাম নিজেই তো নিজেকে একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোর ধারাবাহিকতা বলে দাবি করে। আমরা ইহুদী ও খ্রিস্টান ধর্মের ধারাবাহিকতা মাত্র। সেই অর্থে আমরা নিশ্চয় এই ধর্মগুলো দ্বারা প্রভাবিত।

আব্দুর রহীম গ্রীন এ ব্যাপারে বলেন,

কোরআন স্পষ্ট করেই বলেছে, মোহাম্মদ (সা) লেখতে পারতেন না। আর ‘উম্মী’ শব্দটির অর্থ মূর্খ বা অজ্ঞ নয়। এর অর্থ হলো যে লেখতে-পড়তে জানে না, যে ব্যক্তি ধর্মগ্রন্থ পড়া শেখেনি বা অধ্যয়ন করেনি। অবশ্য অজ্ঞ বা মূর্খ ব্যক্তিকেও উম্মী বলার প্রচলন রয়েছে। তবে মূল কথা হলো, জিবরাইল (আ) হেরা গুহায় এসে যখন মহানবীকে (সা) বলেছিলেন, ‘পড়ো’, তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি পড়তে পারি না’।

খ্রিস্টানদের কাছে ব্যক্তি যিশু যেমন সবকিছুর ঊর্ধ্বে, মুসলমানদের কাছে কোরআনও তেমন ব্যাপার। খ্রিস্টানদের কাছে যিশু হলেন ঈশ্বরের বহিঃপ্রকাশ ও প্রতীক। তাঁর জন্মগ্রহণের বিষয়টি মানুষের অহেতুক সন্দেহের ঊর্ধ্বে পবিত্র ও বিশুদ্ধ একটি ব্যাপার। মুসলমানদের ক্ষেত্রে কোরআনও তেমনি। এটি হলো আল্লাহর কথা। তাই এটি যে কোনো প্রকার অযাচিত মানবীয় হস্তক্ষেপ থেকে পবিত্র। এ কারণেই কোরআনের অমর্যাদা হলে মুসলমানরা প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পায়। তাদের দৃষ্টিতে, এতে শুধু মোহাম্মদই (সা) নন, স্বয়ং আল্লাহকেও অপমান করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোরআন পোড়ানো বা কোরআনের অমর্যাদা সংক্রান্ত বেশকিছু ঘটনা ঘটেছে। কখনো গুয়ান্তানামো বে’র মুসলিম বন্দীদেরকে অপমান করার উদ্দেশ্যে, কখনো বা কোনো সন্ত্রাসী হামলার প্রতিক্রিয়ায় এসব ঘটেছে।

দাওয়াতী কাজের সূচনা

শুরুতে মোহাম্মদ (সা) ঘনিষ্ঠজনদের মাঝে তাঁর এই বাণী গ্রহণের দাওয়াত দেন। সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন তাঁর স্ত্রী খাদীজা (রা)। তারপর তাঁর কিশোর চাচাতো ভাই আলী (রা), পরবর্তীতে যিনি তাঁর মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। তারপর তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবু বকর (রা) এই বাণী গ্রহণ করেন। তিনি মোহাম্মদের (সা) ওফাতের পর ইসলামের প্রথম খলিফা নিযুক্ত হয়েছিলেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগ সম্পর্কে অধ্যাপক সাজ্জাদ রিজভী বলেন,

সাধারণত বলা হয়ে থাকে, প্রথমদিকে বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক শ্রেণীর তরুণরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। অভিজাত পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের একদম প্রান্তিক লোকেরাও ইসলামের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলো। এদিক থেকে দেখলে বুঝা যায়, ইসলাম ছিলো তখন একটি বিপ্লবী বার্তা। বিপ্লবী এই অর্থে যে, তৎকালীন সমাজের অচলায়তনকে ইসলাম ওলট-পালট করে দিতে চেয়েছিলো।

এখনকার মতো তখনো ইসলাম গ্রহণের প্রক্রিয়াটি সহজ ও সোজাসাপ্টা ছিলো। দুজন প্রত্যক্ষদর্শীর সামনে ঈমান গ্রহণের সাদামাটা ঘোষণা দেয়াই ছিলো যথেষ্ট।[1] ইসলাম গ্রহণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হলো, এটি ব্যক্তির একান্ত নিজস্ব ও স্বাধীন ইচ্ছা থেকে হতে হবে। এর একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় মোহাম্মদের (সা) চাচা আবু তালিবের ঘটনা থেকে। তিনি ছিলেন তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শুভাকাঙ্খী, আবার অন্যদিকে ছিলেন গোত্র সর্দার। মক্কায় যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে তিনি এ যাবৎ তাঁকে রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু আবু তালিবও এই বাণী গ্রহণ করেননি। মোহাম্মদ (সা) তাঁকে বুঝাতে বহু চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কখনোই জোরাজোরি করেননি। ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করে ম্যারল ওয়েন ডেভিস বলেন,

কোরআনের সবচেয়ে স্পষ্ট, দ্ব্যার্থকতামুক্ত আয়াত হলো– ‘ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই’। এক্ষেত্রে কোনো যদি-কিন্তু-তবে নেই। এটিই হলো আসল কথা। কেউ যদি স্বাধীনভাবে ও স্বেচ্ছায় বিশ্বাসকে গ্রহণ করতে না পারে, তাহলে তার কাজকর্মের জন্য পরকালে সে কোনোভাবেই দায়ী হবে না। এটিই হচ্ছে ইসলামের মূলকথা।

‘ইসলাম: অ্যা ক্রিশ্চিয়ান পারস্পেকটিভ’ গ্রন্থের লেখক বিশপ মাইকেল নাজির আলী এ প্রসঙ্গে বলেন,

কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি এ ব্যাপারে একদম সুস্পষ্ট। কোরআনের একটি বহুল পরিচিত আয়াত হলো– ‘ধর্মীয় ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই’। মহানবী নিজেও পৌত্তলিক আরবদের উদ্দেশ্যে একই ধরনের কথা বলেছেন– ‘তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন, আমার জন্য আমার দ্বীন’। পারস্পরিক সহিষ্ণুতার জন্য এটি খুব ভালো একটি উপায়। কিন্তু ইতিহাস জুড়ে আমরা দেখে এসেছি, এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান করা হয়নি।

মোহাম্মদ (সা) যে ঐশীবাণী প্রচার করেছিলেন, পরবর্তীতে তা ইসলাম নামে পরিচিতি লাভ করে। ইসলামের শাব্দিক অর্থ হলো ‘আত্মসমর্পণ’। এই অর্থে একজন বিশ্বাসী তথা মুসলমান হলেন তিনি, যিনি আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছেন। ইসলাম শব্দটি এসেছে ‘সালাম’ শব্দ থেকে, যার অর্থ শান্তি।[2]

এক আল্লাহর ধারণা সংক্রান্ত যে বাণী ইবরাহীম (আ) প্রচার করতেন, পরবর্তীতে ইহুদী-খ্রিস্টানদের নবীগণও যা প্রচার করেছিলেন, মক্কায় দাওয়াতী মিশনের শুরুতে মোহাম্মদ (সা) মানুষের নিকট সেই বাণীই প্রচার করতেন। এর পাশাপাশি সমাজে বিদ্যমান অন্যায় ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিনিয়ত লোকদের সাবধান করতেন। অধ্যাপক জন এসপোজিটো বলেন,

একজন নবীর যত ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকার কথা, এর সবগুলো বৈশিষ্ট্য নিয়েই তিনি মহানবী হয়ে ওঠেছিলেন। হ্যাঁ, নবীদের মূল কাজ হলো মানুষের কাছে ঈশ্বরের বাণী তুলে ধরা। কিন্তু সত্যিকারের নবীগণ একইসাথে একজন সতর্ককারীও বটে। আর মহানবী তো ছিলেন একজন সংস্কারক। তাই তিনি সমাজকে সতর্ক করতেন। সমাজ যে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে, তা নির্দ্বিধায় বলতেন।

কোরাইশদের নির্যাতন

তবে মোহাম্মদের (সা) এসব তৎপরতাকে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী ভালো চোখে দেখা হতো না। তিনি সার্বজনীন সমতার কথা বলতেন, মক্কার শাসক কোরাইশ নেতারা যা পছন্দ করতো না। তাঁরা ক্রমান্বয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে মহানবীকে (সা) থামানোর জন্য তারা টাকা-পয়সা ও ক্ষমতার প্রস্তাব পর্যন্ত দিয়েছিলো। এমনকি তিনি যা চাইবেন তাই দেয়া হবে, এমন প্রলোভনও দেখানো হয়েছিলো। তাদের এই সকল প্রস্তাবের বিপরীতে তিনি একটাই জবাব দিয়েছিলেন–

সম্পদের লোভ কিংবা তোমাদের নেতা বা রাজা হওয়ার আকাঙ্খায় আমি আসিনি। আল্লাহর রাসূল হিসেবে তাঁর বাণী তোমাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্যই কেবল আমি এসেছি। তোমরা যদি তা গ্রহণ করো, তাহলে উপকৃত হবে। আর যদি গ্রহণ না করো, তাহলে আমি ধৈর্য ধরবো এবং আল্লাহর চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষায় থাকবো।

ফলে মক্কার নেতারা বুঝতে পারলো, সোজা কথায় কাজ হবে না। তাই এবার তারা ভিন্ন পথ বেছে নিলো। তাঁর উপর নানাভাবে চড়াও হতে শুরু করলো।

মৃদু চাপপ্রয়োগ এ পর্যায়ে সহিংস নির্যাতনে রূপ নিলো। মোহাম্মদের (সা) সাহাবীরা, বিশেষ করে যাদের কোনো গোত্র পরিচয় কিংবা গোত্রীয় নিরাপত্তা ছিলো না (যেমন– দাস-দাসী), বর্বর নির্যাতনের সহজ শিকারে পরিণত হলো। তাদের কাউকে ছুড়ে ফেলা হতো জ্বলন্ত কয়লায়, কাউকে নির্দয়ভাবে পেটানো হতো, অসহায় নারীদের কাউকে কাউকে ছুরিকাঘাতে মেরে ফেলা হতো। এই নির্যাতনের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

কোরাইশদের বিশ্বাসব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার মাধ্যমে মোহাম্মদ মূলত তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলেছিলেন। কারণ, মক্কার ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে তাদের এতদিনের ধর্মীয় রীতিনীতির গভীর সম্পর্ক ছিলো। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকেরা যখন উপাসনার জন্য কাবায় আসবে, তখন মুসলমানদের দাওয়াতী তৎপরতা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সত্যিই খারাপ পরিণতি বয়ে আনবে– এমন আশংকা তারা করতো। তারা বুঝতে পেরেছিলো, এটি একটা বিশাল হুমকি। ফলে তারা প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়ে পড়েছিলো।

এমতাবস্থায় মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাহাবীদের ক্ষুদ্র দলটি চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেলেন। তাঁরা প্রকাশ্যে অকথ্য গালাগাল ও শারিরীক নির্যাতনের শিকার হতে থাকলেন। এমনকি গোপনেও তাঁরা একত্রিত হতে পারতেন না। নামাজ আদায় করতে পারতেন না। বর্তমানে মুসলমানরা ইবাদত পালনের যে স্বাধীনতা ভোগ করছে, তখন তা ছিলো সুদূর পরাহত।

ইসলামিক সেন্টারের অধীনে লন্ডনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে হ্যারো উপশহরে বর্তমানে একটি পাঁচতলা মসজিদ নির্মিত হচ্ছে। পাশ্চাত্যের সর্বত্রই মুসলমানরা এখন মসজিদ নির্মাণের সুবিধা পাচ্ছে। অথচ মোহাম্মদ (সা) নিজ শহরে তাঁর অনুসারীদের নিয়ে যখন একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি তাঁদেরকে হতে হয়েছিলো। হ্যারো মসজিদ কমিটির একজন দায়িত্বশীল আজমত আলীর সাথে মসজিদের নির্মাণাধীন ফ্লোরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম–

– আমরা কত ভাগ্যবান! এই যে আমি আপনার সাথে কমিউনিটির একটি বিল্ডিংয়ের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে আছি, মহানবীর (সা) অভিজ্ঞতা তো এর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিলো। তিনি যখন তাঁর মতো করে একটি কমিউনিটি প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছিলেন, তখন এ জাতীয় কোনো সুযোগ বা স্বাধীনতা মোটেও পাননি।

– আপনি ঠিকই বলেছেন তখন সময়টা আসলেই খুব প্রতিকূল ছিলোইসলামের প্রাথমিক যুগে তাঁরা প্রচণ্ড কষ্ট করেছেন। তাঁদের সবকিছুতেই বাধা দেয়া হতো। নামাজ পড়তে গেলেও তাঁদেরকে নানান রকম লাঞ্ছনা ও প্রতিকূলতা সহ্য করতে হতো। বর্তমানে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে, মাশাআল্লাহ।

আবিসিনিয়ায় হিজরত

কোরাইশদের অত্যাচারের মোকাবেলায় শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে মোহাম্মদ (সা) তাঁর সাহাবীদের নিরাপত্তার জন্য বিকল্প একটি উপায় খুঁজে বের করলেন। নানান দিক থেকেই এটি ছিলো একটি সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত। তিনি সাহাবীদেরকে বাড়িঘর ছেড়ে লোহিত সাগরের অপর পাড়ে অবস্থিত খ্রিস্টান রাজা নাজ্জাশী শাসিত আফ্রিকান রাজ্য আবিসিনিয়ায় শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে নির্দেশ দেন।

৬১৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম একদল মুসলমান সপরিবারে গোপনে মক্কা ত্যাগ করেন। বর্তমানে ইথিওপিয়া হিসেবে যে দেশটি পরিচিত, সেখানে তাঁরা একটি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন। মুসলমানদের চলে যাওয়ার খবরে কোরাইশরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। নির্বাসিতদেরকে ফেরত পাঠানোর জন্য আবিসিনিয়ার রাজা নাজ্জাশীকে রাজি করাতে তারা তাৎক্ষণিকভাবে একটি প্রতিনিধি দল পাঠায়। ফলে প্রকৃত ঘটনা ব্যাখ্যা করার জন্য নাজ্জাশী মুসলমানদের নেতাকে ডেকে পাঠালেন। রাজদরবারে তিনি বললেন, মোহাম্মদ (সা) হলেন একমাত্র সত্য খোদার প্রেরিত নবী। তারপর তিনি কোরআন থেকে সুললিত কণ্ঠে তেলাওয়াত করতে থাকেন। তিনি যে আয়াত পড়ছিলেন, সেখানে কুমারী মরিয়মের (আ) গর্ভে ঈসার (আ) জন্মের বর্ণনা রয়েছে। আয়াতটিতে যিশুখ্রিষ্টকে আল্লাহর একজন নবী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি শুনে তারা অভিভূত হয়ে পড়ে। নাজ্জাশীর চোখ দিয়ে তখন অশ্রু গড়াচ্ছিলো। যার ফলে তিনি মুসলমানদেরকে আবিসিনিয়ায় বসবাসের অনুমতি দেন।

শয়তানের আয়াত

ব্যর্থ মনোরথে মক্কায় ফিরে কোরাইশরা মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাহাবীদের উপর চড়াও হলো। তারা শহর জুড়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করলো, মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর পুরো গোত্রের সাথে কেউ কোনো কিছু করতে পারবে না। বিবাহ, ব্যবসা-বাণিজ্য, বাজারে ক্রয়বিক্রয় থেকে শুরু করে কোনো কিছুই তাদেরকে করতে দেয়া হতো না। মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাথীরা মক্কায় গণশত্রুতে পরিণত হলেন। এভাবে তারা এক আল্লাহর উপর ঈমান আনার দাওয়াত প্রচারে আপস করা এবং কোরাইশদের দেবতাদেরকে মেনে নেয়ার জন্য মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাহাবীদের উপর প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখলো।

এখন পর্যন্ত বাদবাকি বিশ্বের সাথে ইসলামের সম্পর্ক নির্ধারণে যে মৌলিক বিষয়টি মুখ্য ভূমিকা পালন করে, সেই পরিস্থিতিতে হঠাৎ এমন একটি ঘটনা ঘটলো, যার ফলে সেটি হুমকির মধ্যে পড়ে গিয়েছিলো। অবশ্য অধিকাংশ মুসলমান পুরো বিষয়টিকেই বানোয়াট মনে করে। সে যাই হোক, মোহাম্মদ (সা) এবং কোরআনকে ভুল প্রমাণ করার জন্য ইসলামের বিরোধীরা এই ঘটনাটিকে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। ঘটনাটির নানা ধরনের বর্ণনা আছে, তবে মূল ভাষ্যটি মোটামুটি এ রকম:

একদিন মহানবী (সা) কাবাঘরে বসে থাকা অবস্থায় একটি নতুন ওহী নাজিল হলো। যাতে বলা হলো– তিনি চাইলে কোরাইশদের সাথে সমঝোতায় আসতে পারেন যে, কোরাইশদের দেবদেবীদের উপাসনা করায় তাঁর আপত্তি নেই। কোরাইশরা এই ‘ওহী’ শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলো। তারা মনে করলো– যাক, মোহাম্মদ অবশেষে তাদের চিন্তাধারায় ফিরে আসছে। কিন্তু তারপরই ঘটলো আসল ঘটনা। তাৎক্ষণিকভাবে মোহাম্মদের (সা) কাছে আরেকটি ওহী নাজিল হলো। এতে বলা হয়, দেবদেবীদেরকে বাহ্যত মেনে নেয়া সংক্রান্ত যে ‘ওহী’টি নাজিল হয়েছিলো, তা ছিলো আসলে শয়তানের প্ররোচনা। এই কারণে এই আয়াতকে পরবর্তীতে ‘শয়তানের আয়াত’ বলে অভিহিত করা হয়। ঘটনাটি যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে মোহাম্মদ (সা) নিজের ইচ্ছামতো আল্লাহর বাণী পরিবর্তন করতে পারতেন, এমন অভিযোগ করার সুযোগ থেকে যায়। সেক্ষেত্রে মোহাম্মদ (সা) ও কোরআন মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়ে যায়। ‘দ্যা ট্রুথ অ্যাবাউট মোহাম্মদ’ গ্রন্থের লেখক রবার্ট স্পেনসার এ ব্যাপারে বলেন,

মুসলমানরা এখন দাবি করে থাকে, এ ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি, এটি ইসলাম বিদ্বেষীদের বানানো গল্প। কিন্তু তুলনামূলকভাবে প্রাথমিক যুগের মুসলিম সূত্রগুলোতে (যেমন আল্লামা জামাখশারী) কিংবা আরো আগের ইসলামী সূত্রে (যেগুলো এখন আর পাওয়া যায় না) এ ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। এমতাবস্থায়, এটি অস্বীকার করা মুসলমানদের জন্য যথেষ্ট কঠিন। ঘটনাটি যদি ইসলামের শত্রুদের বানানোই হয়ে থাকে, তাহলে একজন খাঁটি মুসলমান কীভাবে এই ঘটনার উল্লেখ করলেন? অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার বটে!

মোহাম্মদের (সা) মৃত্যুর পর মুসলমানদের লেখা তাঁর জীবনীগ্রন্থগুলোর মধ্যে এই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন ও পরস্পর সাংঘর্ষিক তিনটি বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে কোরআনে কিংবা ইবনে ইসহাক কর্তৃক লিখিত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মহানবীর (সা) প্রথম জীবনীগ্রন্থে এর কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি নবম শতকের বিখ্যাত হাদীস সংকলনগুলোতেও এর উল্লেখ নেই। অথচ মুসলমানরা সাধারণত নিছক মোহাম্মদের (সা) সমালোচনা থাকলেই কোনো বর্ণনাকে অস্বীকার করে না। বরং কোনো বর্ণনা যথাযথভাবে যাচাইযোগ্য না হলেই কেবল তা বাতিল গণ্য করা হয়।

দ্য স্যাটানিক ভার্সেস

১৯৮৯ সালে যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত সালমান রুশদীর লেখা ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ উপন্যাসের বিরুদ্ধে গোটা মুসলিম বিশ্বে সহিংস প্রতিবাদের ঝড় উঠে। উপন্যাসটি ছিলো ওই ঘটনার উপর ভিত্তি করে লেখা একটি কল্পকাহিনী। মুসলমানদের মতে, কোরআনকে শয়তানের কাজ হিসেবে উপস্থাপন করা এবং সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মোহাম্মদকে (সা) এভাবে চিত্রিত করা ছিলো ভণ্ডামিপূর্ণ অপপ্রয়াস। এ ঘটনায় পুরো দুনিয়ার মুসলিম জনমত ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ব্র্যাডফোর্ড কাউন্সিল অব মস্কেসের সভাপতি শের আজম স্মৃতিচারণ করে বলেন,

১৯৮৯ সালের ১৪ জানুয়ারির ঘটনা আমার স্পষ্ট মনে আছে। সেদিন আমরা হাজার হাজার মানুষ ওই বইটি নিষিদ্ধের দাবিতে সমবেত হয়েছিলাম। আমরা প্রকাশ্যে বইটি পুড়িয়ে দিয়েছিলাম।

বই পোড়ানোর মাধ্যমে ঘটনার মাত্র শুরু হয়। কয়েক দিনের মাথায় মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র সহিংস বিক্ষোভ এবং উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বাকস্বাধীনতার দোহাই দিয়ে অনেকেই বইটি নিষিদ্ধকরণের দাবির বিরোধিতা করেন। ঘটনার এক পর্যায়ে ইরানের নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনী ইস্যুটিকে কাজে লাগান। তিনি সম্ভাব্য যে কোনো উপায়ে রুশদীকে হত্যা করার ফতোয়া জারি করেন। ফতোয়াটি এখন পর্যন্ত প্রত্যাহার করা হয়নি। এই বইয়ের সাথে যুক্ত অনেকেই আক্রমণের শিকার হয়েছে, এমনকি নিহতও হয়েছে। তবে রুশদী এখনো অক্ষতভাবে বেঁচে আছেন।

মোহাম্মদ (সা) আসলে কে ছিলেন, তাঁর কী অবদান ছিলো এবং সবচেয়ে বড় কথা হলো, বর্তমান যুগে মুসলমান বলতে কী বুঝায়– এই সমস্ত প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে তাঁর জীবনের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার (যা আবার আদতেই ঘটেনি বলে অধিকাংশ মুসলিম স্কলার মনে করেন) আলোকে মোহাম্মদের (সা) জীবন ও কর্মকে বিবেচনা করা নিতান্ত মতলবী কাজ।

এই ইস্যুটির মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব ও পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পার্থক্য পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। পাশ্চাত্য মনে করে, ইসলামের ব্যাপারে যা খুশি বলার অধিকার তাদের রয়েছে। অন্যদিকে মুসলমানরা মনে করে, অপমানিত না হওয়ার অধিকারও তাদের রয়েছে। জিয়াউদ্দীন সরদার ব্যাপারটিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে,

এ ঘটনাটির প্রতিবাদের মাধ্যমে ব্রিটিশ মুসলিমরা একটি স্বতন্ত্র কমিউনিটি হিসেবে সমাজে আত্মপ্রকাশ করেছিলো। সেদিক থেকে বৃটিশ মুসলিমদের জন্য এটি ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। তবে আন্তর্জাতিকভাবেও মুসলমানদের জন্য সময়টি তাৎপর্যপূর্ণ ছিলো। কারণ, একদিকে তারা রুশদীর লেখাকে প্রত্যাখ্যান করছিলো, এর প্রতিবাদে সভা-সমাবেশ করছিলো। অন্যদিকে রুশদীর বিরুদ্ধে দেয়া ফতোয়ার নিন্দা জানাতেও তারা সমবেত হয়েছিলো। পাশ্চাত্যে যা ঘটছে, সেটি যেমন তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়; তেমনি ট্র্যাডিশনাল ইসলামের কিছু ব্যাপারও তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলো না। উভয় দিকের বাস্তবতাই তারা উপলব্ধি করতে পেরেছিলো।

মোহাম্মদের (সা) প্রতি ভালোবাসার জায়গা থেকে বৃটিশ মুসলিমরাও যে বৃহত্তর বিশ্ব মুসলিম সমাজের অংশ, এ ঘটনার পর তারা সেটি উপলব্ধি করতে পেরেছিলো। পাশ্চাত্যের প্রধান পরিচয় তথা ‘উদার মূল্যবোধের’ সাথে ব্রিটিশ মুসলিম সমাজের তুলনামূলক রক্ষণশীল ও ট্র্যাডিশনাল মূল্যবোধের মধ্যকার দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হিসেবেও ঘটনাটিকে চিহ্নিত করা যায়। মোহাম্মদ (সা) কি বিশ্বের জন্য কল্যাণকর, নাকি ক্ষতিকর– পরস্পরবিরোধী এই বিতর্ক হলো এই দ্বন্দ্বের মূল বিষয়। এর পাশাপাশি মোহাম্মদের (সা) ব্যক্তিচরিত্রকেও অনেক সময় বিতর্কে টেনে আনা হয়।

কোরাইশদের বয়কট ও মহানবীর অহিংস প্রতিরোধ

যা হোক, মোহাম্মদ (সা) তৎকালীন মক্কার কোরাইশদের প্রাচীন গোত্রীয় মূল্যবোধের বিপরীতে এক আল্লাহর ধারণা সংক্রান্ত নতুন বাণী নিয়ে সাংঘাতিক এক মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। ফলে কোরাইশরা মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সঙ্গীদের উপর আরো কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তারা ঘোষণা করলো, এখন থেকে কেউই তাদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিবাহ-শাদী, এমনকি খাদ্যদ্রব্য কেনাবেচাও করতে পারবে না। কিন্তু এই চরম উসকানিমূলক পরিস্থিতিতেও তিনি ও তাঁর সাথীরা কোনো রকম সংঘাতে না জড়িয়ে পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছিলেন। বর্তমানে কোনো কোনো মুসলমানের কর্মকাণ্ডের এর সম্পূর্ণ বিপরীত। অধ্যাপক সাজ্জাদ রিজভী বলেন,

ইসলামের একদম প্রাথমিক যুগে সহিংসভাবে পরিস্থিতির মোকাবেলা করা আসলে সম্ভবই ছিলো না। তখন মুসলমানদের সংখ্যা কোনোভাবেই শ’দুয়েকের বেশি ছিলো না। মুসলমানরা তখন যদি মুখোমুখি সংঘাতে লিপ্ত হতো, তাহলে তারা গণহারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হতো। সেক্ষেত্রে এত বছর পর এসেও আমরা যে ইসলামকে জানি, তার নাম-নিশানা তখনই মুছে যেতো।

এভাবে চলার এক পর্যায়ে মোহাম্মদ (সা) ধারাবাহিক অহিংস প্রতিরোধের সুফল পেতে শুরু করলেন। মুসলমানদের বিরুদ্ধে গৃহীত এ ধরনের চরম পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মক্কার লোকেরাই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করলো। মুসলমানরা তো আসলে তাদেরই স্বজন ও গোত্রের সদস্য ছিলো। ফলে কোরাইশ নেতৃবৃন্দের উপর ব্যাপক সামাজিক চাপ তৈরি হলো। অব্যাহত চাপের মুখে দুই বছর পর তারা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। তবে এর ফলে মোহাম্মদের (সা) দুঃখ-কষ্ট লাঘব হলো না। বরং শুরু হলো বলা যায়। তাই ওই বছরটিকে মুসলমানরা দুঃখ-দুর্দশার বছর হিসেবে অভিহিত করে থাকে।

স্ত্রী ও চাচার মৃত্যু

নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার কয়েক মাসের মধ্যে মোহাম্মদের (সা) জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি স্ত্রী খাদীজা (রা) মৃত্যুবরণ করেন। এ ঘটনায় তিনি একদম ভেঙে পড়েছিলেন। বিগত ২৫ বছর ধরে এই নারী ছিলেন একাধারে তাঁর একান্ত ভালোবাসার স্ত্রী, সবচেয়ে ঘনিষ্ট সঙ্গী এবং প্রধান পরামর্শদাতা। তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি তাঁকে আল্লাহর রাসূল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। নবুয়ত লাভের পর তাঁর যে ভয়াবহ দিনগুলো কেটেছে, তখন তিনিই প্রথম তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। খাদীজার (সা) অবদান সম্পর্কে ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

খাদীজা ছিলেন অসাধারণ বিস্ময়কর একজন মানুষ। তিনিই সর্বপ্রথম ওহীর স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এদিক থেকে বলা যায়, তিনিই ছিলেন প্রথম মুসলিম। কারণ, স্বয়ং মহানবীরও আগে তিনি ঐশীবাণীর উপর ঈমান এনেছিলেন। সত্যকে চিনে নেয়ার সহজাত ক্ষমতা তাঁর ছিলো। তাঁর ব্যাপারে প্রাপ্ত বর্ণনাগুলো দেখলে মনে হয়, তিনি ছিলেন মায়ের মতোই মমতাময়ী। তাঁর মৃত্যুতে মহানবী যেন মাতৃতুল্য একজন অভিভাবককেই হারিয়ে ফেলেছিলেন। আসলে তিনি খাদীজাকে অনেক ভালোবাসতেন। আপনি নিশ্চয় জানেন, একজন ধনী বিধবাকে বিয়ে করা মহানবীর সুবিধাবাদিতা ছিলো বলে পাশ্চাত্যের সমালোচকরা প্রায় সময়ই অবজ্ঞা প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু কোনো বর্ণনা থেকেই এর স্বপক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং তিনি সারাজীবন খাদীজাকে ভালোবেসে গিয়েছেন। তাঁর পরবর্তী স্ত্রীগণ কোনো প্রসঙ্গে খাদীজার কথা উল্লেখ করাকে অত্যন্ত অপছন্দ করতেন। কারণ তাঁরা জানতেন, তাঁদের কেউই মহানবীর হৃদয়ে খাদীজার সমান জায়গা করে নিতে পারেননি।

খাদীজার মৃত্যুর কয়েক মাস পর মোহাম্মদের (সা) জীবনে আরো একটি বিপর্যয় নেমে আসে। এবার তাঁর চাচা আবু তালিব মৃত্যুবরণ করেন। এই মানুষটি তাঁকে কোরাইশদের সর্বপ্রকার কোপানল থেকে রক্ষা করতেন। চাচার মৃত্যুর পর মোহাম্মদের (সা) গোত্রের নেতৃত্ব চলে যায় তাঁর বিরোধী পক্ষের সবচেয়ে উগ্র ব্যক্তিদের হাতে। ফলে তাঁর উপর আবারো আক্রমণের মাত্রা বেড়ে যায়। তাঁর শত্রুরা এবার তাঁকে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে দিলো– হয় দাওয়াতী কাজ বন্ধ করো, নয়তো মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকো।

মোহাম্মদ (সা) ও সাথীদের ক্ষুদ্র দলটি এবার সবচেয়ে অসহায় পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেলেন। তাঁদের অর্ধেক গিয়ে আশ্রয় নিলেন ইথিওপিয়ায়। আর বাকিদের মক্কায় নির্যাতন সহ্য করা ছাড়া কোনো উপায় ছিলো না। শত্রুরা এবার তাঁর ইসলামী আন্দোলনকে অঙ্কুরেই ধ্বংস করে দিতে প্রকাশ্যে পরিকল্পনা করতে লাগলো। এমনকি তাঁকে হত্যার পরিকল্পনাও করতে লাগলো।

এই পরিস্থিতিতে তিনি যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, তা ছিলো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। সেটি নিছক তাঁর নিজের ভবিষ্যতই নয়, বরং পুরো দুনিয়ার ইতিহাসকেই পাল্টে দিয়েছিলো।

[স্ক্রিপ্ট: জিয়াউদ্দীন সরদার, অনুবাদ: মাসউদুল আলম]

নোট:

[1] ইসলাম গ্রহণের জন্য দুজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের বিষয়টি প্রশ্ন ও ব্যাখ্যাসাপেক্ষ।

[2] প্রকৃতপক্ষে ‘সালাম’ শব্দের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ রয়েছে। এরমধ্যে একটি অর্থ হলো শান্তি।

অন্যান্য পর্ব

দ্য লাইফ অব মোহাম্মদ (দ্বিতীয় পর্ব: হলি ওয়ার)

দ্য লাইফ অব মোহাম্মদ (তৃতীয় পর্ব: হলি পিস)

জিয়াউদ্দীন সরদার
জিয়াউদ্দীন সরদার হলেন লন্ডননিবাসী স্কলার, লেখক, সাংবাদিক, কালচারাল ক্রিটিক ও পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল। ইসলাম, সংস্কৃতি, নৃতত্ত্ব, দর্শনসহ নানা বিষয়ে তিনি প্রায় অর্ধশতাধিক বই লিখেছেন। বর্তমানে 'মুসলিম ইনস্টিটিউট' নামে লন্ডনভিত্তিক একটি থিংকট্যাঙ্কের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন