মেরাজের ঘটনা

৬২০ খ্রিস্টাব্দে মোহাম্মদের (সা) সবচেয়ে বড় দুজন শুভাকাঙ্খী মৃত্যুবরণ করেন। একজন হলেন তাঁর ২৫ বছরের বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গী খাদীজা (রা)। অপরজন হলেন তাঁকে গোত্রীয় নিরাপত্তা প্রদানকারী চাচা আবু তালিব। ওই সময়টি ছিলো তাঁর জীবনের সবচেয়ে দুঃসময়। তবে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি এমন এক অনন্যসাধারণ আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, যা তাঁর এই দুঃসহ যাতনাকে মুছে দিয়েছিলো।

মুসলিম বর্ণনা মতে, এক রাতে মোহাম্মদ (সা) কাবার আঙিনায় ঘুমিয়েছিলেন। সেই রাতেই তিনি মক্কা থেকে কয়েক শত মাইল উত্তরে অবস্থিত জেরুজালেম নগরী ভ্রমণের এক অলৌকিক অভিজ্ঞতা লাভ করেন। ইহুদী-খ্রিস্টানরা নগরীটিকে পবিত্র স্থান হিসেবে গণ্য করে। মহানবীর (সা) এই নৈশভ্রমণের ঘটনার ফলে মুসলমানদের কাছেও মক্কা-মদীনার পরেই তীর্থযাত্রা ও গভীর ধর্মীয় অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য জেরুজালেম নগরী পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত।

বর্তমানে জেরুজালেম নগরী মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠার এটি একটি অন্যতম প্রধান কারণ। ইসরাইলী ও ফিলিস্তিনীদের মধ্যে চলমান সংঘাত কার্যত এই ভূমির জন্য দুই পক্ষের লড়াই। কিন্তু মুসলিম বিশ্ব জুড়ে এই ইস্যুটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ালো? কেনইবা মহানবীর (সা) জন্মস্থান থেকে প্রায় আটশত মাইল দূরের একটি নগরী জেরুসালেমকে মুক্ত করার আহ্বান অসংখ্য মুসলমানকে এখনো উজ্জীবিত করে? জেরুসালেমের সাবেক প্রধান মুফতি শায়খ ইকরিমা সাবরী এ ব্যাপারে বলেন,

জেরুসালেম হলো মুসলমানদের ঈমান-আকীদার প্রতীক। তাই এটি আমাদের নিকট এতো গুরুত্বপূর্ণ। মহানবীর (সা) রাত্রীকালীন ভ্রমণের সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে। এখান থেকেই ঊর্ধ্বারোহণ তথা মিরাজের ঘটনা ঘটে। আল্লাহ তায়ালা মোহাম্মদকে (সা) প্রথমে মক্কা থেকে জেরুসালেমে পাঠিয়েছিলেন। তারপর এখান থেকে তিনি ঊর্ধ্বাকাশপানে রওয়ানা হয়েছিলেন।

মুসলিম সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, সেই রাতে ফেরেশতা জিবরাইল এসে মহানবীকে (সা) জাগিয়ে তুলেন। তারপর বোরাক নামের একটি উড়ন্ত ঘোড়ায় চড়িয়ে নিয়ে যান। এতে চড়ে তিনি অলৌকিকভাবে বিস্তৃত মরুভূমি পাড়ি দিয়ে জেরুসালেমে পৌঁছেন। এখানে এসেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রভাববিস্তারকারী ও অনন্য সাধারণ অভিজ্ঞতাটির শুরু হয়। এই ভ্রমণে তাঁর সাথে ইবরাহীম (আ) থেকে শুরু করে মুসা (আ), ঈসা (আ) সহ অতীতের সকল নবী-রাসূলের সাথে সাক্ষাৎ হয়। সবাইকে নিয়ে সেখানে তিনি নামাজ আদায় করেন। তারপর তাঁকে পানি, মদ ও দুধ অফার করা হয়। তিনি সেখান থেকে শুধু দুধ পান করেন। তিনি সারাজীবন যে মধ্যপন্থার পক্ষে কথা বলেছেন, দুধ পান করে তিনি তাঁর সেই অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করলেন। তারপর একটি স্বর্গীয় সিঁড়ি দৃশ্যমান হয়ে ওঠলো এবং মোহাম্মদ (সা) এক আধ্যাত্মিক ঊর্ধারোহণ শুরু করেন। সপ্ত আসমান পেরিয়ে তিনি আরশে আজীমে পৌঁছেন এবং স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার সাথে কথা বলেন।

আধুনিক যুক্তি-প্রমাণের এই যুগে একে অবিশ্বাস্য একটি ঘটনা মনে হলেও মুসলমানদের নিকট এটি হলো মোহাম্মদের (সা) জীবনে সংঘটিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। অবশ্য, এই ভ্রমণ কি স্বশরীরে ছিলো, নাকি এটি ছিলো নিছক একটি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা– তা নিয়ে অমুসলমানদের মধ্যে তো বটেই, মুসলিমদের মধ্যেও মতবিরোধ রয়েছে। মুফতি শায়খ ইকরিমা সাবরী এ ব্যাপারে বলেন,

এটি ছিলো একটি অলৌকিক ব্যাপার। আর অলৌকিকতায় বিশ্বাস রাখা ঈমানেরই অংশ। এই ঘটনার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই এবং এটি স্বাভাবিকতার বিপরীতও বটে। তবুও কোরআন ও হাদীসে এ ঘটনার বর্ণনা থাকায় আমরা তা বিশ্বাস করি।

অধ্যাপক তারিক রমাদান বলেন,

আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি, এটি ছিলো একটি আধ্যাত্মিক তাৎপর্যবহ ভ্রমণ। অর্থাৎ, তিনি প্রথমে জেরুসালেম গিয়েছিলেন এবং তারপর তিনি মহান স্রষ্টা তথা এক আল্লাহর খুব সন্নিকটবর্তী হয়েছিলেন।

জেরুসালেমের ‘ডোম অব দ্যা রক’ খ্যাত সোনালী মসজিদটির ভেতরে একটি পবিত্র স্মারক রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, মেরাজের রাতে ঠিক সেখান থেকেই মহানবী (সা) ঊর্ধ্বারোহন শুরু করেন। অতীতকাল থেকে এখনো পর্যন্ত কেউ কেউ বলে থাকেন, মহানবী (সা) স্বশরীরেই ভ্রমণ করেছিলেন। তাদের মতে, তিনি চোখের পলকে মক্কা থেকে প্রায় আটশত মাইল দূরের জেরুসালেমে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তবে অনেকে মনে করেন, রাত্রীকালীন ভ্রমণ একটি প্রতীকী ব্যাপার। আসলে সেটি ছিলো একটি আধ্যাত্মিক সফর, যে সফরে মহানবী (সা) এক নতুন স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন।  আব্দুর রহীম গ্রীন এ ব্যাপারে বলেন,

এই ঘটনার প্রতীকী গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ, সেই রাতে ইবরাহীম, নূহ, মুসা, ঈসা, ইয়াকুবসহ অতীতের সকল নবী-রাসূল মোহাম্মদের (সা) নেতৃত্বে নামাজ আদায় করেছেন। সেদিন স্বয়ং আল্লাহ মহানবীর (সা) সাথে কথা বলেছেন। সেই কথোপকথনেই আল্লাহ তায়ালা মহানবী (সা) ও তাঁর অনুসারী মুসলমানদের জন্য প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের নির্দেশ প্রদান করেছিলেন।

বারনাবি রজারসন এ ব্যাপারে বলেন,

কোরআনে ঘটনাটির বর্ণনা খুঁজতে গেলে আপনি মাত্র তিনটি ছোট্ট রেফারেন্স পাবেন। কিন্তু ঘটনার বিস্তারিত অর্থাৎ, মহানবীর মেরাজে যাওয়া, বোরাকে চড়া, অতীতের নবী-রাসূলদের সাথে সাক্ষাৎ, জেরুসালেমে যাওয়া, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের নির্দেশ লাভ, বেহেশত-দোজখ পরিদর্শন, আরশে আজীমে গমন– এই সমস্ত বর্ণনা মুসলিম বিশ্বে এক ধরনের বিস্ময়কর ও মহাজাগতিক আবহ তৈরির জন্য পরবর্তীতে যোগ করা হয়েছে। কোরআনে এসবের কোনোটিরই উল্লেখ নেই।

ম্যারল ওয়েন ডেভিস এ ব্যাপারে বলেন,

ধর্মের ইতিহাস মাত্রেরই নানা রকম বাহুল্য বর্ণনা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থাকে। তাই ব্যাপারটি কোরআনে কতবার রয়েছে, সেটি বড় কথা নয়। কোরআনে এ ঘটনার উল্লেখ থাকার মানেই হলো এটি তাৎপর্যপূর্ণ।

রাত্রীকালীন সফরে জেরুসালেম যাওয়া এবং বেহেশতে গিয়ে ইহুদী-খ্রিস্টানদের অতি পরিচিত নবী ইবরাহীম (আ) থেকে শুরু করে অতীতের সকল নবী-রাসূলের সাথে সাক্ষাতের ঘটনা ছিলো মহানবীর (সা) জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। মুসলমানদের দৃষ্টিতে, এই ঘটনার মাধ্যমে অন্যান্য নবী-রাসূলগণও ঐশীবাণীর সর্বশেষ বাহক হিসেবে মোহাম্মদকে (সা) স্বীকার করে নিয়েছেন। এটি ছিলো আল্লাহরই হুকুম। ইসলাম ও তার অনুসারীরা যে সনাতন ইবরাহীমীয় ধারারই ধারাবাহিকতা মাত্র, এই সফরের মাধ্যমে সেই স্বীকৃতিও পাওয়া গেলো। এই ঘটনার আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, মোহাম্মদ (সা) এখন তাঁর গোত্রীয় অতীতকে পেছনে ফেলে পুরো দুনিয়ার সামনে তাঁর বাণী তুলে ধরতে প্রস্তুত। ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

মহানবীর মেরাজের ঘটনার মাধ্যমে গোত্রবাদকে পেছনে ফেলে মানবতাকে আলিঙ্গন করা হয়েছে। বলা যায়, ঘটনাটি হলো গোত্র পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ওঠে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছানোর একটি উদ্যোগ। এটিই হলো এই ঘটনার ধর্মতাত্ত্বিক তাৎপর্য।

মেরাজের ঘটনাটি ছিলো মহানবীর (সা) জীবনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। একইসাথে তাঁর নবুয়তী মিশনের নতুন একটি  ধাপের সূচনাও বটে। তবে এটি একটি নতুন পর্যায়ই শুধু নয়, এটি ছিলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। এ পর্যায়ে তিনি তাঁর গোত্রীয় জীবন চিরতরে পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। মক্কা শহরে কোরাইশদেরকে পরাভূত করার পরিবর্তে তিনি এই শহর ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে নব উদ্যমে মিশন শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

ইয়াসরিববাসীর সাথে বৈঠক

একদিন মোহাম্মদ (সা) ইয়াসরিব থেকে আগত একদল লোকের সাথে এক ছোট্ট মরুদ্যানে একটি বৈঠক করেন। ইয়াসরিব হলো মক্কা থেকে উত্তরে ১৫ দিন উটের পিঠে করে সফরের দূরত্বে অবস্থিত একটি শহর। প্রতিনিয়ত যুদ্ধ ও হানাহানির কারণে তারা যে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সে কথা তারা মহানবীকে (সা) জানালো। মহানবী (সা) তাদের সব কথা শুনলেন। জবাবে তাঁর মিশন, আল্লাহর একত্ববাদ, সৎভাবে জীবনযাপনের গুরুত্ব এবং জান্নাতে পুরস্কার লাভের কথা তাদেরকে বললেন। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো, তারা মহানবীর (সা) সব কথা শুনে অভিভূত হলো। মক্কার লোকেরা যেখানে এসব কথা শুনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতো, সেখানে এদের প্রতিক্রিয়া ছিলো সম্পূর্ণ বিপরীত। ইয়াসরিব থেকে আগত ছয়জনের এই দলটি সেদিন ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর সেদিনের বৈঠক শেষ হয়। যাওয়ার আগে তারা মহানবীর (সা) সাথে আবারো দেখা করার কথা দিয়ে যায়।

ইতোমধ্যে মক্কার পরিস্থিতি মোহাম্মদের (সা) জন্য চরম প্রতিকূল হয়ে উঠছিলো। এক পর্যায়ে তিনি অনুভব করলেন, ইয়াসরিবে চলে যাওয়া ছাড়া তাঁর অনুসারীদের পক্ষে আর কোনো পথ খোলা নেই। কিন্তু তখনকার পরিস্থিতিতে এটি ছিলো অকল্পনীয় ব্যাপার। এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অর্থ হলো, তাদের আর কোনো গোত্রীয় নিরাপত্তা বজায় থাকছে না। একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়েই সেখানে তাদের বাস করতে হবে। ড. আমিরা বেনিসন এ ব্যাপারে বলেন,

বেশ কয়েকটি গোত্র মিলে ছিলো ইয়াসরিবের সমাজ। এদের কেউ ছিলো পৌত্তলিক, কেউ আওস গোত্রের, কেউবা খাযরাজ গোত্রের, আবার কেউ কেউ ছিলো ইহুদী। ইহুদীদের তিনটি প্রধান গোত্র ছিলো সেখানে। তবে কর্তৃত্ব নিয়ে তৎকালীন ইয়াসরিবে অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছিলো। ক্ষমতা ও মর্যাদা লাভের জন্য তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগেই থাকতো। এই পরিস্থিতিতে তারা একজন মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন উপলব্ধি করলো। এরই মাঝে মোহাম্মদ (সা) সম্পর্কে তারা জানতে পারলো। তিনি তখন মক্কায় দাওয়াতী কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আরব উপদ্বীপের এই অঞ্চলটাতে তাঁর নাম ততদিনে ছড়িয়ে পড়েছিলো। ফলে তারা মনে করলো, এই ব্যক্তিই হয়তো তাদের চলমান বিরোধের নিষ্পত্তি করতে পারবেন, তিনিই হয়তো ন্যায়বিচারকের ভূমিকা পালন করতে পারবেন, তাঁর পক্ষেই হয়তো ইয়াসরিবে এসে তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধানে সহায়তা করা সম্ভব হবে।

এক বছর পর ইয়াসরিব থেকে আরেকটি প্রতিনিধিদল মহানবীর (সা) সাথে সাক্ষাৎ করতে আসলো। এই দলটি ছিলো আরো বড়। এবার তারা রাতের আঁধারে গোপনে দেখা করলো। এই বৈঠকে ইয়াসরিববাসী ও মোহাম্মদের (সা) মধ্যে একটি ঐক্যমত হয়। মহানবী (সা) তাদেরকে বললেন, ‘আমি তোমাদের জন্য, আর তোমরা আমার জন্য’। এই ঐক্যমতের ঘটনাটি ছিলো খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, তখনকার সময়ে এ ধরনের চুক্তি ছিলো একেবারেই নতুন ব্যাপার। সে হিসেবে এটি দুঃসাহসী সিদ্ধান্তও ছিলো বটে। কারণ, এই চুক্তি কোনো গোত্রীয় মৈত্রী, পারিবারিক বন্ধন কিংবা উপজাতীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে সম্পাদিত হয়নি। বরং জ্ঞাতিসম্পর্কের ঊর্ধ্বে ওঠে এমন এক গ্রাউন্ডে চুক্তিটি সম্পাদিত হয়, যা ছিলো সার্বজনীন। চুক্তিটির তাৎপর্য সম্পর্কে ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

এক দৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্তটি ছিলো অসামান্য দুঃসাহস, হিম্মত এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। নিজের গোত্র ও রক্তসম্পর্ক চিরতরে ত্যাগ করে অন্য কোথাও স্থায়ীভাবে বসবাস করার কথা এর আগে আরবে মোটেও শোনা যায়নি। এ ধরনের কাজ ছিলো রীতিমতো ব্লাসফেমি। অলঙ্ঘণীয় গোত্রব্যবস্থার ধারণা ছিলো আরবের সবচেয়ে শক্তিশালী ও চূড়ান্ত মূল্যবোধ। মোহাম্মদ এই ব্যবস্থাকে ত্যাগ করে ‘উম্মাহ’ নামে নতুন এক সমাজব্যবস্থার ধারণা প্রতিষ্ঠিত করেন, যা কোনো বংশ বা গোত্রীয় সম্পর্কের পরিবর্তে আদর্শের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। আরবদের কাছে এই পুরো ব্যাপারটি ছিলো একদম নতুন একটি বিষয়।

মহানবীকে হত্যার প্রচেষ্টা

মক্কার শাসকগোষ্ঠী মোহাম্মদের (সা) পরিকল্পনা টের পেয়ে গেলে ভয়াবহ পরিণতি ঘটে যেতে পারে। তাই কোরাইশরা সতর্ক হওয়ার আগেই মোহাম্মদ (সা) তাঁর সাথীদেরকে শহর ত্যাগের নির্দেশ দিলেন। পরবর্তী কয়েক মাস ধরে প্রতি রাতেই তাঁর অনুসারীদের কেউ না কেউ শহর ত্যাগ করতে লাগলো। মোহাম্মদ (সা), তাঁর ঘনিষ্ট সাথী আবু বকর (রা), তাঁর কিশোর চাচাতো ভাই আলীসহ (রা) গুটিকতক অনুসারী বাদে বাকিরা চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা কোনো রকম সন্দেহ করতে পারেনি।

ইতোমধ্যে কোরাইশরাও মোহাম্মদকে (সা) হত্যা করার পরিকল্পনা আঁটলো। ঠিক করা হলো, তাঁকে হত্যার অভিযানে মক্কার প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে অংশ নেবে। সেক্ষেত্রে মোহাম্মদের (সা) গোত্রের পক্ষে হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ গ্রহণ অসম্ভব হয়ে পড়বে, সেই চিন্তা থেকেই এই ব্যবস্থা।

এক রাতে তারা মোহাম্মদের (সা) বাড়ি ঘেরাও করে ফেললো। তাদের কাছে মনে হচ্ছিলো, তাঁর শোবার ঘরে কেউ একজন ঘুমিয়ে আছে। হত্যা করার উদ্দেশ্যে তারা খঞ্জর নিয়ে শোবার ঘরে ঢুকে পড়লো। কিন্তু তারা সেখানে মোহাম্মদের (সা) পরিবর্তে পেলো তাঁর চাচাতো ভাই আলীকে (রা)। মোহাম্মদ (সা) ততক্ষণে তাদের চোখের আড়ালে চলে গেছেন। বারনাবি রজারসন এ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে,

তিনি ছিলেন খুবই বিচক্ষণ ব্যক্তি। তারা তাঁকে হত্যা করতে গিয়েছিলো। এই হত্যা প্রচেষ্টা থেকে তিনি নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। তারপর আবু বকরকে সাথে নিয়ে মদীনায় যাত্রা করেন। মক্কা ত্যাগের আগে তিনি প্রত্যেকের আমানত পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর সততার ব্যাপারে জনগণের সমর্থন আদায় এবং তাঁর বিরোধীদের উপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে এটি কাজ করেছিলো।

আবু বকরকে সাথে নিয়ে মোহাম্মদ (সা) গোপনে মক্কা ত্যাগ করে নতুন ঠিকানা ইয়াসরিবে যাত্রা করেন। মক্কার লোকেরা তাঁকে ধরার জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছিলো। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তারা তাঁর গমন পথের পায়ের তাজা ছাপও খুঁজে বের করে ফেললো। ধাওয়াকারীরা সাওর পর্বত পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কিন্তু পর্বতের চূড়ায় ওঠেও তারা মোহাম্মদকে (সা) খুঁজে পায়নি, এমনকি তাঁর পায়ের ছাপও চিহ্নিত করতে পায়নি। বাধ্য হয়ে তারা মক্কায় ফিরে যায়। কিন্তু মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাথী আবু বকর (রা) তখনো সাওর পর্বতের একদম চূড়ায় একটি গুহার মধ্যে লুকিয়ে ছিলেন। বিপদ কেটে যাওয়ার পর তাঁরা ইয়াসরিবের দিকে যাত্রা করেন।

মদীনায় হিজরত

এই ঘটনাটি ঘটে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে। ততদিনে মোহাম্মদের (সা) বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে। তিনি একজন এতিম হিসেবে মক্কায় বেড়ে ওঠেছিলেন। চাচার বাণিজ্য কাফেলার সাথে অনেকবার সফরের কারণে বহির্বিশ্ব সম্পর্কে তাঁর জানাশোনা ছিলো। তিনি ছিলেন বিবাহিত। তাঁর কাছে নিয়মিত আল্লাহর বাণী নাজিল হতো। কিন্তু নিজ গোত্রের কাছেই তিনি প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। তিনি ও তাঁর প্রায় শ’দুয়েক অনুসারী মাতৃভূমিতে দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চরম অবমাননা ও নির্যাতনের শিকার ছিলেন। সর্বশেষ, লোকেরা তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। এমতাবস্থায় গৃহত্যাগ করে সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি স্থানে তাঁকে চলে যেতে হয়। এই ঘটনাটি ‘হিজরত’ হিসেবে পরিচিত, যার আক্ষরিক অর্থ হলো অতীতের সাথে ‘সম্পর্কচ্ছেদ’। এ ঘটনার পর মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর অনুসারীদের আর পেছনে ফিরে তাকানোর কোনো সুযোগ ছিলো না। এ ব্যাপারে বারনাবি রজারসন বলেন,

তিনি সেখানে ধর্মপ্রচারক হিসেবে গিয়েছিলেন। বিজেতা হিসেবে যাননি। ইয়াসরিববাসীরাই তাঁকে বলেছিলো, ‘এখানে আসুন এবং আমাদের মাঝে মধ্যস্থতা করে দিন। আমরা আপনাকে একজন রাসূল ও সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করবো। আপনার কথার উপর আমরা আস্থা রাখি।’ তিনি সেখানে দখলদার সেনাবাহিনী নিয়ে যাননি। একজন শরনার্থী ও নির্বাসিত ব্যক্তি হিসেবে, একজন সম্মানিত ও মর্যাদাবান নেতা হিসেবে সেখানে গিয়েছিলেন।

তবে ‘নাউ দে কল মি ইনফিডাল’ গ্রন্থের লেখিকা ননী দারভীশ বিষয়টিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন,

মোহাম্মদ মক্কায় ১৩ বছর ধরে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। সেখানে তার সর্বোচ্চ দেড়শ জনের মতো অনুসারী ছিলো। তিনি দূরদর্শী ব্যক্তি ছিলেন। ফলে তিনি জানতেন, মক্কায় থেকে তাদের সাথে লড়তে গেলে তিনি হেরে যাবেন। এ জন্য যথাসময়েই তিনি মক্কা ত্যাগ করেন। কারণ, তিনি তার বাণীকে আরো বেশি ছড়িয়ে দিতে চাচ্ছিলেন। এ জন্য মক্কার বাইরে তিনি এমন একটি উপযুক্ত জায়গা খুঁজছিলেন, যেখান থেকে সত্যিকার অর্থে মক্কার মানুষদেরকে আঘাত করতে পারবেন এবং মক্কা জয় করতে পারবেন।

ড. আমিরা বেনিসন বলেন,

হিজরত তথা মক্কা ছেড়ে মদীনায় চলে যাওয়া ছিলো মোহাম্মদের (সা) জীবনের একটি মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা।

মোহাম্মদের (সা) জীবনে হিজরতের ঘটনাটি ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের ইতিহাসেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবীর মক্কা ত্যাগের দিন থেকে ইসলামী ক্যালেন্ডারের যে সূচনা ঘটেছে, আজ পর্যন্ত সেই ক্যালেন্ডার মোতাবেকই ইসলামের সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ পালিত হয়। এর তাৎপর্য সম্পর্কে ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

খ্রিস্টানদের মতো নবীর জন্মদিনকে বিবেচনা না করে, নবীর হিজরতের দিনকে মুসলিম যুগের শুরু হিসেবে গণ্য করা হয়। গোত্রীয় স্পিরিটের সাথে সম্পর্কচ্ছেদকে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখা হয়েছে। এর মধ্যে অসাধারণ ধর্মীয় তাৎপর্য রয়েছে বলে আমি মনে করি।

মদীনায় নতুন জীবন

মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাহাবীরা মক্কার সাথে ইয়াসরিবের কোনো মিলই খুঁজে পেলেন না। ইয়াসরিব ছিলো মূলত একটি বিশাল মরুদ্যান। অনেকগুলো বস্তি নিয়ে শহরটি গড়ে ওঠেছে। প্রত্যেক বস্তিতেই একেকটা গোত্রের প্রাধান্য ছিলো। সেখানে গোত্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং এর পরিণামে দ্বন্দ্ব-সংঘাত ঘটতো।

মহানবীর (সা) সম্মানে পরবর্তীতে ইয়াসরিবের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় মদীনাতুন নবী তথা নবীর শহর। সংক্ষেপে বলা হয় মদীনা। এ ব্যাপারে বারনাবি রজারসন বলেন,

মহানবীর সাথীরা এসেছিলেন একদম খালি হাতে। মক্কার অভিজাত ব্যবসায়ী থেকে তাঁরা হঠাৎ করেই গরীব ও নিঃস্ব মানুষে পরিণত হলেন। বিত্তশালী মরুদ্যানটিতে তাঁরা পুরনো ছেঁড়া কাপড় পরে থাকতেন। নতুন পরিবেশে এসে রুটি-রুজির জন্য তাঁরা ভুট্টা চাষ করেছেন, মাদুর বুনেছেন। এভাবে তারা পরিস্থিতির সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছিলেন।

মদীনা মিউজিয়ামের কর্মকর্তা খালিদ আল খায়েরের সাথে এ বিষয়ে আমার নিম্নোক্ত কথাবার্তা হয়–

– মোহাম্মদ (সা) যখন মদীনায় আসেন, তখন মদীনার অবস্থা কেমন ছিলো?

তখনো মদীনা পরিপূর্ণ শহর হিসেবে গড়ে ওঠেনি বলতে পারেন, ছোট ছোট সম্প্রদায় মিলে

– তারমানে, বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায় মিলে মদীনার সমাজ গড়ে ওঠেছিলো?

হ্যাঁ, তাই মদীনার কেন্দ্রস্থলে মহানবী (সা) আনসারদের মূল অংশটি বসবাস করতেন কুবা কেবলাতাইন এলাকায় অনেকে বসবাস করতো মদীনার পূর্ব দক্ষিণাঞ্চলে ছিলো ইহুদীদের বাস অনেকগুলো গোত্র এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো সব মিলিয়ে পুরো অঞ্চলকে তখন মদীনা নামে ডাকা হতো

মসজিদে নববী

স্বাধীন পরিবেশে মোহাম্মদ (সা) মদীনায় একটি নিজস্ব মসজিদ নির্মাণ করেন। এই মসজিদটি ছিলো তাঁর ঘরের বর্ধিত অংশ। খালিদ আল খায়েরের সাথে এ প্রসঙ্গে আমার কথোপকথন–

– মদীনায় মহানবীর (সা) নির্মিত প্রথম মসজিদটি সম্পর্কে কিছু বলুন।

মদীনার কেন্দ্রস্থলে তিনি একটি জায়গা পেয়েছিলেন। সেখানেই তিনি মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন।

– এই জাদুঘরে মসজিদটির তৎকালীন আকৃতির একটি রেপ্লিকা রয়েছে দেখেছি। মদীনায় এখন যে মসজিদে নববী, সেটি দুনিয়ার অন্যতম বৃহৎ ও প্রধানতম মসজিদ। অন্যদিকে রেপ্লিকাটি একদম সাদামাটা। এর সাথে তো বর্তমান মসজিদটির বিশাল পার্থক্য রয়েছে…।

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন কিন্তু দেখুন, আমরা ১৪শ বছর আগের কথা বলছি তখন মসজিদটি ছিলো খুবই সাদামাটা দৈর্ঘ্যে ৫৫ মিটার, আর প্রস্থে ৩৫ মিটার তৎকালীন মদীনার অন্যান্য আবাসস্থলের মতোই এটি নির্মিত হয়েছিলো কাদামাটি দিয়ে ফাউন্ডেশনে ব্যবহার করা হয়েছিলো পাথর ছাদে ব্যবহৃত হয়েছিলো খেজুর গাছ মসজিদের পেছনের অংশের ছাদ খোলা রাখা হয়েছিলো

সেই মসজিদটিই কালের বিবর্তনে আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মসজিদে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে মসজিদে নববীতে একইসাথে প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষ নামাজ আদায় করতে পারে।

মোহাম্মদ (সা) মসজিদটিকে সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। এখানে তিনি শুধু ধর্মীয় কাজই করতেন না, অফিস হিসেবেও মসজিদটিকে তিনি ব্যবহার করতেন। এখানে বসে তিনি লোকদের নানা রকম বিরোধ মিটিয়ে দিতেন, বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন, পাবলিক ডিবেটের আয়োজন করতেন। ইহুদী, খ্রিস্টান, কাফের, এমনকি দাস-দাসীসহ যে কেউ সেখানে প্রবেশ করতে পারতো। সেখানে তাঁর সাথে বসে সবাই কথা বলতে পারতো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, মসজিদটি প্রতিষ্ঠার ফলে তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ এখানে এসে শান্তিপূর্ণভাবে ইবাদত করতে পারতেন।

আজানের প্রচলন

এবার তাঁরা নতুন এক সমস্যায় পড়লেন। নিরাপদে ইবাদত করার সুযোগ তো হলো, কিন্তু নামাজের সময় হলে লোকজনকে ডাকার জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থা তখনো পর্যন্ত ছিলো না। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, একদিন মহানবী (সা) সবাইকে মসজিদের আঙিনায় জড়ো করলেন। নামাজের জন্য ডাকার সবচেয়ে ভালো উপায় কী হতে পারে, সে বিষয়ে আলোচনা করা ছিলো উদ্দেশ্য। লোকজনকে খ্রিস্টানদের মতো ঘণ্টা বাজিয়ে ডাকা হবে, নাকি ইহুদীদের মতো সাইরেন বাজিয়ে ডাকা হবে, নাকি অন্য কোনো পদ্ধতিতে, যেমন– আগুন জ্বালিয়ে নামাজের জন্য আহ্বান করা হবে, তা নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা হলো। অবশেষে মানুষের কণ্ঠে নামাজের আহ্বান তথা আজান প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত হলো। এটি নতুন ধর্ম হিসেবে ইসলামকে বিশেষায়িত করে।

আজান দেয়ার জন্য মোহাম্মদ (সা) প্রথমে যাকে মনোনীত করেন, সেটিও ছিলো যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ছিলেন একজন মুক্ত আফ্রিকান দাস। তাঁর নাম ছিলো বেলাল (রা)। তিনি মক্কায় নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। উল্লেখ্য, তখন আরবের সর্বত্রই দাসব্যবস্থার প্রচলন ছিলো। মোহাম্মদ (সা) এই ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ না করলেও তিনি ও তাঁর সাহাবীরা বেলালের মতো আরো অনেক দাসকে মুক্ত করেছিলেন। নামাজের ওয়াক্তে মসজিদের ছাদে ওঠে বেলাল (রা) উচ্চস্বরে আজান দিতেন।

তখন থেকেই এটি মুসলমানদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। বিশ্বব্যাপী এখনো আজানের বাক্য হুবহু একইরকম। তবে স্থানভেদে এর সুরের পার্থক্য রয়েছে। সময়ের ব্যবধানে মসজিদ ও এর স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত মিনার ইসলামের অন্যতম প্রতীকী চিহ্নে পরিণত হয়েছে। ইসলামে মসজিদের তাৎপর্য সম্পর্কে ম্যারল ওয়েন ডেভিস বলেন,

মসজিদ নিছক ইবাদতের স্থান নয়। মসজিদ হলো সমাজের কেন্দ্রবিন্দু। কারণ, ইসলামের মিশন হলো মানুষকে সংশোধন করা। এই মিশন বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই মসজিদকে কেন্দ্র করে সমাজের জন্য কাজ করতে হবে। বিশেষ করে, অভাবী মানুষের জন্য সামাজিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে  হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে মসজিদ একইসাথে একটি শিক্ষাকেন্দ্রও বটে। মসজিদগুলো এ রকম হওয়াই বাঞ্ছনীয়। ইসলামের বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের জন্যই এটি সহায়ক। অথচ বর্তমানে অধিকাংশ মসজিদে এসব মোটেও দেখা যায় না। তাছাড়া মসজিদ শুধুমাত্র মুসলমানের জন্য নয়, বরং সকলের জন্য উন্মুক্ত হতে হবে। সবাই এখানে উষ্ণ অভ্যর্থনা লাভ করবে। কেননা, ইসলামের সামাজিক উদ্দেশ্য এবং সংস্কারমূলক মিশন শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্যই নয়, বরং এটি সকলের জন্য।

মদীনা সনদ

মোহাম্মদ (সা) নিছক নতুন একটি ধর্মের নবীমাত্র ছিলেন না। তিনি মদীনার শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নিজেকে  প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মসজিদের আঙিনায় বসেই তিনি যুগপৎভাবে এই দুটি দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এ কারণে দিনের অধিকাংশ সময় তাঁর মসজিদেই কাটতো। দায়িত্ব বেড়ে যাওয়ায় তিনি এমন একটি চুক্তিতে আসার প্রয়োজন অনুভব করলেন, যা শুধু তাঁর শাসনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিই দিবে না, মদীনার বিভিন্ন গোত্রের সাথে তাঁর সম্পর্কও এর ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। এই চুক্তিটিই মদীনার সনদ হিসেবে পরিচিত। ধারণা করা হয়, এটি দুনিয়ার প্রাচীনতম লিখিত সংবিধানগুলোর মধ্যে অন্যতম।

আরবে গোত্রীয় সম্পর্কের পরিবর্তে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলার এটিই ছিলো প্রথম উদ্যোগ। পৌত্তলিক, ইহুদী ও মুসলমান– সবাই যেন পারস্পরিক স্বার্থে কাজ করে, সেই জন্য মোহাম্মদকে (সা) পৌত্তলিক ও ইহুদী গোত্রগুলোর আস্থা অর্জন করতে হয়েছিলো।

জর্দানীয় রাজপরিবারের যুবরাজ হাসান বিন তালাল মদিনা সনদের উপর একজন বিশেষজ্ঞ। এ ব্যাপারে তার বক্তব্য হলো,

মুসলমান, ইহুদী এবং অন্যান্য সম্প্রদায় নিয়ে মদীনায় একটি নতুন বহুমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধান রচনা ছিলো অপরিহার্য। এর উদ্দেশ্য ছিলো জীবন, সম্পত্তি, উপাসনালয়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে মুসলিম, ইহুদী, খ্রিষ্টান এবং অন্যান্য অমুসলিমদের মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা। বিশেষ করে আহলে কিতাবদের মধ্যে যেন পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। এই সংবিধানে জনগণের অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিলো। এই দৃষ্টিতে আপনি একে মুসলমানদের ‘ম্যাগনা কার্টা’ বলতে পারেন। তৎকালীন মদীনা কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্র ছিলো না। সেটি ছিলো একটি সিভিল স্টেট। শাসক ও জনগণ উভয়ই ছিলো অভিন্ন আইনের অধীন।

মদীনা সনদের প্রাথমিক ভাষ্যের সম্পূর্ণ অংশ এখন আর পাওয়া যায় না। অবশ্য প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের লেখায় এর কয়েকটি সংস্করণ পাওয়া যায়। মহানবীর (সা) মৃত্যুর প্রায় শত বছর পর এগুলো লেখা হয়েছিলো। অন্যদিকে, মদীনা সনদ বলে আসলেই কিছু ছিলো কিনা, তা নিয়ে কোনো কোনো ঐতিহাসিক সন্দেহ পোষণ করে থাকেন। এ ব্যাপারে ইউনিভার্সিটি অব ব্যাকিংহামের পলিটিক্স অ্যান্ড কনটেম্পোরারি হিস্ট্রির অধ্যাপক জিউফ্রে অল্ডারম্যানের কথা হলো,

‘মদীনা সনদ’ বলে কি আসলেই কিছু ছিলো? আমরা তো কেবল একটি নির্দিষ্ট ঘরানার সূত্র থেকেই এ ব্যাপারে জানি, যাদের আবার বিশেষ পক্ষপাতিত্ব বা নির্দিষ্ট এজেন্ডা রয়েছে। কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন, তখন মোটেও কোনো সংবিধান ছিলো না, কোনো চুক্তিও ছিলো না। এগুলো পরবর্তীকালে বানানো হয়েছে। এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের অবস্থান বিরোধপূর্ণ। মুসলিম ঐতিহাসিকদের মতে, তখন একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিলো। নিশ্চিতভাবেই তখন একটি সংবিধানও ছিলো। মদীনা সনদটি যদি আপনি পড়ে ফেলেন, তাহলে দেখবেন তৎকালীন রাজনৈতিক সমাজতত্ত্বের বিবেচনায় তাতে চমৎকৃত হওয়ার মতো তেমন কিছু নেই। এটি মোটেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়।

তবে সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অ্যারাবিক স্টাডিজের অধ্যাপক হিউ কেনেডি মদীনা সনদের প্রামাণ্যতা ও তাৎপর্য সম্পর্কে বলেন,

মদীনা সনদের যেসব নথিপত্র পাওয়া যায়, সেগুলো যে আসলেই তখনকার, তা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এই সনদে যে ধরনের আরবি ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা বেশ প্রাচীন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এর মাধ্যমে যেসব বিষয়ের সমাধান করা হয়েছে, তৎকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় সেগুলো ছিলো যথেষ্ট বাস্তবসম্মত। মদীনার তৎকালীন গোত্রসমূহ, জনগণের সহায়-সম্পদ, বা এ জাতীয় বিষয়গুলোর ব্যাপারে মোহাম্মদের অবস্থান আসলে কী ছিলো, এটি খুবই… এটি নিশ্চয় কোনো সাম্রাজ্য গড়ে তোলার নীলনকশা ছিলো না।

মদীনা সনদ ইসলামী সরকারব্যবস্থার একদম প্রাথমিক মডেল হিসেবে পরিচিত। এতে নাগরিকদের অধিকার ও কর্তব্যের পাশাপাশি শাসকের দায়দায়িত্বের কথাও স্পষ্টভাবে বলা আছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এই সনদের মাধ্যমে প্রতিশোধ গ্রহণের গোত্রীয় প্রথা এবং ব্যক্তিগতভাবে প্রতিপক্ষের বিচার করার রীতি ভেঙে দিয়ে সবাইকে আইনের শাসনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছিলো। এ প্রসঙ্গে খালিদ আল খায়েরের সাথে আমার নিম্নোক্ত কথাবার্তা হয়েছে–

মদীনার সকল গোত্র সম্মিলিতভাবে এই সংবিধানে স্বাক্ষর করেছিলো

– ইহুদী ও পৌত্তলিকরাও?

একদম সবাই তারা সবাই স্বাক্ষর করেছিলো, যাদেরকে বলা হয়েছে উম্মাহ

– উম্মাহ মানে কমিউনিটি?

হ্যাঁ এই চুক্তির ফলে মদীনার নিরাপত্তার দায় সকলের উপরেই ন্যস্ত ছিলো আইনের দৃষ্টিতে সবাই ছিলো সমান বিদ্যমান আইনের ভিত্তিতে তারা রাষ্ট্রটি পরিচালনা করেছিলেন যেমন, দুজন ইহুদীর মধ্যে ঝগড়া হলে এর মীমাংসার জন্য তারা মহানবীর (সা) কাছে যেতো তখন তিনি এর ফায়সালা করতেন ইহুদী আইন অনুযায়ী এক্ষেত্রে তিনি ইসলামী আইন প্রয়োগ করতেন না একটি পরিপূর্ণ আদালতব্যবস্থা সেখানে ছিলো একটি রাষ্ট্র হতে গেলে যা যা লাগে, তার সবই সেখানে ছিলো এই দৃষ্টিতে, তৎকালীন আরবে তিনি একটি পরিপূর্ণ সভ্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে গেছেন

বিশপ মাইকেল নাজির আলী বলেন,

মদীনা সনদের একটি ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, এতে আরব পৌত্তলিক, আনসার ও মুহাজির উভয় ধরনের মুসলিম, ইহুদী ও খ্রিস্টানসহ নগরীর সবাইকে একই উম্মাহ তথা জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। বর্তমানে অবশ্য মুসলমানরা ‘উম্মাহ’ বলতে বিশ্ব মুসলিম সমাজকে বুঝিয়ে থাকেন। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্রের প্রথম সংবিধানে শব্দটি এই অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। তাই আমাকে যখন কেউ বলে, ‘আমরা একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই’, আমি তখন জিজ্ঞেস করি, ‘এটি কি মদীনা রাষ্ট্রের মতো হবে, নাকি হবে না? যদি না হয়, তাহলে এর কারণ কী?’

মোহাম্মদ (সা) যতদিন বেঁচেছিলেন ততদিন কোনো ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই মদীনা সনদ পুরোপুরি কার্যকর ছিলো। তবে তাঁর মৃত্যুর পর প্রথমবারের মতো এতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়। আরো পরে পরবর্তীকালের মুসলিম শাসকরা একে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করেন। ম্যারল ওয়েন ডেভিস এ ব্যাপারে বলেন,

এটি বর্তমানে আমাদের অন্যতম বড় সমস্যা। আমার কাছে মহানবীর (সা) জীবনী এবং কোরআনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, সহাবস্থান অর্থে বহুত্ববাদকে মেনে নেয়া। সমাজে নানান ধরনের বিশ্বাস, মত, পথ ইত্যাদি থাকবেই। সবাই মিলেই একটি সমাজ তথা একটি উম্মাহ হিসেবে গড়ে ওঠতে হবে। মুসলমানরা এই শিক্ষাকে অবজ্ঞা করছে, দেখতে পাচ্ছি। বর্তমানে মুসলমানরা বহুত্ববাদকে সমাজ গঠনের প্রধান মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা আসলে মহানবীর (সা) শিক্ষাকেই অগ্রাহ্য করেছে।

কোরাইশদের হুমকি

মোহাম্মদ (সা) এবং তাঁর সাহাবীরা মদীনায় এসেছিলেন একদম নিঃস্ব অবস্থায়। তবে মক্কায় তাঁরা প্রতিনিয়ত যে ধরনের অত্যাচার সইতেন, এখানে তা ছিলো না। শত্রুরা তখনো তাদেরকে বিনাশ করার হুঙ্কার দিয়ে যাচ্ছিলো। গোত্রভিত্তিক আরব সমাজে প্রতিশোধ গ্রহণের প্রবৃত্তি প্রবল থাকায় এই হুমকিকে আমলে না নিয়ে উপায় ছিলো না।

ফলে মদীনায়ও মুসলমানরা নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে সংকটে পড়ে গেলো। ক্ষমতাধর যে শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারে মোহাম্মদকে (সা) মক্কা ছাড়তে হয়েছিলো, যারা তাঁর অনুসারীদের উপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিলো, তাদের সম্পত্তি দখল করেছিলো, বেঁচে থাকার ন্যূনতম অবলম্বনটুকু পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছিলো, তারা তখনো মুসলমানদেরকে নির্মূল করার পরিকল্পনা করছিলো। এই বিপজ্জনক শত্রুকে মোকাবেলার একটা উপায় খুঁজে বের করা তখন মোহাম্মদের (সা) জন্য ছিলো জরুরি।

যুদ্ধের আয়াত

এই পরিস্থিতিতে তাঁর উপর ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু ওহী নাজিল হয়। যারা তাঁদেরকে বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত করেছে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়। কোরআনের এই আয়াতগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা নিয়ে এখন পর্যন্ত বিতর্ক রয়ে গেছে। অনেকের মতে, এগুলো হলো আত্মরক্ষার সাময়িক প্রয়োজনে যুদ্ধের বৈধতার দলীল। অন্যদিকে, মহানবীর (সা) অনুসারী নয়, এমন যে কাউকে হত্যা করার বৈধতার দলীল হিসেবে কেউ কেউ এসব আয়াতকে ব্যবহার করে থাকে। রবার্ট স্পেনসার এ ব্যাপারে বলেন,

কোরআনে সূরা বাকারার ১৯১ ও ২১৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ফেতনা-ফ্যাসাদ হলো হত্যার চেয়ে গুরুতর অপরাধ…। অন্যভাবে বললে, ‘কোরাইশরা যদি নির্যাতন করতে থাকে, তাহলে তাদেরকে হত্যা করার পূর্ণ অধিকার তোমাদের আছে’– এ ধরনের অবস্থান ইসলামী নৈতিকতার এক ধরনের দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। কোনো নৈতিক অবস্থান ইসলামের পক্ষে হলেই কেবল তা ভালো, অন্যথায় তা না মানলেও চলে। এমন মনে করা হলে ইসলামী নৈতিকতার কোনো চূড়ান্ত ভিত্তি থাকে না। যুদ্ধ সংক্রান্ত এই মূলনীতি ছাড়াও অনেকগুলো হাদীসে বর্ণিত মোহাম্মদের আরেকটি বাণী রয়েছে। তিনি প্রায় সময় বলতেন– “যুদ্ধ হলো এক ধরনের প্রতারণা।” তার অনুসারীরা যে প্রতিবেশী এবং অন্যান্যদের ব্যাপারে সাধারণত মারমুখী ও যুদ্ধন্মোখ হয়ে থাকে, দুঃখজনকভাবে এই মানসিকতার পেছনে রয়েছে ইসলামের যুদ্ধ সংক্রান্ত এই নীতি এবং মোহাম্মদের উল্লিখিত এই হাদীসটি।

তবে অধ্যাপক তারিক রমাদান এ ব্যাপারে বলেন,

নির্যাতনের শিকার হলেই কেবল যুদ্ধ সংক্রান্ত কোরআনের এই অনুমোদন কার্যকর হবে। কেউ আপনাকে আক্রমণ করতে থাকলে প্রতিরোধ করার অধিকার নিশ্চয় আপনার রয়েছে। এ কারণেই ক্লাসিকাল ফিকাহ শাস্ত্রের মূলধারায় একে আত্মরক্ষামূলক জিহাদ বলা হয়। অর্থাৎ, আপনি যদি নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে অধিকারের জায়গা থেকে আপনি এর প্রতিরোধ করতে পারবেন। এখন এ জাতীয় কিছু লোক এবং গুটিকতক মুসলিম গ্রুপ এই আয়াতকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। তারা বলছে, ‘বিরোধীদের হত্যা করা আমাদের জন্য বৈধ এবং আমাদের যুদ্ধ করার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে।’ বলাবাহুল্য, তাদের এই দাবি সম্পূর্ণ ভুল। কোরআনের আয়াতে এ ধরনের কিছু বলা হয়নি। আয়াতে বলা হয়েছে– যদি তারা তোমাকে আক্রমণ করে, তাহলে তা প্রতিরোধ করার অধিকার তোমার রয়েছে। কারণ, দিন শেষে এটি বাঁচামরার প্রশ্ন।

বদর যুদ্ধ

যা হোক, মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর অনুসারীগণ এক পর্যায়ে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়লেন। কোরআনের এই আয়াতগুলোকে তিনি বড়জোর কোরাইশদের বাণিজ্য কাফেলার উপর আক্রমণের বৈধতা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে মহানবী (সা) শুনতে পেলেন, কোরাইশদের একটি বিশাল বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়া থেকে মক্কায় ফিরে যাচ্ছে। কাফেলাটিকে তিনি মরুভূমিতেই জব্দ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি যে এ রকম কিছু করতে পারেন, কোরাইশরা তা আঁচ করতে পেরেছিলো। তাই তারা কাফেলাকে মদীনার পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে মোহাম্মদের (সা) মোকাবেলায় একটি সেনাবাহিনী পাঠালো। উভয় বাহিনীই মরুভূমির মধ্যে একটি বিচ্ছিন্ন পানির কূপের কাছে বদর প্রান্তরে মুখোমুখি হলো। অধ্যাপক হিউ কেনেডি বলেন,

মক্কার কোরাইশ বাহিনী এবং মদীনার মোহাম্মদের বাহিনী বদর প্রান্তরে মুখোমুখি হলো। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধটি শেষ হয়ে যায়। যুদ্ধে মোহাম্মদের সেনাসংখ্যা নিশ্চিতভাবেই এক হাজারের কম ছিলো। আনুমানিক ৩’শ থেকে ৪’শ জন হবে। আর কোরাইশদের সেনাসংখ্যা ছিলো আনুমানিক ৯’শ জনের মতো। আমরা যদিও সবসময় বলি, মক্কার বাহিনীর সেনাসংখ্যা মুসলমানদের চেয়ে বেশি ছিলো। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা আসলে কী ছিলো, তা জানার কোনো সত্যিকার পদ্ধতি আমাদের কাছে নেই।

‘জিহাদ: ফ্রম কোরআন টু বিন লাদেন’ গ্রন্থের লেখক, পাদরি এবং অধ্যাপক রিচার্ড বোনি বলেন, 

মহানবী ছিলেন মদীনায় নির্বাসিত। তাই একদৃষ্টিতে মক্কা ও মদীনার মধ্যে সংঘটিত এই যুদ্ধটি ছিলো একটি মতাদর্শিক যুদ্ধ। ব্যাপারটা যেহেতু ঘটেনি, তাই নিশ্চিতভাবে বলতে না পারছি না; তবে আমরা অনুমান করতে পারি– মক্কাবাসীরা জয়ী হলে তাদের চোখে যারা বিদ্রোহী, অর্থাৎ মুসলমানদেরকে তারা একেবারে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতো। কারণ, মক্কাবাসীর জন্য তারা ছিলো বড় ধরনের হুমকি।

যুদ্ধে মক্কাবাসীরা পরাজিত হয়। এর ফলে মদীনাবাসীরা সাময়িকভাবে স্বস্তি লাভ করে। মক্কা ও মদীনার মধ্যে আধিপত্যের লড়াইয়ের প্রথম পর্বে মোহাম্মদ (সা) বিজয়ী হন। আধুনিক যুদ্ধবিদ্যার মানদণ্ডে একে যুদ্ধ বলা বেশ কঠিন। একে বরং খণ্ডযুদ্ধ বলাই ভালো। কিন্তু এর তাৎপর্য ছিলো ব্যাপক। এই প্রথমবারের মতো মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাহাবীরা আল্লাহর পথে কোনো যুদ্ধে শরীক হলেন। কোরাইশদের বিপক্ষে এই অপ্রত্যাশিত বিজয়ে তাঁরা ছিলেন দারুণ উৎফুল্ল। সমগ্র আরব জুড়ে মোহাম্মদের (সা) ব্যাপক সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কোরাইশদের জন্য এটি ছিলো অত্যন্ত লজ্জাজনক ব্যাপার। তাই বদর যুদ্ধের স্মৃতি ভুলে যাওয়া কিংবা মুসলমানদেরকে ক্ষমা করে দেয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিলো। এই অপমানের শোধ তোলার জন্য তারা ছিলো বদ্ধপরিকর। অধ্যাপক হিউ কেনেডি এ ব্যাপারে বলেন,

তাদের মনোভাবের সারকথা হলো, মদীনায় যাওয়ার কিছুদিনের মাঝেই মোহাম্মদ যে মর্যাদা লাভ করেছিলেন, অবশ্যই তা নষ্ট করতে হবে। এটাও ঠিক যে, মদীনায় তাঁর অনুসারীদের জন্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ছিলো দারুণ এক পুরস্কার। এই সম্পদ বণ্টন করে দেয়ায় তাঁদের কাছে মোহাম্মদের অবস্থান অনেক অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছিলো।

মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর অনুসারীদের কাছে বদর যুদ্ধে জয় লাভ করা ধর্মীয়ভাবে ছিলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি ছিলো ঈমানের সত্যতার প্রমাণ, যা তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। এমনকি গত ১৪’শ বছর ধরে তাঁর অনুসারীদেরকেও এই বিজয় অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে। বনী ইসরাইলের মিশর ত্যাগ করে লোহিত সাগর পাড়ি দেয়ার ঘটনার মতো বদরের বিজয়কেও মুসলমানরা আজ অবধি সরাসরি আল্লাহর সাহায্য বলেই মনে করে।

কেবলা পরিবর্তন

বিজয়ের কিছুদিন পর মোহাম্মদ (সা) একদিন নামাজ আদায় করছিলেন। ঠিক তখন তিনি একটি ওহী লাভ করেন। এর মাধ্যমে তিনি ও তাঁর অনুসারীদের আরো সুনির্দিষ্ট ও স্বতন্ত্র পরিচয় নির্ধারিত হয়। এতে মুসলমানদেরকে নামাজ আদায়ের দিক অর্থাৎ কেবলা পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়া হয়। এতদিন তিনি ও তাঁর সাহাবীরা ইহুদী-খ্রিস্টানদের মতোই মদীনা থেকে উত্তরে জেরুসালেমের দিকে ফিরে নামাজ আদায় করতেন। ওহী নাজিলের সাথে সাথে তিনি জামায়াতে নামাজ আদায়কালেই দিক পরিবর্তন করে নতুন কেবলা মক্কার দিকে ফিরে দাঁড়ালেন এবং সাহাবীদের নিয়ে বাকি নামাজ আদায় করলেন। এ কারণে সেই মসজিদটিকে বলা হয় মসজিদে কেবলাতাইন অর্থাৎ দুই কেবলার মসজিদ।

এই পরিবর্তনকে আপাতদৃষ্টিতে সাদামাটা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এর তাৎপর্য বেশ গভীর। কারণ, এর মাধ্যমে একটি নতুন ও মর্যাদাপূর্ণ পরিচয়ের সূচনা ঘটে। সেটি হলো, মুসলমানদের ইবাদতের পদ্ধতি ইহুদী-খ্রিস্টানদের থেকে ভিন্ন। এছাড়া বর্তমানে এর তাৎপর্য হলো, মুসলমানরা দুনিয়ার যেখানেই থাকুক না কেন, সবাই একই দিকে অর্থাৎ মক্কার দিকে ফিরে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে। এটি ঐক্যের প্রতীক। এ প্রসঙ্গে বারনাবি রজারসন বলেন,

জেরুজালেম থেকে মক্কার দিকে কেবলা পরিবর্তনের ঘটনাটি বেশ দুবোর্ধ্য। ইসলামের প্রতি বিরূপ মনোভাবসম্পন্ন কিছু বিশ্লেষকের মতে, প্রথম দিকে ইসলামের অনেক উপাদান ইহুদী-খ্রিষ্টীয় ধারার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলো। যেমন– ইহুদী-খ্রিস্টানদের পবিত্র ভূমির প্রতি মুসলমানদের আকর্ষণ ইত্যাদি। তখন পবিত্র ভূমিকে কেন্দ্র  করে যেসব সমস্যা ছিলো, সেসব দূর করে একটি একক বিশ্বাসব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সংস্কার আন্দোলন চলছিলো। এই আন্দোলনের পরিণতি হিসেবে ইসলামের মতো নতুন একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে ঠিকই, তবে এটি পূর্ববর্তী ইহুদী-খ্রিস্টান ধারার উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিলো।

ইমেরিটাস অধ্যাপক জেরাল্ড হটিং বলেন,

ইসলাম স্বতন্ত্রভাবে নিজের প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলতে চেয়েছিলো, এমনটি কেউ মনে করতেই পারে। ইসলাম যে নিজস্ব আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে মক্কাকে গড়ে তুলেছে, তাও তো সত্য। সুতরাং কেউ ভাবতেই পারে, ইসলামের পূর্বেকার ব্যবস্থাগুলো থেকে স্বতন্ত্র একটি বিশ্বাসব্যবস্থা হিসেবে নিজেকে পৃথক রাখতে সচেতনভাবেই মক্কাকে কেবলা হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে।

ইহুদী-মুসলিম টানাপড়েন

তবে আরো বেশি করে মুসলিম পরিচয়ের দিকে ঝুঁকে পড়াকে মদীনার সবাই পছন্দ করেনি। বিশেষ করে কিছু ইহুদী গোত্র এর বিরোধী ছিলো। অধ্যাপক জিউফ্রে অল্ডারম্যান এ ব্যাপারে বলেন,

জেরুসালেমের পরিবর্তে অন্য কোনো দিকে ফিরে প্রার্থনা করা উচিত– এমন ধরনের চিন্তাভাবনার প্রেক্ষিতে তৎকালীন আরব উপদ্বীপের ইহুদী গোত্রগুলোর মধ্যে সন্দেহ জেগে ওঠা যে স্বাভাবিক ছিলো, তা আমি নিশ্চিতভাবেই অনুমান করতে পারি।

নামাজের নতুন কেবলা নির্ধারণের ব্যাপারটিকে ইহুদী গোত্রগুলো মোহাম্মদের (সা) সাথে তাদের সম্পর্কের অবনতি ও তাদের অবাধ্যতার পরিণতি বলে ধারণা করলো। অধ্যাপক হিউ কেনেডি এ ব্যাপারে বলেন,

ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্কটি বেশ জটিল ছিলো। ইহুদী গোত্রগুলো মোহাম্মদকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে মেনে নিতে পারছিলো না। কারণ, এতে করে তাদের ধর্মগ্রন্থ, নিজস্ব ঐতিহ্য ইত্যাদির বিপক্ষে চলে যেতে হয়। ফলে তারা একটি মৌলিক সমস্যার মধ্যে পড়ে গেলো। অন্যদিকে বাণিজ্য ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ছিলো আরেকটি বড় ইস্যু। রুপার বাজার, মেটাল ওয়ার্ক ইত্যাদি সহ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তখন প্রচণ্ড প্রতিযোগিতা ছিলো। মক্কা থেকে সদ্য আগত মোহাম্মদের অনুসারীরা স্থানীয় অর্থনীতির উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছিলো।

ইহুদী গোত্রগুলোর সাথে দিন দিন সম্পর্কের অবনতি ঘটার পাশাপাশি মোহাম্মদের (সা) সাফল্য ও ক্ষমতাও ক্রমে বাড়ছিলো। মক্কার সাথে বিরোধের বিষয়ে তিনি ইহুদীদের সমর্থন আশা করেছিলেন। কিন্তু তারা মক্কার কোরাইশদের সাথে লাভজনক বাণিজ্যিক সম্পর্ক ত্যাগ করতে রাজি ছিলো না। প্রচলিত মুসলিম বর্ণনা অনুযায়ী, ইহুদী গোত্রগুলো এক পর্যায়ে মোহাম্মদের (সা) শত্রুদের সাথে গোপন বৈঠক করতে থাকে। এছাড়া কিছু পৌত্তলিক গোত্র ইসলাম গ্রহণ করলেও মোহাম্মদের (সা) সাফল্যে তারা অসন্তুষ্ট ছিলো। ফলে তারাও তাঁর বিরুদ্ধে চলে গেলো। মোহাম্মদ (সা) এবার ভেতর-বাহির উভয় দিক থেকে সামগ্রিক হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়লেন।

বনু কাইনুকা অভিযান

বদর যুদ্ধের কিছুদিন পরই মদীনায় ইহুদীদের নিয়ে মোহাম্মদ (সা) প্রথমবারের মতো বড় ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়লেন। মক্কার কোরাইশদের সাথে ইহুদী গোত্রগুলোর একাধিক গোপন বৈঠকের তথ্য তিনি জানতে পারেন। তাঁর আশংকা ছিলো, কোরাইশরা আক্রমণ করে বসলে ইহুদী গোত্রগুলো হয়তো পুরোপুরিভাবে তাদের পক্ষে চলে যাবে এবং তাঁকে শেষ করার জন্য কোরাইশদেরকে সহায়তা করবে। তাই তিনি ইহুদীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন অনুভব করলেন। একদিন তিনি মদীনার দক্ষিণে একটি ইহুদী গোত্রে (বনু কাইনুকা) গিয়ে তাদের দুর্গ অবরুদ্ধ করে রাখলেন। দুই সপ্তাহ ব্যাপী অবরোধের পর তারা আত্মসমর্পণ করে। তারপর তাদেরকে মদীনা থেকে বের করে দেয়া হয়। অধ্যাপক জন এসপোজিটো এই ঘটনা ব্যাখ্যা করে বলেন,

মদীনা সনদে বলা ছিলো, বিভিন্ন গোত্র এবং বিশ্বাসের লোকজন একসাথে মিলেমিশে মদীনায় বসবাস করতে পারবে। সে মোতাবেক ইহুদীদেরও নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ধর্মবিশ্বাস নিয়েই সমাজে বসবাসের অধিকার ছিলো। কিন্তু এর বিনিময়ে শর্ত ছিলো রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকতে হবে। কিন্তু তারা কী করেছিলো? তারা রাষ্ট্রের সাথে সুস্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলো, শত্রুদের সাথে হাত মিলিয়েছিলো এবং মদীনার সমাজের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে তুলেছিলো। ইহুদীদের সবাই এর সাথে নিশ্চয় ছিলো না। তাদের একটি গ্রুপ এর সাথে জড়িত ছিলো।

ইহুদী গোত্রগুলোর সাথে মোহাম্মদের (সা) সম্পর্কের স্বরূপ কী ছিলো, তা বহুল আলোচিত একটি বিষয়। বেশিরভাগ মুসলিম স্কলার মনে করেন, মদীনার সংবিধান ছিলো উভয় পক্ষের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি। ফলে কিছু ইহুদী গোত্র মোহাম্মদের (সা) শত্রুদের সাথে হাত মেলানোর কারণে সেই চুক্তি ভঙ্গ হয়ে যায়। কিন্তু অনেকে এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করেন। এমনই একজন অধ্যাপক জিউফ্রে অল্ডারম্যান এ ব্যাপারে বলেন,

এটি এমন মতবিরোধপূর্ণ একটি বিষয়, যার সমাধান ঐতিহাসিকরা করতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, এ বিষয়ে স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য কোনো সমসাময়িক ইহুদী সূত্রের বর্ণনা আমাদের কাছে নেই। তাই তারা একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলো এবং পরবর্তীতে তা ভঙ্গ করেছিলো, এমনটি আপনি মনে করতে পারেন। আবার আপনি এমনটিও ভাবতে পারেন, ইহুদীদের সাথে তখন যে আচরণ করা হয়েছিলো, পরবর্তীতে তাকে ন্যায্যতা দেয়ার উদ্দেশ্যে মুসলিম ঐতিহাসিকরা হয়তো মনগড়া চুক্তি সম্পাদনের কথা বলেছেন।

বারনাবি রজারসন এ ব্যাপারে বলেন,

এই ধনাঢ্য ইহুদী গোত্রগুলো প্রত্যেকটি ঘটনায় রাজনৈতিক প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলো। তাই তাদেরকে বহিষ্কার করাটা বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিলো। দেখুন, ইহুদীরা ছিলো মদীনায় প্রায় সমস্ত ভূ-সম্পত্তির মালিক। উর্বর উপত্যকাগুলোও ছিলো তাদের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে, মহানবী একদম রিক্ত হস্তে, শরনার্থী হিসেবে মদীনায় এসেছিলেন। কিন্তু তারা নিজেরাই চুক্তিভঙ্গ করে শত্রুদের সাথে হাত মেলানোর মাধ্যমে মহানবীকে তাদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেয়ার সুযোগ করে দিলো। এর মাধ্যমে তিনি মদীনার একচ্ছত্র নেতা হয়ে ওঠলেন।

তখন বিশ্বাসঘাতকতার প্রচলিত শাস্তি ছিলো মৃত্যুদণ্ড। তারপরও মোহাম্মদ (সা) তা বাস্তবায়ন না করে তাদেরকে শুধু মদীনা থেকে নির্বাসিত করেছিলেন। এ থেকে বুঝা যায় তিনি তখনো অন্যদের সাথে এক ধরনের সমঝোতার প্রত্যাশা করছিলেন। কিন্তু দুই পক্ষের সম্পর্কের মধ্যে ফাটল রয়েই গিয়েছিলো।

উহুদ যুদ্ধ

আরেকটি ঘটনা মদীনার পরিস্থিতিকে তখন আরো উত্তপ্ত করে তোলে। বদর যুদ্ধের প্রায় এক বছর পর কোরাইশরা আগের প্রতিশোধ নিতে মদীনা আক্রমণ করতে আসে। এবার তাদের বাহিনী ছিলো মোহাম্মদের (সা) বাহিনীর প্রায় তিন গুণ বড়। এটি কোনো মামুলী গোত্রীয় বিবাদ ছিলো না। এটি ছিলো মুসলমানদেরকে চিরতরে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ।

মোহাম্মদ (সা) আবারো তাদেরকে মদীনার বাইরে মোকাবেলা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। স্থানটি ছিলো উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে। কিন্তু তাঁর সেনাসংখ্যা ছিলো খুবই কম। এর একটা কারণ ছিলো, ইহুদী গোত্রগুলো তাদের ধর্মীয় পবিত্র দিন সাবাতের অজুহাতে যুদ্ধ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। এছাড়া মোহাম্মদের (সা) একজন সেনাপতি (আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই) প্রায় তিনশ সৈন্য নিয়ে তাঁর পক্ষ ত্যাগ করে ময়দান ছেড়ে চলে যায়। অন্যদিকে, মক্কাবাসীরা ছিলো প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত। এই যুদ্ধে কোনো পক্ষই প্রতিপক্ষের চূড়ান্ত ক্ষতিসাধন করতে পারেনি। চূড়ান্ত ফয়সালা হওয়ার আগেই যুদ্ধটি শেষ হয়ে যায়। অধ্যাপক হিউ কেনেডি এ ব্যাপারে বলেন,

যুদ্ধে দুই পক্ষই কঠিন লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলো। যুদ্ধের ফলাফল ড্র ছিলো বলা যায়। তবে মদীনার মুসলিম সমাজ ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলো। এটাই ছিলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

বদর যুদ্ধের সাথে উহুদ যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, মক্কাবাসী এবার মদীনার অভ্যন্তরীণ সহায়তা পেয়েছিলো। প্রচলিত মুসলিম বর্ণনা মতে, মদীনার কয়েকটি ইহুদী গোত্র সক্রিয়ভাবে মোহাম্মদের (সা) শত্রুদেরকে সহায়তা করেছিলো।

খন্দকের যুদ্ধ

কোরাইশদের সাথে তৃতীয় এবং সর্বশেষ যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিলো ৬২৭ খ্রিস্টাব্দে। ততদিনে মদীনায় মোহাম্মদের (সা) আগমনের পাঁচ বছর পার হয়েছে। কোরাইশরা এবার ১০ হাজার সৈন্যের বিশাল একটি বাহিনী নিয়ে এসেছে। বিপরীতে মোহাম্মদ (সা) মাত্র তিন হাজার সেনা সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। এই স্বল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে কোরাইশদের বিপরীতে সম্মুখ সমরে মুখোমুখি হওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাই তিনি কোরাইশদের মোকাবেলায় নতুন কৌশল গ্রহণ করলেন। মদীনার প্রতিরক্ষা তুলনামূলকভাবে সহজ ছিলো। কারণ, শহরটি ছিলো পাথুরে পাহাড় বেষ্টিত। তবে উত্তর দিকটি উন্মুক্ত থাকায় মদীনা ছিলো অরক্ষিত। এই দিকটি সুরক্ষিত করতে মোহাম্মদ (সা) খুব সহজ একটি কৌশল অবলম্বন করলেন। তিনি পুরো উত্তর দিক জুড়ে গভীর পরিখা খুঁড়লেন। কোরাইশদের এগিয়ে আসতে বাধা দেয়ার ক্ষেত্রে এই পরিখাই মূল ভূমিকা পালন করেছিলো। এই যুদ্ধকে তাই পরিখার যুদ্ধ বা খন্দকের যুদ্ধ বলা হয়।

খন্দকের যুদ্ধ যেখানে সংঘটিত হয়েছিলো, সেই অঞ্চলটি বর্তমানে আধুনিক মদীনা নগরীর অংশ। তখন যুদ্ধে দুই বাহিনীর মাঝখানে ছিলো পরিখা। মক্কার বাহিনী ছিলো বিশাল। দৃষ্টিসীমার শেষ পর্যন্ত তাদের বাহিনী দেখা যেতো। পরিখার ফলে তারা অবধারিতভাবেই কঠিন বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে গেলো। তারা কার্যত কোনো কিছুই করতে পারছিলো না। মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর বাহিনী যে খন্দক তৈরি করে রেখেছেন, তা অতিক্রম করার কোনো প্রস্তুতি তাদের ছিলো না। অন্যদিকে, মোহাম্মদ (সা) ধীরেসুস্থে সময় কাটাচ্ছিলেন। মক্কার লোকেরা হতাশ হয়ে কখন এলাকা ত্যাগ করে, সেই অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। অধ্যাপক হিউ কেনেডি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন,

পরিখার কারণে কোরাইশ বাহিনীর ঘোড়াগুলো শহরে প্রবেশ করতে পারছিলো না। খন্দকের এই ঘটনা মুসলমানদের কাছে মোহাম্মদের বিচক্ষণ নেতৃত্ব ও কমান্ডিংয়ের নিদর্শন হিসেবে শত শত বছর ধরে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই ব্যতিক্রমী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ফলে মক্কার বাহিনী একদম অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। এতে তাদের রণকৌশল অকার্যকর হয়ে পড়েছিলো।

বনু কোরাইযার বিশ্বাসঘাতকতা

মুসলিম বর্ণনা মতে, দুই সপ্তাহ পর মক্কার সেনাবাহিনীর রসদ ফুরিয়ে যেতে শুরু করে। ফলে তারা তাদের এক গোপন মিত্রকে মদীনার ভেতর থেকে মুসলম বাহিনীর উপর আক্রমণ করতে অনুরোধ করে। বলাবাহুল্য, মিত্রটি ছিলো ইহুদী গোত্র বনু কোরাইযা।

এতদিন পর্যন্ত ইহুদী গোত্রগুলো মোহাম্মদের (সা) শত্রুদের সাথে শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য করে এসেছিলো। অথবা, বড়জোর মোহাম্মদের (সা) পক্ষে অস্ত্র ধারণ করতে অস্বীকার করেছিলো। কিন্তু এবার তারা মুসলমানদেরকে আক্রমণ করার ষড়যন্ত্র করেছিলো। এ ব্যাপারে রবার্ট স্পেনসার বলেন,

বনু কোরাইযা মোহাম্মদ ও মুসলমানাদের সাথে মদীনার ভেতরেই ছিলো। মোহাম্মদের সাথে তারা একটি চুক্তিতেও আবদ্ধ ছিলো। কিন্তু তারা মদীনার অপর দুই ইহুদী গোত্র বনু নাজীর ও বনু কাইনুকার সাথে কৃত আচরণ প্রত্যক্ষ করেছে। এ কারণেই তারা মোহাম্মদের বিরুদ্ধে কোরাইশদেরকে তাদের সাথে চুক্তি করার প্রস্তাব দিয়েছে বলে আমার ধারণা।

অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদেল হালিম এ ব্যাপারে বলেন,

তারা ছিলো সেই লোক, যারা চুক্তিবদ্ধ মৈত্রী হওয়ার পরও মুসলিম সমাজকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য মদীনার সবচেয়ে বড় শত্রুর পক্ষে চলে গিয়েছিলো। এটি বড় ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা। অবস্থা কতটা সঙ্গীন ছিলো কোরআনের আয়াত থেকে তা বুঝা যায়। কোরআন আমাদেরকে বলেছে, সে সময় মুসলমানদের মনোবল ভেঙে পড়েছিলো। তারা ভেবেছিলো, আজই বুঝি শেষ দিন।

মুসলিম পণ্ডিতদের মতে, কোরাইশদের সাথে সমঝোতা করে বনু কোরাইযা নিশ্চিতভাবেই মোহাম্মদের (সা) সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলো। তারা মুসলমানদেরকে আক্রমণ করার প্রস্তুতিও নিয়ে ফেলেছিলো। এমনকি কোরাইশ ও তাদের মিত্রবাহিনী আক্রমণ থেকে সরে আসার আগেই ইহুদীদের পক্ষ থেকে আক্রমণের আশংকা ছিলো। জেরুসালেমে অবস্থিত হিব্রু ইউনিভার্সিটির ইসলামিক অ্যান্ড মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজের অধ্যাপক এলা ল্যানডাউ-টাসেরন এ ব্যাপারে বলেন,

এটা তো প্রচলিত ব্যাখ্যা। বরং মোহাম্মদই বিশ্বাস ভঙ্গ করেছিলেন। ইহুদীরা নবীকে আক্রমণ করেছিলো, কিংবা এ ধরনের অন্য কোনো ঘটনার কোনো প্রমাণ নেই। ওই অবরোধের সময় বনু কোরাইযা নবীকে অস্ত্র ধার দিয়েছিলো। অন্যদিকে, তারা সম্ভবত অবরোধকারীদের সাথে ব্যবসাও করতো। কারণ, তারা তো আসলে ব্যবসায়ী ছিলো।

অধ্যাপক জিউফ্রে অল্ডারম্যান এ ব্যাপারে বলেন,

বনু কোরাইযা সম্ভবত কোরাইশদের পক্ষ নিয়েছিলো। তবে আমার মতে, তারা যা করেছিলো সেটি করাই তাদের জন্য স্বাভাবিক ছিলো। ইহুদীরা সবসময় মিত্র খোঁজার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকে। ইহুদীদের রাজনৈতিক তত্ত্বের মূলকথা হলো, নিজ ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ইহুদীরা সবার সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে এবং যে কাউকে বন্ধু বানাতে পারে। আমি মনে করি, তখন তারা যা করেছিলো, সেটি ছিলো তাদের জন্য সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ব্যাপার।

এই ষড়যন্ত্র সফল হলে কোরাইশরা মদীনায় ঢুকে পড়তে সক্ষম হতো। সেক্ষেত্রে তারা মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর অনুসারীদের সবাইকে হয়তো হত্যা করতো এবং তাঁর প্রবর্তিত নতুন ধর্মটির সেখানেই অবসান ঘটতে পারতো।

বনু কোরাইযা অভিযান

ইহুদীদের সর্বশেষ এই প্রতারণার বিরুদ্ধে তিনি যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, সেটি তাঁর জীবনের অন্যতম বিতর্কিত একটি ঘটনা। মোহাম্মদ (সা) তাঁর বাহিনীকে ইহুদী গোত্রটির এলাকা ঘিরে ফেলার নির্দেশ দিলেন। তাদেরকে ২৫ দিন পর্যন্ত অবরোধ করে রাখার পর তারা আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু এবার তিনি দোটানায় পড়ে গেলেন। ইহুদীদেরকে মুক্ত করে দেয়া হলে মুসলমানদেরকে নির্মূল করার লক্ষ্যে তারা মক্কার কোরাইশদের সাথে পুনরায় যোগ দেয়ার আশংকা প্রবল। এমতাবস্থায় তিনি নিজে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়ার পরিবর্তে একজন স্বতন্ত্র মধ্যস্ততাকারী নিয়োগের ব্যাপারে রাজি হন। তিনি ইহুদী গোত্র সর্দারদেরকে নেতৃস্থানীয় সম্মানিত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে একজনকে মধ্যস্ততাকারী হিসেবে বেছে নেয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। এ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে অধ্যাপক তারিক রমাদান বলেন,

তাদের সাথে আলোচনায় তিনি তিনবার জানতে চেয়েছিলেন, ‘তোমাদের বিচার করার জন্য আমি তৃতীয় কাউকে নিয়োগ করতে চাই। তোমরা কি এতে রাজি?’ তারপর তিনি সাদ ইবনে মুয়াজকে (সা) আসতে বললেন এবং তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে বললেন। তিনি পুরুষদেরকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত দিলেন। মনে রাখা দরকার, এই সিদ্ধান্তের আগে মহানবী (সা) বলেছিলেন, “আমি নিজে কোনো সিদ্ধান্ত দেবো না, বরং সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য তৃতীয় কাউকে অনুরোধ করবো।” ফয়সালা অনুসারে পুরুষদেরকে হত্যা করা হয়েছিলো। কিন্তু একই ধরনের অপরাধের জন্য এর আগে তিনি আরো দুইবার তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছিলেন। সর্বশেষ বার এসে তিনি বলেছিলেন, “যথেষ্ট হয়েছে। তোমরা বার বার একই কাজ করছো। একই অপরাধে অতীতে তোমাদেরকে মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচিয়ে দেয়ার পরও আমাদেরকে আক্রমণ করতে আসাটা পরিস্কার বিশ্বাসঘাতকতা।”

অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদেল হালিম এ ব্যাপারে বলেন,

বনু কোরাইযার যোদ্ধাদেরকে মৃত্যুদণ্ড এবং নারী ও শিশুদেরকে যুদ্ধবন্দী করার রায় দিয়েছিলেন তিনি। এই রায় বাস্তবায়ন করা হয়েছিলো।

‘নাউ দে কল মি ইনফিডাল’ গ্রন্থের লেখিকা ননী দারভীশ বলেন,

এটি ছিলো ইহুদীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত প্রথম গণহত্যা। ইহুদীরা তাকে হত্যা করতে চাওয়া সত্ত্বেও একজন নবী কীভাবে আট শতাধিক মানুষকে মেরে ফেলার আদেশ দিতে পারেন? এর পরিবর্তে তিনি তাদেরকে উচ্ছেদ করতে কিংবা নির্বাসন দিতে পারতেন।

ইসলাম ইহুদীবিদ্বেষ বিরোধী

আব্দুর রহীম গ্রীন বলেন,

এই ঘটনার সাথে তাদের ইহুদী হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। তারা খ্রিস্টান বা অন্য কোনো গোত্রও হতে পারতো। এটি কোনো হলোকাস্ট ছিলো না। ধর্মের কারণে ইহুদীদেরকে হত্যা করা হয়েছে, ব্যাপারটি তেমনও নয়। যদি তাই হতো, তাহলে ইহুদীদেরকে হত্যা করার নজির হিসেবে এটি মুসলিম ইতিহাসে থেকে যেতো এবং সেক্ষেত্রে ইহুদী এনলাইটেনমেন্টের সোনালি যুগের বিকাশ মুসলিম শাসনামলের স্পেনে ঘটতো না। এই দাবি সত্য হলে ইসলামের ইতিহাসে ইহুদীদের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম হতো।

অন্য যে কোনো ঘটনার চেয়ে বনু কোরাইযর ঘটনাটি সম্ভবত অনেক বেশি সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এই ঘটনা সামনে এনে মোহাম্মদকে (সা) এমন একজন নিষ্ঠুর ও নিপীড়ক শাসক হিসেবে চিত্রিত করা হয়, যিনি নিজের শাসন-কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য যে কোনো প্রকার সহিংস উপায় অবলম্বন করতেন। বর্তমানে মুসলিম বিশ্ব জুড়ে ইহুদীদের প্রতি যে ধরনের তীব্র বৈরিতা বিদ্যমান, এই ঘটনাকে তার পেছনের কারণ হিসেবে সমালোচকরা মনে করে থাকে। হ্যাঁ, আমাদের বর্তমান মানদণ্ডের আলোকে এটি নিশ্চয় নিষ্ঠুর একটি ঘটনা ছিলো। কিন্তু আমাদেরকে অবশ্যই তৎকালীন সময় ও প্রেক্ষাপটের আলোকে ঘটনাটিকে দেখতে হবে। বাস্তবতা হলো এই ঘটনায় তখন তেমন কেউই মর্মাহত হয়নি। এই না হওয়াটাও এক ধরনের নিষ্ঠুরতা বৈকি! মোহাম্মদ (সা) এমনই এক সমাজ ও যুগে বেড়ে ওঠেছিলেন। অধ্যাপক জিউফ্রে অল্ডারম্যান এ ব্যাপারে বলেন,

আমি মনে করি, ইহুদীদের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ থেকেই হত্যাযজ্ঞটি সংঘটিত হয়েছিলো। আমার মতে, একদিক থেকে দেখলে মুসলিম বিশ্ব শত শত বছর ধরে ইহুদীদের প্রতি বিশেষ এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে আসছে। বর্তমানে ইহুদীদের প্রতি মুসলমানদের যে মনোভাব, তার পেছনে অবশ্য অনেক ধরনের কারণ রয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি, এই ঘটনাটিও তেমনই একটি কারণ। এই ঘটনাটি বিষাক্ত ক্ষত হিসেবে মুসলিম মননে গেঁথে গেছে। এটি বাড়তে বাড়তে বর্তমানে এই দুঃখজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

মুসলিম বিশ্ব এবং পাশ্চাত্যের মুসলিম সমাজের কোথাও কোথাও নতুন এক ধরনের ইহুদীবিদ্বেষ দেখা যাচ্ছে। কোরআন থেকেই এর বৈধতা পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়। আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে দেয়া বাগাড়ম্বরসর্বস্ব এ জাতীয় বক্তৃতামালা মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে অধিকাংশ মানুষের কাছেই ভীষণ আপত্তিকর বলে মনে হবে। যেমন একটি টিভি চ্যানেলে একজন বয়োবৃদ্ধ মুসলিম নেতা বলছিলেন–

হে ইহুদী সম্প্রদায়! তোমাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। হে আল্লাহ! তোমার তীব্র ক্রোধ এদের উপর প্রয়োগ করো। এদেরকে শাস্তি এবং নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করাও।

অধ্যাপক তারিক রমাদান এ সম্পর্কে বলেন,

কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় নিছক ইহুদী হওয়ার কারণেই কিছু মানুষ তাদের বিরোধিতা করে থাকে। কিন্তু এটি ইসলামী ঐতিহ্যের পরিপন্থী। এটি অগ্রহণযোগ্য, বর্ণবাদী, ইহুদীবিদ্বেষী অবস্থান। এটি আমাদের ধর্মেরও বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি। একেশ্বরবাদী ধারার অনুসারী ইহুদীদেরকে ‘আহলে কিতাব’ হিসেবে বিবেচনা করার পর তাদের উদ্দেশ্যে আমরা এ ধরনের বর্ণবাদী বক্তব্য দিতে পারি না। অথচ মহানবী (সা) মদীনায় পদার্পণ করে একটি ইসলামী সমাজের সূচনার পাশাপাশি যখন মদীনার শাসনভারও গ্রহণ করেছিলেন, তখন তিনি ‘আল-উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যাহ’ তথা ইসলামী সমাজ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তারা আমাদের উম্মাহর সদস্য।’ তারা কারা? ইহুদী ও খ্রিস্টানরা। এখন দেখুন, স্বয়ং মহানবী (সা) কী বলেছিলেন, আর আমরা কী বলছি! আমাদের এ ধরনের ইহুদীবিদ্বেষী মনোভাব ইসলামের দিক থেকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। ইহুদীদের ব্যাপারে কোনো রাষ্ট্র বা সরকার (যেমন, মধ্যপ্রাচ্যের কথাই ধরা যাক) কী করবে, তা আমাদের আওতাধীন বিষয় নয়। তবে মানবতা ও বিশ্বাসের দিক থেকে ইহুদীরা আমাদের ভাইবোন।

মদীনার ইহুদী গোত্রগুলোর প্রতি মোহাম্মদ (সা) যে আচরণ করেছিলেন, এর ধারাবাহিকতা আমাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত  রয়ে গেছে। কিন্তু সে সময়ে এ ঘটনার পরিণতিতে তিনি আরবের একটি শক্তিশালী নতুন আন্দোলনের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। মোহাম্মদ (সা) কেমন ছিলেন, তা জানার জন্য এই ঘটনাই একমাত্র উদাহরণ নয়।

যা হোক, মহানবীর (সা) বয়স ততদিনে পঞ্চাশের কোটার শেষ দিকে। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে এসেছেন। নিজ শহর থেকে তাঁকে উচ্ছেদ হতে হয়েছে। তারপর বলতে গেলে নিয়মিতভাবে তাঁকে রক্তাক্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে হয়েছে। আরো বেশি করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে শেষ হয়ে যাবেন, নাকি অনুসারীদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবেন– এই প্রসঙ্গে, বিশেষ করে মক্কার সঙ্গে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের সমাধা করার জন্য তাঁকে একটি পথ খুঁজে বের করতে হয়েছিলো। এ বিষয়ে আলোচনার মূলকথা হলো, মোহাম্মদ (সা) সম্পর্কে আপনি কী মনে করবেন? তিনি কি নিছক একজন আরববিজয়ী যোদ্ধা ও নেতা ছিলেন? নাকি তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্ব মানবতার জন্য চিরন্তন ঐশীবাণী বাহক একজন নবী?

শেষ অধ্যায়ে আমরা দেখাবো, মোহাম্মদ (সা) কীভাবে বার বার তাঁর শত্রুদের শান্তিপূর্ণভাবে মোকাবেলা করেছেন এবং জয়লাভ করেছেন। মক্কায় প্রদত্ত সর্বশেষ ভাষণে তিনি কী রূপরেখা দিয়ে গেছেন, তাও আমরা তুলে ধরবো।

[স্ক্রিপ্ট: জিয়াউদ্দীন সরদার, অনুবাদ: মাসউদুল আলম]

অন্যান্য পর্ব

দ্য লাইফ অব মোহাম্মদ (প্রথম পর্ব: সত্যসন্ধানী)

দ্য লাইফ অব মোহাম্মদ (তৃতীয় পর্ব: হলি পিস)

জিয়াউদ্দীন সরদার
জিয়াউদ্দীন সরদার হলেন লন্ডননিবাসী স্কলার, লেখক, সাংবাদিক, কালচারাল ক্রিটিক ও পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল। ইসলাম, সংস্কৃতি, নৃতত্ত্ব, দর্শনসহ নানা বিষয়ে তিনি প্রায় অর্ধশতাধিক বই লিখেছেন। বর্তমানে 'মুসলিম ইনস্টিটিউট' নামে লন্ডনভিত্তিক একটি থিংকট্যাঙ্কের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন