মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭
হোম > পর্যালোচনা > বাংলাদেশে ইসলামচিন্তার নানা ধারা ও চিন্তকগণ: ‘বাংলার ইসলাম’ প্রসঙ্গ ও সম্ভাবনা (পর্ব-১)

বাংলাদেশে ইসলামচিন্তার নানা ধারা ও চিন্তকগণ: ‘বাংলার ইসলাম’ প্রসঙ্গ ও সম্ভাবনা (পর্ব-১)

বিভিন্ন ধারা সম্পর্কে সাধারণ আলোচনা

০১।

বাংলাদেশে ইসলাম নিয়ে যারা মৌলিক বইপুস্তক লেখেন তাদের সাথে আমাদের অপরিচয়ের দেয়াল পর্বতপ্রমাণ। মার্কসবাদের সৃজনশীল ও ধ্রুপদী ব্যাখ্যাদানে ব্রতীদের আমরা কিছুটা হলেও চিনি। সমাজ, রাজনীতি, দর্শন ও ইতিহাস নিয়ে যারা লেখেন তাদেরও পরিচিতি রয়েছে সমাজের প্রগতিশীল ও চিন্তাশীল মহলে। তবে বাংলাদেশে যারা ইসলাম নিয়ে গবেষণা করেছেন, মৌলিকভাবে ভাবার চেষ্টা করেছেন ও লিখেছেন তারা আমাদের সমাজের চিন্তাশীল মহলে প্রায় অপরিচিত। বাংলাদেশে বিশ্বমানের ইসলামী গবেষক একেবারেই নাই – এটি সত্য নয়। শিক্ষিত মহলে ঘুরে ফিরে পাশ্চাত্যে বসবাসকারী তারিক রমাদান, ফজলুর রহমান বা জিয়াউদ্দীন সরদার কিংবা আইআইআইটি’র লেখকদের কথাই আসে। বর্তমান বাংলাদেশে যেসব ‘আলেম’ ইসলাম নিয়ে ভাবছেন ও লিখছেন তাদের চিন্তার সাথেও পরিচিত হওয়ার সময় এসেছে। যাদের শেষ গন্তব্য বাংলাদেশ, আমরা যারা একটা ‘মানবিক’ সমাজের প্রত্যাশা করি, বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও পরমতসহিষ্ণু সমাজ যাচনা করি, ভিন্নমতকে দমন করা সমর্থন করি না, অপরের যুক্তি, জীবন ও চর্চাকে আন্তরিকভাবে বুঝতে চাই – তাদের পক্ষে এ অঞ্চলের ইসলামের রূপ অনুসন্ধান করা ও বুঝা এবং এখানকার ‘ইসলামী চিন্তাবিদ’দের ভাবনার সাথে পরিচিত হওয়া একান্ত প্রয়োজন।

০২।

বাংলাদেশের তরুণদের একটা অংশ বর্তমানে ইসলাম নিয়ে ভাবছেন, লিখছেন ও পড়ছেন। এদের মধ্যে বেশ কয়েকটি ধারা আমি লক্ষ্য করেছি। একটি ধারা মূলত মার্কসবাদী। তারা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার কৌশল হিসেবে ইসলামের একটা অবয়ব নির্মাণ করতে চান। তবে এদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যারা প্রথাগত বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত নন। কেউ আবার আস্তিক। কেউ ঘোষিত বা অঘোষিতভাবে নাস্তিকও বটে। ইসলামের ইতিহাস থেকে তারা তাদের পছন্দসই ইতিবাচক উদাহরণ সংগ্রহ করে নিজেদের রাজনৈতিক ও দার্শনিক ভাবনার উপযোগী করে ব্যাখ্যা করেন। এরা মূলত ইতিহাস আশ্রয়ী। ইসলামের মৌলিক টেক্সট ‘কোরআন ও হাদীস’ থেকে তারা খুব কম উদাহরণ টানেন। ইতিহাসে ইসলাম চর্চার বৈচিত্রের ধারা উনারা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করেন। খুব সহানুভূতি ও সংবেদনশীলভাবে তারা ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের সমালোচনা (পর্যালোচনা?) হাজির করেন। ধর্মের ঐশিত্ব (divinity) নিয়ে তারা সাধারণত প্রশ্ন করেন না। ইসলামকে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবে গণ্য করে ‘গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও সেক্যুলার’ সমাজের উপযোগী করে ইসলামকে উপস্থাপন করতে তারা উদ্যোগী ও উৎসাহী। ইসলাম ধর্মাবলম্বী বা ইসলাম পালনকারী একজন হিসেবে তারা কথা বলেন না। বরং compassionate observer হিসেবে ইসলাম প্রশ্নে তারা আলাপ তোলেন। এ ধারারই একটি অংশ মার্কসীয় পরিভাষা ব্যবহার করে ইসলামকে ব্যাখ্যা করেন অথবা ইসলামী পরিভাষার মার্কসীয় ব্যাখ্যা উপস্থিত করেন।

৩।        

আরেকটি ধারা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। কিন্তু তারা ইসলামকে ধর্ম বা দ্বীন হিসেবে ‘own’ করে কথা বলেন, কথা বলেন ইসলামী ইবাদত ও এলেমের ভেতর থেকে। তাদের আগ্রহ ইসলামী দর্শন, জ্ঞানতত্ত্ব ও রাষ্ট্রতত্ত্বে এবং আধুনিকতার বিপরীত প্যারাডাইম নির্মাণে। বর্তমান পুঁজিবাদী-বিশ্বায়নের এই যুগে ইসলামের কোনো মৌলিক ও অভিনব বক্তব্য আছে কিনা – তা তাঁদের সাগ্রহ অনুসন্ধানের বিষয়। বিশ্ব ইতিহাসে ইসলামের প্রবল ভূমিকার সম্ভাবনার কথা মাথা রেখে আধুনিক-উত্তরাধুনিক পরিভাষা ব্যবহার করে একটা জ্ঞানতাত্ত্বিক পাটাতন তারা তৈরি করতে চান। এরা আরবী পরিভাষাও ব্যবহার করেন। তবে সেগুলোর ‘মানে’ তৈরিতে প্রায়শই পাশ্চাত্য দর্শনের সহায়তা গ্রহণ করেন। এ ব্যাপারে তারা প্রধানত ইংরেজি ভাষায় লেখা বা অনুবাদিত আধুনিক কালের ফকীহদের লেখালেখির উপর নির্ভর করেন। প্রাচীন ফকীহদের লেখাও তারা পুনর্পাঠ করেন। এ ধারা ইসলামের জ্ঞানতাত্ত্বিক সম্ভাবনা উন্মোচনে আগ্রহী।

৪।

তৃতীয় আরেকটি ধারা আছে যারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইসলাম সম্পর্কে পড়াশুনা করেছেন বা করছেন। ইসলামের আমলী ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ইতিহাসের সাথে তাদের রয়েছে অন্তরঙ্গ পরিচয়। তারা ইসলামকে ‘মডার্নাইজ’ করার প্রয়াস চালান না। ইসলামী পরিভাষাই তারা সরাসরি ব্যবহার করেন। তারা ইসলাম পালনকারী বা নিয়মিত পালনের ঘোষণাকারী। তারা অবয়বে ও আমলে বস্তুত ‘ইসলামী’। তারা কোরআন ও হাদীস থেকে রেফারেন্স দিয়ে লেখেন বা বলেন। বাংলাদেশে ভার্চুয়াল জগতে এরা তেমন প্রভাবশালী নন। তবে সমাজে ইসলাম ধর্মের মানে তৈরিতে উনারাই প্রধান ভূমিকা পালনকারী। বাংলাদেশের শহর ও গ্রামে ইসলামের শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে তারাই মূল ভূমিকা রাখেন। রাষ্ট্রের প্রভাবশালী ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ মহলের সাথে এদের কোনো যোগাযোগ নাই বললেই চলে। সমাজ ও রাষ্ট্রে যারা আইডিয়া প্রপাগেট করেন, তাদের বেশিরভাগই এই আলেমদের লেখার সাথে পরিচিত নন। এই তৃতীয় ধারার সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক ও আন্তরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে।

এই ধারার ভেতরে নানা উপধারাও রয়েছে। এই ধারায় আমাদের কওমী মাদ্রাসাগুলো যেমন রয়েছে, তেমনি আছে আলিয়া মাদ্রাসাগুলোও। কিন্তু এই দুই ধারার সিলেবাস ও পাঠপদ্ধতির মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। কওমী মাদ্রাসার সিলেবাস সংস্কার ইত্যাদি নিয়ে অনেক কথা হয়, হচ্ছে ও হবে। তবে এখানকার পাঠদান ও পাঠগ্রহণ পদ্ধতির অনন্যতা নিয়ে কোনো কথা শুনিনি বা লেখা দেখিনি। আমাদের মাদ্রাসাগুলোতে শর্ষিনা, ফুরফুরা, চরমনাই প্রমুখ পীরের মতাদর্শিক প্রভাবও লক্ষণীয়। সালাফী বা আহলে হাদীস মাদ্রাসাও আছে অনেক। যারা পড়াশুনা শেষ করেছেন, আরবী-উর্দু ভাষার উপর তাদের দখল উল্লেখযোগ্য। আমাদের কওমী মাদ্রাসাগুলোতে এখনো উর্দু ভাষার প্রচলন আছে, যদিও সময়ের তাগিদে ধীরে ধীরে আরবী ভাষায় পাঠ ও বাংলায় অনুবাদের আগ্রহ বাড়ছে। উর্দু গদ্যের বিকাশে ‘আলেম’দের ভূমিকা আছে। বাংলা অনুবাদেও শিবলী নোমানী, সোলায়মান নদভী বা হাসান আলী নদভীর গদ্যের অপূর্ব সুষমা সহজেই টের পাওয়া যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে, বাংলা লিখিত গদ্যের বিকাশে আমাদের আলেম সমাজের ভূমিকা নাই বললেই চলে (আছে কি?)। তবে তাদের গদ্যে বাক্য গঠন ও শব্দ চয়নে ভিন্ন স্বাদ ও গতি লক্ষ্য করেছি। তাদের গদ্যের বিশিষ্টতা নিয়ে গবেষণা করলে আমাদের গদ্যভাষার নতুন কোনো দিগন্ত উন্মোচিত হলে হতেও পারে। যাহোক, এই তৃতীয় ধারা সম্পর্কে বাংলাদেশে অনেক নেতিবাচক প্রচারণা আছে। আমাদের অধিপতি বুদ্ধিজীবী মহলে তারা ‘দরিদ্র’, ‘পশ্চাৎপদ’, ‘অনাধুনিক’ ইত্যাদি নানা ‘বিশেষণে’ সম্বোধিত হয়ে তারা ‘অপর’ হিসেবেই বিরাজ করেন।

৫।  

আমাদের জনপরিমণ্ডলে (public sphere) ইসলাম সম্পর্কে জানাশোনার পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমার আলোচনায় যে তৃতীয় ধারার কথা বললাম সেখান থেকে উচ্চশিক্ষার্থে অনেকেই মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়, আল আজহার ও রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয় যাচ্ছেন; অনেকেই মিডিয়ায় ইসলামী ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার বদৌলতে সমাজে ইসলাম সম্পর্কে জানাশোনায় র‍্যাডিকাল পরিবর্তন আসছে। আমাদের দেশে ধর্মীয় আচার হিসেবে পালনীয় অনেক অনুষঙ্গকেই তারা প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণীয় বিভিন্ন ধর্মীয় চর্চা সম্পর্কে অনেকে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। তাই অনেকেই বলছেন, আমাদের সমাজের ‘সালাফীকরণ’ ঘটছে। কারণ মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় ফেরত অনেকেই শুধু ‘সহীহ হাদীস’ ও কোরআন অনুসরণের কথা বলছেন। ধর্মকে ধর্ম হিসেবে টিকিয়ে রাখতে তারা ‘দলীলে’র বিশুদ্ধতার কথা বলেন ও টেক্সচুয়াল অথোরিটিকেই চূড়ান্ত গণ্য করেন। তা না হলে, তাদের যুক্তি অনুসারে, ধর্ম তার ঐশিত্ব হারিয়ে মানুষের নির্বিচার ইচ্ছার বলিতে পরিণত হতে পারে। তবে, সালাফীদের ভেতরেও যে কট্টর ও উদারপন্থী উভয়ই আছেন – এ সম্পর্কে অনেকেই অনবহিত। Literalist হিসেবে তাদের একমাত্রিক চিত্রায়নও সঠিক নয়। বাংলাদেশে তাঁরা ‘আহলে হাদীস’ নামে পরিচিত এবং তাদের নিজেদের মধ্যেই টেক্সচুয়াল ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ভিন্নতার কারণে নানা উপদল রয়েছে।

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ভিজিট করুন

জগলুল আসাদ
জগলুল আসাদ
শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ, সরকারি হরগঙ্গা কলেজ, মুন্সীগঞ্জ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *