মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭
হোম > ডকুমেন্টারি অনুবাদ > মি অ্যান্ড দ্যা মস্ক (পর্ব-২)

মি অ্যান্ড দ্যা মস্ক (পর্ব-২)

এডিটরস নোট:

নারী অধিকার প্রসঙ্গে ইসলামপন্থীদের কথাবার্তা হলো ‘কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নাই’ প্রবাদের মতো। মহানবীর (সা) সময়কালে মসজিদে নববীতে নারীরা পুরুষদের পেছনে নামাজ আদায় করতেন। অথচ বর্তমানে মুসলিম বিশ্ব জুড়ে নারীদের মসজিদে প্রবেশ রীতিমতো নিষিদ্ধ। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এই ধরনের সুন্নাহবিরোধী নিষেধাজ্ঞা যেসব ‘ফেতনা’র আশংকা থেকে আরোপ করা হয়েছে, সেসব ‘ফেতনা’ তৎকালীন সময়েও কমবেশি ছিল। তাই বলে তখন নারীদের মসজিদে যাতায়াত বন্ধ করা হয়নি। কানাডিয়ান মুসলিম নারী জারকা নেওয়াজ ২০০৫ সালে ‘মি অ্যান্ড দ্যা মস্ক’ শিরোনামে একটি ডকুমেন্টারি নির্মাণ করেন। ইসলামে নারীদের ঐতিহাসিক ভূমিকা, কানাডার মসজিদগুলোর বর্তমান অবস্থা, ব্যক্তিগত ক্ষোভ, আশংকা, উপেক্ষা ও সমঝোতার গল্পগুলো এতে বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। একটি সুন্দর সমাজ গড়ার জন্য নারী-পুরুষের যৌথ অংশগ্রহণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে এটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমাদের ধারণা। বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের জন্য এর ধারাবাহিক অনুবাদ করছেন মাসউদুল আলম।


প্রথম পর্ব | তৃতীয় পর্ব | চতুর্থ পর্ব | শেষ পর্ব



উইনিপেগ মসজিদে

পুরো উত্তর আমেরিকা জুড়ে সহস্রাধিক মসজিদ রয়েছে। এরমধ্যে শুধু কানাডায় রয়েছে আনুমানিক ১৪০টি মসজিদ। ১৯৯৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, ৫২ শতাংশ মসজিদেই নারীদের নামাজের স্থান হয় পর্দাঘেরা, নয়তো রয়েছে আলাদা পার্টিশন। এ ধরনের মসজিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০০০ সাল নাগাদ ৬৬ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে।

এ ধরনের একটি মসজিদ রয়েছে ম্যানিটোবার উইনিপেগ শহরে। ছাদ থেকে দেয়াল পর্যন্ত পার্টিশন দেয়া। ‘ম্যানিটোবা ইসলামিক এসোসিয়েশন’ এটি পরিচালনা করে। সেই মসজিদে আমি শাহীনা সিদ্দিকী এবং ডিয়ানা ডিসান্টিজের সাথে কথা বলেছি। শাহীনা সিদ্দিকী ‘ইসলামিক সোশ্যাল সার্ভিসেস এসোসিয়েশন অব কানাডা’র প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর ডিয়ানা ডিসান্টিজ উইনিপেগ শহরের মুসলিম কমিউনিটির একজন নারী।

জারকা নেওয়াজ: প্রথম কখন এখানে পার্টিশন দেয়া হয়? তখন এর ধরন কেমন ছিল?

শাহীনা সিদ্দিকী: আমার ধারণা ১৯৮০’র দশকের শেষ দিকে এটি চালু হয়।

ডিয়ানা ডিসান্টিজ: আমি অবশ্য বেশিদিন আগে এখানে আসিনি। মাত্র ১৩ বছর হলো। তখন এই পার্টিশনটি হাঁটু-পরিমাণ উঁচু ছিল। আমার ধারণা, তারা ধীরে ধীরে এটি উঁচু করেছে। বোন শাহীনা শুরু থেকেই এখানে ছিলেন, তিনি এ ব্যাপারে আরো ভালো বলতে পারবেন।

শাহীনা সিদ্দিকী: তবে সেই নিচু পার্টিশনই তাদেরকে আজ এই ছাদ সমান উঁচু পার্টিশন দেয়ার সাহস যুগিয়েছে।

জারকা নেওয়াজ: আমার প্রথমেই মনে হয়েছে, নারীরা যেন পুরুষদের নজরে না পড়ে তা নিশ্চিত করার জন্য নারীদেরকে এই চরম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। বিল্ডিংটির অন্যান্য অংশের চেয়ে এই পার্টিশনটি যে কোনো বিশেষ ভাবনা থেকে করা হয়েছে, তা স্পষ্টতই বুঝা যায়।

শাহীনা সিদ্দিকী: মসজিদের এই দরজাগুলোও কি তারা পেরেক ঠুকে বন্ধ করে দিতে চায়নি?

ডিয়ানা ডিসান্টিজ: বন্ধ করেই দিয়েছিল। নারী ও শিশুরা যেন দরজা খুলতে না পারে সেজন্য গত বছর তারা ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। কারণ, দরজাগুলো আমাদের দিক থেকে খোলা যেত। একদিন এসে দেখি কোনো দরজাই খুলতে পারছি না। এ ঘটনায় আমরা ক্ষোভ প্রকাশ করলে তারা কিছু দরজা খুলে দেয়। এই দেখুন, ভেতরে দরজার উপর দিকে এখনো একটি করে কাঠের ছোট টুকরা রয়েছে। এগুলো দিয়েই তারা দরজা আটকে দিয়েছিল।

শাহীনা সিদ্দিকী: দেখুন, পার্টিশনের গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ভেতরে ভালো করে কিছু দেখা যাচ্ছে না। পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন বা ওভারহেড প্রজেক্টরে কিছু দেখানো হলে এখানে বসে নারীরা দেখতেই পাবে না। এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য।

ম্যানিটোবা ইসলামিক এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ড. ঘাসসান জোনদীর সাথে বিষয়টি নিয়ে আমার নিম্নোক্ত কথাবার্তা হয়–

শুরুর দিকে তো এখানে কোনো পর্দা বা দেয়াল ছিল না। তাই না?

হ্যাঁ, শুরুতে এখানে কোনো পর্দা বা দেয়াল ছিল না। আমি অন্তত এ রকম কিছু থাকার কথা শুনিনি।

আপনি যখন এখানে আসেন, তখন দেয়াল তৈরির কাজ চলছিল। তাই না?

আমি যখন এখানে আসি, ততদিনে সম্ভবত দেয়াল তৈরি হয়ে গিয়েছিল অবশ্য আমি একে ঠিক দেয়াল বলবো না।

তাহলে কী বলবেন?

একে পার্টিশন বলা যেতে পারে

ঠিক আছে। তো পার্টিশন যখন…

দেয়াল শব্দটা বললে কেমন যেন লাগে মনে হয় যেন কোনো স্থান দখল করার জন্য দেয়াল তুলে দেয়া হয়েছে বৈষম্যের দেয়াল,  দখলদারিত্বের দেয়াল এ ধরনের অনুভূতি হয় তাই পার্টিশন বলাই ভালো

পার্টিশন…

এটা মূলত নারী-পুরুষের মধ্যে এক ধরনের পৃথকীকরণ যতক্ষণ এখানে কোনো পুরুষের উপস্থিতি থাকবে না, ততক্ষণ নারীরাও পুরুষদের জন্য নির্ধারিত এই অংশে আসতে পারবে আপনি জানেন, ইসলামে নারী-পুরুষের মেলামেশা তথা একত্রে অবস্থানকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে আর এসব কারণেই এই ব্যবস্থা

উইনিপেগ মুসলিম কমিউনিটির আরো দুজন নারীর সাথে আমার কথা হয়। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ড. ঘাসসানের কথার টোনের সাথে মিলে যায়।

অ্যাশি নাসিম: দেয়ালের আড়ালে নামাজ আদায় করতে আমি স্বস্তিবোধ করি। আমার মনে হয়, ইসলামের দিক থেকে এটা তাকওয়ার কাছাকাছি। অন্য অনেক বিষয়ে আমরা পুরুষদের সাথে কথা বলতে পারি, কাজ  করতে পারি। কিন্তু নামাজ আদায়ের জন্য অনেক বেশি মনোযোগের প্রয়োজন। কেউ আমার দিকে তাকাচ্ছে না, বা তাকানোর সুযোগ নেই– নামাজে পূর্ণ মনোযোগের জন্য এমন পরিবেশ অধিক উত্তম। এতে আমি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।

শাহীনা আওয়ান: আমার অনুভূতিও একই রকম। আমাদের এখানে এই পর্দার ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। এটি থাকা না থাকা নিয়ে আগে কখনোই সমস্যা হয়নি। এখন কেন এটি নিয়ে কথা উঠছে, তাতে আমি বেশ অবাক হচ্ছি।

এ প্রসঙ্গে শাহীনা ও ডিয়ানার কাছে আবার ফেরা যাক। তারা কী বলে দেখি–

শাহীনা সিদ্দিকী: আমার কাছে মনে হয়, ব্যাপারটা আসলে সাংস্কৃতিক। এখানে জেন্ডার বৈষম্য ও পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব সংক্রান্ত অনুমান কাজ করে। হ্যাঁ, কেউ কেউ তাদের এই অবস্থানের পক্ষে কোরআন থেকে দলীল দেখানোর কসরত করেন। যেন এই ব্যবস্থা সর্বদাই বিদ্যমান ছিল। বিশেষত নবীজীর (সা) সময়ও যেন ছিল। কিন্তু আসলে তো তেমনটা ছিল না। তাদের নিজেদের ধারণাই ইসলামসম্মত– এমনটা ভেবে ও বিশ্বাস করেই তারা অভ্যস্ত। তাই মসজিদে নারীদেরকে সমঝে চলা উচিত, এমন একটা মনোভাব তাদের মধ্যে কাজ করে।

ডিয়ানা ডিসান্টিজ: ইসলাম গ্রহণের আগে আমি আর একটা ধর্মও খুঁজে পাইনি, যারা নারীদেরকে এত উচ্চ সামাজিক মর্যাদা প্রদান করেছে। তখন আমার মনে হয়েছে, ওয়াও! এমনটাই তো আমি খুঁজছি! এখন থেকে ‘নারী স্বাধীনতা’ বাদ, ইসলামই বরং ভালো। কিন্তু প্রত্যেকটা সমাজেই যে এই সমস্যাগুলো বিদ্যমান, ১৩ বছর আগে তা জানতাম না। এসব কারণে আমি এখানে খুব কম আসি।

শাহীনা সিদ্দিকী: এটা সত্যিই দুঃখজনক ব্যাপার। কারণ, এই মসজিদের প্রাণবন্ত পরিবেশের সাথে আমরা অভ্যস্ত ছিলাম।

ডিয়ানা ডিসান্টিজ: আরেকটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছি। ইসলাম নিয়ে জানাশোনার মাঝেপথেই আমি ইসলাম গ্রহণ করে ফেলি। আসলে আমি মুগ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। কারণ, মসজিদ  ক্যাথলিক চার্চের মতো নয়। চার্চে বসতে হয় বেঞ্চিতে, নিজের পরিবারের সাথে। এর তুলনায় মসজিদের পরিবেশ আমার কাছে অনেক স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ মনে হয়েছে। এখানে আমি অন্যান্য নারীর সাথে একই কাতারে বসতে পারি। বক্তব্য শুনতে পারি। সম্মিলিতভাবে সবার নামাজ আদায়ের পদ্ধতি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। এই দৃশ্য আমাকে নাড়া দেয়। আমার হৃদয়কে আন্দোলিত করে তোলে। কিন্তু তারা যখন আমার সামনে দেয়াল তুলে দেয়, তখন ভাবি, আমি কী দোষ করেছি? আমি তো কোনো অন্যায় করছি না, নামাজ আদায়ের চেষ্টা করছি মাত্র।

ডিয়ানার এই আবেগ ও প্রশ্নগুলো নিয়ে আমি পুনরায় ড. ঘাসসানের কাছে গেলাম–

ইসলাম হচ্ছে মধ্যপন্থী ধর্ম এই পার্টিশন দেয়ার মাধ্যমে আমরা তাই একটি মাঝামাঝি সমাধান দিয়েছি

মহানবীর (সা) সময়ে মসজিদে তো দেয়াল বা পর্দার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। তাহলে এটি কীভাবে মধ্যপন্থী সমাধান হয়? অথচ সেই সময়টাই ছিল সর্বোত্তম সময়!

হ্যাঁ, তখন ছিল না কারণ, ওই সময়টা ছিল সর্বোত্তম সময় আর তাঁরাও ছিলেন সর্বোত্তম মানুষ

তখনো কিন্তু পুরুষরা নারীদের দিকে তাকাতো।

তারা ছিলেন সর্বোত্তম সময়ের সর্বোত্তম মানুষ তাদের সাথে আমরা বর্তমানের তুলনা করতে পারি না

 

নারীদেরকে সমাজ বিচ্ছিন্ন রাখা

কেন আমরা তখনকার সাথে এখনকার তুলনা করতে পারি না? সাধারণ মানুষ যেসব সমস্যায় জর্জরিত, সেই সমাজ কি এসব সমস্যা থেকে পুরোপুরি মুক্ত ছিল? ইসলামী সভ্যতার অতীত গৌরব নিয়ে আমরা সাধারণত শুনে থাকি–

শত শত বছর ধরে ইসলাম সাফল্যের সাথে বিশ্বের নেতৃত্ব দিয়েছে তাদের ছিল বিশ্বের সর্বাধিক শক্তিশালী সেনাবাহিনী ইসলামী সভ্যতা জন্ম দিয়েছে মহান সব বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের….

একটা মিনিট থামুন, প্লিজ। হ্যাঁ, মুসলিম বিশ্বের দীর্ঘ ‘সোনালী অতীত’ ছিল এবং সেই ঐতিহ্যের একটি ধারাবাহিকতা এখনো গায়ের জোরে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। সেটি হলো নারীদেরকে বিচ্ছিন্ন রাখা। আসলে আরো অনেক নারীর মতো আমিও মনে করি, মহানবীর (সা) সময়কালই ছিল ইসলামের সত্যিকারের সোনালী যুগ। এসব বিষয় নিয়ে আমি নববী ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. ওমর ফারুক আব্দুল্লাহর মুখোমুখি হয়েছিলাম–

ইসলামের সমতাভিত্তিক সমাজের ধারণা থেকে কেন আমরা সরে যাচ্ছি? কেন এত দ্রুত সামাজিক অবক্ষয় ঘটছে?

ঊনিশ ও বিশ শতকে মুসলিম সমাজের অবক্ষয় একটি বাস্তবতা মুসলিম ও সেক্যুলার উভয় ঘরানার পণ্ডিতদের কাছেই এটি স্বীকৃত তবে প্রকৃতপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিংশ শতাব্দীতেই মুসলিম বিশ্বের কয়েকজন মহান চিন্তাবিদ ও সংস্কারক লক্ষ করেছেন যে, মুসলিম বিশ্বের ক্রমাগত পতনের কারণ ছিল নারীদেরকে ক্ষমতাহীন করে রাখা, দমিয়ে রাখা এবং সমাজ থেকে তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা এসব কারণে তারা অক্ষম হয়ে পড়েছে সর্বদাই যে কোনো বিষয়কে স্থান-কালের ভিত্তিতে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ

নারীদেরকে বিচ্ছিন্ন রাখা সম্পর্কে হাদীসের অবস্থান

মহানবীর (সা) কথা, কাজ বা পরোক্ষ সম্মতি সংক্রান্ত বর্ণনাগুলোর সমষ্টি হলো হাদীস। হাদীস থেকে প্রথম যুগের মুসলিম সমাজের অবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। কোরআনের পরেই ইসলামে জ্ঞানের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো হাদীস।

রাসূলের (সা) যুগে মসজিদে নারীদের নামাজের স্থানকে আড়াল করার ব্যাপারে হাদীসে কী বলা আছে, আমি তা জানার চেষ্টা করেছি। এ জন্য বিশ্বখ্যাত হাদীসশাস্ত্রবিদ শায়খ আব্দুল্লাহ আজমীর সাথে আমি কথা বলেছি­–

আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমতে এ পর্যন্ত রচিত সবগুলো হাদীসের সংকলন অধ্যয়ন করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে আমার কাছে এটি অকল্পনীয় সম্মানজনক ব্যাপার শুধু অধ্যয়নই নয়, হাদীসের বিশাল ভাণ্ডার থেকে বিশুদ্ধ মনিমুক্তাগুলো খুঁজে বের করা এবং বাছাই করতে পারার সৌভাগ্যও মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার প্রতি অসীম বদান্যতা

মহানবীর (সা) জীবদ্দশায় আধ্যাত্মিকতার দিক থেকে পূর্ণ সমৃদ্ধ মদীনার মুসলিম সমাজেও যে মসজিদে নারীদের জন্য আড়াল ছিল না, এ ব্যাপারে কিছু বলুন।

তখনো কিছু পুরুষ শেষ কাতারে দাঁড়াতো, যাতে তারা নারীদের কাতারের ঘনিষ্ট হতে পারে এই অবস্থা বিবেচনায় রাসূল (সা) একদিন বললেন, পুরুষদের জন্য সর্বোত্তম কাতার হলো সামনের কাতার সুস্পষ্ট প্রেক্ষাপট থাকা সত্ত্বেও রাসূলের (সা) নির্দেশনাটি ছিল একেবারেই সাধারণ এ ধরনের আরো অনেক ঘটনা রয়েছে একদম ছোটখাটো ঘটনার বর্ণনাও পাওয়া যায় কিন্তু নারী-পুরুষের নামাজের স্থানের মাঝখানে কোনো আড়াল দেয়ার বর্ণনা খুঁজে পাওয়া যায় না কারণ, এটি কখনোই ইস্যু ছিল না

অনেকগুলো হাদীসের বর্ণনা থেকে বুঝা যায়, রাসূলের (সা) যুগে এ ধরনের আড়াল ছিল না। যেমন একটা হাদীসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, তখন পুরুষদের কারো কারো কাপড় খুবই অপর্যাপ্ত ছিল। ফলে রাসূল (সা) নারীদেরকে সেজদা থেকে কিছুটা দেরিতে মাথা তুলতে অনুরোধ করেছিলেন, যেন পুরুষরা এ সময়ের মধ্যে নিজেদের কাপড় ঠিকঠাক করে নিতে পারে।

মসজিদে খুতবার কোনো অংশ মিস করে গেলে তৎক্ষণাৎ পুরুষদেরকে জিজ্ঞেস করে তা জেনে নেয়া নারীদের জন্য তখন কোনো ব্যাপার ছিল না।

এমনকি, নারীরা তখন মসজিদে নিজেদের মতামতও প্রদান করতে পারত। একবার দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা) দেনমোহরের (বিয়ের আগে পুরুষ কর্তৃক নারীকে প্রদেয় আর্থিক উপহার) সীমা নির্ধারণ করে দেয়ার চেষ্টা করেন। তখন একজন নারী কোরআনের আয়াত উল্লেখ করে এই প্রস্তাবকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।

তখন নারীরা শুধু মসজিদই নয়, নানা ধরনের সামাজিক কাজেও সক্রিয় ছিল। তারা সেনাবাহিনীতেও অংশগ্রহণ করতো। এমনকি স্বয়ং ওমর (রা) একজন নারীকে মদীনার বাজারের (যেখানে খুব বেশি জনসমাগম ঘটতো) তদারককারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এছাড়া তিনি দূরবর্তী মিশনে নিয়োজিত পুরুষদেরকে নিজের স্ত্রীদের প্রয়োজন পূরণের জন্য সর্বোচ্চ চার মাসের মাথায় বাড়ি ফেরার নির্দেশ দিতেন।

চলুন, শায়খ আব্দুল্লাহ আজমীর সাথে কথোপকথনে ফিরে যাই।

বর্তমানে পুরুষরা যে ধরনের ফিতনার আশংকা করে (পুরুষরা সুন্দরী নারীদের দিকে তাকানো, কিংবা নারীরা পুরুষদের দিকে তাকানো ইত্যাদি), তখনো কি সেই সমস্যাগুলো ছিল না? মহানবীর (সা) সময়কালেও কি এসব ঘটেনি? আপনার দেয়া উদাহরণ থেকে তো তেমনটাই বুঝা যায়।

হ্যাঁ, ঘটেছিল

তারপরও মহানবী (সা) মসজিদে নারীদের জন্য কোনো আড়াল তৈরি করেননি। তাই না?

চমৎকার পয়েন্ট এটাই আসলে মূল কথা রাসূলের (সা) যুগে মসজিদে দেয়াল বা আড়াল না থাকার অনেক প্রমাণ রয়েছে তথাকথিত ফিকাহবিদরা ধরেই নিয়েছেন, যত জরুরি প্রয়োজনই  থাকুক না কেন নারীদের একা ভ্রমণ করা সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ অথচ জোরের সাথেই বলা যায়, খ্যাতিমান নারী স্কলারগণ মুসলিম বিশ্ব জুড়ে সফর করে করে মসজিদগুলোতে ক্লাস নিয়েছেন  

তারা কি পর্দার আড়ালে থেকে ক্লাস নিতেন?

না কেউ কেউ বরং মিম্বরে বসেই ক্লাস নিতেন ফাতিমা বিনতে আব্বাস ছিলেন তৎকালীন সময়ে খুবই খ্যাতিমান তিনি ইবনে তাইমিয়ার সমসাময়িক ছিলেন মিম্বরে বসেই তিনি পড়াতেন

তিনি মিম্বরে বসতেন এবং পুরুষদেরকে ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা দিতেন!

তিনি নারী-পুরুষ উভয়ের মিশ্র সমাবেশে ইসলামী  জ্ঞান শিক্ষা দিতেন

তার মুখ কি খোলা থাকতো?

হ্যাঁ

তাহলে কি তিনি বৃদ্ধা ছিলেন? কেউ কেউ বলে, তিনি সম্ভবত খুব বয়স্কা…

না, তিনি বরং খুব কম বয়সী ছিলেন তৎকালীন মদীনার সমাজের নারীরা আসলে বর্তমান আধুনিক মুসলিম বিশ্বের নারীদের চেয়েও অধিক বিপ্লবী চরিত্রের মানুষ ছিলেন

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *