অন্যান্য কমিউনিটির সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক

|

এডিটর’স নোট: অন্যান্য ধর্মীয় বা জাতিগত সম্প্রদায়ের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক কী বিদ্বেষপূর্ণ বা শত্রুতামূলক হবে, নাকি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানমূলক হবে? এ ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী? প্রশ্নটি নতুন না হলেও বর্তমান বৈশ্বিক মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে এটি সবার জন্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ বৃটেনের ইস্ট লন্ডন মসজিদে জুমার খুতবায় ড. জামাল বাদাবী এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি কোরআন, হাদীস ও রাসূলের (সা) জীবনীর আলোকে এ সম্পর্কিত মূল্যবোধগুলো তুলে ধরেছেন। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্যে খুতবাটি অনুবাদ করেছেন আইয়ুব আলী।

*****

আজকের খুতবার বিষয় হচ্ছে অন্যান্য কমিউনিটির সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক। এই সম্পর্কের ভিত্তি কী? এ প্রশ্নের জবাবে আমরা দুটি বিষয়ের উপর দৃষ্টিপাত করবো। এটা কি কারো দাবি কিংবা কাজের উপর নির্ভরশীল? নাকি, এ বিষয়ে কোরআন ও সুন্নাহর দিকেই আমরা ফিরে যাবো? এ জন্যে প্রাথমিকভাবে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে হবে। তারপর এগুলো নিয়ে আরো বিস্তারিত জানতে হবে। শেষোক্তটিকে আমি ‘ইসলামী বিশ্বজনীন মূল্যবোধ’ হিসেবে বলতে চাই। এটা অনেক দীর্ঘ আলোচনার ব্যাপার। এই সম্পর্ক নিয়ে ইসলামে কোনো অসঙ্গতি নেই। কোরআনে শুধু মুসলমানদের উদ্দেশ্যে যেমন বক্তব্য রয়েছে, তেমনি সমগ্র মানবজাতির উদ্দেশ্যেও বক্তব্য রয়েছে। কোরআনের ‘ইয়া আইয়ুহান নাস’ (হে মানুষ!) কিংবা ‘হে আদমের সন্তানেরা!’ জাতীয় সম্বোধনগুলো প্রত্যেক কমিউনিটিকেই অন্তর্ভুক্ত করে।

তিনটি মৌলিক বিশ্বাস

শুরুতে আমি ইসলামের তিনটি মৌলিক বিশ্বাস নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবো।

১। তাওহীদ

তাওহীদ বলতে শুধু একেশ্বরবাদ নয়, বরং তারচেয়েও বেশি কিছু বুঝায়। তাওহীদের ধারণা অনুযায়ী বিশ্বজগতের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকর্তা ও পালনকর্তা হিসেবে আল্লাহর এককত্বকেই বুঝায়। তাই আল্লাহ তায়ালাই আমাদের উপাসনা ও পূর্ণ আনুগত্য সমর্পণের একমাত্র প্রাপ্য সত্তা। আল্লাহর কোনো অংশীদার নেই। অর্থাৎ, ‘আসমাউস সিফাত’ তথা আল্লাহর গুণাবলি ও চমৎকার নামসমূহ এমন কোনো সত্তার অংশ নয়, যা নিজেই অন্য কোনো রূপ বা প্রতিমূর্তি হিসেবে বিবেচিত। এ কারণেই তাওহীদের ধারণা একেশ্বরবাদের ধারণাকে ছাড়িয়ে যায়। এ ধারণা অনুযায়ী, আল্লাহ একজন। আল্লাহ তায়ালার গুণাবলি ও চমৎকার নামসমূহের দিকে তাকালে আমরা দেখবো– তিনি হচ্ছেন চূড়ান্ত হুকুমদাতা ও পরম সত্তা। তাই কে কী বললো বা দাবি করলো তা বিবেচ্য নয়। কারণ, পরম সত্তা আল্লাহ তায়ালাই আমাদেরকে বলে দিয়েছেন– কোনটা সঠিক, কোনটা ভুল; কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা। আল্লাহর প্রতি এই আনুগত্যের ভিত্তি হচ্ছে– তাঁর পরম প্রজ্ঞার প্রতি গভীর আস্থা, তাঁর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর সন্তুষ্টির প্রত্যাশা ও জান্নাতের আকাঙ্ক্ষা; পাশাপাশি তাঁর অবাধ্যতাকে পরিহার করা, যা পরকালে মানুষকে চূড়ান্ত ক্ষতির দিকে নিয়ে যায়।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এগুলো বিশাল ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাপার কিংবা নিছক বিমূর্ত কিছু কথাবার্তা। প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটা তেমন নয়। মুসলিমরা যখন অমুসলিমদের সাথে মেলামেশা করে তখন এর বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়। ধন-সম্পদ বা প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকা সত্ত্বেও একজন সত্যিকারের মুসলমান অহংকারী ও উদ্ধত হয়ে ওঠে না, মানুষের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অন্যায়ে লিপ্ত হয় না। কারণ সে জানে, পরকালে এসব কৃতকর্মের জন্যে কঠোর শাস্তি রয়েছে।

২। নবুয়ত

যুগে যুগে আগত নবী-রাসূলগণ এবং তাঁদের মাধ্যমে আল্লাহর প্রেরিত বাণীর প্রতি আমরা বিশ্বাস রাখি। নবুয়তের ধারণা এবং পূর্বেকার নবী-রাসূলগণের নিকট প্রেরিত বাণীসমূহের মূলকথা একই। আমরা শুধু সে অংশগুলোর উপর গুরুত্ব দেবো, যেগুলো এখনো অবিকৃত রয়েছে। বিভিন্ন সময় নাযিলকৃত ঐশীবাণীসমূহের কোন অংশগুলো অবিকৃত, তা জানার একমাত্র উপায় হচ্ছে কোরআন। কারণ আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের জন্যে যে কোনো কিছু বিবেচনার মানদণ্ড হিসেবে কোরআনকে গ্রহণ করতে বলেছেন। তিনি বলেছেন,

وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ

“আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি সত্যগ্রন্থ, যা পূর্ববতী গ্রন্থসমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণকারী।” (সূরা মায়েদা ৫:৪৮)

পূর্বে নাজিলকৃত ওহীর যে অংশসমূহ অক্ষুণ্ন ও অপরিবর্তিত রয়েছে সেগুলোকে অনুমোদন দিতেই কোরআন এসেছে। তাই কোরআন হচ্ছে ‘মোহাইমিন’ তথা চূড়ান্ত ফয়সালাকারী বা মানদণ্ড। এ কারণে একে ‘আল-ফোরকান’ও বলা হয়। অর্থাৎ, এটি বিকৃত ও অবিকৃত বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করার মানদণ্ড।

তাই একজন প্রকৃত মুসলমান কখনোই পূর্বে নাজিলকৃত সব ওহীকে নির্বিচারে গ্রহণ বা বর্জন করে না। কোরআন যে ব্যাপারে একমত পোষণ করে, মুসলমানরা তা গ্রহণ করে। যেহেতু তা কোরআনের মর্মবাণীর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

এর তাৎপর্য এই যে এখানে একাধিক স্রষ্টার মধ্যে প্রতিযোগিতা বা দ্বন্দ্ব নেই, কারণ স্রষ্টা তো একজনই। কিছু কিছু ব্যাপারে আমরা ভিন্ন বিশ্বাস ধারণ করলেও প্রকৃতপক্ষে অন্যান্য নবী-রাসূল বা তাঁদের উম্মতদের বিপক্ষেও আমাদের কোনো অবস্থান নেই। বরং সত্যিকার অর্থে এটি বিদ্যমান মুসলিম কমিউনিটিকে আরো বৃহত্তর ঈমানদার কমিউনিটিতে উন্নীত করার পথ প্রশস্ত করে। কারণ পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ শুধু তাদেরই নয়, আমাদেরও। কোরআনের ভাষ্য হচ্ছে,

لَا نُفَرِّ‌قُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّ‌سُلِهِ

“আমরা তাঁর পয়গম্বরদের মধ্যে কোনো তারতম্য করি না।” (সূরা বাকারা ২:২৮৫)

৩। আখেরাতে ব্যক্তিগত জবাবদিহিতা

আখেরাতে আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রত্যেককে ব্যক্তিগতভাবে জবাবদিহি করতে হবে। অর্থাৎ, প্রত্যেক মানুষই তার কথা ও কাজ তথা সবকিছুর জন্যে আল্লাহর নিকট দায়বদ্ধ। কেউ ভাবতে পারে– কোনো অপরাধ করেও দুনিয়ার শাস্তি থেকে সে রেহাই পেয়ে যাবে। বাস্তবে হচ্ছেও তাই। খুন-খারাবির মতো অপরাধ করেও কেউ কেউ রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পরকালে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা ও শাস্তি থেকে কেউ রেহাই পাবে না।

এই মৌলিক বিশ্বাসেরও একটা বাস্তব প্রয়োগ রয়েছে। সেটি হলো– দুঃখজনকভাবে কোনো মুসলমান বা মুসলিম গোষ্ঠী যদি আল্লাহ বা ইসলামের নামে অন্যদেরকে হয়রানী, দুর্ব্যবহার, বা কোরআনের শিক্ষার বিপরীতে গিয়ে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করে কিংবা বর্বরভাবে হত্যা করে; তাহলে পরকালে তাদের জন্যে নিকৃষ্ট পরিণতি অপেক্ষা করছে। এ বিষয়ে মাওলানা মওদূদী বলেছেন– পরকাল, জবাবদিহিতা, শাস্তি ও পুরস্কারে বিশ্বাসের ধারণাগুলো নিরেট তত্ত্বকথা কিংবা খোদার প্রতি অন্ধবিশ্বাস মাত্র নয়। তাঁর মতে, এটি হচ্ছে একজন মুসলমানের যাবতীয় নৈতিকতা ও নৈতিক আচার-আচরণের ভিত্তি। ইচ্ছা করলে কোনো ব্যক্তি আখেরাতে বিশ্বাস না করে আল্লাহর অবাধ্যতাকে উপভোগ করতে পারে।

যাহোক, এবার মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক। অন্যান্য কমিউনিটির সাথে মুসলমানদের সম্পর্কের কথা পরিষ্কার করতে গিয়ে আমরা এইসব মৌলিক আকীদা-বিশ্বাসগুলো ছাড়াও আরো কিছু সহজ বিষয় তুলে ধরতে পারি, যাতে সব ভুল বুঝাবুঝি দূর হয়ে যায়। তাই আমরা কোরআন-সুন্নাহ ও প্রিয় নবীর (সা.) জীবনী থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ সম্পর্কে আলোচনা করবো। এগুলো অন্য কারো মতামত নয়।

সার্বজনীন ইসলামী মূল্যবোধ

আপনারা লক্ষ করে থাকবেন, কোরআনে দুই ধরনের সম্বোধন রয়েছে। ঈমানদারগণকে সম্বোধন করা হয়েছে ‘ইয়া আইয়ুহাল্লাজীনা আমানু’ (হে ঈমানদারগণ!) বলে। তারমানে কি অন্যান্য মানুষকে বাদ দেয়া হয়েছে? না। খেয়াল করলে দেখতে পাবেন– নামাজ, রোজা, হজ ইত্যাদির মতো মুসলমানদের জন্য অবশ্য পালনীয় বিষয়ে যখন কথা বলা হয়েছে তখনই কেবল ‘হে ঈমানদারগণ’ সম্বোধন করা হয়েছে। যারা এখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি, তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের আগেই এসব বিষয়ে নির্দেশ দেয়ার তো যৌক্তিকতা নেই। বরং এসব নির্দেশনা তাদের জন্যে, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে।

একইসাথে সমগ্র মানবজাতিকে সম্বোধন করে দেয়া বক্তব্যও কোরআনে রয়েছে। সে কারণেই আমরা একে সার্বজনীন মূল্যবোধ বলছি। এ মূল্যবোধগুলো একইসাথে ইসলামী ও সার্বজনীন। কোরআনে যখন বলা হয় ‘ইয়া আইয়ুন নাস’ (হে মানুষ!), তখন কি শুধু মুসলমান কিংবা আসমানী কিতাবধারীদের কথাই বলা হয়? ‘আইয়ুহান নাস’ বলতে সমগ্র মানবজাতিকে বুঝানো হয়। আবার বলা হয়েছে, ‘ইয়া বনী আদম’ অর্থাৎ হে আদমের সন্তানেরা! কেউই আদমের সন্তান হিসেবে নিজেকে অস্বীকার করতে পারে না। আল্লাহর অনুগত কিংবা অবাধ্য– অর্থাৎ, বিশ্বাস যাই হোক না কেন, সমগ্র মানবজাতিই আদমের সন্তান। এই কথাগুলো বিবেচনায় রেখে কোরআনের বক্তব্যের আলোকে এখানে কিছু মূল্যবোধ সম্পর্কে আলোচনা করছি।

১। মানবিক মর্যাদার সার্বজনীনতা:

এ মূল্যবোধগুলোর প্রথমটি হলো মানবিক মর্যাদার সার্বজনীনতা। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ

“নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।” (সূরা বনী ইসরাইল ১৭:৭০)

এর অর্থ দাঁড়ায়, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে যে কাউকে ভীতি প্রদর্শন বা অপদস্ত করা কিংবা কোনো ধরনের অমানবিক আচরণ করা নীতিগতভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। এ ধরনের কাজ কোনো ঈমানদার ব্যক্তির আচরণ হতে পারে না। সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে যারা এসব করে, তারা আল্লাহর কাছ থেকে অনেক দূরে সরে যায়। যে ব্যক্তি ঈমানদার নয়, পরবর্তী কোনো এক সময়ে সে ঈমানদার হতেও তো পারে! কেউ কোনো অন্যায় করে থাকলে উপযুক্ত শাস্তি তার প্রাপ্য, কিন্তু কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মানবিক মর্যাদার অবনমন করা যাবে না।

২। মানব জীবনের অলঙ্ঘনীয়তা (Sanctity)

মানব জীবনের গুরুত্ব নিয়ে কোরআনে একাধিক আয়াত রয়েছে। এ আয়াতগুলো শুধু মুসলমান নয়, সবার জন্যেই প্রযোজ্য। প্রত্যেক মানুষেরই জীবনের মূল্য রয়েছে। সবার জীবনই পবিত্র। একে সম্মান করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে সূরা মায়েদার একটা আয়াতের কথা বলা যায়। কোরআনের এই আয়াতের শিক্ষা পূর্ববর্তী ইসরাইলী নবীদের কাছেও নাজিল হয়েছিলো। কোরআন বলছে,

مِنْ أَجْلِ ذٰلِكَ كَتَبْنَا عَلٰى بَنِىٓ إِسْرٰٓءِيلَ أَنَّهُۥ مَن قَتَلَ نَفْسًۢا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِى الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَآ أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا ۚ وَلَقَدْ جَآءَتْهُمْ رُسُلُنَا بِالْبَيِّنٰتِ ثُمَّ إِنَّ كَثِيرًا مِّنْهُم بَعْدَ ذٰلِكَ فِى الْأَرْضِ لَمُسْرِفُونَ

“এ কারণেই বনী ইসরাঈলের জন্য আমি যে বিধান দিয়েছিলাম তা হলো– কেউ যদি কোনো মানুষ হত্যার বদলা ব্যতীত, কিংবা জমিনে ফ্যাসাদ সৃষ্টির কারণ ব্যতীত কাউকে হত্যা করে, সে যেন সমস্ত মানুষকেই হত্যা করলো। আর কেউ যদি মানুষের জীবন রক্ষা করে, সে যেন সমস্ত মানুষের জীবনই রক্ষা করলো। আমার রাসূলগণ তো তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে এসেছিলো। তারপরও তাদের অনেকেই পৃথিবীতে সীমালঙ্ঘন করে চলেছে।” (সূরা মায়েদা ৫:৩২)

এই আয়াতটির ঠিক আগের কয়েকটি আয়াতে এ প্রসঙ্গে আদমের (আ) দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কথা বলা হয়েছে।[1] এই দুই ভাইয়ের মধ্যকার রক্তপাতের ঘটনাই হলো পৃথিবীর প্রথম নরহত্যার ঘটনা। দুঃখজনক হলেও সত্য, আজো একইভাবে মুসলমানরা পরস্পরকে হত্যা করছে। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা থেকে বিচ্যুতির ফলেই এমনটা ঘটছে। কিসাসের বিধান অনুযায়ী শাস্তিপ্রাপ্ত নয়– এমন কোনো ব্যক্তিকে কেউ হত্যা করলে হত্যাকারীকে অবশ্যই পূর্বপরিকল্পিত হত্যার দায়ে শাস্তি পেতে হবে। নিহত ব্যক্তিটি মুসলিম কিংবা অমুসলিম যে-ই হোক না কেন, তাতে কিছু আসে যায় না। কোরআনের বিধান মতে, নিহতের অভিভাবকরা হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। এর ফলে সে মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পেয়ে যাবে। এক্ষেত্রে তারা আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিতে পারেন কিংবা নাও নিতে পারেন।

কিসাসের বিধানটি ইসলামের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। আধুনিক পশ্চিমা আইনেও এর ছাপ পাওয়া যায়। কোনো অপরাধী যদি আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয়, তাহলে তাকে একটা সুযোগ দেয়ার বিধান এসব আইনেও রয়েছে।

অন্যদিকে, স্বৈরশাসকরা তাদের নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী রাজনৈতিক দলকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে উপরোক্ত আয়াতে বর্ণিত ‘ফাসাদ’[2] শব্দটির মনগড়া ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। বিরোধীদের প্রতিবাদ দেখলেই তারা বলে ওঠে– এই যে তারা ফ্যাসাদ করছে। আসলে এ ধরনের ব্যাখ্যা কোরআনের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। অথচ ফ্যাসাদপূর্ণ কাজ কোনগুলো, তা কোরআনে স্পষ্টভাবেই বলা আছে। এসব কাজ ‘হেরাবা’[3] হিসেবে গণ্য। যেমন– সন্ত্রাসী কার্যক্রম, ডাকাতি, মানুষ খুন ইত্যাদি। অপরাধের মাত্রা অনুসারে এসব অপরাধীকে বিভিন্ন ধরনের শাস্তিদানের কথা বলা আছে।

যারা শান্তিপূর্ণভাবে ভিন্নমত প্রকাশ করে, জালিম শাসককে জালিম হিসেবে অভিহিত করে, ন্যায়বিচার করার আহ্বান জানায়; তাদেরকে হয়রানী বা নির্মূল করার জন্য ‘ফাসাদ’ শব্দের অপব্যবহার একটা বিকৃতি মাত্র। এসব ‘ভিন্ন মতাবলম্বীদের’ মধ্যে কেউ নিহত হলে তারা শ্রেষ্ঠ শহীদদের একজন হিসেবেই গণ্য হবেন। যেহেতু মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “সর্বশ্রেষ্ঠ শহীদ হচ্ছেন আবদুল মুত্তালিবের পুত্র হামজা এবং সেই ব্যক্তি যে জালিম শাসকের মুখোমুখি হয়।” এ ধরনের ব্যক্তি ট্যাংক, মিসাইল বা কোনো প্রকার অস্ত্র নিয়ে নয়, বরং নিরস্ত্র অবস্থায় শাসকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কোরআন-হাদীস মোতাবেক শাসকের করণীয়-বর্জনীয়গুলোর ব্যাপারে সত্য কথা বলে থাকেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ধরনের শাসকেরা একই রকম প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকে। এমনকি এসব শাসকের বিরুদ্ধে কেউ একটা আর্টিকেল লিখলেও তাকে হত্যা করার জন্য উদ্যত হয়।

বর্তমানে ইসলামের নামে মুসলিম ও অমুসলিমদের সাথে যেসব দুঃখজনক ঘটনা ঘটে চলছে, তা বুঝতে হলে এ ব্যাপারগুলো মনে রাখা খুবই জরুরি। মুসলিম নামের জুলুমবাজরা হাজার হাজার নিরপরাধ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করতে মোটেও দ্বিধা করছে না। তাদেরকে নির্যাতন করা হচ্ছে, জেলে আটক রাখা হচ্ছে। এভাবে তাদের ও তাদের প্রিয়জনদের জীবনকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে।

৩। মানুষের সমতা

তৃতীয় মূল্যবোধটি হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার নিকট সকল মানুষের সমতা। যদিও পরকালে ঈমানদার ও অন্যান্যদের মধ্যে একটা পার্থক্য থাকবে। কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী অবিশ্বাসীদের জন্যে পরকালে কী পরিণতি রয়েছে, তা স্পষ্ট। কিন্তু আমরা মানুষকে বিচার করার কেউ নই। কেন তারা এই পৃথিবীতে জীবনযাপন করছে? কারণ, সমতা শুধু মুসলমান কিংবা বিশ্বাসীদের জন্যে নয়, বরং সকলের জন্য। মানুষ যে সৃষ্টির সেরা জীব, তা শুধু মুসলমানদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, সকলের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। আল্লাহ তায়ালা কোরআনে মুসলিম-অমুসলিম সবাইকে সম্বোধন করে বলেছেন: ইয়া আইয়ুহান নাস (হে মানুষ সকল!)। এখানে কি শুধু মুসলমানদেরকেই সম্বোধন করা হয়েছে? না। বরং ইসলামী বিশ্বজনীন মূল্যবোধ হিসেবে ‘আন নাস’ তথা সকলকেই সম্বোধন করা হয়েছে। আল্লাহ বলছেন,

يٰٓأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنٰكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثٰى وَجَعَلْنٰكُمْ شُعُوبًا وَقَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوٓا ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقٰىكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ

“হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পারো। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।” (সূরা হুজরাত ৪৯:১৩)

এ আয়াতের বক্তব্য অত্যন্ত পরিস্কার। যারা প্রচুর অর্থ, অস্ত্র, ক্ষমতা, কৌশল ইত্যাদির অধিকারী হয়ে অহংকারী বা উদ্ধত হয়ে পড়ে এবং এগুলোর অপব্যবহার করে অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত সকল মানুষের সমতার নীতিকে অমান্য করে; তখন তারা আসলে আল্লাহর কাছ থেকে অনেক দূরে সরে যায়। রাসূল (সা.) বলেছেন, “অনারবের উপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কালোর উপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কেবল তাকওয়ার ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করা যায়।”

এ থেকে বুঝা যায়, কোরআন ও হাদীসের মাঝে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। যারা নিজেদেরকে ‘আহলে কোরআন’ তথা ‘কোরআনের অনুসারী’ বলে দাবি করে কিন্তু হাদীসকে অস্বীকার করে, তারা কখনোই ‘আহলে কোরআন’ হতে পারে না। কারণ, স্বয়ং কোরআনেই সুন্নাহকে অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:

فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُ‌دُّوهُ إِلَى اللَّـهِ وَالرَّ‌سُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّـهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ

“আর যদি কোনো ব্যাপারে তোমাদের মধ্যে বিরোধ লেগে যায়, তাহলে তা মীমাংসার ভার আল্লাহ ও রাসূলের কাছে ছেড়ে দিও, যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাসী হয়ে থাকো।” (সূরা নিসা ৪:৫৯)

এ বিষয়ে আরো অনেক প্রমাণ রয়েছে। কোনো বিষয়ে ইসলামের প্রকৃত বক্তব্যকে গুলিয়ে ফেলার এই ধরনের প্রবণতা খুবই ভয়ংকর। এর ফলে ইসলামের কোনো না কোনো মূলনীতি লঙ্ঘিত হয়ে যেতে পারে।

৪। ধর্মীয় স্বাধীনতা

যদিও এটি সরাসরি আল্লাহকে প্রত্যাখ্যান করার শামিল বলে কোরআনে বলা হয়েছে, তথাপি মানুষকে পছন্দ অনুযায়ী ধর্ম বা দর্শন বাছাই করার অধিকার দেয়া হয়েছে। আমরা সাধারণত শুক্রবারে যে সূরাটি পাঠ করি, সেই সূরা কাহাফে আল্লাহ বলেছেন,

وَقُلِ الْحَقُّ مِنْ رَ‌بِّكُمْ ۖ فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ

“বলুন, সত্য তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে আগত। অতএব, যার ইচ্ছা, বিশ্বাস স্থাপন করুক এবং যার ইচ্ছা অমান্য করুক।” (সূরা কাহাফ ১৮:২৯)

অর্থাৎ কেউ চাইলে আল্লাহর সত্য বাণীর উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে, আবার তা অমান্যও করতে পারে। কোনো ক্ষেত্রেই জবরদস্তি করা যাবে না। ব্যক্তি তার স্বাধীন ইচ্ছায় সিদ্ধান্ত নিবে। তবে সত্য অমান্য করার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করার কথা বলা হয়েছে। এসব ব্যাপারে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ আয়াত রয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

لَآ إِكْرَاهَ فِى الدِّينِ ۖ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَىِّ ۚ فَمَن يَكْفُرْ بِالطّٰغُوتِ وَيُؤْمِنۢ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقٰى لَا انفِصَامَ لَهَا ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

“দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি বা বাধ্যবাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে গোমরাহী থেকে হেদায়াত পৃথক হয়ে গেছে। অতএব, যে তাগূতকে অমান্য করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, সে দৃঢ়তম রশি আঁকড়ে ধরলো, যা কখনো ছিন্ন হবার নয়। আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু জানেন।” (সূরা বাকারা ২:২৫৬)

এটি কোরআনের একটি মুহকাম তথা সুস্পষ্ট আয়াত। তাই এর ভিন্ন কোনো ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। এটি কোরআনের একটি সার্বজনীন ধারণা। আরেকটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মহানবীকে (সা.) উদ্দেশ্য করে বলেছেন,

فَإِنْ أَعْرَضُوا فَمَآ أَرْسَلْنٰكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا ۖ إِنْ عَلَيْكَ إِلَّا الْبَلٰغُ

“যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আপনাকে আমি তাদের রক্ষক করে পাঠাইনি। আপনার কর্তব্য কেবল প্রচার করা।” (সূরা আশ-শু’রা ৪২:৪৮)

এর মানে হচ্ছে, কেউ ইসলাম তথা সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও কেউ তাদেরকে আসামী সাব্যস্ত করতে পারে না। স্বয়ং নবীর (সা.) ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযোজ্য! তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াচ্ছে? ইসলাম সম্পর্কে যে কিছুই জানে না, অথবা ইসলাম সম্পর্কে যার সঠিক বুঝজ্ঞান নেই, তাকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা বা হত্যা করার কোনো সুযোগ কি কারো আছে? অবশ্যই না। আল্লাহ তায়ালা আমাকে-আপনাকে তাদের অভিভাবক করে পাঠাননি। তিনি কোরআনে কী বলেছেন দেখুন:

فَذَكِّرْ‌ إِنَّمَا أَنْتَ مُذَكِّرٌ‌- لَسْتَ عَلَيْهِمْ بِمُصَيْطِرٍ

“অতএব, আপনি উপদেশ দিতে থাকুন, আপনি তো একজন উপদেশদাতা মাত্র। আপনি তো তাদের জিম্মাদার নন।” (সূরা গাশিয়াহ ৮৮:২১-২২)

কোরআনে এ রকম অসংখ্য আয়াত রয়েছে, যেখানে মানুষের বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করা হয়েছে। কারো বিশ্বাসকে ভুল মনে করলেও আপনি নিজেই তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারেন না। এটা আপনার দায়িত্ব নয়। বরং তাদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে আপনাকে কোরআনের নির্দেশনাই মেনে চলতে হবে। শুধু অন্য ধর্মে বিশ্বাস করাই নয়, বরং সেই ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান পালনের অধিকারকেও কোরআন সম্মান করে; যতক্ষণ পর্যন্ত তা অন্যের অধিকার লঙ্ঘন না করে। কোরআনে বলা হয়েছে,

وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُم بِبَعْضٍ لَّهُدِّمَتْ صَوَامِعُ وَبِيَعٌ وَصَلَوَاتٌ وَمَسَاجِدُ يُذْكَرُ فِيهَا اسْمُ اللَّهِ كَثِيرًا

“আল্লাহ যদি মানবজাতির একদলকে আরেক দল দিয়ে শায়েস্তা না করতেন তাহলে দুনিয়ার বুক থেকে মঠ, চার্চ, সিনাগগ ও মসজিদগুলো ধ্বংস হয়ে যেতো; যেখানে বেশি বেশি পরিমাণে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয়।” (সূরা হজ ২২:৪০)

এই আয়াতের শিক্ষা হলো, কোনো ধরনের ধর্মীয় নিপীড়ন চালানো নিকৃষ্ট কাজ। মুসলমান হোক কিংবা অন্য ধর্মাবলম্বী হোক– প্রত্যেকেই স্ব স্ব ধর্মকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে। এটি মানুষের শুদ্ধ আত্মপরিচয়কে নির্ণয় করে। সে কারণে এই আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ যদি অত্যাচারীদেরকে দমন না করতেন, তাহলে যেসব উপসনালয়ে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয় সেগুলো ধ্বংস হয়ে যেতো।

এখন দেখুন, বর্তমানে কী ঘটছে। কিছু কিছু মুসলিম নামধারী ব্যক্তি এমনকি ভিন্ন মতাবলম্বীদের মসজিদগুলোতে পর্যন্ত বোমা মারছে। এসব কর্মকাণ্ড আল্লাহ সমর্থন করেন না, এমনকি অন্য ধর্মের উপসনালয় ধ্বংসের ব্যাপার হলেও। এ কারণে নিষ্ঠাবান মুসলমানদের ইতিহাস হচ্ছে উপাসনালয়গুলোর পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করার ইতিহাস। এমনকি ইবাদতের ধরনের পার্থক্য কিংবা ভিন্ন কোনো ধর্মের উপাসনালয়ের ক্ষেত্রেও তারা নিরাপত্তা দিয়েছেন।

৫। ধর্মীয় ভিন্নতার বাস্তবতা

ধর্মীয় ভিন্নতার বাস্তবতাকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে। তারমানে সব ধর্ম একই রকম নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, লোকজন নানা ধর্মে বিভক্ত। এই পরিস্থিতিতে আপনি দাওয়াতী কাজ করতে পারেন, তথ্য আদান-প্রদান করতে পারেন। কিন্তু কেউ এ কথা বলতে পারে না, ‘আমি আমার মর্জি মতো সমাজকে পরিশুদ্ধ করবো।’ কেউ কেউ এ ধরনের কাজের দলীল হিসেবে কোরআনের নিম্নোক্ত দুটি আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করেন:

وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلَّـهِ

“ফেতনা দূর হয়ে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করো।” (সূরা বাকারা ২:১৯৩)

কিংবা,

وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّـهِ

“তোমরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে থাকো যতক্ষণ না ফেতনার অবসান হয় এবং দ্বীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।” (সূরা আনফাল ৮:৩৯)

তারা বলতে চান, এসব আয়াতে অন্যদের অধিকার হরণের কথা বলা হয়েছে। এটাই বাস্তবতা। তাই আমাদের অন্য কিছু করার নেই। তাদের এ ধরনের ব্যাখ্যার বিপরীতে কোরআনে অন্তত দুটি আয়াত রয়েছে:

وَلَوْ شَآءَ رَبُّكَ لَجَعَلَ النَّاسَ أُمَّةً وٰحِدَةً ۖ وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ

“তোমার প্রভু যদি ইচ্ছা করতেন, তাহলে সব মানুষকে একই উম্মত বানিয়ে দিতে পারতেন, কিন্তু তাতেও তারা মতভেদ করতেই থাকবে।” (সূরা হুদ ১১:১১৮)

وَلَوْ شَآءَ رَبُّكَ لَءَامَنَ مَن فِى الْأَرْضِ كُلُّهُمْ جَمِيعًا ۚ أَفَأَنتَ تُكْرِهُ النَّاسَ حَتّٰى يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ

“যদি তোমার প্রভু চাইতেন তাহলে তো পৃথিবীতে যারাই আছে তারা সবাই একত্রে ঈমান আনতো। অতএব, তুমি কি মানুষকে ঈমান আনার জন্য জবরদস্তি করবে?” (সূরা ইউনুস ১০:৯৯)

এটা ঠিক, আমরা বিশ্বাস করি ইসলাম হচ্ছে সত্য ধর্ম। এটাই ছিলো মহানবীর (সা.) দাওয়াতের মূলকথা। এটিই শুদ্ধ ধর্ম, যেটি সুসংরক্ষিত এবং ক্রমাগতভাবে বিস্তৃতি লাভ করছে। কিন্তু তারমানে এই নয়– পৃথিবীতে অন্য ধর্মাবলম্বীদের কোনো স্থান নেই। আল্লাহর ইচ্ছার ফলেই ধর্মের এই বৈচিত্র্যতা বিদ্যমান। অন্যদের দায়দায়িত্ব একান্তই তাদের ব্যক্তিগত। আমাদের কর্তব্য হলো, সবার সাথে ন্যায্য আচরণ করা।

৬। সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব

অন্য ধর্মাবলম্বীদের জীবনযাপন বা উপাসনার অধিকার, কিংবা মুসলিম কর্তৃত্বের অধীন উপাসনালয় রক্ষা করার অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলেই মুসলমান হিসেবে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার যে মহান বক্তব্য ইসলামের রয়েছে, তাও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ ব্যাপারে কোরআনে কমপক্ষে দুটি আয়াত রয়েছে। এ সংক্রান্ত সূরা নিসার একটি আয়াত সাধারণত বিয়ের খুতবায়ও পাঠ করা হয়। সেখানে আল্লাহ বলেছেন,

يٰٓأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِى خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وٰحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَآءً ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِى تَسَآءَلُونَ بِهِۦ وَالْأَرْحَامَ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا

হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত নারী-পুরুষ। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট অধিকার দাবি করে থাকো এবং রক্তের সম্পর্কের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন। (সূরা নিসা ৪:১)

এখানে ‘ইয়া আইয়ুহান নাস’ তথা ‘হে মানবজাতি’ সম্বোধন করার মাধ্যমে শুধু মুসলমানদেরকেই আহ্বান করা হচ্ছে না, বরং সমস্ত মানুষের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বক্তব্য দিচ্ছেন। বক্তব্যের শুরুতেই সমগ্র মানবজাতিকে বলা হচ্ছে, তারা যেন আল্লাহকে ভয় করে। অর্থাৎ, শুধু মুসলমানদের বলা হচ্ছে না যে– যাও, লোকদের আল্লাহকে ভয় করতে বলো। এমনকি ইসলামের কাছাকাছি কোনো ধর্মের (যেমন– ইহুদী ধর্ম) কাউকেও বিশেষভাবে বলা হচ্ছে না। আবার এই বক্তব্যকে মানবজাতির প্রতি কোনো হুমকি হিসেবেও বিবেচনা করার সুযোগ নেই। কারণ, যিনি সবচেয়ে বড় মুত্তাকী সেই মোহাম্মদকেও (সা.) কোরআনে তাকওয়া অর্জন করার জন্য বলা হয়েছে,

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ اتَّقِ اللَّـهَ

“হে নবী! আল্লাহকে ভয় করুন।” (সূরা আহযাব ৩৩:১)

এই আয়াত আমাদেরকে বিনয়ী হতে শিক্ষা দেয়। শ্রেষ্ঠ মুক্তাকী স্বয়ং মহানবীকে (সা.) পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোরআনে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। অতএব, “তোমরা ভয় করো তোমাদের পালনকর্তাকে, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন…”– এ কথা বলায় আমাদের বিব্রত হওয়ার কিছু নেই। এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক আরেকটি আয়াত রয়েছে, যা একটু আগেও আমি বলেছি। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

يٰٓأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنٰكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثٰى وَجَعَلْنٰكُمْ شُعُوبًا وَقَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوٓا ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقٰىكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ

“হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পারো। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।” (সূরা হুজরাত ৪৯:১৩)

আল্লাহ মানুষকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে ভাগ করেছেন। এর কারণ কী হতে পারে? কোনো জাতি বা গোত্র নিজেদেরকে অন্যদের থেকে শ্রেষ্ঠ দাবি করার জন্যে? নাকি, অন্যদের উপর নিজেদের অন্যায় শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্যে? এর কোনোটার জন্যেই আল্লাহ এটি করেননি। এই বিভাজন না হলে আমরা অন্যকে চিনতাম না, অন্যরাও আমাদের চিনতো না। একে অপরকে চেনা তথা পারস্পরিক স্বীকৃতির জন্য আল্লাহ এটি করেছেন। এবং তিনি বলে দিয়েছেন, আল্লাহভীতির উপরই নির্ভর করবে মর্যাদাগত শ্রেষ্ঠত্ব।

আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি– কোরআনের এই আয়াতে সার্বজনীন ভ্রাতৃত্বকে ব্যাখ্যা করার জন্য ধর্ম ও মতাদর্শের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থেকে অতি সংক্ষেপে যে চমৎকার বক্তব্য দেয়া হয়েছে, তা অন্য কোনো ধর্ম বা দর্শন দিতে পারেনি।

উপরোক্ত আয়াতটি তেলাওয়াত করার সময় আমি এমন একটি ফুলের তোড়ার কথা কল্পনা করি, যার ফুলগুলো লাল, সাদা, গোলাপীসহ বিভিন্ন রঙের। এককভাবে প্রত্যেকটি ফুলই সুন্দর, কিন্তু সবগুলো ফুল মিলে তৈরি হওয়া তোড়াটির সৌন্দর্যই সবচেয়ে বেশি। বহু রঙের বৈচিত্র্য থাকায় এতে বিরক্তি আসে না। ঠিক এভাবেই আল্লাহ তায়ালা মানুষ, ফুল, পশু-পাখিসহ যাবতীয় সৃষ্টির মধ্যেও বৈচিত্র্যতা দিয়েছেন। এমনকি কোরআনে ভিন্ন ভিন্ন রঙের পাহাড়ের কথা বলা হয়েছে,

وَمِنَ الْجِبَالِ جُدَدٌ بِيضٌ وَحُمْرٌ مُّخْتَلِفٌ أَلْوَانُهَا وَغَرَابِيبُ سُودٌ

“আর পাহাড়ের মধ্যে আছে সাদা, লাল বিভিন্ন বর্ণের গিরিপথ এবং কালো কালো পাহাড়।” (সূরা ফাতির: ২৭)

৭। ন্যায়বিচার

শুধু মুসলমানদের সাথেই নয়, সকলের সাথেই ন্যায়বিচার করতে হবে। এ ব্যাপারে কোরআনে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত রয়েছে। প্রথমটিতে বলা হয়েছে,

يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُونُوا قَوّٰمِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَآءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلٰىٓ أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوٰلِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ ۚ إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلٰى بِهِمَا ۖ فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوٰىٓ أَن تَعْدِلُوا ۚ وَإِن تَلْوُۥٓا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান করো, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। তাদের কেউ যদি ধনী বা দরিদ্র হয়, তবুও তাদের ব্যাপারে তোমাদের চাইতে আল্লাহই অধিক শুভাকাঙ্ক্ষী। অতএব, তোমরা বিচার করতে গিয়ে প্রবৃত্তির কামনার অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলো কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে জেনে রেখো, আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজকর্ম সম্পর্কেই অবগত।” (সূরা নিসা ৪:১৩৫)

যা সত্য, বিচার করতে গিয়ে তার পক্ষেই থাকতে হবে। কার ব্যাকগ্রাউন্ড কী, কে কোন ধর্মের অনুসারী– বিচারের ক্ষেত্রে এসব বিষয় বিবেচনায় নেয়া যাবে না। এ সংক্রান্ত অপর আয়াতটি আরো চমৎকার। আল্লাহ বলেছেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّـهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ ۖ وَلَا يَجْرِ‌مَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَ‌بُ لِلتَّقْوَىٰ ۖ وَاتَّقُوا اللَّـهَ ۚ إِنَّ اللَّـهَ خَبِيرٌ‌ بِمَا تَعْمَلُونَ

“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়ভিত্তিক সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে তাদের ব্যাপারে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার করো, এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা যা করো, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে অধিকতর জ্ঞাত।” (সূরা মায়েদা ৫:৮)

এ রকম অসাধারণ বক্তব্য দুনিয়ার আর কোথায় আছে? লোকজন তো বরং বলে থাকে– শত্রুকে ধ্বংস করে দাও, যত পারো হত্যা করো, ভূলুণ্ঠিত করে দাও। যদিও কোরআনে কোনো কোনো সময় ন্যায়সঙ্গত আত্মরক্ষার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু একইসাথে মীমাংসার দরজা খোলা রাখার কথাও বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন,

عَسَى اللَّهُ أَن يَجْعَلَ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ الَّذِينَ عَادَيْتُم مِّنْهُم مَّوَدَّةً ۚ وَاللَّهُ قَدِيرٌ ۚ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

“এটা অসম্ভব কিছু নয়, আল্লাহ তোমাদের এবং যাদের সাথে আজ তোমাদের শত্রুতা সৃষ্টি হয়েছে তাদের মাঝে একদিন সুসম্পর্ক তৈরি করে দেবেন; আল্লাহ তো সবই করতে পারেন; আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” (সূরা মুমতাহিনা ৬০:৭)

এই আয়াতে আল্লাহ বলছেন, তোমরা যারা এখন পরস্পরের শত্রু, তোমাদের মধ্যে আল্লাহ ‘মুওয়াদ্দাহ’ তথা গভীর আন্তরিকতার সম্পর্ক তৈরি করে দিবেন। এটা নিছক ভালোবাসা নয়, তার থেকেও বেশি কিছু। আমাদের প্রিয় নবীর (সা.) জীবনে এ রকম অনেক উদাহরণ রয়েছে। তিনি তায়েফবাসীকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। আঘাতের জবাবে তাদেরকে মমতায় সিক্ত করেছেন। মৃত্যুদণ্ড যাদের প্রাপ্য ছিলো, মক্কা বিজয়ের শুরুতেই তাদের ব্যাপারে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। এ রকম আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে।

আসল কথা হচ্ছে, ন্যায়বিচার করা অর্থাৎ কোনো মানুষ, এমনকি শত্রুর সাথেও অবিচার না করা; এমনকি আত্মরক্ষার ক্ষেত্রেও এটি করা যাবে না। কেউ যদি এমন কোনো কাজের পক্ষে সাফাই গায়, যা কোরআন-হাদীসের শিক্ষার পরিপন্থী; তাহলে সে স্পষ্টত পথভ্রষ্ট।

৮। মধ্যপন্থা

কোরআনে আমাদেরকে ‘গুলু’ তথা বাড়াবাড়ি করার ব্যাপারে সাবধান করে দেওয়া হয়েছে। এটা উগ্রপন্থার পরিচায়ক। কোরআনে একে চরম মন্দ কাজ হিসেবে বিবেচনা করে বলা হয়েছে,

لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ

“তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না।” (সূরা নিসা ৪:১৭১, সূরা মায়েদা ৫:৭৭)

এমনকি ইবাদতের ক্ষেত্রেও বাড়াবাড়ি করতে ইসলাম নিষেধ করেছে। এ ব্যাপারে বর্ণিত একটি হাদীসে স্বাভাবিক জীবনযাপনের পরিবর্তে সদাসর্বদা ইবাদতে নিয়োজিত রত থাকতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনই ইবাদতে পরিণত হতে পারে, যদি কারো সৎ নিয়ত থাকে এবং আল্লাহ নির্দেশিত পথে চলে।

কোরআনে ‘ওয়াসাতিয়া’ তথা মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। তাই বলে এটা ইসলাম অনুসরণের ব্যাপারে গাফলতি নয়। যদিও কেউ কেউ ভুলবশত এমনটা মনে করতে পারে। কেবলা সংক্রান্ত সূরা বাকারার নিম্নোক্ত আয়াতে আল্লাহ বলছেন,

وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّ‌سُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا

“এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত করেছি যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবজাতির জন্যে এবং যাতে রাসূল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্য।” (সূরা বাকারা ২:১৪৩)

আমারদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত হিসেবে আল্লাহ পাঠিয়েছেন। এই আয়াতে বর্ণিত ‘ওয়াসাতান’ শব্দের অর্থ হচ্ছে– যথাযথ ভারসাম্যপূর্ণতা, বাড়াবাড়ি ও শৈথিল্য প্রদর্শনের মাঝামাঝি অবস্থান, মধ্যপন্থা অবলম্বন করা ইত্যাদি। নিছক রাজনৈতিক অর্থে মধ্যপন্থা নয়, বরং ওয়াসাতিয়ার আলোকে মধ্যপন্থা। এর পেছনে যথার্থ কারণ রয়েছে। তাহলো আমরা যাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের কাছে সাক্ষ্য হিসেবে দাঁড়াই, যেভাবে মহানবী (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের নিকট সাক্ষ্য হিসেবে প্রেরিত। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার।

৯। রহমত

নবম মূল্যবোধটি হচ্ছে রহমত তথা সকলের প্রতি সদয় হওয়া। আমরা জানি, এটি আল্লাহর বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির মধ্যে সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি গুণ। আমরা ভালো করে কোরআন পড়লে দেখতে পাবো, রহমতসহ এ ধরনের আরো অনেক শব্দ কোরআনে রয়েছে। এগুলোই হচ্ছে মহানবীর (সা.) দাওয়াতের মূলকথা। আল্লাহ বলেছেন,

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ

“আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্যে রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।” (সূরা আম্বিয়া ২১:১০৭)

এই আয়াতে ‘আলম’ (বিশ্ব) শব্দের বহুবচন ‘আলামীন’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এর মানে হচ্ছে জগৎ সম্পর্কে মানুষের গতানুগতিক ধারণাই শুধু নয়; বরং মনুষ্য জগত, জীনজগত (কারণ, তাদের কেউ কেউ কোরআন শোনার পর ইসলাম গ্রহণ করেছিলো), প্রাণীজগত, উদ্ভিদজগত, পরিবেশ জগতসহ সবার জন্যেই রাসূল (সা.) রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন।

তাহলে স্রেফ ভিন্নমত পোষণ করার কারণে যখন মানুষকে নির্যাতন করা হয়, শিরশ্ছেদ বা মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, অসহায় নারী-পুরুষ ও শিশুদেরকে পাইকারীভাবে হত্যা করা হয়, তখন রহমতের কার্যকারিতার কী হবে? এটা খুবই গুরত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ বিষয়টি হচ্ছে মুসলমানদের সাথে অন্যান্য কমিউনিটির সম্পর্কের ভিত্তির মূল ব্যাপার। এটা শুধুমাত্র শান্তির সময়ে নয়, বরং যুদ্ধক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ বিষয়ে এখন শুধু এটুকু বলে রাখি, কিছু লোক কোরআনের এ সংক্রান্ত কোনো কোনো আয়াতের অপব্যাখ্যা করে। তারা এসব আয়াতের ঐতিহাসিক এবং প্রাসঙ্গিক ঘটনা না জেনে বা এ সম্পর্কে ভুল বুঝে জঘন্য সব কাজ করে বেড়ায়। তারা কোরআন থেকে নিজেদের সুবিধা মতো কিছু আয়াত বাছাই করে (cherry picking) সেগুলোর অপব্যবহার করে।

১০। সহাবস্থান ও সদাচরণ

কেউ মুসলমানদের সাথে শান্তিতে বসবাস করতে চাইলে সেক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি হচ্ছে, আমাদেরকে ন্যায়সঙ্গত ভূমিকা পালন করতে হবে। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন,

لَّا يَنْهٰىكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقٰتِلُوكُمْ فِى الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيٰرِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوٓا إِلَيْهِمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ

“যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং কখনো তোমাদেরকে বাড়িঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ কখনো নিষেধ করেন না; অবশ্যই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।” (সূরা মুমতাহিনা ৬০:৮)

যুদ্ধ না করা এবং বাড়িঘর থেকে তাড়িয়ে না দেওয়া– এটুকু কি খুব বেশি চাওয়া? এটা কি মুসলমানদের অবাস্তব কোনো চাহিদা? এটা কি প্রত্যেক মানুষের প্রাপ্য অধিকার নয়? এটা খুবই সহজ একটি দাবি, যা সবার জন্যেই জরুরি। তাহলে এ চাহিদাটুকু পূরণ হলে মুসলমানরা অন্যদের সাথে কেমন আচরণ করবে? অবশ্যই ‘সদাচারণ ও ন্যায্য আচরণ’ করবে। উপরোক্ত আয়াতে এ সংক্রান্ত শব্দটি হলো ‘তাবাররুহুম’, যা সদাচরণ বা সহৃদয়তা থেকেও বেশি কিছু বুঝায়। এটা অনেকটা মা-বাবা ও সন্তানের সম্পর্কের মতোই হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক, যেখানে আছে সদাচারণ, সম্মান ও ভালোবাসা। এমনকি মা-বাবা অমুসলিম হলেও তাদেরকে ভালোবাসতে হবে। কারণ, মানুষ হিসেবে মা-বাবার কাছে কৃতজ্ঞ থাকার সহজাত ব্যাপার থেকেই তাদেরকে আমরা ভালোবাসি। যদিও আল্লাহ প্রত্যেকের কৃতকর্মের হিসাব নিবেন।

তাই আমাদের উচিত ‘কিস্ত’ তথা ন্যায়বিচার করা। কোনো কোনো আলেমের মতে, ‘কিস্ত’ হচ্ছে ‘আদল’ বা ন্যায়বিচারের চেয়েও বেশি কিছু। ‘আদল’ হচ্ছে কাউকে তার প্রাপ্য যতটকু ঠিক ততটুকু প্রদান করা; কমও নয়, বেশিও নয়। কিন্তু ‘কিস্ত’ হচ্ছে প্রাপ্যের চেয়েও বেশি কিছু দেয়া। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অমুসলিম প্রতিবেশীকে উপহার প্রদান করা। আলেমদের কারো কারো মতে, অমুসলিমদের অনু্ষ্ঠান উপলক্ষ্যে শুভেচ্ছা জানানো যায়। যেমন– ইস্টার সানডে। তবে শুভেচ্ছা জানানোর ক্ষেত্রে আমি নিরপেক্ষ কোনো শব্দ ব্যবহার করতে চাই। যেমন– হ্যাপি হলিডে। কারণ, হলি শব্দটি এখন আর ‘হলি’ তথা পবিত্র অর্থে ব্যবহৃত হয় না। এটা এখন অনেকটাই বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। কারো কারো মতে, এতে কোনো সমস্যা নেই। তাই বলে বিধর্মীদের যাবতীয় আকীদা-বিশ্বাসই সঠিক, এমনটি মনে করারও অবকাশ নেই। এই ইস্যুতে পক্ষে-বিপক্ষে কারো কারো যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে।

এতক্ষণের আলোচনায় আমরা ইসলামের যে বুঝজ্ঞান ও মূল্যবোধ সম্পর্কে জানলাম, তা বিবেচনায় রাখলে আমরা দেখি– কিছু ক্ষুদ্র গোষ্ঠী তাদের কাজকর্মের মাধ্যমে মানুষের কাছে ইসলাম ও মুসলমানদের একটা ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। তারা দাবি করে, কোরআন-সুন্নাহর আলোকেই তারা এসব করছে। অথচ এতক্ষণ আমি যা বলেছি, তা কোরআন-সুন্নাহর আলোকেই বলেছি। তাহলে তারা এগুলো ভুল প্রমাণ করুক। তারা প্রমাণ করুক– আমি কোরআনের যেসব আয়াত উল্লেখ করেছি, সেগুলো আল্লাহর কথা নয়, কোরআনের কোনো সূরার আয়াত নয়! মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এবং তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালনা করুন। আমরা যেন অন্যান্য কমিউনিটির লোকজনসহ আল্লাহর সমস্ত সৃষ্টির সাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে করতে পারি, মহান আল্লাহ আমাদেরকে সে তওফিক দান করুন। আমীন।

আমাদের করণীয়

আয়োজক ভাইদের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে, আমি যেন বর্তমান সময়ে মুসলমানদের জন্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করণীয় তিনটি কাজের কথা বলি। আমি খুব সংক্ষেপে এ ব্যাপারে আমার ক্ষুদ্র মতামত ব্যক্তি করছি।

১। ঈমানকে শক্তিশালী করা

আমাদের ঈমানকে শক্তিশালী এবং অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। কারণ, অন্তর থেকে অনুভব না করলে নিছক ইবাদত আমাদেরকে পরিবর্তন করতে পারবে না এবং আমরা আল্লাহর নৈকট্যও লাভ করতে পারবো না। অর্থাৎ, এই ইবাদত আমাদের কাজে আসবে না। হ্যাঁ, ইবাদত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; কিন্তু তা ঈমানের ভিত্তিতে হতে হবে। তাই প্রথমে আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। তাহলে আমরা যাবতীয় মন্দ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারবো।

২। ইসলামের সঠিক বুঝজ্ঞান অর্জন করা

আল্লাহ কোরআনে যা বলেছেন ঠিক সেভাবে, অর্থাৎ পরিপূর্ণ ভারসাম্যতা সহকারে ইসলামের সঠিক বুঝজ্ঞান আমাদের অর্জন করতে হবে। কট্টরপন্থী হওয়া যাবে না। মধ্যপন্থা সংক্রান্ত ইসলামের ধারণাকে নিছক রাজনৈতিক অর্থে না নিয়ে যথার্থ অর্থে একে গ্রহণ করতে হবে। আমরা জানি, ইসলামের প্রাথমিক যুগে উদ্ভূত খারেজি সম্প্রদায় ছিলো অত্যন্ত ধর্মভীরু। নামাজ, রোজাসহ যে কোনো ইবাদতে অত্যন্ত তৎপর থাকা সত্ত্বেও ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ জ্ঞানের অভাবে তারা গোমরাহ হয়েছিলো। মহানবী (সা.) তাদের সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন, তীর যেমন ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়, তারাও তেমনি দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে। তাদের কাজকর্ম পুরোপুরি ইসলাম পরিপন্থী। যেসব মুসলমান খারেজিদের মনগড়া ব্যাখ্যা গ্রহণে অস্বীকার করতো, তাদের হত্যা করা খারেজিরা বৈধ মনে করত।

৩। জ্ঞানকে বাস্তবে কাজে লাগানো

ঈমান এবং এর সঠিক বুঝজ্ঞানকে শুধু কেতাবী বিদ্যা মনে করা যাবে না। বরং এসবকে কাজে লাগিয়ে অন্যান্য মানুষের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে সচেষ্ট করতে হবে। এক্ষেত্রে মহানবী (সা.) আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। তিনি অমুসলিম প্রতিবেশীদের সাথে অত্যন্ত সদয় আচরণ করতেন। অথচ এদের কেউ কেউ তাঁর বাড়ির সামনে ময়লা-আবর্জনা ছুঁড়ে ফেলত। প্রতিবেশী মুসলিম নাকি অমুসলিম, সে প্রশ্ন না তুলে তাদের প্রতি সদয় হওয়ার ব্যাপারে কোরআনেও বলা হয়েছে।

আমরা যেন ইসলামের উত্তম আদর্শ হতে পারি, অন্যান্য মানুষের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও যেন উত্তম আদর্শ হতে পারি; আল্লাহ আমাদেরক সেই তওফিক দান করুন। আমীন।

রেফারেন্স ও নোট:

[1] “ওদেরকে আদমের দুই পুত্রের (হাবিল ও কাবিল) ঘটনা ঠিকঠিকভাবে শুনিয়ে দাও। যখন তারা (আল্লাহর উদ্দেশ্যে) একটি করে কুরবানী করেছিলো। তাদের একজনের কুরবানী কবুল হলো, অন্যজনের হলো না। তখন দ্বিতীয়জন (প্রথমজনকে) বললো, ‘আমি তোমাকে খুন করে ফেলব।’ প্রথমজন বললো, ‘আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকীদের কুরবানী কবুল করেন।’

‘তুমি আমাকে মেরে ফেলার জন্য হাত উঠালেও আমি তোমাকে মেরে ফেলার জন্য হাত উঠাবো না। আমি বিশ্বজাহানের প্রভু আল্লাহকে ভয় করি।’

‘আমি চাই, আমার ও তোমার পাপের ভার তুমি একাই বহন করে জাহান্নামের অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হও। আর সেটাই জালেমদের শাস্তি।’

অবশেষে প্রবৃত্তির কুপ্ররোচনা ভাইকে মেরে ফেলা তার জন্য সহজ করে দিলো এবং তাকে হত্যা করে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলো।

তারপর আল্লাহ একটি কাক পাঠালেন। হত্যাকারী তার ভাইয়ের মৃতদেহ কীভাবে লুকাবে তাকে তা দেখিয়ে দেওয়ার জন্য কাকটি মাটি খুঁড়তে লাগলো। এটা দেখে সে বলল, ‘হায়রে! আমি কি আমার ভাইয়ের মৃতদেহটি লুকাতে এই কাকটির মতোও বুদ্ধি খাটাতে পারলাম না?’ এরপর নিজের কৃতকর্মের জন্য সে অনুতপ্ত হলো।” (সূরা মায়েদা ৫:২৭-৩১)

[2] এর শাব্দিক অর্থ বিশৃঙ্খলা বা অনর্থ সৃষ্টি করা। কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে বাংলা ভাষায় এটি ‘ফ্যাসাদ’ হিসেবে চালু রয়েছে।

[3] ‘হেরাবা’ হলো ইসলামী দণ্ডবিধি। প্রকাশ্য ডাকাতি, খুন, সশস্ত্রপন্থায় জোরপূর্বক সম্পত্তি দখল, সরকারী সুযোগ-সুবিধা ধ্বংস করা ইত্যাদি অপরাধ এর আওতাভুক্ত।

জামাল বাদাবী
জামাল বাদাবীhttp://jamalbadawi.org/
মিশরীয় বংশোদ্ভূত কানাডীয় ইসলামী স্কলার। কানাডার সেইন্ট মেরি ইউনিভার্সিটির সাবেক অধ্যাপক। লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট ও বক্তা হিসেবেও সুপরিচিত। ইসলামের সামাজিক দিক নিয়ে তাঁর অনেক কাজ রয়েছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

অনুগ্রহপূর্বক আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহপূর্বক এখানে আপনার নাম লিখুন

সাম্প্রতিক আর্টিকেল

ইসলামী পুনর্জাগরণের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি

মুসলিম বিশ্বে সম্প্রতি ধার্মিকতা হ্রাস পাচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে। ইন্টারেস্টিংলি,...

অমুসলিম নারী-পুরুষ কি মসজিদে প্রবেশ ও ইবাদত করতে পারবে?

দক্ষিণ আফ্রিকার একজন ধর্মান্তরিত মুসলমানের কাছ থেকে একবার আমি একটি তিক্ত ঘটনা শুনেছি। তিনি...

নারীদের মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামাজ পড়ায় কোনো ফযিলত আছে কি?

সূরা জুমায় আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوٓا إِذَا نُودِىَ لِلصَّلٰوةِ مِن يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا...

নারীদের মসজিদে যাওয়ার উপযোগী পোশাক

মসজিদে যেতে হলে নারীদের কি বিশেষ কোনো পোশাক পরিধান করতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর...

নারী অধিকার প্রসঙ্গে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা বনাম সামাজিক প্রথা

এডিটর’স নোট: নারীদেরকে ইসলাম যেভাবে স্বাধীন সত্তা, আত্মমর্যাদা, অধিকার ও দায়িত্বসম্পন্ন এজেন্ট হিসেবে বিবেচনা...

আরো পড়ুন
---------