শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭
হোম > সামাজিক আন্দোলন > দ্বীন ও শরীয়াহ

দ্বীন ও শরীয়াহ

Social Movement 04ইসলামের কালোত্তীর্ণ মৌলিকত্ব এবং বিংশ শতাব্দীর প্রধান ইসলামী সংগঠন ও আন্দোলনসমূহের তাৎপর্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রেখে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। যুগোপযোগী সংগঠন ও আন্দোলন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে পুরাতন বা প্রচলিত ‘চিন্তা-কাঠামো’র (paradigm) পুনর্গঠন হলো পূর্বশর্ত। ইসলাম এমন একটি মতাদর্শ, যা মূলত একটি অনন্য সামাজিক আন্দোলন; এর ভিত্তি হলো সুসামঞ্জস্যপূর্ণ তত্ত্ব এবং পরিণতি হলো রাজনৈতিক ব্যবস্থাসহ সমাজের বৃহত্তর লক্ষ্যসমূহ অর্জন।

উপর্যুক্ত দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে ইসলামের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক আন্দোলনের গঠন-কাঠামো ও মৌলিক দিকগুলো নিয়ে একটি পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন সুধী মহলে উপস্থাপন করা হয়েছে। সুধীবৃন্দের পরামর্শের কারণে এর একটি সংক্ষিপ্ত লিখিত ভাষ্য তৈরি করা হয়েছে। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য আজ লিখিত ভাষ্যের  চতুর্থ পর্ব উপস্থাপন করা হলো।

আলোচনা বুঝার সুবিধার্থে প্রেজেন্টেশনটি ডাউনলোড করে নিতে পারেন: পাওয়ারপয়েন্ট, পিডিএফ


৪.১: প্রাসঙ্গিকতা
দ্বীন হিসেবে ইসলাম হলো আক্বিদা, দৃষ্টিভঙ্গি বা মনোভাব। এটা ঈমানের সাথে সম্পর্কিত। আর শরীয়াহ হচ্ছে দ্বীনের প্রায়োগিক দিক। অর্থাৎ কিভাবে সমাজে দ্বীন বাস্তবায়ন করা হবে, সেই ব্যাপার। দ্বীন হচ্ছে ইসলামের অপরিবর্তনীয় বিষয়। আর শরীয়াহ হলো বিধি-বিধান (rules & regulations)। কোনো সমাজের গ্রহণ-ক্ষমতার (conceivability) উপর শরীয়াহর প্রয়োগ নির্ভর করবে। দ্বীন ও শরীয়াহ’র এই সম্পর্ককে বুঝার জন্য সূরা শূরার ১৩নং আয়াত প্রণিধানযোগ্য। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

شَرَعَ لَكُمْ مِنَ الدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ ۖ أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ

অর্থ: তিনি তোমাদের জন্য সেই দ্বীনই নির্ধারিত করেছেন যার নির্দেশ তিনি নূহকে দিয়েছিলেন এবং যা এখন আমি তোমার কাছে অহীর মাধ্যমে পাঠিয়েছি। আর যার আদেশ দিয়েছিলাম আমি ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে। তার সাথে তাগিদ করেছিলাম এই বলে যে, এ দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং এ ব্যাপারে অনৈক্য সৃষ্টি করো না।

আল্লাহ তায়ালা বেশ কয়েকজন রাসূলের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলছেন, সব নবী-রাসূলকে আদ-দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রেরণ করেছেন এবং এর ফরজিয়াত সম্পর্কে কোনো প্রকারের দ্বিমত করা যাবে না। এই দৃষ্টিতে সব নবী-রাসূলের দ্বীন একই, যদিও তাঁদের শরীয়াহ ভিন্ন ভিন্ন।

৪.২: দ্বীন
দ্বীন হলো ঈমান তথা এক বিশেষ বিশ্ব-দৃষ্টি (world-view); যার মধ্যে রয়েছে আল্লাহর মহান সত্ত্বা এবং এই সত্ত্বার এককত্ব ও অনন্যতাসহ অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যাবলি, রিসালাত ও আখিরাতের প্রাসঙ্গিকতাসহ যাবতীয় তাত্ত্বিক বিষয়ের মৌল-কাঠামো।

অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ

অর্থ:নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য দ্বীন হলো ইসলাম। [সূরা আলে ইমরান : ১৯]

সূরা কাফিরুনের শেষ আয়াতে বলা হচ্ছে,

لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ

অর্থ:তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন, আমাদের জন্য আমাদের দ্বীন।

অথচ বিদায় হজ্বের সময় কোরআনের এই আয়াত নাযিল হলো,

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا

অর্থ:আজ আমি তোমাদের জন্য দ্বীনকে পূর্ণতা দান করলাম, তোমাদের ওপর আমার নেয়ামতকে পূর্ণ করলাম। এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম[সূরা মায়িদা : ৩]

দ্বীন যদি দশম হিজরীতে পূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে মক্কী যুগের সূচনা-লগ্ন থেকে পরবর্তীতে যে দ্বীন সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে, সেখানে কি অসম্পূর্ণতার কোনো প্রমাণ বা ইঙ্গিত ছিলো? এই প্রশ্নের উত্তর যদি না-বোধক হয়, তাহলে বুঝতে হবে, সূরা মায়িদার ৩নং আয়াতে দ্বীনের পরিপূর্ণতা নিয়ে বলার বিষয়টি মূলত প্রায়োগিক-কাঠামোগত দিক থেকে বিবেচনা করতে হবে। দ্বীনের প্রায়োগিক পূর্ণতা তথা বিস্তৃতি ও ব্যাপকতা অর্থে শরীয়াহ’র পূর্ণতা এমনকি খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও অব্যাহত ছিলো। তাহলে আল্লাহর রাসূল (সা) যে পূর্ণতা দিয়ে গেছেন তা মৌল-কাঠামোগত (fundamental) পূর্ণতা। আর সাহাবীগণ খিলাফতের দায়িত্বপালন করতে গিয়ে যা করেছেন তা সবিশেষ (exclusive) পূর্ণতা। শরিয়াহ’র কাঠামোগত পূর্ণতা দানে তাঁদের বৈধতা ও কর্তৃত্বের পক্ষে রাসূল (সা) এর এই হাদীসটি দলীল, যেখানে তিনি বলেছেন,

عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِى وَسُنَّةِ الْخُلَفَآءِ الْمَهْدِيْينَ الرَّاشِدِيْنَ

অর্থ:তোমরা অবশ্যই আমার সুন্নত ও আমার হেদায়েতপ্রাপ্ত খলীফাগণের সুন্নত অনুসরণ করবে, দাঁতে দাঁত দিয়ে তা আঁকড়ে ধরবে। [আবু দাউদ, কিতাবুস সুন্নাহ]

বৃহত্তর দৃষ্টিতে শরীয়াহও ইসলামের তথা দ্বীনের অংশ, যদিও তা মৌলিক আক্বীদাগত যে ইসলাম অর্থাৎ দ্বীনের অনিবার্য পরিণতি। মান্যতার দিক থেকে উভয়ই অপরিহার্য তথা সমগুরুত্বের। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গরীবের জন্য হজ্ব ও যাকাতের মান্যতাকে স্বীকার করা অপরিহার্য, যদিও এই আমলগুলো তার জন্য প্রযোজ্য নয়। যেখানে জিহাদ ঘোষণার বৈধ কর্তৃপক্ষ নাই সেখানকার মুসলমান অধিবাসীরা জিহাদের ফরজিয়াতকে শুধুমাত্র তাত্ত্বিকভাবে মানবে, বাস্তবে নয়।

৪.২: শরীয়াহ
রাষ্ট্র যেহেতু সামাজিক ব্যবস্থার একটা ঊর্ধ্বতন বিবর্তন প্রক্রিয়া বা উচ্চতর ধাপ, তাই যে সমাজ যে ধরনের ও মানের রাষ্ট্র গঠন ও পরিচালনার উপযোগী, সেই সমাজের সদস্যবৃন্দ তদনুরূপ রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে কাজ করবে। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা হতে পশ্চাদগামী বা অগ্রগামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি গ্রহণ করা রাষ্ট্রের স্বাভাবিক গতি-প্রকৃতিবিরোধী ও হঠকারিতার নামান্তরমাত্র। সংশ্লিষ্ট সমাজ ব্যবস্থা যদি রাষ্ট্র ব্যবস্থার ন্যূনতম বা উচ্চতর মানের জন্য তৈরী না থাকে, সেই সমাজের মুসলিম সদস্যদের আশু কর্তব্য হলো ইসলামসম্মত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিয়মাবলির উপযোগিতাকে তত্ত্ব ও বাস্তবগত দিক থেকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে সমাজের কাছে তুলে ধরা এবং তদনুযায়ী সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা। এটিই হলো ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মধারা।


অন্যান্য পর্ব:

ইসলামী মতাদর্শের আলোকে সামাজিক আন্দোলন
পর্ব-১: ইসলাম,
পর্ব-২: ইসলামী আন্দোলন,
পর্ব-৩: কর্মধারা,
পর্ব-৪: দ্বীন ও শরীয়াহ,
পর্ব-৫: সমাজ ও রাষ্ট্র,
পর্ব-৬: ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ অথবা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র,
পর্ব-৭: সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া,
পর্ব-৮: সংগঠন কাঠামো

আরো পড়ুন: Social Movement from Islamic Perspective: Analysis & Proposals

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক
সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় || পরিচালক, সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র
http://mozammelhoque.com

আপনার মন্তব্য লিখুন