রবিবার, অক্টোবর ২২, ২০১৭
হোম > ডকুমেন্টারি অনুবাদ > বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার উপর মহানবীর (সা) অসন্তোষ

বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার উপর মহানবীর (সা) অসন্তোষ দ্য লাইফ অব মোহাম্মদের অনুবাদ: পর্ব-৩

মোহাম্মদের (সা) দৈহিক বর্ণনা

মুসলিম সূত্র মতে, তরুণ বয়সেই মোহাম্মদ (সা) তাঁর চারিত্রিক সরলতা ও শুদ্ধতার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি আল-আমীন (সত্যবাদী) ও আস-সাদীক (সত্যনিষ্ঠ) হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

এমতাবস্থায় প্রশ্ন জাগতে পারে, যে ব্যক্তিটি এমন সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পেরেছিলেন, তিনি দেখতে কেমন ছিলেন? তাঁর ছবি বা প্রতিকৃতি আঁকা নিষিদ্ধ হলেও প্রচলিত মুসলিম বিবরণ থেকে তাঁর দৈহিক বর্ণনার বিস্তারিত লিখিত রূপ আমরা পাই। তাঁকে নিয়ে লেখা সর্বপ্রথম জীবনীগ্রন্থ অনুযায়ী, তাঁর উচ্চতা ছিলো গড়পড়তার চেয়ে একটু বেশি। তিনি দীর্ঘ পেশীবহুল সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন। আঙ্গুলগুলো ছিলো সরু ও লম্বা। দীর্ঘ ও ঘন চুলগুলো ছিলো হালকা কোঁকড়ানো। চোখ দুটি ছিলো বেশ বড় ও কালো, তবে হালকা বাদামী। দাড়ি ছিলো ঘন। গায়ের রঙ ফর্সা। এক কথায়, বিয়ে করার জন্য তিনি সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন।

খাদীজার সাথে বিয়ে

মোহাম্মদের (সা) বিয়ে করার প্রথম প্রচেষ্টাটি ব্যর্থ হয়েছিলো। কিছুটা অবমাননাকরও ছিলো বটে। তিনি তাঁর চাচাতো বোনকে বিয়ে করার জন্য চাচার কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু একজন এতিম যুবকের তুলনামূলক নিচু সামাজিক অবস্থানের কারণে তাঁর চাচা এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তবে কিছুদিন পরই তাঁর ভাগ্যের নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। একজন বয়স্ক ধনী নারী খাদীজা নিজের ব্যবসায়িক কাজে তাঁকে সিরিয়ায় পাঠিয়েছিলেন। মোহাম্মদ (সা) তার ব্যবসায়িক টার্গেট পূরণ করতে পেরেছিলেন। সিরিয়া থেকে খাদীজা প্রচুর মুনাফা অর্জন করেছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। খাদীজা মোহাম্মদকে (সা) বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। জর্দান রাজপরিবারের প্রিন্সেস বাদিয়া বিনতে আল হাসান এই ঘটনা ব্যাখ্যা করে বলেন,

সায়্যেদিনা খাদীজার (রা) সাথে তাঁর বিয়ে ছিলো খুবই ব্যতিক্রমী ঘটনা। খাদীজা (রা) ছিলেন বয়সে কিছুটা বড়। এছাড়া তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। বর্তমান যুগেও এ ধরনের ঘটনা কিছুটা ব্যতিক্রম। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে এই যুগেও পাশ্চাত্যেরই অনেক পুরুষ একজন সফল নারীকে বিয়ে করতে ভয় পায়। তাই আমি মনে করি, এই বিয়েতে সম্মত হওয়ার মাধ্যমে মহানবীর (সা) অসামান্য চারিত্রিক দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস এবং নারীদের প্রতি তাঁর সম্মান প্রকাশ পেয়েছে। এখনো যদি কেউ এ ধরনের বিয়ে করতে চায়, তাহলে তার মধ্যেও এইসব গুণ থাকতে হবে।

বর্তমান যুগেও মুসলিম বিশ্বে একজন বয়স্ক নারীর পক্ষে কমবয়সী কোনো যুবককে বিয়ে করতে পারা একটি বিরল ব্যাপার। আর তখন তো এমনটি কেউ ভাবতেও পারতো না। ক্যারেন আর্মস্ট্রং ঘটনাটি ব্যাখ্যা করে বলেন,

ইসলাম আসার আগে আরবের অধিকাংশ অঞ্চলে নারীদের সাথে প্রায় পশুর মতো আচরণ করা হতো। নারীদের মানবাধিকার বলতে কিছুই ছিলো না। তবে শহুরে কিংবা ব্যবসায়ী নারীরা কিছুটা সুবিধা পেতো। কুটির শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নারীরা ভূমিকার রাখার মোটামুটি সুযোগ পেতো। খাদীজা ছিলেন এমনই একজন নারী। তিনি বিধবা ছিলেন। খুব সম্ভবত তাঁর স্বামীর ভালো ব্যবসা ছিলো। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি এই ব্যবসার মালিকানা লাভ করেন এবং তা চালিয়ে নিতে সক্ষম হন।

খাদীজার (রা) সাথে মোহাম্মদের (সা) ২৪ বছরের দাম্পত্য জীবন ছিলো। তখন বহুবিবাহ ছিলো অতি সাধারণ সামাজিক প্রথা। তা সত্ত্বেও খাদীজা (রা) যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন তিনি অন্য কোনো নারীকে বিয়ে করেননি। তাছাড়া সংশ্লিষ্ট সকল দলীল থেকে প্রমাণিত, খাদীজার (রা) ব্যবসা পরিচালনায় তিনি কখনোই কোনো বাধা দেননি। অথচ বর্তমান যুগেও বেশিরভাগ মুসলিম সমাজে নারীদেরকে স্বাধীন মর্যাদা লাভের জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। লন্ডনস্থ মুসলিম ইনস্টিটিউটের পরিচালক ম্যারল ওয়েন ডেভিস এ প্রসঙ্গে বলেন,

কমবয়সী কোনো যুবককে বিয়ে করা এখনো একজন বয়স্ক নারীর জন্য কলঙ্কের ব্যাপার। মুসলিম সমাজে ব্যবসা ও রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ করা এখন পর্যন্ত বেশ কঠিন। মুসলিম সমাজ গঠনে নারীরাও যে পুরুষদের সমান অংশীদার, খাদীজা (রা) তা দেখিয়ে গেছেন।



বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার উপর মহানবীর অসন্তোষ

খাদীজাকে (রা) বিয়ে করে মোহাম্মদ (সা) সুখী থাকলেও এই নিস্তরঙ্গ জীবনযাপনে তিনি ব্যতিব্যস্ত ছিলেন না। তিনি তৎকালীন সমাজব্যবস্থার উপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। বারনাবি রজারসন ব্যাপারটি বর্ণনা করেছেন এভাবে,

জীবনের ২৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত সময়কালটি হওয়ার কথা ছিলো তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। কারণ, এ সময় তিনি খাদিজার মতো সম্পদশালী, সুন্দরী ও বিশ্বস্ত নারীকে স্ত্রী হিসেবে পেয়েছেন। চার চারটি ফুটফুটে কন্যার বাবা ছিলেন। তাঁর দুটি ছেলে সন্তান জন্মলাভ করেছিলো। যদিও তারা শিশুকালেই মারা যায়। তিনি ছিলেন একটি সম্মানিত গোত্রের সদস্য। সাপোর্ট দেয়ার মতো তাঁর একটি পরিবারও ছিলো। এতো কিছু থাকার পরেও, এমনকি সমাজের শীর্ষস্থানে থেকেও আশপাশের সবকিছু নিয়ে তাঁর মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তিবোধ  কাজ করতো। তিনি গোত্রতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার সহিংস রূপ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি দেখেছেন, এখানে অর্থকড়ি দিয়ে যে কাউকে কিনে ফেলা যায়।

এসব কারণে সামগ্রিকভাবে মোহাম্মদ (সা) মোটেও সুখী ছিলেন না। আরবের গোত্রতান্ত্রিক সমাজের কদর্য রূপ তিনি দেখেছিলেন। গোত্রীয় জীবনধারার বৈষম্যগুলো তাঁকে বিষিয়ে তুলেছিলো। এসব নিয়ে তিনি খুবই চিন্তিত থাকতেন। প্রাপ্ত সকল বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি এ সময়ে এক ধরনের মানসিক সংকটে ভুগছিলেন। লন্ডনভিত্তিক ইসলামিক এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ একাডেমির চেয়ারম্যান আব্দুর রহীম গ্রীন এ ব্যাপারে বলেন,

সমাজের দরিদ্র, অসহায় ও নির্যাতিত মানুষের দুরাবস্থা দেখে তিনি সত্যিই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। এসব দেখে নিশ্চিতভাবেই সেই গোড়ার প্রশ্নটি তাঁকে ভাবিয়ে তোলে– আমরা কেন পৃথিবীতে এসেছি? জীবনের উদ্দেশ্য কী? আমাদের চারপাশের জগতকে আমরা কীভাবে অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারি? ইত্যাদি

লন্ডনের স্থানীয় একজন ইমাম আজমল মাসরুর বলেন,

তরুণ বয়সে ইবরাহীম (আ) যেমন পথের দিশা খুঁজে বেড়াতেন, মুসা (আ) যেমন উপত্যকায় ঘুরে বেড়াতেন, ওল্ড ও নিউ টেস্টামেন্টে বর্ণিত অন্যান্য সকল নবী-রাসূল যেমন সঠিক পথের অনুসন্ধান করতেন, ঠিক তেমনি তিনিও এমন একটা পথের অনুসন্ধান করতে বলে আমার মনে হয়।

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক জন এসপোজিটো বলেন,

সমাজ, নৈতিকতা, স্রষ্টার প্রকৃতিবিরোধী ধর্মীয় রীতিনীতি ইত্যাদি সম্পর্কে প্রশ্ন তোলাই কারো জন্য খুব সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

হেরা গুহায় আধ্যাত্মিকতা চর্চা

এই পর্যায়ে মোহাম্মদ (সা) নির্জনে নিয়মিত আধ্যাত্মিকতা চর্চা করতেন। শান্তি ও নির্জনতার খোঁজে ও প্রার্থনার উদ্দেশ্যে তিনি প্রায় সারা বছরই মক্কার পাহাড়-পর্বতে কাটাতেন। তিনি আসলে কীসের অন্বেষণ করতেন? সেখানে গিয়ে কী করতেন? তিনি যে সমাজের দুরাবস্থা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন, তা নিশ্চিত। ফলে তিনি আসলে এক ধরনের ঐশী সত্য খুঁজে ফিরছিলেন।

মোহাম্মদ (সা) ক্রমান্বয়ে নিয়মিতভাবে ও গভীর মনোযোগের সাথে নির্জনে আধ্যাত্মিকতার চর্চা করতে থাকেন। এতে তাঁর অভিব্যক্তি ও চিন্তা আরো শাণিত হতে থাকে। এই কাজের জন্য তিনি শহরের অদূরে ‘জাবালে নূরকে’ বেছে নেন। পাদদেশ থেকে পাহাড়টির চূড়ায় আরোহণ করা সত্যিই দুঃসাধ্য ব্যাপার। তিনি একদম চূড়ায় অবস্থিত একটি গুহায় (যেটি এখন গারে হেরা নামে পরিচিত) অবস্থান করতেন। আরো গভীর ও ঐকান্তিকভাবে ধ্যানমগ্ন হওয়ার লক্ষ্যে তিনি সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাটিয়ে দিতেন।

হঠাৎ একদিন এমন একটা ব্যাপার ঘটে গেলো, যা শুধু তাঁর জীবনকেই বদলে দেয়নি, বরং গোটা পৃথিবীর ইতিহাসই পাল্টে দিয়েছে। এটি ছিলো ৬১০ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা।

(চলবে)


বাকি পর্বগুলো পড়তে ভিজিট করুন এখানে

আপনার মন্তব্য লিখুন