মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭
হোম > ডকুমেন্টারি অনুবাদ > মি অ্যান্ড দ্যা মস্ক (শেষ পর্ব)

মি অ্যান্ড দ্যা মস্ক (শেষ পর্ব)

এডিটরস নোট:

নারী অধিকার প্রসঙ্গে ইসলামপন্থীদের কথাবার্তা হলো ‘কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নাই’ প্রবাদের মতো। মহানবীর (সা) সময়কালে মসজিদে নববীতে নারীরা পুরুষদের পেছনে নামাজ আদায় করতেন। অথচ বর্তমানে মুসলিম বিশ্ব জুড়ে নারীদের মসজিদে প্রবেশ রীতিমতো নিষিদ্ধ। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এই ধরনের সুন্নাহবিরোধী নিষেধাজ্ঞা যেসব ‘ফেতনা’র আশংকা থেকে আরোপ করা হয়েছে, সেসব ‘ফেতনা’ তৎকালীন সময়েও কমবেশি ছিল। তাই বলে তখন নারীদের মসজিদে যাতায়াত বন্ধ করা হয়নি। কানাডিয়ান মুসলিম নারী জারকা নেওয়াজ ২০০৫ সালে ‘মি অ্যান্ড দ্যা মস্ক’ শিরোনামে একটি ডকুমেন্টারি নির্মাণ করেন। ইসলামে নারীদের ঐতিহাসিক ভূমিকা, কানাডার মসজিদগুলোর বর্তমান অবস্থা, ব্যক্তিগত ক্ষোভ, আশংকা, উপেক্ষা ও সমঝোতার গল্পগুলো এতে বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। একটি সুন্দর সমাজ গড়ার জন্য নারী-পুরুষের যৌথ অংশগ্রহণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে এটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমাদের ধারণা। বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের জন্য এর ধারাবাহিক অনুবাদ করছেন মাসউদুল আলম।


প্রথম পর্ব | দ্বিতীয় পর্ব | তৃতীয় পর্ব | চতুর্থ পর্ব



তারিক সোয়াইদানের সাথে

আসরার সাথে সময় কাটানোর পর উপলব্ধি করলাম, আমাদের পক্ষে নারীদের জন্য কাঙ্খিত পরিবর্তন আনা বেশ কঠিন। যা হোক, এই পর্যায়ে কুয়েতি স্কলার ড. তারিক সোয়াইদানের সাথে আমি সাক্ষাৎ করি। তিনি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। মুসলিম নেতৃত্ব নিয়ে প্রচুর লিখেছেন। মসজিদের পরিবেশের আরো উন্নতিসাধন দরকার বলে তিনি মনে করেন। তাঁর সাথে আমার আলাপের বিবরণ–

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের দূরদৃষ্টির যথেষ্ট অভাব রয়েছে এখনকার আধুনিক সময়ে আমাদের মসজিদগুলোর ব্যবস্থাপনায় বেশ দুর্বলতা রয়েছেএই কারণে আমাদেরকে অনেক সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে বলে আমি মনে করি এক সময় আমি একটি মসজিদ পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছি তখন আমি জুমার খুতবা দিতাম, নামাজও পড়াতাম আমি তখন নির্দেশ দিয়েছিলাম, মসজিদে নারী-পুরুষের মাঝখানে কোনো দেয়াল রাখা যাবে না

সেখানে কি আগে থেকেই দেয়াল ছিল?

হ্যাঁ

দেয়ালটা দেখতে কেমন ছিল?

দেয়ালটি ছিল কাচের

নারীরা কি এতদিন কাচের দেয়ালের পেছনে নামাজ আদায় করতো?

হ্যাঁ, নারীদের দিক থেকে কাচ ছিল স্বচ্ছ ভেতরে দেখা যেত তবে ভেতর থেকে নারীদের অংশ দেখা যেত না

একদম আমাদের মসজিদের মতো! তারপর আপনি কী করলেন?

আমি তাদেরকে মসজিদের ভেতরে এসে বসতে বললাম

তারা কি ভেতরে আসার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছিল?

হ্যাঁ

এ ব্যাপারে পুরুষরা কী বললো?

কেউ কেউ অসন্তুষ্ট হয়েছিলকিন্তু আমি যখন এর পক্ষে তাদেরকে রাসূলের (সা) হাদীস দেখিয়েছি, সাহাবীদের আমলের উদাহরণ দিয়েছি; তখন তাদের আর বলার কিছু ছিল না অতএব তারা

আমি এই প্রথম শুনলাম, একজন ইমাম নারীদেরকে নামাজের মূল কক্ষের বাইরে না যেতে বলছেন!

আগে তারা ভেতরে আসতে পারতো না অথচ তারা বাইরে বসবে, নাকি ভেতরে বসবে এটা তো তাদের পছন্দের বিষয় যা হোক, সেই মসজিদ থেকে চলে আসার সাত বছর পর আমি আবার মসজিদটিতে গিয়েছিলাম দেখলাম, নারীরা ভেতরে বসেই আমার বক্তব্য শুনছে কোনো পর্দা বা কাচের দেয়াল ছিল না

সত্যিই দারুণ এক প্রেরণামূলক ঘটনা শুনলাম।

ম্যানিটোবার ক্যাম্পিংয়ে

আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, নারীরা মসজিদের কোথায় নামাজ আদায় করবে, এটা তো সহজ একটা ব্যাপার। এত জটিলতার কী আছে? তবে বাস্তবতা ভিন্ন। তাই আগে সমাজের বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে হবে।

উইনিপেগের মুসলমানরা বাচ্চাকাচ্চাসহ সময় কাটানোর জন্য প্রতিবছরই একটি ক্যাম্পের আয়োজন করে। এবার ক্যাম্প করা হয়েছে ম্যানিটোবার গিমলিতে। সেখানে এ বিষয়ে আমি একটি আলোচনার আয়োজন করি। আলোচনার প্যানেল সদস্য ছিলেন ম্যানিটোবা ইসলামিক এসোসিয়েশনের ইমাম হোসনী আজ্জাবী এবং আমার বন্ধু নাদিরা ও আমাল আবু কারাম (এই দুজন একসময় উইনিপেগে বাস করতেন)। মসজিদে নারীদের নামাজের স্থানের সামনে দেয়াল থাকার ব্যাপারে সৃষ্ট হতাশার বিষয়টি পুরুষদেরকে কীভাবে বুঝাবো, তা নিয়ে আমি কিছুটা নার্ভাস ছিলাম। আলোচনার মূল অংশ এখানে তুলে ধরা হলো–

জারকা নেওয়াজ: আপনারা জানেন, নারীরা কোথায় নামাজ আদায় করবে, তা এখন একটা বিশাল ইস্যু। তারচেয়েও বড় কথা হলো, নারীদেরকে কি দেখা যাবে? তাদের কণ্ঠস্বর কি শোনা যাবে? আমি পুরো দেশজুড়ে মুসলিম নারীদের সাথে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলছি। তারা আমাকে বলেছে, মুসলিম নারীদের পক্ষে সমাজে নিজেদের মতামত দিতে পারা খুবই কঠিন কাজ। যা হোক, মসজিদে দেয়াল থাকার নেতিবাচক ফলাফল কী হতে পারে? এ ব্যাপারে আপনাদের ব্যক্তিগত অভিমত শুনতে চাই।

আমাল আবু কারাম: ঠিক আছে, শুরু করা যাক। কিন্তু আমি তো আর এখানে থাকি না… (হাসি)।

জারকা নেওয়াজ: সেজন্যই তোমাকে প্যানেলে রাখা হয়েছে।

আমাল আবু কারাম: আমি মনে করি, দেয়াল থাকলে নারী ও শিশুরা মসজিদে যাওয়ার ব্যাপারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে কমিউনিটির উন্নতি ঘটবে না। এটা একটা উদাহরণ মাত্র। সমাজের কর্মকাণ্ডের উপর এর প্রভাব রয়েছে। আমি ঠিক জানি না, এখানকার কমিউনিটি এখন কতটা সক্রিয়। তবে নারীরা যদি মসজিদে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করে, তাহলে সেটা নিশ্চয় চিন্তার বিষয়।

পুরুষ অংশগ্রহণকারী (১): আমি মনে করি, আমাদের মুসলমানদের জন্য এসব ইস্যু খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। একটা অনৈসলামিক পরিবেশের মধ্যে আমরা রয়েছি। এখানে আমাদের অনুসৃত আদর্শ থেকে আমাদেরকে বিচ্যুত করতে অমুসলিমরা সাধারণত এসব ইস্যু নিয়ে এই পন্থায় বিতর্ক তৈরি করে।

পুরুষ অংশগ্রহণকারী (২): দেখা যাচ্ছে, অনেক কিছুতেই এক ধরনের পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। নারীদেরকে সবসময় পুরুষের সমকক্ষ ও পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের মসজিদ ও কমিউনিটিতে আমি এই প্রবণতা লক্ষ করছি। ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যেন নিত্য নতুন সব বিষয় নিয়ে নারীদেরকে তর্ক-বিতর্ক করতেই হবে। আমরা নারীদেরকে আমাদের সমাজে অগ্রাহ্য করছি না। সব ব্যাপারেই তারা তাদের মতামত দেবেন, এটা আমরা চাই। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, ঘরই হলো নারীদের জন্য সঠিক স্থান।

ডিয়ানা ডিসান্টিজের প্রতিউত্তর: আমি নারীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণে বিশ্বাসী। নারীদেরকে নিজেদের কমিউনিটির অংশ হয়ে ওঠার চেষ্টা করা উচিত…।

পুরুষ অংশগ্রহণকারীর জবাব: আমি ঠিক এ কথাই বলেছি। আপনার বক্তব্য আমি মোটেও অগ্রাহ্য করছি না। আমি শুধু বলেছি, প্রত্যেকেই ছাড় দিতে চায়, আমরাও চাই। তাই আরো বেশি করে জানার চেষ্টা করুন, তাহলে আরো ছাড় দিতে শিখবেন। এ কথাটাই আমি বলেছি।

ডিয়ানা ডিসান্টিজের প্রতিউত্তর: আমি বিশ্বাস করি, নারীরা যেমন সন্তান লালন-পালন করতে পারে, তেমনি একটি দেশও গড়ে তুলতে পারে। তাই নারীদের কথা শোনা উচিত। নারীরা ঘরে আবদ্ধ থাকলে, তাদের কথা না শোনা হলে দুনিয়া কীভাবে টিকবে? স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাও তাই শুধু পুরুষ সৃষ্টি করেননি, নারীদেরও সৃষ্টি করেছেন।

পুরুষ অংশগ্রহণকারীর জবাব: স্বামী-সন্তানের যত্ম নেয়া, পরিবার দেখাশোনা করা নারীদেরই কাজ। আমি দৃঢ়ভাবে এটি বিশ্বাস করি।

ইমাম হোসনী আজ্জাবী: মসজিদে পার্টিশন থাকাকে আমি বড় কোনো ইস্যু মনে করি না। কারণ, এটি ইসলামের অপরিহার্য অংশ নয়। এমনকি নামাজের ফরজ-ওয়াজিবের মধ্যেও এটি পড়ে না। এ বিষয়ে লোকেরা নানা ধরনের মতামত দিতেই পারে। তবে কাউকে না কাউকে রোল মডেল হিসেবে অনুসরণ করা উচিত। তাই আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে রোল মডেল হিসেবে আমরা কাকে মানবো। উদাহরণ হিসেবে আমরা মহানবীর (সা) স্ত্রীদের কথা বলতে পারি। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে রোল মডেল হিসেবে মেনে চলার উপদেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, তারা যেন ঘরেই অবস্থান করে। সুতরাং…

সংস্কৃতি বনাম ধর্ম

নারীদেরকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ঘরে আবদ্ধ রাখার এই প্রচলিত ধ্যানধারণা কি আদৌ ইসলামসম্মত, নাকি ইসলামের সঠিক জ্ঞান না থাকার ফলেই এসব ধারণার ভিত্তি তৈরি হয়েছে? বিষয়টি নিয়ে আমি বিভিন্ন স্তরের বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলেছি। প্রথমে কুয়েতি স্কলার ড. তারিক সোয়াইদানের বক্তব্য তুলে ধরলাম–

দুঃখজনকভাবে মুসলিম বিশ্বে ইসলামের মূলনীতির পরিবর্তে স্থানীয় প্রথাগুলোই গেড়ে বসেছে। বেশিরভাগ মানুষ মহানবীর (সা) শিক্ষা থেকে এসব প্রথাকে আলাদা করতে পারে না। মহানবীর (সা) সময়কালকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে আমরা স্পষ্টতই দেখবো, নারী-পুরুষকে আলাদা করার জন্য সেখানে কোনো দেয়াল বা পর্দা ছিল না। শুধু মহানবীর (সা) স্ত্রীগণই ছিলেন এর ব্যতিক্রম।[1] এর কার‍ণ হলো তারা হলেন মুসলমানদের কাছে মায়ের মতো। তাই পবিত্র দৃষ্টি ছাড়া তাদের দিকে কারো তাকানো ছিল অনুচিত। এই কারণেই তারা ছিলেন ব্যতিক্রম। দুঃখজনকভাবে অনেক স্কলার এবং পরবর্তীতে সাধারণ মানুষও ব্যাপারটি মুসলিম নারীদের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন।

এ বিষয়ে আরেকটা আয়াতে বলা হয়েছে, পর্দার আড়াল ছাড়া তাদের সাথে কথা বলা উচিত নয়।[2] আপনি যদি ভালোভাবে ইতিহাস অধ্যয়ন করেন (আমি তা করেছি), ভালোভাবে হাদীস ও কোরআন অধ্যয়ন করেন, তাহলে স্পষ্টতই বুঝতে পারবেন, এই ব্যাপারটি শুধু মুমিনদের মা তথা মহানবীর (সা) স্ত্রীগণের জন্য প্রযোজ্য। অন্যদের বেলায় এটি প্রযোজ্য নয়।

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর মুসলিম উইমেনের ডিরেক্টর আমিনা অ্যাসিলমিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মুসলিম পুরুষরা যে নারীদেরকে পৃথক ও বিচ্ছিন্ন রাখার ব্যাপারে খুব কঠোর, এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন–

অজ্ঞতা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির অনুসরণই হলো এর মূল কারণ। অমুক শায়খ, তমুক হুজুর কিংবা মা-বাবা যাই হোক না কেন, তাদের কাছ থেকে নারীদের ব্যাপারে এভাবে শুনে শুনে লোকেরা বড় হয়েছে। কোনো কোনো দেশে নারীদেরকে বিচ্ছিন্ন রাখা সামাজিক প্রথা হিসেবে প্রচলিত। এ দেশে তারা সেগুলোই নিয়ে এসেছে। এটা নিছকই অজ্ঞতা। তারা সত্যিকার অর্থে কোরআন ও হাদীস অধ্যয়ন করলে বুঝতে পারবে, তাদের ধারণা সঠিক নয়। মুসলিম দেশগুলোতে প্রচলন থাকলেই যে কোনো কিছু ইসলামসম্মত হয়ে যাবে, এমন কোনো কথা নেই।

একই প্রশ্নের জবাবে নববী ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. ওমর ফারুক আব্দুল্লাহ বলেছেন–

আপনি যে প্রসঙ্গটি তুলেছেন, তা মূলত একটি অধঃপতিত সংস্কৃতি। মুসলিম সংস্কৃতিকেও এটি অধঃপতিত করেছে। এটি মূলত এসেছে ভারত, পাকিস্তান বা আরব অঞ্চল থেকে। এটি আসলে ইসলামী সংস্কৃতি নয়।

দুনিয়ার যে কোনো সংস্কৃতি বা ধর্মকেই অধঃপতনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। মুসলমানরা নিজেরাই ধর্মীয় সাহিত্যে যেসব পুরুষতান্ত্রিক ধ্যানধারণা ঢুকিয়েছে, সেগুলোকে দূর করাই এখন মুসলমানদের জন্য চ্যালেঞ্জ। এ ব্যাপারে হাদীসশাস্ত্র ও ফিকাহবিদ শায়খ আব্দুল্লাহ আজমীর বক্তব্য হলো–

আমাদের সমাজে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে ওঠেছে, যেখানে নারীর মর্যাদা সম্পর্কে অজ্ঞতা একেবারে বদ্ধমূল হয়ে গেছে। আমাদের গড়ে তোলা এই বাস্তবতাকে সমর্থন করেই আমরা এখন ফতোয়া দিচ্ছি। তারপর একেই ইসলামের আইনগত অবস্থান বলে দাবি করছি। তাই না?

নারীদের নিয়ে পুরুষদের লেখা কিছু বই দেখলে অবাক লাগে। মনে হয় যেন নারীদের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণকে ন্যায্যতা দিতেই তারা ইসলামী জ্ঞানের সূত্রগুলোকে (কোরআন ও হাদীস) কাটাছেঁড়া করেছেন। তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি পুরো দুনিয়ার মুসলিম সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলেছে। যার ফলে নারীদেরকে সামাজিক কাজকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার ব্যাপারটি গেড়ে বসেছে। শায়খ আজমীর শেষ কথা হলো–

আমি মনে করি, নারীদেরকে সামাজিক কাজকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার স্ববিরোধ থেকে আমাদের মুক্ত হওয়া উচিত। যেহেতু বাস্তবেই আমাদের একত্রে কাজ করার গঠনমূলক উদ্দেশ্য রয়েছে। কোরআনে নারী-পুরুষকে সমন্বিতভাবে সামাজিক দায়িত্ব পালনের নিদের্শ দেয়া হয়েছে। কারণ, বিশ্ব পরিচালনার ব্যাপারে তারা সমভাবে দায়বদ্ধ।

ড. তারিক সোয়াইদান এ ব্যাপারে আমার কাছে বলেছেন–

আমি মনে করি, যারা মসজিদে দেয়াল, পর্দা বা এ জাতীয় কিছু আরোপ করতে চায়, তাদের নিয়ত ভালো। নামাজের স্থানে যেন বাজে কিছু না ঘটে, মুসল্লীদের মনে যাতে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য তৈরি না হয়, পবিত্র মনে যেন নামাজ আদায় করা যায়– এ ব্যাপারগুলো তারা নিশ্চিত করতে চান। আমি তাদের এই নিয়তকে সম্মান করি, যদিও তাদের কর্মপদ্ধতি ভুল। আসলে সঠিক জ্ঞানের অভাবেই এমনটা হচ্ছে। আপনি দেখবেন, অনেকেই একে সঠিক মনে করে। কিন্তু তাদেরকে যখন প্রকৃত ব্যাপারটা বুঝাবেন, তখন তারা ঠিকই বুঝতে পারবে।

পরিবর্তনের সূচনা

এরমধ্যে এক বছর পেরিয়ে গেছে। দীর্ঘদিন পর রেজিনায় আমার মসজিদটিতে আবার গেলাম। ততদিনে সেখানে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। চলতি বছর আমাদের ইসলামিক এসোসিয়েশন অব রেজিনার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন ড. আহমদ আবু শীর। এই ধরনের দায়িত্বে তিনি নতুন। মসজিদে পরিবেশের উন্নয়ন সাধনের জন্য তিনি দৃঢ় মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। এই নতুন পরিস্থিতিতে নারীরা এখন মসজিদে আগের চেয়ে বেশি সক্রিয়। কমিউনিটির বিভিন্ন কমিটিতে পুরুষদের পাশাপাশি আমার বন্ধুরাও এখন মনোনীত হচ্ছেন। মসজিদে ঢুকতেই ড. আহমদের সাথে দেখা হয়ে গেলো। আমরা সালাম ও কুশল বিনিময় করলাম। তারপর তার অফিসে গিয়ে বসলাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছি, আমাদের কমিউনিটির সমস্যাগুলোর সমাধানের ব্যাপারে আপনি কী ভাবছেন? আমরা কীভাবে সংস্কার কাজ শুরু করতে পারি?

তিনি জবাব দিয়েছেন,

সবাই একটা ইতিবাচক পরিবর্তন চাচ্ছে, যাতে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি, সবাই যেন মিলেমিশে থাকতে পারি। তাই কমিউনিটির সবাই যেন সন্তুষ্ট থাকে তা বিবেচনায় রেখে আমরা ধীরে ধীরে বিভিন্ন নিয়মকানুনের প্রচলন ঘটাতে পারি। কোনো সমস্যা আলোচনার টেবিলে উত্থাপন করাই হলো সবচেয়ে কার্যকর পন্থা। এতে আমি-আপনি-সবাই সমস্যাটির দিকে নজর দিতে পারবো। সমাধানের জন্য আমাদের হাতে রয়েছে দুটি মানদণ্ড– কোরআন ও হাদীস। এভাবে আমরা আমাদের সকল সমস্যার সমাধান করতে পারবো। আমি মনে করি, এর ফলে নিকট ভবিষ্যতেও তেমন কোনো সমস্যা তৈরি হবে না।

যদিও আমি আশাবাদী, তারপরও এই পরিবর্তনের স্থায়িত্ব নিয়ে একটা শংকা কাজ করে। কারণ, এখানে মাত্র একজন ব্যক্তির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে যিনি নতুন প্রেসিডেন্ট হবেন, মসজিদে নারীদের নামাজের স্থানের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমও হতে পারে। যা হোক, তারা কাচের দেয়াল দেয়ার পর থেকে আমি এখানে আর জুমার নামাজ আদায় করিনি। তারপর এই প্রথম জুমার নামাজ পড়তে এসেছি। তাই নামাজ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানে যেতে আমি কিছুটা নার্ভাস ফিল করেছি।

আমি মুসলমান হিসেবে জীবনযাপন করতে ভালোবাসি। অথচ আমাকে মসজিদে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হয়েছিল। এতে আমি মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। আমার কাছে মসজিদ হলো মুসলিম সমাজের কেন্দ্র। আমি যেমন একটা আনন্দময় পরিবেশে মুসলিম হিসেবে বেড়ে ওঠেছি, আমি চাই আমার বাচ্চারা, বিশেষ করে আমার মেয়েরা যেন ঠিক সেই অনুভূতি নিয়েই বেড়ে ওঠে।

নিশ্চয়ই আল্লাহ কখনো কোনো জাতির অবস্থার পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করে
(সূরা রা’দ: ১১)


নোট:

[1] হে নবীপত্নীরা! তোমরা অন্য নারীদের মতো (সাধারণ নারী) নও, যদি তোমরা (সত্যিই) আল্লাহকে ভয় করো, তাহলে (অন্য পুরুষদের সাথে) কথা বলার সময় কোমলতা অবলম্বন করো না, (যদি এমন করো) তাহলে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে তোমার ব্যাপারে প্রলুব্ধ হয়ে পড়বে, (তবে) তোমরা (সর্বদাই) ভালোভাবে কথাবার্তা বলবে। (সূরা আহযাব: ৩২)

[2] তোমাদের যদি নবীপত্নীদের কাছ থেকে কোনো জিনিসপত্র চাইতে হয় তাহলে পর্দার আড়াল থেকে চেয়ে নিয়ো, এটা তোমাদের ও তাদের অন্তরকে পাক সাফ রাখার জন্যে অধিকতর উপযোগী। (সূরা আহযাব: ৫৩)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *