রবিবার, নভেম্বর ১৯, ২০১৭
হোম > ডকুমেন্টারি অনুবাদ > মহানবীর (সা) বহুবিবাহ এবং ইসলামে পর্দার বিধান

মহানবীর (সা) বহুবিবাহ এবং ইসলামে পর্দার বিধান দ্য লাইফ অব মোহাম্মদের অনুবাদ: পর্ব-১২

বহুবিবাহ ইস্যু

৬২৭ খ্রিস্টাব্দ। মোহাম্মদ (সা) ততদিনে মদীনায় একটি নিরাপদ ক্ষমতাকেন্দ্র গড়ে তুলেছেন। যদিও তাঁকে শেষ করে দেয়ার লক্ষ্যে প্রতিপক্ষ কোরাইশদের সকল প্রচেষ্টাকেই তিনি ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন, তারপরও তারা যথেষ্ট ক্ষমতাবান ছিলো। মক্কা নগরী তখনো তারাই নিয়ন্ত্রণ করতো। আরবের সকল মানুষের কাছে তাঁর বাণী নিয়ে পৌঁছতে হলে তাঁকে এই বাধা অতিক্রম করার একটা পথ খুঁজে বের করা ছিলো জরুরি।

অতীতের যুদ্ধগুলো থেকে মোহাম্মদ (সা) একটি মৌলিক শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মক্কার সেনাবাহিনীকে পরাজিত করা বেশ কঠিন। তাই তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করতে হবে। এই ভাবনা থেকে তিনি গোটা আরবের বিভিন্ন গোত্রের সাথে মৈত্রী গড়া শুরু করলেন। এই সম্পর্ক গড়ার কাজে অন্যতম একটি উপায় ছিলো বিবাহবন্ধন।

মোহাম্মদের (সা) সমালোচকরা সবসময়ই বহুবিবাহ ইস্যুটিকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরেছে। অথচ তৎকালীন আরবে এটি ছিলো একটি সাধারণ সামাজিক প্রথা। এরচেয়ে বড় কথা হলো, প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি আর কোনো বিয়ে করেননি। কারো কারো বর্ণনা মতে, তাঁর স্ত্রী ছিলেন নয় জন। অন্যদের মতে, ১১ কিংবা ১৩ জন। এঁদের কেউ ছিলেন বিধবা। কেউ ছিলেন যুদ্ধবন্দী, বিবাহের মাধ্যমে যিনি মুক্তি লাভ করেছিলেন। এমনকি এঁদের একজন ছিলেন কপ্টিক খ্রিস্টান দাসী। মিশরের বাইজেন্টানীয় শাসক তাঁকে উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। তবে তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধুর কন্যা আয়েশার (রা) সাথে বিয়ের ঘটনাটিই সবচেয়ে বেশি আলোচিত-সমালোচিত। কোনো কোনো সূত্র মতে, আয়েশার (রা) বয়স যখন ছয় কিংবা সাত, তখন বাগদান হয়েছিলো এবং নয় বছর বয়সে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের কাজ সমাধা হয়। অন্যান্য সূত্র মতে, তাঁর বয়স আরো বেশি ছিলো। ১৬ কিংবা ১৭ বছরের কাছাকাছি। বয়স নিয়ে পরিষ্কার তথ্য না থাকায় অনেক সমালোচক এ বিষয়ে মোহাম্মদের (সা) কঠোর সমালোচনা করার প্রয়াস পেয়েছেন। ‘সোর্ড অব দ্য প্রফেট’ গ্রন্থের লেখক সার্জ ট্রিফকভিচ এ ব্যাপারে বলেন,

৫৩ বছর বয়সী একজন ব্যক্তি নয় বছর বয়সী একজন মেয়েকে বিয়ে করবে এবং শয্যাসঙ্গী করবে, এটি মোটেও সঠিক কাজ নয়। শুধু পাশ্চাত্যের একবিংশ শতাব্দীর মানদণ্ড অনুযায়ীই নয়; বরং মানব ইতিহাসের অধিকাংশ সময়ের, অধিকাংশ সমাজের সাধারণ নৈতিকতার সাথেও এটি যায় না।

অধ্যাপক তারিক রমাদান বলেন,

এ ব্যাপারে আমার অবস্থান হলো, তিনি প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। তখন তাঁর বয়স ৬ কিংবা ৭ ছিলো না, বরং ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে ছিলো। ব্যাপারটা নিয়ে এতোদিন পর এসে বর্তমানকালের গবেষকরা (ঠিক বর্তমানকাল নয়, বরং গত শতাব্দী থেকে) কথাবার্তা বলছেন। আমরা বার বার বলে আসছি, আয়েশার (রা) বয়সের ব্যাপারে যা বলা হয়, সেটিই একমাত্র সত্য নয়। এটি কোরআনের কোনো আয়াত নয়। এটি বরং রাসূলের (সা) জীবনের সাথে সম্পর্কিত বিষয়। তাই আমাদেরকে অবশ্যই তাঁর প্রকৃত বয়স যাচাই করে দেখতে হবে। এ ব্যাপারে আমি মনে করি, তাঁর বয়সের ব্যাপারে যা বলা হয়, সেই দাবির মধ্যে সমস্যা রয়েছে। 

মোহাম্মদের (সা) মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর সাথে আয়েশার (রা) বিয়ের সম্পর্ক অটুট ছিলো। পরবর্তীতে আয়েশা (রা) তাঁর স্বীয় যোগ্যতাবলে অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক নেতায় পরিণত হন। মুসলিম ঐতিহাসিকদের দাবি অনুযায়ী, এটি ছিলো মহানবীর (সা) চাচাত ভাই ও জামাতা আলীর (রা) সাথে আয়েশার (রা) মতদ্বৈততার পরিণতি। এই বিরোধের জের ধরেই পরবর্তীতে শিয়া ও সুন্নী ধারার নামে ইসলামে সবচেয়ে বড় বিভাজনের সূত্রপাত ঘটে। ম্যারল ওয়েন ডেভিস আয়েশার (রা) ব্যাপারে বলেন,

প্রকৃতপক্ষে আয়েশা (রা) কে ছিলেন, কীভাবে তিনি গড়ে ওঠেছিলেন, এটিই হলো আসল প্রশ্ন। এই প্রশ্নের জবাবের মাধ্যমে বাকি সব যুক্তি খারিজ হয়ে যায়। একজন সত্যিকারের সাহসী, স্বাধীন, বুদ্ধিমতি, রাজনীতি সচেতন নারী হিসেবে তিনি বেড়ে ওঠেছিলেন। মহানবীর (সা) জীবন সম্পর্কে আমাদের জানার অন্যতম ভিত্তি হলেন তিনি। মহানবী (সা) সম্পর্কে আমরা যা কিছু জানি, আয়েশা (রা) ব্যতীত এর অন্তত অর্ধেক বিষয় আমাদের অজানাই থেকে যেতো।

পরবর্তীতে বেশকিছু আয়াত নাজিল করে ইসলামের বিবাহ ব্যবস্থাকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর ফলে মুসলিম পুরুষরা সর্বোচ্চ চারজন স্ত্রী রাখতে পারবে। তাও শর্ত হলো, ভরণপোষণ ও আচরণের ক্ষেত্রে কারো সাথে বৈষম্য করা যাবে না। অথচ, মোহাম্মদের (সা) সমালোচনার ক্ষেত্রে এই আয়াতগুলোকেই জোড়ালো উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, অন্যদের জন্য এ ব্যবস্থা কার্যকর থাকলেও মোহাম্মদ (সা) স্বয়ং তাঁর সকল স্ত্রীকেই বহাল রাখার সুযোগ পেয়েছেন। আব্দুর রহীম গ্রীন ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করে বলেন,

আমাদেরকে তৎকালীন বাস্তবতা বুঝতে হবে। পৌত্তলিক আরবে বহুবিবাহের কোনো নির্দিষ্ট সীমা ছিলো না। এটি অত্যন্ত সাধারণ একটি প্রথা ছিলো। ইসলাম এসে বিবাহের সংখ্যা নির্ধারণ করে দিয়েছে। মুসলমানরা চারটির বেশি বিয়ে করতে পারবে না। মহানবীর (সা) যে নয় জন স্ত্রী ছিলেন,  তাঁদেরকে তিনি এই বিধান নাজিলের পূর্বেই বিয়ে করেছিলেন। তাঁর জন্যও নতুন করে চারটির বেশি বিয়ে করা নিষিদ্ধ ছিলো। কিন্তু ইতোমধ্যেই যাঁদেরকে তিনি বিয়ে করেছিলেন, তাঁদেরকে রাখার অনুমতি তাঁকে দেয়া হয়েছিলো। এর পেছনের কারণটা একদম পরিষ্কার। সেটি হলো, গোত্রীয় মৈত্রী বজায় রাখা। এটি খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। তিনি তো আর নিছক একজন নবীই ছিলেন না, তিনি তাঁর জনগোষ্ঠীর প্রধান নেতাও ছিলেন। তাই তৎকালীন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন গোত্রের সাথে মৈত্রী বজায় রাখাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।

ড. ডেভিড উড বলেন,

সূরা আহযাবের ৫০ নং আয়াতের মাধ্যমে মোহাম্মদের অতিরিক্ত স্ত্রী রাখাকে ন্যায্যতা দেয়া হয়েছে। এই আয়াতে যত খুশি তত নারীকে বিয়ে করার অনুমতি শুধু মোহাম্মদকে দেয়া হয়েছে। তাই ব্যাপারটি সন্দেহজনক। কারণ, যদি দেখা যায় অন্য যে কারো চেয়ে একজন নবীকে অধিক যৌনসঙ্গী গ্রহণ করার অনুমতি ঐশী প্রত্যাদেশ দেয়, তখন অনেকেই নিজেকে নবী দাবি করতে পারে। মোটকথা হলো, বিষয়টিকে সন্দেহ করার কিছু কারণ কিন্তু রয়েই যায়।

তবে এ যুক্তি খণ্ডন করে ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

মহানবী অনৈতিকভাবে জাগতিক আনন্দলাভে মত্ত হওয়ার মতো স্থূল ব্যক্তি ছিলেন, এমনটা মনে করা সম্পূর্ণ ভুল চিন্তা। এই বিয়েগুলোর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিলো। আয়েশাকে বিয়ে করার কারণ ছিলো, তিনি আয়েশার পিতাকে আরো ঘনিষ্ঠ বন্ধনে আবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। তিনি তখন এমন এক নয়া সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, গোত্র বা রক্ত সম্পর্ক যার ভিত্তি ছিলো না। বৈবাহিক সম্পর্ক থাকায় এই উত্তরণ পর্ব কিছুটা সহজ হয়েছিলো।

মুসলিম সূত্রগুলো থেকে আমরা জানি, মোহাম্মদের (সা) কয়েকটি বৈবাহিক সম্পর্ক জীবদ্দশায়ই তাঁকে সমস্যায় ফেলেছিলো। যেমন, তাঁর পালক পুত্রের তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে তিনি যখন বিয়ে করলেন, তখন তাঁর শত্রুরা মুসলিম সমাজে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে গুজব ছড়িয়ে দিলো যে, তাঁদের মধ্যে আগে থেকেই অবৈধ সম্পর্ক ছিলো। রবার্ট স্পেনসার এ ব্যাপারে বলেন,

সাবেক পুত্রবধূ জয়নব বিনতে জাহাশকে তিনি বিয়ে করার প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্টত বুঝা যায়, সমাজ এর বিরোধী ছিলো। লোকেরা এ ঘটনায় সংক্ষুব্ধ ছিলো। তারা মনে করেছিলো, তিনি এক প্রকার অসম্মানজনক কাজ করেছেন।

আরেকটি বর্ণনা অনুযায়ী, একবার এক সফরের সময় যখন আয়েশাকে (রা) খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন আরো একবার তিনি এ জাতীয় সংকটে পড়েন। পরে অবশ্য তাঁকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিলো। তিনি এমন এক ব্যক্তির সাথে করে মদীনায় ফিরছিলেন, মোহাম্মদের (সা) সাথে বিয়ের পূর্বে যার সাথে আয়েশার (রা) পরিচয় ছিলো। আবারো তাঁর শত্রুরা গুজব ছড়িয়ে দিলো, তাদের দুজনের মধ্যে নিশ্চয় কোনো স্ক্যান্ডাল ঘটেছে। মুসলিম বর্ণনা মতে, কোন পক্ষের কথা বিশ্বাস করবেন, তা নিয়ে শুরুতে মোহাম্মদ (সা) নিজেই দ্বিধায় পড়ে যান। পরবর্তীতে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নাজিল হলে তিনি আয়েশার (রা) নিষ্কলুষ থাকার দাবি মেনে নেন। তৎকালীন আরবে ব্যভিচারের প্রচলিত শাস্তি ছিলো পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা। আয়েশাকে (রা) নিয়ে নাজিলকৃত নতুন ওহীতে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ব্যাভিচারের অভিযোগের সমাধান কীভাবে করতে হবে, তা বলে দেয়া হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, এই সমাধানটি তালেবানের মতো কট্টর দৃষ্টিভঙ্গির গ্রুপগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত। ব্যভিচারের শাস্তি প্রসঙ্গে আজমল মাসরুর বলেন,

পাথর নিক্ষেপে হত্যা করার ব্যাপারটি ইহুদী ও খ্রিষ্টধর্মের ব্যাপার। আমাদের জানা মতে, এটি ওল্ড টেস্টামেন্টের বিধান। কোরআনে বর্ণিত বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্কের শাস্তি হলো দেহের পেছন দিকে ১০০ বেত্রাঘাত। তবে এই শাস্তি কেবল তখনই প্রয়োগ করা যাবে, যদি চারজন ব্যক্তি অভিযুক্ত দুজনের যৌন সম্পর্কের বিষয়টি সরাসরি প্রত্যক্ষ করে সাক্ষ্য দেয়। এই শর্ত অক্ষুণ্ন রেখে শাস্তি প্রয়োগ করা সত্যিই বেশ কঠিন।



ইসলামে পর্দার বিধান

মসজিদে নববীর সাথে লাগোয়া নির্মিত কক্ষগুলোতে তাঁর স্ত্রীগণ বাস করতেন। সেখানে প্রায় সর্বদাই লোক সমাগম লেগে থাকতো। ফলে সেখানে খুব একটা প্রাইভেসি ছিলো না। অন্যদিকে, মোহাম্মদের (সা) শত্রুরা সবসময়ই মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন তৈরির প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকতো। এ ধরনের খোলামেলা পরিবেশ থাকায় ভবিষ্যতে নতুন করে স্ক্যান্ডাল বানিয়ে তা ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ তাঁর শত্রুদের ছিলো। এই প্রেক্ষাপটে একদিন মোহাম্মদ (সা) ওহীর মাধ্যমে নতুন একটি নির্দেশনা লাভ করলেন। তাঁর স্ত্রীদেরকে শালীনতা বজায় রাখার স্বার্থে আপদমস্তক ঢেকে চলাফেরা করার নির্দেশ দেয়া হলো। এই নির্দেশ মুসলিম নারীদের উপরও গভীর প্রভাব ফেলেছে। নারীদের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিকে বাইরের দুনিয়া সাধারণত এই জায়গা থেকেই দেখে থাকে। ক্যারেন আর্মস্ট্রং এ ব্যাপারে বলেন,

কাপড় দিয়ে ঢেকে চলাফেরা করার একটি নিদের্শ মহানবীর স্ত্রীগণের প্রতি ছিলো। অবশ্য ঠিক কীভাবে ঢাকতে হবে, তা সুস্পষ্ট নয়। তবে এটুকু নিশ্চিত, এর মাধ্যমে তাঁদেরকে অন্যদের থেকে পৃথক করা হয়েছে। মদীনার তৎকালীন নাজুক পরিস্থিতির কারণেই এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিলো। কারণ, মদীনায় মোহাম্মদের (সা) শত্রুরা তাঁর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে তাঁর স্ত্রীদের নানান ব্যক্তিগত বিষয়কে ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করতে চাচ্ছিলো। তাই এক ধরনের পৃথকীকরণ প্রয়োজন ছিলো। বলাবাহুল্য, এই নির্দেশ অন্য নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

ইসলামের সমালোচকদের দাবি, নারীদের প্রতি ইসলামের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক হলো এই ধরনের পর্দা ব্যবস্থা। ইসলাম যে নারীদেরকে দমিয়ে রাখতে চায়, এর মাধ্যমে সেই আকাঙ্খারই প্রকাশ ঘটে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মোহাম্মদের (সা) মৃত্যুর পর প্রায় শতাধিক বছর পর্যন্ত ইসলামী রীতি হিসেবে এই ধরনের সার্বজনীন পর্দাব্যবস্থার প্রচলন ছিলো না। প্রিন্সেস বাদিয়া বিনতে আল হাসান এই ব্যাপারে বলেন,

নারী-পুরুষ যেন শালীনতা বজায় রেখে চলাফেরা করে, সে ব্যাপারে ধর্ম কনসার্ন থাকে। কিন্তু ঠিক কতটুকু হলে শালীনতার শর্ত পূরণ হবে, তা উন্মুক্ত আলোচনার বিষয়। হিজাব পরিধান না করা সত্ত্বেও একজন মুসলিম হিসেবে আমি কম্প্রোমাইজ করে চলছি, এমনটি মনে করি না। এমনকি ভবিষ্যতেও আমি হিজাব পরবো না। কারণ আমি নিজেই বলি যে, আমি নিষ্ঠাবান মুসলমান নই। পোশাক-আশাক দেখে কারো ঈমানের নিষ্ঠা বা গভীরতা যাচাই করা যায় না।

ব্রিটেনসহ পাশ্চাত্যের অনেক দেশে গত প্রায় দুই দশক ধরে হিজাব হয়ে উঠেছে অধিকাংশ মুসলিম নারীর আত্মপরিচয়ের প্রতীক। কেউ হয়তো শুধু চুল ঢাকেন, অন্যরা পুরো মুখমণ্ডলই ঢাকেন। যা হোক, পাশ্চাত্যে হিজাব এখন একটি বিতর্কিত বিষয়। কোনো কোনো ইউরোপীয় দেশ ইতোমধ্যে হিজাব পরিধান নিষিদ্ধ করেছে। মুসলিম নারীদের নিয়ে লেখালেখি করেন ফাতিমা বরকতুল্লাহ। তাঁর সাথে হিজাব প্রসঙ্গে আমার নিম্নোক্ত কথাবার্তা হয়েছে –

– ফাতিমা, আপনি তো হিজাব পরিধান করেন। এটি কি আপনার পারিবারিক বাধ্যবাধকতা, নাকি নিজের ইচ্ছা থেকেই?

– সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছা থেকে আমি হিজাব করি আমার আধ্যাত্মিক পথচলার সাথে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে আল্লাহর কাছে নৈতিক দিক থেকে নিজেকে উন্নততর হিসেবে তুলে ধরার ইচ্ছা থেকে আমি হিজাব করি শরীর ঢাকার জন্য বোরকা পরাটা আমার কাছে সকালে বাইরে বেরুনোর প্রস্তুতি হিসেবে জিন্স বা অন্য কোনো পোশাক পরার মতোই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার

– এটি তো মূলত এক ধরনের গাউন। তাই না?

– হ্যাঁ, এটি একটি বাড়তি পোশাক একে আবায়া বা জিলবাব বলা হয় এটি পরিধানের পর আমি খিমার তথা স্কার্ফ দিয়ে মাথা ঢাকি তারপর আমি একটি ছোট্ট নেকাব পরিধান করি এভাবেই আমি বাইরে যাই

– অনেক মুসলিম নারীই তো শুধু মাথা ঢাকার জন্য খিমার তথা স্কার্ফ পরিধান করেন। আপনি কেন তা না করে পুরো মুখমণ্ডল ঢাকেন?

– আমি মনে করি, আরো বেশি শালীনতা মেনে চলাফেরা করা আমার পক্ষে সম্ভব এটি আরো বেশি সওয়াবের কাজ তাই আমি আসলে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই এভাবে চলি

– এই ব্যাপারটি কোত্থেকে এসেছে? এটি কি কোরআনে আছে? এটি কি…

– হ্যাঁ, এটি আপনি কোরআনে পাবেন সূরা আহযাবের একটি আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, হে নবী! আপনার স্ত্রী, কন্যা এবং বিশ্বাসী নারীদের বলুন! তারা যখন বাইরে যায়, তখন যেন তাদের পরিধেয় কাপড়ের উপর আরেকটি বাড়তি কাপড় পরিধান করে নেয় এই ব্যাপারটি বুঝানোর জন্য আরবীতে জালাবীবপরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়েছে এর দুটি ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে

– একদম ঠিক বলেছেন। ব্যাখ্যার উপরই আসলে সবকিছু নির্ভর করছে। সাধারণ মুসলিম নারীদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে মুখ ঢাকতে হবে, এমন কোনো বিধান কোরআনের কোথাও বলা নেই। এ সংক্রান্ত প্রচলিত বিধানটি একটা ব্যাখ্যা মাত্র।

– হ্যাঁ, মুখমণ্ডল ঢাকার কথা যদি বলেন, তাহলে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে

ম্যারল ওয়েন ডেভিস এ প্রসঙ্গে বলেন,

পোশাকের ব্যাপারে সুনিদ্ষ্টিভাবে মাত্র একটি আয়াত রয়েছে, যেখানে দেহের উন্মুক্ত অংশগুলো ঢেকে রাখতে বলা হয়েছে। কালো প্যাকেটে নিজেকে ঢেকে রাখার কথা সেখানে বলা হয়নি। কিন্তু বর্তমানে মুসলিম নারীরা এই আয়াতকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করছে। মুসলিম পুরুষরাও অন্যান্য সমাজের এ সংক্রান্ত প্রথাগুলোকে ধর্মীয় ব্যাখ্যা আকারে সংযোজন করে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। এছাড়া আত্মপরিচয়ের রাজনীতিও এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে আমার অবস্থান হলো, প্রচলিত পর্দাপ্রথার কোনো বাধ্যবাধকতা যদিও নেই, তারপরও এটি পরিধান করা বা না করার স্বাধীনতা নারীদের থাকা উচিত।

(চলবে)


বাকি পর্বগুলো পড়তে ভিজিট করুন এখানে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *