শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৭
হোম > ডকুমেন্টারি অনুবাদ > মক্কা বিজয়, বিদায় হজ ও মহামানবের বিদায়

মক্কা বিজয়, বিদায় হজ ও মহামানবের বিদায় দ্য লাইফ অব মোহাম্মদের অনুবাদ: শেষ পর্ব

মক্কায় প্রবেশ

যা হোক, মোহাম্মদের (সা) শান্তিপূর্ণ জিহাদ এতদিনে সফলতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হলো। যেখানে তিনি জন্মেছিলেন, সাত বছর আগে জীবন বাঁচাতে খালি হাতে যে শহর ত্যাগ করে তিনি অভিবাসী হয়েছিলেন, হুদায়বিয়ার চুক্তির ফলে তিনি এবার সেই নগরীটিতে ফিরে যেতে পারছেন। একটি ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় সমাজের প্রধান এবং আরবের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা হিসেবে তিনি মক্কায় ফিরছেন।

কাবা পরিদর্শনের জন্য মক্কায় প্রবেশের ব্যাপারে ৬২৯ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে কোরাইশরা মুসলমানদেরকে সম্মতি প্রদান করে। মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাথীদেরকে তিনদিন অবস্থান করার অনুমতি দেয়া হয়। তবে এ স্বল্প সময়ের মধ্যেই মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাথীদের ব্যাপারে লোকজনের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। মক্কার লোকেরা মুসলমানদেরকে কাবায় প্রবেশ করতে দেখেছে, তাদের চমৎকার ও আন্তরিক ব্যবহার খেয়াল করেছে। মুসলমানদের সুন্দর আচরণ মক্কায় কোরাইশদের দুঃসহ শাসনের ইতি ঘটাতে  কিছুটা হলেও যে ভূমিকা রেখেছিলো, তা নিশ্চিত। তাই এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার।

মক্কা বিজয়

এক বছর পর কোরাইশরা মোহাম্মদের (সা) মিত্র একটি গোত্রের উপর হামলা করার মাধ্যমে চুক্তি ভঙ্গ করলো। এটা ছিলো কোরাইশদের চরম ভুল। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে মহানবী (সা) ১০ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে মার্চ করলেন। এই বাহিনী মোকাবেলার সাধ্য কোরাইশদের ছিলো না। তারা ধরেই নিয়েছিলো, মোহাম্মদ (সা) মক্কায় প্রচণ্ড তাণ্ডব চালাবেন, বহু বছরের নির্যাতন ও যুদ্ধবিগ্রহের রক্তাক্ত প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। নগরীর উপর কোরাইশরা তাদের নিয়ন্ত্রণ হারালো। তবে চূড়ান্ত বিজয়ের মুহূর্তে মহানবীর (সা) ভূমিকায় মক্কার লোকেরা অভিভূত হয়ে পড়লো। মোহাম্মদ (সা) ঘোষণা করলেন, শত্রুদের সকলকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। কাউকেই ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা যাবে না বলে তাঁর সাথীদেরকেও সতর্ক করে দিলেন। প্রতিশোধ গ্রহণের পরিবর্তে তিনি সচেতনভাবেই বিরোধ  মীমাংসার এই পথ বেছে নিয়েছিলেন। অধ্যাপক সাজ্জাদ রিজভী বলেন,

মক্কা বিজয় ছিলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার। কারণ, এ বিজয়ের পর অভাবনীয়ভাবে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছিলো। লোকদের জন্য ইসলাম গ্রহণ করা বা না করা, কিংবা অন্য কোথাও চলে যাওয়া, মোটকথা নিজের ব্যাপারে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ তাদের ছিলো। এই বিজয়ের আরেকটি তাৎপর্য রয়েছে। সেটা হলো, বিজয়ের পর মক্কা হয়ে ওঠলো নতুন বিশ্বাসব্যবস্থার কেন্দ্র। এর মাধ্যমে মহানবীর (সা) মিশনের প্রথম ধাপটি নিশ্চিতভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। ফলে সংঘাতের আর কোনো প্রয়োজনই ছিলো না।

এই সময়টির জন্যই মোহাম্মদ (সা) অপেক্ষায় ছিলেন। কোরাইশদেরকে হত্যা করতে তিনি মক্কায় ফিরে আসেননি। এক আল্লাহর পবিত্র ঘর হিসেবে কাবার মর্যাদাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতেই তিনি মক্কায় ফিরে এসেছিলেন। মুসলিম বর্ণনা মতে, তিনি ও তাঁর হাজারো অনুসারী কাবায় কাবায় প্রবেশ করে অসংখ্য দেবদেবীর মূর্তি-প্রতিমূর্তি ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। মক্কা বিজয় সম্পর্কে বারনাবি রজারসন বলেন,

তিনি শুধু তাদেরকে ক্ষমাই করেননি। তাদের প্রতি যথেষ্ট উদারতাও দেখিয়েছেন। শত্রুতার বিনিময়ে তিনি তাদেরকে দিয়েছেন উপহার। এমনকি যেসব গোত্রীয় সর্দার তাঁর বিরোধিতাও করেনি, আবার তাঁর বাণী গ্রহণও করেনি; তারাও মোহাম্মদের (সা) কাছে উট, বিভিন্ন গবাধি পশু, রৌপ্য ইত্যাদি পাওয়ার আশা করছিলো। তিনিও তাদেরকে সেসব দিয়েছিলেন। এটি ছিলো ন্যায়ের অসাধারণ এক দৃষ্টান্ত।

ম্যারল ওয়েন ডেভিস এ ব্যাপারে বলেন,

আমার মনে হয়, এই ঘটনাটি মহানবীর (সা) জীবনের মূল শিক্ষা। মহানবীর (সা) জীবনকে আমি যতটুকু জেনেছি বা বুঝেছি, সে আলোকে বলতে পারি, এটি ছিলো তাঁর সমগ্র জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত। তিনি প্রতিহিংসাপরায়ণ ছিলেন না। প্রতিশোধ নয়, বরং ব্যাপক সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সকলকে নিয়ে একটি নতুন সমাজ গড়ে তোলাই ছিলো তাঁর দাওয়াতের মূল কথা। তাই আমরা যে ধরনের সমাজ গড়ে তুলতে চাই, সে ধরনের সমাজের মডেল হিসেবে তাঁর মক্কায় প্রত্যাবর্তনের মুহূর্তটিকেই আমার কাছে সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে হয়।

ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

অবশেষে তিনি ঘরে ফিরে গেলেন। তবে বর্তমানে ইসলামী রাষ্ট্রে যেসব বিষয় বাধ্যতামূলক বলে আমরা মনে করি, তেমন কোনো কিছুই তিনি সেখানে চাপিয়ে দেননি। এ কারণেই তখনকার মতাদর্শিক গোঁড়ামী নিয়ে কেউ কোনো কথা বলে না। যে গোত্রবাদ লোকদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা তৈরি করে রেখেছিলো, মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তার অবসান ঘটার প্রসঙ্গটিই বরং আলোচনার প্রতিপাদ্য বিষয়।

মক্কা নগরী মোহাম্মদের (সা) নিয়ন্ত্রণে থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর জন্মভূমিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি বরং মদীনায় ফিরে গিয়েছিলেন। কোরাইশদের পরাজিত করার কিছুদিনের মধ্যেই আরবের বাদবাকি গোত্রগুলো তাঁর সাথে যোগ দিয়েছিলো।

রক্তপাতহীনভাবে মক্কা বিজয়ের ঘটনা থেকে স্পষ্টত বুঝা যাচ্ছিলো, মোহাম্মদের (সা) আন্দোলন সফল হতে চলেছে। উপরন্তু, তাঁর ন্যায়বিচারের বাণী এবং এই বাণী প্রচারের ক্ষেত্রে শান্তি ও বিরোধ মীমাংসাকে অগ্রাধিকার দেয়ায় অসংখ্য মানুষ তা গ্রহণ করতে শুরু করে। এমনকি, পুরো গোত্র একসাথে ইসলাম গ্রহণের ঘটনাও ঘটতে থাকে। ৬৩১ খ্রিষ্টাব্দে পৌত্তলিকদের সর্বশেষ ঘাঁটি তায়েফেরও পতন ঘটে। ফলে মোহাম্মদ (সা) এবার সত্যিকার অর্থে সমগ্র মুসলিম আরবের শাসক হয়ে ওঠলেন।

ইতোমধ্যে মহানবীর (সা) নবুয়তের ২০ বছর পার হয়ে গেছে। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ও তাঁর অনুসারীগণ নিরাপত্তাহীন এক অনিশ্চিত জীবন পার করেছেন। দিনকে দিন তাঁরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু মোহাম্মদের (সা) আধ্যাত্মিক, সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অসামান্য দক্ষতার কারণে খাদের কিনারা থেকে তাঁরা ফিরে আসতে পেরেছিলেন। অবশেষে আপাতদৃষ্টিতে অপমানজনক একটি চুক্তি স্বাক্ষরের (হুদাইবিয়ার সন্ধি) পর তাঁরা শত্রুদের উপর বিজয়ী হন। মহানবীর (সা) নেতৃতৃগুণ নিয়ে জন আডায়ার বলেন,

একজন ভালো নেতার মধ্যে আমরা এখন যেসব গুণাবলি দেখি, তার সবকটিই মোহাম্মদের মধ্যে ছিলো। তাই তিনি আজ পর্যন্ত উদাহরণ হয়ে আছেন। একজন ভালো নেতা মানে, কাজের প্রতি একাগ্রতা থাকবে, চারিত্রিক সুষমা বজায় থাকবে। যে কোনো নেতার মধ্যে কঠোরতা, একাগ্রতা এবং ন্যায়পরায়ণতার সমন্বয় থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। মোহাম্মদের মধ্যে এইসবগুলো গুণই সুস্পষ্টভাবে ছিলো। আমার মতে, আন্তরিকতা, মানবতাবোধ ও দয়ামায়া থাকাটাও গুরুত্বপূর্ণ। মোহাম্মদের জীবনের দিকে তাকালে আমরা দেখবো, তিনি ছিলেন এইসব মানবিক গুণাবলির প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

মোহাম্মদ (সা) যা যা চেয়েছিলেন, ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ তার প্রায় সবই তিনি অর্জন করতে পেরেছিলেন। তিনি আরবে একটি পর্যায় পর্যন্ত শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। যা সেখানে খুবই দুর্লভ ব্যাপার ছিলো। তিনি ইসলামের ভিত্তি ও আইনকানুনগুলো প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। একটি নতুন মুসলিম সমাজের ভিত্তিও তিনি গড়ে গেছেন। এসব করতে করতে তিনি একজন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধে পরিণত হয়ে পড়লেন। ক্রমে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। সে বছরই তিনি শেষবারের মতো মক্কায় আসেন এবং প্রথম ও শেষবারের মতো হজ পালন করেন। হজে আগত হাজীদের উদ্দেশ্যে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা ‘বিদায় হজের ভাষণ’ হিসেবে পরিচিত।

বিদায় হজের ভাষণ

আরাফাতের ময়দানে বিশাল জনসমুদ্রের উদ্দেশ্যে একটি উটের উপর বসে তিনি এই ভাষণ প্রদান করেছিলেন। তাঁর কথাগুলো সবার কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য পুরো ময়দান জুড়ে ঘোষক নিয়োজিত ছিলো। মহানবী (সা) নিজেই পরবর্তীতে বলেছেন, এটি ছিলো গভীর আবেগময়ী একটি ভাষণ। তিনি ও তাঁর অনুসারীগণ যা কিছু অর্জন করতে পেরেছেন বলে তিনি মনে করতেন, তার একটি সারসংক্ষেপ এই ভাষণে তিনি তুলে ধরেছিলেন।

হে জনমণ্ডলী! মনোযোগ দিয়ে শোনো। আগামীবার তোমাদের মাঝে ভাষণ দেয়ার জন্য আমি নাও থাকতে পারি। তাই যা বলছি, সতর্কতার সাথে তা শুনে রাখো। আজকে যারা এখানে উপস্থিত নেই, তাদের কাছে আমার কথাগুলো তোমরা পৌঁছে দিও।

– মহানবীর বিদায় হজের ভাষণ থেকে

এ ব্যাপারে আব্দুর রহীম গ্রীন বলেন,

বিদায় হজের ভাষণ পড়লে আপনি বুঝতে পারবেন, এটি ছিলো মুসলমানদের উদ্দেশ্যে মহানবীর (সা) হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে জানানো আহ্বান ও সতর্কবার্তা। মুসলমানদেরকে তিনি কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। মুসলমানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর উদ্বিগ্নতা আপনার চোখে পড়ার কথা। এই ভাষণ মুসলমানদেরকে গুরুত্ব সহকারে নেয়া উচিত এবং তা মেনে চলার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকা উচিত। কারণ, এতে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা রয়েছে।

নিজের দাসদাসীদের উপর অবিচার করো না। মনে রেখো, একদিন তোমাকে আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে এবং নিজ কৃতকর্ম সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। তাই সতর্ক হও। আমার মৃত্যুর পর তোমরা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ো না।

– মহানবীর বিদায় হজের ভাষণ থেকে

অধ্যাপক জন এসপোজিটো বিদায় হজের ভাষণ থেকে উদ্ধৃতি দেন,

মনে করে দেখো– আদম, ইবরাহীম, মুসা, ঈসাসহ রাসূলগণের প্রতি আল্লাহর সর্বপ্রথম বাণী কী ছিলো! একমাত্র পরম ও চূড়ান্ত সত্য হলো স্বয়ং এক আল্লাহ। তিনি হলেন সর্বস্রষ্টা, প্রতিপালক ও বিচার দিবসের মালিক।

সকল মানুষ এসেছে আদম ও হাওয়া থেকে। তাই অনারবদের উপর আরবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আরবদের উপরও অনারবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কালোদের উপর সাদাদের, কিংবা সাদাদের উপর কালোদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো খোদাভীরুতা ও সৎকর্ম।

– মহানবীর বিদায় হজের ভাষণ থেকে

ক্যারেন আর্মস্ট্রং বিদায় হজের ভাষণ সম্পর্কে বলেন,

তিনি বলেছেন, সকল মানুষ এক। আল্লাহ তোমাদেরকে পৌত্তলিক গোত্রতন্ত্র এবং বংশীয় গর্ব প্রদর্শনের পৌত্তলিক রীতি থেকে ফিরিয়ে এনেছেন। স্মরণ রেখো, সকল মানুষ এসেছে আদম থেকে এবং আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে ধূলিকণা থেকে। তারপর তিনি কোরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করেন, যা আমাদের সময়ের জন্য পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক – “হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে। তারপর আমি তোমাদেরকে বিভিন্ন গোত্র ও জাতিতে ভাগ করে দিয়েছি, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো।” পরস্পর যুদ্ধ-সংঘাত, নির্যাতন, দখলদারিত্ব, জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণ কিংবা সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানোর জন্য এই বিভাজন করা হয়নি। একে অপরকে জানার জন্যই মানবজাতিকে এভাবে ভাগ করা হয়েছে।

তোমরা যারা আমার কথা শুনছো, তারা অন্যদের কাছে এই কথাগুলো পৌঁছে দেবে। তারা আবার পৌঁছে দেবে আরো যারা শুনেনি, তাদের কাছে। তোমরা যারা সরাসরি আমার কথা শুনছো, তাদের চেয়ে পরবর্তী কেউ হয়তোবা আমার কথা আরো ভালোভাবে বুঝতে পারবে। হে আল্লাহ! সাক্ষী থেকো, আমি তোমার বান্দাদের কাছে তোমার বাণী পৌঁছে দিয়েছি।

– মহানবীর বিদায় হজের ভাষণ থেকে

ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

তারপর তিনি উপস্থিত জনসমুদ্রের কাছে জানতে চাইলেন, ‘হে লোকসকল! হে মুসলমানেরা! তোমাদের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব কি আমি পালন করতে পেরেছি?’ লোকেরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো, ‘নায়াম’, ‘হ্যাঁ, আপনি পেরেছেন।’ জনসমুদ্রের এই সাক্ষ্য ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলো। তিনি লোকদেরকে তিনবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি পেরেছি?’ প্রতিবারই তারা জবাব দিলো, ‘নায়াম’, ‘হ্যাঁ, আপনি পেরেছেন।’ আমার মতে, এটি ছিলো সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ও আবেগময় একটি মুহূর্ত।

জিয়াউদ্দীন সরদার বলেন,

এই ভাষণ ছিলো তাঁর সমগ্র জীবনের একটি সারসক্ষেপ। বিগত ২৩ বছরে তিনি যেসব শিক্ষা দিয়েছেন, এই ভাষণে সেসব মূলনীতির উপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন, আরব ও অনারবের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তারপর বলেছেন, নিজ পরিবারের দেখাশোনা করো। এগুলোই ছিলো তাঁর জীবনের শিক্ষা। আর কিছু না পড়লেও শুধু বিদায় হজের ভাষণও যদি আপনি পড়ে থাকেন, তাহলে মোহাম্মদের (সা) জীবনের সারনির্যাস আপনি পেয়ে যাবেন।

ম্যারল ওয়েন ডেভিস বলেন,

মহানবীর (সা) বিদায় হজের ভাষণ আধুনিক ও সমসাময়িক মুসলিম সমাজের কর্তব্য ঠিক করে দিয়েছে। কী করলে আমরা ব্যর্থ হয়ে পড়বো, ব্যর্থতা থেকে মুক্তির উপায়ই বা কী, এই ভাষণে এর দিকনির্দেশনা রয়েছে। এটি ছিলো মহানবীর (সা) সমাজ পরিবর্তনের মিশনের সারনির্যাস।



মহামানবের বিদায়

বিদায় হজের পর ক্লান্ত-শ্রান্ত মোহাম্মদ (সা) মদীনায় তাঁর ছোট্ট বাড়িতে ফিরে গেলেন। তখন থেকেই তাঁর মাথাব্যথা ও শারিরীক দুর্বলতা শুরু হয়। তারপরও তিনি মসজিদে হাজির হওয়ার চেষ্টা করতেন। কিন্তু দিন দিন তাঁর অসুস্থতা বেড়েই চলছিলো। ফলে তিনি প্রায়ই শয্যাশায়ী থাকতেন। আয়েশা (সা) তাঁর সেবা করতেন। হঠাৎ একদিন তিনি কিছুটা সুস্থবোধ করলেন। মুহূর্তেই খবরটি মদীনা জুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লো। কিন্তু খুব অল্প সময় পরই তিনি আবারো অসুস্থ্ হয়ে পড়েন।

তারপর একদিন তিনি আয়েশার (রা) ঘরে ইন্তেকাল করেন। দিনটি ছিলো ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জুন। খবরটি শুনে তাঁর সাহাবীরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। কেউ কেউ এই বাস্তবতা মেনে নিতে অস্বীকার করেন। তারা ভেবেই পাচ্ছিলেন না, আল্লাহর প্রেরিত একজন রাসূল কীভাবে মৃত্যুবরণ করতে পারেন! মহানবীর (সা) সবচেয়ে ঘনিষ্ট সাথী আবু বকর (রা) তখন তাঁদেরকে শান্ত করেন। তিনি তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন, আর দশজনের মতো মরনশীল মানুষের বাইরে মোহাম্মদ (সা) কখনোই নিজের ব্যাপারে ভিন্ন কিছু দাবি করেননি। আর মোহাম্মদের (সা) নয়, ইবাদত করতে হবে একমাত্র আল্লাহর– মহানবীর (সা) এই শিক্ষাও তিনি তাদেরকে মনে করিয়ে দেন। মসজিদে নববীর পাশেই তাঁকে কবর দেয়া হয়। তাঁর মুখমণ্ডলকে কাবার দিকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়। আজো মুসলমানরা মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই প্রথাটি মেনে চলেন।

শেষ কথা

পরবর্তী এক শতাব্দীর মধ্যে মোহাম্মদের (সা) বাণী গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এর বিস্তৃতি ছিলো প্রাচ্যের চায়না-ইন্ডিয়া, উত্তর আফ্রিকা এবং পাশ্চাত্যের স্পেন-ফ্রান্স পর্যন্ত। কিন্তু নানান কারণে তাঁর শান্তিপূর্ণ জিহাদের সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত বিচ্যুতির শিকার হয়। মোহাম্মদের (সা) মৃত্যুর এক প্রজন্মের মধ্যেই তাঁর ঘনিষ্ট অনুসারী ও পরিবারের সদস্যরা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তাঁরা প্রকাশ্য ও রক্তাক্ত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। এই দ্বন্দ্ব মুসলমানদের মধ্যে গভীর ক্ষত তৈরি করে, যা আজো মুসলিম বিশ্বে শিয়া-সুন্নী বিভাজন হিসেবে রয়ে গেছে।

কিন্তু মোহাম্মদের (সা) বাণী আগে কখনোই এখনকার মতো এ ধরনের হুমকিতে পড়েনি। অনেক মুসলমান পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি ও সামরিক প্রাধান্যকে নিজেদের জন্য অবমাননাকর মনে করে এবং তারা এর বিরোধিতা করে। অন্যদিকে, অনেক পাশ্চাত্যবাসীর কাছেও ইসলাম হলো দুনিয়ার সবচেয়ে নিষ্ঠুর, সহিংস ও অসহিষ্ণু ধর্ম। তর্কের খাতিরে তা ধরে নিলেও স্বয়ং মোহাম্মদকে (সা) এর জন্য কীভাবে দায়ী করা যায়?

মোহাম্মদ (সা) তিনটি জিনিস রেখে গেছেন– আল্লাহর উপর বিশ্বাস, তাঁর নিজের জীবনকর্ম এবং সর্বোপরি আল কোরআন।

কিন্তু অনেকে শুধু তাঁর জীবনের সেটুকুই তুলে ধরে, যেটুকু তার নিজের অবস্থানের পক্ষে যায়। ফলে তাঁর জীবনের বাকি অধ্যায় অজানাই থেকে যায়। কিন্তু আমরা তাঁর জীবনকে সামগ্রিকভাবে যাচাই করলে দেখবো, আরব বিশ্বকে তিনি চমৎকার একটি অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েও প্রতিরোধের পরিবর্তে তিনি তা সহ্য করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি অনেকগুলো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও, সম্ভব হলেই যুদ্ধ এড়িয়ে গিয়েছেন। শান্তিপূর্ণভাবে তাঁর জীবনের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়েছিলো। সেই বিজয়ের পর তিনি প্রতিশোধ গ্রহণের পরিবর্তে বিরোধ মীমাংসার পথই বেছে নিয়েছিলেন।

সর্বশেষ, বিদায় হজের ভাষণে মোহাম্মদ (সা) আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপদেশগুলো দিয়ে গেছেন। তিনি বলে গেছেন, আরব-অনারব, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে মানুষ হিসেবে আমরা সবাই সমান। এই সার্বজনীন বক্তব্য সপ্তম শতকের আরবের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিলো, একইভাবে বর্তমান সময়ের জন্যও প্রাসঙ্গিক। মোহাম্মদের (সা) জীবনের এই শিক্ষাটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় বলে মনে হয়।


বাকি পর্বগুলো পড়তে ভিজিট করুন এখানে

আপনার মন্তব্য লিখুন