মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭
হোম > ডকুমেন্টারি অনুবাদ > মেরাজের ঘটনা ও মদীনায় হিজরত

মেরাজের ঘটনা ও মদীনায় হিজরত দ্য লাইফ অব মোহাম্মদের অনুবাদ: পর্ব-৭

দ্বিতীয় অধ্যায়: ধর্মযুদ্ধ

মেরাজের ঘটনা

৬২০ খ্রিস্টাব্দে মোহাম্মদের (সা) সবচেয়ে বড় দুজন শুভাকাঙ্খী মৃত্যুবরণ করেন। একজন হলেন তাঁর ২৫ বছরের বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গী খাদীজা (রা)। অপরজন হলেন তাঁকে গোত্রীয় নিরাপত্তা প্রদানকারী চাচা আবু তালিব। ওই সময়টি ছিলো তাঁর জীবনের সবচেয়ে দুঃসময়। তবে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি এমন এক অনন্যসাধারণ আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, যা তাঁর এই দুঃসহ যাতনাকে মুছে দিয়েছিলো।

মুসলিম বর্ণনা মতে, এক রাতে মোহাম্মদ (সা) কাবার আঙিনায় ঘুমিয়েছিলেন। সেই রাতেই তিনি মক্কা থেকে কয়েক শত মাইল উত্তরে অবস্থিত জেরুজালেম নগরী ভ্রমণের এক অলৌকিক অভিজ্ঞতা লাভ করেন। ইহুদী-খ্রিস্টানরা নগরীটিকে পবিত্র স্থান হিসেবে গণ্য করে। মহানবীর (সা) এই নৈশভ্রমণের ঘটনার ফলে মুসলমানদের কাছেও মক্কা-মদীনার পরেই তীর্থযাত্রা ও গভীর ধর্মীয় অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য জেরুজালেম নগরী পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত।

বর্তমানে জেরুজালেম নগরী মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠার এটি একটি অন্যতম প্রধান কারণ। ইসরাইলী ও ফিলিস্তিনীদের মধ্যে চলমান সংঘাত কার্যত এই ভূমির জন্য দুই পক্ষের লড়াই। কিন্তু মুসলিম বিশ্ব জুড়ে এই ইস্যুটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ালো? কেনইবা মহানবীর (সা) জন্মস্থান থেকে প্রায় আটশত মাইল দূরের একটি নগরী জেরুসালেমকে মুক্ত করার আহ্বান অসংখ্য মুসলমানকে এখনো উজ্জীবিত করে? জেরুসালেমের সাবেক প্রধান মুফতি শায়খ ইকরিমা সাবরী এ ব্যাপারে বলেন,

জেরুসালেম হলো মুসলমানদের ঈমান-আকীদার প্রতীক। তাই এটি আমাদের নিকট এতো গুরুত্বপূর্ণ। মহানবীর (সা) রাত্রীকালীন ভ্রমণের সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে। এখান থেকেই ঊর্ধ্বারোহণ তথা মিরাজের ঘটনা ঘটে। আল্লাহ তায়ালা মোহাম্মদকে (সা) প্রথমে মক্কা থেকে জেরুসালেমে পাঠিয়েছিলেন। তারপর এখান থেকে তিনি ঊর্ধ্বাকাশপানে রওয়ানা হয়েছিলেন।

মুসলিম সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, সেই রাতে ফেরেশতা জিবরাইল এসে মহানবীকে (সা) জাগিয়ে তুলেন। তারপর বোরাক নামের একটি উড়ন্ত ঘোড়ায় চড়িয়ে নিয়ে যান। এতে চড়ে তিনি অলৌকিকভাবে বিস্তৃত মরুভূমি পাড়ি দিয়ে জেরুসালেমে পৌঁছেন। এখানে এসেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রভাববিস্তারকারী ও অনন্য সাধারণ অভিজ্ঞতাটির শুরু হয়। এই ভ্রমণে তাঁর সাথে ইবরাহীম (আ) থেকে শুরু করে মুসা (আ), ঈসা (আ) সহ অতীতের সকল নবী-রাসূলের সাথে সাক্ষাৎ হয়। সবাইকে নিয়ে সেখানে তিনি নামাজ আদায় করেন। তারপর তাঁকে পানি, মদ ও দুধ অফার করা হয়। তিনি সেখান থেকে শুধু দুধ পান করেন। তিনি সারাজীবন যে মধ্যপন্থার পক্ষে কথা বলেছেন, দুধ পান করে তিনি তাঁর সেই অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করলেন। তারপর একটি স্বর্গীয় সিঁড়ি দৃশ্যমান হয়ে ওঠলো এবং মোহাম্মদ (সা) এক আধ্যাত্মিক ঊর্ধারোহণ শুরু করেন। সপ্ত আসমান পেরিয়ে তিনি আরশে আজীমে পৌঁছেন এবং স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার সাথে কথা বলেন।

আধুনিক যুক্তি-প্রমাণের এই যুগে একে অবিশ্বাস্য একটি ঘটনা মনে হলেও মুসলমানদের নিকট এটি হলো মোহাম্মদের (সা) জীবনে সংঘটিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। অবশ্য, এই ভ্রমণ কি স্বশরীরে ছিলো, নাকি এটি ছিলো নিছক একটি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা– তা নিয়ে অমুসলমানদের মধ্যে তো বটেই, মুসলিমদের মধ্যেও মতবিরোধ রয়েছে। মুফতি শায়খ ইকরিমা সাবরী এ ব্যাপারে বলেন,

এটি ছিলো একটি অলৌকিক ব্যাপার। আর অলৌকিকতায় বিশ্বাস রাখা ঈমানেরই অংশ। এই ঘটনার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই এবং এটি স্বাভাবিকতার বিপরীতও বটে। তবুও কোরআন ও হাদীসে এ ঘটনার বর্ণনা থাকায় আমরা তা বিশ্বাস করি।

অধ্যাপক তারিক রমাদান বলেন,

আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি, এটি ছিলো একটি আধ্যাত্মিক তাৎপর্যবহ ভ্রমণ। অর্থাৎ, তিনি প্রথমে জেরুসালেম গিয়েছিলেন এবং তারপর তিনি মহান স্রষ্টা তথা এক আল্লাহর খুব সন্নিকটবর্তী হয়েছিলেন।

জেরুসালেমের ‘ডোম অব দ্যা রক’ খ্যাত সোনালী মসজিদটির ভেতরে একটি পবিত্র স্মারক রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, মেরাজের রাতে ঠিক সেখান থেকেই মহানবী (সা) ঊর্ধ্বারোহন শুরু করেন। অতীতকাল থেকে এখনো পর্যন্ত কেউ কেউ বলে থাকেন, মহানবী (সা) স্বশরীরেই ভ্রমণ করেছিলেন। তাদের মতে, তিনি চোখের পলকে মক্কা থেকে প্রায় আটশত মাইল দূরের জেরুসালেমে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তবে অনেকে মনে করেন, রাত্রীকালীন ভ্রমণ একটি প্রতীকী ব্যাপার। আসলে সেটি ছিলো একটি আধ্যাত্মিক সফর, যে সফরে মহানবী (সা) এক নতুন স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন।  আব্দুর রহীম গ্রীন এ ব্যাপারে বলেন,

এই ঘটনার প্রতীকী গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ, সেই রাতে ইবরাহীম, নূহ, মুসা, ঈসা, ইয়াকুবসহ অতীতের সকল নবী-রাসূল মোহাম্মদের (সা) নেতৃত্বে নামাজ আদায় করেছেন। সেদিন স্বয়ং আল্লাহ মহানবীর (সা) সাথে কথা বলেছেন। সেই কথোপকথনেই আল্লাহ তায়ালা মহানবী (সা) ও তাঁর অনুসারী মুসলমানদের জন্য প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের নির্দেশ প্রদান করেছিলেন।

বারনাবি রজারসন এ ব্যাপারে বলেন,

কোরআনে ঘটনাটির বর্ণনা খুঁজতে গেলে আপনি মাত্র তিনটি ছোট্ট রেফারেন্স পাবেন। কিন্তু ঘটনার বিস্তারিত অর্থাৎ, মহানবীর মেরাজে যাওয়া, বোরাকে চড়া, অতীতের নবী-রাসূলদের সাথে সাক্ষাৎ, জেরুসালেমে যাওয়া, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের নির্দেশ লাভ, বেহেশত-দোজখ পরিদর্শন, আরশে আজীমে গমন– এই সমস্ত বর্ণনা মুসলিম বিশ্বে এক ধরনের বিস্ময়কর ও মহাজাগতিক আবহ তৈরির জন্য পরবর্তীতে যোগ করা হয়েছে। কোরআনে এসবের কোনোটিরই উল্লেখ নেই।

ম্যারল ওয়েন ডেভিস এ ব্যাপারে বলেন,

ধর্মের ইতিহাস মাত্রেরই নানা রকম বাহুল্য বর্ণনা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থাকে। তাই ব্যাপারটি কোরআনে কতবার রয়েছে, সেটি বড় কথা নয়। কোরআনে এ ঘটনার উল্লেখ থাকার মানেই হলো এটি তাৎপর্যপূর্ণ।

রাত্রীকালীন সফরে জেরুসালেম যাওয়া এবং বেহেশতে গিয়ে ইহুদী-খ্রিস্টানদের অতি পরিচিত নবী ইবরাহীম (আ) থেকে শুরু করে অতীতের সকল নবী-রাসূলের সাথে সাক্ষাতের ঘটনা ছিলো মহানবীর (সা) জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। মুসলমানদের দৃষ্টিতে, এই ঘটনার মাধ্যমে অন্যান্য নবী-রাসূলগণও ঐশীবাণীর সর্বশেষ বাহক হিসেবে মোহাম্মদকে (সা) স্বীকার করে নিয়েছেন। এটি ছিলো আল্লাহরই হুকুম। ইসলাম ও তার অনুসারীরা যে সনাতন ইবরাহীমীয় ধারারই ধারাবাহিকতা মাত্র, এই সফরের মাধ্যমে সেই স্বীকৃতিও পাওয়া গেলো। এই ঘটনার আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, মোহাম্মদ (সা) এখন তাঁর গোত্রীয় অতীতকে পেছনে ফেলে পুরো দুনিয়ার সামনে তাঁর বাণী তুলে ধরতে প্রস্তুত। ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

মহানবীর মেরাজের ঘটনার মাধ্যমে গোত্রবাদকে পেছনে ফেলে মানবতাকে আলিঙ্গন করা হয়েছে। বলা যায়, ঘটনাটি হলো গোত্র পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ওঠে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছানোর একটি উদ্যোগ। এটিই হলো এই ঘটনার ধর্মতাত্ত্বিক তাৎপর্য।

মেরাজের ঘটনাটি ছিলো মহানবীর (সা) জীবনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। একইসাথে তাঁর নবুয়তী মিশনের নতুন একটি  ধাপের সূচনাও বটে। তবে এটি একটি নতুন পর্যায়ই শুধু নয়, এটি ছিলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। এ পর্যায়ে তিনি তাঁর গোত্রীয় জীবন চিরতরে পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। মক্কা শহরে কোরাইশদেরকে পরাভূত করার পরিবর্তে তিনি এই শহর ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে নব উদ্যমে মিশন শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলেন।



ইয়াসরিববাসীর সাথে বৈঠক

একদিন মোহাম্মদ (সা) ইয়াসরিব থেকে আগত একদল লোকের সাথে এক ছোট্ট মরুদ্যানে একটি বৈঠক করেন। ইয়াসরিব হলো মক্কা থেকে উত্তরে ১৫ দিন উটের পিঠে করে সফরের দূরত্বে অবস্থিত একটি শহর। প্রতিনিয়ত যুদ্ধ ও হানাহানির কারণে তারা যে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সে কথা তারা মহানবীকে (সা) জানালো। মহানবী (সা) তাদের সব কথা শুনলেন। জবাবে তাঁর মিশন, আল্লাহর একত্ববাদ, সৎভাবে জীবনযাপনের গুরুত্ব এবং জান্নাতে পুরস্কার লাভের কথা তাদেরকে বললেন। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো, তারা মহানবীর (সা) সব কথা শুনে অভিভূত হলো। মক্কার লোকেরা যেখানে এসব কথা শুনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতো, সেখানে এদের প্রতিক্রিয়া ছিলো সম্পূর্ণ বিপরীত। ইয়াসরিব থেকে আগত ছয়জনের এই দলটি সেদিন ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর সেদিনের বৈঠক শেষ হয়। যাওয়ার আগে তারা মহানবীর (সা) সাথে আবারো দেখা করার কথা দিয়ে যায়।

ইতোমধ্যে মক্কার পরিস্থিতি মোহাম্মদের (সা) জন্য চরম প্রতিকূল হয়ে উঠছিলো। এক পর্যায়ে তিনি অনুভব করলেন, ইয়াসরিবে চলে যাওয়া ছাড়া তাঁর অনুসারীদের পক্ষে আর কোনো পথ খোলা নেই। কিন্তু তখনকার পরিস্থিতিতে এটি ছিলো অকল্পনীয় ব্যাপার। এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অর্থ হলো, তাদের আর কোনো গোত্রীয় নিরাপত্তা বজায় থাকছে না। একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়েই সেখানে তাদের বাস করতে হবে। ড. আমিরা বেনিসন এ ব্যাপারে বলেন,

বেশ কয়েকটি গোত্র মিলে ছিলো ইয়াসরিবের সমাজ। এদের কেউ ছিলো পৌত্তলিক, কেউ আওস গোত্রের, কেউবা খাযরাজ গোত্রের, আবার কেউ কেউ ছিলো ইহুদী। ইহুদীদের তিনটি প্রধান গোত্র ছিলো সেখানে। তবে কর্তৃত্ব নিয়ে তৎকালীন ইয়াসরিবে অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছিলো। ক্ষমতা ও মর্যাদা লাভের জন্য তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগেই থাকতো। এই পরিস্থিতিতে তারা একজন মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন উপলব্ধি করলো। এরই মাঝে মোহাম্মদ (সা) সম্পর্কে তারা জানতে পারলো। তিনি তখন মক্কায় দাওয়াতী কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আরব উপদ্বীপের এই অঞ্চলটাতে তাঁর নাম ততদিনে ছড়িয়ে পড়েছিলো। ফলে তারা মনে করলো, এই ব্যক্তিই হয়তো তাদের চলমান বিরোধের নিষ্পত্তি করতে পারবেন, তিনিই হয়তো ন্যায়বিচারকের ভূমিকা পালন করতে পারবেন, তাঁর পক্ষেই হয়তো ইয়াসরিবে এসে তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধানে সহায়তা করা সম্ভব হবে।

এক বছর পর ইয়াসরিব থেকে আরেকটি প্রতিনিধিদল মহানবীর (সা) সাথে সাক্ষাৎ করতে আসলো। এই দলটি ছিলো আরো বড়। এবার তারা রাতের আঁধারে গোপনে দেখা করলো। এই বৈঠকে ইয়াসরিববাসী ও মোহাম্মদের (সা) মধ্যে একটি ঐক্যমত হয়। মহানবী (সা) তাদেরকে বললেন, ‘আমি তোমাদের জন্য, আর তোমরা আমার জন্য’। এই ঐক্যমতের ঘটনাটি ছিলো খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, তখনকার সময়ে এ ধরনের চুক্তি ছিলো একেবারেই নতুন ব্যাপার। সে হিসেবে এটি দুঃসাহসী সিদ্ধান্তও ছিলো বটে। কারণ, এই চুক্তি কোনো গোত্রীয় মৈত্রী, পারিবারিক বন্ধন কিংবা উপজাতীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে সম্পাদিত হয়নি। বরং জ্ঞাতিসম্পর্কের ঊর্ধ্বে ওঠে এমন এক গ্রাউন্ডে চুক্তিটি সম্পাদিত হয়, যা ছিলো সার্বজনীন। চুক্তিটির তাৎপর্য সম্পর্কে ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

এক দৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্তটি ছিলো অসামান্য দুঃসাহস, হিম্মত এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। নিজের গোত্র ও রক্তসম্পর্ক চিরতরে ত্যাগ করে অন্য কোথাও স্থায়ীভাবে বসবাস করার কথা এর আগে আরবে মোটেও শোনা যায়নি। এ ধরনের কাজ ছিলো রীতিমতো ব্লাসফেমি। অলঙ্ঘণীয় গোত্রব্যবস্থার ধারণা ছিলো আরবের সবচেয়ে শক্তিশালী ও চূড়ান্ত মূল্যবোধ। মোহাম্মদ এই ব্যবস্থাকে ত্যাগ করে ‘উম্মাহ’ নামে নতুন এক সমাজব্যবস্থার ধারণা প্রতিষ্ঠিত করেন, যা কোনো বংশ বা গোত্রীয় সম্পর্কের পরিবর্তে আদর্শের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। আরবদের কাছে এই পুরো ব্যাপারটি ছিলো একদম নতুন একটি বিষয়।

মহানবীকে হত্যার প্রচেষ্টা

মক্কার শাসকগোষ্ঠী মোহাম্মদের (সা) পরিকল্পনা টের পেয়ে গেলে ভয়াবহ পরিণতি ঘটে যেতে পারে। তাই কোরাইশরা সতর্ক হওয়ার আগেই মোহাম্মদ (সা) তাঁর সাথীদেরকে শহর ত্যাগের নির্দেশ দিলেন। পরবর্তী কয়েক মাস ধরে প্রতি রাতেই তাঁর অনুসারীদের কেউ না কেউ শহর ত্যাগ করতে লাগলো। মোহাম্মদ (সা), তাঁর ঘনিষ্ট সাথী আবু বকর (রা), তাঁর কিশোর চাচাতো ভাই আলীসহ (রা) গুটিকতক অনুসারী বাদে বাকিরা চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা কোনো রকম সন্দেহ করতে পারেনি।

ইতোমধ্যে কোরাইশরাও মোহাম্মদকে (সা) হত্যা করার পরিকল্পনা আঁটলো। ঠিক করা হলো, তাঁকে হত্যার অভিযানে মক্কার প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে অংশ নেবে। সেক্ষেত্রে মোহাম্মদের (সা) গোত্রের পক্ষে হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ গ্রহণ অসম্ভব হয়ে পড়বে, সেই চিন্তা থেকেই এই ব্যবস্থা।

এক রাতে তারা মোহাম্মদের (সা) বাড়ি ঘেরাও করে ফেললো। তাদের কাছে মনে হচ্ছিলো, তাঁর শোবার ঘরে কেউ একজন ঘুমিয়ে আছে। হত্যা করার উদ্দেশ্যে তারা খঞ্জর নিয়ে শোবার ঘরে ঢুকে পড়লো। কিন্তু তারা সেখানে মোহাম্মদের (সা) পরিবর্তে পেলো তাঁর চাচাতো ভাই আলীকে (রা)। মোহাম্মদ (সা) ততক্ষণে তাদের চোখের আড়ালে চলে গেছেন। বারনাবি রজারসন এ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে,

তিনি ছিলেন খুবই বিচক্ষণ ব্যক্তি। তারা তাঁকে হত্যা করতে গিয়েছিলো। এই হত্যা প্রচেষ্টা থেকে তিনি নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। তারপর আবু বকরকে সাথে নিয়ে মদীনায় যাত্রা করেন। মক্কা ত্যাগের আগে তিনি প্রত্যেকের আমানত পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর সততার ব্যাপারে জনগণের সমর্থন আদায় এবং তাঁর বিরোধীদের উপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে এটি কাজ করেছিলো।

আবু বকরকে সাথে নিয়ে মোহাম্মদ (সা) গোপনে মক্কা ত্যাগ করে নতুন ঠিকানা ইয়াসরিবে যাত্রা করেন। মক্কার লোকেরা তাঁকে ধরার জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছিলো। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তারা তাঁর গমন পথের পায়ের তাজা ছাপও খুঁজে বের করে ফেললো। ধাওয়াকারীরা সাওর পর্বত পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কিন্তু পর্বতের চূড়ায় ওঠেও তারা মোহাম্মদকে (সা) খুঁজে পায়নি, এমনকি তাঁর পায়ের ছাপও চিহ্নিত করতে পায়নি। বাধ্য হয়ে তারা মক্কায় ফিরে যায়। কিন্তু মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাথী আবু বকর (রা) তখনো সাওর পর্বতের একদম চূড়ায় একটি গুহার মধ্যে লুকিয়ে ছিলেন। বিপদ কেটে যাওয়ার পর তাঁরা ইয়াসরিবের দিকে যাত্রা করেন।

মদীনায় হিজরত

এই ঘটনাটি ঘটে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে। ততদিনে মোহাম্মদের (সা) বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে। তিনি একজন এতিম হিসেবে মক্কায় বেড়ে ওঠেছিলেন। চাচার বাণিজ্য কাফেলার সাথে অনেকবার সফরের কারণে বহির্বিশ্ব সম্পর্কে তাঁর জানাশোনা ছিলো। তিনি ছিলেন বিবাহিত। তাঁর কাছে নিয়মিত আল্লাহর বাণী নাজিল হতো। কিন্তু নিজ গোত্রের কাছেই তিনি প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। তিনি ও তাঁর প্রায় শ’দুয়েক অনুসারী মাতৃভূমিতে দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চরম অবমাননা ও নির্যাতনের শিকার ছিলেন। সর্বশেষ, লোকেরা তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। এমতাবস্থায় গৃহত্যাগ করে সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি স্থানে তাঁকে চলে যেতে হয়। এই ঘটনাটি ‘হিজরত’ হিসেবে পরিচিত, যার আক্ষরিক অর্থ হলো অতীতের সাথে ‘সম্পর্কচ্ছেদ’। এ ঘটনার পর মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর অনুসারীদের আর পেছনে ফিরে তাকানোর কোনো সুযোগ ছিলো না। এ ব্যাপারে বারনাবি রজারসন বলেন,

তিনি সেখানে ধর্মপ্রচারক হিসেবে গিয়েছিলেন। বিজেতা হিসেবে যাননি। ইয়াসরিববাসীরাই তাঁকে বলেছিলো, ‘এখানে আসুন এবং আমাদের মাঝে মধ্যস্থতা করে দিন। আমরা আপনাকে একজন রাসূল ও সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করবো। আপনার কথার উপর আমরা আস্থা রাখি।’ তিনি সেখানে দখলদার সেনাবাহিনী নিয়ে যাননি। একজন শরনার্থী ও নির্বাসিত ব্যক্তি হিসেবে, একজন সম্মানিত ও মর্যাদাবান নেতা হিসেবে সেখানে গিয়েছিলেন।

তবে ‘নাউ দে কল মি ইনফিডাল’ গ্রন্থের লেখিকা ননী দারভীশ বিষয়টিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন,

মোহাম্মদ মক্কায় ১৩ বছর ধরে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। সেখানে তার সর্বোচ্চ দেড়শ জনের মতো অনুসারী ছিলো। তিনি দূরদর্শী ব্যক্তি ছিলেন। ফলে তিনি জানতেন, মক্কায় থেকে তাদের সাথে লড়তে গেলে তিনি হেরে যাবেন। এ জন্য যথাসময়েই তিনি মক্কা ত্যাগ করেন। কারণ, তিনি তার বাণীকে আরো বেশি ছড়িয়ে দিতে চাচ্ছিলেন। এ জন্য মক্কার বাইরে তিনি এমন একটি উপযুক্ত জায়গা খুঁজছিলেন, যেখান থেকে সত্যিকার অর্থে মক্কার মানুষদেরকে আঘাত করতে পারবেন এবং মক্কা জয় করতে পারবেন।

ড. আমিরা বেনিসন বলেন,

হিজরত তথা মক্কা ছেড়ে মদীনায় চলে যাওয়া ছিলো মোহাম্মদের (সা) জীবনের একটি মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা।

মোহাম্মদের (সা) জীবনে হিজরতের ঘটনাটি ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের ইতিহাসেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবীর মক্কা ত্যাগের দিন থেকে ইসলামী ক্যালেন্ডারের যে সূচনা ঘটেছে, আজ পর্যন্ত সেই ক্যালেন্ডার মোতাবেকই ইসলামের সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ পালিত হয়। এর তাৎপর্য সম্পর্কে ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

খ্রিস্টানদের মতো নবীর জন্মদিনকে বিবেচনা না করে, নবীর হিজরতের দিনকে মুসলিম যুগের শুরু হিসেবে গণ্য করা হয়। গোত্রীয় স্পিরিটের সাথে সম্পর্কচ্ছেদকে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখা হয়েছে। এর মধ্যে অসাধারণ ধর্মীয় তাৎপর্য রয়েছে বলে আমি মনে করি।

(চলবে)


বাকি পর্বগুলো পড়তে ভিজিট করুন এখানে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *