ইসলাম মানুষের জীবনকে ফান্ডামেন্টালি ডিফাইন করে― আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্কের ভিত্তিতে।

আল্লাহর সাথে মানুষের এই সম্পর্ক রক্ষা করা এতই ফান্ডামেন্টাল একটা ব্যাপার― এইখানে পরিবার, সমাজ, সংস্কার― সবকিছুই গৌণ। এইখানে আধুনিকতার সাথে ইসলামের একটা ‘স্থূল’ মিল আছে। আধুনিকতাও এই ― পরিবার, সমাজ, সংস্কারকে― সেকেন্ডারি বিষয় আকারে দ্যাখে, ইসলামও সেকেন্ডারি বিষয় আকারে দ্যাখে।

কিন্তু, এখানে একটা মৌলিক ফারাক আছে। ‘আধুনিকতা’ ব্যক্তিসত্তাকে দ্যাখে― একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ব্যিং আকারে। অর্থাৎ, আধুনিকতায় ‘ব্যক্তি’ নিজেই সর্বেসর্বা। এইখানে কেউ ইন্টারফেয়ার করতে পারবে না, আনলেস সে অন্য কারো সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু, ইসলামে ব্যাপারটা মোটেই এরকম না। ইসলামে― ‘ব্যক্তিসত্তা’ ইন্ডিপেন্ডেন্ট না― বরং নৈতিকভাবে সে এক অমনিপটেন্ট সত্তা ‘আল্লাহ’র কাছে দায়বদ্ধ। এবং সে আল্লাহর বিধান মানতে বাধ্য। তার দায়িত্ব হচ্ছে, আল্লাহকে ভালোবাসার মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করা। এবং আল্লাহকে সেন্টারে রেখে― তার নিজের সত্তা, পরিবার, সমাজ, সংস্কার, প্রাণি, পশু-পাখি― সব কিছুর সাথে তার সম্পর্ক নির্ণয় করা।

ইসলামে কোনো ‘ব্যক্তি’ নিজেই নিজের ‘মালিক’ না। ফলে, এমনকি তার নিজেই নিজের কোনো ক্ষতি করার অনুমতি/অধিকার নাই। আবার ‘ব্যক্তি’ যেমন নিজের প্রতি নিজের কর্তব্যের ব্যপারে দায়বদ্ধ, একইভাবে আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী অন্যদের প্রতিও দায়বদ্ধ। ফলে, ‘মাই লাইফ, মাই ডিসিশান’― এইটা বলার অধিকার তার নাই। আপনি চাইলেই নিজের অঙ্গহানি নিজে করতে পারবেন না। নিজের জীবন নিজে নিতে পারবেন না। নিজেকে নিজে ঘৃণা করতে পারবেন না। নিজেকে ওর্থলেস মনে করতে পারবেন না। কারণ― ইসলাম আপনার ওর্থিনেস বিবেচনা করবে― আপনি কতটুকু সৎ এইটা দিয়া, আপনার দুনিয়াবি পজিশান দিয়া না।

ফলে, আপনি তখনই নিজের উপর বিরক্ত/হতাশ হইতে পারেন― যখন আপনি একচুয়ালি কোনো অন্যায় করতেছেন। এবং এই অন্যায় করার প্রবণতাও যেহেতু পরীক্ষার জন্য আল্লাহরই দেয়া (ফা আলহামাহা ফুজুরাহা ও তাকওয়াহা), সেইজন্য অন্যায় করলেও আসলে আল্লাহ আপনাকে বরং হতাশ হইতে নিষেধ করতেছেন এবং বলতেছেন, নিজের অন্যায় বুঝতে পারার সাথেই আবার বিশুদ্ধ মনে ন্যায়ের পথে ফিরে আসতে, তাইলে সব অন্যায় সাথে সাথে মওকুফ হয়ে যাবে।

এখন এই সমস্ত বিষয়ই হইতেছে আল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্কের ব্যাপার। এইখানে কোনো ফ্রডগিরি-কপটতা চলে না। কারণ, আল্লাহ হচ্ছেন, আলিমুম বি জাতিস সুদুর― তিনি আপনার অন্তরের অবস্থাও জানেন। ইন্টেনশনের ভিত্তিতেই আল্লাহ কিয়ামতে আপনার বিচার করবেন। কিন্তু দ্যাখেন, আল্লাহ আবার দুনিয়ার সাথে আপনার সম্পর্ককে ভিন্নভাবে ডিফাইন করেন। দুনিয়ায় একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে জাজ করতে পারবে বাহ্যিক আচরণ ও প্রপার এভিডেন্সের মাধ্যমে। এইটা আসলে একটা বিশাল আলাপ।

এই কথাগুলা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে একচুয়ালি ইসলামের প্যারাডাইমের ব্যাপারে একটা ধারণা দেওয়া। আপনি যদি সত্যিই ইসলাম পালনের ব্যাপারে সিরিয়াস হন, আখিরাতের ব্যাপারে যদি কেয়ার করেন, তাইলে আপনার সীমা-পরিসীমার ব্যাপারে আপনার ধারণা থাকতে হবে।

আপনাকে মনে রাখতে হবে, আপনি অভিভাবকহীন নন― বরং আপনার আসল অভিভাবক হচ্ছেন― আল্লাহ তায়ালা। যার দৃষ্টি থেকে কিছুই এড়ায় না, যার শ্রবণশক্তির বাইরে কোনো আওয়াজ নাই, যার জ্ঞানের অজ্ঞাতসারে কিছুই ঘটেনা, যার শক্তি সর্বত্র পরিব্যাপ্ত, যিনি আপনার সামাজিক পজিশান দ্যাখেন না; বরং মনের পরিচ্ছন্নতা দ্যাখেন― এইটা যখন আপনি বুঝতে পারবেন, দুনিয়ার ব্যাপারে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি হবে অন্যরকম। আপনার প্রত্যেকটি মূহূর্তের অনুভুতি হবে ভিন্ন ধরনের। এ এক অনন্য প্রশান্তির ফোয়ারা, যথাযথ বিশ্বাসী ছাড়া যার স্বাদ কেউই পায় না। এদেরকেই আল্লাহ ডাকবেন ‘ইয়া আইয়াতুহান নাফসিল মুতমাইন্না’ বলে। এদেরকেই আল্লাহ ‘শান্তি’র সাথে সম্ভাষণ জানাবেন মহা আকাঙ্ক্ষিত জান্নাতে।

ইসলামে ‘ব্যক্তি’র এই কনসেপ্টের সাথে আরো অনেক বিষয় জড়িত আছে। ইসলাম যখন― ‘দান’ করাকে বাধ্যতামূলক করে, অন্যকে সম্মান করতে বলে, প্রতিবেশির প্রতি দায়বদ্ধতার কথা বলে, সমাজের সঠিক নর্মসগুলো মেনে চলতে বলে, স্বামীদেরকে স্ত্রীর আর্থিক দায়িত্ব নিতে বলে, আবার স্ত্রীদেরকে স্বামীর ন্যায় আদেশ মেনে চলতে বলে, পিতা-মাতার ন্যায় আদেশ সন্তানকে মেনে চলতে বলে, আবার পুরুষদেরকে চক্ষু অবনমিত রাখতে বলে, নারীকে নিজের সৌন্দর্য ঢেকে রাখতে বলে― একজন ‘আধুনিক’ ইগোওয়ালা ‘ব্যক্তি’র মনে হবে― এগুলা তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। কিন্তু একজন সত্যিকারের মুসলিমের মনে হবে― এগুলা তার দায়িত্ব।

ইসলামে ‘ব্যক্তি’ তার নিজের মালিক নয়, বরং আল্লাহর মালিকানায় সে নিজের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। দায়িত্বের সঠিক প্রতিপালন আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ককে মজবুত করবে। এবং এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, তাকেও আল্লাহর কাছে ব্যর্থ করে দেবে।

একটি মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন