শিল্পকলা ও নন্দনতত্ত্বের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান (শেষ পর্ব) 'কোরআন-সুন্নাহর আলোকে সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্র' শীর্ষক গ্রন্থের ধারাবাহিক অনুবাদ

শিল্পকলা ও নন্দনতত্ত্বের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান

এডিটর’স নোট:

গান গাওয়া বা শোনা জায়েজ কি না, যদি জায়েজ হয় তাহলে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে কি না– এইসব তাত্ত্বিক প্রশ্নের সমাধান এখন পর্যন্ত অন্তত বাংলাদেশে হয়নি। ফলে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাজ করার ক্ষেত্রে ইসলামপন্থীদের মধ্যে এক ধরনের দ্বন্দ্ব কাজ করে। এই দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে না পারায় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাদের পদচারণাও খুব সীমিত। কিঞ্চিৎ যেসব চর্চা রয়েছে, তাও নিজস্ব গণ্ডি পেরিয়ে মূলধারায় এসে মিশতে পারেনি। শাইখুল ইসলাম ড. ইউসুফ আল কারযাভী ‘ফিকহুল গিনা ওয়াল মাওসিকা ফি দাওয়িল কোরআন ওয়াস সুন্নাহ’ শিরোনামে ২০০১ সালে একটি বই লিখেন, যার বাংলা অর্থ হলো ‘কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে গান ও বাদ্যযন্ত্র’। আমরা আশা করছি বইটির ধারাবাহিক অনুবাদ পাবলিশ করতে পারবো। এর মাধ্যমে অন্তত গানের জগতে ইসলামপন্থীরা হয়ত স্ববিরোধমুক্ত হয়ে কাজ করার তাত্ত্বিক ভিত্তি খুঁজে পাবে। সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য আজ  ছাপা হলো প্রথম অধ্যায়ের শেষ অংশ।

*****

কোরআন একটি নান্দনিক মুজিযা

আল কোরআন হলো ইসলামের সবচেয়ে বড় নিদর্শন এবং আল্লাহর রাসূলের সুমহান মুজিযা। একে একটি নান্দনিক মুজিযা তথা বিস্ময়কর ব্যাপার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি এটি বুদ্ধিবৃত্তিক মুজিযাও বটে। কোরআনের নান্দনিক প্রকাশভঙ্গির কারণে আরবরা ছিল বিস্মিত। এর চমৎকার ছন্দ ও রচনাশৈলী, অদ্বিতীয় বাচনভঙ্গি ও সুরে তারা ছিল মুগ্ধ। এমনকি কোরআন শোনার পর কেউ কেউ একে জাদু হিসেবে অভিহিত করেছিল।

কোরআনের বাচনভঙ্গির নান্দনিক মুজিযা নিয়ে অলংকারশাস্ত্রবিদ ও আরবী সাহিত্যিকগণ প্রচুর লেখালেখি করেছেন। আব্দুল কাহের থেকে শুরু করে সমসাময়িক কালের আল-রাফে, সাইয়েদ কুতুব, বিনতে শাতেয়ীসহ আরো অনেকে এ বিষয়ে লিখেছেন, লিখছেন।

তাছাড়া কাব্যিক ও সুরেলা কণ্ঠে তেলাওয়াত করার রীতিও কোরআনের চমৎকার বাচনভঙ্গি ও কাব্যিকতাকে নির্দেশ করে। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا

তুমি তারতীল সহকারে কোরআন তেলাওয়াত করো। (সূরা মুজ্জাম্মিল: ৪)

আর রাসূল (সা) বলেছেন, “তোমরা সুললিত কণ্ঠে কোরআন তেলাওয়াত করো।”[1] আরেকটি সূত্র অনুযায়ী তিনি বলেছেন, “সুললিত কণ্ঠ কোরআনের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তোলে।”[2]

তিনি আরো বলেছেন, “যে ব্যক্তি সুর করে কোরআন পড়ে না, সে আমাদের কেউ নয়।”[3] তবে সুর করে পড়ার মানে এই নয় যে, তেলাওয়াত করতে গিয়ে মশকরা কিংবা বিকৃতি করা যাবে।

আরেকটি হাদীস রয়েছে যেখানে রাসূল (সা) আবু মুসাকে (রা) বলছিলেন, “গতরাতে আমি তোমার তেলাওয়াত শুনছিলাম, তুমি যদি তা দেখতে পেতে (তাহলে নিশ্চয় খুশি হতে)। কী সৌভাগ্য তোমার, দাউদের (আ) মতো সুরেলা কণ্ঠ তোমাকে দেয়া হয়েছে!” এ কথা শুনে আবু মুসা বললেন, “আমি যদি জানতাম, আপনি আমার তেলাওয়ান শুনছিলেন, তাহলে আপনাকে খুশি করতে আমি আরো সুন্দর করে তেলাওয়াত করতাম।”[4] অর্থাৎ, তাজবীদ মেনে আরো শুদ্ধভাবে সুললিত কণ্ঠে তেলাওয়াত করতাম।

রাসূল (সা) আরো বলেছেন, “একজন নবীর উচ্চস্বরে সুললিত কণ্ঠের তেলাওয়াত আল্লাহ যেভাবে শুনেন, আর কোনো কিছু সেভাবে শুনেন না।[5]

শায়খ ড. মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ দারায ছিলেন একটি রেডিওর এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য। কমিটির একটি বৈঠকের গল্প তিনি একবার আমাদেরকে শুনিয়েছিলেন। নিছক দ্বীনি কাজ হিসেবে প্রতিদিন রেডিও অনুষ্ঠান সম্প্রচারের শুরুতে ও শেষে এবং অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে কোরআন তেলাওয়াত সম্প্রচার করার ইচ্ছা ছিল তাদের। এ কথা শুনে তিনি তাদেরকে বললেন, নিছক কোরআন শোনাটাই যথেষ্ট নয়। কোরআনের শিল্প ও সৌন্দর্য উপভোগ করাও দ্বীনের অংশ। তাই তেলাওয়াত হতে হবে সুললিত কণ্ঠে।

শায়খের কথাটি একদম সত্য। কোরআন হলো একই সাথে দ্বীন, জ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্পকলার সমন্বয়। এটি আত্মার রসদ যোগায়, মনকে তৃপ্ত করে, বিবেককে জাগ্রত রাখে, আবেগ-অনুভূতির প্রকাশ ঘটায় ও ভাষাকে পরিশুদ্ধ করে।

সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ

ইসলাম যেহেতু সৌন্দর্যের কথা বলে, সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে বলে, ভালোবাসতে বলে; তাহলে নিশ্চয় সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো, একে উপভোগ করা ও ভালোবাসা আরো বেশি সুন্দর কাজ।

সাহিত্য ও শিল্পকলা

গদ্য ও পদ্য ছাড়াও শিল্পকলার অনেক শাখা-প্রশাখা রয়েছে। মাকামাত (আরবী গদ্য সাহিত্যের একটি ধরন), কাসিদা, মহাকাব্য ইত্যাদি। মহানবী (সা) কবিতা শুনতেন। এগুলো তিনি পছন্দ করতেন। তিনি কাব বিন যুহায়িরের বিখ্যাত কাসিদা ‘বানাত সুয়াদ’ পর্যন্ত শুনেছেন। আমরা জানি, সেই কাসিদায় একটি প্রেমকাব্যও ছিল। এছাড়া তিনি নাবিগা আল-জাদীর কাসিদা শুনে তার জন্য দোয়া করেছিলেন। দাওয়াতী কাজকে বেগবান করতে তিনি কবিতাকে কাজে লাগিয়েছেন। হাসসান বিন সাবিতের (রা) বাগ্মিতার কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে। রাসূল (সা) কথা বলার সময় কবিতার উদ্ধৃতিও দিতেন। যেমন তিনি বলেছেন, “সবচেয়ে বড় সত্য কথা হলো, যা লাবীদ বলেছে– আল্লাহ ছাড়া বাকি সবকিছুই বাতিল।”[6]

সাহাবীরাও কথাবার্তায় কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিতেন। কোরআনের অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁরা এটি করতেন। কেউ কেউ চমৎকার আবৃত্তি করতে পারতেন। উদাহরণ হিসেবে আলীর (রা) কথা বলা যেতে পারে। আসলে সাহাবীদের অনেকেই কবি ছিলেন।

ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক, ইমাম শাফেয়ীসহ আয়িম্মায়ে কেরামদেরও অনেকে কবি ছিলেন।

এ প্রসঙ্গে রাসূলের (সা) কয়েকটি হাদীস রয়েছে। যেমন–

“নিশ্চয় কিছু কবিতায় রয়েছে প্রজ্ঞা।”[7]

“নিশ্চয় কিছু কিছু কথায় রয়েছে মুগ্ধতা।”[8]

“নিশ্চয়ই কিছু কথায় রয়েছে মুগ্ধতা, আর কিছু কবিতায় রয়েছে প্রজ্ঞা।”[9]

উক্ত হাদীসগুলো থেকে পরোক্ষভাবে এটাও বোঝা যায়– কিছু কিছু কবিতায় হিকমাহ তথা প্রজ্ঞার মোটেও কোনো ছাপ থাকে না। এসব কবিতা সম্পূর্ণভাবে প্রজ্ঞার বিপরীত। অন্যায়ের পক্ষে স্তুতিমূলক কবিতা, মিথ্যা অহংবোধপূর্ণ কাব্য, বাড়াবাড়ি ধরনের ব্যঙ্গাত্মক কবিতা, অশ্লীল কবিতাসহ আমাদের নৈতিক মূল্যবোধের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ কবিতা এর উদাহরণ।

এ কারণেই কোরআন এমনসব ভ্রষ্ট কবিদের নিন্দা করেছে। কারণ যে কোনো মাত্রার লাগামহীন কথাবার্তা বলে ফেলতে এ ধরনের লোকেরা কোনো দ্বিধা করে না। এদের কথা ও কাজের মধ্যে কোনো মিল থাকে না। তাই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

وَالشُّعَرَاءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُونَ. أَلَمْ تَرَ أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُونَ. وَأَنَّهُمْ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ. إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَذَكَرُوا اللَّـهَ كَثِيرًا وَانتَصَرُوا مِن بَعْدِ مَا ظُلِمُوا

কবিদের অনুসরণ করে বিভ্রান্ত ব্যক্তিরা তুমি কি দেখনি যে, তারা (কবিরা) প্রত্যেক উপত্যকায় উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায় (প্রত্যেক বিষয়ে সত্য-মিথ্যা কথা বলে)? এবং (দেখনি যে,) তারা তাই বলে যা নিজেরা করে না? তবে তাদের কথা ভিন্ন, যারা (সত্যে) বিশ্বাস করে, সৎকাজ করে, আল্লাহকে বেশি করে স্মরণ করে এবং অত্যাচারিত হলে প্রতিশোধ গ্রহণ করে (আশ-শু’আরা: ২২৪-২২৭)

কবিতা বা সাধারণত সাহিত্য কিংবা আরেকটু এগিয়ে বললে শিল্পকলার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও প্রায়োগিক দিক রয়েছে। যেসব কবিতা, সাহিত্য বা শিল্পকলার দায়বদ্ধতা রয়েছে, এক্ষেত্রে শুধু তাদের কথাই বলা হচ্ছে। অন্যদের কথা আলাদা।

কবিতা বা সাহিত্যের উপরিকাঠামোর পরিবর্তন বা বিবর্তনে কিছু আসে যায় না। এমনকি অন্যদের কাছ থেকে আমাদের জন্য উপযোগী কোনো কিছু গ্রহণ করতেও সমস্যা নেই। এসবের উদ্দেশ্য, বিষয়বস্তু এবং প্রায়োগিক দিকের প্রতি খেয়াল রাখাই হলো গুরুত্বপূর্ণ।

অতীতে আরবরা আন্দালুসিয়ায় কবিতার ক্ষেত্রে ‘মুওয়াশশাহাত’সহ (স্তবকে স্তবকে বিন্যস্ত একাধিক অন্ত্যমিলবিশিষ্ট এক প্রকার আরবী কবিতা) বিভিন্ন কাঠামো আবিষ্কার করেছিল। তাই বর্তমানকালের আধুনিক কবিতার কাঠামো গ্রহণ করতেও আমাদের কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। যেমন সাম্প্রতিক কালের ‘গদ্য কবিতা’র কথা বলা যায়। কবিতার বিষয়বস্তু শরীয়াহর আলোকে গ্রহণযোগ্য হলে এ ধরনের কাঠামো গ্রহণ করতে কোনো আপত্তি নেই।

একইভাবে আরবরা ইসলামী যুগে কবিতা ছাড়াও সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রে বিভিন্ন কাঠামো আবিষ্কার করেছিল। উদাহরণ হিসেবে ‘মাকামাত’-এর কথা বলা যায়। ‘রিসালাতুল গোফরান’, ‘আলিফ লায়লা ওয়া লায়লা’ ইত্যাদি আরবদের রূপকথা সাহিত্যের নিদর্শন। এছাড়া ‘কালীলাতু ওয়া দিমনাহ’র মতো কাল্পনিক উপন্যাসের অনুবাদও তারা করেছে। পরবর্তীতে আরব সাহিত্যিকরা লোকমুখে জনপ্রিয় গল্পের আলোকে মহাকাব্য রচনা করেছে। যেমন ইসলামপূর্ব যুগের আরব বীর আন্তারা ইবনে শাদ্দাদের কাহিনী নিয়ে রচিত মহাকাব্য ‘আন্তারা’, এক আরব গোত্রের ইতিহাস নিয়ে রচিত মহাকাব্য ‘বনু হেলাল’। এছাড়াও আরবী সাহিত্যে আরো নতুন নতুন কাঠামো তারা তৈরি করেছে।

অতএব, আমাদের যুগের প্রয়োজনে আমরা সাহিত্যের নতুন নতুন কাঠামো তৈরি করতে পারি। পাশাপাশি অন্যদের থেকে আমাদের উপযোগী নাটক, উপনস্যা ও ছোটগল্প নিতে পারি।

আরেকটি বিষয় হলো, আরবীতে সাহিত্য চর্চায় আগ্রহীদের উচিত শুদ্ধ, সাবলীল ও প্রমিত আরবীতে সাহিত্য চর্চা করা। দ্ব্যর্থবোধক ও জগাখিচুড়ি মার্কা আঞ্চলিক আরবী ভাষা ব্যবহার করা থেকে তাদেরকে সতর্ক থাকতে বলবো। কারণ, এ ধরনের ভাষার ব্যবহার কোরআন-সুন্নাহ বোঝা থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়। এছাড়া আঞ্চলিক ভাষা চর্চা বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতাকে উসকে দেয়। এই আঞ্চলিকতা সর্বদাই ইসলাম ও আরব জাতীয়তার মাঝে বৈরীতা তৈরি এবং পোক্ত করতে ও জিইয়ে রাখতে চায়।

সাহিত্য চর্চার ভাষা সহজ ও সরল হওয়া বাঞ্ছনীয়, যা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে। কেননা, এই সহজ ভাষাতেই প্রতিদিন রেডিও-টেলিভিশনে খবর সম্প্রচারিত হয়। এই ভাষাতেই দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। মানুষ এই সহজ ভাষায় অভ্যস্ত।

তাছাড়া প্রমিত ও বিশুদ্ধ আরবী ভাষাই আরব ও অন্যান্য দেশের আরবী জানা মুসলমানদেরকে কাছাকাছি নিয়ে আসতে সক্ষম। কারণ, অন্য দেশের মুসলমানরা কেবল প্রমিত আরবীটাই শেখে। তাদের পক্ষে প্রমিত আরবী ছাড়া অন্যান্য আঞ্চলিক আরবী বুঝা সম্ভব নয়।

ইসলামী সাহিত্যের নানা ধরন নিয়ে আমার কাছে লোকজন বিভিন্ন সময় জানতে চেয়েছে। যেমন, গল্প ও নাটকের কথাই বলা যাক। গল্পকার ও নাট্যকারগণ সচরাচর এমনসব চরিত্র, বক্তব্য ও ঘটনা তুলে নিয়ে আসেন, বাস্তবে যেসবের ভিত্তি থাকে না। তাহলে কি এসব সেই মিথ্যার চক্রে পড়ে যাবে, শরীয়াহর মধ্যে যাকে হারাম করা হয়েছে?

আমার উত্তর ছিলো এসব বিষয় নিষিদ্ধ মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ, পাঠক বা শ্রোতা ভালো করেই জানেন, বাস্তবে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনাকে এসব গল্প বা নাটকের মাধ্যমে উপস্থাপন করাটা উদ্দেশ্য নয়। এটি অনেকটা পশু-পাখির মুখ দিয়ে কথা বলানোর মতো ব্যাপার। এটি মূলত এক ধরনের শৈল্পিক চিত্রায়ণ। অর্থাৎ, কতগুলো চরিত্রের মাধ্যমে এমনসব সংলাপ বলানো, ওই ধরনের পরিস্থিতিতে সেই চরিত্রগুলো সাধারণত যা বলত বা বলতে বাধ্য হতো। পিঁপড়ার কথা বলা কিংবা সোলায়মানের (আ) সামনে হুদহুদের কথা বলার বিষয়টি কোরআন যেভাবে বর্ণনা করেছে, বিষয়টি অনেকটা সে ধরনের। পিঁপড়া বা হুদহুদ সুস্পষ্ট আরবী ভাষায় কথা বলেনি, এটা নিশ্চিত। ওই সময় ও পরিস্থিতিতে তাদের বলা সম্ভাব্য কথাকে কোরআন আরবীতে অনুবাদ করেছে মাত্র।

আমি নিজেও দুটি নাটক রচনা করেছিলাম। প্রথমটি ছিল ইউসুফকে (আ) নিয়ে রচিত একটি কাব্যনাট্য। আমি তখন মাধ্যমিক প্রথম বর্ষে পড়ি। আমার সাহিত্য জীবনের শুরুতে এটি রচিত। প্রখ্যাত নাট্যকার আহমদ শাওকীর নামডাক দেখে আমি তখন প্রভাবিত ছিলাম। আর দ্বিতীয়টি ছিল সাঈদ বিন জোবায়ের ও হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে কেন্দ্র করে লেখা একটি ইতিহাস আশ্রিত নাটক। এর নাম ছিল ‘আলিম ওয়া ত্বগিয়াহ’ (আলেম ও স্বৈরাচারী)। নাটকটি তখন বেশ সমাদৃত হয়। একাধিক দেশে এটি মঞ্চস্থ করা হয়েছিল। তবে প্রথম নাটকটির বেলায় তা হয়নি। কারণ, সেটি রচিত হয়েছিল একজন নবীর জীবনীকে ঘিরে। আর নবীদের চিত্র চরিত্রায়নের নিষিদ্ধতার ব্যাপারে সমসাময়িক আলেমগণ মোটামুটি একমত।

শ্রবণের নন্দনতত্ত্ব (গান ও বাদ্যযন্ত্র)

ইতোপূর্বে কোরআন ও হাদীসের বিভিন্ন দলীল উল্লেখ করে যে আলোচনা করেছি তাতে পরিষ্কার বুঝা যায়, সৌন্দর্যের ব্যাপারে ইসলাম বেশ মনোযোগী। সৌন্দর্য অনুভব ও উপভোগ করার জন্য ইসলাম মানুষকে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করে।

আর এই সৌন্দর্যের উপকরণগুলোর কিছু উপাদান শোনার অনুভূতির সাথে সম্পৃক্ত, কিছু দেখার অনুভূতির সাথে সম্পৃক্ত, আর কিছু অন্যান্য অনুভূতির সাথে সম্পৃক্ত।

আমরা এখানে ‘শ্রবণের নন্দনতত্ত্ব তথা সৌন্দর্য’ নিয়ে আলোচনা করবো। অন্য কথায়, গান (বাদ্যযন্ত্র থাকুক বা না থাকুক) নিয়ে আলোচনা করবো। কারণ, সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে ইসলামের বিধান কী?– এই বিশাল প্রশ্নটির একটা ফয়সালা করা আমাদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে।

সঙ্গীতের শাব্দিক অর্থ

আরবী ভাষায় ‘আল-গিনা’ তথা সঙ্গীত বলতে কী বুঝায়, তার একটা ভাষাতাত্ত্বিক পর্যালোচনা করা যাক।

‘কামুসু ওয়া শরহাহ’ অভিধানে বলা হয়েছে, ‘কিসা’ (كِسَاء) তথা পোশাকের মাধ্যমে যেমন সৌন্দর্য প্রকাশ পায়, ‘আল-গিনা’ (الغِنَاء) তেমনি একটি ব্যাপার। অর্থাৎ, এর মাধ্যমে মনের উচ্ছাস প্রকাশিত হয়।

‘আস-সিহাহ’ অভিধানে বলা হয়েছে, ‘আল-গিনা’র (الغِنَاء) মূল শব্দরূপের প্রথম অক্ষরটি যের দিয়ে পড়তে হবে। শব্দটির অর্থ হলো, গান জাতীয় এমন কিছু যা শোনা হয়।

‘আন-নিহায়াহ’ অভিধানে বলা হয়েছে, ‘গিনা’ শব্দটির মানে হলো স্বরকে উঁচু করা এবং পর্যায়ক্রমিকভাবে তা অব্যাহত রাখা।

আবু সোলাইমান খাত্তাবী (রাহ.) বলেছেন, কেউ উচ্চস্বরে কোনো কিছু বার বার গাইতে থাকলে আরবে তাকে গান বলা হয়, যাতে নির্দিষ্ট বিরতিতে বাদ্য বাজানো হয়, কিংবা তাতে থাকে মোহনীয় ছন্দ ও সুর। এজন্য বলা হয়, কবুতর গান গেয়েছে বা পাখি গান গায়।

কবি মাজনুনের একটি কবিতার কিছু লাইন এ রকম:

এই সকালে আল্লাহ মারুন কইতরকে,
গাছের শাখে গান গেয়ে মোর মন জাগালো,
অবোধ স্বরে গান গেয়ে মোর প্রেম জাগালো,
বুকের পাঁজর কেঁদেই মরে যার গোমকে

ইবনুল কাওতিয়া তার গ্রন্থে হ্রস্বস্বর ও দীর্ঘস্বর সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন: যা দীর্ঘস্বরের, সেগুলো গান।

ফাররা গেয়েছেন:

গান গেয়ে যাও তোমার বলা পংক্তি মালায়,
এই চরণে গানের লিপি সুর মিলে যায়।[10]

‘আল-মুহ্কাম’ গ্রন্থে ‘গিনা’ (الغِنَاء) শব্দটির ব্যবহার গান হিসেবে এসেছে। যেমন: সে কবিতা দিয়ে গান বাঁধলো এবং গুনগুন করে গাইলো, কিংবা তারা সম্মিলিতভাবে গীত গাইলো।

ইসলামে সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্রের বিধান কী?

এই প্রশ্নটি যুগে যুগে দুনিয়ার অসংখ্য মানুষের। এই প্রশ্নটির জবাব নিয়ে মুসলমানরা এখন বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাদের আচার-ব্যবহারেও পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

একদল যে কোনো ধরনের গান শুনে থাকে। কোনো গানেই তাদের আপত্তি নেই। তাদের দাবি অনুযায়ী এগুলো জীবনযাপনের চমৎকার উপাদান, যা আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য যা হালাল করেছেন।

আরেক দল রেডিও অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সব ধরনের গান শোনা থেকে বিরত থাকে। তাদের মতে, গান হলো শয়তানের বাঁশি, অর্থহীন কাজ ও কথাবার্তা। কারণ, এটি মানুষকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখে। আর গানের শিল্পী যদি নারী হয়, তাহলে তো কথাই নেই। তাদের মতে, যেখানে নারীদের কণ্ঠস্বর পর্দার (আওরাহ) অন্তর্ভুক্ত, সেখানে নারী কণ্ঠে গান কীভাবে জায়েজ হতে পারে? তাদের এই অবস্থানের পক্ষে তারা কোরআন, হাদীস ও সাহাবী-তাবেয়ীদের উক্তিকে রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করেন। তাদের মধ্যে আরেকটি উপদল রয়েছে, যারা যে কোনো ধরনের বাজনাকেই অবৈধ মনে করে। এমনকি খবরের শুরুতে যে মিউজিক বাজানো হয়, সেটিকেও তারা জায়েজ মনে করে না।

তৃতীয় আরেকটি পক্ষ রয়েছে, যারা মূলত উপরোল্লিখিত দল দুটির মাঝে পরে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। একবার তারা প্রথম দলের পক্ষ নেয়, আরেকবার দ্বিতীয় দলের পক্ষ নেয়। এখন ঘরে ঘরে রেডিও-টিভি চলে এসেছে। হাসিঠাট্টা বলুন কিংবা সিরিয়াস কাজ বলুন, রেডিও-টিভি এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। ফলে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় মানুষকে গান ও মিউজিক শুনতে হচ্ছে। তাই ঘরে রেডিও-টিভি রাখার ব্যাপারে আলেমদের কাছ থেকে তারা সোজাসাপ্টা জবাব পেতে চায়।

মিউজিক থাকুক বা না থাকুক– শুধু গান নিয়েই প্রাথমিক যুগের আলেমদের মধ্যে বিতর্ক ও মতভেদ ছিল। তারা কিছু বিষয়ে একমত হতে পেরেছিলেন, আবার কিছু বিষয়ে পারেননি।

যেসব গানে অশ্লীলতা, পাপাচার ও পাপাচারের সুড়সুড়ি থাকে, সেসব গান হারাম হওয়ার ব্যাপারে আলেমগণ একমত হয়েছেন। আসলে গান তো কিছু কথামালার সমষ্টি মাত্র। ফলে এর যা কিছু ভালো সেগুলোকে ভালো এবং যা কিছু মন্দ সেসবকে মন্দ হিসেবই নিতে হবে। তাই কোনো গানের কথায় হারাম উপাদান থাকলে স্বভাবতই তা হারাম বিবেচিত হবে। সে ধরনের গানে সুর ও মিউজিক যোগ করা হলো কি হলো না, তাতে কি আসে যায়?

মিউজিক, যৌনতা ও পাপাচারের সুড়সুড়িমুক্ত স্বাভাবিক গানের বৈধতার ব্যাপারে আলেমগণ একমত পোষণ করেছেন। যেমন: বিয়ে অনুষ্ঠান, বিশেষ কোনো অতিথির আগমন এবং দুই ঈদসহ শরীয়তসম্মত বিভিন্ন উপলক্ষ্য, যেখানে লোকেরা আনন্দ-ফুর্তি করে থাকে। তবে এখানেও তারা একটি শর্ত দিয়েছেন। সেটি হলো, এসব ক্ষেত্রে অপরিচিত মানুষের সামনে কোনো নারী গান গাইতে পারবে না।

এর স্বপক্ষে সুস্পষ্ট দলীল রয়েছে, যা আমরা পরবর্তীতে তুলে ধরবো।

যা হোক, এই ঐক্যমতের বাইরে বিষয়টি নিয়ে আলেমদের মধ্যে সুস্পষ্ট মতপার্থক্যও রয়েছে। মিউজিক থাকুক বা না থাকুক, সব ধরনের গানকেই কোনো কোনো আলেম বৈধ সাব্যস্ত করেছেন। কেউ কেউ একে মুস্তাহাব বলেও মনে করেন। আবার অনেকে মিউজিক গানকে নিষিদ্ধ মনে করেন, তবে মিউজিকবিহীন গানকে বৈধ মনে করেন। আলেমদের আরেকটি পক্ষ মিউজিক বা মিউজিকবিহীন সব ধরনের গানকে হারাম মনে করেন। তারা একে কবীরা গোনাহ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।

বিষয়টির গুরুত্বের কারণে সঙ্গীত নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করার একটা দায়িত্ববোধ আমি অনুভব করেছি। বিষয়টি আমি এতটা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরতে চাই, যাতে মুসলমানরা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির মতের উপর নির্ভরশীল না থেকে সুস্পষ্ট দলীলের ভিত্তিতে সঙ্গীতের হালাল ও হারাম দিকগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। এতে করে মুসলমানরা বিষয়টি সম্পর্ক স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারবে এবং এ ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান সম্পর্কেও অবগত হতে পারবে।

মানুষ যখন নানান মত ও পথে ঘুরপাক খেতে খেতে সঠিক রাস্তা হারিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়; তখন সবুজ বাতি জ্বালিয়ে মানুষকে সঠিক পথ দেখিয়ে দেয়া কিংবা লাল বাতি জ্বালিয়ে ভুল পথ থেকে বিরত রাখাই হলো আলেমদের কাজ। আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা, আমরা যেন সত্যকে সত্য হিসেবে চিনতে পারি এবং তা মেনে চলতে পারি। একই সাথে আমরা যেন মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে চিনতে পারি এবং তা বর্জন করতে পারি। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সেই তওফিক দান করুন।

সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্রকে যারা হারাম সাব্যস্ত করেছেন, তাদের উত্থাপিত দলীল ও যুক্তিগুলো আমরা প্রথমে বিশ্লেষণ করবো। তারপর যারা একে হালাল সাব্যস্ত করেছেন, তাদের উত্থাপিত দলীল ও যুক্তিগুলো বিশ্লেষণ করবো। সবশেষে দলীল-প্রমাণ ও শরীয়াহর আলোকে যে মতামতটি তুলনামূলক বেশি শক্তিশালী, আমরা তাকে প্রাধান্য দেবো।

*****

বাকি পর্বগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন

*****

রেফারেন্স ও নোট

[1]  সহীহ মুসলিম।

[2] প্রথমে বর্ণনাটি ইমাম আহমদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান এবং দারেমী তাঁদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীতে দারেমী ও হাকিম বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন। প্রত্যেকেই আল-বারা’র বরাতে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। দেখুন, সহীহ জামে আস সগীর (হাদীস নং– ৩৫৮০ ও ৩৫৮১)।

[3] আবু হুরাইরার (রা) বরাতে ইমাম বুখারী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এছাড়া আরো অনেক গ্রন্থে বিভিন্ন সাহাবীর বরাতে হাদীসটির উল্লেখ রয়েছে।

[4] আবু মুসার (রা) বরাতে ইমাম মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এছাড়া ইমাম বুখারীসহ আরো অনেকে ভিন্ন ভিন্ন সাহাবীর বরাতে বিভিন্ন আঙ্গিকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

[5] ইমাম আহমদ, বুখারী, মুসলিম, আবূ দাঊদ ও নাসাঈ আবু হুরাইরার (রা) বরাতে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। দেখুন, সহীহ জামে আস সগীর (হাদীস নং– ৫৫২৫)।

[6] আবু হুরাইরার (রা) বরাতে সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত।

[7] উবাই ইবনে কাবের (রা) বর্ণনা অনুযায়ী সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত। এছাড়া একদল সাহাবীদের নিকট থেকেও অনুরূপ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। দেখুন, সহীহ জামে আস সাগীর (হাদীস নম্বর– ২২১৯)।

[8] ইবনে ওমরের (রা) বরাত দিয়ে ইমাম মালেক, আহমদ, বুখারী, আবু দাউদ এবং তিরমিযী তাঁদের স্ব স্ব গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। দেখুন, প্রাগুক্ত (হাদীস নং­– ২২১৬)।

[9] ইবনে আব্বাসের (রা) বরাতে আহমদ ও আবু দাউদ তাঁদের নিজ নিজ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। দেখুন, প্রাগুক্ত (হাদীস নং– ২২১৫)।

[10] এই লাইন দুটি লেখকের নাম ছাড়াই লিসানুল আরবে উল্লেখ করা হয়েছে। দেখুন, ১৯তম খণ্ড, ৩৭৬ পৃ.।

১টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন