রবিবার, নভেম্বর ১৯, ২০১৭
হোম > সামাজিক আন্দোলন > ইসলামী আন্দোলন

ইসলামী আন্দোলন ইসলামী মতাদর্শের আলোকে সামাজিক আন্দোলন: পর্ব-২

ইসলামের কালোত্তীর্ণ মৌলিকত্ব এবং বিংশ শতাব্দীর প্রধান ইসলামী সংগঠন ও আন্দোলনসমূহের তাৎপর্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রেখে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। যুগোপযোগী সংগঠন ও আন্দোলন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে পুরাতন বা প্রচলিত ‘চিন্তা-কাঠামো’র (paradigm) পুনর্গঠন হলো পূর্বশর্ত। ইসলাম এমন একটি মতাদর্শ, যা মূলত একটি অনন্য সামাজিক আন্দোলন; এর ভিত্তি হলো সুসামঞ্জস্যপূর্ণ তত্ত্ব এবং পরিণতি হলো রাজনৈতিক ব্যবস্থাসহ সমাজের বৃহত্তর লক্ষ্যসমূহ অর্জন।

উপর্যুক্ত দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে ইসলামের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক আন্দোলনের গঠন-কাঠামো ও মৌলিক দিকগুলো নিয়ে একটি পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন সুধী মহলে উপস্থাপন করা হয়েছে। সুধীবৃন্দের পরামর্শের কারণে এর একটি সংক্ষিপ্ত লিখিত ভাষ্য তৈরি করা হয়েছে। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য আজ লিখিত ভাষ্যের  দ্বিতীয় পর্ব উপস্থাপন করা হলো।

আলোচনা বুঝার সুবিধার্থে প্রেজেন্টেশনটি ডাউনলোড করে নিতে পারেন: পাওয়ারপয়েন্ট, পিডিএফ


সামাজিক প্রয়োগযোগ্যতার দিক থেকে ইসলামের চারটি পর্যায়। অন্য কথায় ইসলামী আন্দোলনের চারটি ধাপ। এতদনুসারে এই অধ্যায়ের আলোচনাকে চার ভাগ করা হয়েছে: (১) ভিত্তি পর্যায়, (২) প্রাথমিক পর্যায়, (৩) মধ্য-উচ্চ পর্যায় ও (৪) উচ্চ পর্যায়।

২.১: ভিত্তি স্তর
(Foundation Level)
বুদ্ধিবৃত্তি তথা জগত, জীবন ও বাস্তবতা সম্পর্কে প্রশ্নাবলি, বিশেষ করে বললে, ‘প্রশ্ন’ মাত্রই মানুষের প্রজাতিগত অনন্য বৈশিষ্ট্যের পরিচায়ক। এটি ইসলামেরও অন্যতম মূল অনুষঙ্গ। এটি মানুষকে আরেকটা সমগুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গের দিকে পরিচালিত করে, যাকে আধ্যাত্মিকতা (spirituality) বলা যেতে পারে। মানুষের বস্তুগত সত্ত্বা বা অস্তিত্বের অতিরিক্ত যে সত্ত্বা রয়েছে, ওই সত্ত্বাই তাকে নিয়ে যায় একটা অতিবর্তীতার (transcendence) দিকে। এমনকি কোনো নিরীশ্বরবাদী ‘বস্তুবাদী’ও যখন কোনো না কোনো ধরনের মানবতা কিম্বা নৈতিকতার কথা বলেন, তখন তিনি অঘোষিতভাবে বস্তু-অতিরিক্ত এক বিশেষ মানবিক-সত্ত্বার অস্তিত্বকে স্বীকার করে নেন। এই বস্তু-অতিবর্তীতাই হলো আধ্যাত্মিকতার লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য। আধ্যাত্মিকতা মানুষকে ঈমানের দিকে নিয়ে যায়। অন্য কথায়, ঈমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ হলো আধ্যাত্ম-চেতনা তথা আধ্যাত্মিকতা।

আধ্যাত্মিক চেতনা ও বুদ্ধিবৃত্তি মানুষকে জগতের সাথে কর্মসূত্রে সম্পৃক্ত হওয়ার মাধ্যমে সৃষ্টিশীলতার দিকে উদ্বুদ্ধ করে এবং তাকে পূর্ণত্বের দিকে পরিচালিত করে। এ জন্যে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের ভিত্তি স্তরে বুদ্ধিবৃত্তি ও আধ্যাত্মিকতা অপরিহার্য অনুসঙ্গ। যা হোক, বুদ্ধিবৃত্তি এবং আধ্যাত্মিকতা যখন সমন্বিত হয় তখন অনিবার্যভাবে তৃতীয় একটি বৈশিষ্ট্যের আবির্ভাব ঘটে যাকে  মননশীলতা (creativity) বলা যায়। একটি সমবাহু ত্রিভুজের তিনটি বাহুর মতো ইসলামী আন্দোলনের এই পর্যায়ে বুদ্ধিবৃত্তি, আধ্যাত্মিকতা ও মননশীলতা হচ্ছে তিনটি সমভাবে অপরিহার্য অনুষঙ্গ।

২.২: প্রাথমিক স্তর (Primary Level)
ইসলামী আন্দোলনের ভিত্তিস্তরের উপরিস্তরকে প্রাথমিক স্তর বা পর্যায় বলা যেতে পারে। ব্যক্তিগত মৌলিক মানবীয় বৃত্তি হিসাবে বুদ্ধিবৃত্তি, আধ্যাত্মিকতা এবং মননশীলতার সমন্বয়ের ফলে চতুর্থ আরেকটি বিষয়ের উৎপত্তি ঘটে, সেটা হচ্ছে সামাজিক দায়বোধ। সামাজিক আন্দোলনের এই পর্যায়ের কর্মকাণ্ড একটি বর্গক্ষেত্রের মতো চারদিকে সমভাবে বিস্তৃত হওয়া বাঞ্ছনীয়। কর্মক্ষেত্র বা দিকের এই সমগুরুত্ব গুণগত (qualitative), পরিমাণগত (quantitative) নয়।

পারিবারিক দায়-দায়িত্ব বহন করা হলো সামাজিক দায়বোধের প্রথম পর্যায়। সুষম পারিবারিক ব্যবস্থা হলো ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ-ব্যবস্থার পূর্বশর্ত। আর্ত-মানবতার সেবা, শিক্ষার বিস্তার, মানুষের অধিকারের পক্ষে বলাসহ মানুষের জন্য কাজ করাই তো যে কোনো সমাজ-কর্মীর কাজ। ‘আদর্শ’ প্রতিষ্ঠা বা নাম-যশের চিন্তা না করেই সমাজের জন্য কাজ করা উচিত। কোনো আদর্শের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে যারা সমাজ কাজ করবে তাদের এই কাজের বিষয়ে শতভাগ অকৃত্রিম হতে হবে। পবিত্র কোরআনে মুসলমানদেরকে বলা হয়েছে,

كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ

অর্থ: তোমরাই হচ্ছো সর্বোত্তম জাতি, মানুষের কল্যাণের জন্যেই তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে[আলে ইমরান: ১১০]

এই আয়াতের মর্মানুযায়ী মানুষের কল্যাণ সাধনের সর্বাত্মক প্রচেষ্টাই হলো মুসলিম জাতির টিকে থাকার অজুহাত (excuse) বা বৈধতা। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, মানুষকে একটি সুসামঞ্জস্যপূর্ণ ও সুষম বিশ্ব-ব্যবস্থার নেতৃত্ব দেয়ার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। সূরা বাকারার ৩০ নং আয়াতটি এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য,

إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَة

অর্থ: আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি নিযুক্ত করতে যাচ্ছি।

এই আয়াতের অর্থ অপরাপর মানুষের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নয়, বরং মানুষের সেবা করা, তাদের সর্বাঙ্গীন উন্নতির জন্য কাজ করা। কোরআন শরীফের অপর একটি আয়াতে বলা হয়েছে,

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ

অর্থ: আমি অবশ্যই আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি। [সূরা বনী ইসরাইল : ৭০]

অতএব, যেখানে যে কারণে আদম-সন্তান তথা মানুষ ও মানবিকতা বিপর্যস্ত ও ভূলুণ্ঠিত; সেখানে সেই কারণ বিশেষ বা কারণসমূহকে দূর করে মানুষের মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা আল্লাহর খলিফা হিসেবে প্রত্যেক মুসলমানের জরুরি দায়িত্ব।

২.৩: মধ্য-উচ্চ পর্যায়(Mid-higher Level)
বুদ্ধিবৃত্তি, আধ্যাত্মিকতা, মননশীলতার সাথে সামাজিক দায়বোধ যখন কোনো দল বিশেষের কাজের মধ্যে সমন্বিত (integrated) হবে তখন সেই ব্যক্তিবর্গ বা দল রাজনৈতিক হিসেবে গড়ে উঠবে।

রাজনৈতিক হিসেবে গড়ে ওঠা বলতে বুঝায় সাধারণভাবে যা ভালো তার পক্ষে বলা বা এ জন্য উচ্চ-কণ্ঠ হওয়া।এটি সামাজিক দায়বোধের অনিবার্য বহিঃপ্রকাশ বা পরিণতি। যখন এই ভালো মনে করা বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন হওয়া  কিম্বা মন্দ কাজগুলোর প্রতিরোধ হওয়া উচিত – এমনটা দাবি করা হবে; তখন বিষয়গুলো নিছক ব্যক্তিগত পর্যায়কে অতিক্রম করে পুরো সমাজ এবং রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে। এ ধরনের ব্যক্তিগত ঔচিত্যবোধের (sense of obligation) সামাজিক প্রয়োগযোগ্যতার প্রসঙ্গ আসলে, তাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড  বলা যায়।

এখানে বলে রাখা ভালো, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড মানে এই নয় যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে বা হরতাল-অবরোধ-মিছিল-মিটিং করতে হবে। আবার, নির্বাচন বা হরতাল-অবরোধ-মিছিল-মিটিং করা যাবে না, সেটাও নয়। রাজনৈতিক কর্মসূচিকে বিদ্যমান নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে দেখলে হবে না। বরং রাজনীতিকে দেখতে হবে নৈতিকতার সর্বোচ্চ পর্যায় হিসেবে। কেননা, রাজনীতি সমাজের ভালো-মন্দ নিয়ে সামগ্রিকভাবে সংশ্লিষ্ট থাকে। এ বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো,

كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ

অর্থ: তোমরাই হচ্ছো সর্বোত্তম জাতি, মানুষের কল্যাণের জন্যেই তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছেতোমরা সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে [আলে ইমরান: ১১০]

এ সংক্রান্ত আরো অনেক কোরআনের আয়াত ও হাদীস আছে। এই বিশেষ আয়াতটিতে মানুষের কল্যাণের জন্যেই তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে বলেই কিন্তু শেষ করা হয়নি। বরং মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত হওয়া প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, যখন তোমরা সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে তখনই কল্যাণ নিশ্চিত হবে। ন্যায়ের আদেশ এবং অন্যায়ের নিষেধ সংক্রান্ত এই নীতিকে কার্যকর করার জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতা বা রাষ্ট্রক্ষমতা অপরিহার্য।

তাহলে, যতদিন পর্যন্ত ইসলামী মতাদর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত কোনো সামাজিক আন্দোলন বিশেষ কোনো রাজ্য, রাষ্ট্র বা এলাকায়‘রাজনৈতিক বিষয়ে’মত প্রকাশ বা প্রচারণা চালাবে ও নানাবিধ প্রাসঙ্গিক কার্যক্রমে সক্রিয় থাকবে, শাসন-ক্ষমতা লাভের পূর্ব পর্যন্ত উক্ত (ইসলামী) আন্দোলন মধ্য-উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে বলা যাবে। জ্যামিতিক গঠনের দিক থেকে ইসলামী আন্দোলনের এই পর্যায়কে আমরা সমবাহু পঞ্চভুজের সাথে তুলনা করতে পারি।

২.৪:  উচ্চ পর্যায় (Higher Level)
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা দলকে আন্দোলনের উচ্চ পর্যায়ে উপনীত করে। ভালোর বাস্তবায়ন এবং মন্দের প্রতিরোধ, জনকল্যাণ সাধন এবং ন্যায়-বিচার নিশ্চিতকরণের ইতোমধ্যে ঘোষিত সামাজিক লক্ষ্যসমূহকে বাস্তবায়নের জন্যে এই আন্দোলনের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ বা দলবিশেষ এক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট জনপদের শাসনকর্তৃত্বের ক্ষমতা প্রাপ্ত হবে। ইসলামী আন্দোলনের ইতোপূর্বকার সমবাহু পঞ্চভুজ মডেলটা এ পর্যায়ে এসে ষড়ভুজে উন্নীত (evolved) হবে। বলা বাহুল্য, বুদ্ধিবৃত্তি, আধ্যাত্মিকতা, মননশীলতা, সামাজিক দায়বোধ, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অপরাপর বৈশিষ্ট্যসমূহও উক্ত ব্যক্তিবর্গ বা দলের মধ্যে যথাযথভাবে সক্রিয় থাকবে।

ইসলামী আন্দোলনের প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী ধারার সাথে এই ধরনের (model) পার্থক্য হচ্ছে,

১। প্রচলিত ধারায় আন্দোলনের কাঠামো হলো ক্রমসোপানমূলক (hierarchical)। মোটা দাগে যার স্তরগুলো হলো- দাওয়াত, সংগঠন, প্রশিক্ষণ, সমাজসেবা ও রাজনীতি।
২। প্রচলিত ধারায় আন্দোলনের কাজ-কর্ম আঞ্জাম দেয়ার জন্য এলাকাভিত্তিক ইউনিট ও শাখা কায়েম করা হয়।
৩। উপর্যুক্ত সব ধরনের কর্ম সম্পাদন, অনুমোদন বা নিয়ন্ত্রণ (guide) করার কর্তৃত্ব একই ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের ওপর ন্যস্ত থাকে।

সর্বাত্মকবাদী বা সংগঠনবাদী এই কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার ভালো-মন্দ কিম্বা সাফল্য-ব্যর্থতার বিষয়টিকে অন্য কোনো আলোচনার জন্য রেখে দিয়ে ইসলামী মতাদর্শভিত্তিক সামাজিক আন্দোলনের এই রূপরেখাটি উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে বিভিন্ন পর্যায়ে যেসব জ্যামিতিক গঠনের প্রস্তাবনা করা হয়েছে তা প্রচলিত ধারা হতে একেবারেই স্বতন্ত্র (radically different)।

কোনো ব্যক্তিবর্গ বা দলবিশেষের পরবর্তী ধাপে উন্নীত হওয়ার মানে হলো যারা শুরু করেছিলো বা আগের ধাপে ছিল তাদের একটা অংশ পরবর্তী ধাপের বিশেষ ধরনের কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত করবে। যেমন, রাষ্ট্রীয় কাজে যারা জড়িত থাকবে তাদের সাথে রাজনৈতিক দলের এক প্রকার যোগাযোগ থাকলেও এতদুভয়ের মধ্যে স্বাতন্ত্র্য ও দূরত্ব থাকতে হবে। অর্থাৎ প্রশাসন এবং দল এই দুটো কখনো একাত্ম হতে পারবে না।

আলোচ্য ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, পঞ্চভুজ ও ষড়ভুজ মডেলসমূহের ক্ষেত্রে প্রত্যেক মডেলের প্রতিটি বাহু এবং কোণ সমান। অর্থাৎ প্রত্যেকটা দিকের কাজের গুরুত্ব একই রকম।

সমাজে যারা রাজনৈতিক কাজ করবে, তাদের জন্যে আন্দোলনের অপরাপর অংশের কর্মীরা হচ্ছেন পরোক্ষ সহযোগী মাত্র। রাজনীতির ময়দানে রাজনৈতিক কর্মীরাই মূখ্য ভূমিকা পালন করবে। বুদ্ধিবৃত্তি, আধ্যাত্মিকতা, মননশীলতা ও সমাজসেবামূলক সেক্টর থেকে তারা সময়ে সময়ে সহযোগিতা পাবে।

অন্যদিকে, যারা সামাজিক কাজ করবে তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজ কর্মীরাই আন্দোলনের মূল অংশ। রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, আধ্যাত্মিকতা, মননশীলতা বা সাহিত্য-সংস্কৃতি– এগুলো সামাজিক আন্দোলনে তাদের সহযোগী মাত্র।

আবার, সাহিত্য-সংস্কৃতি, মননশীলতা, বিনোদন ইত্যাদি নিয়ে যারা কাজ করবে, তাদের দিক থেকে তারাই হলো আন্দোলনের মূল অংশ। আর ধর্ম, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, শিক্ষা, রাজনীতি, সামাজিক কাজ– এগুলো তাদের সহযোগী।একইভাবে, যারা ধর্মীয় বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হবে তাদের ফোকাস এবং ডেভেলপমেন্ট হবে শুধুমাত্র দ্বীনি বিষয়ে। রাজনীতি, মননশীলতা, বুদ্ধিবৃত্তি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ব্যাপারে তারা সচেতন (concern) থাকবে এবং প্রয়োজন অনুসারে সহযোগিতা করবে; কিন্তু সরাসরি সম্পৃক্ত হবে না।

তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকান্ডে জড়িতরা অন্যান্য বিষয়ের সাথে সরাসরি জড়িত না হবে না। বরং অন্যান্য বিষয়ের সাথে পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্টতা রেখে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করবে। স্পষ্টতই তারা রাজনীতি-সচেতন থাকবে এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সহায়তা করবে; কিন্তু নিজেরা কখনো প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে জড়িত হবে না।

বুদ্ধিবৃত্তি, আধ্যাত্মিকতা ও মননশীলতার উপাদানগুলোকে মৌলিক মানবীয় গঠন ও পদ্ধতি হিসেবে সবাই লালন করবে। এরপর যার যার যোগ্যতা অনুসারে নিজ কর্মক্ষেত্র বেছে নিয়ে কর্ম-তৎপর হবে। আন্দোলনের এই নতুন ধারায় কোনো সেক্টরই মূল (core) নয়। তাই বাস্তব কাজের ক্ষেত্রে সবাইকে কর্ম-বিভাজন-প্রক্রিয়া (specialization) অনুসরণ করতে হবে। যারা যে বিষয়ে প্রাগ্রসর, তারা শুধু সে বিষয়ে পূর্ণমাত্রায় সক্রিয় থাকবে এবং নিজ নিজ কাজের জন্যে দায়বদ্ধ থাকবে। তবে প্রত্যেকটা সেক্টর সময়ে সময়ে পরস্পরকে সহযোগিতা করবে। রাজনীতি, সমাজ, সাহিত্য-সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তি, আধ্যাত্মিকতা, মননশীলতা– এগুলোর কোনোটাকে বাদ দিয়ে একটি ইসলামভিত্তিক সমাজ আন্দোলন পূর্ণতা পাবে না।


অন্যান্য পর্ব:

ইসলামী মতাদর্শের আলোকে সামাজিক আন্দোলন
পর্ব-১: ইসলাম,
পর্ব-২: ইসলামী আন্দোলন,
পর্ব-৩: কর্মধারা,
পর্ব-৪: দ্বীন ও শরীয়াহ,
পর্ব-৫: সমাজ ও রাষ্ট্র,
পর্ব-৬: ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ অথবা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র,
পর্ব-৭: সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া,
পর্ব-৮: সংগঠন কাঠামো

আরো পড়ুন: Social Movement from Islamic Perspective: Analysis & Proposals

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক
সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় || পরিচালক, সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র
http://mozammelhoque.com

৩ thoughts on “ইসলামী আন্দোলন ইসলামী মতাদর্শের আলোকে সামাজিক আন্দোলন: পর্ব-২

  1. আন্দোলেনের যে “কর্ম-বিভাজন-প্রক্রিয়া” বা specialization এর কথা বলা হচ্ছে সেটাকে কি অনেকটা বামপন্থীদের কাজের ধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলা যায় কিনা?

    যেমন উদিচীর মতো বামাদর্শ লালনকারী বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে যারা সরাসরি কমিউনিস্ট রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *