ইসলামের ডিসকোর্সগুলোতে আমরা পরমতসহিষ্ণুতা খুঁজে পাই না। সাধারণত দুটি প্রান্তিক অবস্থান দেখা যায়। নিজের পক্ষের কেউ যদি অন্য পক্ষকে ভিত্তিহীন কটু মন্তব্য করে নাস্তানাবুদও করে, সেটাতে আমরা দোষ খুঁজে পাই না। এক্ষেত্রে যে বলছে তার কথায় যে ভালো যুক্তি নেই সেদিকে তো আমাদের খেয়াল থাকেই না, বরং যে কটু কথা ব্যবহার করা হয়েছে সেটাকেও বেশ বীরত্বপূর্ণ মনে করি। আবার অন্য পক্ষের কেউ যদি খুব যৌক্তিকভাবে আমাদের সমালোচনা করে (কিছুটা কড়া কথা ব্যবহার করে হলেও), সেক্ষেত্রেও আমরা সেই যুক্তিকে পরখ করতে উদ্গ্রীব নই, এবং সামান্য যে তীর্যক কথা তার সমালোচনায় পাওয়া গেছে সেটাতে খুব ফোকাস করি। স্পষ্টতই এটি ডাবল স্ট্যান্ডার্ড।

এই সমস্যার মূলে রয়েছে আমাদের প্রেস্ক্রিপটিভভাবে ফাতওয়া দিয়ে ইসলাম বোঝার সমস্যা। সাধারণ জীবনে আমাদের ফাতওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ প্রতিটি ইস্যুতে চুলচেরা জ্ঞানগত বিশ্লেষণের ক্ষমতা বেশিরভাগ মানুষই রাখে না, আর ক্ষমতা থাকলেও সব বিষয়ে গবেষণা করার মতো সময় থাকে না, ইন্সট্যান্ট ডিসিশন নিতে হয়। এরকম পরিস্থিতিতে ফাতওয়ার প্রয়োজন কেউ অস্বীকার করে না।

সমস্যাটা হচ্ছে যখন ফাতওয়া একটি চলতি সমস্যার সমাধান হিসেবে ব্যবহৃত না হয়ে ইসলামকে সম্যকভাবে বোঝার মাধ্যম হয়ে যায়। এটাকে আমরা ফাতওয়া মেন্টালিটি বলতে পারি। ফাতওয়া মেন্টালিটির চরিত্রটা হলো যখন একজন মুসলিম মনে করা শুরু করে যে একজন ব্যক্তি বা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দেয়া ইস্যুভিত্তিক একক মতগুলোই সঠিক মত। তার ধারণা– একটি একধারার সূত্র রয়েছে যেখান থেকে বা যেখানে পুরো ইসলামটাকে সম্পূর্ণ সঠিক ফর্মে উদ্ধার করা যাবে। তাই সে এই একটি নির্দিষ্ট ধারার বা সূত্রের সকল ‘আলেম, প্রকাশনী, ভিডিও চ্যানেলের মেটেরিয়াল ইত্যাদি অনুসরণ করতে থাকে। এটা করার মাধ্যমে সে গোটা ইসলামের শোচণীয়রকম স্বল্প জিনিসই পায়, কিন্তু সে মনে করতে থাকে– তার সম্যক গবেষণা না থাকলেও এই যে একটি বিশ্বস্ত সূত্র সে পেয়ে গেছে, এটা দিয়েই গোটা ইসলামটা ধরে ফেলা যাচ্ছে। তার জানাটা শুধু সঠিকই নয়, সেটা সম্পূর্ণও বটে। শুধু সঠিক ইসলামই তার জানা তাই নয়, মোটামুটি পুরো ইসলামটা তার জানা। ইসলামের মূল কাঠামো তার আয়ত্তে। যদি অল্প কিছু বাদ থেকেও থাকে, ওটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়।

অথচ একটি নির্দিষ্ট সূত্র বা ধারা – যার ওপর তার আস্থা রয়েছে – সেখান থেকে ইসলাম পালনের জন্য তার যে প্রশ্নগুলো সেগুলোর উত্তর জানতে কোনও সমস্যা ছিলো না। সেটা করাটাই লজিক্যাল। অধিকাংশ মানুষ তাই করবে। মূল সমস্যা এটা নয় যে আমরা সবার মত জেনে গবেষণা করে সিদ্ধান্তে আসছি না, কারণ সেটা সম্ভব নয়। কিন্তু সমস্যাটা হলো–আমি যে ‘আলেমের মত শুনছি, যে বই পড়ছি, যে ভিডিও লেকচার দেখছি সেটা কেবল একজন বক্তা বা লেখক বা নিদেনপক্ষে একটি নির্দিষ্ট ঘরানা বা স্কুলের চিন্তা, তা যখন আমি অ্যাপ্রিশিয়েট করি না। সময় ও গবেষণাশক্তির ঘাটতির কারণে আমি সেটাকে অনুসরণ করতে পারি বটে, কিন্তু একইসাথে আমার মনে চেতনা কাজ করা দরকার যে আমার এই জানা কতটা সংকীর্ণ, সীমিত‌ ও একপেশে। অন্য কোনো ঘরানার অনুসারীর জানাটা ঠিক হবার সম্ভাবনা যতটুকু, আমার জানাবুঝা ঠিক হবার সম্ভাবনা ততটুকুই। অথচ, বহু ঘরানার মাঝে মাত্র একটি ঘরানাকে আমি অনুসরণ করছি– এই কনশাসনেস আমার মাঝে থাকলেও আমি কেবল নিজেকেই ঠিক মনে করি। কারণ আমার বদ্ধমূল ধারণা, আমি ও আমার বন্ধুরাই সঠিক ঘরানাকে বেছে নিতে পেরেছি।

ফলে একজন সালাফি/আহলে হাদীস মনে করছে, সে যেভাবে ইসলাম ফলো করছে সেটাই একেবারে কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক হচ্ছে। যদিও সে নিজে খুব অল্পই কুরআন-হাদীস পড়েছে, এর ব্যাখ্যাও তার অল্পই জানা, এবং সেটা আসছেও মূলত অন্য কাউকে অনুসরণ করার মাধ্যমেই। একজন মাযহাবি মনে করছে, তার মাযহাব অনুসরণের মাধ্যমে গোটা ইসলাম পালন হয়ে যাচ্ছে, অন্য সকল মাযহাব তার মাযহাবের মতো পোক্ত নয়। একজন জামাতি মনে করছে, ইসলামের রাজনীতিকে সে সবচেয়ে ভালো ধারণ করছে। যদিও ইসলামের রাজনৈতিক আলোচনা তার খুব কমই জানা, এবং এ ব্যাপারে সে একটি নির্দিষ্ট স্কুলের মেটেরিয়ালই অনুসরণ করে। একজন তাবলীগি মনে করে, তার তাবলীগই হচ্ছে আল্লাহ্‌র রাসূলের (সা.) তাবলীগের সবচেয়ে পিউর ফর্ম, যদিও তার সব জানাশোনা তার নিজের গ্রুপেই ঘুরপাক খায়।

অথচ একজন ব্যক্তির সালাফি, মাযহাবি, জামাতি, তাবলীগি বা সুফি হওয়াতে কোনও সমস্যা ছিলো না প্রথম বিচারে। যে আলেমের বা যে স্কুলের ব্যাখ্যায় আপনি আস্থা পেয়েছেন সেটা অনুযায়ী আপনি আপনার ধর্মকে এক্সিকিউট করবেন সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু গোল বাঁধে তখনই, যখন আপনি আপনার দুর্বলতাকে আপনার শক্তি ভাবা শুরু করেন। আপনি কেবলই একজন সালাফি বা সুফি বা জামাতি বা তাবলীগি – এটা কিন্তু আপনার ব্যক্তিদুর্বলতার কারণেই। আপনার জ্ঞান ও বুদ্ধির সীমাবদ্ধতার কারণেই কিন্তু আপনি যে কোনও ইসলামিক প্রশ্নে নিজে সিদ্ধান্ত তৈরি করতে পারেন না, ফলে আপনি একটি গোষ্ঠীকে অনুসরণ করেন। এমনকি কাকে অনুসরণ করবেন, সেটাও কিন্তু ঠিক হয় আপনারই সিদ্ধান্তে; সেই আপনি, যার জ্ঞান ও বুদ্ধি সীমাবদ্ধ। কিন্তু এই অনুসরণ করার পথে আপনি অদ্ভুতভাবে নিজের কোনও ঐশী শ্রেষ্ঠত্ব খুঁজে পান! যার কারণে আপনার মনে হতে থাকে যে কাকে অনুসরণ করবেন সে ব্যাপারে আপনার সিদ্ধান্ত নেয়া একেবারে ওহী নাজিল হওয়ার মতো ব্যাপার! একবার যখন সঠিক মুরশিদ আপনি বেছে নিয়েছেন, এখন মুরিদ হিসেবে আপনার আর চিন্তা নেই!

এই মনোভাব প্রকাশ পায় যখন আপনার জ্ঞান এত পরনির্ভরশীল হওয়ার পরও সেই জ্ঞান দিয়েই আপনি অন্য পরনির্ভরশীল কারও ‘ভুল’ – অর্থাৎ যেটা আপনার চোখে ভুল – সেটাকে দ্ব্যর্থবোধকভাবে ভুল প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগেন। যদিও আপনার নিজের অনুসৃত মতটাও যে ভুল হতে পারে সে চেতনা আপনার কাজ করে না। শুধু তাই নয়, আপনার নিজের মত ভুল হলে সেটা বোঝার ক্ষমতাই আপনার নাই।

এই সমস্যা তৈরির পেছনে অনুসারীরা যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী যাদের অনুসরণ করা হচ্ছে তারাও। যেসব ‘আলেমরা বা ইসলামিক চিন্তাবিদদের মানুষ অনুসরণ করছে তারা কিন্তু অন্তত জানেন– বেশিরভাগ ইস্যুতেই ইসলামের মতগুলো এত সোজাসাপ্টা নয়। তারা নিজেরা গবেষণা করে একটা সিদ্ধান্তে এসেছেন বটে, কিন্তু একই রকম তুমুল গবেষণা করেও আরেকজন সমমানের মেধাবী চিন্তাবিদ আরেকটি বিপরীত সিদ্ধান্তে এসেছেন। কিন্তু আমাদের সময়ে খুব কম আলেম বা স্কলারকেই আপনি অন্যের মতকে স্পেইস দিতে দেখবেন।

স্পেইস দেয়ার অর্থ এই নয় যে আপনি আপনার নিজের মত থেকে সরে আসবেন। আপনি যখন একবার গবেষণা করে একটি সিদ্ধান্তে এসেছেন, সেটাতে কেবল আরেকজন আরেকটি মত দিচ্ছে বলে আপনাকে নিজের মত ছাড়তে হবে তা নয়। কিন্তু নিজের মতকে ফার্মলি জানানোর পাশাপাশি অন্যের মত দেয়ার অধিকার ও সেটাও যে সঠিক হবার একই অধিকার রাখে, এই ব্যাপারটা মাথায় রাখা এবং মানুষের কাছে তা স্পষ্ট করে দেয়াটাই হলো স্পেইস দেয়া।

এখনকার অনেক স্কলারদের এরকম রেটোরিক্যাল ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’ টাইপের মনোভাব দেখে মনে হতে পারে– ‘আলেমরা বুঝি সবসময় এরকম যুদ্ধংদেহী ছিলেন, নিজের মতকেই শুধু ঠিক মনে করতেন, এবং অন্যদের তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতেন, নিজের ফাতওয়ার বিপরীতে যাওয়া অন্যান্যরা কত অসৎ, খারাপ, বিপথে যাওয়া – সেটা মনে করিয়ে দিতেন।

এই উদ্দেশ্যে আমি ইমাম আশ-শাফি’ইর একটি উপযুক্ত উক্তি উল্লেখ করছি এখানে। আশ-শাফি’ই তাঁ ‘আল-উম্ম’ গ্রন্থে বলেছেন:

“যে ব্যক্তি মুত’আ[1] বিয়েকে বৈধ করে, বৈধ বলে ফাতওয়া দেয়, এবং নিজে মুত’আ বিয়ে করে, তার সাক্ষ্য দেয়ার অধিকারকে ক্ষুণ্ন করা যাবে না। একইভাবে যে ব্যক্তি নিজে সচ্ছল হয়েও একজন ক্রীতদাসীকে বিয়ে করে ও সেই বিয়েকে বৈধ মনে করে, তার সাক্ষ্য দেয়ার অধিকারও কেড়ে নেয়া যাবে না। কেননা আমরা মানুষের মাঝে এমন মুফতি ও স্কলারদেরও পাই, যারা এসবকে হালাল করেছেন। একইভাবে হাতে হাতে এক দিনারের বদলে দুই দিনার বা এক দিরহামের বদলে দুই দিরহাম আদানপ্রদান করাকে যে হালাল মনে করে এবং এরকম লেনদেনে যুক্ত হয় (তার ব্যাপারেও একই কথা খাটে)। যে ব্যক্তি মনে করে স্ত্রীদের পেছন থেকে আসা যায় (অ্যানাল সেক্স) তার ব্যাপারেও একই কথা। এসবই কিন্তু আমাদের কাছে নিতান্ত অপছন্দনীয় ও অবৈধ (মাকরুহ মুহাররাম) যদিওবা কিছু মানুষ আমাদের সাথে দ্বিমত পোষণ করে – তাদের মতকে আমরা প্রত্যাখ্যান করি। কিন্তু তার মানে এই নয়– আমরা তাদের বলবো: আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তোমরা তাকে হালাল করছো এবং খুব গর্হিত কাজ করছো। কেননা তারাও আমাদেরকে একইভাবে অভিযুক্ত করতে পারে, যেভাবে আমরা তাদের করছি। তারাও আমাদের কথার অনুসারীকে বলতে পারে– আল্লাহ্‌ যা হালাল করেছেন সে তাকে হারাম করছে।” [আল-উম্ম, ৬/২০৬]

এখানে যে কাজগুলোর কথা ইমাম শাফি’ই বলেছেন– এসব শুধু তার কাছেই হারাম নয়, মোটামুটি সুন্নি মুসলিমদের প্রায় সবার কাছেই হারাম। কিছু কিছু কাজ কুরআন-হাদীস দিয়ে অ্যাপারেন্টলি অবৈধ ঘোষিত বলেই আমরা জানি। যেমন– হাতে হাতে এক টাকার বদলে দুই টাকার লেনদেনের যে উদাহরণ, তা হাদীস দিয়ে স্পষ্ট সুদ হিসেবে পরিচিত। অ্যানাল সেক্স কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় নিষিদ্ধ। এবং ইমাম শাফি’ই নিজেও এখানে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে এগুলো তার কাছে পরিষ্কার হারাম। কিন্তু তাই বলে অন্য ব্যক্তির মত দেয়ার বা ভিন্নভাবে চিন্তা করার যে স্কোপ রয়েছে, সেটাকে তিনি অস্বীকার করছেন না। এমনকি সেসব বিষয়েও, যেসব বিষয়ে আমাদের ধারণা হলো– এগুলোতে মতপার্থক্যের কোনও সুযোগ নেই। এবং এ ব্যাপারগুলোতে নিজের স্পষ্ট ধারণা থাকার পরও ইমাম আশ-শাফি’ই কতটা প্রজ্ঞাবান যে নিজের মতে তিনি অটল থাকলেও, অন্যের মতকে এবং অন্যকে স্বীয় মতে অটল থাকার স্পেইস তিনি দিচ্ছেন। এটুকু অনুধাবনও তার মনে ঠিকই কাজ করছে যে তিনি যদি অন্যকে দোষারোপ করেন, তাহলে অন্যেরাও ঠিক একইভাবে তাকে দোষারোপ করতে পারে।

অথচ আমাদের সময়ে বহু স্কলার বা তাদের অনুসারীদের এরকম বহু বিষয়ে স্পষ্ট ডিসমিসিভ কথা বলতে শোনা যায়, যেন এ ব্যাপারে কোনও দ্বিতীয় মত থাকতে পারে না। যারা অন্য মত দিচ্ছে তারা বক্র, পথভ্রষ্ট, কুটিল লোক, শয়তানের দোসর।

সক্রেটিসের ‘নো দাইসেলফ’ কথাটি খুবই দামী একটি কথা। কিন্তু যে মুসলিম অন্য মুসলিমের কথাই শুনতে পারে না, সে সক্রেটিসের কথা শুনবে এমনটা আশা না করাই ভালো।

নোট:

[1] মুত’আ বিয়ে হলো এক ধরনের ফিক্সড পিরিয়ড বিয়ে, যাতে বিয়েটি কতদিন ভ্যালিড থাকবে সে ব্যাপারে বিয়ের ‘আকদে একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে দেয়া হয়। ঐ সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলে চুক্তি অনুযায়ী বিয়ে বাতিল হয়ে যায়। এই বিয়েতে কোনও উত্তরাধিকার থাকে না। সুন্নি ‘আলেমদের অধিকাংশই এই বিয়েকে হারাম মনে করেন।

4 টি মন্তব্য

  1. সহজ-সাবলিল ভাষায় লেখা! আমরা ঠিক এভাবেই চিন্তা করি। লেখাটা পড়ার পর মনে হচ্ছিলো, কথাগুলো যেন আমার জন্যই লেখা হয়েছে। যদিও নিজের স্বভাব পরিবর্তন করাটা সহজ নয়; তথাপি চেষ্টা করব ইনশা আল্লাহ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন