ইসলামী চিন্তার সংস্কার: বিচ্যুতি, প্রগতি, নাকি সময়ের দাবি? (প্রথম অংশ)

এডিটরস নোট:

ইসলামী চিন্তার সংস্কারের প্রসঙ্গ আসলে প্রায়শই একটা প্রশ্ন উত্থাপিত হয় – সংস্কারের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো বিবেচনাযোগ্য, আর কোনগুলো অপরিবর্তনীয়? এক্ষেত্রে অতি উদার কেউ কেউ শরীয়াহর খোলনলচে পাল্টে ফেলতে চান, আবার অতি রক্ষণশীল কেউ কেউ মনে করেন ইসলামে সংস্কারের কোনো ধরনের সুযোগ নেই। এই দুই প্রান্তিক অবস্থানের বাইরে সঠিক পথ কী হতে পারে?

২০১৪ সালের নভেম্বরে লন্ডনে প্রদত্ত দীর্ঘ দেড় ঘণ্টার এক বক্তৃতায় ড. ইয়াসির ক্বাদী এ ব্যাপারে গভীর পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন। তিনি ইসলামী চিন্তার প্যারাডাইমগুলোকে প্রধান পাঁচটি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন। প্রতিটি প্যারাডাইমের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়ার পর সেগুলোকে বিশ্লেষণ করেছেন। তারপর ইসলামী চিন্তার সংস্কারের ব্যাপারে তাঁর মতামতগুলো তুলে ধরেছেন। একটি গল্পের আশ্রয় নিয়ে পুরো বিষয়টিকে তিনি চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন।

আলোচনা শেষে আরো প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কথা বলেন। দীর্ঘ আলোচনার পরেও শ্রোতাদের কাছে যেসব বিষয় অস্পষ্ট রয়ে গিয়েছিল, প্রশ্নোত্তর পর্বে সেগুলো দূর হয়েছে বলা যায়।

ইসলাম নিয়ে যারা সত্যিকার অর্থে ভাবেন, সময়ের সংকটগুলোর পথ খুঁজেন, তারা এই বক্তব্য থেকে উপকৃত হবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য বক্তব্যটি অনুবাদ করেছেন আইয়ুব আলী।

*****

ভূমিকা

السلام عليكم ورحمة الله وبركاته، الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله ، وعلى آله وصحبه ومن والاه ، أما بعد

আজকের আলোচ্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়টি নিয়ে প্রত্যেকেরই ভাবা উচিত বলে আমি মনে করি। পাশ্চাত্যে মুসলমানরা যেসব ইস্যু মোকাবেলা করছে, সেসব মূলত একটা বিষয়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। সেটা হলো, আধুনিক লাইফস্টাইল ও আধুনিকতার প্রেক্ষাপটে ইসলামী ধর্মতত্ত্ব ও আইন কীভাবে প্রয়োগ করা হবে। আমি মনে করি, এটা কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়। বরং এটাই এখন আমাদের জন্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা, অন্ততপক্ষে অন্যতম বড় সমস্যা।

আরেকটু সহজ করে বলতে গেলে, চৌদ্দশ বছরের পুরানো একটা ধর্মের শিক্ষা মোতাবেক আমরা কীভাবে আমাদের জীবন পরিচালনা করব, যেখানে আমরা একবিংশ শতাব্দীর মানবতাবাদী ও লিবারেল মূল্যবোধসম্পন্ন গণতান্ত্রিক সমাজে বাস করছি। পাশ্চাত্যের এই সমাজ যে কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিদ্যমান প্রভাবশালী সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের কী কী এবং কতটুকু গ্রহণ করব, সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।

এই গ্রহণ-বর্জনের বিষয়টি নিয়ে প্রত্যেক সচেতন মুসলমানেরই চিন্তাভাবনা করা উচিত। একটা উদাহরণ দেই। অবশ্য এটা একটা বিতর্কিত বিষয়। তাই আশা করব, আপনারা একে ফিকাহর দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে নিছক উদাহরণ হিসেবেই দেখবেন। সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া ‘হ্যাপি মুসলিম ভিডিও’ বেশ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ভিডিওটি হালাল নাকি হারাম আমি সে বিতর্কে যাচ্ছি না। এটি যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, আমি আপনাদেরকে শুধু সেদিকে দৃষ্টি দিতে বলব। অনেক মুসলমান ভিডিওটির ব্যাপারে তাদের বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। আবার অনেকেই এতে কোনো সমস্যা খুঁজে পাননি।

ভিডিওটির ফিকহী বা আইনী ব্যাখ্যা আমাদের মনোযোগের বিষয় নয়। এটা একটা বড় সমস্যার প্রতীকী উদাহরণ মাত্র। অর্থাৎ, আমরা কতটুকু পর্যন্ত গ্রহণ বা বর্জন করব, সেটা হলো মূল ব্যাপার। ভিডিওটিতে যা পারফর্ম করা হয়েছে, আমরা সবাই মিলে যদি তা করি – তাহলেই কি তা হালাল কিংবা হারাম বলে গণ্য হবে? এটাই হচ্ছে মূল প্রশ্ন।

ইউনাইটেড কিংডম অব ভেগানোপোলিসের গল্প

একটি দীর্ঘ উপকথা দিয়ে আজকের আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছি। উপকথাটির দৃশ্যপট সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এটি নিছক একটি উপকথা হলেও আসলে ততটা অবাস্তব নয়। আমি যে চিত্রকল্প ও বাস্তবতা তুলে ধরবো, কয়েক দশক পর তা বাস্তবে ঘটতেও পারে। যাইহোক, গল্পটি শুরু করছি।

ইউনাইটেড কিংডম অব ভেগানোপোলিস (ইউকেভি) নামে একটি ভবিষ্যত দেশের কথা কল্পনা করি। দেশটির সবাই ভেজিটেরিয়ান। প্রাণীর মাংস এবং এ থেকে উৎপাদিত যে কোনো প্রকার খাদ্য গ্রহণকে তারা বর্বরতা বলে মনে করে। তাদের মতে, প্রাণী হত্যা একটি নিষ্ঠুর কাজ। এটা এক ধরনের রক্তচোষা প্রবণতা। স্রেফ মাংস, চামড়া, চোখ ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্যে পশু লালন-পালন এবং ‘হত্যা’ করাকে তারা অন্যায় মনে করে।

আরেকটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে –আক্ষরিক অর্থেই তারা নিজেদেরকে পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বোৎকৃষ্ট সমাজ বলে দাবি করে। এ ব্যাপারে ইউকেভির অধিবাসীদের যুক্তি হচ্ছে – আমরা এমন একটি জাতি যারা মাংস খাওয়ার মতো আদিম প্রথা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি।

এই যুক্তিটি তাদের মাঝে এক ধরনের দাম্ভিকতা তৈরি করে। ফলে তারা আশেপাশের মাংসভোজী সমাজ ও সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা ও ঘৃণার চোখে দেখে থাকে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে – ‘তোমরা কীভাবে প্রাণী হত্যার মতো এত নিষ্ঠুর, পশ্চাৎপদ ও অসভ্য কাজ করতে পার? তোমরা কি দেখো না, কীভাবে জবাই করা প্রাণীর রক্তের স্রোত বয়ে যায়! তারপরও কীভাবে তোমরা সেই প্রাণীর মাংস খাও? এ থেকেই বুঝা যায়, তোমরা খুবই পশ্চাৎপদ ও অসভ্য একটা জাতি।’

ইউকেভির বৈদেশিক নীতি

নিজেদের এই ‘মূল্যবোধ’ অন্যান্য দেশের উপর চাপিয়ে দেওয়াই ইউকেভির মুখ্য বৈদেশিক নীতি। এই মূল্যবোধ তাদেরকে এত বেশি আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, তাদের বন্ধুভাবাপন্ন অন্যান্য ভেজিটেরিয়ান দেশগুলোর উপরও তারা কর্তৃত্ব ফলাতে চায়। ফলে তারা অন্যান্য দেশের উপর অবরোধ আরোপ করে, এমনকি আগ্রাসনও চালায়। এর পক্ষে তাদের যুক্তি হলো – আমরা এই ‘পিছিয়ে পড়া’ জনগোষ্ঠীর মাঝে ভেগানিজমকে ছড়িয়ে দিতে চাই। এসব দেশের জনগণ এখনো মাংস খাওয়া ছাড়তে পারেনি। অন্যদিকে, আমরা এমন একটি সুসভ্য জাতি যারা নিরামিষভোজী হিসেবে নিজেদেরকে উন্নীত করেছি। অন্যান্য দেশ নিশ্চয় একে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করবে। ভেগানিজমের প্রচার-প্রসারকে সেসব দেশের বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ ও শুভবোধসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ নিশ্চয় স্বাগত জানাবে।

এককথায়, তাদের সত্যিকার উদ্দেশ্য হচ্ছে অন্যান্য দেশের লোকদেরকে জোরপূর্বক ভেগানিজমের আদর্শ গ্রহণে বাধ্য করা।

কাহিনীটি যদিও কাল্পনিক তবুও এর প্রেক্ষাপট খুব বেশি অবাস্তব নয়। কারণ, এখনই অনেকে প্রাণী অধিকার রক্ষায় সচেতন হয়ে উঠছেন। ভেগান মুভমেন্টও একইভাবে প্রসার লাভ করেছে।

প্রথম প্রজন্মের মুসলিম অভিবাসী

এবার ইউকেভির মুসলমানদের কথা ভাবা যাক। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিশর এবং টিম্বাকটুসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলমানরা ইউকেভিতে এসেছে। তারা সবাই শুরুতে জীবিকার তাগিদে শ্রমিক হিসেবে অভিবাসী হয়েছে। কিন্তু তাদের সন্তান ও নাতিপুতিরা বেশ আরামেই এখানে বসবাস করছে। তারা এখানকার অধিবাসীদের ভাষায় কথা বলে, একই প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করে এবং ইউকেভির সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও দর্শনকে পুরোপুরি গ্রহণ করে নিয়েছে।

এখন প্রশ্ন জাগে, মুসলিম সংস্কৃতি তো নিরামিষভোজী হওয়ার কথা বলে না। যে কারণে প্রথম প্রজন্মের মুসলিম অভিবাসীরা ভেগানিজম সম্পর্কে সচেতন ছিল। তারা মাংস খেতো। যার ফলে তারা সমাজের প্রভাবশালী সংস্কৃতির মধ্যে বিলীন হয়ে যায়নি। তো, ইউকেভির মুসলমানদের ব্যাপারে আপনার ভাবনা কী? ভেগানিজম প্রভাবিত সমাজের প্রভাবশালী সংস্কৃতির ব্যাপারে তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল বলে আপনি মনে করেন?

মুসলমানদের প্রতিক্রিয়ার পাঁচটি ধারা

কোনো মুসলিম দেশে ভেগানিজমের উৎপত্তি হয়নি। ইউকেভিতেই এর উৎপত্তি এবং সেখানে এটি খুব জনপ্রিয়। ফলে অভিবাসী মুসলমানদের জন্যে এই অভিজ্ঞতা নতুন। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে বলে আপনার মনে হয়? আমরা খুব সহজেই ধারণা করতে পারি – এ ব্যাপারে সব মুসলমানের প্রতিক্রিয়া একই রকম নয়, বরং মিশ্র। তাই না?

গল্পের সুবিধার্থে মুসলমানদের প্রতিক্রিয়াগুলোকে আমি পাঁচটি ভাগে বিশ্লেষণ করতে চাই। অর্থাৎ ভেগানিজম ইস্যুটি নিয়ে ইউকেভিতে বসবাসকারী মুসলমানদের তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম প্রজন্মগুলো মোটামুটিভাবে পাঁচটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এ দলের সংখ্যা আরো বেশিও হতে পারে, তবে আমি শুধু পাঁচটি প্রধান ধারাকে আলোচনায় রাখছি।

ধর্মত্যাগী ধারা

অবশ্যম্ভাবীভাবে কিছু মুসলমান ভেগানিজমের আদর্শ দ্বারা পুরোপুরি কনভিন্সড হয়ে পড়ে। তারা মনে করে, ভেগানিজমই হচ্ছে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একমাত্র লাইফস্টাইল। তারপর যখন তারা খেয়াল করে, ইসলামী ট্র্যাডিশনে প্রাণীর মাংস খাওয়ার সুস্পষ্ট বৈধতা রয়েছে, তখন পূর্বপুরুষের সংস্কৃতি ও ধর্ম পুরোপুরি ত্যাগ করা ব্যতীত অন্য কোনো বিকল্প তারা দেখে না। কারণ, ততদিনে তারা ইউকেভির প্রভাবশালী সংস্কৃতির মধ্যে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে।

প্রচলিত ব্যবস্থা

মুসলমানদের এই গ্রুপটি প্রচলিত ব্যবস্থাকে আক্ষরিক অর্থেই গ্রহণ করে নিয়েছে। তারা ইউকেভি সমাজের মূল্যবোধ, আদর্শ ও সংস্কৃতিকে সঠিক মনে করে। তারা এটাও বুঝে, তাদের ধর্ম এই সমাজের মূল্যবোধের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাই তারা বলে – ‘আমি আর মুসলমান থাকতে পারছি না। আমি নিজেকে এই প্রভাবশালী সংস্কৃতির একজন হিসেবেই মনে করি।’

পপুলিজম

তাদের অনেকে চুপিচুপি ইসলাম থেকে সরে গেছে। তারা ইসলামের শিক্ষাগুলো এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে এবং মসজিদে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আপনি হয়তো লোকমুখে তাদের ব্যাপারে শুনে থাকবেন, অমুক এখন আর ইসলামের বিধিবিধান পালন করছে না। তারা এখন প্রচলিত সংস্কৃতিতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। তাদের কেউ কেউ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে বেশ পরিচিত।

ইসলামের সমালোচনা

তারা মিডিয়াতে পূর্বপুরুষের সংস্কৃতির সমালোচনা করে থাকে। এভাবে তারা ইসলামের সমালোচকে পরিণত হয়। তারা বলে থাকে, ‘আমি মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু আমার পরিবারের লোকজন মাংস খায়। তাই আমি এখন আর তাদের সাথে নেই।’

চলুন দেখা যাক, এই ধরনের ব্যক্তি আরো কী কী করতে পারে। এই ধরনের ব্যক্তি বিখ্যাত ও ধনী হয়ে ওঠবে, বই বেরুবে, টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাক পড়বে। কারণ, তিনি প্রচলিত সংস্কৃতিকে সঠিক হিসেবে তুলে ধরেন। এরই সাথে তিনি বলে বেড়ান – ‘আমি আমার বাপ-দাদার ধর্ম ও সংস্কৃতিকে ত্যাগ করেছি।’ তাই এ ধরনের লোকেরা সাধারণত মিডিয়ার কাছে পোস্টার-চাইল্ড ও ডার্লিং-বয় হিসেবে খাতির পায়। মিডিয়া এইসব লোকদের খুব পছন্দ করে।

বিচ্ছিন্ন রেফারেন্স ব্যবহার  

তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি, এই ধরনের ব্যক্তি তার সাবেক মুসলিম পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের সমালোচনা করার মাধ্যমে প্রাচুর্য ও খ্যাতি অর্জন করেছে। তো এই ব্যক্তির সম্ভাব্য আরো কী বক্তব্য থাকতে পারে? তিনি এ রকমও বলতে পারেন, ‘আমি কোরআন ও সুন্নাহ নিয়ে পড়াশোনা করে দেখেছি কোরআন স্পষ্টভাবেই গোশত খাওয়াকে অনুমোদন করেছে। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।’ তারপর প্রমাণ হিসেবে কোরআনের আয়াত হয়তো পড়ে শোনাবেন, যেখানে আল্লাহ বলেছেন,

 أُحِلَّتْ لَكُم بَهِيمَةُ ٱلْأَنْعَـٰمِ

তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে (সূরা মায়েদা: ১)

তিনি কোরআন থেকে হয়তো আরো উদ্ধৃতি দিবেন। তারপর এসব আয়াতের উপর নিজের মনগড়া ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিবেন। একটি সরল ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ আয়াতকে তিনি তার পক্ষপাতদুষ্ট পূর্বানুমানের সাথে প্রতীকী অর্থে পাঠ করবেন, যা সংশ্লিষ্ট আয়াতে আদতেই নেই। এভাবে তিনি একেকটি আয়াতকে ক্রমাগত নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করতে থাকেন। যেমন, তিনি বলতে পারেন – ‘প্রাণীদেরকে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে জবাই করার ব্যাপারে কোরআন উৎসাহিত করেছে।’ অথচ কোরআনের আয়াতটি প্রকৃতপক্ষে এ রকম:

فَاذْكُرُ‌وا اسْمَ اللَّـهِ عَلَيْهَا صَوَافَّ ۖ فَإِذَا وَجَبَتْ جُنُوبُهَا فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ‌

জবাই করার সময় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো অবস্থায় তাদের উপর তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো তারপর তারা যখন ঢলে পড়ে যায় তখন তা থেকে তোমরা খাও এবং ধৈর্যশীল অভাবগ্রস্ত ও সাহায্যপ্রাথী অভাবগ্রস্তকে খাওয়াও (সূরা হাজ্জ্ব: আয়াত ৩৬)

কিন্তু তিনি এই আয়াতের অপব্যখ্যা করে বলতে পারেন – ‘প্রাণীদেরকে একের পর এক সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে সবগুলোকে একসাথে জবাই করার ব্যাপারে কোরআন স্পষ্টভাবেই উৎসাহিত করেছে।’

পরিভাষাগতভাবে দেখলে তিনি হয়তো সঠিক। কিন্তু আয়াতটি পাঠ করলে তার উপস্থাপিত নাটকীয় বর্ণনা ও প্রতীকী অর্থ আমাদের চিন্তায় মোটেও আসে না। অথচ প্রচলিত সংস্কৃতি তার ব্যাখ্যাটাই গ্রহণ করে। তাদের দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী, প্রাণীদেরকে লাইনে দাঁড় করানো এবং একসাথে জবাই করা অত্যন্ত ‘বর্বর’ কাজ। আসলে তারা এভাবে ভাবতেই অভ্যস্ত।

এইসব ইসলামত্যাগীদের কেউ হয়ত আরো বলবেন – “আমি ‘তাদের’ নবীর জীবনী পড়েছি। ফলে আমার কাছে এটা পরিষ্কার যে, তিনি নরমাংস খেতেন। তাদের অন্যতম একটি ধর্মগ্রন্থ সহীহ বুখারী থেকে আমরা জেনেছি, মোহাম্মদের প্রিয় খাবার ছিল ভেড়ার পায়ের নলি।”

তারপর তিনি হয়ত বলবেন – ‘মাংস কীভাবে ঈশ্বর প্রেরিত একজন সত্য নবীর প্রিয় খাবার হতে পারে? এটা কীভাবে সম্ভব! তারমানে এই নবী ঈশ্বর মনোনীত ছিল না।’

সবশেষে তিনি উপসংহার টানবেন – ‘ইসলাম প্রাণী হত্যাকে উৎসাহিত করে। তাদের ধর্মীয় উৎসব (যেমন – ঈদুল আজহা) মূলত প্রাণী হত্যার উৎসব। তাদের অনুষ্ঠানগুলো হাজার হাজার ভেড়া-বকরি জবাই করার উপলক্ষ্য ছাড়া আর কিছুই নয় এবং এটা নাকি তাদের উৎসব! আকিকা ও ওয়ালিমাসহ যে কোনো আনন্দঘন ঘটনায় তাদের ধর্ম তাদেরকে কী করতে বলে? – যাও, গরু-ছাগল-ভেড়া জবাই করো, এদের হত্যা করো।

মনগড়া ব্যাখ্যা

সাদামাটা ব্যাপারগুলোকে এ ধরনের ব্যক্তি যে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, সেভাবে আগে কেউ কখনো ভাবেনি। এর কারণ হচ্ছে সমাজের প্রভাবশালী ন্যারেটিভ বা প্রচলিত সংস্কৃতি ভেগানিজমকে গ্রহণ করে নিয়েছে। তাই এই ব্যক্তিটির নিকট ইসলামের এই সবকিছুই  ‘খারাপ’ ও ‘বর্বরতা’ বলে মনে হয়।

ব্যক্তিটি যদিও কোরআন ও হাদীসের সঠিক উদ্ধৃতি দিচ্ছে; কিন্তু সেই সাথে এসব উদ্ধৃতির প্রতীকী অর্থ আবিষ্কার করে এগুলোকে এমন অশুভ ও ভয়ংকর হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে যা কোনোভাবেই আমাদের কল্পনায়ও আসেনি। এমনকি ইউনাইটেড কিংডম অব ভেগানোপোলিশে জন্মগ্রহণকারী ছাড়া অন্য কারো চিন্তায়ও এসব আসার কথা নয়।

উদ্ভট ফিকহী মতামতের উদ্ধৃতি

তাদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে অভিজ্ঞ লোকেরা এমনসব ফিকহী মতামতের উদ্বৃতি দেয় যেগুলো অধিকাংশ মুসলমানেরই অজানা। এইসব মতামত মুসলমানরা কখনো শোনেনি। তারা এই উদ্ভট মতামতগুলোই ফিকাহর গ্রন্থগুলো থেকে খুঁজে খুঁজে বের করে। তারা সেগুলোকে হয়তো সঠিকভাবেই উদ্ধৃত করে, কিন্তু আসল কথা হচ্ছে এই সমস্ত বিচ্ছিন্ন মতামত এখনকার ইসলামী সমাজে প্রচলিত নেই। হয়তো হাজার বছর আগে কিছু মানুষ সেগুলো অনুসরণ করতো।

তারা এভাবে বলে – ‘আরে, মুসলমানরা তো খুবই অসভ্য! তুমি জানো না, তাদের হাম্বলী মাজহাব তো বন্য কুকুর এবং শিয়াল খাওয়া জায়েজ করেছে! গরু-ভেড়া না হয় বাদ দিলাম, তাই বলে বন্য কুকুর আর শিয়াল! আর তুমি কি এটা জানো, তাদের মুহাদ্দিসরা মরুভূমির টিকটিকি খাওয়াকেও জায়েজ মনে করে! আর মালিকী মাজহাব কি বলেছে, তাও শুনে রাখো। তারা বলেছে, তুমি চাইলে কুকুর-বেড়ালও খেতে পারো। এগুলো হারাম নয়। আর কিছু আলেম তো শুকর ছাড়া সবকিছু খাওয়া জায়েজ মনে করে। অর্থাৎ তুমি চাইলে ইদুর, সাপ, টিকটিকি, বিচ্ছু – এইসবও খেতে পারো।’

মাজহাবগুলোর কোনো কোনো আলেম এগুলোকে জায়েজ মনে করেছেন – এটা সত্য। কিন্তু কয়জন এইসব মতামত জীবনে একবার হলেও শুনেছে? আর কয়জন এই মতামত অনুযায়ী জীবনযাপন করে? কেউ-ই নয়। অথচ তারা এ ধরনের মতামতগুলোই খুঁজে খুঁজে বের করে মিডিয়াতে প্রচার করে। তারপর এই কয়েকটা মতামতের উপর ভিত্তি করে পুরো ধর্মবিশ্বাসকে হেয় প্রতিপন্ন করে।

এই ব্যক্তির চূড়ান্ত বক্তব্য হচ্ছে এ রকম – ‘তাদের ধর্মগ্রন্থ, নবীর জীবনী এবং ফিকাহর বইগুলো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টভাবে বুঝা যায় ইসলাম একটা বর্বর, অসভ্য এবং পশ্চাৎপদ ধর্ম। কারণ এই ধর্ম প্রাণীহত্যার মতো ন্যক্কারজনক কাজকর্মের প্রচার করে। তাই আমার বিশ্বাস, কোনো সুস্থ মস্তিস্কসম্পন্ন ও বুদ্ধিমান মানুষ এই ধর্মকে সত্য এবং সঠিক বলে মনে করবে না’।

আপসকামী ধারা

এই ধারার ব্যক্তিরা তাদের ইসলামী আইডেন্টিটি টিকিয়ে রাখার জন্যে সদাসর্বদা সচেষ্ট। অথচ প্রথম দলটি তাদের ইসলামী আইডেন্টিটি ইতোমধ্যেই ত্যাগ করেছে। দ্বিতীয় দলটি আপসকামী। তারা মনে করে, সমাজের ডমিন্যান্ট ন্যারেটিভ অর্থাৎ ভেগানিজম হচ্ছে একমাত্র নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোড অব ল। আবার একইসাথে তারা নিজেদেরকে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেয়। তারা প্রকাশ্যেই বলে, ‘আমরা পবিত্র কোরআন ও নবী মোহাম্মদের (সা) উপর বিশ্বাস রাখি।’

কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব? কোরআন স্পষ্টভাবেই মাংস খাওয়াকে অনুমোদন করেছে। অথচ আপসকামীরা মনে করে, এটা একটা জঘন্য, পশ্চাৎপদ এবং অসভ্য কাজ। তাহলে তারা কীভাবে কোরআন ও নবীর (সা) উপর বিশ্বাস রাখে? কীভাবে তারা মুসলিম থাকে?

হাদীস অস্বীকার

এই দলটি বিশেষ কোনো জনপ্রিয় ভাষ্য বা স্থানিক প্রথা দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে অজান্তেই নিজেদের মূল্যবোধ পরিবর্তন করে ফেলে। এই বিকৃত আদর্শ ও নৈতিকতাকে তারা কোরআন ও ইসলামী ঐতিহ্যের উপর চাপিয়ে দিতে চায়। এরা সাধারণত হাদীস প্রত্যাখ্যান করে। ‘হাদীসকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। তাই শুধু কোরআন নিয়েই আমাদের ভাবতে হবে’ – এটি তাদের বক্তব্য।

মাংস নিষিদ্ধ করাই শরীয়াহর উদ্দেশ্য

মাংস খাওয়ার অনুমোদন সম্পর্কে তাদের বক্তব্য হলো – ‘এটা সত্য যে অতীতের কিছু আলেম এ সংক্রান্ত কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, কোরআন মাংস খাওয়াকে উৎসাহিত করে। কিন্তু আপনি যদি ইসলামের স্পিরিট বা শরীয়াহর উদ্দেশ্যের দিকে খেয়াল করেন তাহলে দেখবেন, মাংস খাওয়াকে পুরোপুরি বর্জন করাই ছিল শরীয়াহর উদ্দেশ্য। কিন্তু মানুষ মাংস খেতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে শরীয়াহ তা নিষিদ্ধ করতে পারেনি। তবে শরীয়াহ আমাদেরকে কিছু উপায় বাতলে দিয়েছে, যার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে মাংস খাওয়াটা এক ধরনের পশ্চাৎপদতা। বর্তমানে আমরা ভেগানোপোলিস রাষ্ট্রে বসবাস করছি। তাই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে বলা যায়, আমাদেরকে ভেগানিজম গ্রহণ করা উচিত। এটা ইসলামী আইনেরও দাবি! এ আইন মাংস খাওয়াকে হারাম গণ্য করে!’

পিক অ্যান্ড চ্যুজ ফ্যালাসি

তারা আরো বলে – ‘নবীজীর (সা) সীরাত থেকে এটা পরিস্কার যে, তিনি কদাচিৎ মাংস খেতেন।’

এটা ঠিক, মহানবী (সা) কদাচিৎ মাংস খেতেন। কিন্তু এই দলটি সাধারণত হাদীস অস্বীকার করে থাকে। তারপরেও নিজেদের সুবিধামতো দুয়েকটা হাদীস তারা ঠিকই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে। একে বলা হয় পিক অ্যান্ড চ্যুজ ফ্যালাসি বা একপেশে নীতি। তারপর এই রেফারেন্সকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করে, যার সাথে মূল বিষয়ের অর্থগত সম্পর্ক নেই। যেমন তারা বলে, ‘মহানবীর (সা) স্ত্রী আয়েশা (রা) বলেছেন, তাদের চুলায় তিন মাস পর্যন্ত আগুন জ্বলেনি। তারমানে, কোনো মাংসও রান্না হয়নি!’

মহানবী (সা) ভেগান ছিলেন!

এরপর তারা হয়তো বলবে, ‘এখন কেউ বলতেই পারে, এই ঘটনার মানে হলো মহানবী (সা) ভেগান ছিলেন। আসলে ভেগান হওয়াই ছিল ইসলামের স্পিরিট। এটা ঠিক, তিনি কদাচিৎ মাংস খেতেন। তবে এর পেছনে  তখনকার রীতিনীতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়াই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। তাই আদর্শ হিসেবে বা দৈনন্দিন জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আমাদের ভেগান হওয়াই উচিত।’

উটের অভিযোগ

তারা হয়তো এমনটাও বলতে পারে, ‘তখনকার সমাজে নানা ধরনের প্রথা বা রীতিনীতি থাকতেই পারে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তাঁকে রহমাতাল্লিল আলামীন তথা বিশ্বজগতের জন্যে রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন’।

এখানে তারা আরেকটি কৌশল অবলম্বন করেছে। নির্দিষ্ট কোনো বিষয়কে নিজেদের অনুকুলে নেওয়ার জন্য সেটির ব্যাপক অর্থের পরিবর্তে তারা বিশেষ কোনো অর্থকে গ্রহণ করে।

আমরা জানি, কোরআনে মহানবীকে (সা) বিশ্বজগতের জন্যে রহমত হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, হাদীসের সূত্রে একটি উট কর্তৃক তার মালিকের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহার করার অভিযোগের ঘটনা আমরা জানি। সহীহ বুখারীর বর্ণনায় রয়েছে – ‘একবার একটি উট মহানবীর (সা) কাছে এসে অভিযোগ করলো, আমার মালিক আমাকে সাধ্যের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করায়, কিন্তু অনেক কম খাবার দেয়।’ আরেকটি হাদীসে এসেছে, উটটির অভিযোগ ছিল – ‘আমার মালিক আমাকে প্রহার করে’। এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে মহানবী (সা) উটটির মালিককে তিরস্কার করেন।

এখন আপসকামী দলটি এই উদাহরণ দেখিয়ে বলবে, ‘যিনি বিশ্বজগতের জন্যে রহমত, যিনি উটকে প্রহার না করতে তার মালিককে নির্দেশ দিয়েছেন, অতিরিক্ত কাজ করাতে নিষেধ করেছেন; সেই দয়ালু নবী স্বীয় অনুসারীদেরকে ঈদের দিন রক্তপিপাসু হতে বলবেন, অধীনস্ত পশুদেরকে হত্যা করার কথা বলবেন – এমনটা আপনি কীভাবে ভাবতে পারেন! এটাই কি সেই ইসলাম, যা মহানবী (সা) নিয়ে এসেছিলেন! স্পষ্টতই এটা ভুল চিন্তা। কারণ তিনি তো রহমাতাল্লিল আলামীন! তাই ঈদের দিন পশু জবাই করাটা একটা অসঙ্গত কাজ। এ ধরনের কিছু ইসলামে নেই। আমরা মুসলমানরা হচ্ছি ভেগান। ইসলাম আমাদেরকে ভেগানই হতে বলে।’

এই দলের কৌশল হচ্ছে কোরআন-হাদীস থেকে শুধু সেই দলীলগুলোই গ্রহণ করা যেগুলো তাদের মানদণ্ডের সাথে খাপ খায়। স্পষ্টতই তাদের নিজস্ব মানদণ্ডের আলোকে তারা কোরআন ও সুন্নাহ পাঠ করে। কোনো বিষয়ে কোরআন প্রকৃতপক্ষে কী বলেছে, সেটা নিয়ে তাদের চিন্তা নেই। বরং তাদের মতামতই তারা কোরআনের উপর চাপিয়ে দেয়।

রক্ষণশীল ধারা

আমাদের মসজিদগুলোর মুসুল্লীদের অধিকাংশই রক্ষণশীল ধারার। দেশের প্র্যাকটিসিং মুসলমানদের বেশিরভাগই এই ধারার অনুসারী। এই দলটি পূর্বপুরুষের মাংস খাওয়ার ঐতিহ্যকে রক্ষা করে চলে এবং একে রীতিমতো আইনসিদ্ধ করার চেষ্টা করে। প্রচলিত বিরুদ্ধ সংস্কৃতি মাংস খাওয়াকে নিষিদ্ধ গণ্য করায় এই দলের কেউ কেউ একে মুসলমান হওয়ার অন্যতম পূর্বশর্ত বানিয়ে নিয়েছে।

ধর্মবাদিতা

তারা মনে করে, ‘একজন ভালো মুসলমান হতে হলে আপনাকে অবশ্যই মাংস খেতে হবে।’ এমনকি কোনো মুসলমান ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণে মাংস না খেলে তারা তাকে খুবই অবজ্ঞার চোখে দেখে – ‘হায়, তোমার আত্মা তো মরে গেছে! তুমি তো এখন প্রচলিত ভেগান সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছো! কারণ তুমি মাংস খাও না। অথচ আমাদের পূর্বপুরুষরা মাংস খেতেন!’

ধর্মীয় প্রথা হিসেবে মাংস খাওয়া

এই ধরনের রক্ষণশীল ধারার মুসলমানদের নিকট মাংস খাওয়া ধর্মীয় প্রথার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতেও এর এত গুরুত্ব নেই। মাংস খাওয়াকে তারা ভালো মুসলমানের পরিচায়ক বলে মনে করে। কারণ, আপনি হলেন অমুসলিম সংস্কৃতি তথা প্রচলিত সংস্কৃতির বিরোধী লোক।

সেই কারণে আপনি খেয়াল করলে দেখবেন, এই রক্ষণশীল ধারার মুসলমানরা যে কোনো অনুষ্ঠানে তাদের মাংস খাওয়ার অভ্যাসকে প্রতীকে পরিণত করে।

বিভিন্ন উপধারা

এই ধারার মুসলমানদের পূর্বপুরুষরা কোন অঞ্চল থেকে এসেছিল, তার উপর ভিত্তি করে এদের মধ্যে বিভিন্ন উপধারা তৈরি হয়। এক দল বিরিয়ানীকে প্রাধান্য দেয়, তো আরেক দলের পছন্দ শর্মা। অন্যদিকে, আরেক দল এসে বলে, ‘অবশ্যই সেদ্ধ চাল এবং বাদাম ও কিশমিশ দিয়ে ভেড়ার মাংস রান্না হতে হবে।’ এরইমধ্যে আরো এক দলের দাবি হচ্ছে, ‘অবশ্যই মুরগী দিয়ে কুচ কুচ রান্না করতে হবে।

উল্লেখ্য, ভেগানরা নিরামিষভোজী হওয়া সত্বেও ইউকেভিতে মাছ খেতে কোনো বাধা নেই। এ কারণে ফিশ অ্যান্ড চিপস খাওয়াকে এই উপদলগুলোর কোনোটিই বরদাশত করে না। তাদের বক্তব্য হলো – ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা ফিশ অ্যান্ড চিপস খেতো না। এর বদলে আমাদেরকে বিরিয়ানী খেতে হবে।’ আরেক গ্রুপ ‘রুজদে জাজ’র কথা বলবে। তখন অন্য আরেক গ্রুপ এসে হয়তো বলবে, ‘না, শর্মাই খেতে হবে।’ কিন্তু কোনো গ্রুপই ফিশ অ্যান্ড চিপস খাওয়ার কথা বলবে না। কারণ, এর মানে হচ্ছে আপনি বিপথে চলে গেলেন!

এই বিশেষ বিশেষ খাবারগুলো স্ব স্ব উপধারার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে তারা পরস্পরবিরোধী হয়ে যায়। আমরা একে তুচ্ছ মনে করলেও ব্যাপারটাকে তারা অনেক বড় বানিয়ে ফেলেছে।

আপনি যদি শর্মার চেয়ে বিরিয়ানীকে প্রাধান্য দেন, তাহলে তারা আপনার সাথে তর্কযুদ্ধে লিপ্ত হবে, আপনাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করার চেষ্টা করবে। এমনকি এর ফলে তারা নামাজ পড়তে আলাদা মসজিদে পর্যন্ত চলে যেতে পারে। কারণ, তাদের পূর্বপুরুষরা যেভাবে ইসলাম পালন করেছে, তার সাথে আপনারটা মিলে না। এভাবে রক্ষণশীল ধারার প্রতিটি উপধারাই তাদের পূর্বপুরুষদের সংস্কৃতিকে আপন মনে করে আঁকড়ে ধরে। এটাকেই তারা ইসলাম অনুসরণের একমাত্র পন্থা বলে মনে করে।

মাংস খাওয়া ভালো মুসলমানের পরিচয়

মাংস খাওয়াকে তারা এমনই তাৎপর্যপূর্ণ একটা ব্যাপারে পরিণত করেছে যে, এর উপর ভিত্তি করেই আপনি কতটকু ইসলাম পালন করেন, তা মূল্যায়ন করা হয়। এটা স্পষ্ট যে, এই ধারাটি প্রচলিত জনপ্রিয় সংস্কৃতির একটা পাল্টা প্রতিক্রিয়া মাত্র। এটাও বাস্তবতা যে, প্রচলিত সংস্কৃতির ব্যাপারে তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ মনোভাব থাকে। যদিও তাদের সন্তানেরা এখানেই জন্মগ্রহণ করেছে। হতে পারে তারা নিজেরাও এখানে জন্মগ্রহণ করেছে। তারপরেও তাদের অনেকে নিজেদেরকে ইউনাইটেড কিংডম অব ভেগানোপোলিসের সত্যিকারের নাগরিক পর্যন্ত মনে করে না।

বুদ্বুদের ভেতর বসবাস

এই মানুষগুলো দুইটি ভিন্ন জগতে বসবাস করে। তারা যখন দৈনন্দিন কাজকর্ম, চাকরি বা শপিংয়ের জন্যে কোথাও যায়; তখন তারা নিজেদের জগতের বাইরে ভ্ন্নি আরেকটা জগতে প্রবেশ করে। এর বিপরীতে, তাদের সামাজিক মেলামেশা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ সম্পূর্ণ আলাদা। আক্ষরিক অর্থেই তারা যেন একটা বুদ্বুদের ভেতর বাস করছে।

জেনারেশন গ্যাপের ভয়

আরো একটা ব্যাপার হচ্ছে, তাদের সন্তান ও নাতিপুতিদের অধিকাংশই এই বুদ্বুদের ভেতর আর বসবাস করতে চায় না। এটা নিয়ে তারা বেশ চিন্তিত। এ কারণে তাদের মতবিনিময় সভা কিংবা মসজিদগুলোতে বৃদ্ধ মানুষই বেশি অংশগ্রহণ করে। মোটকথা, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই রক্ষণশীল ধারাকে আর মেনে নিচ্ছে না। ফলে তারা বুঝতে পারছে, এটা একটা সমস্যা। কিন্তু এই সমস্যার কোনো সমাধান তাদের কাছে নেই।

কট্টরপন্থী ধারা

চতুর্থ দলকে আমরা কট্টরপন্থী ধারা বলতে পারি। এই দলটি ক্ষুদ্রতর হলেও মনমানসিকতায় উগ্রপন্থী। কারণ, বৃহত্তর সমাজ সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করে এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর উপর চড়াও হতে রাষ্ট্রকে অনুমোদন দিয়েছে। ফলে ইউকেভি একচোখা বৈদেশিক নীতি ও অন্যায় যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারছে এবং ভেগানিজম ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন মুসলিম দেশে আক্রমণ চালাচ্ছে।

এসবের ফলে তারা এত বেশি ক্রুদ্ধ হয়ে পড়ে যে, একপর্যায়ে তারা ভেগানবিরোধী কর্মকাণ্ড চালাতে শুরু করে। প্রচলিত সংস্কৃতির প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে গিয়ে তারা সবজির ফার্ম ধ্বংস করে ও প্রকাশ্যে শাকসবজিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। দলটি সর্বক্ষণ ‘আমরা বনাম তারা’ – এই মানসিকতা দ্বারা তাড়িত হয়।

এই লোকদের এসব কাজকর্ম প্রচার করতে মিডিয়া খুবই ভালোবাসে। না হলে আমরা হয়তো এই মানুষগুলোর কথা কখনোই জানতাম না। সংবাদমাধ্যমগুলো এই ক্ষুদ্র কট্টরপন্থী দলটির কাজকর্ম প্রচার করে উচ্ছ্বাসের সাথেই বলে, ‘এই হচ্ছে সব মুসলমানের বৈশিষ্ট্য’।

সংস্কারপন্হী ধারা

নয়া প্যারাডাইম

পঞ্চম অর্থাৎ শেষ ধারাটি হচ্ছে আধুনিকতাবাদী ধারা। ‘আধুনিকতাবাদী’ পরিভাষাটির ব্যাপারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকায়, এটি ব্যবহার করার কিছু বিপদ আছে। তবুও আমি এটি ব্যবহার করতে চাই। কারণ এরচেয়ে ভালো কোনো পরিভাষা আমার জানা নেই। আর হ্যা, এই ধারাটির ব্যাপারেই আমার সবচেয়ে বেশি দরদ রয়েছে।

এই ধারাটিকে সংস্কারপন্থী হিসেবে অভিহিত করা যায়। পূর্বে উল্লেখিত চারটি ধারা থেকেই এটি আলাদা। ইউকেভির প্রভাবশালী ভেগান সংস্কৃতি এবং রক্ষণশীল ধারার মুসলমান কর্তৃক ইসলামী আইনের বিশেষ ধরনের ব্যাখ্যা – এই দুটি বিষয়কেই সংস্কারপন্থীরা একটা ঐতিহাসিক ব্যাপার হিসেবে দেখে।

দুটি প্রশ্ন

সংস্কারপন্থীরা মূলত দুটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে:

এক) কেন এবং কীভাবে ভেগানিজম এত বেশি জনপ্রিয় হয়েছে? ভেগানিজমের সবকিছুই কি খারাপ কিংবা সবকিছুই কি ভালো? এখানে ভালো কী আছে, যা আমরা গ্রহণ করতে পারি? কিংবা, মন্দ কী আছে, যা আমাদের বর্জন করা দরকার?

দুই) ভেগানিজম সম্পর্কে ইসলামের সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য আছে কি? নাকি, এটা আধুনিক যুগের একটা ব্যাপার, যার উত্তর আমাদেরকেই খুঁজে বের করতে হবে?

এই ধারার অনুসারীরা বুঝতে পেরেছে, প্রাক-আধুনিক যুগে ভেগানিজম বলতে কিছু ছিল না। সেই কারণে ইসলামের চিরায়ত ঐতিহ্যে এ ব্যাপারে কিছু বলা নেই। কারণ অতীতের আলেমগণ কোনো ভেগান দেশে বাস করেননি। ফলে ইউকেভির মতো দেশের গতি-প্রকৃতি ও নীতি-নৈতিকতা সম্পর্কে তাদের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না।

ইসলামী ঐতিহ্যের প্রতি মনোভাব

সংস্কারপন্থীরা আপসকামীদের মতো ইসলামী ঐতিহ্যকে খারিজ করে না। আপসকামীরা নিজেদেরকে মুসলিম দাবি করলেও ‘চৌদ্দশ বছরের পুরনো’ হওয়ার অজুহাতে ইসলামী আইনকে অগ্রাহ্য করে। এর বিপরীতে ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই সংস্কারপন্থীরা মনে করে, ‘স্বভাবতই চিরায়ত ঐতিহ্যের পক্ষে আধুনিক ইস্যু নিয়ে কথা বলতে পারার কথা নয়। আধুনিক যুগের সমস্যাগুলোর যে ধরনের সমাধান দরকার, এটি তা পারে না। সে কারণে আমাদেরকে নতুন সমাধান বের করতে হবে। ঐতিহ্যকে বাতিল করে দিলে তো সমাধান হবে না। বরং চিরায়ত ঐতিহ্য ও বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে আধুনিক যুগের আলেমগণ ভেগানিজম সম্পর্কে মুসলিমদের অবস্থান নির্ণয় করবেন।’

উদার মানসিকতা

সংস্কারপন্থীরা ভেগানিজমকে যাচাই করে দেখতে আগ্রহী। ভেগান হওয়ার মাঝে ভালো কোনো দিক থাকতে পারে কিনা, সেই সম্ভাবনাও তারা যাচাই করেন। ‘ভেগান হওয়া কি অনৈসলামিক? একইসাথে একজন ভেগান ও ভালো মুসলমান হওয়া কি সম্ভব? কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ থেকে আসার পরিবর্তে ইউকেভিতে ভেগানিজমের উদ্ভব হওয়ার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কি একে মন্দ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে? এর মধ্যে কি কোনো ইতিবাচক দিক আছে, যা আমরা গ্রহণ করতে পারি?’

এই দলটি এ প্রশ্নগুলোর জবাব পেতে আগ্রহী, যে কারণে তারা অন্যান্য গ্রুপ থেকে আলাদা। ধর্মত্যাগী ও আপসকামী ধারা দুটি আধুনিক মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে, যাকে কোনো প্রকার প্রশ্ন করা যাবে না। অন্যদিকে, রক্ষণশীল ও কট্টরপন্থী – উভয় ধারাই প্রতিক্রিয়াশীল। তারা মনে করে, আধুনিক মূল্যবোধগুলো আদতেই খারাপ। তাই এগুলো বৈধ নাকি অবৈধ, তা যাচাই করাটাও অবান্তর। নিছক এগুলোর বৈধতা যাচাই করতে গেলেও তাদের দৃষ্টিতে আপনি মন্দলোক হিসেবে বিবেচিত হবেন।

উভয় পক্ষকেই প্রশ্ন করা

উল্লেখিত চারটি ধারার বিপরীতে সংস্কারপন্থীরা বলবে – “না, উভয় পক্ষকেই প্রশ্ন করতে হবে। প্রশ্নটা কী? আমরা প্রতিটি প্রভাবশালী ন্যারেটিভকে প্রশ্ন করি। এ ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ন্যারেটিভ হচ্ছে ভেগানিজম। আমরা কোরআন ও সুন্নাহকে প্রশ্ন করি না, আপসকামীরা যেমনটা করে থাকে। আমরা বরং ইসলামের গতানুগতিক বুঝজ্ঞানকেই (classical understanding) প্রশ্ন করি। বিশেষ করে রক্ষণশীল আলেমদের ‘বিধিবদ্ধ ইসলাম’কে (codified Islam) আমরা প্রশ্ন করি।”

টেক্সটুয়ালিটি এবং টেকনিক্যালিটি

‘হ্যা, নিশ্চিতভাবেই এটা সত্য – ইসলাম মোটাদাগে মাংস খাওয়ার পক্ষে। এটাও সত্য – মুসলিম সমাজের অনেকে বিরিয়ানী পছন্দ করে, আবার অনেকে শর্মা পছন্দ করে। কিন্তু ইসলাম কি সরাসরি আমাদেরকে বিরিয়ানী বা শর্মা খেতে বলেছে? এ ব্যাপারে কোরআন-হাদীস আমাদেরকে কী বলে?’ এভাবেই সংস্কারপন্থীরা প্রশ্ন করতে শুরু করে। অবশ্য অন্যদের জন্যে এটা বেশ অস্বস্তিকর ব্যাপার।

মূলকথা হচ্ছে, সংস্কারপন্থীরা কোনো ধরনের কমপ্লেক্সে ভোগেন না। ফলে ‘ভেগানিজম সর্বদা ভালো’ – এ ধরনের দাবি করার মানসিকতাও তাদের নেই। তারা প্রতিক্রিয়াশীলও নয়, আবেগপ্রবণও নয়। বরং তারা মনে করে, একজন ব্যক্তি মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও টেকনিক্যালি ভেগান হতে পারে। এটি তার খোদাভীতির ক্ষেত্রে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।

সকল ইসলামী স্কলার এই ব্যাপারে একমত যে, কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় মাংস না খেলে কিংবা মাংস খেতে অপছন্দ করলে, ইসলামের দৃষ্টিতে তা অন্যায় কিছু নয়। এর ফলে তাকে কেউ এ রকম বলতে পারে না যে, ‘এই ব্যক্তি হীনমন্য কিংবা ভালো মুসলমান নয়।’ তাই না?

কোনো সীমারেখা আছে কি?

কোনো ব্যক্তি যদি বলে, ‘মাংস খাওয়াটা পশ্চাৎপদ একটা ব্যাপার  হওয়া সত্বেও আল্লাহ কীভাবে এটা হালাল করলেন!’ এটা কি কোনো ধর্মতাত্ত্বিক সমস্যা? না, আপনি তা বলতে পারেন না। মনে করুন, কোনো একজন মুসলমান মাংস খেতে পছন্দ করে না; কিংবা ইউকেভির কথাই ধরুন, যেখানে মাংস খাওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ ইসলাম মাংস খাওয়াকে অনুমোদন করলেও সমাজ তা করে না – এমন পরিস্থিতিতে কেউ ভেগান হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও তিনি পুরোপুরি ইসলামী জীবনব্যবস্থার মধ্যেই থাকেন। তিনি কোনোভাবেই ইসলামকে ছোট করেন না। একদিকে, আধুনিক সংস্কৃতি তাকে মাংস খাওয়ার অনুমোদন দেয় না। অপরদিকে, একজন ভালো মুসলমান  হওয়ার জন্যে মাংস খেতেই হবে, এমন নয়।

সমন্বয়মূলক অবস্থান

কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংস্কারপন্থীরা রক্ষণশীলদের সাথে একমত পোষণ করে। যেমন – ইসলামের সাধারণ নীতি হচ্ছে মাংস খাওয়া হালাল। অন্যদিকে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা প্রগতিবাদীদের সাথেও একমত হন। যেমন – ভেগানিজমের কিছু ভালো দিকও থাকতে পারে। এমনকি সংস্কারপন্থীরা এমনটাও বলতে পারে – ‘কসাইখানায় পশুদের সাথে এমনকিছু আচরণ করা হয়, যা ইসলামের দৃষ্টিতেও অন্যায়। কোনো প্রাণীকে অন্য প্রাণীর সামনে জবাই করা উচিত নয়, প্রাণীদের সাথে খারাপ আচরণ করা উচিত নয়, তাদেরকে আজেবাজে খাবার খাওয়ানো ঠিক নয়। প্রাণীদের ব্যাপারে এইসব সুস্পষ্ট বিধান ইসলাম আমাদেরকে পালন করতে বলেছে।’

এসব বিধানের কথা কেউ বললে প্রচলিত সংস্কৃতি তাকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারে – এই আশংকাটাও ঠিক নয়। আবার, মাংস খাওয়ার ব্যাপারে ইসলামের বক্তব্য তুলে ধরার পর কেউ যুক্তি দিতে পারে, আসলে মাংস কম খাওয়াই স্বাস্থ্যসম্মত। আমাদের সময়ের প্রচলিত সংস্কৃতিতে এমনটাই বলা হয়ে থাকে। তাই না? এমতাবস্থায় সংস্কারপন্থীরা বলতে পারে – ‘আপনি কি জানেন, ইসলাম অনুযায়ী আপনি নিজের ব্যাপারে যত্ম নিতে বাধ্য? তাই আমাদের মাংস কম খাওয়া উচিত। আর ইসলামের নির্দেশনা মোতাবেক পশু-প্রাণীদের সাথে আমাদের আরো ভালো ব্যবহার করা উচিত। এগুলোকে আপনি সংস্কারপন্থীদের বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।’

এই ধরনের নৈতিক অবস্থান প্রথম চারটি দলেরই বিপক্ষে যায়। তাতে স্পষ্টতই কিছুসংখ্যক মানুষ একটা ভিন্নতর প্যারাডাইম তৈরি করছে। রক্ষণশীলদের মতো জনপ্রিয় না হলেও সংস্কারপন্থীরা এই পাঁচটি ধারার অন্যতম হিসেবে ইতোমধ্যেই আবির্ভূত হয়েছে।

গল্পের সমাপ্তি

গল্পটি এখানেই শেষ। এবার চলুন পেছনে ফেলে আসা মূল বিষয়ের প্রতি আমরা মনোযোগী হই। মাংস খাওয়া নিয়ে আলোচনা করা আমাদের মূল প্রসঙ্গ নয়। আমরা জানি, শরীয়াহ আমাদের জন্যে মাংস খাওয়া হালাল করেছে, আলহামদুলিল্লাহ। সত্যি কথা বলতে কি, রাতের খাবারে মাংস না থাকলে আমার মনে হয় যেন খাবারই পরিবেশন করা হয়নি!

যাইহোক, গল্পটি মূলত মাংস নিয়ে নয়। তাই একে উড়িয়ে দেবেন না। কারণ, দুনিয়া যেভাবে চলছে, তাতে করে ইউরোপের কোথাও এমন একটা সমাজের কথা কল্পনা করা অসম্ভব নয়, যারা ভেগানিজমকে গ্রহণ করে নেবে। তখন কিন্তু এই ইস্যুগুলো তৈরি হতে পারে।

বাস্তব ইস্যু

ভবিষ্যতে যাইহোক না কেন, সত্যি কথা হচ্ছে বর্তমানে ভেগানিজম কোনো ইস্যু নয়; আমরা যা নিয়ে এতক্ষণ কথা বলছিলাম। এখনকার ইস্যুগুলো হচ্ছে – নারী-পুরুষের সম্পর্ক, যৌনতা, গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং আধুনিক পাশ্চাত্য যুগে ইসলামী আইনের প্রয়োগযোগত্যা ইত্যাদি।

সাদাকালো নয়, রঙিন

এই পাঁচটি ধারার কোনোটিই পুরোপুরি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ধারা নয়। এগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে এবং এ সবগুলো ধারার সমন্বয়ে এক ধরনের বর্ণচ্ছটা (spectrum) তৈরি হয়েছে। এ কারণে আপনি হয়তো একইসাথে একাধিক ধারায় একই ধরনের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে থাকবেন। এটি হলো নানা রংয়ের সমাহার। তাই না? আর তাই আমি এই ধারাগুলোর কিছু স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্টের কথা আপনাদেরকে এখন বলবো।

মুসলমানদের মধ্যে নানা মত ও পথের ধারাবাহিকতার কারণে কারো কারো মাঝে একইসাথে প্রথম ও দ্বিতীয় ধারার কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে, আবার কারো কারো মাঝে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধারার কিছু প্রভাবও থাকতে পারে। একজন মুসলমানের উপর এই সকল পরস্পরবিরোধী ধারার প্রভাব থাকাটাও এই স্পেকট্রামের একটা অংশ। তাছাড়া, কঠোরভাবে যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে এই ধারাগুলো নির্ধারণ করা হয়নি। যাইহোক, আমি আসলে এই গল্পটির শিক্ষনীয় দিকের উপরই জোর দিতে চাচ্ছি।

বাকি অংশ পড়ুন | প্রশ্নোত্তর পর্ব

আগের আর্টিকেলঅন্যান্য কমিউনিটির সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক
পরের আর্টিকেলইসলামী চিন্তার সংস্কার: বিচ্যুতি, প্রগতি, নাকি সময়ের দাবি? (শেষ অংশ)
ইয়াসির ক্বাদী
ইয়াসির ক্বাদী একজন প্রভাবশালী আমেরিকান স্কলার ও জনপ্রিয় বক্তা। তিনি হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় হাদীস শাস্ত্রে বিএ এবং ধর্মতত্ত্বের উপর মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তারপর ২০০৫ সালে আমেরিকায় ফিরে গিয়ে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ও এমফিল করার পর ইসলামিক স্টাডিজের উপর পিএইচডি করেন। কর্মজীবনে তিনি ইসলামিক স্টাডিজের উপর অগ্রসর পড়াশোনার জন্য উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান আল-মাগরিব ইনস্টিটিউটের অ্যাকাডেমিক অ্যাফেয়ার্সের ডিন। পাশাপাশি টিনেসি রাজ্যের মেমফিসে অবস্থিত রডস কলেজের রিলিজিয়াস স্টাডিজের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন