শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭
হোম > নির্বাচিত > অন্যান্য কমিউনিটির সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক (পর্ব-১)

অন্যান্য কমিউনিটির সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক (পর্ব-১)

এডিটর’স নোট:

অন্যান্য ধর্মীয় বা জাতিগত সম্প্রদায়ের সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক কী বিদ্বেষপূর্ণ বা শত্রুতামূলক হবে, নাকি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান হবে? এ ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী কী? প্রশ্নটি নতুন না হলেও বর্তমান বৈশ্বিক মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে এটি সবার জন্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ বৃটেনের ইস্ট লন্ডন মসজিদে জুমার খুতবায় ড. জামাল বাদাবী এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি কোরআন, হাদীস ও রাসূলের (সা) জীবনীর আলোকে এ সম্পর্কিত মূল্যবোধগুলো তুলে ধরেছেন।

ড. জামাল বাদাবী মিশরীয় বংশোদ্ভূত কানাডীয় ইসলামী স্কলার। তিনি কানাডার সেইন্ট মেরি ইউনিভার্সিটির সাবেক অধ্যাপক। লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট ও বক্তা হিসেবেও তিনি সুপরিচিত। ইসলামের সামাজিক দিক নিয়ে তাঁর প্রচুর কাজ রয়েছে।

সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্যে এই খুতবার ধারাবাহিক অনুবাদের অংশ হিসেবে আজ প্রথম পর্ব পাবলিশ করা হলো।


আজকের খুতবার বিষয় হচ্ছে অন্যান্য কমিউনিটির সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক। এ আলোচনায় দুটি বিষয়ের উপর আমরা দৃষ্টিপাত করবো। এই সম্পর্কের ভিত্তি কী? (১) এটা কি কারো দাবি কিংবা কাজের উপর নির্ভরশীল? নাকি, (২) এ বিষয়ে কোরআন ও সুন্নাহর দিকেই আমরা ফিরে যাবো? এ জন্যে প্রাথমিকভাবে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে হবে। তারপর এগুলো নিয়ে আরো বিস্তারিত জানতে হবে। শেষোক্তটিকে আমি ‘ইসলামী বিশ্বজনীন মূল্যবোধ’ হিসেবে বলতে চাই। এটা অনেক লম্বা সময়ের ব্যাপার। এই সম্পর্ক নিয়ে ইসলামে কোনো অসঙ্গতি নেই। শুধু মুসলমানদের উদ্দেশ্যে কোরআনে যেমন বক্তব্য রয়েছে, তেমনি সমগ্র মানবজাতির উদ্দেশ্যেও বক্তব্য রয়েছে। কোরআনের ‘ইয়া আইয়ুহান নাস’ (হে মানুষ!) কিংবা ‘হে আদমের সন্তানেরা!’ জাতীয় সম্বোধনগুলো প্রত্যেক কমিউনিটিকে অন্তর্ভুক্ত করে।



তিনটি মৌলিক বিশ্বাস

শুরুতে আমি ইসলামের তিনটি মৌলিক বিশ্বাস নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবো।

তাওহীদ

তাওহীদ বলতে শুধু একেশ্বরবাদ নয়, বরং তারচেয়েও বেশি কিছু বুঝায়। তাওহীদের ধারণা অনুযায়ী বিশ্বজগতের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকর্তা ও পালনকর্তা হিসেবে আল্লাহর এককত্বকেই বুঝায়। তাই আল্লাহ তায়ালাই আমাদের উপাসনা ও পূর্ণ আনুগত্য সমর্পণের একমাত্র প্রাপ্য সত্ত্বা। আল্লাহর কোনো অংশীদার নেই। অর্থাৎ, ‘আসমা ওয়াস সিফাত’ তথা আল্লাহর গুণাবলি ও চমৎকার নামসমূহ এমন কোনো সত্ত্বার অংশ নয়, যা নিজেই অন্য কোনো রূপ বা প্রতিমূর্তি হিসেবে বিবেচিত। এ কারণেই তাওহীদের ধারণা একেশ্বরবাদের ধারণাকে ছাড়িয়ে যায়। এ ধারণা অনুযায়ী, আল্লাহ একজন। আল্লাহ তায়ালার গুণাবলি ও চমৎকার নামসমূহের দিকে তাকালে আমরা দেখবো যে – তিনি হচ্ছেন চূড়ান্ত হুকুমদাতা ও পরম সত্ত্বা। তাই কে কী বললো বা দাবি করলো তা বিবেচ্য নয়। কারণ পরম সত্ত্বা আল্লাহ তায়ালাই আমাদেরকে বলে দিয়েছেন – কোনটা সঠিক, আর কোনটা ভুল; কোনটা সত্য, আর কোনটা মিথ্যা। আল্লাহর প্রতি এই আনুগত্যের ভিত্তি হচ্ছে – তাঁর পরম প্রজ্ঞার প্রতি গভীর আস্থা, তাঁর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর সন্তুষ্টির প্রত্যাশা ও জান্নাতের আকাঙ্খা; পাশাপাশি তাঁর অবাধ্যতাকে পরিহার করা, যা পরকালে মানুষকে চূড়ান্ত ক্ষতির দিকে নিয়ে যায়।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এগুলো বিশাল ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাপার কিংবা নিছক বিমূর্ত কিছু কথাবার্তা। প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটা তেমন নয়। মুসলিমরা যখন অমুসলিমদের সাথে মেলামেশা করে তখন এর বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়। ধন-সম্পদ বা প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকা সত্বেও একজন সত্যিকারের মুসলমান অহংকারী ও উদ্ধত হয়ে ওঠে না, মানুষের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অন্যায়ে লিপ্ত হয় না। কারণ সে জানে, পরকালে এসব কৃতকর্মের জন্যে কঠোর শাস্তি রয়েছে।

নবুয়ত

যুগে যুগে আগত নবী-রাসূলগণ এবং তাঁদের মাধ্যমে আল্লাহর প্রেরিত বাণীর প্রতি আমরা বিশ্বাস রাখি। নবুওয়তের ধারণা এবং পূর্বেকার নবী-রাসূলগণের নিকট প্রেরিত বাণীর মূলকথা একই। আমরা শুধু সে অংশগুলোর উপর গুরুত্ব দেবো, যেগুলো এখনো অবিকৃত রয়েছে। আল্লাহর সে সমস্ত বাণীর কোন অংশগুলো অবিকৃত – তা জানার একমাত্র উপায় হচ্ছে কোরআন। কারণ আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের জন্যে অন্য কোনোকিছু বিবেচনার মানদণ্ড হিসেবে কোরআনকে গ্রহণ করার জন্যে বলেছেন। তিনি বলেছেন,

وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ

আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি সত্যগ্রন্থ, যা পূর্ববতী গ্রন্থসমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণকারী। (সূরা মায়েদা: ৪৮)

পূর্বে নাজিলকৃত ওহীর যে অংশটুকু অক্ষুন্ন ও অপরিবর্তিত রয়েছে সেগুলোকে অনুমোদন দিতেই কোরআন এসেছে। তাই কোরআন হচ্ছে ‘মোহাইমিন’ তথা চূড়ান্ত ফয়সালাকারী বা মানদণ্ড। এ কারণে একে ‘আল ফোরকান’ও বলা হয়। যার অর্থ হচ্ছে, বিকৃত ও অবিকৃত বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করার মানদণ্ড।

তাই একজন প্রকৃত মুসলমান কখনোই পূর্বে নাজিলকৃত সব ওহীকে নির্বিচারে গ্রহণ বা বর্জন করে না। কোরআন যে ব্যাপারে একমত পোষণ করে, মুসলমানরা তা গ্রহণ করে। যেহেতু তা কোরআনের মর্মবাণীর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

এর তাৎপর্য এই যে – এখানে একাধিক স্রষ্টার মধ্যে প্রতিযোগিতা বা দ্বন্দ্ব নেই, কারণ স্রষ্টা তো একজনই। কিছু কিছু ব্যাপারে আমরা ভিন্ন বিশ্বাস ধারণ করলেও প্রকৃতপক্ষে অন্যান্য নবী-রাসূল বা তাঁদের উম্মতদের বিপক্ষেও আমাদের কোনো অবস্থান নেই। বরং সত্যিকার অর্থে এটি বিদ্যমান মুসলিম কমিউনিটিকে আরো বৃহত্তর ঈমানদার কমিউনিটিতে উন্নীত করার পথ প্রশস্ত করে। কারণ পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ শুধু তাদেরই নয়, আমাদেরও। কোরআনের ভাষ্য হচ্ছে,

لَا نُفَرِّ‌قُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّ‌سُلِهِ

আমরা তাঁর পয়গম্বরদের মধ্যে কোনো তারতম্য করি না। (সূরা বাকারাহ: ২৮৫)

৩। আখেরাতে ব্যক্তিগত জবাবদিহিতা

আখেরাতে আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রত্যেককে ব্যক্তিগতভাবে জবাবদিহি করতে হবে। অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষই তার কথা ও কাজ তথা সবকিছুর জন্যে আল্লাহর নিকট দায়বদ্ধ। কেউ মনে করতে পারে – কোনো ব্যাপারে সে দুনিয়ার শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে যাবে। বাস্তবে হচ্ছেও তাই। খুন-খারাবির মতো অপরাধ করেও কেউ কেউ রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পরকালে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা ও শাস্তি থেকে কেউ রেহাই পাবে না।

এই মৌলিক বিশ্বাসেরও একটা বাস্তব প্রয়োগ রয়েছে। সেটি হলো – যদি কোনো মুসলিম বা মুসলিম গোষ্ঠী দুঃখজনকভাবে আল্লাহ বা ইসলামের নামে অন্যদেরকে হয়রানী, দুর্ব্যবহার, কোরআনের শিক্ষার বিপরীতে গিয়ে ইসলাম গ্রহণে বাধ্যকরণ কিংবা বর্বরভাবে হত্যা করে; তাহলে পরকালে তাদের জন্যে নিকৃষ্ট পরিণতি অপেক্ষা করছে। এ বিষয়ে মাওলানা মওদূদী বলেছেন, পরকাল, জবাবদিহিতা, শাস্তি ও পুরস্কারে বিশ্বাসের ধারণাগুলো নিরেট তত্ত্বকথা কিংবা খোদার প্রতি অন্ধবিশ্বাস মাত্র নয়। তাঁর মতে, এটি হচ্ছে একজন মুসলমানের যাবতীয় নৈতিকতা ও নৈতিক আচার-আচরণের ভিত্তি। ইচ্ছা করলে কোনো ব্যক্তি আখেরাতে বিশ্বাস না করে আল্লাহর অবাধ্যতাকে উপভোগ করতে পারে।

যাইহোক, এবার মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক। অন্যান্য কমিউনিটির সাথে মুসলমানদের সম্পর্কের কথা পরিস্কার করতে গিয়ে আমরা এইসব মৌলিক আকিদা-বিশ্বাসগুলো ছাড়াও আরো কিছু সহজ বিষয় তুলে ধরতে পারি, যাতে সব ভুল বুঝাবুঝি দূর হয়ে যায়। তাই আমরা কোরআন-সুন্নাহ ও প্রিয় নবীর (সা) জীবনী থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ সম্পর্কে আলোচনা করবো। এগুলো অন্য কারো মতামত নয়।

পরবর্তী পর্বসমূহ: পর্ব ২, পর্ব ৩  এবং শেষ পর্ব

আইয়ুব আলী
আইয়ুব আলী
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়নরত

আপনার মন্তব্য লিখুন