বদর যুদ্ধ ও বনু কাইনুকা অভিযান দ্য লাইফ অব মোহাম্মদের অনুবাদ: পর্ব-৯

কোরাইশদের হুমকি

মোহাম্মদ (সা) এবং তাঁর সাহাবীরা মদীনায় এসেছিলেন একদম নিঃস্ব অবস্থায়। তবে মক্কায় তাঁরা প্রতিনিয়ত যে ধরনের অত্যাচার সইতেন, এখানে তা ছিলো না। শত্রুরা তখনো তাদেরকে বিনাশ করার হুঙ্কার দিয়ে যাচ্ছিলো। গোত্রভিত্তিক আরব সমাজে প্রতিশোধ গ্রহণের প্রবৃত্তি প্রবল থাকায় এই হুমকিকে আমলে না নিয়ে উপায় ছিলো না।

ফলে মদীনায়ও মুসলমানরা নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে সংকটে পড়ে গেলো। ক্ষমতাধর যে শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারে মোহাম্মদকে (সা) মক্কা ছাড়তে হয়েছিলো, যারা তাঁর অনুসারীদের উপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিলো, তাদের সম্পত্তি দখল করেছিলো, বেঁচে থাকার ন্যূনতম অবলম্বনটুকু পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছিলো, তারা তখনো মুসলমানদেরকে নির্মূল করার পরিকল্পনা করছিলো। এই বিপজ্জনক শত্রুকে মোকাবেলার একটা উপায় খুঁজে বের করা তখন মোহাম্মদের (সা) জন্য ছিলো জরুরি।

যুদ্ধের আয়াত

এই পরিস্থিতিতে তাঁর উপর ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু ওহী নাজিল হয়। যারা তাঁদেরকে বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত করেছে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়। কোরআনের এই আয়াতগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা নিয়ে এখন পর্যন্ত বিতর্ক রয়ে গেছে। অনেকের মতে, এগুলো হলো আত্মরক্ষার সাময়িক প্রয়োজনে যুদ্ধের বৈধতার দলীল। অন্যদিকে, মহানবীর (সা) অনুসারী নয়, এমন যে কাউকে হত্যা করার বৈধতার দলীল হিসেবে কেউ কেউ এসব আয়াতকে ব্যবহার করে থাকে। রবার্ট স্পেনসার এ ব্যাপারে বলেন,

কোরআনে সূরা বাকারার ১৯১ ও ২১৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ফেতনা-ফ্যাসাদ হলো হত্যার চেয়ে গুরুতর অপরাধ…। অন্যভাবে বললে, ‘কোরাইশরা যদি নির্যাতন করতে থাকে, তাহলে তাদেরকে হত্যা করার পূর্ণ অধিকার তোমাদের আছে’– এ ধরনের অবস্থান ইসলামী নৈতিকতার এক ধরনের দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। কোনো নৈতিক অবস্থান ইসলামের পক্ষে হলেই কেবল তা ভালো, অন্যথায় তা না মানলেও চলে। এমন মনে করা হলে ইসলামী নৈতিকতার কোনো চূড়ান্ত ভিত্তি থাকে না। যুদ্ধ সংক্রান্ত এই মূলনীতি ছাড়াও অনেকগুলো হাদীসে বর্ণিত মোহাম্মদের আরেকটি বাণী রয়েছে। তিনি প্রায় সময় বলতেন– “যুদ্ধ হলো এক ধরনের প্রতারণা।” তার অনুসারীরা যে প্রতিবেশী এবং অন্যান্যদের ব্যাপারে সাধারণত মারমুখী ও যুদ্ধন্মোখ হয়ে থাকে, দুঃখজনকভাবে এই মানসিকতার পেছনে রয়েছে ইসলামের যুদ্ধ সংক্রান্ত এই নীতি এবং মোহাম্মদের উল্লিখিত এই হাদীসটি।

তবে অধ্যাপক তারিক রমাদান এ ব্যাপারে বলেন,

নির্যাতনের শিকার হলেই কেবল যুদ্ধ সংক্রান্ত কোরআনের এই অনুমোদন কার্যকর হবে। কেউ আপনাকে আক্রমণ করতে থাকলে প্রতিরোধ করার অধিকার নিশ্চয় আপনার রয়েছে। এ কারণেই ক্লাসিকাল ফিকাহ শাস্ত্রের মূলধারায় একে আত্মরক্ষামূলক জিহাদ বলা হয়। অর্থাৎ, আপনি যদি নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে অধিকারের জায়গা থেকে আপনি এর প্রতিরোধ করতে পারবেন। এখন এ জাতীয় কিছু লোক এবং গুটিকতক মুসলিম গ্রুপ এই আয়াতকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। তারা বলছে, ‘বিরোধীদের হত্যা করা আমাদের জন্য বৈধ এবং আমাদের যুদ্ধ করার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে।’ বলাবাহুল্য, তাদের এই দাবি সম্পূর্ণ ভুল। কোরআনের আয়াতে এ ধরনের কিছু বলা হয়নি। আয়াতে বলা হয়েছে– যদি তারা তোমাকে আক্রমণ করে, তাহলে তা প্রতিরোধ করার অধিকার তোমার রয়েছে। কারণ, দিন শেষে এটি বাঁচামরার প্রশ্ন।

বদর যুদ্ধ

যা হোক, মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর অনুসারীগণ এক পর্যায়ে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়লেন। কোরআনের এই আয়াতগুলোকে তিনি বড়জোর কোরাইশদের বাণিজ্য কাফেলার উপর আক্রমণের বৈধতা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে মহানবী (সা) শুনতে পেলেন, কোরাইশদের একটি বিশাল বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়া থেকে মক্কায় ফিরে যাচ্ছে। কাফেলাটিকে তিনি মরুভূমিতেই জব্দ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি যে এ রকম কিছু করতে পারেন, কোরাইশরা তা আঁচ করতে পেরেছিলো। তাই তারা কাফেলাকে মদীনার পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে মোহাম্মদের (সা) মোকাবেলায় একটি সেনাবাহিনী পাঠালো। উভয় বাহিনীই মরুভূমির মধ্যে একটি বিচ্ছিন্ন পানির কূপের কাছে বদর প্রান্তরে মুখোমুখি হলো। অধ্যাপক হিউ কেনেডি বলেন,

মক্কার কোরাইশ বাহিনী এবং মদীনার মোহাম্মদের বাহিনী বদর প্রান্তরে মুখোমুখি হলো। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধটি শেষ হয়ে যায়। যুদ্ধে মোহাম্মদের সেনাসংখ্যা নিশ্চিতভাবেই এক হাজারের কম ছিলো। আনুমানিক ৩’শ থেকে ৪’শ জন হবে। আর কোরাইশদের সেনাসংখ্যা ছিলো আনুমানিক ৯’শ জনের মতো। আমরা যদিও সবসময় বলি, মক্কার বাহিনীর সেনাসংখ্যা মুসলমানদের চেয়ে বেশি ছিলো। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা আসলে কী ছিলো, তা জানার কোনো সত্যিকার পদ্ধতি আমাদের কাছে নেই।

‘জিহাদ: ফ্রম কোরআন টু বিন লাদেন’ গ্রন্থের লেখক, পাদরি এবং অধ্যাপক রিচার্ড বোনি বলেন, 

মহানবী ছিলেন মদীনায় নির্বাসিত। তাই একদৃষ্টিতে মক্কা ও মদীনার মধ্যে সংঘটিত এই যুদ্ধটি ছিলো একটি মতাদর্শিক যুদ্ধ। ব্যাপারটা যেহেতু ঘটেনি, তাই নিশ্চিতভাবে বলতে না পারছি না; তবে আমরা অনুমান করতে পারি– মক্কাবাসীরা জয়ী হলে তাদের চোখে যারা বিদ্রোহী, অর্থাৎ মুসলমানদেরকে তারা একেবারে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতো। কারণ, মক্কাবাসীর জন্য তারা ছিলো বড় ধরনের হুমকি।

যুদ্ধে মক্কাবাসীরা পরাজিত হয়। এর ফলে মদীনাবাসীরা সাময়িকভাবে স্বস্তি লাভ করে। মক্কা ও মদীনার মধ্যে আধিপত্যের লড়াইয়ের প্রথম পর্বে মোহাম্মদ (সা) বিজয়ী হন। আধুনিক যুদ্ধবিদ্যার মানদণ্ডে একে যুদ্ধ বলা বেশ কঠিন। একে বরং খণ্ডযুদ্ধ বলাই ভালো। কিন্তু এর তাৎপর্য ছিলো ব্যাপক। এই প্রথমবারের মতো মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাহাবীরা আল্লাহর পথে কোনো যুদ্ধে শরীক হলেন। কোরাইশদের বিপক্ষে এই অপ্রত্যাশিত বিজয়ে তাঁরা ছিলেন দারুণ উৎফুল্ল। সমগ্র আরব জুড়ে মোহাম্মদের (সা) ব্যাপক সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কোরাইশদের জন্য এটি ছিলো অত্যন্ত লজ্জাজনক ব্যাপার। তাই বদর যুদ্ধের স্মৃতি ভুলে যাওয়া কিংবা মুসলমানদেরকে ক্ষমা করে দেয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিলো। এই অপমানের শোধ তোলার জন্য তারা ছিলো বদ্ধপরিকর। অধ্যাপক হিউ কেনেডি এ ব্যাপারে বলেন,

তাদের মনোভাবের সারকথা হলো, মদীনায় যাওয়ার কিছুদিনের মাঝেই মোহাম্মদ যে মর্যাদা লাভ করেছিলেন, অবশ্যই তা নষ্ট করতে হবে। এটাও ঠিক যে, মদীনায় তাঁর অনুসারীদের জন্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ছিলো দারুণ এক পুরস্কার। এই সম্পদ বণ্টন করে দেয়ায় তাঁদের কাছে মোহাম্মদের অবস্থান অনেক অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছিলো।

মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর অনুসারীদের কাছে বদর যুদ্ধে জয় লাভ করা ধর্মীয়ভাবে ছিলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি ছিলো ঈমানের সত্যতার প্রমাণ, যা তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। এমনকি গত ১৪’শ বছর ধরে তাঁর অনুসারীদেরকেও এই বিজয় অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে। বনী ইসরাইলের মিশর ত্যাগ করে লোহিত সাগর পাড়ি দেয়ার ঘটনার মতো বদরের বিজয়কেও মুসলমানরা আজ অবধি সরাসরি আল্লাহর সাহায্য বলেই মনে করে।



কেবলা পরিবর্তন

বিজয়ের কিছুদিন পর মোহাম্মদ (সা) একদিন নামাজ আদায় করছিলেন। ঠিক তখন তিনি একটি ওহী লাভ করেন। এর মাধ্যমে তিনি ও তাঁর অনুসারীদের আরো সুনির্দিষ্ট ও স্বতন্ত্র পরিচয় নির্ধারিত হয়। এতে মুসলমানদেরকে নামাজ আদায়ের দিক অর্থাৎ কেবলা পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়া হয়। এতদিন তিনি ও তাঁর সাহাবীরা ইহুদী-খ্রিস্টানদের মতোই মদীনা থেকে উত্তরে জেরুসালেমের দিকে ফিরে নামাজ আদায় করতেন। ওহী নাজিলের সাথে সাথে তিনি জামায়াতে নামাজ আদায়কালেই দিক পরিবর্তন করে নতুন কেবলা মক্কার দিকে ফিরে দাঁড়ালেন এবং সাহাবীদের নিয়ে বাকি নামাজ আদায় করলেন। এ কারণে সেই মসজিদটিকে বলা হয় মসজিদে কেবলাতাইন অর্থাৎ দুই কেবলার মসজিদ।

এই পরিবর্তনকে আপাতদৃষ্টিতে সাদামাটা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এর তাৎপর্য বেশ গভীর। কারণ, এর মাধ্যমে একটি নতুন ও মর্যাদাপূর্ণ পরিচয়ের সূচনা ঘটে। সেটি হলো, মুসলমানদের ইবাদতের পদ্ধতি ইহুদী-খ্রিস্টানদের থেকে ভিন্ন। এছাড়া বর্তমানে এর তাৎপর্য হলো, মুসলমানরা দুনিয়ার যেখানেই থাকুক না কেন, সবাই একই দিকে অর্থাৎ মক্কার দিকে ফিরে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে। এটি ঐক্যের প্রতীক। এ প্রসঙ্গে বারনাবি রজারসন বলেন,

জেরুজালেম থেকে মক্কার দিকে কেবলা পরিবর্তনের ঘটনাটি বেশ দুবোর্ধ্য। ইসলামের প্রতি বিরূপ মনোভাবসম্পন্ন কিছু বিশ্লেষকের মতে, প্রথম দিকে ইসলামের অনেক উপাদান ইহুদী-খ্রিষ্টীয় ধারার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলো। যেমন– ইহুদী-খ্রিস্টানদের পবিত্র ভূমির প্রতি মুসলমানদের আকর্ষণ ইত্যাদি। তখন পবিত্র ভূমিকে কেন্দ্র  করে যেসব সমস্যা ছিলো, সেসব দূর করে একটি একক বিশ্বাসব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সংস্কার আন্দোলন চলছিলো। এই আন্দোলনের পরিণতি হিসেবে ইসলামের মতো নতুন একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে ঠিকই, তবে এটি পূর্ববর্তী ইহুদী-খ্রিস্টান ধারার উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিলো।

ইমেরিটাস অধ্যাপক জেরাল্ড হটিং বলেন,

ইসলাম স্বতন্ত্রভাবে নিজের প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলতে চেয়েছিলো, এমনটি কেউ মনে করতেই পারে। ইসলাম যে নিজস্ব আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে মক্কাকে গড়ে তুলেছে, তাও তো সত্য। সুতরাং কেউ ভাবতেই পারে, ইসলামের পূর্বেকার ব্যবস্থাগুলো থেকে স্বতন্ত্র একটি বিশ্বাসব্যবস্থা হিসেবে নিজেকে পৃথক রাখতে সচেতনভাবেই মক্কাকে কেবলা হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে।

ইহুদী-মুসলিম টানাপড়েন

তবে আরো বেশি করে মুসলিম পরিচয়ের দিকে ঝুঁকে পড়াকে মদীনার সবাই পছন্দ করেনি। বিশেষ করে কিছু ইহুদী গোত্র এর বিরোধী ছিলো। অধ্যাপক জিউফ্রে অল্ডারম্যান এ ব্যাপারে বলেন,

জেরুসালেমের পরিবর্তে অন্য কোনো দিকে ফিরে প্রার্থনা করা উচিত– এমন ধরনের চিন্তাভাবনার প্রেক্ষিতে তৎকালীন আরব উপদ্বীপের ইহুদী গোত্রগুলোর মধ্যে সন্দেহ জেগে ওঠা যে স্বাভাবিক ছিলো, তা আমি নিশ্চিতভাবেই অনুমান করতে পারি।

নামাজের নতুন কেবলা নির্ধারণের ব্যাপারটিকে ইহুদী গোত্রগুলো মোহাম্মদের (সা) সাথে তাদের সম্পর্কের অবনতি ও তাদের অবাধ্যতার পরিণতি বলে ধারণা করলো। অধ্যাপক হিউ কেনেডি এ ব্যাপারে বলেন,

ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্কটি বেশ জটিল ছিলো। ইহুদী গোত্রগুলো মোহাম্মদকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে মেনে নিতে পারছিলো না। কারণ, এতে করে তাদের ধর্মগ্রন্থ, নিজস্ব ঐতিহ্য ইত্যাদির বিপক্ষে চলে যেতে হয়। ফলে তারা একটি মৌলিক সমস্যার মধ্যে পড়ে গেলো। অন্যদিকে বাণিজ্য ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ছিলো আরেকটি বড় ইস্যু। রুপার বাজার, মেটাল ওয়ার্ক ইত্যাদি সহ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তখন প্রচণ্ড প্রতিযোগিতা ছিলো। মক্কা থেকে সদ্য আগত মোহাম্মদের অনুসারীরা স্থানীয় অর্থনীতির উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছিলো।

ইহুদী গোত্রগুলোর সাথে দিন দিন সম্পর্কের অবনতি ঘটার পাশাপাশি মোহাম্মদের (সা) সাফল্য ও ক্ষমতাও ক্রমে বাড়ছিলো। মক্কার সাথে বিরোধের বিষয়ে তিনি ইহুদীদের সমর্থন আশা করেছিলেন। কিন্তু তারা মক্কার কোরাইশদের সাথে লাভজনক বাণিজ্যিক সম্পর্ক ত্যাগ করতে রাজি ছিলো না। প্রচলিত মুসলিম বর্ণনা অনুযায়ী, ইহুদী গোত্রগুলো এক পর্যায়ে মোহাম্মদের (সা) শত্রুদের সাথে গোপন বৈঠক করতে থাকে। এছাড়া কিছু পৌত্তলিক গোত্র ইসলাম গ্রহণ করলেও মোহাম্মদের (সা) সাফল্যে তারা অসন্তুষ্ট ছিলো। ফলে তারাও তাঁর বিরুদ্ধে চলে গেলো। মোহাম্মদ (সা) এবার ভেতর-বাহির উভয় দিক থেকে সামগ্রিক হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়লেন।

বনু কাইনুকা অভিযান

বদর যুদ্ধের কিছুদিন পরই মদীনায় ইহুদীদের নিয়ে মোহাম্মদ (সা) প্রথমবারের মতো বড় ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়লেন। মক্কার কোরাইশদের সাথে ইহুদী গোত্রগুলোর একাধিক গোপন বৈঠকের তথ্য তিনি জানতে পারেন। তাঁর আশংকা ছিলো, কোরাইশরা আক্রমণ করে বসলে ইহুদী গোত্রগুলো হয়তো পুরোপুরিভাবে তাদের পক্ষে চলে যাবে এবং তাঁকে শেষ করার জন্য কোরাইশদেরকে সহায়তা করবে। তাই তিনি ইহুদীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন অনুভব করলেন। একদিন তিনি মদীনার দক্ষিণে একটি ইহুদী গোত্রে (বনু কাইনুকা) গিয়ে তাদের দুর্গ অবরুদ্ধ করে রাখলেন। দুই সপ্তাহ ব্যাপী অবরোধের পর তারা আত্মসমর্পণ করে। তারপর তাদেরকে মদীনা থেকে বের করে দেয়া হয়। অধ্যাপক জন এসপোজিটো এই ঘটনা ব্যাখ্যা করে বলেন,

মদীনা সনদে বলা ছিলো, বিভিন্ন গোত্র এবং বিশ্বাসের লোকজন একসাথে মিলেমিশে মদীনায় বসবাস করতে পারবে। সে মোতাবেক ইহুদীদেরও নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ধর্মবিশ্বাস নিয়েই সমাজে বসবাসের অধিকার ছিলো। কিন্তু এর বিনিময়ে শর্ত ছিলো রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকতে হবে। কিন্তু তারা কী করেছিলো? তারা রাষ্ট্রের সাথে সুস্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলো, শত্রুদের সাথে হাত মিলিয়েছিলো এবং মদীনার সমাজের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে তুলেছিলো। ইহুদীদের সবাই এর সাথে নিশ্চয় ছিলো না। তাদের একটি গ্রুপ এর সাথে জড়িত ছিলো।

ইহুদী গোত্রগুলোর সাথে মোহাম্মদের (সা) সম্পর্কের স্বরূপ কী ছিলো, তা বহুল আলোচিত একটি বিষয়। বেশিরভাগ মুসলিম স্কলার মনে করেন, মদীনার সংবিধান ছিলো উভয় পক্ষের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি। ফলে কিছু ইহুদী গোত্র মোহাম্মদের (সা) শত্রুদের সাথে হাত মেলানোর কারণে সেই চুক্তি ভঙ্গ হয়ে যায়। কিন্তু অনেকে এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করেন। এমনই একজন অধ্যাপক জিউফ্রে অল্ডারম্যান এ ব্যাপারে বলেন,

এটি এমন মতবিরোধপূর্ণ একটি বিষয়, যার সমাধান ঐতিহাসিকরা করতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, এ বিষয়ে স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য কোনো সমসাময়িক ইহুদী সূত্রের বর্ণনা আমাদের কাছে নেই। তাই তারা একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলো এবং পরবর্তীতে তা ভঙ্গ করেছিলো, এমনটি আপনি মনে করতে পারেন। আবার আপনি এমনটিও ভাবতে পারেন, ইহুদীদের সাথে তখন যে আচরণ করা হয়েছিলো, পরবর্তীতে তাকে ন্যায্যতা দেয়ার উদ্দেশ্যে মুসলিম ঐতিহাসিকরা হয়তো মনগড়া চুক্তি সম্পাদনের কথা বলেছেন।

বারনাবি রজারসন এ ব্যাপারে বলেন,

এই ধনাঢ্য ইহুদী গোত্রগুলো প্রত্যেকটি ঘটনায় রাজনৈতিক প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলো। তাই তাদেরকে বহিষ্কার করাটা বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিলো। দেখুন, ইহুদীরা ছিলো মদীনায় প্রায় সমস্ত ভূ-সম্পত্তির মালিক। উর্বর উপত্যকাগুলোও ছিলো তাদের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে, মহানবী একদম রিক্ত হস্তে, শরনার্থী হিসেবে মদীনায় এসেছিলেন। কিন্তু তারা নিজেরাই চুক্তিভঙ্গ করে শত্রুদের সাথে হাত মেলানোর মাধ্যমে মহানবীকে তাদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেয়ার সুযোগ করে দিলো। এর মাধ্যমে তিনি মদীনার একচ্ছত্র নেতা হয়ে ওঠলেন।

তখন বিশ্বাসঘাতকতার প্রচলিত শাস্তি ছিলো মৃত্যুদণ্ড। তারপরও মোহাম্মদ (সা) তা বাস্তবায়ন না করে তাদেরকে শুধু মদীনা থেকে নির্বাসিত করেছিলেন। এ থেকে বুঝা যায় তিনি তখনো অন্যদের সাথে এক ধরনের সমঝোতার প্রত্যাশা করছিলেন। কিন্তু দুই পক্ষের সম্পর্কের মধ্যে ফাটল রয়েই গিয়েছিলো।

(চলবে)


বাকি পর্বগুলো পড়তে ভিজিট করুন এখানে

Leave a Reply