তাকদীর বা অদৃষ্টবাদের পক্ষে দার্শনিক যুক্তি: আলোচনার সারসংক্ষেপ

‌‘তাকদীর’ নিয়ে মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক স্যারের সাথে এক সন্ধ্যায় ঘরোয়া পরিবেশে আমরা একটা দীর্ঘ আলোচনা করেছিলাম বছর দুই আগে। তাকদীরের পক্ষে দার্শনিক যুক্তি আছে কিনা তাই তিনি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। আমি এখানে আলোচনাটার সামারি করার চেষ্টা করেছি কয়েকটি পয়েন্টে: ১। আলোচনাটা ছিল মূলত তাকদীর বিশ্বাসকে নিয়ে। মানে একজন লোক আপাতদৃষ্টিতে আস্তিক হোক বা নাস্তিক হোক তার জন্য তাকদীর তথা ফিক্সেশন যে একটা অবশ্যম্ভাবী বিষয় সেটা প্রমাণ করা। আর সেটা করতে গিয়ে স্রষ্টা বা Transcendent তথা জগৎ অতিবর্তী কিছু আছে কিনা...

ইসলামের মূলতত্ত্ব

দ্বীন হলো মহান আল্লাহর হিদায়াত বা পথনির্দেশ— যা তিনি প্রথমে মানুষের সৃষ্টিপ্রকৃতিতে অনুপ্রেরণ (ইলহাম) করেছেন, এরপর উহার প্রয়োজনীয় বিশদ রূপসহ স্বীয় নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে মানুষকে দান করেছেন। এই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ রাসূল হলেন মুহাম্মদ (তাঁর উপর সালাত ও সালাম)। অতএব, দুনিয়াতে দ্বীনের চূড়ান্ত  গ্রহণস্থল কেবলমাত্র মুহাম্মদ স.; তিনিই একমাত্র সত্তা — ক্বিয়ামাত পর্যন্ত যার কাছ থেকে  স্বীয় প্রতিপালকের দিকনির্দেশনা পাওয়া আদমসন্তানের পক্ষে সম্ভব হবে এবং এ একমাত্র তাঁরই পদমর্যাদা — স্বীয় কথা, কাজ, সিদ্ধান্ত ও সম্মতির মাধ্যমে তিনি যে বিষয়কে দ্বীন...

ফরহাদ মজহার: তার চিন্তা ও কাজের একটি পুনর্পাঠ

ফরহাদ মজহার এদেশে মার্কসবাদের প্রচলিত তাত্ত্বিক বয়ানের সংস্কার করেছেন। ধর্ম প্রশ্নে এবং বিশেষ করে ইসলাম প্রশ্নে এদেশে মার্কসবাদের গতানুগতিক "আফিম তত্ত্ব"টি-ই বিরাজ করত। তিনি "তরুণ মার্কস পাঠ" সূত্রে এই প্রচলিত বয়ান পরিত্যাগ করে মার্কসবাদী অবস্থান থেকে ধর্ম ও ইসলাম প্রশ্নকে আরো স্মার্টলি ডিল করেছেন। এর ফলে ফরহাদ মজহারের মার্কসবাদী রাজনীতি এদেশে ইসলামপন্থার বিভিন্ন ধারার সঙ্গে তার ও তার অনুসারীদের একধরনের মৈত্রী তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এটা এদেশে মার্কসবাদের প্রতি তার একটা গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক অবদান। এছাড়া তিনি একাত্তরের ১০...

ধর্ম ও জ্ঞান-বুদ্ধি

আমাদের মাঝে এ কথা বহুল প্রচলিত যে ধর্মের সাথে জ্ঞান-বুদ্ধির কী সম্পর্ক? ধর্ম তো কেবল মেনে নেওয়ার বিষয়। এ ধারণার পক্ষে আলী রা.-এর একটি বাণী দলীল হিসেবে পেশ করা হয় -- "ইসলামী শরীয়তের বিধি-বিধান যদি জ্ঞান-বুদ্ধি নির্ভর হতো তবে আল্লাহর রাসূল স. অযুর ক্ষেত্রে পায়ের মোজার উপরে মাসেহ্ করার বিধান না দিয়ে মোজার তলা মাসেহ্ করার বিধান দিতেন।" কারণ, স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধি অনুযায়ী মোজার তলা মাসেহ্ করাই যুক্তিযুক্ত, যেহেতু মোজার তলা-ই বেশি ময়লাযুক্ত হয়। আমাদের বিবেচনায় এমন ধ্যান-ধারণা কোনভাবেই সঠিক নয়।...

আলেম শব্দের টুকিটাকি

সংজ্ঞা ‘আলিম আরবি শব্দটি উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে এসে ‘আলেম হয়ে গেছে। এর শাব্দিক অর্থ: জ্ঞানী, বিদ্বান, পণ্ডিত ইত্যাদি। আল-কুরআনে শব্দটি আল্লাহর একটি বিশেষ গুণ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে (আল-আন’আমঃ ৭৩; আত-তাওবাঃ ৯৪, ১০৫; আর-রা’দঃ ৯; আল-মু’মিনূনঃ ৯২; আস-সাজদাঃ ৬; সাবাঃ ৩ ইত্যাদি)। সেটি হলো: ‘আলিমুল গাইব বা অদৃষ্ট সম্পর্কে জ্ঞানী। এছাড়া আল-কুরআনে ‘আলেম শব্দটিকে রেপ্রেজেন্ট করছে এমন চারটি সমার্থক পরিভাষা হলো – আর-রাসিখূন ফীল ‘ইল্ম বা জ্ঞানের মধ্যে পারদর্শী (আল-‘ইমরানঃ ৭), উলুল ‘ইল্ম বা জ্ঞানবান ব্যক্তিবর্গ (আল-‘ইমরানঃ ১৮), আল্লাযিনা উতুল ইল্ম বা যাদের...

মুসলিম প্রান্তিকতা: ড. ইউসুফ আল-কারাদাওয়ীর ইনসাইট

আমাদের মুসলিম চিন্তা ও অভ্যাসে প্রান্তিকতা নতুন কিছু নয়। এই প্রান্তিকতা দ্বিমাত্রিক। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম একজন শ্রেষ্ঠ ইসলামিক স্কলার ড. ইউসুফ আল-কারাদাওয়ী (হাফি.) এই দ্বিমাত্রিক প্রান্তিকতার বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। এই দ্বিমাত্রিক প্রান্তিকতাকে তার বিভিন্ন লেখায় তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন অসাধারণভাবে। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত তার মাস্টারপিস বই "আল-হালাল ওয়াল হারাম ফীল ইসলাম" এর ভূমিকায় খুব সুন্দর করে তিনি একে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। সেই প্রাসঙ্গিক অংশটির অনুবাদ নিচে আপনাদের সাথে শেয়ার করা হলো: ইসলাম নিয়ে যারা গবেষণা করেন এবং কথাবার্তা বলেন, তাদের অধিকাংশকেই...

শরিয়া, এথিক্যাল গোলস ও মডার্ন সোসাইটি

কানুন এটি শরিয়া ও ফতোয়া থেকে ভিন্ন জিনিস। শরিয়া হলো ব্যক্তি ও সমাজের নৈতিকতা, অন্যদিকে কানুন হলো যা কর্তৃপক্ষ ব্যক্তি ও সমাজের উপর শক্তিপ্রয়োগে বাস্তবায়ন করে। অধিকন্তু, শরিয়া আর কানুনের মধ্যে পার্থক্য হলো অনেকটা পাপ (গুনাহ) ও অপরাধের পার্থক্যের মতো। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে প্রত্যেকটি পাপ রাষ্ট্রীয়ভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। বস্তুত, কোনো পাপ কিংবা নৈতিক ভুলকে অপরাধে রূপান্তরিত করতে একটা তাকনিন (আইনী প্রক্রিয়ার) প্রয়োজন। আইন প্রণয়ন রাজনীতি ও রাষ্ট্র কাঠামোর একটি বিষয়। অতীতে আমাদের রাষ্ট্রগুলো ছিল খুবই সাধারণ। সেখানে রাজা, ঈমাম, আমীর...

শরিয়া আইন নয়, আইনকে আরবিতে কানুন বলে

ফিকহ ফিকহ শব্দটি আরবি। অর্থ উপলব্ধি, বোঝাপড়া। আর (ইসলামি) ফিকহ হলো শরিয়ার উপলব্ধি ও বোঝাপড়া। পুনরায় ফিকহ মানে আইন নয়, ফিকহ হলো শরিয়া সম্পর্কে ফিকহবিদদের উপলব্ধি। তারা শরিয়াকে নীতিমালায় পরিণত করেন। ফিকহ হলো নীতিমালা; আপনি এসবকে নৈতিক নীতিমালা বলতে পারেন, কিন্তু এগুলো শরিয়ার নীতিমালা নয়। শরিয়া ও ফিকহের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আর এই পার্থক্যটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ফিকহ হলো শরিয়া সম্পর্কে স্কলারদের উপলব্ধি, তারা যা বুঝেছিলেন। মাযহাব ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক স্কলার স্বতন্ত্র পন্থায় শরিয়াকে উপলব্ধি করেছিলেন। পরিশেষে তাদের ছাত্ররা কিংবা ছাত্রের ছাত্ররা...

কেন আমি সর্বদা একজন মা ও গৃহিনী হতে চেয়েছি?

আমি সর্বদা একটি চিন্তা ও স্বপ্ন লালন করতাম, আর তা হলো— একজন মা হওয়ার। আমার বয়স যখন ১৬ বছর, তখন কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করতো— আমি কী কাজ করার কল্পনা করি ও স্বপ্ন দেখি? তখনই আমার মাথায় প্রথম যে চিন্তাটি আসতো তা হলো একজন গৃহকর্ত্রী (Homemaker) হওয়ার। এটা এমন ছিল যে যার জন্য আমি নিয়মিত দোয়া করতাম এবং এই অনুভূতি সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এটি শুধু তারাই বুঝবে যারাই এরকম স্বপ্ন লালন করে। এই স্বপ্নের কথা সর্বদা বিশেষত বান্ধবীদের...

ইসলামে নারী আলেম ও ধর্মপ্রচারকগণ

ধর্মসমূহ বর্তমানে যেসব বড় বড় সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তার অন্যতম হলো আধুনিকতার প্রাসঙ্গিকতা। ধর্মের অনেক লোকজন এই প্রসঙ্গে হয় তাদের ধর্মগ্রন্থকে আধুনিক সময়ের সাথে সংস্কার করে নিতে চাচ্ছে অথবা নতুন ব্যাখ্যার আলোকে ধর্মের কিতাবাদিকে পুনঃব্যাখ্যা করছে বা কিছু বিষয়কে বাদ দিচ্ছে। ধর্মসমূহের মাঝে ইসলামের সৌন্দর্য হচ্ছে এটি বহুমুখী ও বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর রয়েছে বহুমুখী আইনগত মূলনীতি ও ঐতিহ্য, যা সময় এবং সংস্কৃতির সাথে সবদিক থেকে প্রাসঙ্গিক থাকে। বাস্তবতার গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যানের মাঝে আধুনিকতার অবস্থান: মুসলিমদের সঠিক আচরণ কিন্তু আধুনিকতার বিরোধিতা...