শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭
হোম > সামাজিক আন্দোলন > ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ অথবা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র

‘ইসলামী রাষ্ট্র’ অথবা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র

Social Movement 06ইসলামের কালোত্তীর্ণ মৌলিকত্ব এবং বিংশ শতাব্দীর প্রধান ইসলামী সংগঠন ও আন্দোলনসমূহের তাৎপর্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রেখে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। যুগোপযোগী সংগঠন ও আন্দোলন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে পুরাতন বা প্রচলিত ‘চিন্তা-কাঠামো’র (paradigm) পুনর্গঠন হলো পূর্বশর্ত। ইসলাম এমন একটি মতাদর্শ, যা মূলত একটি অনন্য সামাজিক আন্দোলন; এর ভিত্তি হলো সুসামঞ্জস্যপূর্ণ তত্ত্ব এবং পরিণতি হলো রাজনৈতিক ব্যবস্থাসহ সমাজের বৃহত্তর লক্ষ্যসমূহ অর্জন।

উপর্যুক্ত দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে ইসলামের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক আন্দোলনের গঠন-কাঠামো ও মৌলিক দিকগুলো নিয়ে একটি পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন সুধী মহলে উপস্থাপন করা হয়েছে। সুধীবৃন্দের পরামর্শের কারণে এর একটি সংক্ষিপ্ত লিখিত ভাষ্য তৈরি করা হয়েছে। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য আজ লিখিত ভাষ্যের  ষষ্ঠ পর্ব উপস্থাপন করা হলো।

আলোচনা বুঝার সুবিধার্থে প্রেজেন্টেশনটি ডাউনলোড করে নিতে পারেন: পাওয়ারপয়েন্ট, পিডিএফ


ইসলামপন্থীগণ ‘ইসলামী রাষ্ট্রে’র যে সর্বাত্মকবাদী তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছে, তা পাশ্চাত্য শিক্ষা দ্বারা প্রভাবিত মানুষদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে আমেরিকায় টুইন টাওয়ারে হামলার পরে বিশ্বব্যাপী (ইসলামী) ‘সন্ত্রাসবাদে’র বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষিতে বিষয়টি আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৬.১: রাজনীতি হলো বিশেষ ধরনের মুয়ামালাত:
একজন ঈমানদারের সকল সৎকর্মই ইবাদাত। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

 وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

অর্থ: আমি জ্বিন এবং মানুষকে ইবাদত ভিন্ন অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি। [সূরা যারিয়াত: ৫৬]

প্রাত্যহিক কাজ-কর্ম, প্রাকৃতিক কাজ, ঘুম, এমনকি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক- ইসলামের দৃষ্টিতে এই প্রত্যেকটা কাজ মুসলমানের জন্যে ইবাদত। এ সংক্রান্ত মুসলিম শরীফের একটি হাদীস হচ্ছে,

عَنْ أَبِي، ذَرٍّ أَنَّ نَاسًا، مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ قَالُوا لِلنَّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَا رَسُولَ اللَّهِ ذَهَبَ أَهْلُ الدُّثُورِ بِالأُجُورِ يُصَلُّونَ كَمَا نُصَلِّي وَيَصُومُونَ كَمَا نَصُومُ وَيَتَصَدَّقُونَ بِفُضُولِ أَمْوَالِهِمْ قَالَ‏ أَوَلَيْسَ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ مَا تَصَّدَّقُونَ إِنَّ بِكُلِّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةً وَكُلِّ تَكْبِيرَةٍ صَدَقَةٌ وَكُلِّ تَحْمِيدَةٍ صَدَقَةٌ وَكُلِّ تَهْلِيلَةٍ صَدَقَةٌ وَأَمْرٌ بِالْمَعْرُوفِ صَدَقَةٌ وَنَهْىٌ عَنْ مُنْكَرٍ صَدَقَةٌ وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ‏ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيَأْتِي أَحَدُنَا شَهْوَتَهُ وَيَكُونُ لَهُ فِيهَا أَجْرٌ قَالَ‏ أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي حَرَامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ فِيهَا وِزْرٌ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الْحَلاَلِ كَانَ لَهُ أَجْرٌ

অর্থ: আবু যর (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা) এর কিছু সংখ্যক সাহাবী তাঁর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ধন সম্পদের মালিকেরা তো সব সওয়াব লুটে নিয়ে গেছে। কেননা, আমরা যেভাবে নামায পড়ি, তারাও  পড়ে। আমরা যেভাবে রোযা রাখি, তারাও রাখে। কিন্তু তারা তাদের অতিরিক্ত সম্পদ দান করে সওয়াব লাভ করছে, অথচ আমাদের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। নবী (সা) বললেন, আল্লাহ তায়ালা কি তোমাদের এমন অনেক কিছু দান  করেননি! যা সদকা করে তোমরা সওয়াব পেতে পারো? আর তা হলো প্রত্যেক তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ) একটি সদকা, প্রত্যেক তাকবীর (আল্লাহু আকবার) একটি সদকা, প্রত্যেক তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ) একটি সদকা, প্রত্যেক লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা একটি সদকা, প্রত্যেক ভালো কাজের আদেশ ও উপদেশ দেয়া একটি সদকা এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা ও বাধা দেয়া একটি সদকা। এমনকি তোমাদের শরীরের অংশে অংশে সদকা রয়েছে। অর্থাৎ স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও একটি সদকা। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কেউ তার কাম-প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করবে আর এতেও তার সওয়াব হবে? তিনি বললেন, তোমরা বলো  দেখি, যদি তোমাদের কেউ তা হারাম কাজে (যিনা) ব্যবহার করতো তাহলে কি তার গুনাহ হতো না? অনুরূপভাবে যখন সে তা হালালভাবে ব্যবহার করবে তাতে তার সওয়াব হবে। [সহীহ মুসলিম, কিতাবুয যাকাত]

ইবাদতের এই বৃহত্তর ব্যাখ্যার সাথে সাথে ইবাদতের একটা বিশেষ তাৎপর্যও ইসলামে রয়েছে। সে অনুযায়ী ইবাদতকে দুই ভাগ করা হয়েছে- ইবাদত ও মুয়ামালাত। যে ইবাদতগুলো সমাজের সাথে সম্পর্কিত, নিছক ব্যক্তিগত নয়; সেগুলো হচ্ছে মুয়ামালাত (Social/public dealings)। আর যেগুলো নিছক ব্যক্তিগত, সেগুলো হচ্ছে ইবাদত (Ritual)।

ইবাদতের ক্ষেত্রে নিয়ত (intention) এবং ঘোষণা (declaration) খুবই জরুরি। যেমন, নামাজ পড়ার সময় নিয়ত করতে হয়। পাশাপাশি তাকবীর, কেরাত, দরুদ-এগুলো যেভাবে বলা আছে, সেভাবেই পড়তে হয়। কিন্তু সামাজিক আচরণের (public dealings) ক্ষেত্রে এগুলোকে শর্ত করা  হয়নি। যেমন, যাকাত দেওয়ার সময়- আমি যাকাত দিচ্ছি- এটা বলা জরুরি নয়। কোনো অন্যায়ের প্রতিরোধ করার সময় এটা বলা জরুরি নয় যে, আল্লাহ বলেছেন অন্যায় প্রতিরোধ করতে, তাই আমি অন্যায় প্রতিরোধ করছি। অন্যায়ের প্রতিরোধ করলেই কিন্তু দায়িত্বটা পালন হয়ে যায়।

এই আলোচনা থেকে ইবাদত ও মুয়ামালাতের পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে আশা করি। মুয়ামালাতের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, politics বা রাজনীতি হচ্ছে সামাজিক আচরণ। তারমানে রাজনীতির জন্য নিয়ত জরুরি, ঘোষণাটা জরুরি নয়।

ইসলাম ভিন্ন অপরাপর মতাদর্শগুলোর একটা সুবিধা হলো, এগুলোর কোনো একটি অংশ বা প্রস্তাবনাকে বাদ দিয়েও উক্ত আদর্শের বাদবাকি অংশকে গ্রহণ করা যায় বা সুবিধামতো সংশোধন করা যায়। অথচ তত্ত্বগতভাবে ত্রুটিহীন এবং প্রায়োগিক দিক থেকেও সম্পূর্ণ সুসামঞ্জস্য মতাদর্শ হিসেবে ইসলাম নিজেকে উপস্থাপন বা দাবি করে। অতএব, রাজনৈতিকতা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা যদি মানবজীবনের কোনো না পর্যায়ে অনস্বীকার্য বিষয় হয়ে থাকে, এবং ইসলাম যদি মানুষের পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হয়ে থাকে, তাহলে ইসলামে রাজনীতি থাকবে না কেন? যদি ইসলামী রাষ্ট্র গঠনকে বাদ দেয়া হয়, তাহলে ইসলামের তরফ থেকে সেটা আদৌ ঠিক থাকে কিনা? আলোচনার শুরুতে ‘সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ’ সংক্রান্ত কোরআনের যে আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে, সে আদেশকে তাহলে কিভাবে সমাজে প্রয়োগ করা হবে?

৬.২: ইসলামী রাষ্ট্র নাকি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র?
ইসলামপন্থীরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে স্বভাবতই ইসলামী নীতি-আদর্শের দ্বারা পরিচালিত হবে। কিন্তু তাদের এটা বলা জরুরি নয় যে, ইসলাম মোতাবেক এটি করা হচ্ছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, এই ব্যাপারটা কপটতা হয়ে যাচ্ছে কি না? আসলে তা হবে না। কারণ ইসলামপন্থীরা যা করছে, তারা তা কেন করছে? এর উপযোগিতা কি? এর যুক্তি কি? কিভাবে করবে?– এ বিষয়গুলো স্বচ্ছ। এ কাজের যুক্তিগুলো স্পষ্ট। আর এগুলো সমাজে এ জন্যই গৃহীত হবে যেহেতু তা সবচেয়ে বেশি যুক্তিপূর্ণ। আর কোনো ইসলামী আইন যদি সবচেয়ে বেশি যুক্তিপূর্ণ (better than any other alternative) হিসেবে সমাজে গ্রহণযোগ্যতা না পায়, তাহলে সমাজে জোর করে ওই আইন প্রয়োগ করা হবে হঠকারিতার (ফিতনা-ফাসাদ) নামান্তর।  

islamic-state-or-civil-state

কোনো বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সমাজের বিদ্যমান বাস্তবতায় যে বিকল্পগুলো থাকে, সেগুলো থেকে সমাজ যেটাকে সবচেয়ে ভালো মনে করে, সেটাকেই গ্রহণ করে। প্রশ্ন হচ্ছে, আসলেই যেটা শ্রেষ্ঠ, সেটাকেই গ্রহণ করছে নাকি অন্য একটাকে শ্রেষ্ঠ মনে করে তা গ্রহণ করছে?

একটা মতাদর্শের অনুসারী হিসেবে যদি কেউ মনে করে, তার অনুসারিত মতাদর্শের কর্মপন্থাই সবচেয়ে ভালো, কিন্তু সমাজের লোকেরা তা বুঝছে না; সেক্ষেত্রে তাদেরকে এর যৌক্তিকতা তুলে ধরতে হবে। যা ভালো বা অধিক কল্যাণকর, সেটা তার নিজ গুণেই প্রকাশিত হয়। একটা পাত্রে রাখা পানিতে বালুকণা থাকলে যেমন এক পর্যায়ে তা তলানীতে পড়ে যায়; তেমনি যা মিথ্যা, অকল্যাণকর ও ক্ষতিকর; সেটা এক সময় তলিয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলেছেন,

 جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ ۚ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا

অর্থ: সত্য সমাগত, মিথ্যা অপসৃত। মিথ্যার পরাজয় অবশ্যম্ভাবী [সূরা বনী ইসরাইল: ৮১]

বলে রাখা ভালো, সমাজে কোনো আইনই স্বতঃস্ফূর্তভাবে গৃহীত হয় না। আইনকে সব সময় সমাজের লোকদের উপর প্রয়োগ করতে হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সমাজ নতুন কোনো আইনের জন্য প্রস্তুত কি না? নতুন আইনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার বিভিন্ন মাত্রা আছে। তারমধ্যে একটা মাত্রা হচ্ছে, সমাজের সবাই উপলব্ধি করবে- এই আইনটা তাদের দরকার। অতঃপর এক প্রকারের গণ-সম্মতির প্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট ধরনের কোনো আইন বলবৎ হবে। নতুন আইন গ্রহণ করার জন্য সমাজকে সব সময় উপযোগীও হতে হবে। এই উপযোগিতা সবার ঐক্যমতের ভিত্তিতে হতে পারে। কিংবা আইনের যৌক্তিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের পথ সুগম হতে পারে।

ইসলামকে যারা তত্ত্ব এবং প্রায়োগিক দিক থেকে সর্বাপেক্ষা ভালো মনে  করে, তারাই হচ্ছেন মুসলমান। যারা এমনটি মনে করবে না, তারা মুসলমান নয়। তাহলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অমুসলিমরা মুসলমানদের এইসব ব্যাপার কেন মানবে? তারা এগুলো এ জন্যই মানবে, যদি এগুলো তাদের কাছে better than any other alternative মনে  হয়। এ জন্য মুসলমানদের দায়িত্ব হচ্ছে, ইসলাম সবচেয়ে বেশি যুক্তিপূর্ণ- এ বিষয়টা বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরা। তা করতে ব্যর্থ হলে মুসলমান হিসেবে তারা নিজেদের সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ বলে গণ্য হবে।

সমাজের জন্যে কল্যাণকর লক্ষ্যসমূহ সুসমন্বিতভাবে পূরণ করার জন্যই ইসলামভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা অর্থে ‘ইসলামী রাষ্ট্র’। সেই লক্ষ্যগুলো যদি কোনো রাষ্ট্রের প্রয়োগের মধ্যে থাকে কিন্তু নামের মধ্যে (ইসলাম) নাও থাকে, তাহলে সে রাষ্ট্রকে ইসলামসম্মত বলা যায়। সত্যিকার অর্থেই  tolerant বা balanced কোনো civil state এর উদাহরণ হতে পারে। অবশ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা civil state মানেই যে ইসলামের জন্য সহনশীল হবে, এমন নয়। কোনো কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ, ধর্ম বা ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ থাকে। যদিও তারা অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নত বা সাংস্কৃতিকভাবে অনেক আধিপত্যশীল,  কিন্তু তাদের এই নেতিবাচকতার কারণে রাষ্ট্রটিকে ভারসাম্যহীন বলা যায়। অর্থনৈতিকভাবে উন্নত বা সাংস্কৃতিকভাবে আধিপত্যশীল হওয়াই কিন্তু একটা রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিপূর্ণতার সবটুকু নয়। যদিও এ দুটো হচ্ছে অপরিহার্য শর্ত।

তাহলে যে civil state-এ কোনো বিশেষ জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা গোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ নাই, সে হিসেবে ইসলামের প্রতিও কোনো বিদ্বেষ নাই, যেখানে জনকল্যাণকে সার্বিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে,  ন্যায় বিচারকে যথাসম্ভব পালন করা হচ্ছে; সে ধরনের একটা সাধারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। আর আমাদের প্রচলিত ধারণায় ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার যে রূপ আমরা কল্পনা করি, তা হচ্ছে এই ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিবর্তন বা উন্নয়নগত দিক থেকে এর পরিপূর্ণতার উচ্চতম ধাপ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা বা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা- এর কোনোটাই মুসলমানের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা, অন্যায়ের নিষেধ এবং মানুষ-জগত-জীবন-বাস্তবতা- এ সকল বিষয়ে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক, আধ্যাত্মিক, অর্থনৈতিক কল্যাণ সাধনের মাধ্যমে মানুষ এবং জীবজগতের সমন্বয়ে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ লক্ষ্য পূরণের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে civil state হচ্ছে permissible lowest stage এবং islamic state হচ্ছে highest stage বা সর্বোচ্চ পর্যায়।

৬.৩: রাষ্ট্রে শ্রেণিবিন্যাস
আলোচনার সুবিধার্থে একটা state scale এর কথা ভাবা যেতে পারে। যাতে, ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন মাত্রা দেখানো হয়েছে। এটি এমন একটা স্কেল, যার মাঝখানে শূন্য (০) পয়েন্ট আছে। স্কেলের এক পাশে -১, -২, -৩, -৪ … অর্থাৎ ইসলামের জন্য সমাজ প্রতিকূল হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায় হলো complete jaheliah। আর বিপরীত দিকে ১, ২, ৩, ৪ … অর্থাৎ ইসলামের জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রের আনুকূল্য বেড়ে যাওয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়  হলো state run by Prophet।

রাসূল (সা) মদিনাকে কেন্দ্র করে যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, সেটা হলো ইসলামী রাষ্ট্রের একটা পরিপূর্ণ ও সর্বোচ্চ নমুনা। আর এর উল্টোটি হলো যেখানে কল্যাণ, ভালো, ন্যায়-নীতির কোনো কিছুই বিন্দুমাত্র হাজির নেই। অর্থাৎ তাকে জাহেলিয়াত বলা যেতে পারে।

মূল আলোচনাটা হলো, যেখানে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান অর্থাৎ ইসলামের প্রতি কোনো বিদ্বেষ নাই, আবার সমাজটা ইসলাম মোতাবেকও গড়ে উঠছে না এবং ইসলামের পরিচিতিও সেখানে নাই; তাহলে কি সেই সমাজটা শূন্য? সেখানে কি কোনো নীতি-আদর্শ নাই? অথচ সমাজ কখনোই শূন্য থাকে না। সমাজ সব সময় কোনো না কোনো নীতি বা মতাদর্শের আলোকে চলে। ইসলামের দিক থেকে দেখলে, যে রাষ্ট্রে একটা balancing situation রয়েছে অর্থাৎ যেখানে ইসলাম বিদ্বেষ নাই এবং ইসলামের জন্য কোনো বাধা নাই; সেই রাষ্ট্রকে একটা গ্রহণযোগ্য (civil) state হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এ ধরনের রাষ্ট্র ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রাথমিক স্তর হিসেবে অনুমোদনযোগ্য হতে পারে।

আবার কোনো রাষ্ট্রে মুসলিমদের জন্য ইসলামী দণ্ডবিধি, অমুসলিমদের জন্য তাদের স্ব-ধর্মীয় দণ্ডবিধি এবং ধর্মে অবিশ্বাসীদের জন্য স্বতন্ত্র দণ্ডবিধি প্রয়োগ করার মতো পরিস্থিতিতে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা আরেক ধাপ উচ্চস্তরে উন্নীত হয়েছে বলা যাবে। এভাবে এক পর্যায়ে ইসলামের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নীতি-আদর্শকে আরো ব্যাপকভাবে অর্থাৎ উন্নততর বিবেচনা করে নিজেদের জন্য সাধারণ আইন হিসেবে গ্রহণ করলে, সেই সমাজ ও রাষ্ট্র আরো উন্নত স্তরের হিসেবে বিবেচিত হবে। এই প্রক্রিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায় হচ্ছে রাসূল (সা) মদীনায় যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সে রাষ্ট্র কিম্বা সে ধরনের কোনো সম্ভাব্য রাষ্ট্র ব্যবস্থা।

৬.৪: ইসলামী রাষ্ট্রের কোনো একক রূপ (model) নাই
‘ইসলামী রাষ্ট্র’ একক কোনো ব্যাপার নয় যে, এটা আছে কিম্বা নাই। বরং এর অনেকগুলো পর্যায় বা ধরন হতে পারে। balancing situation বা প্রতিসম অবস্থা (zero level) থেকে  শুরু করে রাসূল (সা) পরিচালিত রাষ্ট্র পর্যন্ত ইসলামী রাষ্ট্রের নানা রূপ রয়েছে। এমনকি স্বয়ং রাসূল (সা) মদীনায় যে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তারও বিভিন্ন ধাপ বা পর্যায় ছিলো। মদীনা রাষ্ট্রের প্রাথমিক পর্যায়ে সে সব আইন  কার্যকর ছিলো না, যেগুলো শেষ দিকে চালু হয়েছিলো। এই বিবর্তন প্রক্রিয়ায় মদীনা রাষ্ট্র তার প্রাথমিক সময়কালে ইসলামী ছিলো না, এমনটা কিন্তু নয়। বরং সর্বাবস্থায়ই তা ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে ছিলো। তবে পার্থক্যটা হলো গুণগত।


অন্যান্য পর্ব:

ইসলামী মতাদর্শের আলোকে সামাজিক আন্দোলন
পর্ব-১: ইসলাম,
পর্ব-২: ইসলামী আন্দোলন,
পর্ব-৩: কর্মধারা,
পর্ব-৪: দ্বীন ও শরীয়াহ,
পর্ব-৫: সমাজ ও রাষ্ট্র,
পর্ব-৬: ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ অথবা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র,
পর্ব-৭: সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া,
পর্ব-৮: সংগঠন কাঠামো

আরো পড়ুন: Social Movement from Islamic Perspective: Analysis & Proposals

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক
সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় || পরিচালক, সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র
http://mozammelhoque.com

২ thoughts on “‘ইসলামী রাষ্ট্র’ অথবা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র

  1. বেশ ভালো লাগলো। সেমিনারে উপস্থাপনার সময় অনেক বিষয় উঠে আসেনি। এখন বেশ তথ্যবহুল হয়েছে। সিএসসিএস পরিবার কে ধন্যবাদ।

আপনার মন্তব্য লিখুন