ওহী লাভের শারীরিক কষ্ট

মোহাম্মদ (সা) সময়ে সময়ে যেসব ঐশীবাণী লাভ করেছিলেন, সেগুলোর সংকলনই হলো ‘আল কোরআন’। ওহী নাজিলের প্রতিটি ঘটনাই তাঁর জন্য ছিলো কষ্টকর ও দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এই জন্য তাঁকে প্রতিনিয়ত কঠোর সাধনা করতে হতো। কখনো ওহী নাজিল হতো সরাসরি কথা হিসেবে, আবার কখনো স্বপ্নযোগে। সেক্ষেত্রে ওহীর অর্থ সঠিকভাবে অনুধাবন করার জন্য রাসূলকে (সা) গভীর মনোযোগ সন্নিবেশ করতে হতো। এ প্রসঙ্গে ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

তিনি প্রায় সময় বলতেন, ‘আমার উপর যখন ওহী নাজিল হয়, তখন মনে হয় যেন দেহ থেকে আত্মা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।’ ওহী নাজিলের পর তাঁর মুখমণ্ডল বিবর্ণ হয়ে যেতো। তিনি তখন ঘর্মাক্ত হয়ে পড়তেন। এমনকি শীতের দিনেও এর ব্যতিক্রম হতো না। আল্লাহর বাণী গ্রহণ করার জন্যই তাঁর এতো কষ্ট হতো।

বারনাবি রজারসন বলেন,

প্রচণ্ড কষ্টকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মহানবী ওহী লাভ করতেন। তাঁর গোটা সত্তা জুড়ে প্রবাহিত এই বিশেষ অভিজ্ঞতাকে তিনি ভাষায় প্রকাশ করেছেন।

টম হল্যান্ড বলেন,

মোহাম্মদ এমন এক যুগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যখন মনে করা হতো, ঐশ্বরিক রহস্যময় ব্যাপারগুলোর পর্দা উন্মোচন করা বিশেষ আধ্যাত্মিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষেই কেবল সম্ভব। ইহুদী, খ্রিস্টান, জরাথ্রুস্ট– এই ধর্মগুলোতেও এ ধরনের পবিত্র ব্যক্তির ধারণা রয়েছে। এ কারণেই ঈশ্বরের কাছ থেকে মোহাম্মদের ঐশীবাণী লাভের দাবির প্রতি মানুষ তখন আস্থা রেখেছিলো।

আধ্যাত্মিকতার ইসলামী স্বরূপ

তবে বাস্তবতা হলো, এই ধরনের আধ্যাত্মিকতার ধারণা ইসলামের সাথে যায় না। যদিও মুসলমানদের মধ্যে এ ধরনের একটি গ্রুপ তথা সুফী ধারার প্রচলন রয়েছে। তাদের দাবি হলো– আল্লাহর নৈকট্য লাভের যে অভিজ্ঞতা মোহাম্মদ (সা) লাভ করেছিলেন, তারাও গভীর ধ্যান, জিকির ও কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সে ধরনের অভিজ্ঞতা লাভের চেষ্টা করছে। তুর্কি সুফীদের বিশেষ ধরনের ঘূর্ণি নৃত্যের একজন নৃত্যকার এমরি ইলদিরিম বলেন,

নবী মোহাম্মদ (সা) প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতেন, তাঁর সাথে যোগাযোগ করতেন। তিনি সাধারণত তখনই ঐশী নির্দেশনাগুলো লাভ করতেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করতেন। ঠিক এ কারণেই আমরাও আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করি। এ ধরনের আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর সাথে বিলীন হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। নবী মোহাম্মদ (সা) নিজেই এর দৃষ্টান্ত। তিনি তাঁর দৈনন্দিন জীবনযাপন কিংবা প্রার্থনার মাধ্যমে যা কিছু করেছেন, আমাদের জন্য সেগুলোই অনুসরণীয়।

এভাবে সুফীরা অনেক ধরনের নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠান ও পদ্ধতি ক্রমে ক্রমে গড়ে নিয়েছে। অথচ সুফীরা যাকে তাদের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা লাভের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস বলে মনে করে, সেই মোহাম্মদ (সা) এ ধরনের আচার-অনুষ্ঠান কখনো করেছেন বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। অধ্যাপক সাজ্জাদ রিজভী এ ব্যাপারে বলেন,

একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে মহানবী (সা) ইসলামের ধর্মতাত্ত্বিক ও সুফী উভয় ধারারই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাঁর মাধ্যমেই কেবল কেউ আল্লাহকে জানতে পারে– এই সত্যের মাঝেই আসলে তাঁর পরিপূর্ণতা নিহিত রয়েছে।

সুফিদের এসব আচার-অনুষ্ঠানে জিকির করতে করতে একদম চূড়ান্ত পর্যায়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় বলে মনে করা হয়। সুর করে জিকির করার সময় এক ধরনের মোহাবিষ্টতা তৈরি করতে তুর্কি সুফীরা নৃত্যেরও প্রবর্তন করেছে। জিয়াউদ্দীন সরদার এ ব্যাপারে বলেন,

প্রত্যেকটি ধর্মেই আধ্যাত্মিকতার নানা রকম নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে। ইসলামও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদেরও বেশ কয়েক ধরনের আধ্যাত্মিক ধারা রয়েছে। সুফীবাদ এরমধ্যে একটি। হ্যাঁ, মহানবী (সা) প্রার্থনা করেছেন, ধ্যান করেছেন; কিন্তু তিনি তো এটিও বলেছেন– ‘দোয়া করো, তবে তোমার উটটি বেঁধেও রেখো।’ এর মানে হলো শুধু দোয়া-দরুদই যথেষ্ট নয়, ভালো কাজটাও করতে হবে। দোয়া করার সাথে সাথে আমাদেরকে একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজও গড়ে তুলতে হবে। এ ধরনের আধ্যাত্মিকতা কেউ যদি মেনে চলে এবং বাস্তব জীবনে ভালো কাজ করে ও ভালো কাজ করার উপর জোর দেয়াকে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তাহলেই সত্যিকার অর্থে মোহাম্মদের (সা) পথ অনুসরণ করা হয়।

মোহাম্মদের (সা) আধ্যাত্মিকতা ছিলো জীবনের বাস্তব প্রয়োজনের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তিনি সন্ন্যাসী টাইপের কোনো ব্যক্তি ছিলেন না। বরং আরব সমাজের সংস্কারের জন্য তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে গেছেন। পরকালে বেহেশত লাভের অপেক্ষায় নিছক বসে থাকার পরিবর্তে তিনি একটি আদর্শ সমাজ গড়ার চেষ্টা করে গেছেন।

মহানবীর ব্যক্তিচরিত্র

৬২৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই মদীনার একজন ক্ষমতাধর শাসক হিসেবে অধিষ্ঠিত হলেও ব্যক্তিগত আচরণ ও জীবনযাপনে তিনি আগের মতোই পরিমিত ছিলেন। প্রাপ্ত সকল বর্ণনাই এ কথা সমর্থন করে। আগের মতোই তিনি তাঁর ছোট্ট মসজিদটির পাশের ঘরটিতে থাকতেন এবং মসজিদটিকে নামাজের স্থান ও তাঁর কাজকর্মের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। ইহুদী, খ্রিস্টান, কাফের, এমনকি দাসদাসীসহ সকলেরই তাঁর কাছে যাওয়া এবং কথা বলার অবাধ সুযোগ ছিলো। মহানবীর (সা) চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জিয়াউদ্দীন সরদার বলেন,

তাঁর জীবনী পড়লে স্পষ্টতই বুঝা যায়, তিনি একজন অসাধারণ ক্যারেশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। অসংখ্য লোক পরামর্শ নিতে তাঁর কাছে প্রতিনিয়ত আসতো। তিনি যে সব সময় একেবারে সর্বোত্তম পরামর্শটিই তাৎক্ষণিকভাবে দিতে পারতেন, তা কিন্তু নয়। তবে সবসময়ই তিনি লোকদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মানবিক, আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল ব্যক্তি।

ড. আমিরা বেনিসন বলেন,

আমি মনে করি, নানান দিক থেকেই মোহাম্মদ (সা) চমৎকার মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন খুবই ভদ্র। কারো দোষত্রুটি খুঁজতে যেতেন না। অত্যন্ত স্বচ্ছ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন।

তিনি একদম সাদামাটা পোশাক পরিধান করতেন। স্বর্ণ, রেশমি পোশাক, কিংবা বিলাসবহুল কোনো দ্রব্য অপছন্দ করতেন। বিত্তবৈভবের ধার ধারতেন না। সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে দান-খয়রাত করতেন, উপহার দিতেন। ‘দ্য লিডারশিপ অব মোহাম্মদ’ গ্রন্থের লেখক জন আডায়ার মহানবী (সা) সম্পর্কে বলেন,

ক্ষমতার পেছনে ছুটে বেড়ানোর কোনো লক্ষণ আমি মোহাম্মদের মাঝে খুঁজে পাইনি। তাঁর সততার উপর কখনো কোনো কালি পড়েনি। যে কোনো আর্থিক বিষয় বা দুর্নীতির ব্যাপারে তিনি খুব সতর্ক থাকতেন। একটি উদীয়মান সংগঠনের নেতার যেসব যোগ্যতা ও মোরাল ভিশন থাকা দরকার, আমার মতে, মোহাম্মদের ঠিক তাই ছিলো। এই দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।

বারনাবি রজারসন বলেন,

তিনি ছিলেন একজন অনুসন্ধায়ী। জীবনভর তিনি সত্য ও সঠিক উপলব্ধির সন্ধান করেছেন। তাঁর বাগ্মিতা ছিলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো। তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান আরব। তাঁর কর্ম মানবজাতির জন্য এমনই দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, যা কালক্রমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।

মক্কী ও মাদানী যুগের পার্থক্য

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মোহাম্মদ (সা) ধারাবাহিকভাবে ওহী লাভ করলেও মক্কী ও মাদানী যুগের ওহীর বিষয়বস্তুর মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। মক্কী জীবনের ওহীগুলোতে ঈমান ও ধর্মীয় বিষয়গুলোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে, মাদানী জীবনের ওহীগুলো ছিলো সে তুলনায় অনেক বেশি প্রায়োগিক, অর্থাৎ বাস্তব জীবনের সাথে সম্পর্কিত। সামাজিক বিষয়গুলো থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ব্যাপার পর্যন্ত একজন মুসলমানের জীবনযাপন কেমন হওয়া উচিত, এই ওহীগুলোতে সেসব বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অনেক মুসলমান এসব নির্দেশনা মেনে চলার চেষ্টা করেন। ড. আমিরা বেনিসন এ ব্যাপারে বলেন,

মক্কায় তিনি মূলত একজন ধর্মীয় প্রচারক ছিলেন, এ কথা ঠিকই আছে। শেষবিচারের দিন, নৈতিকতা, ন্যায়বিচার– এ জাতীয় বিষয়গুলো নিয়েই তিনি বেশি বলতেন। তবে মদীনায় হিজরতের পর তিনি সমাজের নেতা হিসেবে সক্রিয় হয়ে ওঠলেন। তারপর দিন দিন সমাজ পরিচালনার সাথে তিনি অনেক বেশি জড়িয়ে পড়লেন। লোকেরা কীভাবে একে অপরের কাজে এগিয়ে আসবে, উত্তরাধিকার সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা কীভাবে করবে, এমনকি একে অপরকে কীভাবে সম্ভাষণ জানাবে, সেসব বিষয়ে পর্যন্ত তিনি দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন।

কখনো সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে ওহী নাজিল হয়েছে। যেমন– অসুস্থ ও অভাবীদেরকে আর্থিক সহায়তা করা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য। আবার ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হলে অন্য বিশ্বাসের লোকদের সাথে কী রকম আচরণ করতে হবে, এ সংক্রান্ত সাধারণ নির্দেশনা হিসেবেও কখনো কখনো ওহী নাজিল হয়েছে। মদীনার শাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মোহাম্মদ (সা) এসবকে নীতিনির্ধারণী বিষয়ে পরিণত করেছিলেন।

শরীয়াহ বলতে আসলে কী বুঝায়?

সময়ে সময়ে মোহাম্মদের (সা) উপর নাজিলকৃত ওহীগুলো সার্বজনীন সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণা সংক্রান্ত একটি নৈতিক নীতিমালা তথা জীবনবিধানের রূপ লাভ করে। কোরআনে একে বলা হয়েছে ‘শরীয়াহ’ তথা ‘আল্লাহকে জানার পথ’। অধ্যাপক তারিক রমাদান এ সম্পর্কে বলেন,

শরীয়াহ সম্পর্কে আমরা তিনটি আয়াত পাই। এই আয়াতগুলোতে শরীয়াহ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। রাসূল (সা) এবং তাঁর সাহাবীগণ শরীয়াহ বলতে কী বুঝেছিলেন? তারা কী প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছিলেন? এ প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তারা আসলে মানুষকে আহ্বান জানিয়েছিলেন– এই পথই হলো স্রষ্টার পথ তথা শরীয়াহ। তবে পরিভাষাটি নিয়ে আমরা সমস্যায় পড়েছি আরো পরে। কারণ, পরবর্তী স্কলারগণ শরীয়াহকে আল্লাহর আইন বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন। যেহেতু তাঁরা মূলত ফিকাহবিদ ছিলেন, তাই তাঁদের কাছে শরীয়াহ নিছক একটি আইনী ব্যাপার হিসেবে বিবেচিত ছিলো। কিন্তু মহানবী (সা) সমাজে প্রকৃতপক্ষে কোন বিষয়গুলোর প্রচলন ঘটিয়েছিলেন? আপনি জানেন, সেগুলো ছিলো ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার, সমতা, স্বাধীনতা ইত্যাদি। এগুলোই হলো শরীয়াহ।

ইসলামের পবিত্র বিধান তথা শরীয়াহ আইন হিসেবে যা এখন পরিচিত, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়। এর প্রচলন ঘটেছে মহানবীর (সা) মৃত্যুর দুই শতাব্দী পর। ক্রমবিকাশমান ইসলামী খেলাফত সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় সহায়তা করতে তৎকালীন ফিকাহবিদগণ একটি আইনী কাঠামোর উদ্ভাবন করেন, যা আজকে শরীয়াহ আইন হিসেবে পরিচিত। তাঁরা কোরআনের শিক্ষা ও মহানবীর (সা) জীবনের দৃষ্টান্তগুলোর মাঝে সমন্বয় করেন। শরীয়াহর এই কাঠামোকেই অনেক মুসলমান এখন অপরিবর্তনীয় আল্লাহর আইন বলে মনে করেন। ড. আমিরা বেনিসন এ ব্যাপারে বলেন,

ইসলামী আইনের মূলনীতিগুলো কোরআনে বলা আছে। এমনকি সুনির্দিষ্ট কিছু বিধানের বিস্তারিত বর্ণনাও আপনি কোরআনে পাবেন। যেমন– উত্তরাধিকার আইন। কিন্তু ‘শরীয়াহ আইন’ সময়ের ব্যবধানে মানুষের হাতেই গড়ে ওঠেছে। এটি ছিলো আল্লাহর ইচ্ছাকে বুঝা ও তা বাস্তবায়ন করার একটি মানবীয় প্রচেষ্টা। শরীয়াহ ডিসকোর্সের ভেতরেই ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির দৃষ্টান্ত রয়েছে। সাংঘর্ষিক বিধান পর্যন্ত রয়েছে। তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এটি সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো বিধান নয়। এটি অনেক বেশি নমনীয়, পরিবর্তনশীল এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার উপযোগী একটি ব্যবস্থা।

শরীয়াহ আইন নিয়ে বিতর্ক

মদীনায় মোহাম্মদ (সা) বহু অতীত গোত্রীয় রীতিনীতির আমূল পরিবর্তন সাধন করেছিলেন। বংশ পরম্পরায় চলে আসা নৃশংস গোত্রীয় সংঘাতের বিলোপসাধন করেছিলেন। উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীদের অংশিদারিত্ব এবং নারীদের স্বীয় সম্পত্তির উপর অধিকার নিশ্চিত করেছেন। তবে কোরআনে কিছু সেকেলে শাস্তি আইনের কথাও বলা আছে। যেমন– চুরির শাস্তি হিসেবে অঙ্গ কেটে নেয়ার বিধান। অবশ্য মোহাম্মদ (সা) কখনো এই শাস্তির প্রয়োগ করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না।[1] এ জাতীয় কিছু শাস্তি এখন পর্যন্ত শরীয়াহ আইন কাঠামোর অংশ হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে। নিউইয়র্কের ফোর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটির ফিলোসফির টিচিং ফেলো ড. ডেভিড উড এ ব্যাপারে বলেন,

সপ্তম শতাব্দীর আরবে (কখনো কখনো) কন্যাশিশুকে মেরে ফেলার প্রচলন ছিলো। কেউ যদি নিজের কন্যাসন্তানকে বিয়ে দেয়ার আগ পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৪/১৫ বছর পর্যন্ত লালনপালনের ভার নিতে না চাইতো, তাহলে মেয়েটিকে মরুভূমিতে ফেলে আসতো। এক পর্যায়ে মেয়েটি মারা যেতো। মোহাম্মদ এই ব্যবস্থার অবসান ঘটান। এতিম ও বিধবাদেরকে সহায়তা করার উপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। এগুলোকে নিশ্চয় মহৎ শিক্ষা হিসেবে আমরা বিবেচেনা করতে পারি। কিন্তু এমন কিছু শিক্ষাও আমরা দেখতে পাই, যা বর্তমানের তুলনায় রীতিমতো বর্বর। ব্যভিচারী নারী-পুরুষকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা, চোরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নেয়া– আমার বিবেচনায় এসব বিধান নিশ্চিতভাবেই পশ্চাৎপদতার নামান্তর।

তবে অধ্যাপক তারিক রমাদান বলেন,

আজকের দিনে আমরা পশ্চিমা বিশ্ব দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কারণে শরীয়াহর অত্যন্ত সংকীর্ণ ব্যাখ্যা করছি। বিয়ে, শাস্তি আইন ইত্যাদি বিষয়কে সমর্থন বা বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে শরীয়াহর রক্ষণশীল ব্যাখ্যাকেই আমরা মুখ্য বিবেচনা করছি। এটি ঠিক নয়। শরীয়াহ নিয়ে আমার বক্তব্য হলো– আমি পাশ্চাত্যে বসবাস করি। এখানে আমার-আপনার-সবার জন্যই আইন রয়েছে। আমরা সবাই সমান অধিকার ভোগ করি। এটাই হলো আমার শরীয়াহ। এটি হলো শরীয়াহর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য।

সৌদি আরব ও ইরানের মতো কোনো কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের আইনী কাঠামোর মূলভিত্তি হলো শরীয়াহ আইন। সেসব দেশের শাস্তির বিধানগুলোকে অনেকে মধ্যযুগীয় বর্বরতা বলে মনে করে। ফলে ব্রিটেন ও ইউরোপে শরীয়াহ আইন চালুর যে দাবি মুসলিম চরমপন্থীরা করে থাকে, এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণা জোরদার হচ্ছে। কারণ, তাদের দৃষ্টিতে এটি হলো ইসলামী প্রভাব ছড়িয়ে দেয়ার একটি প্রচেষ্টা। ‘নাউ দে কল মি ইনফিডাল’ গ্রন্থের লেখিকা ননী দারভীশ এ ব্যাপারে বলেন,

একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা এমন এক জাতি দেখছি, যারা মানুষের শিরচ্ছেদ করছে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে নিচ্ছে, হাত-পা কেটে ফেলছে। এটি একটি বড় সমস্যা। এই যুগেও স্বয়ং সরকার পাথর মেরে নারীদের হত্যা করছে। অথচ এসব নারীরা কাউকে খুন করেনি। নিছক ‘যৌন অপরাধের’ অভিযোগে এই শাস্তি দেয়া হচ্ছে। একজন ব্যক্তির জীবন হরণ করার চেয়েও গুরুতর ব্যাপার হলো মৃত্যুদণ্ড প্রদানের এই অমানবিক প্রক্রিয়াটি।

অধ্যাপক তারিক রমাদান এ সম্পর্কে বলেন,

কেউ কেউ পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে হত্যা করা, কিংবা শাস্তি প্রয়োগ শুরু করাকেই শরীয়াহর বাস্তবায়ন বলে মনে করে। আমি বলি– না, এটি শরীয়াহ নয়। এটি হলো নিজের স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করার কৌশল। তাদের কাছে আমার একটা প্রশ্ন আছে। সেটি হলো, আপনি কোন পদ্ধতিতে রাষ্ট্রক্ষমতার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন? নাকি আদৌ নির্বাচিতই হননি? আপনি কি সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন? এটি হলো প্রথম প্রশ্ন। যেহেতু আপনার কোনো বৈধতা নেই, সেহেতু ইসলামের নামে এই ধরনের শাস্তি প্রয়োগের কোনো অধিকার আপনার নেই। এই শাস্তি যারা প্রয়োগ করছে বা চালু করেছে, তাদের অধিকাংশই আসলে নির্বাচিত কর্তৃপক্ষ নয়। জনগণ তাদেরকে নির্বাচিত করেনি। নিজেদের গদি ঠিক রাখার স্বার্থেই তারা এগুলো করে থাকে। এবার দ্বিতীয় প্রশ্নটি করা যাক। শাস্তি প্রয়োগের পূর্বশর্ত হিসেবে সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমানাধিকার বাস্তবায়ন করবে কে? ইসলামের মর্মবাণী জনগণকে বুঝাবে কে? আপনি কি মানুষকে ইসলামে উদ্বুদ্ধ না করেই শাস্তি প্রয়োগ করতে চান? এটি কি ইসলাম? মোটেও না। ইসলাম শুরুই হয় মানুষকে উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে। শাস্তি প্রয়োগের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি ব্যাপার। শাস্তি প্রয়োগ দিয়ে শুরু করা যাবে না। মানুষের আত্মমর্যাদা ও অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শাস্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তারা ধর্মকে নিছক নিজেদের শাসনতান্ত্রিক বৈধতার স্বার্থে ব্যবহার করে।

এ ব্যাপারে জিয়াউদ্দীন সরদার বলেন,

অন্যান্য সকল আইনের মতো শরীয়াহ আইনও সময়ের পরিক্রমায় পরিবর্তিত হওয়ার কথা। একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকশিত হওয়ার কথা। অন্তত তাত্ত্বিকভাবে হলেও এটি সত্য। কিন্তু শরীয়াহ আইনের নামে আমাদের হাতে এখন যা আছে, তা বহুকাল আগের ব্যাপার-স্যাপার। এগুলো মূলত অষ্টম ও নবম শতাব্দীর ফিকাহবিদদের প্রদত্ত ব্যাখ্যা। এগুলোকেই আমরা এখন শরীয়াহ আইন বলে দাবি করছি। এ কারণেই যেখানে শরীয়াহ আইনের প্রয়োগ ঘটেছে, সেখানে অষ্টম ও নবম শতাব্দীর পরিবেশ-পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তাই শরীয়াহ আইনকে মুসলমানদের নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। এই কাজ ধারাবাহিক ও নিরবচ্ছিন্নভাবে করে যেতে হবে। কারণ, স্বয়ং শরীয়াহ শব্দের অর্থ হলো– ‘বহমান ঝরনাধারা’। আপনি কেন পানির উৎসের কাছে যান? পানি পান করার জন্যই তো। এটি এমন একটি দরকারী বিষয়, যা আমাদেরকে সবসময়ই করতে হয়। যার ফলে যুগে যুগে একে রিফ্রেশ করা, নতুনভাবে এ নিয়ে চিন্তা করা এবং নতুন নতুন ফর্মূলা বের করা অত্যাবশ্যক।

বহুবিবাহ ইস্যু

৬২৭ খ্রিস্টাব্দ। মোহাম্মদ (সা) ততদিনে মদীনায় একটি নিরাপদ ক্ষমতাকেন্দ্র গড়ে তুলেছেন। যদিও তাঁকে শেষ করে দেয়ার লক্ষ্যে প্রতিপক্ষ কোরাইশদের সকল প্রচেষ্টাকেই তিনি ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন, তারপরও তারা যথেষ্ট ক্ষমতাবান ছিলো। মক্কা নগরী তখনো তারাই নিয়ন্ত্রণ করতো। আরবের সকল মানুষের কাছে তাঁর বাণী নিয়ে পৌঁছতে হলে তাঁকে এই বাধা অতিক্রম করার একটা পথ খুঁজে বের করা ছিলো জরুরি।

অতীতের যুদ্ধগুলো থেকে মোহাম্মদ (সা) একটি মৌলিক শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মক্কার সেনাবাহিনীকে পরাজিত করা বেশ কঠিন। তাই তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করতে হবে। এই ভাবনা থেকে তিনি গোটা আরবের বিভিন্ন গোত্রের সাথে মৈত্রী গড়া শুরু করলেন। এই সম্পর্ক গড়ার কাজে অন্যতম একটি উপায় ছিলো বিবাহবন্ধন।

মোহাম্মদের (সা) সমালোচকরা সবসময়ই বহুবিবাহ ইস্যুটিকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরেছে। অথচ তৎকালীন আরবে এটি ছিলো একটি সাধারণ সামাজিক প্রথা। এরচেয়ে বড় কথা হলো, প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি আর কোনো বিয়ে করেননি। কারো কারো বর্ণনা মতে, তাঁর স্ত্রী ছিলেন নয় জন। অন্যদের মতে, ১১ কিংবা ১৩ জন। এঁদের কেউ ছিলেন বিধবা। কেউ ছিলেন যুদ্ধবন্দী, বিবাহের মাধ্যমে যিনি মুক্তি লাভ করেছিলেন। এমনকি এঁদের একজন ছিলেন কপ্টিক খ্রিস্টান দাসী। মিশরের বাইজেন্টানীয় শাসক তাঁকে উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। তবে তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধুর কন্যা আয়েশার (রা) সাথে বিয়ের ঘটনাটিই সবচেয়ে বেশি আলোচিত-সমালোচিত। কোনো কোনো সূত্র মতে, আয়েশার (রা) বয়স যখন ছয় কিংবা সাত, তখন বাগদান হয়েছিলো এবং নয় বছর বয়সে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের কাজ সমাধা হয়। অন্যান্য সূত্র মতে, তাঁর বয়স আরো বেশি ছিলো। ১৬ কিংবা ১৭ বছরের কাছাকাছি। বয়স নিয়ে পরিষ্কার তথ্য না থাকায় অনেক সমালোচক এ বিষয়ে মোহাম্মদের (সা) কঠোর সমালোচনা করার প্রয়াস পেয়েছেন। ‘সোর্ড অব দ্য প্রফেট’ গ্রন্থের লেখক সার্জ ট্রিফকভিচ এ ব্যাপারে বলেন,

৫৩ বছর বয়সী একজন ব্যক্তি নয় বছর বয়সী একজন মেয়েকে বিয়ে করবে এবং শয্যাসঙ্গী করবে, এটি মোটেও সঠিক কাজ নয়। শুধু পাশ্চাত্যের একবিংশ শতাব্দীর মানদণ্ড অনুযায়ীই নয়; বরং মানব ইতিহাসের অধিকাংশ সময়ের, অধিকাংশ সমাজের সাধারণ নৈতিকতার সাথেও এটি যায় না।

অধ্যাপক তারিক রমাদান বলেন,

এ ব্যাপারে আমার অবস্থান হলো, তিনি প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। তখন তাঁর বয়স ৬ কিংবা ৭ ছিলো না, বরং ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে ছিলো। ব্যাপারটা নিয়ে এতোদিন পর এসে বর্তমানকালের গবেষকরা (ঠিক বর্তমানকাল নয়, বরং গত শতাব্দী থেকে) কথাবার্তা বলছেন। আমরা বার বার বলে আসছি, আয়েশার (রা) বয়সের ব্যাপারে যা বলা হয়, সেটিই একমাত্র সত্য নয়। এটি কোরআনের কোনো আয়াত নয়। এটি বরং রাসূলের (সা) জীবনের সাথে সম্পর্কিত বিষয়। তাই আমাদেরকে অবশ্যই তাঁর প্রকৃত বয়স যাচাই করে দেখতে হবে। এ ব্যাপারে আমি মনে করি, তাঁর বয়সের ব্যাপারে যা বলা হয়, সেই দাবির মধ্যে সমস্যা রয়েছে। 

মোহাম্মদের (সা) মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর সাথে আয়েশার (রা) বিয়ের সম্পর্ক অটুট ছিলো। পরবর্তীতে আয়েশা (রা) তাঁর স্বীয় যোগ্যতাবলে অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক নেতায় পরিণত হন। মুসলিম ঐতিহাসিকদের দাবি অনুযায়ী, এটি ছিলো মহানবীর (সা) চাচাত ভাই ও জামাতা আলীর (রা) সাথে আয়েশার (রা) মতদ্বৈততার পরিণতি। এই বিরোধের জের ধরেই পরবর্তীতে শিয়া ও সুন্নী ধারার নামে ইসলামে সবচেয়ে বড় বিভাজনের সূত্রপাত ঘটে। ম্যারল ওয়েন ডেভিস আয়েশার (রা) ব্যাপারে বলেন,

প্রকৃতপক্ষে আয়েশা (রা) কে ছিলেন, কীভাবে তিনি গড়ে ওঠেছিলেন, এটিই হলো আসল প্রশ্ন। এই প্রশ্নের জবাবের মাধ্যমে বাকি সব যুক্তি খারিজ হয়ে যায়। একজন সত্যিকারের সাহসী, স্বাধীন, বুদ্ধিমতি, রাজনীতি সচেতন নারী হিসেবে তিনি বেড়ে ওঠেছিলেন। মহানবীর (সা) জীবন সম্পর্কে আমাদের জানার অন্যতম ভিত্তি হলেন তিনি। মহানবী (সা) সম্পর্কে আমরা যা কিছু জানি, আয়েশা (রা) ব্যতীত এর অন্তত অর্ধেক বিষয় আমাদের অজানাই থেকে যেতো।

পরবর্তীতে বেশকিছু আয়াত নাজিল করে ইসলামের বিবাহ ব্যবস্থাকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর ফলে মুসলিম পুরুষরা সর্বোচ্চ চারজন স্ত্রী রাখতে পারবে। তাও শর্ত হলো, ভরণপোষণ ও আচরণের ক্ষেত্রে কারো সাথে বৈষম্য করা যাবে না। অথচ, মোহাম্মদের (সা) সমালোচনার ক্ষেত্রে এই আয়াতগুলোকেই জোড়ালো উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, অন্যদের জন্য এ ব্যবস্থা কার্যকর থাকলেও মোহাম্মদ (সা) স্বয়ং তাঁর সকল স্ত্রীকেই বহাল রাখার সুযোগ পেয়েছেন। আব্দুর রহীম গ্রীন ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করে বলেন,

আমাদেরকে তৎকালীন বাস্তবতা বুঝতে হবে। পৌত্তলিক আরবে বহুবিবাহের কোনো নির্দিষ্ট সীমা ছিলো না। এটি অত্যন্ত সাধারণ একটি প্রথা ছিলো। ইসলাম এসে বিবাহের সংখ্যা নির্ধারণ করে দিয়েছে। মুসলমানরা চারটির বেশি বিয়ে করতে পারবে না। মহানবীর (সা) যে নয় জন স্ত্রী ছিলেন,  তাঁদেরকে তিনি এই বিধান নাজিলের পূর্বেই বিয়ে করেছিলেন। তাঁর জন্যও নতুন করে চারটির বেশি বিয়ে করা নিষিদ্ধ ছিলো। কিন্তু ইতোমধ্যেই যাঁদেরকে তিনি বিয়ে করেছিলেন, তাঁদেরকে রাখার অনুমতি তাঁকে দেয়া হয়েছিলো। এর পেছনের কারণটা একদম পরিষ্কার। সেটি হলো, গোত্রীয় মৈত্রী বজায় রাখা। এটি খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। তিনি তো আর নিছক একজন নবীই ছিলেন না, তিনি তাঁর জনগোষ্ঠীর প্রধান নেতাও ছিলেন। তাই তৎকালীন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন গোত্রের সাথে মৈত্রী বজায় রাখাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।

ড. ডেভিড উড বলেন,

সূরা আহযাবের ৫০ নং আয়াতের মাধ্যমে মোহাম্মদের অতিরিক্ত স্ত্রী রাখাকে ন্যায্যতা দেয়া হয়েছে। এই আয়াতে যত খুশি তত নারীকে বিয়ে করার অনুমতি শুধু মোহাম্মদকে দেয়া হয়েছে। তাই ব্যাপারটি সন্দেহজনক। কারণ, যদি দেখা যায় অন্য যে কারো চেয়ে একজন নবীকে অধিক যৌনসঙ্গী গ্রহণ করার অনুমতি ঐশী প্রত্যাদেশ দেয়, তখন অনেকেই নিজেকে নবী দাবি করতে পারে। মোটকথা হলো, বিষয়টিকে সন্দেহ করার কিছু কারণ কিন্তু রয়েই যায়।

তবে এ যুক্তি খণ্ডন করে ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

মহানবী অনৈতিকভাবে জাগতিক আনন্দলাভে মত্ত হওয়ার মতো স্থূল ব্যক্তি ছিলেন, এমনটা মনে করা সম্পূর্ণ ভুল চিন্তা। এই বিয়েগুলোর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিলো। আয়েশাকে বিয়ে করার কারণ ছিলো, তিনি আয়েশার পিতাকে আরো ঘনিষ্ঠ বন্ধনে আবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। তিনি তখন এমন এক নয়া সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, গোত্র বা রক্ত সম্পর্ক যার ভিত্তি ছিলো না। বৈবাহিক সম্পর্ক থাকায় এই উত্তরণ পর্ব কিছুটা সহজ হয়েছিলো।

মুসলিম সূত্রগুলো থেকে আমরা জানি, মোহাম্মদের (সা) কয়েকটি বৈবাহিক সম্পর্ক জীবদ্দশায়ই তাঁকে সমস্যায় ফেলেছিলো। যেমন, তাঁর পালক পুত্রের তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে তিনি যখন বিয়ে করলেন, তখন তাঁর শত্রুরা মুসলিম সমাজে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে গুজব ছড়িয়ে দিলো যে, তাঁদের মধ্যে আগে থেকেই অবৈধ সম্পর্ক ছিলো। রবার্ট স্পেনসার এ ব্যাপারে বলেন,

সাবেক পুত্রবধূ জয়নব বিনতে জাহাশকে তিনি বিয়ে করার প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্টত বুঝা যায়, সমাজ এর বিরোধী ছিলো। লোকেরা এ ঘটনায় সংক্ষুব্ধ ছিলো। তারা মনে করেছিলো, তিনি এক প্রকার অসম্মানজনক কাজ করেছেন।

আরেকটি বর্ণনা অনুযায়ী, একবার এক সফরের সময় যখন আয়েশাকে (রা) খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন আরো একবার তিনি এ জাতীয় সংকটে পড়েন। পরে অবশ্য তাঁকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিলো। তিনি এমন এক ব্যক্তির সাথে করে মদীনায় ফিরছিলেন, মোহাম্মদের (সা) সাথে বিয়ের পূর্বে যার সাথে আয়েশার (রা) পরিচয় ছিলো। আবারো তাঁর শত্রুরা গুজব ছড়িয়ে দিলো, তাদের দুজনের মধ্যে নিশ্চয় কোনো স্ক্যান্ডাল ঘটেছে। মুসলিম বর্ণনা মতে, কোন পক্ষের কথা বিশ্বাস করবেন, তা নিয়ে শুরুতে মোহাম্মদ (সা) নিজেই দ্বিধায় পড়ে যান। পরবর্তীতে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নাজিল হলে তিনি আয়েশার (রা) নিষ্কলুষ থাকার দাবি মেনে নেন। তৎকালীন আরবে ব্যভিচারের প্রচলিত শাস্তি ছিলো পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা। আয়েশাকে (রা) নিয়ে নাজিলকৃত নতুন ওহীতে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ব্যাভিচারের অভিযোগের সমাধান কীভাবে করতে হবে, তা বলে দেয়া হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, এই সমাধানটি তালেবানের মতো কট্টর দৃষ্টিভঙ্গির গ্রুপগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত। ব্যভিচারের শাস্তি প্রসঙ্গে আজমল মাসরুর বলেন,

পাথর নিক্ষেপে হত্যা করার ব্যাপারটি ইহুদী ও খ্রিষ্টধর্মের ব্যাপার। আমাদের জানা মতে, এটি ওল্ড টেস্টামেন্টের বিধান। কোরআনে বর্ণিত বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্কের শাস্তি হলো দেহের পেছন দিকে ১০০ বেত্রাঘাত। তবে এই শাস্তি কেবল তখনই প্রয়োগ করা যাবে, যদি চারজন ব্যক্তি অভিযুক্ত দুজনের যৌন সম্পর্কের বিষয়টি সরাসরি প্রত্যক্ষ করে সাক্ষ্য দেয়। এই শর্ত অক্ষুণ্ন রেখে শাস্তি প্রয়োগ করা সত্যিই বেশ কঠিন।

ইসলামে পর্দার বিধান

মসজিদে নববীর সাথে লাগোয়া নির্মিত কক্ষগুলোতে তাঁর স্ত্রীগণ বাস করতেন। সেখানে প্রায় সর্বদাই লোক সমাগম লেগে থাকতো। ফলে সেখানে খুব একটা প্রাইভেসি ছিলো না। অন্যদিকে, মোহাম্মদের (সা) শত্রুরা সবসময়ই মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন তৈরির প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকতো। এ ধরনের খোলামেলা পরিবেশ থাকায় ভবিষ্যতে নতুন করে স্ক্যান্ডাল বানিয়ে তা ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ তাঁর শত্রুদের ছিলো। এই প্রেক্ষাপটে একদিন মোহাম্মদ (সা) ওহীর মাধ্যমে নতুন একটি নির্দেশনা লাভ করলেন। তাঁর স্ত্রীদেরকে শালীনতা বজায় রাখার স্বার্থে আপদমস্তক ঢেকে চলাফেরা করার নির্দেশ দেয়া হলো। এই নির্দেশ মুসলিম নারীদের উপরও গভীর প্রভাব ফেলেছে। নারীদের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিকে বাইরের দুনিয়া সাধারণত এই জায়গা থেকেই দেখে থাকে। ক্যারেন আর্মস্ট্রং এ ব্যাপারে বলেন,

কাপড় দিয়ে ঢেকে চলাফেরা করার একটি নিদের্শ মহানবীর স্ত্রীগণের প্রতি ছিলো। অবশ্য ঠিক কীভাবে ঢাকতে হবে, তা সুস্পষ্ট নয়। তবে এটুকু নিশ্চিত, এর মাধ্যমে তাঁদেরকে অন্যদের থেকে পৃথক করা হয়েছে। মদীনার তৎকালীন নাজুক পরিস্থিতির কারণেই এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিলো। কারণ, মদীনায় মোহাম্মদের (সা) শত্রুরা তাঁর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে তাঁর স্ত্রীদের নানান ব্যক্তিগত বিষয়কে ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করতে চাচ্ছিলো। তাই এক ধরনের পৃথকীকরণ প্রয়োজন ছিলো। বলাবাহুল্য, এই নির্দেশ অন্য নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

ইসলামের সমালোচকদের দাবি, নারীদের প্রতি ইসলামের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক হলো এই ধরনের পর্দা ব্যবস্থা। ইসলাম যে নারীদেরকে দমিয়ে রাখতে চায়, এর মাধ্যমে সেই আকাঙ্খারই প্রকাশ ঘটে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মোহাম্মদের (সা) মৃত্যুর পর প্রায় শতাধিক বছর পর্যন্ত ইসলামী রীতি হিসেবে এই ধরনের সার্বজনীন পর্দাব্যবস্থার প্রচলন ছিলো না। প্রিন্সেস বাদিয়া বিনতে আল হাসান এই ব্যাপারে বলেন,

নারী-পুরুষ যেন শালীনতা বজায় রেখে চলাফেরা করে, সে ব্যাপারে ধর্ম কনসার্ন থাকে। কিন্তু ঠিক কতটুকু হলে শালীনতার শর্ত পূরণ হবে, তা উন্মুক্ত আলোচনার বিষয়। হিজাব পরিধান না করা সত্ত্বেও একজন মুসলিম হিসেবে আমি কম্প্রোমাইজ করে চলছি, এমনটি মনে করি না। এমনকি ভবিষ্যতেও আমি হিজাব পরবো না। কারণ আমি নিজেই বলি যে, আমি নিষ্ঠাবান মুসলমান নই। পোশাক-আশাক দেখে কারো ঈমানের নিষ্ঠা বা গভীরতা যাচাই করা যায় না।

ব্রিটেনসহ পাশ্চাত্যের অনেক দেশে গত প্রায় দুই দশক ধরে হিজাব হয়ে উঠেছে অধিকাংশ মুসলিম নারীর আত্মপরিচয়ের প্রতীক। কেউ হয়তো শুধু চুল ঢাকেন, অন্যরা পুরো মুখমণ্ডলই ঢাকেন। যা হোক, পাশ্চাত্যে হিজাব এখন একটি বিতর্কিত বিষয়। কোনো কোনো ইউরোপীয় দেশ ইতোমধ্যে হিজাব পরিধান নিষিদ্ধ করেছে। মুসলিম নারীদের নিয়ে লেখালেখি করেন ফাতিমা বরকতুল্লাহ। তাঁর সাথে হিজাব প্রসঙ্গে আমার নিম্নোক্ত কথাবার্তা হয়েছে –

– ফাতিমা, আপনি তো হিজাব পরিধান করেন। এটি কি আপনার পারিবারিক বাধ্যবাধকতা, নাকি নিজের ইচ্ছা থেকেই?

– সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছা থেকে আমি হিজাব করি আমার আধ্যাত্মিক পথচলার সাথে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে আল্লাহর কাছে নৈতিক দিক থেকে নিজেকে উন্নততর হিসেবে তুলে ধরার ইচ্ছা থেকে আমি হিজাব করি শরীর ঢাকার জন্য বোরকা পরাটা আমার কাছে সকালে বাইরে বেরুনোর প্রস্তুতি হিসেবে জিন্স বা অন্য কোনো পোশাক পরার মতোই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার

– এটি তো মূলত এক ধরনের গাউন। তাই না?

– হ্যাঁ, এটি একটি বাড়তি পোশাক একে আবায়া বা জিলবাব বলা হয় এটি পরিধানের পর আমি খিমার তথা স্কার্ফ দিয়ে মাথা ঢাকি তারপর আমি একটি ছোট্ট নেকাব পরিধান করি এভাবেই আমি বাইরে যাই

– অনেক মুসলিম নারীই তো শুধু মাথা ঢাকার জন্য খিমার তথা স্কার্ফ পরিধান করেন। আপনি কেন তা না করে পুরো মুখমণ্ডল ঢাকেন?

– আমি মনে করি, আরো বেশি শালীনতা মেনে চলাফেরা করা আমার পক্ষে সম্ভব এটি আরো বেশি সওয়াবের কাজ তাই আমি আসলে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই এভাবে চলি

– এই ব্যাপারটি কোত্থেকে এসেছে? এটি কি কোরআনে আছে? এটি কি…

– হ্যাঁ, এটি আপনি কোরআনে পাবেন সূরা আহযাবের একটি আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, হে নবী! আপনার স্ত্রী, কন্যা এবং বিশ্বাসী নারীদের বলুন! তারা যখন বাইরে যায়, তখন যেন তাদের পরিধেয় কাপড়ের উপর আরেকটি বাড়তি কাপড় পরিধান করে নেয় এই ব্যাপারটি বুঝানোর জন্য আরবীতে জালাবীবপরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়েছে এর দুটি ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে

– একদম ঠিক বলেছেন। ব্যাখ্যার উপরই আসলে সবকিছু নির্ভর করছে। সাধারণ মুসলিম নারীদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে মুখ ঢাকতে হবে, এমন কোনো বিধান কোরআনের কোথাও বলা নেই। এ সংক্রান্ত প্রচলিত বিধানটি একটা ব্যাখ্যা মাত্র।

– হ্যাঁ, মুখমণ্ডল ঢাকার কথা যদি বলেন, তাহলে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে

ম্যারল ওয়েন ডেভিস এ প্রসঙ্গে বলেন,

পোশাকের ব্যাপারে সুনিদ্ষ্টিভাবে মাত্র একটি আয়াত রয়েছে, যেখানে দেহের উন্মুক্ত অংশগুলো ঢেকে রাখতে বলা হয়েছে। কালো প্যাকেটে নিজেকে ঢেকে রাখার কথা সেখানে বলা হয়নি। কিন্তু বর্তমানে মুসলিম নারীরা এই আয়াতকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করছে। মুসলিম পুরুষরাও অন্যান্য সমাজের এ সংক্রান্ত প্রথাগুলোকে ধর্মীয় ব্যাখ্যা আকারে সংযোজন করে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। এছাড়া আত্মপরিচয়ের রাজনীতিও এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে আমার অবস্থান হলো, প্রচলিত পর্দাপ্রথার কোনো বাধ্যবাধকতা যদিও নেই, তারপরও এটি পরিধান করা বা না করার স্বাধীনতা নারীদের থাকা উচিত।

কোরাইশ নিয়ন্ত্রিত কাবায় হজ করার ঘোষণা

মোহাম্মদের (সা) বিরোধীরা বহুবিবাহকে কেন্দ্র করে তাঁর মর্যাদাহানীর সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তা সত্ত্বেও তিনি এই বিয়েগুলোকে আরবে তাঁর ক্ষমতা নিশ্চিত করা এবং তা আরো বিস্তৃত করতে কাজে লাগিয়েছেন। এরপর তিনি পুনরায় মক্কার দিকে মনোযোগ দেয়ার ফুরসত পেলেন। ফলে তিনি বার্ষিক হজ পালনের জন্য মক্কায় অবস্থিত কাবাঘরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে অনুসারীদেরকে নির্দেশ দিলেন। এটি ৬২৮ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকের ঘটনা।

মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর অনুসারীদের কাছে কাবা ছিলো ইবাদতের কেন্দ্র। কাবার দিকে ফিরেই তাঁরা নামাজ আদায় করেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন, সর্বপ্রথম কাবা তৈরি করেছিলেন নবী ইবরাহীম (আ)। তাঁদের কাছে এই ঘরটি আল্লাহর একত্ববাদ তথা তাওহীদী বিশ্বাসের চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু কাবা ঘরে প্রবেশের নিয়ন্ত্রণ ছিলো মক্কার শাসকগোষ্ঠী তথা মোহাম্মদের (সা) শত্রু কোরাইশদের হাতে। আরবের গোত্রগুলোর পূজনীয় শত শত দেবদেবীর মূর্তি কাবাঘরে রক্ষিত ছিলো। তিনি এবার সেই পবিত্র ঘরের উপর কোরাইশদের নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

মহানবী ঘোষণা করলেন, তিনি হজ করতে যাচ্ছেন। এই ঘোষণায় সবাই হতবিহ্ববল হয়ে পড়েছিলো। কারণ, হজে কোনো প্রকার অস্ত্র সাথে রাখা নিষিদ্ধ। আর এই নিরস্ত্র অবস্থায় তিনি যেতে চাচ্ছেন শত্রুর ডেরায়!

বারনাবি রজারসন এ ব্যাপারে বলেন,

এই ঘটনায় আপনি আবারো ব্যক্তি মোহাম্মদের জাদুকরি প্রতিভার ছোঁয়া পাবেন। এতোদিন তিনি যুদ্ধে নিয়োজিত ছিলেন। এবার তিনি বললেন, যথেষ্ট হয়েছে, আমরা এবার আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করবো।

হোদায়বিয়ার সন্ধি

মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাথীদের কাফেলা মক্কা থেকে আট মাইল দূরে হুদায়বিয়ায় থেমে যেতে বাধ্য হলো। কারণ, কোরাইশরা তাদের চিরাচরিত আগ্রাসী প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিলো। মুসলিম কাফেলার অগ্রগতি রুখতে তারা একদল অশ্বারোহীকে পাঠালো। এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডার পর উভয় পক্ষ অবশেষে একটি সমঝোতাপত্রে স্বাক্ষর করে। এটি হুদায়বিয়ার সন্ধি নামে পরিচিত। ঐতিহাসিক এই ঘটনার স্মারক হিসেবে সেই স্থানটিতে বর্তমানে একটি মসজিদ রয়েছে।

আপাতদৃষ্টিতে সন্ধির বিষয়বস্তু মোহাম্মদের (সা) জন্য ছিলো অত্যন্ত অপমানজনক। কোরাইশদের শর্তানুযায়ী, মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাথীদেরকে এবার হজ না করেই মদীনায় ফিরে যেতে হবে। মক্কার বাণিজ্য কাফেলাগুলোর উপর মুসলিম বাহিনীর আক্রমণ বন্ধ করতে হবে। এসব কিছুর বিনিময়ে মুসলমানরা মক্কায় গিয়ে হজ করতে পারবে। তবে এ বছর নয়, আগামী বছর। এ সকল কথাবার্তা চূড়ান্ত হওয়ার পর সন্ধিপত্র স্বাক্ষর করার জন্য যখন নিয়ে আসা হলো, তখন দেখা গেলো তাতে মোহাম্মদকে (সা) ‘আল্লাহর রাসূল’ হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়েছে। কোরাইশ প্রতিনিধি এতে আপত্তি জানিয়ে বললো, তাদের কাছে তিনি শুধুই আব্দুল্লাহর পুত্র মোহাম্মদ। মোহাম্মদের (সা) অনুসারীদের কাছে এটি ছিলো চরম অপমান। মুসলিম বর্ণনা মতে, মোহাম্মদের (সা) তরুণ চাচাতো ভাই আলী (রা) ‘আল্লাহর রাসূল’ অংশটুকু কেটে দিতে অস্বীকার করলেন। উল্লেখ্য, সন্ধিপত্রের চূড়ান্ত সংস্করণ তিনিই লিখেছিলেন। ক্যারেন আর্মস্ট্রং ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন,

তখন মোহাম্মদ বললেন, আমাকে একটা কলম দাও, আর কোথায় ‘আল্লাহর রাসূল’ লেখা রয়েছে, তা দেখিয়ে দাও। তারপর তিনি নিজে সে অংশটুকু কেটে দিলেন। আমি মনে করি, অধিকারের জায়গা থেকে নয়, বরং অহংকারবশতই কোরাইশরা  এই অংশটুকু কেটে দিতে বাধ্য করেছে। তাছাড়া কোরআনে বলা হয়েছে, শত্রুপক্ষ যদি শান্তির আহ্বান জানায়, তাহলে অবশ্যই তাৎক্ষণিকভাবে অস্ত্র সংবরণ করতে হবে। তারপর শান্তির স্বার্থে যে কোনো শর্তে রাজি হতে হবে, তা যতই অসুবিধাজনক হোক না কেন।

মোহাম্মদের (সা) অনুসারীদের দৃষ্টিতে চুক্তির শর্তাবলি এবং চুক্তি সম্পাদন প্রক্রিয়া ছিলো মুসলমানদের জন্য নিতান্তই অবমাননাকর। তবে মোহাম্মদের (সা) দৃঢ় মনোভাবের কারণেই তাঁরা কোনো প্রতিবাদ করেনি। যদিও মুসলমানদের এ ধরনের প্রতিক্রিয়া খুব স্বাভাবিক ছিলো। কারণ, তিনি যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, সপ্তম শতাব্দীর আরবে এ ধরনের কিছু করার কথা আগে কেউ কখনো শুনেনি। আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য যুগের পর যুগ, বংশ পরম্পরায় লড়াই করে যাওয়াই ছিলো তখনকার সমাজের প্রচলিত প্রথা। কিন্তু কয়েক বছরের অমীমাংসিত রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলার পর মোহাম্মদ (সা) এবার তাঁর শত্রুদেরকে যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তির বার্তা দিয়ে বশ করতে চাইলেন। কোরাইশদের সাথে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে তিনি শুধু কাবা ঘরে প্রবেশের সুযোগই লাভ করলেন, তা নয়; বরং তিনি যে তাদের সমমর্যাদার প্রতিপক্ষ, অতি গুরুত্বপূর্ণ এই স্বীকৃতিটাও আদায় করে নিলেন। অধ্যাপক সাজ্জাদ রিজভী এ ব্যাপারে বলেন,

এক দিক থেকে হুদায়বিয়ার সন্ধি ছিলো অত্যন্ত সামান্য একটি অর্জন। কারণ, আমাদের ইচ্ছানুযায়ী এখনই আমরা কাবায় যেতে পারছি না। তবে চুক্তিটি করলে ভবিষ্যতে সেখানে যেতে পারবো। জানা কথা হলো, যুদ্ধের চেয়ে সমঝোতা উত্তম। আমরা জানি, কোরআনেও বার বার বলা হয়েছে, যুদ্ধের চেয়ে শান্তি উত্তম। সেই হিসেবে চুক্তিটি কোরআনের এই মূলনীতির সাথে পুরোপুরি মিলে গেছে।

মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাথীরা মদীনায় ফিরে আসার পর পরই একটি নতুন ওহী নাজিল হয়। হুদায়বিয়ার সন্ধি যে কোনো অবমাননাকর পরাজয় নয়, ওহীর মাধ্যমে তা আশ্বস্ত করা হয়েছে। ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

তিনি বললেন, “মাত্রই একটি ওহী নাজিল হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, আপাতদৃষ্টিতে একে পরাজয় মনে হলেও এটি একটি সুস্পষ্ট বিজয়।” কোরাইশরা পুরানো গোত্রীয় ধ্যানধারণা তথা হিংস্রতা, ঘৃণা-বিদ্বেষ ও গর্ব-অহংকার ইত্যাদির মধ্যে নিমজ্জিত ছিলো। অন্যদিকে, মুসলমানদের হৃদয় ছিলো শান্তির মর্মবাণীতে পরিপূর্ণ। যা প্রায় সময়ই আমরা ভুলে যাই। মোহাম্মদ কতগুলো যুদ্ধ করেছেন, আমরা সাধারণত এসব বিষয় শুনে থাকি। কিন্তু তাঁর এই অসামান্য, অহিংস আত্মরক্ষামূলক দিকটির কথা আমরা ভুলে যাই। হুদাইবিয়ার ঘটনার পর পরিস্থিতি তাঁর অহিংস আন্দোলনের অনুকূলে চলে আসে।

অধ্যাপক জন এসপোজিটো বলেন,

যুদ্ধংদেহী পরিবেশে থেকেও মোহাম্মদ কূটনীতিকে অন্যতম প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন গোত্রের কাছে গিয়েছেন, শীর্ষ ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলেছেন, তাদের সাথে সমঝোতা চুক্তিতে আসার চেষ্টা করেছেন। তৎকালীন মদীনার সমাজের দিকে খেয়াল করলে আপনি দেখবেন, ভিন্ন বিশ্বাস ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের জন্য সেখানে জায়গা ছিলো। তবে কোনো আগ্রাসন বা প্রতিরোধের মুখে পরিবেশ ও পরিস্থিতির আলোকে যা করণীয়, তিনি তা-ই করেছেন। আমার কাছে ব্যাপারটা একদম পরিষ্কার। মহানবীর পক্ষ হতে বিরোধীদেরকে পাইকারিভাবে হত্যা করার আহ্বান জানানোর কোনো নজির আপনি খুঁজে পাবেন না।

পুরো আরব জুড়ে মোহাম্মদ (সা) তাঁর বাণী ছড়িয়ে দেয়ার যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন, হুদায়বিয়ার সন্ধি ছিলো এর একটি অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে প্রতিপক্ষের চরম অপমান সহ্য করার প্রস্তুতিও যে তাঁর ছিলো, এ ঘটনা থেকে সেটি বুঝা যায়। অথচ বর্তমান দুনিয়ায় মোহাম্মদকে (সা) অনেকেই শান্তির শত্রু বিবেচনা করে। তারা মনে করে, ইসলাম হলো জিহাদের ধর্ম। এক্ষেত্রে জিহাদ বলতে তারা ধর্মযুদ্ধকেই বুঝে থাকে।

জিহাদ কি ধর্মযুদ্ধ?

জিহাদী বলে পরিচিত গোষ্ঠীগুলোর হাতে দুনিয়া জুড়ে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে। অথচ মোহাম্মদের (সা) সময় জিহাদী হিসেবে কেউ পরিচিত ছিলো না। জিহাদী গোষ্ঠীগুলো দাবি করে, কোরআন এবং স্বয়ং মোহাম্মদ (সা) তাদের কাজের বৈধতা ও অনুপ্রেরণার উৎস। যেমন, ২০০৫ সালের ৭ জুলাই লন্ডনে বোমা হামলাকারীদের অন্যতম মোহাম্মদ সিদ্দিক খান এক ভিডিও বার্তায় বলেছিলেন, “প্রিয় নবী এবং তাঁর প্রিয় সাহাবীদের হৃদয়ে জিহাদ এবং শাহাদাতের তামান্না যে গভীরভাবে প্রোথিত ছিলো, তা সহজেই বুঝা যায়।”

তথাকথিত জিহাদীদের বেশিরভাগই তাদের সহিংস কার্যক্রমের বৈধতার জন্য সাধারণত কোরআনের একটি আয়াত ব্যবহার করে, যা কারো  কারো কাছে ‘তলোয়ারের আয়াত’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। অধ্যাপক তারিক রমাদান এ সম্পর্কে বলেন,

হ্যাঁ, কোরআনে আপনি এ জাতীয় আয়াত পাবেন। এগুলো যে যুদ্ধ ও সংঘাত সম্পর্কিত আয়াত, তা কেউই অস্বীকার করতে পারবে না। কিন্তু এই কালে এসে আমাদেরকে কোরআন নামক একটি কালোত্তীর্ণ গ্রন্থকে পাঠ করতে হবে তৎকালীন ইতিহাসের আলোকে। এই আয়াতগুলো নাজিল হয়েছিলো সুনির্দিষ্ট একটি সময়কালে। মুসলমানরা তখন নির্যাতন সহ্য করছিলো, প্রতিরোধের চেষ্টা করছিলো। টিকে থাকাটাই তখন একটা চ্যালেঞ্জ ছিলো। এই প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় নিতে হবে। শিয়া-সুন্নী উভয় পক্ষের মূলধারার আলেমরা মনে করেন, নিরীহ মানুষদেরকে হত্যা করা এবং যুদ্ধ-সংঘাত উসকে দেয়ার জন্য এই আয়াতগুলো ব্যবহার করা যাবে না। এটি সম্পূর্ণ অন্যায়।

কোরআনের আয়াতের বিচ্ছিন্ন ব্যাখ্যা এ জাতীয় বিতর্কের মূল কারণ। জিহাদ পরিভাষাটির অর্থ যে ধর্মযুদ্ধ নয়, সে ব্যাপারে অধিকাংশ স্কলারই একমত। তাদের মতে, এর প্রকৃত অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। অধ্যাপক রিচার্ড বোনি এ ব্যাপারে বলেন, 

জিহাদের ধারণাটি কোরআন থেকেই এসেছে। মহানবী ওহীর নির্দেশ আকারে এটি লাভ করেছিলেন। কোরআনে ‘জিহাদ’ শব্দটি রয়েছে প্রায় ৩৫ বার। প্রায় সবক্ষেত্রেই এটি চূড়ান্ত কর্মপ্রচেষ্টা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যে কোনো ধরনের ইতিবাচক কর্মপ্রচেষ্টার ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য হতে পারে। হতে পারে তা ব্যক্তির আত্মসংশোধনের ব্যাপার। হতে পারে মন্দ পরিহার করে সৎকর্ম সাধনের চেষ্টা। যুদ্ধ বুঝাতেও ব্যবহৃত হতে পারে। যদিও জিহাদ আর যুদ্ধ সমার্থক নয়। যুদ্ধ বুঝানোর জন্য ভিন্ন আরেকটি পরিভাষা (‘কিতাল’) ব্যবহৃত হয়েছে।

মোহাম্মদ (সা) যতগুলো যুদ্ধ করেছেন, তৎকালীন প্রেক্ষাপটে এর প্রত্যেকটির পেছনেই সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য কারণ ছিলো। এতোগুলো যুদ্ধে জড়ানোর পরও বেসামরিক লোকদের উপর আক্রমণের কোনো নজির তাঁর জীবনে নেই। অধ্যাপক রিচার্ড বোনি বলেন,

জিহাদ সম্পর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, মহানবীর জীবদ্দশায় এবং পরবর্তীতে ইসলামের প্রাথমিক যুগে ক্রমেই এটি একটি ন্যায়যুদ্ধের ধারণা হিসেবে বিকাশ লাভ করেছে। ন্যায়যুদ্ধ বলতে সেনাবাহিনীকে একটি নীতিমালা মেনে চলতে বাধ্য করা, যেমন– বেসামরিক লোকদের উপর আক্রমণ বা তাদেরকে হত্যা করা যাবে না, নারী ও শিশুদেরকে হত্যা করা যাবে না, কোনোভাবেই অন্য ধর্মের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে হত্যা করা যাবে না ইত্যাদি।

যুদ্ধে অংশগ্রহণের এইসব মূলনীতি এখনকার মুসলিম চরমপন্থীদের মধ্যে দেখা যায় না। আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীরা শুধু পাশ্চাত্যের নাগরিকদেরই হত্যা করছে না, মুসলিম বিশ্বের মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোতে পর্যন্ত হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যা করছে। বর্তমানে ব্রিটেনের কোনো মুসলিম অ্যাক্টিভিস্ট বা গ্রুপই সহিংস পথে গিয়ে বিদ্যমান আইনকে অমান্য করতে চাইবে না। তৎসত্ত্বেও, গত ১০ বছরে দুই শতাধিক মুসলিম সন্ত্রাসমূলক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। এমনই একজন হলেন ব্রিটিশ মুসলিম আব্দুল মুহিত। সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অর্থায়নের অভিযোগে ২০০৮ সালে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে দুই বছরের জেল দেয়া হয়। আরেকজন হলেন মিজানুর রহমান। হত্যাপ্রচেষ্টার অভিযোগে ২০০৬ সালে তার চার বছরের জেল হয়। দুজনই ইতোমধ্যে তাদের সাজা ভোগ করেছেন। এদের সাথে আমি কথা বলেছি। এখনো তারা বর্তমান দুনিয়ায় জিহাদের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দৃঢ় মতামত পোষণ করেন।

– বর্তমানে জিহাদের ব্যাখ্যার কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি? কারণ, বেশিরভাগ মানুষের কাছেই এখন জিহাদ মানে নিছক যুদ্ধ বা লড়াই-সংগ্রাম নয়। এর নানান অর্থ তাদের কাছে রয়েছে।

– মিজানুর রহমান: জিহাদ মানে অমুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করা এ ব্যাপারে অতীতের আলেমদের সবাই একমত হ্যাঁ, তাদেরকে নিছক জোরপূর্বক মুসলমান বানানোর জন্য জিহাদ করা যাবে না তবে শরীয়াহ কায়েমের পথে সকল বাধা দূর করে আল্লাহর বাণীকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার জন্য জিহাদ করতে হবে দুনিয়া জুড়ে ইসলামের দাওয়াতকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যও জিহাদ করতে হবে

– জিহাদের নামে যে কোনো পরিস্থিতিতে নিরস্ত্র মানুষের উপর হামলা চালানো কি অনুমোদনযোগ্য? মহানবীর (সা) কর্মময় জীবন সম্পর্কে আপনার বুঝজ্ঞান এ সম্পর্কে কী বলে?

– আব্দুল মুহিত: একদম সোজা কথায় ইসলামী সন্ত্রাসবাদীদের যুক্তি হলো, আপনি যদি আপনার প্রতিনিধি হিসেবে একটি সরকারকে নির্বাচিত করেন এবং তারা যদি অন্য একটা দেশে বোমা হামলা কিংবা মানুষ মারার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তার দায় আপনার কাঁধেই এসে পড়ে এটি কাউকে খুন করার জন্য একজন খুনী ভাড়া করার মতোই একটি ব্যাপার এই খুনের জন্য শুধু খুনি নিজেই দায়ী নয়, আমার উপরও এর দায় এসে পড়ে অতএব, এইসব নিরস্ত্র লোকগুলোই কিন্তু এমন এক সরকারকে ভোট দিয়েছে, যারা অন্যায়-অপরাধ করে ফলে এই ভোটদাতাদেরও দায় আছে ইসলামী সন্ত্রাসবাদীদের দৃষ্টিতে তারা অবশ্যই অপরাধী

মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষ সবার নিকটই জিহাদের এই ধারণা ঘৃণ্য একটি ব্যাপার। জিহাদের এ ধরনের ব্যাখ্যা স্বয়ং মোহাম্মদেরও (সা) জানা ছিলো না। তাঁর কাছে জিহাদ মানে নিছক যুদ্ধ করে মানুষ মারার ব্যাপার ছিলো না। তখন জিহাদ ছিলো আল্লাহর কাছে নিজেকে উন্নত মানুষ হিসেবে তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা। ইসলামে আছে ন্যায়যুদ্ধের ধারণা। মোহাম্মদ (সা) নিজেও অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু তিনি কখনোই নিরপরাধ মানুষ হত্যার করার জন্য যুক্তি দাঁড় করাননি। আজমল মাসরুর এ প্রসঙ্গে বলেন,

যুদ্ধ ও আত্মরক্ষা সংক্রান্ত কোরআনের যে আয়াত রয়েছে, সেগুলো আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে নিজেকে এবং অন্যান্যদেরকে হত্যা করার বৈধতা দেয় না। মনে রাখা দরকার, ইসলাম যুদ্ধের অযুহাতে বেসামরিক জানমাল ধ্বংস করাকে অনুমোদন করে না। চরমপন্থীরা হত্যার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট কিছু লোকের উপর পরিকল্পিতভাবে বোমা হামলা করে। কিন্তু এর ফলে শুধু তারাই নয়, টার্গেটের বাইরে অন্যান্য মানুষও নিহত হয়। একে বলা হয় কোল্যাটারাল ড্যামেজ। এর কোনোটাই ইসলামে মোটেও অনুমোদিত নয়।

মক্কায় প্রবেশ

যা হোক, মোহাম্মদের (সা) শান্তিপূর্ণ জিহাদ এতদিনে সফলতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হলো। যেখানে তিনি জন্মেছিলেন, সাত বছর আগে জীবন বাঁচাতে খালি হাতে যে শহর ত্যাগ করে তিনি অভিবাসী হয়েছিলেন, হুদায়বিয়ার চুক্তির ফলে তিনি এবার সেই নগরীটিতে ফিরে যেতে পারছেন। একটি ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় সমাজের প্রধান এবং আরবের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা হিসেবে তিনি মক্কায় ফিরছেন।

কাবা পরিদর্শনের জন্য মক্কায় প্রবেশের ব্যাপারে ৬২৯ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে কোরাইশরা মুসলমানদেরকে সম্মতি প্রদান করে। মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাথীদেরকে তিনদিন অবস্থান করার অনুমতি দেয়া হয়। তবে এ স্বল্প সময়ের মধ্যেই মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাথীদের ব্যাপারে লোকজনের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। মক্কার লোকেরা মুসলমানদেরকে কাবায় প্রবেশ করতে দেখেছে, তাদের চমৎকার ও আন্তরিক ব্যবহার খেয়াল করেছে। মুসলমানদের সুন্দর আচরণ মক্কায় কোরাইশদের দুঃসহ শাসনের ইতি ঘটাতে  কিছুটা হলেও যে ভূমিকা রেখেছিলো, তা নিশ্চিত। তাই এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার।

মক্কা বিজয়

এক বছর পর কোরাইশরা মোহাম্মদের (সা) মিত্র একটি গোত্রের উপর হামলা করার মাধ্যমে চুক্তি ভঙ্গ করলো। এটা ছিলো কোরাইশদের চরম ভুল। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে মহানবী (সা) ১০ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে মার্চ করলেন। এই বাহিনী মোকাবেলার সাধ্য কোরাইশদের ছিলো না। তারা ধরেই নিয়েছিলো, মোহাম্মদ (সা) মক্কায় প্রচণ্ড তাণ্ডব চালাবেন, বহু বছরের নির্যাতন ও যুদ্ধবিগ্রহের রক্তাক্ত প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। নগরীর উপর কোরাইশরা তাদের নিয়ন্ত্রণ হারালো। তবে চূড়ান্ত বিজয়ের মুহূর্তে মহানবীর (সা) ভূমিকায় মক্কার লোকেরা অভিভূত হয়ে পড়লো। মোহাম্মদ (সা) ঘোষণা করলেন, শত্রুদের সকলকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। কাউকেই ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা যাবে না বলে তাঁর সাথীদেরকেও সতর্ক করে দিলেন। প্রতিশোধ গ্রহণের পরিবর্তে তিনি সচেতনভাবেই বিরোধ  মীমাংসার এই পথ বেছে নিয়েছিলেন। অধ্যাপক সাজ্জাদ রিজভী বলেন,

মক্কা বিজয় ছিলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার। কারণ, এ বিজয়ের পর অভাবনীয়ভাবে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছিলো। লোকদের জন্য ইসলাম গ্রহণ করা বা না করা, কিংবা অন্য কোথাও চলে যাওয়া, মোটকথা নিজের ব্যাপারে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ তাদের ছিলো। এই বিজয়ের আরেকটি তাৎপর্য রয়েছে। সেটা হলো, বিজয়ের পর মক্কা হয়ে ওঠলো নতুন বিশ্বাসব্যবস্থার কেন্দ্র। এর মাধ্যমে মহানবীর (সা) মিশনের প্রথম ধাপটি নিশ্চিতভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। ফলে সংঘাতের আর কোনো প্রয়োজনই ছিলো না।

এই সময়টির জন্যই মোহাম্মদ (সা) অপেক্ষায় ছিলেন। কোরাইশদেরকে হত্যা করতে তিনি মক্কায় ফিরে আসেননি। এক আল্লাহর পবিত্র ঘর হিসেবে কাবার মর্যাদাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতেই তিনি মক্কায় ফিরে এসেছিলেন। মুসলিম বর্ণনা মতে, তিনি ও তাঁর হাজারো অনুসারী কাবায় কাবায় প্রবেশ করে অসংখ্য দেবদেবীর মূর্তি-প্রতিমূর্তি ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। মক্কা বিজয় সম্পর্কে বারনাবি রজারসন বলেন,

তিনি শুধু তাদেরকে ক্ষমাই করেননি। তাদের প্রতি যথেষ্ট উদারতাও দেখিয়েছেন। শত্রুতার বিনিময়ে তিনি তাদেরকে দিয়েছেন উপহার। এমনকি যেসব গোত্রীয় সর্দার তাঁর বিরোধিতাও করেনি, আবার তাঁর বাণী গ্রহণও করেনি; তারাও মোহাম্মদের (সা) কাছে উট, বিভিন্ন গবাধি পশু, রৌপ্য ইত্যাদি পাওয়ার আশা করছিলো। তিনিও তাদেরকে সেসব দিয়েছিলেন। এটি ছিলো ন্যায়ের অসাধারণ এক দৃষ্টান্ত।

ম্যারল ওয়েন ডেভিস এ ব্যাপারে বলেন,

আমার মনে হয়, এই ঘটনাটি মহানবীর (সা) জীবনের মূল শিক্ষা। মহানবীর (সা) জীবনকে আমি যতটুকু জেনেছি বা বুঝেছি, সে আলোকে বলতে পারি, এটি ছিলো তাঁর সমগ্র জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত। তিনি প্রতিহিংসাপরায়ণ ছিলেন না। প্রতিশোধ নয়, বরং ব্যাপক সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সকলকে নিয়ে একটি নতুন সমাজ গড়ে তোলাই ছিলো তাঁর দাওয়াতের মূল কথা। তাই আমরা যে ধরনের সমাজ গড়ে তুলতে চাই, সে ধরনের সমাজের মডেল হিসেবে তাঁর মক্কায় প্রত্যাবর্তনের মুহূর্তটিকেই আমার কাছে সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে হয়।

ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

অবশেষে তিনি ঘরে ফিরে গেলেন। তবে বর্তমানে ইসলামী রাষ্ট্রে যেসব বিষয় বাধ্যতামূলক বলে আমরা মনে করি, তেমন কোনো কিছুই তিনি সেখানে চাপিয়ে দেননি। এ কারণেই তখনকার মতাদর্শিক গোঁড়ামী নিয়ে কেউ কোনো কথা বলে না। যে গোত্রবাদ লোকদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা তৈরি করে রেখেছিলো, মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তার অবসান ঘটার প্রসঙ্গটিই বরং আলোচনার প্রতিপাদ্য বিষয়।

মক্কা নগরী মোহাম্মদের (সা) নিয়ন্ত্রণে থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর জন্মভূমিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি বরং মদীনায় ফিরে গিয়েছিলেন। কোরাইশদের পরাজিত করার কিছুদিনের মধ্যেই আরবের বাদবাকি গোত্রগুলো তাঁর সাথে যোগ দিয়েছিলো।

রক্তপাতহীনভাবে মক্কা বিজয়ের ঘটনা থেকে স্পষ্টত বুঝা যাচ্ছিলো, মোহাম্মদের (সা) আন্দোলন সফল হতে চলেছে। উপরন্তু, তাঁর ন্যায়বিচারের বাণী এবং এই বাণী প্রচারের ক্ষেত্রে শান্তি ও বিরোধ মীমাংসাকে অগ্রাধিকার দেয়ায় অসংখ্য মানুষ তা গ্রহণ করতে শুরু করে। এমনকি, পুরো গোত্র একসাথে ইসলাম গ্রহণের ঘটনাও ঘটতে থাকে। ৬৩১ খ্রিষ্টাব্দে পৌত্তলিকদের সর্বশেষ ঘাঁটি তায়েফেরও পতন ঘটে। ফলে মোহাম্মদ (সা) এবার সত্যিকার অর্থে সমগ্র মুসলিম আরবের শাসক হয়ে ওঠলেন।

ইতোমধ্যে মহানবীর (সা) নবুয়তের ২০ বছর পার হয়ে গেছে। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ও তাঁর অনুসারীগণ নিরাপত্তাহীন এক অনিশ্চিত জীবন পার করেছেন। দিনকে দিন তাঁরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু মোহাম্মদের (সা) আধ্যাত্মিক, সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অসামান্য দক্ষতার কারণে খাদের কিনারা থেকে তাঁরা ফিরে আসতে পেরেছিলেন। অবশেষে আপাতদৃষ্টিতে অপমানজনক একটি চুক্তি স্বাক্ষরের (হুদাইবিয়ার সন্ধি) পর তাঁরা শত্রুদের উপর বিজয়ী হন। মহানবীর (সা) নেতৃতৃগুণ নিয়ে জন আডায়ার বলেন,

একজন ভালো নেতার মধ্যে আমরা এখন যেসব গুণাবলি দেখি, তার সবকটিই মোহাম্মদের মধ্যে ছিলো। তাই তিনি আজ পর্যন্ত উদাহরণ হয়ে আছেন। একজন ভালো নেতা মানে, কাজের প্রতি একাগ্রতা থাকবে, চারিত্রিক সুষমা বজায় থাকবে। যে কোনো নেতার মধ্যে কঠোরতা, একাগ্রতা এবং ন্যায়পরায়ণতার সমন্বয় থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। মোহাম্মদের মধ্যে এইসবগুলো গুণই সুস্পষ্টভাবে ছিলো। আমার মতে, আন্তরিকতা, মানবতাবোধ ও দয়ামায়া থাকাটাও গুরুত্বপূর্ণ। মোহাম্মদের জীবনের দিকে তাকালে আমরা দেখবো, তিনি ছিলেন এইসব মানবিক গুণাবলির প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

মোহাম্মদ (সা) যা যা চেয়েছিলেন, ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ তার প্রায় সবই তিনি অর্জন করতে পেরেছিলেন। তিনি আরবে একটি পর্যায় পর্যন্ত শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। যা সেখানে খুবই দুর্লভ ব্যাপার ছিলো। তিনি ইসলামের ভিত্তি ও আইনকানুনগুলো প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। একটি নতুন মুসলিম সমাজের ভিত্তিও তিনি গড়ে গেছেন। এসব করতে করতে তিনি একজন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধে পরিণত হয়ে পড়লেন। ক্রমে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। সে বছরই তিনি শেষবারের মতো মক্কায় আসেন এবং প্রথম ও শেষবারের মতো হজ পালন করেন। হজে আগত হাজীদের উদ্দেশ্যে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা ‘বিদায় হজের ভাষণ’ হিসেবে পরিচিত।

বিদায় হজের ভাষণ

আরাফাতের ময়দানে বিশাল জনসমুদ্রের উদ্দেশ্যে একটি উটের উপর বসে তিনি এই ভাষণ প্রদান করেছিলেন। তাঁর কথাগুলো সবার কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য পুরো ময়দান জুড়ে ঘোষক নিয়োজিত ছিলো। মহানবী (সা) নিজেই পরবর্তীতে বলেছেন, এটি ছিলো গভীর আবেগময়ী একটি ভাষণ। তিনি ও তাঁর অনুসারীগণ যা কিছু অর্জন করতে পেরেছেন বলে তিনি মনে করতেন, তার একটি সারসংক্ষেপ এই ভাষণে তিনি তুলে ধরেছিলেন।

হে জনমণ্ডলী! মনোযোগ দিয়ে শোনো। আগামীবার তোমাদের মাঝে ভাষণ দেয়ার জন্য আমি নাও থাকতে পারি। তাই যা বলছি, সতর্কতার সাথে তা শুনে রাখো। আজকে যারা এখানে উপস্থিত নেই, তাদের কাছে আমার কথাগুলো তোমরা পৌঁছে দিও।

– মহানবীর বিদায় হজের ভাষণ থেকে

এ ব্যাপারে আব্দুর রহীম গ্রীন বলেন,

বিদায় হজের ভাষণ পড়লে আপনি বুঝতে পারবেন, এটি ছিলো মুসলমানদের উদ্দেশ্যে মহানবীর (সা) হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে জানানো আহ্বান ও সতর্কবার্তা। মুসলমানদেরকে তিনি কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। মুসলমানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর উদ্বিগ্নতা আপনার চোখে পড়ার কথা। এই ভাষণ মুসলমানদেরকে গুরুত্ব সহকারে নেয়া উচিত এবং তা মেনে চলার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকা উচিত। কারণ, এতে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা রয়েছে।

নিজের দাসদাসীদের উপর অবিচার করো না। মনে রেখো, একদিন তোমাকে আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে এবং নিজ কৃতকর্ম সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। তাই সতর্ক হও। আমার মৃত্যুর পর তোমরা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ো না।

– মহানবীর বিদায় হজের ভাষণ থেকে

অধ্যাপক জন এসপোজিটো বিদায় হজের ভাষণ থেকে উদ্ধৃতি দেন,

মনে করে দেখো– আদম, ইবরাহীম, মুসা, ঈসাসহ রাসূলগণের প্রতি আল্লাহর সর্বপ্রথম বাণী কী ছিলো! একমাত্র পরম ও চূড়ান্ত সত্য হলো স্বয়ং এক আল্লাহ। তিনি হলেন সর্বস্রষ্টা, প্রতিপালক ও বিচার দিবসের মালিক।

সকল মানুষ এসেছে আদম ও হাওয়া থেকে। তাই অনারবদের উপর আরবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আরবদের উপরও অনারবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কালোদের উপর সাদাদের, কিংবা সাদাদের উপর কালোদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো খোদাভীরুতা ও সৎকর্ম।

– মহানবীর বিদায় হজের ভাষণ থেকে

ক্যারেন আর্মস্ট্রং বিদায় হজের ভাষণ সম্পর্কে বলেন,

তিনি বলেছেন, সকল মানুষ এক। আল্লাহ তোমাদেরকে পৌত্তলিক গোত্রতন্ত্র এবং বংশীয় গর্ব প্রদর্শনের পৌত্তলিক রীতি থেকে ফিরিয়ে এনেছেন। স্মরণ রেখো, সকল মানুষ এসেছে আদম থেকে এবং আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে ধূলিকণা থেকে। তারপর তিনি কোরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করেন, যা আমাদের সময়ের জন্য পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক – “হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে। তারপর আমি তোমাদেরকে বিভিন্ন গোত্র ও জাতিতে ভাগ করে দিয়েছি, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো।” পরস্পর যুদ্ধ-সংঘাত, নির্যাতন, দখলদারিত্ব, জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণ কিংবা সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানোর জন্য এই বিভাজন করা হয়নি। একে অপরকে জানার জন্যই মানবজাতিকে এভাবে ভাগ করা হয়েছে।

তোমরা যারা আমার কথা শুনছো, তারা অন্যদের কাছে এই কথাগুলো পৌঁছে দেবে। তারা আবার পৌঁছে দেবে আরো যারা শুনেনি, তাদের কাছে। তোমরা যারা সরাসরি আমার কথা শুনছো, তাদের চেয়ে পরবর্তী কেউ হয়তোবা আমার কথা আরো ভালোভাবে বুঝতে পারবে। হে আল্লাহ! সাক্ষী থেকো, আমি তোমার বান্দাদের কাছে তোমার বাণী পৌঁছে দিয়েছি।

– মহানবীর বিদায় হজের ভাষণ থেকে

ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

তারপর তিনি উপস্থিত জনসমুদ্রের কাছে জানতে চাইলেন, ‘হে লোকসকল! হে মুসলমানেরা! তোমাদের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব কি আমি পালন করতে পেরেছি?’ লোকেরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো, ‘নায়াম’, ‘হ্যাঁ, আপনি পেরেছেন।’ জনসমুদ্রের এই সাক্ষ্য ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলো। তিনি লোকদেরকে তিনবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি পেরেছি?’ প্রতিবারই তারা জবাব দিলো, ‘নায়াম’, ‘হ্যাঁ, আপনি পেরেছেন।’ আমার মতে, এটি ছিলো সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ও আবেগময় একটি মুহূর্ত।

জিয়াউদ্দীন সরদার বলেন,

এই ভাষণ ছিলো তাঁর সমগ্র জীবনের একটি সারসক্ষেপ। বিগত ২৩ বছরে তিনি যেসব শিক্ষা দিয়েছেন, এই ভাষণে সেসব মূলনীতির উপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন, আরব ও অনারবের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তারপর বলেছেন, নিজ পরিবারের দেখাশোনা করো। এগুলোই ছিলো তাঁর জীবনের শিক্ষা। আর কিছু না পড়লেও শুধু বিদায় হজের ভাষণও যদি আপনি পড়ে থাকেন, তাহলে মোহাম্মদের (সা) জীবনের সারনির্যাস আপনি পেয়ে যাবেন।

ম্যারল ওয়েন ডেভিস বলেন,

মহানবীর (সা) বিদায় হজের ভাষণ আধুনিক ও সমসাময়িক মুসলিম সমাজের কর্তব্য ঠিক করে দিয়েছে। কী করলে আমরা ব্যর্থ হয়ে পড়বো, ব্যর্থতা থেকে মুক্তির উপায়ই বা কী, এই ভাষণে এর দিকনির্দেশনা রয়েছে। এটি ছিলো মহানবীর (সা) সমাজ পরিবর্তনের মিশনের সারনির্যাস।

মহামানবের বিদায়

বিদায় হজের পর ক্লান্ত-শ্রান্ত মোহাম্মদ (সা) মদীনায় তাঁর ছোট্ট বাড়িতে ফিরে গেলেন। তখন থেকেই তাঁর মাথাব্যথা ও শারীরিক দুর্বলতা শুরু হয়। তারপরও তিনি মসজিদে হাজির হওয়ার চেষ্টা করতেন। কিন্তু দিন দিন তাঁর অসুস্থতা বেড়েই চলছিলো। ফলে তিনি প্রায়ই শয্যাশায়ী থাকতেন। আয়েশা (রা) তাঁর সেবা করতেন। হঠাৎ একদিন তিনি কিছুটা সুস্থবোধ করলেন। মুহূর্তেই খবরটি মদীনা জুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লো। কিন্তু খুব অল্প সময় পরই তিনি আবারো অসুস্থ্ হয়ে পড়েন।

তারপর একদিন তিনি আয়েশার (রা) ঘরে ইন্তেকাল করেন। দিনটি ছিলো ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জুন। খবরটি শুনে তাঁর সাহাবীরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। কেউ কেউ এই বাস্তবতা মেনে নিতে অস্বীকার করেন। তারা ভেবেই পাচ্ছিলেন না, আল্লাহর প্রেরিত একজন রাসূল কীভাবে মৃত্যুবরণ করতে পারেন! মহানবীর (সা) সবচেয়ে ঘনিষ্ট সাথী আবু বকর (রা) তখন তাঁদেরকে শান্ত করেন। তিনি তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন, আর দশজনের মতো মরনশীল মানুষের বাইরে মোহাম্মদ (সা) কখনোই নিজের ব্যাপারে ভিন্ন কিছু দাবি করেননি। আর মোহাম্মদের (সা) নয়, ইবাদত করতে হবে একমাত্র আল্লাহর– মহানবীর (সা) এই শিক্ষাও তিনি তাদেরকে মনে করিয়ে দেন। মসজিদে নববীর পাশেই তাঁকে কবর দেয়া হয়। তাঁর মুখমণ্ডলকে কাবার দিকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়। আজো মুসলমানরা মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই প্রথাটি মেনে চলেন।

শেষ কথা

পরবর্তী এক শতাব্দীর মধ্যে মোহাম্মদের (সা) বাণী গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এর বিস্তৃতি ছিলো প্রাচ্যের চায়না-ইন্ডিয়া, উত্তর আফ্রিকা এবং পাশ্চাত্যের স্পেন-ফ্রান্স পর্যন্ত। কিন্তু নানান কারণে তাঁর শান্তিপূর্ণ জিহাদের সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত বিচ্যুতির শিকার হয়। মোহাম্মদের (সা) মৃত্যুর এক প্রজন্মের মধ্যেই তাঁর ঘনিষ্ট অনুসারী ও পরিবারের সদস্যরা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তাঁরা প্রকাশ্য ও রক্তাক্ত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। এই দ্বন্দ্ব মুসলমানদের মধ্যে গভীর ক্ষত তৈরি করে, যা আজো মুসলিম বিশ্বে শিয়া-সুন্নী বিভাজন হিসেবে রয়ে গেছে।

কিন্তু মোহাম্মদের (সা) বাণী আগে কখনোই এখনকার মতো এ ধরনের হুমকিতে পড়েনি। অনেক মুসলমান পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি ও সামরিক প্রাধান্যকে নিজেদের জন্য অবমাননাকর মনে করে এবং তারা এর বিরোধিতা করে। অন্যদিকে, অনেক পাশ্চাত্যবাসীর কাছেও ইসলাম হলো দুনিয়ার সবচেয়ে নিষ্ঠুর, সহিংস ও অসহিষ্ণু ধর্ম। তর্কের খাতিরে তা ধরে নিলেও স্বয়ং মোহাম্মদকে (সা) এর জন্য কীভাবে দায়ী করা যায়?

মোহাম্মদ (সা) তিনটি জিনিস রেখে গেছেন– আল্লাহর উপর বিশ্বাস, তাঁর নিজের জীবনকর্ম এবং সর্বোপরি আল কোরআন।

কিন্তু অনেকে শুধু তাঁর জীবনের সেটুকুই তুলে ধরে, যেটুকু তার নিজের অবস্থানের পক্ষে যায়। ফলে তাঁর জীবনের বাকি অধ্যায় অজানাই থেকে যায়। কিন্তু আমরা তাঁর জীবনকে সামগ্রিকভাবে যাচাই করলে দেখবো, আরব বিশ্বকে তিনি চমৎকার একটি অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েও প্রতিরোধের পরিবর্তে তিনি তা সহ্য করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি অনেকগুলো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও, সম্ভব হলেই যুদ্ধ এড়িয়ে গিয়েছেন। শান্তিপূর্ণভাবে তাঁর জীবনের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়েছিলো। সেই বিজয়ের পর তিনি প্রতিশোধ গ্রহণের পরিবর্তে বিরোধ মীমাংসার পথই বেছে নিয়েছিলেন।

সর্বশেষ, বিদায় হজের ভাষণে মোহাম্মদ (সা) আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপদেশগুলো দিয়ে গেছেন। তিনি বলে গেছেন, আরব-অনারব, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে মানুষ হিসেবে আমরা সবাই সমান। এই সার্বজনীন বক্তব্য সপ্তম শতকের আরবের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিলো, একইভাবে বর্তমান সময়ের জন্যও প্রাসঙ্গিক। মোহাম্মদের (সা) জীবনের এই শিক্ষাটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় বলে মনে হয়।

[স্ক্রিপ্ট: জিয়াউদ্দীন সরদার, অনুবাদ: মাসউদুল আলম]

নোট:

[1] এ তথ্যটি সঠিক নয়। কারণ, রাসূল (সা) কর্তৃক এ ধরনের শাস্তি প্রয়োগের ঘটনা সংক্রান্ত হাদীস রয়েছে –অনুবাদক।

অন্যান্য পর্ব

দ্য লাইফ অব মোহাম্মদ (প্রথম পর্ব: সত্যসন্ধানী)

দ্য লাইফ অব মোহাম্মদ (দ্বিতীয় পর্ব: হলি ওয়ার)

জিয়াউদ্দীন সরদার
জিয়াউদ্দীন সরদার হলেন লন্ডননিবাসী স্কলার, লেখক, সাংবাদিক, কালচারাল ক্রিটিক ও পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল। ইসলাম, সংস্কৃতি, নৃতত্ত্ব, দর্শনসহ নানা বিষয়ে তিনি প্রায় অর্ধশতাধিক বই লিখেছেন। বর্তমানে 'মুসলিম ইনস্টিটিউট' নামে লন্ডনভিত্তিক একটি থিংকট্যাঙ্কের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন