রবিবার, নভেম্বর ১৯, ২০১৭
হোম > ডকুমেন্টারি অনুবাদ > মহানবীর ব্যক্তিচরিত্র, আধ্যাত্মিকতা ও শরীয়াহ প্রসঙ্গ

মহানবীর ব্যক্তিচরিত্র, আধ্যাত্মিকতা ও শরীয়াহ প্রসঙ্গ দ্য লাইফ অব মোহাম্মদের অনুবাদ: পর্ব-১১

তৃতীয় অধ্যায়: হলি পিস

ওহী লাভের শারীরিক কষ্ট

মোহাম্মদ (সা) সময়ে সময়ে যেসব ঐশীবাণী লাভ করেছিলেন, সেগুলোর সংকলনই হলো ‘আল কোরআন’। ওহী নাজিলের প্রতিটি ঘটনাই তাঁর জন্য ছিলো কষ্টকর ও দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এই জন্য তাঁকে প্রতিনিয়ত কঠোর সাধনা করতে হতো। কখনো ওহী নাজিল হতো সরাসরি কথা হিসেবে, আবার কখনো স্বপ্নযোগে। সেক্ষেত্রে ওহীর অর্থ সঠিকভাবে অনুধাবন করার জন্য রাসূলকে (সা) গভীর মনোযোগ সন্নিবেশ করতে হতো। এ প্রসঙ্গে ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

তিনি প্রায় সময় বলতেন, ‘আমার উপর যখন ওহী নাজিল হয়, তখন মনে হয় যেন দেহ থেকে আত্মা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।’ ওহী নাজিলের পর তাঁর মুখমণ্ডল বিবর্ণ হয়ে যেতো। তিনি তখন ঘর্মাক্ত হয়ে পড়তেন। এমনকি শীতের দিনেও এর ব্যতিক্রম হতো না। আল্লাহর বাণী গ্রহণ করার জন্যই তাঁর এতো কষ্ট হতো।

বারনাবি রজারসন বলেন,

প্রচণ্ড কষ্টকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মহানবী ওহী লাভ করতেন। তাঁর গোটা সত্তা জুড়ে প্রবাহিত এই বিশেষ অভিজ্ঞতাকে তিনি ভাষায় প্রকাশ করেছেন।

টম হল্যান্ড বলেন,

মোহাম্মদ এমন এক যুগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যখন মনে করা হতো, ঐশ্বরিক রহস্যময় ব্যাপারগুলোর পর্দা উন্মোচন করা বিশেষ আধ্যাত্মিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষেই কেবল সম্ভব। ইহুদী, খ্রিস্টান, জরাথ্রুস্ট– এই ধর্মগুলোতেও এ ধরনের পবিত্র ব্যক্তির ধারণা রয়েছে। এ কারণেই ঈশ্বরের কাছ থেকে মোহাম্মদের ঐশীবাণী লাভের দাবির প্রতি মানুষ তখন আস্থা রেখেছিলো।

আধ্যাত্মিকতার ইসলামী স্বরূপ

তবে বাস্তবতা হলো, এই ধরনের আধ্যাত্মিকতার ধারণা ইসলামের সাথে যায় না। যদিও মুসলমানদের মধ্যে এ ধরনের একটি গ্রুপ তথা সুফী ধারার প্রচলন রয়েছে। তাদের দাবি হলো– আল্লাহর নৈকট্য লাভের যে অভিজ্ঞতা মোহাম্মদ (সা) লাভ করেছিলেন, তারাও গভীর ধ্যান, জিকির ও কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সে ধরনের অভিজ্ঞতা লাভের চেষ্টা করছে। তুর্কি সুফীদের বিশেষ ধরনের ঘূর্ণি নৃত্যের একজন নৃত্যকার এমরি ইলদিরিম বলেন,

নবী মোহাম্মদ (সা) প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতেন, তাঁর সাথে যোগাযোগ করতেন। তিনি সাধারণত তখনই ঐশী নির্দেশনাগুলো লাভ করতেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করতেন। ঠিক এ কারণেই আমরাও আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করি। এ ধরনের আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর সাথে বিলীন হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। নবী মোহাম্মদ (সা) নিজেই এর দৃষ্টান্ত। তিনি তাঁর দৈনন্দিন জীবনযাপন কিংবা প্রার্থনার মাধ্যমে যা কিছু করেছেন, আমাদের জন্য সেগুলোই অনুসরণীয়।

এভাবে সুফীরা অনেক ধরনের নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠান ও পদ্ধতি ক্রমে ক্রমে গড়ে নিয়েছে। অথচ সুফীরা যাকে তাদের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা লাভের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস বলে মনে করে, সেই মোহাম্মদ (সা) এ ধরনের আচার-অনুষ্ঠান কখনো করেছেন বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। অধ্যাপক সাজ্জাদ রিজভী এ ব্যাপারে বলেন,

একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে মহানবী (সা) ইসলামের ধর্মতাত্ত্বিক ও সুফী উভয় ধারারই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাঁর মাধ্যমেই কেবল কেউ আল্লাহকে জানতে পারে– এই সত্যের মাঝেই আসলে তাঁর পরিপূর্ণতা নিহিত রয়েছে।

সুফিদের এসব আচার-অনুষ্ঠানে জিকির করতে করতে একদম চূড়ান্ত পর্যায়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় বলে মনে করা হয়। সুর করে জিকির করার সময় এক ধরনের মোহাবিষ্টতা তৈরি করতে তুর্কি সুফীরা নৃত্যেরও প্রবর্তন করেছে। জিয়াউদ্দীন সরদার এ ব্যাপারে বলেন,

প্রত্যেকটি ধর্মেই আধ্যাত্মিকতার নানা রকম নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে। ইসলামও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদেরও বেশ কয়েক ধরনের আধ্যাত্মিক ধারা রয়েছে। সুফীবাদ এরমধ্যে একটি। হ্যাঁ, মহানবী (সা) প্রার্থনা করেছেন, ধ্যান করেছেন; কিন্তু তিনি তো এটিও বলেছেন– ‘দোয়া করো, তবে তোমার উটটি বেঁধেও রেখো।’ এর মানে হলো শুধু দোয়া-দরুদই যথেষ্ট নয়, ভালো কাজটাও করতে হবে। দোয়া করার সাথে সাথে আমাদেরকে একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজও গড়ে তুলতে হবে। এ ধরনের আধ্যাত্মিকতা কেউ যদি মেনে চলে এবং বাস্তব জীবনে ভালো কাজ করে ও ভালো কাজ করার উপর জোর দেয়াকে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তাহলেই সত্যিকার অর্থে মোহাম্মদের (সা) পথ অনুসরণ করা হয়।

মোহাম্মদের (সা) আধ্যাত্মিকতা ছিলো জীবনের বাস্তব প্রয়োজনের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তিনি সন্ন্যাসী টাইপের কোনো ব্যক্তি ছিলেন না। বরং আরব সমাজের সংস্কারের জন্য তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে গেছেন। পরকালে বেহেশত লাভের অপেক্ষায় নিছক বসে থাকার পরিবর্তে তিনি একটি আদর্শ সমাজ গড়ার চেষ্টা করে গেছেন।

মহানবীর ব্যক্তিচরিত্র

৬২৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই মদীনার একজন ক্ষমতাধর শাসক হিসেবে অধিষ্ঠিত হলেও ব্যক্তিগত আচরণ ও জীবনযাপনে তিনি আগের মতোই পরিমিত ছিলেন। প্রাপ্ত সকল বর্ণনাই এ কথা সমর্থন করে। আগের মতোই তিনি তাঁর ছোট্ট মসজিদটির পাশের ঘরটিতে থাকতেন এবং মসজিদটিকে নামাজের স্থান ও তাঁর কাজকর্মের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। ইহুদী, খ্রিস্টান, কাফের, এমনকি দাসদাসীসহ সকলেরই তাঁর কাছে যাওয়া এবং কথা বলার অবাধ সুযোগ ছিলো। মহানবীর (সা) চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জিয়াউদ্দীন সরদার বলেন,

তাঁর জীবনী পড়লে স্পষ্টতই বুঝা যায়, তিনি একজন অসাধারণ ক্যারেশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। অসংখ্য লোক পরামর্শ নিতে তাঁর কাছে প্রতিনিয়ত আসতো। তিনি যে সব সময় একেবারে সর্বোত্তম পরামর্শটিই তাৎক্ষণিকভাবে দিতে পারতেন, তা কিন্তু নয়। তবে সবসময়ই তিনি লোকদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মানবিক, আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল ব্যক্তি।

ড. আমিরা বেনিসন বলেন,

আমি মনে করি, নানান দিক থেকেই মোহাম্মদ (সা) চমৎকার মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন খুবই ভদ্র। কারো দোষত্রুটি খুঁজতে যেতেন না। অত্যন্ত স্বচ্ছ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন।

তিনি একদম সাদামাটা পোশাক পরিধান করতেন। স্বর্ণ, রেশমি পোশাক, কিংবা বিলাসবহুল কোনো দ্রব্য অপছন্দ করতেন। বিত্তবৈভবের ধার ধারতেন না। সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে দান-খয়রাত করতেন, উপহার দিতেন। ‘দ্য লিডারশিপ অব মোহাম্মদ’ গ্রন্থের লেখক জন আডায়ার মহানবী (সা) সম্পর্কে বলেন,

ক্ষমতার পেছনে ছুটে বেড়ানোর কোনো লক্ষণ আমি মোহাম্মদের মাঝে খুঁজে পাইনি। তাঁর সততার উপর কখনো কোনো কালি পড়েনি। যে কোনো আর্থিক বিষয় বা দুর্নীতির ব্যাপারে তিনি খুব সতর্ক থাকতেন। একটি উদীয়মান সংগঠনের নেতার যেসব যোগ্যতা ও মোরাল ভিশন থাকা দরকার, আমার মতে, মোহাম্মদের ঠিক তাই ছিলো। এই দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।

বারনাবি রজারসন বলেন,

তিনি ছিলেন একজন অনুসন্ধায়ী। জীবনভর তিনি সত্য ও সঠিক উপলব্ধির সন্ধান করেছেন। তাঁর বাগ্মিতা ছিলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো। তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান আরব। তাঁর কর্ম মানবজাতির জন্য এমনই দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, যা কালক্রমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।



মক্কী ও মাদানী যুগের পার্থক্য

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মোহাম্মদ (সা) ধারাবাহিকভাবে ওহী লাভ করলেও মক্কী ও মাদানী যুগের ওহীর বিষয়বস্তুর মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। মক্কী জীবনের ওহীগুলোতে ঈমান ও ধর্মীয় বিষয়গুলোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে, মাদানী জীবনের ওহীগুলো ছিলো সে তুলনায় অনেক বেশি প্রায়োগিক, অর্থাৎ বাস্তব জীবনের সাথে সম্পর্কিত। সামাজিক বিষয়গুলো থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ব্যাপার পর্যন্ত একজন মুসলমানের জীবনযাপন কেমন হওয়া উচিত, এই ওহীগুলোতে সেসব বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অনেক মুসলমান এসব নির্দেশনা মেনে চলার চেষ্টা করেন। ড. আমিরা বেনিসন এ ব্যাপারে বলেন,

মক্কায় তিনি মূলত একজন ধর্মীয় প্রচারক ছিলেন, এ কথা ঠিকই আছে। শেষবিচারের দিন, নৈতিকতা, ন্যায়বিচার– এ জাতীয় বিষয়গুলো নিয়েই তিনি বেশি বলতেন। তবে মদীনায় হিজরতের পর তিনি সমাজের নেতা হিসেবে সক্রিয় হয়ে ওঠলেন। তারপর দিন দিন সমাজ পরিচালনার সাথে তিনি অনেক বেশি জড়িয়ে পড়লেন। লোকেরা কীভাবে একে অপরের কাজে এগিয়ে আসবে, উত্তরাধিকার সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা কীভাবে করবে, এমনকি একে অপরকে কীভাবে সম্ভাষণ জানাবে, সেসব বিষয়ে পর্যন্ত তিনি দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন।

কখনো সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে ওহী নাজিল হয়েছে। যেমন– অসুস্থ ও অভাবীদেরকে আর্থিক সহায়তা করা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য। আবার ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হলে অন্য বিশ্বাসের লোকদের সাথে কী রকম আচরণ করতে হবে, এ সংক্রান্ত সাধারণ নির্দেশনা হিসেবেও কখনো কখনো ওহী নাজিল হয়েছে। মদীনার শাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মোহাম্মদ (সা) এসবকে নীতিনির্ধারণী বিষয়ে পরিণত করেছিলেন।

শরীয়াহ বলতে আসলে কী বুঝায়?

সময়ে সময়ে মোহাম্মদের (সা) উপর নাজিলকৃত ওহীগুলো সার্বজনীন সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণা সংক্রান্ত একটি নৈতিক নীতিমালা তথা জীবনবিধানের রূপ লাভ করে। কোরআনে একে বলা হয়েছে ‘শরীয়াহ’ তথা ‘আল্লাহকে জানার পথ’। অধ্যাপক তারিক রমাদান এ সম্পর্কে বলেন,

শরীয়াহ সম্পর্কে আমরা তিনটি আয়াত পাই। এই আয়াতগুলোতে শরীয়াহ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। রাসূল (সা) এবং তাঁর সাহাবীগণ শরীয়াহ বলতে কী বুঝেছিলেন? তারা কী প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছিলেন? এ প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তারা আসলে মানুষকে আহ্বান জানিয়েছিলেন– এই পথই হলো স্রষ্টার পথ তথা শরীয়াহ। তবে পরিভাষাটি নিয়ে আমরা সমস্যায় পড়েছি আরো পরে। কারণ, পরবর্তী স্কলারগণ শরীয়াহকে আল্লাহর আইন বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন। যেহেতু তাঁরা মূলত ফিকাহবিদ ছিলেন, তাই তাঁদের কাছে শরীয়াহ নিছক একটি আইনী ব্যাপার হিসেবে বিবেচিত ছিলো। কিন্তু মহানবী (সা) সমাজে প্রকৃতপক্ষে কোন বিষয়গুলোর প্রচলন ঘটিয়েছিলেন? আপনি জানেন, সেগুলো ছিলো ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার, সমতা, স্বাধীনতা ইত্যাদি। এগুলোই হলো শরীয়াহ।

ইসলামের পবিত্র বিধান তথা শরীয়াহ আইন হিসেবে যা এখন পরিচিত, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়। এর প্রচলন ঘটেছে মহানবীর (সা) মৃত্যুর দুই শতাব্দী পর। ক্রমবিকাশমান ইসলামী খেলাফত সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় সহায়তা করতে তৎকালীন ফিকাহবিদগণ একটি আইনী কাঠামোর উদ্ভাবন করেন, যা আজকে শরীয়াহ আইন হিসেবে পরিচিত। তাঁরা কোরআনের শিক্ষা ও মহানবীর (সা) জীবনের দৃষ্টান্তগুলোর মাঝে সমন্বয় করেন। শরীয়াহর এই কাঠামোকেই অনেক মুসলমান এখন অপরিবর্তনীয় আল্লাহর আইন বলে মনে করেন। ড. আমিরা বেনিসন এ ব্যাপারে বলেন,

ইসলামী আইনের মূলনীতিগুলো কোরআনে বলা আছে। এমনকি সুনির্দিষ্ট কিছু বিধানের বিস্তারিত বর্ণনাও আপনি কোরআনে পাবেন। যেমন– উত্তরাধিকার আইন। কিন্তু ‘শরীয়াহ আইন’ সময়ের ব্যবধানে মানুষের হাতেই গড়ে ওঠেছে। এটি ছিলো আল্লাহর ইচ্ছাকে বুঝা ও তা বাস্তবায়ন করার একটি মানবীয় প্রচেষ্টা। শরীয়াহ ডিসকোর্সের ভেতরেই ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির দৃষ্টান্ত রয়েছে। সাংঘর্ষিক বিধান পর্যন্ত রয়েছে। তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এটি সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো বিধান নয়। এটি অনেক বেশি নমনীয়, পরিবর্তনশীল এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার উপযোগী একটি ব্যবস্থা।

শরীয়াহ আইন নিয়ে বিতর্ক

মদীনায় মোহাম্মদ (সা) বহু অতীত গোত্রীয় রীতিনীতির আমূল পরিবর্তন সাধন করেছিলেন। বংশ পরম্পরায় চলে আসা নৃশংস গোত্রীয় সংঘাতের বিলোপসাধন করেছিলেন। উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীদের অংশিদারিত্ব এবং নারীদের স্বীয় সম্পত্তির উপর অধিকার নিশ্চিত করেছেন। তবে কোরআনে কিছু সেকেলে শাস্তি আইনের কথাও বলা আছে। যেমন– চুরির শাস্তি হিসেবে অঙ্গ কেটে নেয়ার বিধান। অবশ্য মোহাম্মদ (সা) কখনো এই শাস্তির প্রয়োগ করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না।[1] এ জাতীয় কিছু শাস্তি এখন পর্যন্ত শরীয়াহ আইন কাঠামোর অংশ হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে। নিউইয়র্কের ফোর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটির ফিলোসফির টিচিং ফেলো ড. ডেভিড উড এ ব্যাপারে বলেন,

সপ্তম শতাব্দীর আরবে (কখনো কখনো) কন্যাশিশুকে মেরে ফেলার প্রচলন ছিলো। কেউ যদি নিজের কন্যাসন্তানকে বিয়ে দেয়ার আগ পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৪/১৫ বছর পর্যন্ত লালনপালনের ভার নিতে না চাইতো, তাহলে মেয়েটিকে মরুভূমিতে ফেলে আসতো। এক পর্যায়ে মেয়েটি মারা যেতো। মোহাম্মদ এই ব্যবস্থার অবসান ঘটান। এতিম ও বিধবাদেরকে সহায়তা করার উপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। এগুলোকে নিশ্চয় মহৎ শিক্ষা হিসেবে আমরা বিবেচেনা করতে পারি। কিন্তু এমন কিছু শিক্ষাও আমরা দেখতে পাই, যা বর্তমানের তুলনায় রীতিমতো বর্বর। ব্যভিচারী নারী-পুরুষকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা, চোরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নেয়া– আমার বিবেচনায় এসব বিধান নিশ্চিতভাবেই পশ্চাৎপদতার নামান্তর।

তবে অধ্যাপক তারিক রমাদান বলেন,

আজকের দিনে আমরা পশ্চিমা বিশ্ব দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কারণে শরীয়াহর অত্যন্ত সংকীর্ণ ব্যাখ্যা করছি। বিয়ে, শাস্তি আইন ইত্যাদি বিষয়কে সমর্থন বা বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে শরীয়াহর রক্ষণশীল ব্যাখ্যাকেই আমরা মুখ্য বিবেচনা করছি। এটি ঠিক নয়। শরীয়াহ নিয়ে আমার বক্তব্য হলো– আমি পাশ্চাত্যে বসবাস করি। এখানে আমার-আপনার-সবার জন্যই আইন রয়েছে। আমরা সবাই সমান অধিকার ভোগ করি। এটাই হলো আমার শরীয়াহ। এটি হলো শরীয়াহর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য।

সৌদি আরব ও ইরানের মতো কোনো কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের আইনী কাঠামোর মূলভিত্তি হলো শরীয়াহ আইন। সেসব দেশের শাস্তির বিধানগুলোকে অনেকে মধ্যযুগীয় বর্বরতা বলে মনে করে। ফলে ব্রিটেন ও ইউরোপে শরীয়াহ আইন চালুর যে দাবি মুসলিম চরমপন্থীরা করে থাকে, এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণা জোরদার হচ্ছে। কারণ, তাদের দৃষ্টিতে এটি হলো ইসলামী প্রভাব ছড়িয়ে দেয়ার একটি প্রচেষ্টা। ‘নাউ দে কল মি ইনফিডাল’ গ্রন্থের লেখিকা ননী দারভীশ এ ব্যাপারে বলেন,

একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা এমন এক জাতি দেখছি, যারা মানুষের শিরচ্ছেদ করছে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে নিচ্ছে, হাত-পা কেটে ফেলছে। এটি একটি বড় সমস্যা। এই যুগেও স্বয়ং সরকার পাথর মেরে নারীদের হত্যা করছে। অথচ এসব নারীরা কাউকে খুন করেনি। নিছক ‘যৌন অপরাধের’ অভিযোগে এই শাস্তি দেয়া হচ্ছে। একজন ব্যক্তির জীবন হরণ করার চেয়েও গুরুতর ব্যাপার হলো মৃত্যুদণ্ড প্রদানের এই অমানবিক প্রক্রিয়াটি।

অধ্যাপক তারিক রমাদান এ সম্পর্কে বলেন,

কেউ কেউ পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে হত্যা করা, কিংবা শাস্তি প্রয়োগ শুরু করাকেই শরীয়াহর বাস্তবায়ন বলে মনে করে। আমি বলি– না, এটি শরীয়াহ নয়। এটি হলো নিজের স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করার কৌশল। তাদের কাছে আমার একটা প্রশ্ন আছে। সেটি হলো, আপনি কোন পদ্ধতিতে রাষ্ট্রক্ষমতার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন? নাকি আদৌ নির্বাচিতই হননি? আপনি কি সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন? এটি হলো প্রথম প্রশ্ন। যেহেতু আপনার কোনো বৈধতা নেই, সেহেতু ইসলামের নামে এই ধরনের শাস্তি প্রয়োগের কোনো অধিকার আপনার নেই। এই শাস্তি যারা প্রয়োগ করছে বা চালু করেছে, তাদের অধিকাংশই আসলে নির্বাচিত কর্তৃপক্ষ নয়। জনগণ তাদেরকে নির্বাচিত করেনি। নিজেদের গদি ঠিক রাখার স্বার্থেই তারা এগুলো করে থাকে। এবার দ্বিতীয় প্রশ্নটি করা যাক। শাস্তি প্রয়োগের পূর্বশর্ত হিসেবে সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমানাধিকার বাস্তবায়ন করবে কে? ইসলামের মর্মবাণী জনগণকে বুঝাবে কে? আপনি কি মানুষকে ইসলামে উদ্বুদ্ধ না করেই শাস্তি প্রয়োগ করতে চান? এটি কি ইসলাম? মোটেও না। ইসলাম শুরুই হয় মানুষকে উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে। শাস্তি প্রয়োগের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি ব্যাপার। শাস্তি প্রয়োগ দিয়ে শুরু করা যাবে না। মানুষের আত্মমর্যাদা ও অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শাস্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তারা ধর্মকে নিছক নিজেদের শাসনতান্ত্রিক বৈধতার স্বার্থে ব্যবহার করে।

এ ব্যাপারে জিয়াউদ্দীন সরদার বলেন,

অন্যান্য সকল আইনের মতো শরীয়াহ আইনও সময়ের পরিক্রমায় পরিবর্তিত হওয়ার কথা। একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকশিত হওয়ার কথা। অন্তত তাত্ত্বিকভাবে হলেও এটি সত্য। কিন্তু শরীয়াহ আইনের নামে আমাদের হাতে এখন যা আছে, তা বহুকাল আগের ব্যাপার-স্যাপার। এগুলো মূলত অষ্টম ও নবম শতাব্দীর ফিকাহবিদদের প্রদত্ত ব্যাখ্যা। এগুলোকেই আমরা এখন শরীয়াহ আইন বলে দাবি করছি। এ কারণেই যেখানে শরীয়াহ আইনের প্রয়োগ ঘটেছে, সেখানে অষ্টম ও নবম শতাব্দীর পরিবেশ-পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তাই শরীয়াহ আইনকে মুসলমানদের নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। এই কাজ ধারাবাহিক ও নিরবচ্ছিন্নভাবে করে যেতে হবে। কারণ, স্বয়ং শরীয়াহ শব্দের অর্থ হলো– ‘বহমান ঝরনাধারা’। আপনি কেন পানির উৎসের কাছে যান? পানি পান করার জন্যই তো। এটি এমন একটি দরকারী বিষয়, যা আমাদেরকে সবসময়ই করতে হয়। যার ফলে যুগে যুগে একে রিফ্রেশ করা, নতুনভাবে এ নিয়ে চিন্তা করা এবং নতুন নতুন ফর্মূলা বের করা অত্যাবশ্যক।

(চলবে)

নোট:

[1] এ তথ্যটি সঠিক নয়। কারণ, রাসূল (সা) কর্তৃক এ ধরনের শাস্তি প্রয়োগের ঘটনা সংক্রান্ত হাদীস রয়েছে –অনুবাদক।


বাকি পর্বগুলো পড়তে ভিজিট করুন এখানে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *