মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭
হোম > ডকুমেন্টারি অনুবাদ > উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ এবং বনু কোরাইযার বিশ্বাসঘাতকতা

উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ এবং বনু কোরাইযার বিশ্বাসঘাতকতা দ্য লাইফ অব মোহাম্মদের অনুবাদ: পর্ব-১০

উহুদ যুদ্ধ

আরেকটি ঘটনা মদীনার পরিস্থিতিকে তখন আরো উত্তপ্ত করে তোলে। বদর যুদ্ধের প্রায় এক বছর পর কোরাইশরা আগের প্রতিশোধ নিতে মদীনা আক্রমণ করতে আসে। এবার তাদের বাহিনী ছিলো মোহাম্মদের (সা) বাহিনীর প্রায় তিন গুণ বড়। এটি কোনো মামুলী গোত্রীয় বিবাদ ছিলো না। এটি ছিলো মুসলমানদেরকে চিরতরে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ।

মোহাম্মদ (সা) আবারো তাদেরকে মদীনার বাইরে মোকাবেলা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। স্থানটি ছিলো উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে। কিন্তু তাঁর সেনাসংখ্যা ছিলো খুবই কম। এর একটা কারণ ছিলো, ইহুদী গোত্রগুলো তাদের ধর্মীয় পবিত্র দিন সাবাতের অজুহাতে যুদ্ধ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। এছাড়া মোহাম্মদের (সা) একজন সেনাপতি (আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই) প্রায় তিনশ সৈন্য নিয়ে তাঁর পক্ষ ত্যাগ করে ময়দান ছেড়ে চলে যায়। অন্যদিকে, মক্কাবাসীরা ছিলো প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত। এই যুদ্ধে কোনো পক্ষই প্রতিপক্ষের চূড়ান্ত ক্ষতিসাধন করতে পারেনি। চূড়ান্ত ফয়সালা হওয়ার আগেই যুদ্ধটি শেষ হয়ে যায়। অধ্যাপক হিউ কেনেডি এ ব্যাপারে বলেন,

যুদ্ধে দুই পক্ষই কঠিন লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলো। যুদ্ধের ফলাফল ড্র ছিলো বলা যায়। তবে মদীনার মুসলিম সমাজ ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলো। এটাই ছিলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

বদর যুদ্ধের সাথে উহুদ যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, মক্কাবাসী এবার মদীনার অভ্যন্তরীণ সহায়তা পেয়েছিলো। প্রচলিত মুসলিম বর্ণনা মতে, মদীনার কয়েকটি ইহুদী গোত্র সক্রিয়ভাবে মোহাম্মদের (সা) শত্রুদেরকে সহায়তা করেছিলো।

খন্দকের যুদ্ধ

কোরাইশদের সাথে তৃতীয় এবং সর্বশেষ যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিলো ৬২৭ খ্রিস্টাব্দে। ততদিনে মদীনায় মোহাম্মদের (সা) আগমনের পাঁচ বছর পার হয়েছে। কোরাইশরা এবার ১০ হাজার সৈন্যের বিশাল একটি বাহিনী নিয়ে এসেছে। বিপরীতে মোহাম্মদ (সা) মাত্র তিন হাজার সেনা সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। এই স্বল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে কোরাইশদের বিপরীতে সম্মুখ সমরে মুখোমুখি হওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাই তিনি কোরাইশদের মোকাবেলায় নতুন কৌশল গ্রহণ করলেন। মদীনার প্রতিরক্ষা তুলনামূলকভাবে সহজ ছিলো। কারণ, শহরটি ছিলো পাথুরে পাহাড় বেষ্টিত। তবে উত্তর দিকটি উন্মুক্ত থাকায় মদীনা ছিলো অরক্ষিত। এই দিকটি সুরক্ষিত করতে মোহাম্মদ (সা) খুব সহজ একটি কৌশল অবলম্বন করলেন। তিনি পুরো উত্তর দিক জুড়ে গভীর পরিখা খুঁড়লেন। কোরাইশদের এগিয়ে আসতে বাধা দেয়ার ক্ষেত্রে এই পরিখাই মূল ভূমিকা পালন করেছিলো। এই যুদ্ধকে তাই পরিখার যুদ্ধ বা খন্দকের যুদ্ধ বলা হয়।

খন্দকের যুদ্ধ যেখানে সংঘটিত হয়েছিলো, সেই অঞ্চলটি বর্তমানে আধুনিক মদীনা নগরীর অংশ। তখন যুদ্ধে দুই বাহিনীর মাঝখানে ছিলো পরিখা। মক্কার বাহিনী ছিলো বিশাল। দৃষ্টিসীমার শেষ পর্যন্ত তাদের বাহিনী দেখা যেতো। পরিখার ফলে তারা অবধারিতভাবেই কঠিন বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে গেলো। তারা কার্যত কোনো কিছুই করতে পারছিলো না। মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর বাহিনী যে খন্দক তৈরি করে রেখেছেন, তা অতিক্রম করার কোনো প্রস্তুতি তাদের ছিলো না। অন্যদিকে, মোহাম্মদ (সা) ধীরেসুস্থে সময় কাটাচ্ছিলেন। মক্কার লোকেরা হতাশ হয়ে কখন এলাকা ত্যাগ করে, সেই অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। অধ্যাপক হিউ কেনেডি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন,

পরিখার কারণে কোরাইশ বাহিনীর ঘোড়াগুলো শহরে প্রবেশ করতে পারছিলো না। খন্দকের এই ঘটনা মুসলমানদের কাছে মোহাম্মদের বিচক্ষণ নেতৃত্ব ও কমান্ডিংয়ের নিদর্শন হিসেবে শত শত বছর ধরে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই ব্যতিক্রমী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ফলে মক্কার বাহিনী একদম অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। এতে তাদের রণকৌশল অকার্যকর হয়ে পড়েছিলো।

বনু কোরাইযার বিশ্বাসঘাতকতা

মুসলিম বর্ণনা মতে, দুই সপ্তাহ পর মক্কার সেনাবাহিনীর রসদ ফুরিয়ে যেতে শুরু করে। ফলে তারা তাদের এক গোপন মিত্রকে মদীনার ভেতর থেকে মুসলম বাহিনীর উপর আক্রমণ করতে অনুরোধ করে। বলাবাহুল্য, মিত্রটি ছিলো ইহুদী গোত্র বনু কোরাইযা।

এতদিন পর্যন্ত ইহুদী গোত্রগুলো মোহাম্মদের (সা) শত্রুদের সাথে শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য করে এসেছিলো। অথবা, বড়জোর মোহাম্মদের (সা) পক্ষে অস্ত্র ধারণ করতে অস্বীকার করেছিলো। কিন্তু এবার তারা মুসলমানদেরকে আক্রমণ করার ষড়যন্ত্র করেছিলো। এ ব্যাপারে রবার্ট স্পেনসার বলেন,

বনু কোরাইযা মোহাম্মদ ও মুসলমানাদের সাথে মদীনার ভেতরেই ছিলো। মোহাম্মদের সাথে তারা একটি চুক্তিতেও আবদ্ধ ছিলো। কিন্তু তারা মদীনার অপর দুই ইহুদী গোত্র বনু নাজীর ও বনু কাইনুকার সাথে কৃত আচরণ প্রত্যক্ষ করেছে। এ কারণেই তারা মোহাম্মদের বিরুদ্ধে কোরাইশদেরকে তাদের সাথে চুক্তি করার প্রস্তাব দিয়েছে বলে আমার ধারণা।

অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদেল হালিম এ ব্যাপারে বলেন,

তারা ছিলো সেই লোক, যারা চুক্তিবদ্ধ মৈত্রী হওয়ার পরও মুসলিম সমাজকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য মদীনার সবচেয়ে বড় শত্রুর পক্ষে চলে গিয়েছিলো। এটি বড় ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা। অবস্থা কতটা সঙ্গীন ছিলো কোরআনের আয়াত থেকে তা বুঝা যায়। কোরআন আমাদেরকে বলেছে, সে সময় মুসলমানদের মনোবল ভেঙে পড়েছিলো। তারা ভেবেছিলো, আজই বুঝি শেষ দিন।

মুসলিম পণ্ডিতদের মতে, কোরাইশদের সাথে সমঝোতা করে বনু কোরাইযা নিশ্চিতভাবেই মোহাম্মদের (সা) সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলো। তারা মুসলমানদেরকে আক্রমণ করার প্রস্তুতিও নিয়ে ফেলেছিলো। এমনকি কোরাইশ ও তাদের মিত্রবাহিনী আক্রমণ থেকে সরে আসার আগেই ইহুদীদের পক্ষ থেকে আক্রমণের আশংকা ছিলো। জেরুসালেমে অবস্থিত হিব্রু ইউনিভার্সিটির ইসলামিক অ্যান্ড মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজের অধ্যাপক এলা ল্যানডাউ-টাসেরন এ ব্যাপারে বলেন,

এটা তো প্রচলিত ব্যাখ্যা। বরং মোহাম্মদই বিশ্বাস ভঙ্গ করেছিলেন। ইহুদীরা নবীকে আক্রমণ করেছিলো, কিংবা এ ধরনের অন্য কোনো ঘটনার কোনো প্রমাণ নেই। ওই অবরোধের সময় বনু কোরাইযা নবীকে অস্ত্র ধার দিয়েছিলো। অন্যদিকে, তারা সম্ভবত অবরোধকারীদের সাথে ব্যবসাও করতো। কারণ, তারা তো আসলে ব্যবসায়ী ছিলো।

অধ্যাপক জিউফ্রে অল্ডারম্যান এ ব্যাপারে বলেন,

বনু কোরাইযা সম্ভবত কোরাইশদের পক্ষ নিয়েছিলো। তবে আমার মতে, তারা যা করেছিলো সেটি করাই তাদের জন্য স্বাভাবিক ছিলো। ইহুদীরা সবসময় মিত্র খোঁজার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকে। ইহুদীদের রাজনৈতিক তত্ত্বের মূলকথা হলো, নিজ ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ইহুদীরা সবার সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে এবং যে কাউকে বন্ধু বানাতে পারে। আমি মনে করি, তখন তারা যা করেছিলো, সেটি ছিলো তাদের জন্য সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ব্যাপার।

এই ষড়যন্ত্র সফল হলে কোরাইশরা মদীনায় ঢুকে পড়তে সক্ষম হতো। সেক্ষেত্রে তারা মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর অনুসারীদের সবাইকে হয়তো হত্যা করতো এবং তাঁর প্রবর্তিত নতুন ধর্মটির সেখানেই অবসান ঘটতে পারতো।



বনু কোরাইযা অভিযান

ইহুদীদের সর্বশেষ এই প্রতারণার বিরুদ্ধে তিনি যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, সেটি তাঁর জীবনের অন্যতম বিতর্কিত একটি ঘটনা। মোহাম্মদ (সা) তাঁর বাহিনীকে ইহুদী গোত্রটির এলাকা ঘিরে ফেলার নির্দেশ দিলেন। তাদেরকে ২৫ দিন পর্যন্ত অবরোধ করে রাখার পর তারা আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু এবার তিনি দোটানায় পড়ে গেলেন। ইহুদীদেরকে মুক্ত করে দেয়া হলে মুসলমানদেরকে নির্মূল করার লক্ষ্যে তারা মক্কার কোরাইশদের সাথে পুনরায় যোগ দেয়ার আশংকা প্রবল। এমতাবস্থায় তিনি নিজে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়ার পরিবর্তে একজন স্বতন্ত্র মধ্যস্ততাকারী নিয়োগের ব্যাপারে রাজি হন। তিনি ইহুদী গোত্র সর্দারদেরকে নেতৃস্থানীয় সম্মানিত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে একজনকে মধ্যস্ততাকারী হিসেবে বেছে নেয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। এ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে অধ্যাপক তারিক রমাদান বলেন,

তাদের সাথে আলোচনায় তিনি তিনবার জানতে চেয়েছিলেন, ‘তোমাদের বিচার করার জন্য আমি তৃতীয় কাউকে নিয়োগ করতে চাই। তোমরা কি এতে রাজি?’ তারপর তিনি সাদ ইবনে মুয়াজকে (সা) আসতে বললেন এবং তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে বললেন। তিনি পুরুষদেরকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত দিলেন। মনে রাখা দরকার, এই সিদ্ধান্তের আগে মহানবী (সা) বলেছিলেন, “আমি নিজে কোনো সিদ্ধান্ত দেবো না, বরং সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য তৃতীয় কাউকে অনুরোধ করবো।” ফয়সালা অনুসারে পুরুষদেরকে হত্যা করা হয়েছিলো। কিন্তু একই ধরনের অপরাধের জন্য এর আগে তিনি আরো দুইবার তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছিলেন। সর্বশেষ বার এসে তিনি বলেছিলেন, “যথেষ্ট হয়েছে। তোমরা বার বার একই কাজ করছো। একই অপরাধে অতীতে তোমাদেরকে মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচিয়ে দেয়ার পরও আমাদেরকে আক্রমণ করতে আসাটা পরিস্কার বিশ্বাসঘাতকতা।”

অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদেল হালিম এ ব্যাপারে বলেন,

বনু কোরাইযার যোদ্ধাদেরকে মৃত্যুদণ্ড এবং নারী ও শিশুদেরকে যুদ্ধবন্দী করার রায় দিয়েছিলেন তিনি। এই রায় বাস্তবায়ন করা হয়েছিলো।

‘নাউ দে কল মি ইনফিডাল’ গ্রন্থের লেখিকা ননী দারভীশ বলেন,

এটি ছিলো ইহুদীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত প্রথম গণহত্যা। ইহুদীরা তাকে হত্যা করতে চাওয়া সত্ত্বেও একজন নবী কীভাবে আট শতাধিক মানুষকে মেরে ফেলার আদেশ দিতে পারেন? এর পরিবর্তে তিনি তাদেরকে উচ্ছেদ করতে কিংবা নির্বাসন দিতে পারতেন।

ইসলাম ইহুদীবিদ্বেষ বিরোধী

আব্দুর রহীম গ্রীন বলেন,

এই ঘটনার সাথে তাদের ইহুদী হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। তারা খ্রিস্টান বা অন্য কোনো গোত্রও হতে পারতো। এটি কোনো হলোকাস্ট ছিলো না। ধর্মের কারণে ইহুদীদেরকে হত্যা করা হয়েছে, ব্যাপারটি তেমনও নয়। যদি তাই হতো, তাহলে ইহুদীদেরকে হত্যা করার নজির হিসেবে এটি মুসলিম ইতিহাসে থেকে যেতো এবং সেক্ষেত্রে ইহুদী এনলাইটেনমেন্টের সোনালি যুগের বিকাশ মুসলিম শাসনামলের স্পেনে ঘটতো না। এই দাবি সত্য হলে ইসলামের ইতিহাসে ইহুদীদের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম হতো।

অন্য যে কোনো ঘটনার চেয়ে বনু কোরাইযর ঘটনাটি সম্ভবত অনেক বেশি সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এই ঘটনা সামনে এনে মোহাম্মদকে (সা) এমন একজন নিষ্ঠুর ও নিপীড়ক শাসক হিসেবে চিত্রিত করা হয়, যিনি নিজের শাসন-কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য যে কোনো প্রকার সহিংস উপায় অবলম্বন করতেন। বর্তমানে মুসলিম বিশ্ব জুড়ে ইহুদীদের প্রতি যে ধরনের তীব্র বৈরিতা বিদ্যমান, এই ঘটনাকে তার পেছনের কারণ হিসেবে সমালোচকরা মনে করে থাকে। হ্যাঁ, আমাদের বর্তমান মানদণ্ডের আলোকে এটি নিশ্চয় নিষ্ঠুর একটি ঘটনা ছিলো। কিন্তু আমাদেরকে অবশ্যই তৎকালীন সময় ও প্রেক্ষাপটের আলোকে ঘটনাটিকে দেখতে হবে। বাস্তবতা হলো এই ঘটনায় তখন তেমন কেউই মর্মাহত হয়নি। এই না হওয়াটাও এক ধরনের নিষ্ঠুরতা বৈকি! মোহাম্মদ (সা) এমনই এক সমাজ ও যুগে বেড়ে ওঠেছিলেন। অধ্যাপক জিউফ্রে অল্ডারম্যান এ ব্যাপারে বলেন,

আমি মনে করি, ইহুদীদের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ থেকেই হত্যাযজ্ঞটি সংঘটিত হয়েছিলো। আমার মতে, একদিক থেকে দেখলে মুসলিম বিশ্ব শত শত বছর ধরে ইহুদীদের প্রতি বিশেষ এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে আসছে। বর্তমানে ইহুদীদের প্রতি মুসলমানদের যে মনোভাব, তার পেছনে অবশ্য অনেক ধরনের কারণ রয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি, এই ঘটনাটিও তেমনই একটি কারণ। এই ঘটনাটি বিষাক্ত ক্ষত হিসেবে মুসলিম মননে গেঁথে গেছে। এটি বাড়তে বাড়তে বর্তমানে এই দুঃখজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

মুসলিম বিশ্ব এবং পাশ্চাত্যের মুসলিম সমাজের কোথাও কোথাও নতুন এক ধরনের ইহুদীবিদ্বেষ দেখা যাচ্ছে। কোরআন থেকেই এর বৈধতা পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়। আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে দেয়া বাগাড়ম্বরসর্বস্ব এ জাতীয় বক্তৃতামালা মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে অধিকাংশ মানুষের কাছেই ভীষণ আপত্তিকর বলে মনে হবে। যেমন একটি টিভি চ্যানেলে একজন বয়োবৃদ্ধ মুসলিম নেতা বলছিলেন–

হে ইহুদী সম্প্রদায়! তোমাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। হে আল্লাহ! তোমার তীব্র ক্রোধ এদের উপর প্রয়োগ করো। এদেরকে শাস্তি এবং নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করাও।

অধ্যাপক তারিক রমাদান এ সম্পর্কে বলেন,

কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় নিছক ইহুদী হওয়ার কারণেই কিছু মানুষ তাদের বিরোধিতা করে থাকে। কিন্তু এটি ইসলামী ঐতিহ্যের পরিপন্থী। এটি অগ্রহণযোগ্য, বর্ণবাদী, ইহুদীবিদ্বেষী অবস্থান। এটি আমাদের ধর্মেরও বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি। একেশ্বরবাদী ধারার অনুসারী ইহুদীদেরকে ‘আহলে কিতাব’ হিসেবে বিবেচনা করার পর তাদের উদ্দেশ্যে আমরা এ ধরনের বর্ণবাদী বক্তব্য দিতে পারি না। অথচ মহানবী (সা) মদীনায় পদার্পণ করে একটি ইসলামী সমাজের সূচনার পাশাপাশি যখন মদীনার শাসনভারও গ্রহণ করেছিলেন, তখন তিনি ‘আল-উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যাহ’ তথা ইসলামী সমাজ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তারা আমাদের উম্মাহর সদস্য।’ তারা কারা? ইহুদী ও খ্রিস্টানরা। এখন দেখুন, স্বয়ং মহানবী (সা) কী বলেছিলেন, আর আমরা কী বলছি! আমাদের এ ধরনের ইহুদীবিদ্বেষী মনোভাব ইসলামের দিক থেকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। ইহুদীদের ব্যাপারে কোনো রাষ্ট্র বা সরকার (যেমন, মধ্যপ্রাচ্যের কথাই ধরা যাক) কী করবে, তা আমাদের আওতাধীন বিষয় নয়। তবে মানবতা ও বিশ্বাসের দিক থেকে ইহুদীরা আমাদের ভাইবোন।

মদীনার ইহুদী গোত্রগুলোর প্রতি মোহাম্মদ (সা) যে আচরণ করেছিলেন, এর ধারাবাহিকতা আমাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত  রয়ে গেছে। কিন্তু সে সময়ে এ ঘটনার পরিণতিতে তিনি আরবের একটি শক্তিশালী নতুন আন্দোলনের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। মোহাম্মদ (সা) কেমন ছিলেন, তা জানার জন্য এই ঘটনাই একমাত্র উদাহরণ নয়।

যা হোক, মহানবীর (সা) বয়স ততদিনে পঞ্চাশের কোটার শেষ দিকে। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে এসেছেন। নিজ শহর থেকে তাঁকে উচ্ছেদ হতে হয়েছে। তারপর বলতে গেলে নিয়মিতভাবে তাঁকে রক্তাক্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে হয়েছে। আরো বেশি করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে শেষ হয়ে যাবেন, নাকি অনুসারীদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবেন– এই প্রসঙ্গে, বিশেষ করে মক্কার সঙ্গে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের সমাধা করার জন্য তাঁকে একটি পথ খুঁজে বের করতে হয়েছিলো। এ বিষয়ে আলোচনার মূলকথা হলো, মোহাম্মদ (সা) সম্পর্কে আপনি কী মনে করবেন? তিনি কি নিছক একজন আরববিজয়ী যোদ্ধা ও নেতা ছিলেন? নাকি তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্ব মানবতার জন্য চিরন্তন ঐশীবাণী বাহক একজন নবী?

শেষ অধ্যায়ে আমরা দেখাবো, মোহাম্মদ (সা) কীভাবে বার বার তাঁর শত্রুদের শান্তিপূর্ণভাবে মোকাবেলা করেছেন এবং জয়লাভ করেছেন। মক্কায় প্রদত্ত সর্বশেষ ভাষণে তিনি কী রূপরেখা দিয়ে গেছেন, তাও আমরা তুলে ধরবো।

(চলবে)


বাকি পর্বগুলো পড়তে ভিজিট করুন এখানে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *