খ) অর্থহীন কথাবার্তা (লাগ্উ) এড়িয়ে চলা সংক্রান্ত আয়াত:

গানকে হারাম সাব্যস্তকারীদের আরেকটি দলীল হলো কোরআনের সেই আয়াত, যেখানে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের প্রশংসা করে বলেছেন–

وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ

অর্থ: আর যখন তারা অর্থহীন কথাবার্তা শুনে, তখন তারা সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। (সূরা কাসাস: ৫৫)

তাদের মতে, গানও অর্থহীন কথাবার্তার (লাগ্উ) অন্তর্ভুক্ত। তাই আয়াতের মর্মানুসারে গান শোনা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। অথচ আয়াতটির মূল অর্থের দিকে মনোযোগ দিলে বুঝা যায়, এখানে ‘আল-লাগ্‌উ’ শব্দটির মানে হলো– কাউকে মূর্খের মতো অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা, অপমান করা ইত্যাদি। আয়াতটির বাকি অংশে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ وَقَالُوا لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ لَا نَبْتَغِي الْجَاهِلِينَ

অর্থ: আর যখন তারা অর্থহীন কথাবার্তা শুনে, তখন তারা সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে আমাদের কাজের ফল আমাদের এবং তোমাদের কাজের ফল তোমাদের। তোমাদেরকে সালাম। আমরা জাহেলদের মতো পথ চলতে চাই না। (সূরা কাসাস: ৫৫)

এই আয়াতের সাথে অন্য একটি আয়াতের বেশ মিল রয়েছে। সেখানে আল্লাহ তায়ালা ‘রহমানের বান্দাদের’ প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছেন:

وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا

অর্থ: তাদের সাথে যখন মূর্খরা কথা বলতে আসে, তখন তারা বলে সালাম। (সূরা ফুরকান: ৬৩)

এখন গানকেও যদি ‘লাগউ’ শব্দের অন্তর্ভুক্তু হিসেবে স্বীকার করা হয়, তাহলে আয়াতের ভাষ্য থেকে মূলত প্রতিপাদিত হয়: গান না শোনা মুস্তাহাব তথা উত্তম কাজ। অর্থাৎ, একে হারাম গণ্য করা হচ্ছে না।

‘লাগউ’ শব্দটি ‘বাতিল’ শব্দটির কাছাকাছি, যার অর্থ হলো: যে বিষয়ের মধ্যে কোনো ফায়দা বা উপকারিতা নেই। আর ফায়দাহীন গান শোনা ততক্ষণ পর্যন্ত হারাম হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তা কোনো অধিকার ক্ষুণ্ন করছে, বা কোনো কর্তব্য পালনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ইবনে জুরাইহ সম্পর্কে বর্ণিত আছে: তিনি গান শোনাকে বৈধ মনে করতেন। একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো: গান শোনা কেয়ামতের দিন আপনার ভালো কাজ হিসেবে গণ্য হবে, নাকি মন্দ কাজ হিসেবে গণ্য হবে? প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন: এটি ভালো-মন্দ কোনোটা হিসেবেই গণ্য হবে না। কারণ, গান শোনা ‘লাগ্‌উ’ তথা অনর্থক কাজের অন্তর্ভুক্ত। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন:

لَّا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّـهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ

অর্থ: তোমাদের নিরর্থক (লাগ্‌উ) শপথের জন্য আল্লাহ তোমাদেরকে ধরবেন না। (সূরা বাকারা: ২২৫)

ইমাম গাজ্জালী বলেছেন: চুক্তি বা সংকল্প করা হয়নি এমন কোনো বিষয়ে আল্লাহর নামে শপথ করা একটি নিরর্থক কাজ। বেহুদা হওয়া সত্ত্বেও এ ব্যাপারে কোনো জবাবদিহিতা বা শাস্তি নেই। তাহলে কাব্য ও নৃত্যের মতো নিরর্থক কাজের জন্য কীভাবে কাউকে অভিযুক্ত করা যায়?[1]

এই কথার জের ধরে আমরা আরো বলতে পারি: গান মাত্রই নিরর্থক নয়। গানের সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিয়ত ভেদে এ সংক্রান্ত বিধানের তারতম্য হতে পারে। সৎ নিয়তের কারণে মুবাহ, কিংবা অনর্থক কাজ ইবাদতের মানে উন্নীত হতে পারে। অন্যদিকে, অসৎ ও অশুদ্ধ নিয়ত এমন কাজকে ধ্বংস করে দেয়, যা বাইরে থেকে ইবাদতের মতো মনে হলেও ভিতরে লুকিয়ে থাকে রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছা। সহীহ হাদীসে এসেছে: “আল্লাহ তায়ালা তোমাদের বাহ্যিকতা বা ধন-সম্পত্তির দিকে মোটেও তাকান না। তিনি মূলত তোমাদের অন্তর ও কাজসমূহ দেখেন।”[2]

এ পর্যায়ে আমরা ইমাম ইবনে হাযমের একটি চমৎকার বক্তব্য উদ্ধৃত করতে পারি। এটি তিনি তাঁর ‘আল-মুহাল্লা’ নামক বিখ্যাত ফিকাহর কিতাবে উল্লেখ করেছেন। গান-বাজনার বিরোধিতা করে, এমন ব্যক্তিবর্গের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন: “(গানের বিরোধীরা) প্রমাণ হিসেবে বলে থাকেন বলেন: গান কি ‘আল-হক’ তথা সত্যের অন্তর্ভুক্ত? নাকি সত্য নয় এমন বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত? হকের অন্তর্ভুক্ত হওয়া বা না হওয়া – এই দুইয়ের বাইরে বিকল্প কোনো তৃতীয় পন্থা হতে পারে না। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “সত্য আসার পর (আল্লাহকে না মানা) গোমরাহী ছাড়া আর কী?” (সূরা ইউনুস: ৩২)। এক্ষেত্রে আমাদের উত্তর হলো– রাসূল (সা) বলেছেন: ‘নিশ্চয়ই সমস্ত কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল। আর প্রত্যেক ব্যক্তি তা-ই পায়, যা সে নিয়ত করে।’[3] অতএব, যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার নিয়তে গান শুনবে, সে নিঃসন্দেহে ফাসিক। গান ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রেও এই কথাটি সমপরিমাণে সত্য।

যে ব্যক্তি আরো ভালোভাবে আল্লাহর আনুগত্য করা ও ভালো কাজে নেমে পড়ার জন্য নিজেকে উজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে গান শুনবে, সে ব্যক্তি নিঃসন্দেহে আনুগত্যপরায়ণ ও ভালো মানুষ হিসেবে বিবেচিত হবে। আর যে ব্যক্তি গান শোনার ক্ষেত্রে আনুগত্য কিংবা পাপ কাজ কোনোটারই নিয়ত করে না, তার কাজটি ক্ষমাপ্রাপ্ত অর্থহীন কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ক্ষেত্রে গান শোনাও বাগানে ঘোরাফেরা করা; বাগানের গেটে বসে চারপাশের দৃশ্য অবলোকন করা; আকাশী, সবুজ বা অন্য কোনো রঙিন কাপড় পরিধান করা; পা ছড়িয়ে বা ভাঁজ করে আরাম করে বসে থাকার মতো সাধারণ একটি কাজ হিসেবে গণ্য হবে।”[4]

গ) অর্থহীন বিষয়কে ভদ্রতার সাথে পাশ কাটানো সংক্রান্ত আয়াত:

গানকে হারাম সাব্যস্তকারীগণ আরেকটা আয়াতকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করার চেষ্টা করেন। সেটি হলো:

وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا

অর্থ: আর যারা মিথ্যা কাজে যোগদান করে না এবং যখন অর্থহীন কাজকর্মের সম্মুখীন হয়, তখন মানসম্মান রক্ষার্থে ভদ্রভাবে সরে পড়ে। (সূরা ফুরকান: ৭২)

সালাফদের কেউ কেউ ‘আয-যূর’ (মিথ্যা কাজ) শব্দটির তাফসীর করতে গিয়ে বলেছেন, এটি দিয়ে মূলত গান বোঝানো হচ্ছে। যেমন– মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়্যা বলেছেন: এই আয়াতে ‘আয-যূর’ শব্দটি দিয়ে গান ও নিরর্থক কাজকর্মকে বোঝানো হচ্ছে। হাসান, মুজাহিদ ও আবু জাহহাফ থেকে ঠিক একই ধরনের তাফসীর বর্ণিত আছে। আর গানকে ‘আয-যূর’ হিসেবে অভিহিত করায় এটি হারাম হিসেবে বিবেচিত হওয়াকেই প্রতিপাদন করে।

অন্যদিকে, আল-কালবী বলেছেন: মুমিনরা নিরর্থক বা ফালতু আসরে উপস্থিত হন না,[5] আর গান তো এসব নিরর্থক ও ফালতু আসরেরই অংশ।

উপরোক্ত এসব দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের কিছু কথা আছে:

প্রথমত: কোনো কোনো মুফাসসির আয়াতটির এমন ব্যাখ্যা করেছেন, যার সাথে গান বা তৎসংশ্লিষ্ট কোনো কিছুর দূরতম সম্পর্কও নেই। তারা আয়াতে উল্লেখিত ‘ইয়াশহাদুন’ (يشهدون) শব্দটির অর্থ করেছেন ‘শাহাদাহ’ (الشهادة) তথা সাক্ষ্য দেয়া হিসেবে; ‘শুহুদ’ (الشهود) তথা অবলোকন করা বা দেখা অর্থে নয়। এর ফলে আয়াতটির অর্থ দাঁড়ায়, “(রহমানের বান্দা তো তারাই) যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না।” যদিও আমি এই অর্থটিকে প্রাধান্য দেই না।

যেমন কাতাদাহ বলেছেন, আয়াতে উল্লেখিত ‘আয-যুর’ শব্দের মূল অর্থ হলো মিথ্যা। অন্যদিকে, দাহহাক বলেছেন, এখানে ‘আয-যুর’ শব্দের অর্থ হলো শিরক।

দ্বিতীয়ত:  মুফাসসিরদের কেউ কেউ ‘আয-যুর’ শব্দটির ব্যাখ্যা করেছেন ‘মুশরিকদের আনন্দ-উৎসব’ হিসেবে। কারণ, এসব উৎসবে জাহেলিয়াত ও পৌত্তলিকতা থেকে শুরু করে নানান ধরনের ভ্রান্ত বিষয়ের প্রচলন ছিল। ইবনে আব্বাস থেকে আল-খাতীব এমনটাই বর্ণনা করেছেন।

এছাড়া এ ব্যাপারে ইকরিমার বক্তব্যটি এই মতের বেশ কাছাকাছি। আয়াতটির ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন: ‘আয-যূর’ শব্দটি দিয়ে জাহেলী যুগে প্রচলিত খেলাধূলাকে বুঝানো হয়েছে।[6]

এছাড়া কিছু কিছু বিদয়াতপন্থী ও বিকৃতিকারীরা ওলী-আউলিয়াদের কবর ঘিরে যেসব সীমালঙ্ঘনমূলক কার্যকলাপ করে থাকে, সেগুলোও এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হবে।

এ ব্যাপারে মূলনীতি হলো: কোনো দলীলে যদি শরীয়াহসম্মত একাধিক সঠিক অর্থের সম্ভাবনা থাকে, তাহলে এসব অর্থের মধ্য থেকে যে কোনো একটিকে অকাট্যভাবে একমাত্র সঠিক বিবেচনা করার সুযোগ নেই।[7]

তৃতীয়ত: তর্কের খাতিরে যদি ‘আয-যুর’ শব্দটির ব্যাখ্যা হিসেবে ‘গান’কে সঠিক বলে ধরেও নিই, তখনও কিছু কথা থাকে। সেক্ষেত্রে বলতে হবে, এর মাধ্যমে সে ধরনের গানকেই বুঝানো হচ্ছে, যেগুলো মানুষকে পাপাচারের দিকে নিয়ে যায়, আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে এবং যেগুলোতে খারাপ কাজের মিশ্রণ থাকে।

তুর্থত: তাছাড়া আলোচ্য আয়াতে এমন কোনো উপাদান নেই, যা দিয়ে ওয়াজিব বা আবশ্যকতা আরোপ করা যায়। বরং আলোচ্য আয়াতটিতে কেবল উল্লেখিত কাজগুলো পালন করাকে রহমানের বান্দাদের গুণ হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছে। অন্য আরেকটি আয়াতেও যেভাবে প্রশংসা করে বলা হয়েছে:

وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا

অর্থ: (রহমানের বান্দা তো তারাই) যারা রাত্রি যাপন করে পালনকর্তার উদ্দেশ্যে সেজদাবনত হয়ে ও দণ্ডায়মান হয়ে। (সূরা ফুরকান: ৬৪)

এটা তো সহজেই বোধগম্য যে, এখানে যা করতে বলা হয়েছে সেগুলো কোনো আবশ্যকীয় ফরজ ইবাদত নয়। বরং এগুলো পরিপূর্ণতাদানকারী মুস্তাহাব কাজ।

ঘ) শয়তানের আওয়াজ সংক্রান্ত আয়াত:

গানকে হারাম সাব্যস্তকারীদের চতুর্থ দলীল হলো কোরআনের সেই আয়াতসমূহ, যেখানে আল্লাহ তায়ালা অভিশপ্ত শয়তানকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন:

قَالَ اذْهَبْ فَمَن تَبِعَكَ مِنْهُمْ فَإِنَّ جَهَنَّمَ جَزَاؤُكُمْ جَزَاءً مَّوْفُورًا – وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُم بِصَوْتِكَ وَأَجْلِبْ عَلَيْهِم بِخَيْلِكَ وَرَجِلِكَ وَشَارِكْهُمْ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ وَعِدْهُمْ ۚ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُورًا

অর্থ: আল্লাহ তায়ালা বললেন– যাও (দূর হও এখান থেকে), যারা তোমার আনুগত্য করবে, তোমাদের সবার শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম, আর (জাহান্নামের) শাস্তি (হবে) পুরোপুরি। এদের মধ্যে যাকে যাকে পারো, তুমি তোমার আওয়াজ দিয়ে গোমরাহ করে দাও, তোমার যাবতীয় অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে তাদের ওপর দিয়ে চড়াও হও, ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে তুমি তাদের সাথী হয়ে যাও এবং তাদের প্রতিশ্রুতি দিতে থাকো; আর শয়তান তাদের যে প্রতিশ্রুতি দেয় তা তো প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। (সূরা বনী ইসরাঈল: ৬৩-৬৪)

কোনো কোনো মুফাসসির এখানে উল্লেখিত ‘শয়তানের আওয়াজ’ শব্দের তাফসীর করতে গিয়ে বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো গান। মুজাহিদ বলেছেন, শয়তানের আওয়াজ মানে হলো গান, বাঁশী ও বিনোদন। আর দাহ্হাক বলেছেন, শায়তানের আওয়াজ মানে হলো বাঁশির আওয়াজ।

উপরোক্ত তাফসিরই একমাত্র সঠিক ও ভুলত্রুটির উর্ধ্বে, ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। ফলে একে মেনে নেয়া বাধ্যতামূলকও নয়। যেহেতু অন্যান্য মুফাসসিরগণ এই তাফসীরের বিপরীত মত দিয়েছেন। যেমন– ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: শয়তানের আওয়াজ মানে হলো আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে আহ্বানকারী যে কোনো কিছু। আবার বলা হয়েছে, শয়তানের আওয়াজ মানে হলো শয়তানের কুমন্ত্রণা।[8]

আর একটু আগে উল্লেখিত মূলনীতি তো রয়েছেই– কোনো দলীলে যদি শরীয়াহসম্মত একাধিক সঠিক অর্থের সম্ভাবনা থাকে, তাহলে এসব অর্থের মধ্য থেকে যে কোনো একটিকে অকাট্যভাবে একমাত্র সঠিক বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

মূলকথা হলো: এখানে আয়াতের অর্থটা বাহ্যিক বা আক্ষরিকভাবে বুঝতে চাওয়াটা উচিত নয়। বরং আয়াতটির উদ্দেশ্য হলো অভিশপ্ত শয়তানকে এই কথা বলা যে– তুমি তোমার সমস্ত অস্ত্র দিয়ে আদমের সন্তানদের বিভ্রান্ত করতে কোমর বেঁধে নামো। তাদেরকে বিভ্রান্ত করতে তোমার সমস্ত সৈন্য আর কৌশলকে কাজে লাগাও। এত কিছুর পরেও তুমি আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাদেরকে পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।

ঙ) ওয়া আনতুম সা-মিদূন শীর্ষক আয়াত:

এ সংক্রান্ত পঞ্চম দলীল হিসেবে সূরা নাজমের শেষ দিকের কয়েকটি আয়াতকে উপস্থাপন করা হয়। যেখানে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

أَفَمِنْ هَـٰذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ – وَتَضْحَكُونَ وَلَا تَبْكُونَ – وَأَنتُمْ سَامِدُونَ

অর্থ: তাহলে এসব কথায় কি তোমরা অবাক হয়ে যাচ্ছো? তোমরা হাসিঠাট্টা করছো, অথচ কাঁদছো না! তোমরা ‘সামিদূন’ হয়ে রয়েছো। (সূরা নাজম: ৫৯-৬১)

ইবনে আব্বাস থেকে ইকরিমা বর্ণনা করেছেন, ইবনে আব্বাস বলেছেন: ‘সামাদা’ হলো গাধার স্বরে নিকৃষ্ট ভাষায় গান করা। যেমন– আরবীতে বলা হয়: اُسْمُدْ لَناَ (উস্‌মুদ লানা), অর্থাৎ আমাদেরকে গান শোনাও। যখন তারা কোরআন তেলাওয়াত শুনতো, তখন তারা গান গাইতো, হাসি-তামাশা করতো; যাতে করে তাদের কোরআন শুনতে না হয়।

কিন্তু আলোচ্য শব্দটি দিয়ে কী বোঝাচ্ছে এ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন আরো ব্যাখ্যা রয়েছে। এমনকি স্বয়ং ইবনে আব্বাস থেকে আল-ওয়ালিবী ও আল-আওফী বর্ণনা করেছেন: ‘সামিদূন’ মানে হলো, উদাসীন, অবজ্ঞাকারী। এছাড়া কুরতুবী বলেছেন, আরবী ভাষায় শব্দটির ক্রিয়াপদের এই ব্যবহারটি খুব প্রসিদ্ধ: সামাদাইয়াস্মুদুসুমূদান। যার মানে হলো: উদাসীন হওয়া, পাত্তা না দেয়া বা অবজ্ঞা করা। অন্যদিকে, দাহহাক বলেছেন, সামিদূন অর্থ উদ্ধত ও অহংকারী। আস-সিহাহ গ্রন্থে এসেছে: সামাদাসুমূদান ক্রিয়াপদের অর্থ: অহংকারবশত মাথা উঁচু করে চলা। যে ব্যক্তি এভাবে চলাফেরা করে, তাকে বলা হয় সামিদ। আর কবি মুবাররিদ বলেছেন: সামিদূন অর্থ– যারা নিষ্ক্রিয় ও নির্লিপ্ত। কবি বলেছেন:

أتى الحدثان نسوة آل حرب   بمقدور سمدن له سمودا
فرد شعورهن السود بيضا     ورد وجههن البيض سودا

অর্থ:

ভাগ্যের ফেরে আলে হারবের নারীরা এমন বিপদের মুখোমুখি,     

যা তাদের হতবুদ্ধি করে দিয়েছে।

ফলে তাদের কালো চুলগুলো সব সাদা হয়ে গেছে,                    

আর ফর্সা চেহারাগুলো হয়ে গেছে কালো। 

অর্থাৎ, এই কবিতায় এসে কবি সামাদা শব্দটিকে ভিন্ন একটি অর্থে ব্যবহার করেছেন।

আর এটা তো নির্ধারিত একটা বিষয় যে– কোনো দলীলে যদি শরীয়াহসম্মত একাধিক সঠিক অর্থের সম্ভাবনা থাকে, তাহলে এসব অর্থের মধ্য থেকে যে কোনো একটিকে অকাট্যভাবে একমাত্র সঠিক বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

এই আয়াতকে যারা গান হারাম হওয়ার পক্ষের দলীল হিসেবে উপস্থাপন করেন, তাদের জবাবে ইমাম গাজ্জালী বলেছেন: তাদের দাবী অনুযায়ী গানকে হারাম হিসেবে মেনে নিলে তো হাসাহাসি করা তো হারাম হবেই, এমনকি কান্না না করাও হারাম! কারণ আয়াতটিতে এই ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “তোমরা হাসিঠাট্টা করছো, অথচ কাঁদছো না!”

গাজ্জালী আরো বলেছেন: যদি বলা হয়ে থাকে, এই আয়াতটি তো মুসলমানদের ইসলাম গ্রহণের কারণে যারা হাসাহাসি করে, তাদের জন্য প্রযোজ্য। তাহলে এক্ষেত্রেও শুধু সেসব গান ও কবিতাই হারাম হবে, যেগুলো মুসলমানদেরকে উপহাস ও অবজ্ঞার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। যেমনটা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদের অনুসরণ করে” (সূরা শোয়ারা: ২২৪)। এখানে অবশ্য আল্লাহ তায়ালা কাফির কবিদের কথা বুঝাতে চেয়েছেন। স্বয়ং কবিতাকে হারাম গণ্য করা আল্লাহর উদ্দেশ্য নয়।[9]

আলোচনার এই পর্যায়ে এসে আমরা দেখতে পাই– পবিত্র কোরআনে এমন একটা আয়াতও নেই, যাকে অকাট্য ও শর্তহীনভাবে গান হারাম হওয়ার পক্ষে দলীল হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।

সমস্ত প্রসংশা মহান আল্লাহর, যিনি আমাদের সঠিক পথের দিশা দিয়েছেন। তিনি ব্যতীত কোনোভাবেই আমরা সঠিক পথের দিশা পেতাম না।

[মূল: ইউসুফ আল-কারযাভী, অনুবাদ: শাইখুল আবরার]

*****

অনুবাদটির অন্য পর্বগুলো পাবেন এখানে

*****

নোট ও রেফারেন্স:

[1] এহইয়া উলুমুদ্দীন, গান অধ্যায়, পৃ. ১১৪৭, আশ-শাব প্রকাশনী, মিশর।

[2] আবু হুরাইরার (রা) বরাত দিয়ে ইমাম মুসলিম তাঁর হাদীস গ্রন্থে হাদীসটি সংকলন করেছেন। সৎ কাজ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও শিষ্টাচার অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: কোনো মুসলিমকে অত্যচার করা হারাম হওয়া প্রসংগে। 

[3] ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা) থেকে ‘মুত্তাফিকুন আলাইহ’ হিসেবে বর্ণিত। এটি সহীহ বুখারীর প্রথম হাদীস।

[4] আল-মুহাল্লা: ৯/৬০।

[5] দেখুন– ইগাসাতু আল-লাহফান, প্রথম খণ্ড, পৃ. ২৬০।

[6] দেখুন– আদ-দুররুল মানসূর, পঞ্চম খণ্ড, পৃ. ৮০।

[7] বিস্তারিত জানতে দেখুন: মিন উসূলুল ফিক্‌হ আলা মানহাজ আহলিল হাদীস, যাকারিয়া বিন গোলাম কাদির, প্রথম সংস্করণ, দারুল খারায, পৃ. ৩৪। — অনুবাদক।

[8] দেখুন– তাফসীরে কুরতুবী, প্রথম খণ্ড, পৃ. ২৮৮, দারুল কুতুব আল-মিসরিয়্যাহ।

[9] এহইয়া উলুমুদ্দীন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ২৮৫।

ইউসুফ আল-কারযাভী
ড. ইউসুফ আল-কারযাভী একজন শীর্ষস্থানীয় ইসলামী চিন্তাবিদ ও পণ্ডিত। ইসলামী জ্ঞানে তাঁর গভীরতা এবং সমসাময়িক বিশ্বে ইসলাম ও মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনামূলক মতামতের জন্য তিনি বিশ্বব্যাপী সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র। পড়াশোনা করেছেন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্রজীবনেই শিক্ষকদের নিকট হতে আল্লামা খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন। নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন এবং মানবাধিকারের সপক্ষে তিনি সোচ্চার। এ পর্যন্ত তিনি শতাধিক বই লিখেছেন। বর্তমানে কাতারে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন