মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭
হোম > ডকুমেন্টারি অনুবাদ > দাওয়াতী কাজের সূচনা, নির্যাতন ও আবিসিনিয়ায় হিজরত

দাওয়াতী কাজের সূচনা, নির্যাতন ও আবিসিনিয়ায় হিজরত দ্য লাইফ অব মোহাম্মদের অনুবাদ: পর্ব-৫

দাওয়াতী কাজের সূচনা

শুরুতে মোহাম্মদ (সা) ঘনিষ্টজনদের মাঝে তাঁর এই বাণী গ্রহণের দাওয়াত দেন। সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন তাঁর স্ত্রী খাদীজা (রা)। তারপর তাঁর কিশোর চাচাতো ভাই আলী (রা), পরবর্তীতে যিনি তাঁর মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। তারপর তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু ও স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবু বকর (রা) এই বাণী গ্রহণ করেন। তিনি মোহাম্মদের (সা) ওফাতের পর ইসলামের প্রথম খলিফা নিযুক্ত হয়েছিলেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগ সম্পর্কে অধ্যাপক সাজ্জাদ রিজভী বলেন,

সাধারণত বলা হয়ে থাকে, প্রথমদিকে বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক শ্রেণীর তরুণরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। অভিজাত পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের একদম প্রান্তিক লোকেরাও ইসলামের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলো। এদিক থেকে দেখলে বুঝা যায়, ইসলাম ছিলো তখন একটি বিপ্লবী বার্তা। বিপ্লবী এই অর্থে যে, তৎকালীন সমাজের অচলায়তনকে ইসলাম ওলট-পালট করে দিতে চেয়েছিলো।

এখনকার মতো তখনো ইসলাম গ্রহণের প্রক্রিয়াটি সহজ ও সোজাসাপ্টা ছিলো। দুজন প্রত্যক্ষদর্শীর সামনে ঈমান গ্রহণের সাদামাটা ঘোষণা দেয়াই ছিলো যথেষ্ট।[1] ইসলাম গ্রহণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হলো, এটি ব্যক্তির একান্ত নিজস্ব ও স্বাধীন ইচ্ছা থেকে হতে হবে। এর একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় মোহাম্মদের (সা) চাচা আবু তালিবের ঘটনা থেকে। তিনি ছিলেন তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শুভাকাঙ্খী, আবার অন্যদিকে ছিলেন গোত্র সর্দার। মক্কায় যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে তিনি এ যাবৎ তাঁকে রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু আবু তালিবও এই বাণী গ্রহণ করেননি। মোহাম্মদ (সা) তাঁকে বুঝাতে বহু চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কখনোই জোরাজোরি করেননি। ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করে ম্যারল ওয়েন ডেভিস বলেন,

কোরআনের সবচেয়ে স্পষ্ট, দ্ব্যার্থকতামুক্ত আয়াত হলো– ‘ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই’। এক্ষেত্রে কোনো যদি-কিন্তু-তবে নেই। এটিই হলো আসল কথা। কেউ যদি স্বাধীনভাবে ও স্বেচ্ছায় বিশ্বাসকে গ্রহণ করতে না পারে, তাহলে তার কাজকর্মের জন্য পরকালে সে কোনোভাবেই দায়ী হবে না। এটিই হচ্ছে ইসলামের মূলকথা।

‘ইসলাম: অ্যা ক্রিশ্চিয়ান পারস্পেকটিভ’ গ্রন্থের লেখক বিশপ মাইকেল নাজির আলী এ প্রসঙ্গে বলেন,

কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি এ ব্যাপারে একদম সুস্পষ্ট। কোরআনের একটি বহুল পরিচিত আয়াত হলো– ‘ধর্মীয় ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই’। মহানবী নিজেও পৌত্তলিক আরবদের উদ্দেশ্যে একই ধরনের কথা বলেছেন– ‘তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন, আমার জন্য আমার দ্বীন’। পারস্পরিক সহিষ্ণুতার জন্য এটি খুব ভালো একটি উপায়। কিন্তু ইতিহাস জুড়ে আমরা দেখে এসেছি, এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান করা হয়নি।

মোহাম্মদ (সা) যে ঐশীবাণী প্রচার করেছিলেন, পরবর্তীতে তা ইসলাম নামে পরিচিতি লাভ করে। ইসলামের শাব্দিক অর্থ হলো ‘আত্মসমর্পণ’। এই অর্থে একজন বিশ্বাসী তথা মুসলমান হলেন তিনি, যিনি আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছেন। ইসলাম শব্দটি এসেছে ‘সালাম’ শব্দ থেকে, যার অর্থ শান্তি।[2]

এক আল্লাহর ধারণা সংক্রান্ত যে বাণী ইবরাহীম (আ) প্রচার করতেন, পরবর্তীতে ইহুদী-খ্রিস্টানদের নবীগণও যা প্রচার করেছিলেন, মক্কায় দাওয়াতী মিশনের শুরুতে মোহাম্মদ (সা) মানুষের নিকট সেই বাণীই প্রচার করতেন। এর পাশাপাশি সমাজে বিদ্যমান অন্যায় ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিনিয়ত লোকদের সাবধান করতেন। অধ্যাপক জন এসপোজিটো বলেন,

একজন নবীর যত ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকার কথা, এর সবগুলো বৈশিষ্ট্য নিয়েই তিনি মহানবী হয়ে ওঠেছিলেন। হ্যাঁ, নবীদের মূল কাজ হলো মানুষের কাছে ঈশ্বরের বাণী তুলে ধরা। কিন্তু সত্যিকারের নবীগণ একইসাথে একজন সতর্ককারীও বটে। আর মহানবী তো ছিলেন একজন সংস্কারক। তাই তিনি সমাজকে সতর্ক করতেন। সমাজ যে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে, তা নির্দ্বিধায় বলতেন।



কোরাইশদের নির্যাতন

তবে মোহাম্মদের (সা) এসব তৎপরতাকে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী ভালো চোখে দেখা হতো না। তিনি সার্বজনীন সমতার কথা বলতেন, মক্কার শাসক কোরাইশ নেতারা যা পছন্দ করতো না। তাঁরা ক্রমান্বয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে মহানবীকে (সা) থামানোর জন্য তারা টাকা-পয়সা ও ক্ষমতার প্রস্তাব পর্যন্ত দিয়েছিলো। এমনকি তিনি যা চাইবেন তাই দেয়া হবে, এমন প্রলোভনও দেখানো হয়েছিলো। তাদের এই সকল প্রস্তাবের বিপরীতে তিনি একটাই জবাব দিয়েছিলেন–

সম্পদের লোভ কিংবা তোমাদের নেতা বা রাজা হওয়ার আকাঙ্খায় আমি আসিনি। আল্লাহর রাসূল হিসেবে তাঁর বাণী তোমাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্যই কেবল আমি এসেছি। তোমরা যদি তা গ্রহণ করো, তাহলে উপকৃত হবে। আর যদি গ্রহণ না করো, তাহলে আমি ধৈর্য ধরবো এবং আল্লাহর চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষায় থাকবো।

ফলে মক্কার নেতারা বুঝতে পারলো, সোজা কথায় কাজ হবে না। তাই এবার তারা ভিন্ন পথ বেছে নিলো। তাঁর উপর নানাভাবে চড়াও হতে শুরু করলো।

মৃদু চাপপ্রয়োগ এ পর্যায়ে সহিংস নির্যাতনে রূপ নিলো। মোহাম্মদের (সা) সাহাবীরা, বিশেষ করে যাদের কোনো গোত্র পরিচয় কিংবা গোত্রীয় নিরাপত্তা ছিলো না (যেমন– দাস-দাসী), বর্বর নির্যাতনের সহজ শিকারে পরিণত হলো। তাদের কাউকে ছুড়ে ফেলা হতো জ্বলন্ত কয়লায়, কাউকে নির্দয়ভাবে পেটানো হতো, অসহায় নারীদের কাউকে কাউকে ছুরিকাঘাতে মেরে ফেলা হতো। এই নির্যাতনের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

কোরাইশদের বিশ্বাসব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার মাধ্যমে মোহাম্মদ মূলত তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলেছিলেন। কারণ, মক্কার ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে তাদের এতদিনের ধর্মীয় রীতিনীতির গভীর সম্পর্ক ছিলো। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকেরা যখন উপাসনার জন্য কাবায় আসবে, তখন মুসলমানদের দাওয়াতী তৎপরতা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সত্যিই খারাপ পরিণতি বয়ে আনবে– এমন আশংকা তারা করতো। তারা বুঝতে পেরেছিলো, এটি একটা বিশাল হুমকি। ফলে তারা প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়ে পড়েছিলো।

এমতাবস্থায় মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাহাবীদের ক্ষুদ্র দলটি চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেলেন। তাঁরা প্রকাশ্যে অকথ্য গালাগাল ও শারিরীক নির্যাতনের শিকার হতে থাকলেন। এমনকি গোপনেও তাঁরা একত্রিত হতে পারতেন না। নামাজ আদায় করতে পারতেন না। বর্তমানে মুসলমানরা ইবাদত পালনের যে স্বাধীনতা ভোগ করছে, তখন তা ছিলো সুদূর পরাহত।

ইসলামিক সেন্টারের অধীনে লন্ডনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে হ্যারো উপশহরে বর্তমানে একটি পাঁচতলা মসজিদ নির্মিত হচ্ছে। পাশ্চাত্যের সর্বত্রই মুসলমানরা এখন মসজিদ নির্মাণের সুবিধা পাচ্ছে। অথচ মোহাম্মদ (সা) নিজ শহরে তাঁর অনুসারীদের নিয়ে যখন একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি তাঁদেরকে হতে হয়েছিলো। হ্যারো মসজিদ কমিটির একজন দায়িত্বশীল আজমত আলীর সাথে মসজিদের নির্মাণাধীন ফ্লোরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম–

– আমরা কত ভাগ্যবান! এই যে আমি আপনার সাথে কমিউনিটির একটি বিল্ডিংয়ের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে আছি, মহানবীর (সা) অভিজ্ঞতা তো এর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিলো। তিনি যখন তাঁর মতো করে একটি কমিউনিটি প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছিলেন, তখন এ জাতীয় কোনো সুযোগ বা স্বাধীনতা মোটেও পাননি।

– আপনি ঠিকই বলেছেন তখন সময়টা আসলেই খুব প্রতিকূল ছিলোইসলামের প্রাথমিক যুগে তাঁরা প্রচণ্ড কষ্ট করেছেন। তাঁদের সবকিছুতেই বাধা দেয়া হতো। নামাজ পড়তে গেলেও তাঁদেরকে নানান রকম লাঞ্ছনা ও প্রতিকূলতা সহ্য করতে হতো। বর্তমানে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে, মাশাআল্লাহ।

আবিসিনিয়ায় হিজরত

কোরাইশদের অত্যাচারের মোকাবেলায় শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে মোহাম্মদ (সা) তাঁর সাহাবীদের নিরাপত্তার জন্য বিকল্প একটি উপায় খুঁজে বের করলেন। নানান দিক থেকেই এটি ছিলো একটি সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত। তিনি সাহাবীদেরকে বাড়িঘর ছেড়ে লোহিত সাগরের অপর পাড়ে অবস্থিত খ্রিস্টান রাজা নাজ্জাশী শাসিত আফ্রিকান রাজ্য আবিসিনিয়ায় শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে নির্দেশ দেন।

৬১৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম একদল মুসলমান সপরিবারে গোপনে মক্কা ত্যাগ করেন। বর্তমানে ইথিওপিয়া হিসেবে যে দেশটি পরিচিত, সেখানে তাঁরা একটি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন। মুসলমানদের চলে যাওয়ার খবরে কোরাইশরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। নির্বাসিতদেরকে ফেরত পাঠানোর জন্য আবিসিনিয়ার রাজা নাজ্জাশীকে রাজি করাতে তারা তাৎক্ষণিকভাবে একটি প্রতিনিধি দল পাঠায়। ফলে প্রকৃত ঘটনা ব্যাখ্যা করার জন্য নাজ্জাশী মুসলমানদের নেতাকে ডেকে পাঠালেন। রাজদরবারে তিনি বললেন, মোহাম্মদ (সা) হলেন একমাত্র সত্য খোদার প্রেরিত নবী। তারপর তিনি কোরআন থেকে সুললিত কণ্ঠে তেলাওয়াত করতে থাকেন। তিনি যে আয়াত পড়ছিলেন, সেখানে কুমারী মরিয়মের (আ) গর্ভে ঈসার (আ) জন্মের বর্ণনা রয়েছে। আয়াতটিতে যিশুখ্রিষ্টকে আল্লাহর একজন নবী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি শুনে তারা অভিভূত হয়ে পড়ে। নাজ্জাশীর চোখ দিয়ে তখন অশ্রু গড়াচ্ছিলো। যার ফলে তিনি মুসলমানদেরকে আবিসিনিয়ায় বসবাসের অনুমতি দেন।

(চলবে)

নোট:

[1] ইসলাম গ্রহণের জন্য দুজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের বিষয়টি প্রশ্ন ও ব্যাখ্যাসাপেক্ষ।

[2] প্রকৃতপক্ষে ‘সালাম’ শব্দের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ রয়েছে। এরমধ্যে একটি অর্থ হলো শান্তি।


বাকি পর্বগুলো পড়তে ভিজিট করুন এখানে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *