শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭
হোম > নির্বাচিত > ইসলামী চিন্তার সংস্কার: বিচ্যুতি, প্রগতি, নাকি সময়ের দাবি? (পর্ব ১)

ইসলামী চিন্তার সংস্কার: বিচ্যুতি, প্রগতি, নাকি সময়ের দাবি? (পর্ব ১)

এডিটর’স নোট:
ইসলামী চিন্তার সংস্কারের প্রসঙ্গ আসলে প্রায়শই একটা প্রশ্ন উত্থাপিত হয় – সংস্কারের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো বিবেচনাযোগ্য, আর কোনগুলো অপরিবর্তনীয়? এক্ষেত্রে অতি উদার কেউ কেউ শরীয়াহর খোলনলচে পাল্টে ফেলতে চান, আবার অতি রক্ষণশীল কেউ কেউ মনে করেন ইসলামে সংস্কারের কোনো ধরনের সুযোগ নেই। এই দুই প্রান্তিক অবস্থানের বাইরে সঠিক পথ কী হতে পারে?

২০১৪ সালের নভেম্বরে লন্ডনে প্রদত্ত দীর্ঘ দেড় ঘণ্টার এক বক্তৃতায় শায়খ ড. ইয়াসির ক্বাদী এ ব্যাপারে গভীর পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন। একটি গল্পের আশ্রয় নিয়ে পুরো বিষয়টিকে তিনি চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্যে বক্তৃতাটি ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করা হচ্ছে। অনুবাদ করেছেন আইয়ুব আলী


বক্তৃতা পর্ব: পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫, পর্ব ৬

প্রশ্নোত্তর পর্ব: পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩

ভূমিকা

السلام عليكم ورحمة الله وبركاته، الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله ، وعلى آله وصحبه ومن والاه ، أما بعد

Yasir-Qadhiআজকের আলোচ্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়টি নিয়ে প্রত্যেকেরই ভাবা উচিত বলে আমি মনে করি। পাশ্চাত্যে মুসলমানরা যেসব ইস্যু মোকাবেলা করছে, সেসব মূলত একটা বিষয়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। সেটা হলো, আধুনিক লাইফস্টাইল ও আধুনিকতার প্রেক্ষাপটে ইসলামী ধর্মতত্ত্ব ও আইন কীভাবে প্রয়োগ করা হবে। আমি মনে করি, এটা কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়। বরং এটাই এখন আমাদের জন্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা, অন্ততপক্ষে অন্যতম বড় সমস্যা।

আরেকটু সহজ করে বলতে গেলে, চৌদ্দশ বছরের পুরানো একটা ধর্মের শিক্ষা মোতাবেক আমরা কীভাবে আমাদের জীবন পরিচালনা করব, যেখানে আমরা একবিংশ শতাব্দীর মানবতাবাদী ও লিবারেল মূল্যবোধসম্পন্ন গণতান্ত্রিক সমাজে বাস করছি। পাশ্চাত্যের এই সমাজ যে কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিদ্যমান প্রভাবশালী সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের কী কী এবং কতটুকু গ্রহণ করব, সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।

এই গ্রহণ-বর্জনের বিষয়টি নিয়ে আমাদের সবার, প্রত্যেক সচেতন মুসলমানেরই চিন্তাভাবনা করা উচিত। আমি উদাহরণ দিচ্ছি। যদিও এটা একটা বিতর্কিত বিষয়। তাই আমি আশা করব, আপনারা একে ফিকাহর দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে নিছক উদাহরণ হিসেবেই দেখবেন। সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া ‘হ্যাপি মুসলিম ভিডিও’ বেশ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ভিডিওটি হালাল নাকি হারাম আমি সে বিতর্কে যাচ্ছি না। এটি যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, আমি শুধু আপনাদেরকে সেদিকে দৃষ্টি দিতে বলব। অনেক মুসলমান ভিডিওটির ব্যাপারে তাদের বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। আবার অনেকেই এতে কোনো সমস্যা খুঁজে পাননি।

ভিডিওটির ফিকহী বা আইনী ব্যাখ্যা আমাদের মনোযোগের বিষয় নয়। এটা একটা বড় সমস্যার প্রতীকী উদাহরণ মাত্র। অর্থাৎ, আমরা কতটুকু পর্যন্ত গ্রহণ বা বর্জন করব, সেটা হলো মূল ব্যাপার। ভিডিওটিতে যা পারফর্ম করা হয়েছে, আমরা সবাই মিলে যদি তা করি – তাহলেই কি তা হালাল কিংবা হারাম বলে গণ্য হবে? এটাই হচ্ছে মূল প্রশ্ন।


ইউনাইটেড কিংডম অব ভেগানোপোলিসের গল্প

একটি দীর্ঘ উপকথা দিয়ে আমি আজকের আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছি। উপকথাটির দৃশ্যপট সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এটি নিছক একটি উপকথা হলেও আসলে এটি ততটা অবাস্তব নয়। আমি যে চিত্রকল্প ও বাস্তবতা তুলে ধরবো আজ থেকে কয়েক দশক পর তা বাস্তবে ঘটতেও পারে। যাইহোক, গল্পটি শুরু করছি। সবশেষে আমরা আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে গল্পটি বিশ্লেষণ করব।

ইউনাইটেড কিংডম অব ভেগানোপোলিস (ইউকেভি) নামে একটি ভবিষ্যত দেশের কথা কল্পনা করি। দেশটির সবাই ভেজিটেরিয়ান। তারা প্রাণীর মাংস এবং এ থেকে উৎপাদিত যে কোনো প্রকার খাদ্য গ্রহণকে বর্বরতা বলে মনে করে। তাদের মতে, প্রাণী হত্যা একটি নিষ্ঠুর কাজ। এটা এক ধরনের রক্তচোষা প্রবণতা। স্রেফ মাংস, চামড়া, চোখ ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্যে পশু লালন-পালন এবং ‘হত্যা’ করাকে তারা অন্যায় মনে করে।

আরেকটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে – তারা আক্ষরিক অর্থেই নিজেদেরকে পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বোৎকৃষ্ট সমাজ বলে দাবি করে। এ ব্যাপারে ইউকেভির অধিবাসীদের যুক্তি হচ্ছে – আমরা এমন একটি জাতি যারা মাংস খাওয়ার মতো আদিম প্রথা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি।

এই যুক্তিটি তাদের মাঝে এক ধরনের দাম্ভিকতা তৈরি করে। ফলে তারা আশেপাশের মাংসভোজী সমাজ ও সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা ও ঘৃণার চোখে দেখতে থাকে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে – ‘তোমরা কীভাবে প্রাণী হত্যার মতো এত নিষ্ঠুর, পশ্চাৎপদ ও অসভ্য কাজ করতে পার? তোমরা কি দেখো না, কীভাবে জবাই করা প্রাণীর রক্তের স্রোত বয়ে যায়! তারপরও কীভাবে তোমরা সেই প্রাণীর মাংস খাও? এ থেকেই বুঝা যায়, তোমরা খুবই পশ্চাৎপদ ও অসভ্য একটা জাতি।’

ইউকেভির বৈদেশিক নীতি
নিজেদের এই ‘মূল্যবোধ’ অন্যান্য দেশের উপর চাপিয়ে দেওয়াই হচ্ছে ইউকেভির মুখ্য বৈদেশিক নীতি। এই মূল্যবোধ তাদেরকে এত বেশি আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, তাদের অন্যান্য ভেজিটেরিয়ান বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর উপরও তারা কর্তৃত্ব ফলাতে চায়। এর অংশ হিসেবে তারা অন্যান্য দেশের উপর অবরোধ আরোপ করে। এমনকি আগ্রাসনও চালায়। এর পক্ষে তাদের যুক্তি হলো – আমরা এই ‘পিছিয়ে পড়া’ মানুষগুলোর মাঝে ভেগানিজমকে ছড়িয়ে দিতে চাই। এসব দেশের জনগণ এখনো মাংস খাওয়া ছাড়তে পারেনি। অন্যদিকে, আমরা এমন একটি সুসভ্য জাতি যারা নিরামিষভোজী হিসেবে নিজেদেরকে উন্নীত করেছি। অন্যান্য দেশ নিশ্চয় একে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করবে। ভেগানিজমের প্রচার-প্রসারকে সেসব দেশের বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ ও শুভবোধসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ নিশ্চয় স্বাগত জানাবে।

এককথায়, তাদের সত্যিকার উদ্দেশ্য হচ্ছে অন্যান্য দেশের লোকদেরকে জোরপূর্বক ভেগানিজমের আদর্শ গ্রহণে বাধ্য করা।

প্রথম প্রজন্মের মুসলিম অভিবাসী
কাহিনীটি যদিও কাল্পনিক তবুও এর প্রেক্ষাপট খুব অবাস্তব নয়। কারণ, বর্তমান সময়কালেই অনেকে প্রাণী অধিকার রক্ষায় সচেতন হয়ে উঠছেন। ভেগান মুভমেন্টও একইভাবে প্রসার লাভ করছে।

এবার ইউকেভির মুসলমানদের কথা চিন্তা করা যাক। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিশর এবং টিম্বাকটুসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক মুসলমান ইউকেভিতে এসেছে। তারা সবাই প্রাথমিকভাবে জীবিকার তাগিদে শ্রমিক হিসেবে ইউকেভিতে অভিবাসী হয়েছে। কিন্তু তাদের সন্তান ও নাতিপুতিরা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই ইউকেভিতে বসবাস করছে। তারা এখানকার অধিবাসীদের ভাষায় কথা বলে, একই প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করে এবং ইউকেভির সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও দর্শনকে পুরোপুরি গ্রহণ করে নিয়েছে।

তাহলে এখন প্রশ্ন জাগে, মুসলিম সংস্কৃতি নিরামিষভোজী হওয়ার কথা বলে না। এ কারণে প্রথম প্রজন্মের মুসলিম অভিবাসীরা ভেগানিজম সম্পর্কে সচেতন ছিল। ফলে তারা মাংস খেতো। যার ফলে তারা সমাজের প্রভাবশালী সংস্কৃতির মধ্যে বিলীন হয়ে যায়নি।

অতএব, ইউকেভির মুসলমানদের ব্যাপারে আপনার ভাবনা কী? ভেগানিজম প্রভাবিত সমাজের প্রভাবশালী সংস্কৃতির ব্যাপারে তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল বলে আপনি মনে করেন?



মুসলমানদের প্রতিক্রিয়ার পাঁচটি ধারা

কোনো মুসলিম দেশে ভেগানিজমের উৎপত্তি হয়নি। ইউকেভিতেই এর উৎপত্তি এবং সেখানে এটি খুব জনপ্রিয়। ফলে অভিবাসী মুসলমানদের জন্যে এই অভিজ্ঞতা নতুন। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে বলে আপনার মনে হয়? আমরা খুব সহজেই ধারণা করতে পারি – এ ব্যাপারে সব মুসলমানের প্রতিক্রিয়া একই রকম নয়, বরং মিশ্র। তাই না?

গল্পের সুবিধার্থে মুসলমানদের প্রতিক্রিয়াগুলোকে আমি পাঁচ ভাগে বিশ্লেষণ করতে চাই। অর্থাৎ ভেগানিজম ইস্যুটি নিয়ে ইউকেভিতে বসবাসকারী মুসলমানদের তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম প্রজন্মগুলো মোটামুটিভাবে পাঁচটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এ দলের সংখ্যা আরো বেশিও হতে পারে, তবে আমি শুধু পাঁচটি প্রধান ধারাকে আলোচনায় রাখছি।

ধর্মত্যাগী ধারা

অবশ্যম্ভাবীভাবে কিছু মুসলিম ভেগানিজমের আদর্শ দ্বারা পুরোপুরি কনভিন্সড হয়ে পড়ে। তারা মনে করে, ভেগানিজমই হচ্ছে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একমাত্র লাইফস্টাইল। তারপর যখন তারা খেয়াল করে, তাদের ইসলামী ঐতিহ্য স্পষ্টভাবেই প্রাণীর মাংস খাওয়ার বৈধতা দিয়েছে, তখন তারা তাদের পূর্বপুরুষের সংস্কৃতি ও ধর্ম পুরোপুরি ত্যাগ করা ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় দেখে না। কারণ, ততদিনে তারা ইউকেভির প্রভাবশালী সংস্কৃতির মধ্যে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে।

প্রচলিত ব্যবস্থা
মুসলমানদের এই গ্রুপটি প্রচলিত ব্যবস্থাকে আক্ষরিক অর্থেই গ্রহণ করে নিয়েছে। তারা ইউকেভি সমাজের মূল্যবোধ, আদর্শ ও সংস্কৃতিকে সঠিক মনে করে। তারা এটাও বুঝে, তাদের ধর্ম এই সমাজের মূল্যবোধের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাই তারা বলে – ‘আমি আর মুসলমান থাকতে পারছি না, এবং আমি নিজেকে এই প্রভাবশালী সংস্কৃতির একজন হিসেবেই মনে করি।’

পপুলিজম
তাদের অনেকে ইসলাম থেকে চুপচাপ সরে গেছে। তারা ইসলামের শিক্ষাগুলো এড়িয়ে চলতে শুরু করে এবং মসজিদে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। আপনি হয়তো লোকমুখে তাদের ব্যাপারে শুনে থাকবেন, অমুক এখন আর ইসলামের বিধিবিধান পালন করছে না। তারা এখন প্রচলিত সংস্কৃতিতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। তাদের কেউ কেউ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে বেশ পরিচিত।

ইসলামের সমালোচনা
মিডিয়াতে তারা পূর্বপুরুষের সংস্কৃতির সমালোচনা করে থাকে। এভাবে তারা ইসলামের সমালোচকে পরিণত হয়। তারা বলে – ‘আমি মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি। আমার পরিবারের লোকজন মাংস খায়। কিন্তু আমি তাদের সাথে নাই।’

চলুন দেখা যাক, এই ধরনের ব্যক্তি আরো কী কী করতে পারে। এই ধরনের ব্যক্তি বিখ্যাত ও ধনী হয়ে ওঠবে, বই বেরুবে, টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাক পড়বে। কারণ, তিনি প্রচলিত সংস্কৃতিকে সঠিক হিসেবে তুলে ধরেন। এরইসাথে তিনি বলে বেড়ান – ‘আমি আমার বাপ-দাদার ধর্ম ও সংস্কৃতিকে ত্যাগ করেছি।’ তাই এ ধরনের লোকেরা সাধারণত মিডিয়ার কাছে পোস্টার-চাইল্ড ও ডার্লিং-বয় হিসেবে খাতির পায়। মিডিয়া এইসব লোকদের খুব পছন্দ করে।

বিচ্ছিন্ন রেফারেন্স ব্যবহার
তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি, এই ধরনের ব্যক্তি তার সাবেক মুসলিম পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের সমালোচনা করার মাধ্যমে প্রাচুর্য ও খ্যাতি অর্জন করেছে। তো এই ব্যক্তির সম্ভাব্য আরো কী বক্তব্য থাকতে পারে? তিনি এ রকমও বলতে পারেন, ‘আমি কোরআন ও সুন্নাহ নিয়ে পড়াশোনা করে দেখেছি কোরআন স্পষ্টভাবেই গোশত খাওয়াকে অনুমোদন করেছে। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।’ তারপর প্রমাণ হিসেবে কোরআনের আয়াত হয়তো পড়ে শোনাবেন, যেখানে আল্লাহ বলেছেন,

أُحِلَّتْ لَكُم بَهِيمَةُ ٱلْأَنْعَـٰمِ

তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে (সূরা মায়েদা: ১)

তিনি কোরআন থেকে হয়তো আরো উদ্ধৃতি দিবেন। তারপর এসব আয়াতের উপর নিজের মনগড়া ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিবেন। একটি সরল ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ আয়াতকে তিনি তার পক্ষপাতদুষ্ট পূর্বানুমানের সাথে প্রতীকী অর্থে পাঠ করবেন, যা সংশ্লিষ্ট আয়াতে আদতেই নেই। এভাবে তিনি একেকটি আয়াতকে ক্রমাগত নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করতে থাকেন। যেমন, তিনি বলতে পারেন – ‘প্রাণীদেরকে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে জবাই করার ব্যাপারে কোরআন উৎসাহিত করেছে।’ অথচ কোরআনের আয়াতটি প্রকৃতপক্ষে এ রকম:

فَاذْكُرُ‌وا اسْمَ اللَّـهِ عَلَيْهَا صَوَافَّ ۖ فَإِذَا وَجَبَتْ جُنُوبُهَا فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ

জবাই করার সময় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো অবস্থায় তাদের উপর তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো তারপর তারা যখন ঢলে পড়ে যায় তখন তা থেকে তোমরা খাও এবং ধৈর্যশীল অভাবগ্রস্ত ও সাহায্যপ্রাথী অভাবগ্রস্তকে খাওয়াও (সূরা হাজ্জ্ব: আয়াত ৩৬)

কিন্তু তিনি এই আয়াতের অপব্যখ্যা করে বলতে পারেন – ‘প্রাণীদেরকে একের পর এক সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে সবগুলোকে একসাথে জবাই করার ব্যাপারে কোরআন স্পষ্টভাবেই উৎসাহিত করেছে।’

পরিভাষাগতভাবে দেখলে তিনি হয়তো সঠিক। কিন্তু আয়াতটি পাঠ করলে তার উপস্থাপিত নাটকীয় বর্ণনা ও প্রতীকী অর্থ আমাদের চিন্তায় মোটেও আসে না। অথচ প্রচলিত সংস্কৃতি তার ব্যাখ্যাটাই গ্রহণ করে। তাদের দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী, প্রাণীদেরকে লাইনে দাঁড় করানো এবং একসাথে জবাই করা অত্যন্ত ‘বর্বর’ কাজ। আসলে তারা এভাবে ভাবতেই অভ্যস্ত।

এইসব ইসলামত্যাগীদের কেউ হয়ত আরো বলবেন – “আমি ‘তাদের’ নবীর জীবনী পড়েছি। ফলে আমার কাছে এটা পরিষ্কার যে, তিনি নরমাংস খেতেন। তাদের অন্যতম একটি ধর্মগ্রন্থ সহীহ বুখারী থেকে আমরা জেনেছি, মোহাম্মদের প্রিয় খাবার ছিল ভেড়ার পায়ের নলি।”

তারপর তিনি হয়ত বলবেন – ‘মাংস কীভাবে ঈশ্বর প্রেরিত একজন সত্য নবীর প্রিয় খাবার হতে পারে? এটা কীভাবে সম্ভব! তারমানে এই নবী ঈশ্বর মনোনীত ছিল না।’

সবশেষে তিনি উপসংহার টানবেন – ‘ইসলাম প্রাণী হত্যাকে উৎসাহিত করে। তাদের ধর্মীয় উৎসব (যেমন – ঈদুল আজহা) মূলত প্রাণী হত্যার উৎসব। তাদের অনুষ্ঠানগুলো হাজার হাজার ভেড়া-বকরি জবাই করার উপলক্ষ্য ছাড়া আর কিছুই নয় এবং এটা নাকি তাদের উৎসব! আকিকা ও ওয়ালিমাসহ যে কোনো আনন্দঘন ঘটনায় তাদের ধর্ম তাদেরকে কী করতে বলে? – যাও, গরু-ছাগল-ভেড়া জবাই করো, এদের হত্যা করো।

মনগড়া ব্যাখ্যা
সাদামাটা ব্যাপারগুলোকে এ ধরনের ব্যক্তি যে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, সেভাবে আগে কেউ কখনো ভাবেনি। এর কারণ হচ্ছে সমাজের প্রভাবশালী ন্যারেটিভ বা প্রচলিত সংস্কৃতি ভেগানিজমকে গ্রহণ করে নিয়েছে। তাই এই ব্যক্তিটির নিকট ইসলামের এই সবকিছুই ‘খারাপ’ ও ‘বর্বরতা’ বলে মনে হয়।

ব্যক্তিটি যদিও কোরআন ও হাদীসের সঠিক উদ্ধৃতি দিচ্ছে; কিন্তু সেই সাথে এসব উদ্ধৃতির প্রতীকী অর্থ আবিষ্কার করে এগুলোকে এমন অশুভ ও ভয়ংকর হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে যা কোনোভাবেই আমাদের কল্পনায়ও আসেনি। এমনকি ইউনাইটেড কিংডম অব ভেগানোপোলিসে জন্মগ্রহণকারী ছাড়া অন্য কারো চিন্তায়ও এসব আসার কথা নয়।

উদ্ভট ফিকহী মতামতের উদ্ধৃতি
তাদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে অভিজ্ঞ লোকেরা এমনসব ফিকহী মতামতের উদ্বৃতি দেয় যেগুলো অধিকাংশ মুসলমানেরই অজানা। এইসব মতামত মুসলমানরা কখনো শোনেনি। তারা এই উদ্ভট মতামতগুলোই ফিকাহর গ্রন্থগুলো থেকে খুঁজে খুঁজে বের করে। তারা সেগুলোকে হয়তো সঠিকভাবেই উদ্ধৃত করে, কিন্তু আসল কথা হচ্ছে এই সমস্ত বিচ্ছিন্ন মতামত এখনকার ইসলামী সমাজে প্রচলিত নেই। হয়তো হাজার বছর আগে কিছু মানুষ সেগুলো অনুসরণ করতো।

তারা এভাবে বলে – ‘আরে, মুসলমানরা তো খুবই অসভ্য! তুমি জানো না, তাদের হাম্বলী মাজহাব তো বন্য কুকুর এবং শিয়াল খাওয়া জায়েজ করেছে! গরু-ভেড়া না হয় বাদ দিলাম, তাই বলে বন্য কুকুর আর শিয়াল! আর তুমি কি এটা জানো, তাদের মুহাদ্দিসরা মরুভূমির টিকটিকি খাওয়াকেও জায়েজ মনে করে! আর মালিকী মাজহাব কি বলেছে, তাও শুনে রাখো। তারা বলেছে, তুমি চাইলে কুকুর-বেড়ালও খেতে পারো। এগুলো হারাম নয়। আর কিছু আলেম তো শুকর ছাড়া সবকিছু খাওয়া জায়েজ মনে করে। অর্থাৎ তুমি চাইলে ইদুর, সাপ, টিকটিকি, বিচ্ছু – এইসবও খেতে পারো।’

মাজহাবগুলোর কোনো কোনো আলেম এগুলোকে জায়েজ মনে করেছেন – এটা সত্য। কিন্তু কয়জন এইসব মতামত জীবনে একবার হলেও শুনেছে? আর কয়জন এই মতামত অনুযায়ী জীবনযাপন করে? কেউ-ই নয়। অথচ তারা এ ধরনের মতামতগুলোই খুঁজে খুঁজে বের করে মিডিয়াতে প্রচার করে। তারপর এই কয়েকটা মতামতের উপর ভিত্তি করে পুরো ধর্মবিশ্বাসকে হেয় প্রতিপন্ন করে।

এই ব্যক্তির চূড়ান্ত বক্তব্য হচ্ছে এ রকম – ‘তাদের ধর্মগ্রন্থ, নবীর জীবনী এবং ফিকাহর বইগুলো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টভাবে বুঝা যায় ইসলাম একটা বর্বর, অসভ্য এবং পশ্চাৎপদ ধর্ম। কারণ এই ধর্ম প্রাণীহত্যার মতো ন্যক্কারজনক কাজকর্মের প্রচার করে। তাই আমার বিশ্বাস, কোনো সুস্থ মস্তিস্কসম্পন্ন ও বুদ্ধিমান মানুষ এই ধর্মকে সত্য এবং সঠিক বলে মনে করবে না’।

আইয়ুব আলী
আইয়ুব আলী
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়নরত

আপনার মন্তব্য লিখুন