রবিবার, নভেম্বর ১৯, ২০১৭
হোম > ডকুমেন্টারি অনুবাদ > হুদাইবিয়ার সন্ধি ও জিহাদের ধারণা

হুদাইবিয়ার সন্ধি ও জিহাদের ধারণা দ্য লাইফ অব মোহাম্মদের অনুবাদ: পর্ব-১৩

কোরাইশ নিয়ন্ত্রিত কাবায় হজ করার ঘোষণা

মোহাম্মদের (সা) বিরোধীরা বহুবিবাহকে কেন্দ্র করে তাঁর মর্যাদাহানীর সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তা সত্ত্বেও তিনি এই বিয়েগুলোকে আরবে তাঁর ক্ষমতা নিশ্চিত করা এবং তা আরো বিস্তৃত করতে কাজে লাগিয়েছেন। এরপর তিনি পুনরায় মক্কার দিকে মনোযোগ দেয়ার ফুরসত পেলেন। ফলে তিনি বার্ষিক হজ পালনের জন্য মক্কায় অবস্থিত কাবাঘরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে অনুসারীদেরকে নির্দেশ দিলেন। এটি ৬২৮ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকের ঘটনা।

মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর অনুসারীদের কাছে কাবা ছিলো ইবাদতের কেন্দ্র। কাবার দিকে ফিরেই তাঁরা নামাজ আদায় করেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন, সর্বপ্রথম কাবা তৈরি করেছিলেন নবী ইবরাহীম (আ)। তাঁদের কাছে এই ঘরটি আল্লাহর একত্ববাদ তথা তাওহীদী বিশ্বাসের চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু কাবা ঘরে প্রবেশের নিয়ন্ত্রণ ছিলো মক্কার শাসকগোষ্ঠী তথা মোহাম্মদের (সা) শত্রু কোরাইশদের হাতে। আরবের গোত্রগুলোর পূজনীয় শত শত দেবদেবীর মূর্তি কাবাঘরে রক্ষিত ছিলো। তিনি এবার সেই পবিত্র ঘরের উপর কোরাইশদের নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

মহানবী ঘোষণা করলেন, তিনি হজ করতে যাচ্ছেন। এই ঘোষণায় সবাই হতবিহ্ববল হয়ে পড়েছিলো। কারণ, হজে কোনো প্রকার অস্ত্র সাথে রাখা নিষিদ্ধ। আর এই নিরস্ত্র অবস্থায় তিনি যেতে চাচ্ছেন শত্রুর ডেরায়!

বারনাবি রজারসন এ ব্যাপারে বলেন,

এই ঘটনায় আপনি আবারো ব্যক্তি মোহাম্মদের জাদুকরি প্রতিভার ছোঁয়া পাবেন। এতোদিন তিনি যুদ্ধে নিয়োজিত ছিলেন। এবার তিনি বললেন, যথেষ্ট হয়েছে, আমরা এবার আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করবো।

হোদায়বিয়ার সন্ধি

মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাথীদের কাফেলা মক্কা থেকে আট মাইল দূরে হুদায়বিয়ায় থেমে যেতে বাধ্য হলো। কারণ, কোরাইশরা তাদের চিরাচরিত আগ্রাসী প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিলো। মুসলিম কাফেলার অগ্রগতি রুখতে তারা একদল অশ্বারোহীকে পাঠালো। এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডার পর উভয় পক্ষ অবশেষে একটি সমঝোতাপত্রে স্বাক্ষর করে। এটি হুদায়বিয়ার সন্ধি নামে পরিচিত। ঐতিহাসিক এই ঘটনার স্মারক হিসেবে সেই স্থানটিতে বর্তমানে একটি মসজিদ রয়েছে।

আপাতদৃষ্টিতে সন্ধির বিষয়বস্তু মোহাম্মদের (সা) জন্য ছিলো অত্যন্ত অপমানজনক। কোরাইশদের শর্তানুযায়ী, মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাথীদেরকে এবার হজ না করেই মদীনায় ফিরে যেতে হবে। মক্কার বাণিজ্য কাফেলাগুলোর উপর মুসলিম বাহিনীর আক্রমণ বন্ধ করতে হবে। এসব কিছুর বিনিময়ে মুসলমানরা মক্কায় গিয়ে হজ করতে পারবে। তবে এ বছর নয়, আগামী বছর। এ সকল কথাবার্তা চূড়ান্ত হওয়ার পর সন্ধিপত্র স্বাক্ষর করার জন্য যখন নিয়ে আসা হলো, তখন দেখা গেলো তাতে মোহাম্মদকে (সা) ‘আল্লাহর রাসূল’ হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়েছে। কোরাইশ প্রতিনিধি এতে আপত্তি জানিয়ে বললো, তাদের কাছে তিনি শুধুই আব্দুল্লাহর পুত্র মোহাম্মদ। মোহাম্মদের (সা) অনুসারীদের কাছে এটি ছিলো চরম অপমান। মুসলিম বর্ণনা মতে, মোহাম্মদের (সা) তরুণ চাচাতো ভাই আলী (রা) ‘আল্লাহর রাসূল’ অংশটুকু কেটে দিতে অস্বীকার করলেন। উল্লেখ্য, সন্ধিপত্রের চূড়ান্ত সংস্করণ তিনিই লিখেছিলেন। ক্যারেন আর্মস্ট্রং ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন,

তখন মোহাম্মদ বললেন, আমাকে একটা কলম দাও, আর কোথায় ‘আল্লাহর রাসূল’ লেখা রয়েছে, তা দেখিয়ে দাও। তারপর তিনি নিজে সে অংশটুকু কেটে দিলেন। আমি মনে করি, অধিকারের জায়গা থেকে নয়, বরং অহংকারবশতই কোরাইশরা  এই অংশটুকু কেটে দিতে বাধ্য করেছে। তাছাড়া কোরআনে বলা হয়েছে, শত্রুপক্ষ যদি শান্তির আহ্বান জানায়, তাহলে অবশ্যই তাৎক্ষণিকভাবে অস্ত্র সংবরণ করতে হবে। তারপর শান্তির স্বার্থে যে কোনো শর্তে রাজি হতে হবে, তা যতই অসুবিধাজনক হোক না কেন।

মোহাম্মদের (সা) অনুসারীদের দৃষ্টিতে চুক্তির শর্তাবলি এবং চুক্তি সম্পাদন প্রক্রিয়া ছিলো মুসলমানদের জন্য নিতান্তই অবমাননাকর। তবে মোহাম্মদের (সা) দৃঢ় মনোভাবের কারণেই তাঁরা কোনো প্রতিবাদ করেনি। যদিও মুসলমানদের এ ধরনের প্রতিক্রিয়া খুব স্বাভাবিক ছিলো। কারণ, তিনি যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, সপ্তম শতাব্দীর আরবে এ ধরনের কিছু করার কথা আগে কেউ কখনো শুনেনি। আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য যুগের পর যুগ, বংশ পরম্পরায় লড়াই করে যাওয়াই ছিলো তখনকার সমাজের প্রচলিত প্রথা। কিন্তু কয়েক বছরের অমীমাংসিত রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলার পর মোহাম্মদ (সা) এবার তাঁর শত্রুদেরকে যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তির বার্তা দিয়ে বশ করতে চাইলেন। কোরাইশদের সাথে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে তিনি শুধু কাবা ঘরে প্রবেশের সুযোগই লাভ করলেন, তা নয়; বরং তিনি যে তাদের সমমর্যাদার প্রতিপক্ষ, অতি গুরুত্বপূর্ণ এই স্বীকৃতিটাও আদায় করে নিলেন। অধ্যাপক সাজ্জাদ রিজভী এ ব্যাপারে বলেন,

এক দিক থেকে হুদায়বিয়ার সন্ধি ছিলো অত্যন্ত সামান্য একটি অর্জন। কারণ, আমাদের ইচ্ছানুযায়ী এখনই আমরা কাবায় যেতে পারছি না। তবে চুক্তিটি করলে ভবিষ্যতে সেখানে যেতে পারবো। জানা কথা হলো, যুদ্ধের চেয়ে সমঝোতা উত্তম। আমরা জানি, কোরআনেও বার বার বলা হয়েছে, যুদ্ধের চেয়ে শান্তি উত্তম। সেই হিসেবে চুক্তিটি কোরআনের এই মূলনীতির সাথে পুরোপুরি মিলে গেছে।

মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাথীরা মদীনায় ফিরে আসার পর পরই একটি নতুন ওহী নাজিল হয়। হুদায়বিয়ার সন্ধি যে কোনো অবমাননাকর পরাজয় নয়, ওহীর মাধ্যমে তা আশ্বস্ত করা হয়েছে। ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

তিনি বললেন, “মাত্রই একটি ওহী নাজিল হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, আপাতদৃষ্টিতে একে পরাজয় মনে হলেও এটি একটি সুস্পষ্ট বিজয়।” কোরাইশরা পুরানো গোত্রীয় ধ্যানধারণা তথা হিংস্রতা, ঘৃণা-বিদ্বেষ ও গর্ব-অহংকার ইত্যাদির মধ্যে নিমজ্জিত ছিলো। অন্যদিকে, মুসলমানদের হৃদয় ছিলো শান্তির মর্মবাণীতে পরিপূর্ণ। যা প্রায় সময়ই আমরা ভুলে যাই। মোহাম্মদ কতগুলো যুদ্ধ করেছেন, আমরা সাধারণত এসব বিষয় শুনে থাকি। কিন্তু তাঁর এই অসামান্য, অহিংস আত্মরক্ষামূলক দিকটির কথা আমরা ভুলে যাই। হুদাইবিয়ার ঘটনার পর পরিস্থিতি তাঁর অহিংস আন্দোলনের অনুকূলে চলে আসে।

অধ্যাপক জন এসপোজিটো বলেন,

যুদ্ধংদেহী পরিবেশে থেকেও মোহাম্মদ কূটনীতিকে অন্যতম প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন গোত্রের কাছে গিয়েছেন, শীর্ষ ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলেছেন, তাদের সাথে সমঝোতা চুক্তিতে আসার চেষ্টা করেছেন। তৎকালীন মদীনার সমাজের দিকে খেয়াল করলে আপনি দেখবেন, ভিন্ন বিশ্বাস ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের জন্য সেখানে জায়গা ছিলো। তবে কোনো আগ্রাসন বা প্রতিরোধের মুখে পরিবেশ ও পরিস্থিতির আলোকে যা করণীয়, তিনি তা-ই করেছেন। আমার কাছে ব্যাপারটা একদম পরিষ্কার। মহানবীর পক্ষ হতে বিরোধীদেরকে পাইকারিভাবে হত্যা করার আহ্বান জানানোর কোনো নজির আপনি খুঁজে পাবেন না।

পুরো আরব জুড়ে মোহাম্মদ (সা) তাঁর বাণী ছড়িয়ে দেয়ার যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন, হুদায়বিয়ার সন্ধি ছিলো এর একটি অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে প্রতিপক্ষের চরম অপমান সহ্য করার প্রস্তুতিও যে তাঁর ছিলো, এ ঘটনা থেকে সেটি বুঝা যায়। অথচ বর্তমান দুনিয়ায় মোহাম্মদকে (সা) অনেকেই শান্তির শত্রু বিবেচনা করে। তারা মনে করে, ইসলাম হলো জিহাদের ধর্ম। এক্ষেত্রে জিহাদ বলতে তারা ধর্মযুদ্ধকেই বুঝে থাকে।



জিহাদ কি ধর্মযুদ্ধ?

জিহাদী বলে পরিচিত গোষ্ঠীগুলোর হাতে দুনিয়া জুড়ে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে। অথচ মোহাম্মদের (সা) সময় জিহাদী হিসেবে কেউ পরিচিত ছিলো না। জিহাদী গোষ্ঠীগুলো দাবি করে, কোরআন এবং স্বয়ং মোহাম্মদ (সা) তাদের কাজের বৈধতা ও অনুপ্রেরণার উৎস। যেমন, ২০০৫ সালের ৭ জুলাই লন্ডনে বোমা হামলাকারীদের অন্যতম মোহাম্মদ সিদ্দিক খান এক ভিডিও বার্তায় বলেছিলেন, “প্রিয় নবী এবং তাঁর প্রিয় সাহাবীদের হৃদয়ে জিহাদ এবং শাহাদাতের তামান্না যে গভীরভাবে প্রোথিত ছিলো, তা সহজেই বুঝা যায়।”

তথাকথিত জিহাদীদের বেশিরভাগই তাদের সহিংস কার্যক্রমের বৈধতার জন্য সাধারণত কোরআনের একটি আয়াত ব্যবহার করে, যা কারো  কারো কাছে ‘তলোয়ারের আয়াত’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। অধ্যাপক তারিক রমাদান এ সম্পর্কে বলেন,

হ্যাঁ, কোরআনে আপনি এ জাতীয় আয়াত পাবেন। এগুলো যে যুদ্ধ ও সংঘাত সম্পর্কিত আয়াত, তা কেউই অস্বীকার করতে পারবে না। কিন্তু এই কালে এসে আমাদেরকে কোরআন নামক একটি কালোত্তীর্ণ গ্রন্থকে পাঠ করতে হবে তৎকালীন ইতিহাসের আলোকে। এই আয়াতগুলো নাজিল হয়েছিলো সুনির্দিষ্ট একটি সময়কালে। মুসলমানরা তখন নির্যাতন সহ্য করছিলো, প্রতিরোধের চেষ্টা করছিলো। টিকে থাকাটাই তখন একটা চ্যালেঞ্জ ছিলো। এই প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় নিতে হবে। শিয়া-সুন্নী উভয় পক্ষের মূলধারার আলেমরা মনে করেন, নিরীহ মানুষদেরকে হত্যা করা এবং যুদ্ধ-সংঘাত উসকে দেয়ার জন্য এই আয়াতগুলো ব্যবহার করা যাবে না। এটি সম্পূর্ণ অন্যায়।

কোরআনের আয়াতের বিচ্ছিন্ন ব্যাখ্যা এ জাতীয় বিতর্কের মূল কারণ। জিহাদ পরিভাষাটির অর্থ যে ধর্মযুদ্ধ নয়, সে ব্যাপারে অধিকাংশ স্কলারই একমত। তাদের মতে, এর প্রকৃত অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। অধ্যাপক রিচার্ড বোনি এ ব্যাপারে বলেন, 

জিহাদের ধারণাটি কোরআন থেকেই এসেছে। মহানবী ওহীর নির্দেশ আকারে এটি লাভ করেছিলেন। কোরআনে ‘জিহাদ’ শব্দটি রয়েছে প্রায় ৩৫ বার। প্রায় সবক্ষেত্রেই এটি চূড়ান্ত কর্মপ্রচেষ্টা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যে কোনো ধরনের ইতিবাচক কর্মপ্রচেষ্টার ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য হতে পারে। হতে পারে তা ব্যক্তির আত্মসংশোধনের ব্যাপার। হতে পারে মন্দ পরিহার করে সৎকর্ম সাধনের চেষ্টা। যুদ্ধ বুঝাতেও ব্যবহৃত হতে পারে। যদিও জিহাদ আর যুদ্ধ সমার্থক নয়। যুদ্ধ বুঝানোর জন্য ভিন্ন আরেকটি পরিভাষা (‘কিতাল’) ব্যবহৃত হয়েছে।

মোহাম্মদ (সা) যতগুলো যুদ্ধ করেছেন, তৎকালীন প্রেক্ষাপটে এর প্রত্যেকটির পেছনেই সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য কারণ ছিলো। এতোগুলো যুদ্ধে জড়ানোর পরও বেসামরিক লোকদের উপর আক্রমণের কোনো নজির তাঁর জীবনে নেই। অধ্যাপক রিচার্ড বোনি বলেন,

জিহাদ সম্পর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, মহানবীর জীবদ্দশায় এবং পরবর্তীতে ইসলামের প্রাথমিক যুগে ক্রমেই এটি একটি ন্যায়যুদ্ধের ধারণা হিসেবে বিকাশ লাভ করেছে। ন্যায়যুদ্ধ বলতে সেনাবাহিনীকে একটি নীতিমালা মেনে চলতে বাধ্য করা, যেমন– বেসামরিক লোকদের উপর আক্রমণ বা তাদেরকে হত্যা করা যাবে না, নারী ও শিশুদেরকে হত্যা করা যাবে না, কোনোভাবেই অন্য ধর্মের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে হত্যা করা যাবে না ইত্যাদি।

যুদ্ধে অংশগ্রহণের এইসব মূলনীতি এখনকার মুসলিম চরমপন্থীদের মধ্যে দেখা যায় না। আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীরা শুধু পাশ্চাত্যের নাগরিকদেরই হত্যা করছে না, মুসলিম বিশ্বের মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোতে পর্যন্ত হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যা করছে। বর্তমানে ব্রিটেনের কোনো মুসলিম অ্যাক্টিভিস্ট বা গ্রুপই সহিংস পথে গিয়ে বিদ্যমান আইনকে অমান্য করতে চাইবে না। তৎসত্ত্বেও, গত ১০ বছরে দুই শতাধিক মুসলিম সন্ত্রাসমূলক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। এমনই একজন হলেন ব্রিটিশ মুসলিম আব্দুল মুহিত। সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অর্থায়নের অভিযোগে ২০০৮ সালে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে দুই বছরের জেল দেয়া হয়। আরেকজন হলেন মিজানুর রহমান। হত্যাপ্রচেষ্টার অভিযোগে ২০০৬ সালে তার চার বছরের জেল হয়। দুজনই ইতোমধ্যে তাদের সাজা ভোগ করেছেন। এদের সাথে আমি কথা বলেছি। এখনো তারা বর্তমান দুনিয়ায় জিহাদের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দৃঢ় মতামত পোষণ করেন।

– বর্তমানে জিহাদের ব্যাখ্যার কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি? কারণ, বেশিরভাগ মানুষের কাছেই এখন জিহাদ মানে নিছক যুদ্ধ বা লড়াই-সংগ্রাম নয়। এর নানান অর্থ তাদের কাছে রয়েছে।

– মিজানুর রহমান: জিহাদ মানে অমুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করা এ ব্যাপারে অতীতের আলেমদের সবাই একমত হ্যাঁ, তাদেরকে নিছক জোরপূর্বক মুসলমান বানানোর জন্য জিহাদ করা যাবে না তবে শরীয়াহ কায়েমের পথে সকল বাধা দূর করে আল্লাহর বাণীকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার জন্য জিহাদ করতে হবে দুনিয়া জুড়ে ইসলামের দাওয়াতকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যও জিহাদ করতে হবে

– জিহাদের নামে যে কোনো পরিস্থিতিতে নিরস্ত্র মানুষের উপর হামলা চালানো কি অনুমোদনযোগ্য? মহানবীর (সা) কর্মময় জীবন সম্পর্কে আপনার বুঝজ্ঞান এ সম্পর্কে কী বলে?

– আব্দুল মুহিত: একদম সোজা কথায় ইসলামী সন্ত্রাসবাদীদের যুক্তি হলো, আপনি যদি আপনার প্রতিনিধি হিসেবে একটি সরকারকে নির্বাচিত করেন এবং তারা যদি অন্য একটা দেশে বোমা হামলা কিংবা মানুষ মারার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তার দায় আপনার কাঁধেই এসে পড়ে এটি কাউকে খুন করার জন্য একজন খুনী ভাড়া করার মতোই একটি ব্যাপার এই খুনের জন্য শুধু খুনি নিজেই দায়ী নয়, আমার উপরও এর দায় এসে পড়ে অতএব, এইসব নিরস্ত্র লোকগুলোই কিন্তু এমন এক সরকারকে ভোট দিয়েছে, যারা অন্যায়-অপরাধ করে ফলে এই ভোটদাতাদেরও দায় আছে ইসলামী সন্ত্রাসবাদীদের দৃষ্টিতে তারা অবশ্যই অপরাধী

মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষ সবার নিকটই জিহাদের এই ধারণা ঘৃণ্য একটি ব্যাপার। জিহাদের এ ধরনের ব্যাখ্যা স্বয়ং মোহাম্মদেরও (সা) জানা ছিলো না। তাঁর কাছে জিহাদ মানে নিছক যুদ্ধ করে মানুষ মারার ব্যাপার ছিলো না। তখন জিহাদ ছিলো আল্লাহর কাছে নিজেকে উন্নত মানুষ হিসেবে তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা। ইসলামে আছে ন্যায়যুদ্ধের ধারণা। মোহাম্মদ (সা) নিজেও অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু তিনি কখনোই নিরপরাধ মানুষ হত্যার করার জন্য যুক্তি দাঁড় করাননি। আজমল মাসরুর এ প্রসঙ্গে বলেন,

যুদ্ধ ও আত্মরক্ষা সংক্রান্ত কোরআনের যে আয়াত রয়েছে, সেগুলো আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে নিজেকে এবং অন্যান্যদেরকে হত্যা করার বৈধতা দেয় না। মনে রাখা দরকার, ইসলাম যুদ্ধের অযুহাতে বেসামরিক জানমাল ধ্বংস করাকে অনুমোদন করে না। চরমপন্থীরা হত্যার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট কিছু লোকের উপর পরিকল্পিতভাবে বোমা হামলা করে। কিন্তু এর ফলে শুধু তারাই নয়, টার্গেটের বাইরে অন্যান্য মানুষও নিহত হয়। একে বলা হয় কোল্যাটারাল ড্যামেজ। এর কোনোটাই ইসলামে মোটেও অনুমোদিত নয়।

(চলবে)


বাকি পর্বগুলো পড়তে ভিজিট করুন এখানে

One thought on “হুদাইবিয়ার সন্ধি ও জিহাদের ধারণা দ্য লাইফ অব মোহাম্মদের অনুবাদ: পর্ব-১৩

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *