রবিবার, অক্টোবর ২২, ২০১৭
হোম > সামাজিক আন্দোলন > সমাজ ও রাষ্ট্র

সমাজ ও রাষ্ট্র ইসলামী মতাদর্শের আলোকে সামাজিক আন্দোলন: পর্ব-৫

ইসলামের কালোত্তীর্ণ মৌলিকত্ব এবং বিংশ শতাব্দীর প্রধান ইসলামী সংগঠন ও আন্দোলনসমূহের তাৎপর্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রেখে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। যুগোপযোগী সংগঠন ও আন্দোলন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে পুরাতন বা প্রচলিত ‘চিন্তা-কাঠামো’র (paradigm) পুনর্গঠন হলো পূর্বশর্ত। ইসলাম এমন একটি মতাদর্শ, যা মূলত একটি অনন্য সামাজিক আন্দোলন; এর ভিত্তি হলো সুসামঞ্জস্যপূর্ণ তত্ত্ব এবং পরিণতি হলো রাজনৈতিক ব্যবস্থাসহ সমাজের বৃহত্তর লক্ষ্যসমূহ অর্জন।

উপর্যুক্ত দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে ইসলামের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক আন্দোলনের গঠন-কাঠামো ও মৌলিক দিকগুলো নিয়ে একটি পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন সুধী মহলে উপস্থাপন করা হয়েছে। সুধীবৃন্দের পরামর্শের কারণে এর একটি সংক্ষিপ্ত লিখিত ভাষ্য তৈরি করা হয়েছে। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য আজ লিখিত ভাষ্যের পঞ্চম পর্ব উপস্থাপন করা হলো।

আলোচনা বুঝার সুবিধার্থে প্রেজেন্টেশনটি ডাউনলোড করে নিতে পারেন: পাওয়ারপয়েন্ট, পিডিএফ


আমরা জানি, সমাজ হতে রাষ্ট্র গড়ে ওঠে বা রাষ্ট্রব্যবস্থা সর্বদাই সামাজিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আর ইসলামী শরীয়াহর প্রয়োগযোগ্যতা যেহেতু সমাজ হতে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত, তাই সমাজ ও রাষ্ট্র সংক্রান্ত কিছু মৌলিক আলোচনা  দরকার।

৫.১: ইসলামী রাষ্ট্র কী?
সমাজ ও রাষ্ট্র সংক্রান্ত আলোচনার আগে ইসলামী রাষ্ট্র বলতে কী বুঝায়, তা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা বলতে এমন এক ধরনের কর্তৃত্বকে বুঝায়, যা ইসলামের তরফ থেকে প্রাপ্ত বিষয়গুলোকে সমাজ ও রাষ্ট্রে ধারণ, প্রয়োগ ও চর্চা করে এবং এগুলোকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়। প্রচলিত অর্থে ইসলামী রাষ্ট্র বলতে ইসলামপন্থী দল বা গ্রুপের ক্ষমতা গ্রহণকে বুঝায়।

.২: ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কি ফরজ?
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ইসলাম অনুসারীদের ওপর ফরজ কিনা- এ প্রশ্ন দিয়ে আলোচনাটা শুরু হতে পারে­। এ ব্যাপারে বলা  যায়, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র বা দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার উপর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব বা ফরজিয়াত নির্ভর করবে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সমাজব্যবস্থারই পরিণতি ও প্রতিচ্ছবি হচ্ছে রাষ্ট্র, তাই কোনো সমাজ ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের উপযুক্ত হলে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি গ্রহণ করা সংশ্লিষ্ট সামাজিক আন্দোলনের জন্য অপরিহার্য। পক্ষান্তরে রাষ্ট্র গঠনের জন্যে যেখানকার সমাজ উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি সেখানকার আন্দোলনের জন্য রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ অনুচিত। বরং বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে মানিয়ে নিয়ে সম্ভাব্য সকল দিক থেকে সামাজিক পুনর্গঠনের কাজকে যথাসম্ভব এগিয়ে নেয়া উচিত।

.৩ ও ৫.৪ : সামাজিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার বটম-আপ এপ্রোচ
সামাজিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সামাজিক আন্দোলনকে রাষ্ট্র ক্ষমতার দিকে পরিচালিত করে। বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে কোনো জনপদে বা জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যূনতম মানে উপযোগী রাষ্ট্রব্যবস্থা কার্যকর নাও থাকতে পারে, কিন্তু পরিস্থিতি নির্বিশেষে জনগোষ্ঠী মাত্রেরই কোনো না কোনো ধরনে সমাজব্যবস্থার অস্তিত্ব অনিবার্য। সমাজের আকাঙ্খা ও আদলেই যেহেতু রাষ্ট্র গড়ে উঠে সেহেতু বিদ্যমান রাষ্ট্র-ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্নভাবে সমাজনির্ভর থাকে বা থাকতে বাধ্য। অতএব, যখনই কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা সমর্থনকারী সমাজব্যবস্থা হতে উল্লেখযোগ্যভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তখনই সেই রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে থাকার বৈধতা হারায়। এই দৃষ্টিতে রাষ্ট্রগঠন ও এর অব্যাহত অগ্রগতির এই এপ্রোচটা হলো নিচ থেকে গড়ে উঠে ক্রমান্বয়ে উপরের দিকে যাওয়া, ইংরেজিতে যাকে ‘বটম-আপ এপ্রোচ’ বলে। ঠিক যেভাবে একটা বিল্ডিং তৈরি হয় ও তা টিকে থাকে। যুক্তিবিদ্যার ভাষায় একে আরোহমূলক (inductive) পদ্ধতিও বলা যায়। একটি পিরামিড যেমন বৃহত্তর ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে ক্রমান্বয়ে একটি চূড়ার দিকে ধাবিত  হয়, ব্যাপারটা  তেমন।

.৫: শরয়াহ বাস্তবায়নে ক্রমধারা
ইসলামী রাষ্ট্র সমাজের ভেতর থেকে ক্রমধারার (gradual process) মাধ্যমে গড়ে উঠবে। সমাজ যখন ইসলামকে ধারণ করবে, ইসলামী মতাদর্শ জনপ্রিয় পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে, তখন তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ে উঠবে। সহজ কথায়, সমাজ যদি ইসলাম মোতাবেক গড়ে উঠে তাহলে রাষ্ট্রও ইসলাম মোতাবেক গড়ে উঠবে।

সুতরাং, সমাজ ও রাষ্ট্র সংক্রান্ত কোনো বিষয় কোরআন ও হাদীসে থাকলেই সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে, এমন নয়। দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট আইনটির পূর্ববর্তী ধাপটি উক্ত সমাজ কিম্বা রাষ্ট্রে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত বা বাস্তবায়িত হয়েছে কিনা। কোনো আইনের প্রয়োগ হতে বিরত থাকা সেটির ফরজিয়াতকে (অপরিহার্যতা) বাতিল কিম্বা স্থগিত করা বুঝায় না। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিধানাবলী প্রয়োগের ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সা) যে ধরনের ক্রমধারা অবলম্বন করেছেন তা বিবেচনায় নিতে হবে।

উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা) বলেছেন, মদ হারাম ঘোষণার ব্যাপারে ক্রমধারা অবলম্বন করা না হলে লোকেরা মানতো না। চিন্তা করে দেখুন, রাসূল ও নবীদের পরে শ্রেষ্ঠতম মানবগোষ্ঠী তথা আসহাবে মুহাম্মদুর রসুলুল্লাহ (সা) এর মতো শ্রেষ্ঠতম ছাত্রদের জন্য ‘শ্রেষ্ঠতম শিক্ষকে’র প্রত্যক্ষ উপস্থিতি সত্ত্বেও যদি ক্রমধারা অবলম্বন অপরিহার্য হয়, তাহলে বর্তমানের শিক্ষকবিহীন দূর্বলতম ছাত্রদের অবস্থা কেমন হবে! প্রত্যক্ষ অহী তথা কোরআন নাযিল করার সময়ে আল্লাহ সুবহানুতায়ালা যে ধরনের ক্রমধারা অবলম্বন করেছেন, পরোক্ষ অহী বা হাদীসের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা)ও সামাজিক রূপান্তর প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতার দিকে লক্ষ রেখেছেন। পূর্বাপর তথা ক্রমধারা অবলম্বন করা না হলে, এমনও হতে পারে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বের করণীয়কে শিরোধার্য করে লোকেরা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজকে অবহেলা করবে বা বাদ দিবে।

অতএব, নিরবচ্ছিন্নভাবে সমাজ ও শরীয়াহ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এতদুভয়ের মধ্যে সমন্বয়কারী সামাজিক আন্দোলনসমূহ ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে বিশেষ (specific) কোনো বিষয়ে ফয়সালা দিতে হবে। হতে পারে, কোনো জনপদে একটা মিশ্র পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কোনো কোনো দিক থেকে সমাজ মক্বী যুগে, আবার কোনো কোনো দিক থেকে মাদানী যুগে। বলাবাহুল্য, অনুকূল রাষ্ট্রব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে সামাজিক আন্দোলনসমূহ এককভাবে এই দায়িত্বপালন করবে। আর অনুকূল রাষ্ট্রব্যবস্থার উপস্থিতিতেও সামাজিক আন্দোলনসমূহ প্রয়োজনুসারে সহযোগিতা বা সমালোচনা অব্যাহত রাখবে।


অন্যান্য পর্ব:

ইসলামী মতাদর্শের আলোকে সামাজিক আন্দোলন
পর্ব-১: ইসলাম,
পর্ব-২: ইসলামী আন্দোলন,
পর্ব-৩: কর্মধারা,
পর্ব-৪: দ্বীন ও শরীয়াহ,
পর্ব-৫: সমাজ ও রাষ্ট্র,
পর্ব-৬: ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ অথবা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র,
পর্ব-৭: সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া,
পর্ব-৮: সংগঠন কাঠামো

আরো পড়ুন: Social Movement from Islamic Perspective: Analysis & Proposals

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক
সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় || পরিচালক, সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র
http://mozammelhoque.com

আপনার মন্তব্য লিখুন