শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭
হোম > সামাজিক আন্দোলন > সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া

সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া

Social Movement 07ইসলামের কালোত্তীর্ণ মৌলিকত্ব এবং বিংশ শতাব্দীর প্রধান ইসলামী সংগঠন ও আন্দোলনসমূহের তাৎপর্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রেখে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। যুগোপযোগী সংগঠন ও আন্দোলন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে পুরাতন বা প্রচলিত ‘চিন্তা-কাঠামো’র (paradigm) পুনর্গঠন হলো পূর্বশর্ত। ইসলাম এমন একটি মতাদর্শ, যা মূলত একটি অনন্য সামাজিক আন্দোলন; এর ভিত্তি হলো সুসামঞ্জস্যপূর্ণ তত্ত্ব এবং পরিণতি হলো রাজনৈতিক ব্যবস্থাসহ সমাজের বৃহত্তর লক্ষ্যসমূহ অর্জন।

উপর্যুক্ত দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে ইসলামের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক আন্দোলনের গঠন-কাঠামো ও মৌলিক দিকগুলো নিয়ে একটি পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন সুধী মহলে উপস্থাপন করা হয়েছে। সুধীবৃন্দের পরামর্শের কারণে এর একটি সংক্ষিপ্ত লিখিত ভাষ্য তৈরি করা হয়েছে। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য আজ লিখিত ভাষ্যের  সপ্তম পর্ব উপস্থাপন করা হলো।

আলোচনা বুঝার সুবিধার্থে প্রেজেন্টেশনটি ডাউনলোড করে নিতে পারেন: পাওয়ারপয়েন্ট, পিডিএফ


৭.১
কোনো সংগঠন, ইসলামভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন, প্রশাসন বা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ‘কার্যকর জনসম্পৃক্ততা’র বৈশিষ্ট্য থাকা অপরিহার্য। কোনো বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরাই সাধারণত সিদ্ধান্ত নেবেন। যারা বিশেষজ্ঞ নন, কিন্তু বিষয়ের সাথে সামগ্রিকভাবে সংশ্লিষ্ট, তারা উক্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সময়ে সময়ে এবং সামগ্রিকভাবে অংশগ্রহণ করবেন।

৭.২
সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভারসাম্য বজায় রাখতে তিনটা বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। যথা:
১. পরামর্শ
২. নেতৃত্ব ও
৩. আনুগত্য

 আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলেছেন-

 اِتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ

অর্থ: এ লোকেরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের আহবার (পণ্ডিত) ও রুহবানদেরকে (সন্ন্যাসী) নিজেদের  রব হিসাবে গ্রহণ করেছে [সূরা তওবা: ৩১]

এই আয়াতের তাৎপর্য হলো, বিশেষায়িত জ্ঞানের অপরিহার্যতা সংক্রান্ত কোরআন-হাদীসের অকাট্য বর্ণনাসমূহের (নস্) বা ‘মাযহাব মেনে চলা’র প্রয়োজনীয়তার ভুল ব্যাখ্যা করে আলেম সমাজের ওপর নিজেদের সোপর্দ করে দেয়া যাবে না। অপরদিকে, প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষে সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়াও সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে বাস্তব জীবনে আমরা যা করি, তাই করতে হবে। যেমন, ডাক্তারের কাছে যখন আমরা যাই তখন ডাক্তারের ডাক্তারিবিদ্যাকে আমরা যাচাই করি না। কিন্তু তিনি আসলে ডাক্তার কি না, চিকিৎসা প্রদানের উপযুক্ত কি না- এসব বিষয় আমরা বিবেচনা করি।

স্মরণ রাখতে হবে, ইসলাম অনুসারে প্রত্যেকেই নিজ নিজ বিষয়ে দায়িত্বশীল বিধায় ইহকালীন ও পরকালীন জবাবদিহিতাও সর্বাবস্থায়ই ব্যক্তিগত। সমস্যা হলো, মানুষ ক্ষমতাপ্রয়োগ ও প্রাপ্তির দাবিকে যথাসম্ভব সম্প্রসারিত করলেও স্বীয় দায়-দায়িত্বের কর্মক্ষেত্রকে ন্যূনতম মানেরও নিচে সীমিত করার চেষ্টা করে। পবিত্র কোরআনের সূরা তাকাসুরের শেষ আয়াতে বলা হয়েছে,

ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ

অর্থ: অতঃপর অবশ্যই সেদিন তোমাদের (প্রত্যেককে) নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে

তাহলে দেখা যাচ্ছে, সত্যিকার অর্থে কোনো এক ব্যক্তির পক্ষে সকল বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়া এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব নয়। তাই আমাদেরকে নির্ভর করতে হয়। তবে তা করতে গিয়ে সর্বদা চোখ-কান খোলা রাখতে হবে; যেন বিনা শর্তে কাউকে মেনে নেওয়ার মতো শিরকের সমস্যা না ঘটে।

৭.৩
প্রচলিত ইসলামী সংগঠন ও আন্দোলনসমূহে নেতৃত্ব ও আনুগত্যের ভারসাম্যের ওপর জোর দেয়া হয়। ভারসাম্য হওয়া বা না হওয়ার প্রসঙ্গ আসে এমন বিষয়ের মধ্যে, যাদের পারষ্পরিক সম্পর্ক প্রাসঙ্গিক (occasional)। Q এবং U – এর মতো যেসব বিষয়ের মধ্যকার সম্পর্ক অপরিহার্য (necessary), সেসব বিষয়ে ভারসাম্য থাকা না থাকার প্রসঙ্গ বা দাবি একটি অপ্রয়োজনীয় দ্বিরুক্তি (redundancy)। তাই নেতৃত্ব ও আনুগত্যের সাথে ভারসাম্যের বিষয় হলো যথোচিত পরামর্শ। আনুগত্যের ওপর মাত্রাতিরিক্ত ও একপেশে গুরুত্বারোপের ফলে পরামর্শের বিষয়টি অকার্যকর (over-shadowed) হয়ে পড়ে। যার ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্য বজায় থাকে না। এ জন্য নেতৃত্বের দুদিকে দুটি ব্যাপার সমানভাবে থাকতে হবে- নিরবচ্ছিন্ন পরামর্শ এবং আনুগত্য।

কোরআন শরীফে বলা হয়েছে,

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ

অর্থ: তোমরা ভালো ও তাকওয়ার কাজে পরষ্পরকে সহযোগিতা করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনমূলক কাজে পরষ্পরের সহযোগিতা করো না। [সূরা মায়েদা : ২]

রাসূলুল্লাহ (সা) এর একটি হাদীসে বলা হয়েছে,

عَنْ طَارِقِ بْنِ شِهَابٍ، أَنَّ رَجُلاً، سَأَلَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَقَدْ وَضَعَ رِجْلَهُ فِي الْغَرْزِ أَىُّ الْجِهَادِ أَفْضَلُ قَالَ ‏كَلِمَةُ حَقٍّ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ

অর্থ: হযরত তারিক বিন  শিহাব (রা) থেকে বর্ণিত, ঘোড়ার রেকাবে পা রেখে এক লোক রাসূল (সা) কে প্রশ্ন করলো, সর্বোত্তম জিহাদ কোনটি? তিনি বললেন, অত্যাচারী শাসকের মুখের উপর হক্ব কথা বলা। [সুনানে নাসাঈ]

বিশেষায়িত ও সাধারণ পরামর্শ প্রক্রিয়ার উদাহরণ দেয়া যায় এভাবে- পৃথিবী নিজের কক্ষপথে ঘুরে, পাশাপাশি সূর্যের কক্ষপথেও ঘুরে। একইভাবে বিশেষজ্ঞগণ নিজেরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। পাশাপাশি তারা সাধারণ মানুষের জবাবদিহিতার মধ্যে নিজেদেরকে সোপর্দ করবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যদি পরামর্শ, নেতৃত্ব এবং আনুগত্যের মধ্যে এভাবে সমন্বয় করা যায়; তাহলেই কোনো দল, সংগঠন, সামাজিক আন্দোলন বা রাষ্ট্রের পক্ষে সর্বদা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষকে সঠিক পথে রাখার জন্য আদর্শগত তাত্ত্বিক বিষয়গুলোর বাঁধন ছাড়া অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকলে বা তেমনভাবে কার্যকর না থাকলে; হতে পারে, ‘উলিল আমর’ তথা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ একটু একটু করে এক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে আদর্শচ্যুতির শিকার হবেন। এ ধরনের আদর্শিক বিচ্যুতির সাধারণ (common) বহিঃপ্রকাশ হলো স্বৈরতান্ত্রিকতা। অতএব, প্রত্যেক কর্তৃপক্ষই তিনটি কর্তৃপক্ষের অধীন:  (১) সংশ্লিষ্ট আদর্শিক নির্দেশ ও নির্দেশনা, (২) ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও (৩) অধস্তন জনগণ।


অন্যান্য পর্ব:

ইসলামী মতাদর্শের আলোকে সামাজিক আন্দোলন
পর্ব-১: ইসলাম,
পর্ব-২: ইসলামী আন্দোলন,
পর্ব-৩: কর্মধারা,
পর্ব-৪: দ্বীন ও শরীয়াহ,
পর্ব-৫: সমাজ ও রাষ্ট্র,
পর্ব-৬: ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ অথবা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র,
পর্ব-৭: সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া,
পর্ব-৮: সংগঠন কাঠামো

আরো পড়ুন: Social Movement from Islamic Perspective: Analysis & Proposals

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক
সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় || পরিচালক, সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র
http://mozammelhoque.com

আপনার মন্তব্য লিখুন