মঙ্গলবার, নভেম্বর ২১, ২০১৭
হোম > লেকচার অনুবাদ > আগামী দিনের ইসলাম (শেষ পর্ব)

আগামী দিনের ইসলাম (শেষ পর্ব)

এডিটর’স নোট:

ড. তারিক সোয়াইদান আরব বিশ্বের খ্যাতিমান একজন স্কলার ও বক্তা। ২০০৪ সালে অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থীদের এক প্রোগ্রামে ‘দ্যা ফিউচার অব ইসলাম’ শিরোনামে তিনি একটি বক্তৃতা করেন। বলা যায়, ইসলাম সম্পর্কে এটি একটি কম্প্রেহেনসিভ আলোচনা। প্রথমে তিনি বিশ্বসভ্যতাগুলোর উত্থান-পতনের কারণসমূহ পর্যালোচনা করেছেন। তারপর ইসলামের আগমন, উত্থান ও পরবর্তীতে খেলাফতের পতনের কারণসমূহ তুলে ধরেছেন। সবশেষে, আগামী দিনে ইসলাম কীভাবে পুনরায় বিশ্বসভ্যতা হিসেবে পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেবে, তার রূপরেখা ব্যক্ত করেছেন।

সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য লেকচারটি ইংরেজিতে অনুলিখন ও বাংলায় অনুবাদ করেছেন মো: হাবিবুর রহমান হাবীব।


প্রথম পর্ব | দ্বিতীয় পর্ব | তৃতীয় পর্ব


উসমানীয় খেলাফতের পতন

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক পর্যন্ত ইসলামী সভ্যতার অগ্রগতির ধারা অব্যাহত ছিল। সময় সংক্ষেপ করার জন্য আমি বেশ কিছু ঘটনা বাদ দিয়ে দ্রুত ইতিহাস বলে যাওয়ার চেষ্টা করবো।

তখন পর্যন্ত উসমানীয় খেলাফত ছিল ইসলামের কেন্দ্রভূমি। শুরুর দিকে প্রচণ্ড প্রতাপশালী এই খেলাফত ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। বিংশ শতাব্দীতে এসে সাম্রাজ্যটি খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে।

তখন খলিফা ছিলেন সুলতান আব্দুল হামিদ। ফিলিস্তিন ভূমি যেন ইহুদীদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়, সেই উদ্দেশ্যে একদিন থিওডর হার্জেলের নেতৃত্বে এক দল ইহুদী আসে। এ ব্যাপারে তারা খলিফার সাথে সমঝোতা করার চেষ্টা চালায়। খলিফা তাদেরকে বললেন, এই সমঝোতা হতে পারে কেবল আমার লাশের বিনিময়ে! এ কথা শুনে তারা ফিরে গেলো। সুইজারল্যান্ডের ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত ইহুদী সম্মেলনে হার্জেল বললেন, আব্দুল হামিদ যতদিন মুসলমানদের নেতৃত্বে থাকবেন, ততদিন পর্যন্ত ফিলিস্তিন নিয়ে আমাদের কোনো আশা নেই। তাকে অবশ্যই ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে।

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক

এই লক্ষ্যে তারা বছরের পর বছর ধরে কাজ করে যেতে লাগলো। এক পর্যায়ে তারা তুরস্কের ভেতরেই তাদের অনুগত একটি গোষ্ঠী গড়ে তুলতে সক্ষম হলো। প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি  তাদের সাথে হাত মেলালো। এদের মধ্যে একজন ছিলেন সেনাবাহিনীর একটি ডিভিশনের কমান্ডার। তার নাম মোস্তফা কামাল। পরবর্তীতে তাকে আতাতুর্ক (জাতির পিতা) হিসেবে অভিহিত করা হয়। এটি তার উপাধি, নামের অংশ নয়।

যাই হোক, ব্যাপক ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। ১৯০৯ সালে তারা খলিফা আবদুল হামিদকে নির্বাসনে পাঠাতে সক্ষম হয় এবং কর্তৃত্ব তাদের হাতে চলে আসে। যদিও তখন পর্যন্ত  খেলাফত ছিল। তবে তা ছিল নামে মাত্র। সুলতান আব্দুল হামিদের পর একে একে সিংহাসেন আরোহণ করেন সুলতান মোহাম্মদ রাশাদ ও সুলতান মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ। কিন্তু ক্ষমতার চাবিকাঠি ছিল মূলত ইহুদীদের অনুগত ব্যক্তিদের হাতে।

লরেন্স অব অ্যারাবিয়া

ব্রিটেন, ফ্রান্স ও অন্যান্য ইউরোপীয়রা তখন বেশ শক্তিশালী ছিল। তারা এই দুর্বল সম্রাজ্যটি দখল করে নিতে চাইলো। তাই তারা সংঘবদ্ধ হয়ে মুসলমানদের উপর আক্রমণ শুরু করলো। এক পর্যায়ে তারা মিশর দখল করে নিতে সক্ষম হয়। তারপর তারা ফিলিস্তিন দখলের চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু উসমানীয় সেনাবাহিনী তাদেরকে দক্ষিণ জর্ডানের আকাবা অঞ্চলে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়। ফলে এডমন্ড অ্যালেনবি তার ব্রিটিশ সেনাবাহিনী নিয়ে ফিলিস্তিনের দিকে অগ্রসর হতে পারছিল না। তাই ব্রিটিশরা এবার অটোমানদের প্রতিরোধ ব্যূহ ভেঙে দিতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করলো। তারা নিজস্ব গুপ্তচর পাঠালো। সেই গুপ্তচরের নামটি খুবই বিখ্যাত– লরেন্স অব অ্যারাবিয়া। তিনি যে ব্রিটিশ গুপ্তচর ছিলেন, তার প্রামাণ্য দলীল রয়েছে।

তিনি হেজাজ শহরে গিয়ে তৎকালীন আরবদের নেতা শরীফ হোসাইনের ছেলে ফয়সালের সাথে দেখা করলেন। তিনি তাকে আরব জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হলেন। তাকে বললেন– আপনারা তো তুর্কি নন, আরব। তাহলে আপনাদের পক্ষে কীভাবে তুর্কিদের কর্তৃত্ব মেনে নেয়া সম্ভব! আপনারা যদি তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়তে চান, তাহলে আমরা সহায়তা করবো। ব্রিটিশরা তাদের আরো কথা দিলো– আপনারা তুর্কিদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে যদি সহায়তা করেন, তাহলে আমরা পুরো আরব অঞ্চল নিয়ে একটি স্বাধীন আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে দিবো। এভাবে আরবরা মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে ব্রিটিশদের পক্ষে যোগদান করলো।

শরিফ হোসাইনের সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন তার ছেলে ফয়সাল। লরেন্সের পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা পূর্ব দিক থেকে আকাবায় আক্রমণ চালালো। অটোমানরা পশ্চিম দিক ও সাগর পথের আক্রমণ ঠেকাতে সেনাবাহিনী প্রস্তুত রেখেছিল। কিন্তু পূর্ব দিক থেকে আক্রমণ তাদের জন্য ছিল অপ্রত্যাশিত। ফলে আকস্মিকভাবেই আরবদের হাতে আকাবা শহরটির পতন ঘটলো। তারপর ফিলিস্তিন ও সিরিয়ায় ব্রিটিশ ও আরবরা যৌথভাবে আক্রমণ চালিয়ে সেখান থেকে তুর্কিদের বিতাড়িত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। এরপর ফয়সালের নেতৃত্বে আরব বাহিনী ও অ্যালেনবির নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনীর মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চল দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেলো।  

অ্যালেনবি এক পর্যায়ে জেরুসালেম দখল করলেন। তারপর সালাহ উদ্দীন আইয়ুবীর সমাধিতে গিয়ে কবরে লাথি মারলেন। তখন তার স্বগোতোক্তি ছিল– ‘সালাহ উদ্দীন! আমরা ফিরে এসেছি, আরবদের সহযোগিতা নিয়েই আমরা ফিরে এসেছি!’ ইতিহাসের কি নিষ্ঠুর পরিহাস!

তারপর দামেস্ক দখল নিয়ে শুরু হলো দুই বাহিনীর মধ্যে প্রতিযোগিতা। উভয় বাহিনী একই দিনে শহরটিতে প্রবেশ করে।

আরব জাতীয়তাবাদ ও সাইকস-পিকট চুক্তি

সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে তখন নানা ধরনের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ চলছিল। অবশেষে ব্রিটিশরা সিদ্ধান্ত নিলো, আল-হোসেইন পরিবারের হাতে তারা নামে মাত্র আরবের শাসন ক্ষমতা অর্পণ করবে। ফলে শরিফ হোসাইনের ছেলে ফয়সাল পেলেন দামেস্কের ক্ষমতা, রাজী পেলেন ইরাকের ক্ষমতা। এভাবে অন্যরা বাদবাকি অঞ্চলের ক্ষমতা পেলো। তবে সবই ছিল নামে মাত্র। এটি ১৯১৭ সালের ঘটনা। এর আগে ১৯১৬ সালে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে একটি গোপন চুক্তি হয়েছিল।

আমি বলবো, এগুলো ছিল আরবদেরই হাতের কামাই। কিন্তু তখন তারা যড়যন্ত্রটা বুঝতে পারেনি, যা আমরা এখন বুঝতে পারছি। পরবর্তীতে ব্রিটিশ দলিলপত্র প্রকাশ হয়ে পড়লে দেখা গেলো, ১৯১৬ সালেই ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মধ্যে চুক্তিটি হয়েছিল, যা ‘সাইকস-পিকট চুক্তি’ হিসেবে এখন পরিচিত। চুক্তির শর্তানুযায়ী আরব ভূমি দখল করার পর সিরিয়া ও লেবানন পাওয়ার কথা ফ্রান্সের। আর অবশিষ্ট আরব অঞ্চল পাবে ব্রিটেন। তবে ইতালি এই ভাগাভাগিতে ক্ষুব্ধ হয়। তাই ইতালিকে লিবিয়ার ভাগ দেয়া হয়।

মহানবী (সা) বলেছেন,

تُوْشِكُ أَنْ تَدَاعَى عَلَيْكُمُ الأُمَمُ كَمَا تَدَاعَى الْأَكَلَةُ إِلىٰ قَصْعَتِهَا. قَالُوْا أَمِنْ قِلَّةٍ نَحْنُ يَا رَسُوْلَ اللهِ؟ قَالَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كَلاَّ،  بَلْ أَنْتُمْ كَثِيرٌ، وَلٰكِنَّكُمْ غُثَاءٌ كَغُثَاءِ السَّيْلِ. قَالُوْا مِمَّ ذٰلِكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ! قَالَ: لَمَّا أَصَابَكُمُ الْوَهْنُ. قَالُوْا: وَمَا الْوَهْنُ يَا رَسُوْلَ اللهِ! قَالَ: حُبُّ الدُّنْيَا وَكَرَاهِيَةُ الْمَوْتِ

ভাবানুবাদ: শীঘ্রই অন্যান্য দেশ তোমাদের বিরুদ্ধে পরস্পরকে (ঐক্যবদ্ধ হওয়ার) আহ্বান করবে, যেভাবে মানুষ নৈশভোজের জন্য একে অন্যকে আমন্ত্রণ করে। সাহাবীরা তখন জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা)! আমরা কি সংখ্যায় তখন এতোই কম হবো (যাতে আমরা পরাজিত হয়ে পড়বো)?  রাসূল (সা) বললেন, না, তোমরা বরং সংখ্যায় অনেক বেশি হবে। কিন্তু তখন তোমরা হয়ে পড়বে জলে ভাসা খড়কুটোর মতো। তারা জিজ্ঞেস করলেন, কেন আমাদের এই অবস্থা হবে? তিনি বললেন, কারণ, তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে। তারা জিজ্ঞেস করলেন, কেন আমরা দুর্বল হয়ে পড়বো, ইয়া রাসূলুল্লাহ? তিনি বললেন, যখন তোমরা দুনিয়ার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে এবং মৃত্যুর কথা ভুলে যাবে, তখন দুর্বল হয়ে পড়বে।

অতএব, মুসলিম উম্মাহর একমাত্র আকাঙ্খা হওয়া উচিত আখেরাতকে ভালোবাসা এবং মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা।

যাই হোক, আগের কথায় ফিরে আসি। এভাবেই শত্রুরা আমাদের বোকা বানিয়েছিল। তারা আমাদের ভূমি দখল করেছে। তারপর সব জায়গায় পুতুল সরকার বসিয়েছে। মুসলমান ও আরবদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করেছে। ফলে আরব ও তুর্কিদের মধ্যে পারস্পরিক বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে। এ ধরনের অনেক সমস্যা তৈরি হয়েছে।  

১৯২৪ সালে কামাল আতাতুর্ক খেলাফত ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘোষণা করলেন। তিনি ঘোষণা করেন, আমরা এই নামে পরিচিত হতে চাই না। তুরস্ক এখন থেকে আর মুসলিম বিশ্বের অংশ নয়। আমরা ইউরোপীয় হিসেবে পরিচিত হতে চাই। আমরা আরবি ভাষা ও বর্ণমালা আর ব্যবহার করতে চাই না।

এর ধারাবাহিকতায় আরবি ভাষায় আজান পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে আজান দিতে হতো তুর্কি ভাষায়। সম্ভবত ৫৪ বছর পর্যন্ত তুর্কি ভাষায় আজান দিতে হয়েছিল! এরচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যাপার আর কী হতে পারে? আমরা অধঃপতনের সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে গিয়েছিলাম। কী দুর্ভাগ্য!

وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللّٰهُ وَاللّٰهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ

এবং তারা নানা রকম পরিকল্পনা আঁটতো, আর আল্লাহও পরিকল্পনা আঁটতেন। নিশ্চয় আল্লাহই সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী। (সূরা আনফাল: ৩০)



বিংশ শতাব্দীতে ইসলামী পুনর্জাগরণ

১৯২৪ সালে খেলাফতের আনুষ্ঠানিক পতন ঘটায় বিশ্ব রাজনীতিতে ইসলামের আর কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকলো না। মুসলমানরা চরম দুর্বল হয়ে পড়লো। বিচ্ছিন্ন কিছু উদাহরণ ছাড়া ইসলামের জন্য স্কলারদের কোনো অবদান ছিল  না। জামালুদ্দীন আফগানী, মোহাম্মদ আব্দুহু, রশিদ রিদার মতো অল্প কয়েকজন মাত্র কাজ করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সবাই নিজের মতো করেই করছিলেন। সম্মিলিতভাবে কোনো কাজ হচ্ছিল না। কেউ এগিয়ে এসে বলছিল না– আসুন সবাই মিলে ইসলামের জন্য কাজ করি।

তারপর আকস্মিকভাবেই কয়েকজন মহান স্কলার আবির্ভূত হলেন। অথচ অনেকেই তখন যোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব ওঠে আসেনি। আসলে অতীতেও কখনো এমনটি হয়নি। সবসময়ই কাজের শুরু হয় স্কলারদের মাধ্যমে। তারপর তা জনসাধারণের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে নেতৃত্ব ওঠে আসে। আমরা জানি– كَمَا تَكُوْنُوْا يُوَلَّى عَلَيْكُمْ (মানুষ যেমন, নেতৃত্বও তেমন)।

অতএব, অবশ্যই শুরুতে একটি গণআন্দোলন থাকতে হবে। কিন্তু এর সূচনা কে করবেন? অবশ্যই স্কলারগণ। বিংশ শতাব্দীতে যেসব মহান ব্যক্তি মুসলমানদেরকে সংঘবদ্ধ করেছেন, তাদের মধ্যে প্রথমেই আসে ইমাম হাসান আল বান্নার নাম। খেলাফতের পতনের মাত্র চার বছর পর ১৯২৮ সালে তিনি মিশরে তার এই আন্দোলন শুরু করেন। অনেক মানুষ তার আন্দোলনে শামিল হতে থাকলো। সুন্নী ধারার মুসলমানরা (আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত) এতে শরীক হতে থাকলো। আরব উপদ্বীপে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লো। মরক্কোতেও আন্দোলন শুরু হলো। ফিলিস্তিনেও আন্দোলন গড়ে ওঠতে থাকে। সিরিয়ায় আন্দোলনটি শুরু হয় মোস্তফা আস-সিবায়ীর নেতৃত্বে। আমিনুল হোসাইনীসহ  অনেকেই বিভিন্ন অঞ্চলে এই আন্দোলন গড়ে তুলতে শুরু করলেন। তারপর হঠাৎ করে একই ধ্যান-ধারণার আলোকে পাকিস্তানে একজন আন্দোলন শুরু করলেন। হাসান আল-বান্নার সাথে যার ইতোপূর্বে দেখাও হয়নি। তিনি হলেন ইমাম আবুল আ’লা মওদূদী।

ইসলামী পুনর্জাগরণের তাৎপর্য ও ধারাবাহিকতা

উল্লেখিত সবার মূল বক্তব্য কী ছিল?

আমাদের ভরসার একমাত্র জায়গা হলো ইসলাম। ইসলাম নিছক ইবাদতের জন্য নয়। ইসলাম হচ্ছে একটি জীবনব্যবস্থা। রাজনীতি, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক আইন, বিচারব্যবস্থা, সমাজ জীবন ইত্যাদি সবই ইসলামের অন্তর্ভুক্ত। আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামের বক্তব্য রয়েছে। আমাদেরকে আবার জেগে ওঠতে হবে। আমাদের তরুণদেরকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের ইতিহাসে নারীরা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার শিকার। ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণের ক্ষেত্রে তাদেরকেও অতি অবশ্যই ভূমিকা রাখার সুযোগ হবে।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা! গত ছয়’শ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম সর্বত্র ইসলামী পুনর্জাগরণ আন্দোলন শুরু হয়েছে। অতীতে আপনারা এই আন্দোলন হয়তো দেখেছেন লিবিয়া, সুদান, বাংলাদেশ কিংবা অন্য কোথাও। কিন্তু সেগুলো সফল হয়নি। তবে বর্তমানে আপনি মুসলিম বিশ্ব কিংবা অমুসলিম বিশ্ব– যেখানেই যান না কেন, আপনি দেখবেন সর্বত্রই মুসলনরা দ্বীনের দিকে ফিরে আসছে। ইসলামের প্রতি তরুণদের কমিটমেন্ট চোখে পড়ার মতো। এর প্রেক্ষিতে আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, আমরা আবার স্রোতের গতিপথ ঘুরিয়ে দিতে পারবো। আমি এই সম্ভাবনা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, ঠিক যেভাবে আপনাদেরকে এখন দেখছি।

ইতিহাসের গতিপথ

প্রিয় ভাই ও বোনেরা! বেশিরভাগ মানুষ ৯/১১, বেনিন হামলা ইত্যাদি সব ঘটনা নিয়ে চিন্তিত। তারা আসলে সামগ্রিক চিত্রটা দেখতে পাচ্ছে না। খুব কম মানুষই এ বিষয়ে সচেতন। এই সামগ্রিক চিত্রটা পেতে হলে ইতিহাস ও সভ্যতার গতিধারা বুঝতে হবে।

ইসলাম খুব দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। তারপর প্রায় ৮’শ বছর ধরে এটি ক্রমাগত বিস্তৃত হতে থাকে। অতঃপর গত ৬’শ বছর ধরে পতন হতে হতে ১৯৪৮ সালে একবার এবং ১৯৬৭ সালে আবারো একদম তলানীতে এসে ঠেকে। ওই সময় আমরা আল্লাহ তায়ালার শত্রু ইহুদীদের কাছে পরাজিত হই। তারা আমাদের কেন্দ্রভূমি ফিলিস্তিন দখল করে নেয়। ইতিহাস অধ্যয়ন করলে আপনারা দেখতে পাবেন, ১৯৬৭ সালের পর আবারো শক্তিশালী পুনর্জাগরণ শুরু হয়। এর আগে আরব জাতীয়তাবাদ ইত্যাদির ব্যাপক প্রভাব ছিল। কিন্তু ১৯৬৭ সালের পরাজয়ের পর আমরা আবার জেগে ওঠি এবং নতুন করে পুনর্জাগরণ শুরু হয়। প্রথমবারের মতো মুসলমানরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলে। মুসলমানদের উদ্যোগে ব্যাংক, মিডিয়া, সংবাদপত্র, স্যাটেলাইট টিভি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম নারী ও শিশুদের জন্য নানা সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। এক কথায় দুনিয়া জুড়ে প্রতিটি সেক্টরে মুসলমানদের অংশগ্রহণ শুরু হয়।

আগামী দিনের ইসলাম

সব মিলিয়ে একটা জোয়ার তৈরি হয়েছে। কিন্তু এর পরবর্তী ধাপ কী? আগামী দিনের ইসলাম কেমন হবে?

মহানবীর (সা) একটি প্রসিদ্ধ হাদীস শুনিয়ে আজকের আলোচনা শেষ করবো। এই হাদীসটির মাধ্যমে তিনি যেন আমাদের নিকট ইতিহাসের গতিপথ জানিয়ে দিচ্ছেন। হাদীসটি ইমাম আহমদ তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন। নাসিরুদ্দীন আলবানী সংকলিত হাদীস গ্রন্থসহ আরো অনেক গ্রন্থে হাদীসটি স্থান পেয়েছে। তাই এটি নিয়ে কোনো সংশয় নেই বলা যায়।

تكون النبوة فيكم ما شاء الله ان تكون ثم يرفعها إذا شاء ان يرفعها ثم تكون خلافة على منهاج النبوة فتكون ما شاء الله ان تكون ثم يرفعها إذا شاء الله أن يرفعها ثم تكون ملكا عاضا فيكون ما شاء الله ان يكون ثم يرفعها إذا شاء أن يرفعها ثم تكون ملكا جبرية فتكون ما شاء الله ان تكون ثم يرفعها إذا شاء ان يرفعها ثم تكون خلافة على منهاج النبوة ثم سكت

ভাবানুবাদ: আল্লাহ তায়ালা যতদিন চাইবেন, ততদিন পর্যন্ত তোমাদের মাঝে নবুয়ত বহাল থাকবে। অতঃপর আল্লাহ যখন চাইবেন, তখন তিনি তা উঠিয়ে নেবেন। তারপর নবুয়তী শাসনব্যবস্থার মতোই খেলাফত ব্যবস্থা আসবে। আল্লাহ যতদিন চাইবেন, ততদিন তা থাকবে এবং আল্লাহর ইচ্ছায় এক সময় এর সমাপ্তি ঘটবে। অতঃপর আসবে রাজতন্ত্রের যুগ। আল্লাহ যতদিন চাইবেন ততদিন এসব রাজতন্ত্র টিকে থাকবে এবং আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী এর সমাপ্তি ঘটবে। তারপর আসবে সামরিক শাসন।[1] আল্লাহ যতদিন চাইবেন, ততদিন এ শাসন থাকবে। তারপর আল্লাহর ইচ্ছায় এর অবসান ঘটবে। তারপর নবুয়তী শাসনব্যবস্থার মতো খেলাফত ব্যবস্থা আবারো প্রতিষ্ঠিত হবে। এ কথা বলে  রাসূল (সা) চুপ হয়ে গেলেন।

(মুসনাদে আহমদ, চতুর্থ খণ্ড, (কায়রো: মুয়াসসাহ আল-কুরতুবাহ), ২৭৩, (নং. ১৮৪৩০).)

আল্লাহর রাসূলের (সা) এই হাদীসের প্রতিটি ধাপকে আমরা সত্যে পরিণত হতে দেখছি। প্রথমে নবুওয়াত বহাল ছিল মাত্র ২৩ বছর। তারপর এসেছিল খেলাফত, যা ৩০ বছর পর্যন্ত বহাল ছিল। তারপর এসেছে রাজতন্ত্র। রাজতন্ত্র বুঝাতে হাদীসে ‘মুলকান আ-দ্দান’ পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী রাজতন্ত্র বুঝাতে আরবীতে এই পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়। বাস্তবেও আমরা এর ঐতিহাসিক সত্যতা পেয়েছি। যেমন, উমাইয়া শাসন ছিল ১৩০ বছর, আব্বাসীয় শাসন ছিল ৪’শ বছর। এভাবে মামলুক, ফাতেমীসহ আরো অনেকে দীর্ঘদিন শাসন করেছে। উসমানীয় শাসন প্রায় ৬’শ বছর টিকে ছিল। তারপর মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে এসব রাজতন্ত্রের অবসান ঘটেছে। তারপর এসেছে সামরিক শাসন। বর্তমানে কয়টা মুসলিম দেশ সামরিক শাসনের বাইরে? চারপাশে খেয়াল করে দেখুন! গুটি কতক বাদে প্রায় সব মুসলিম দেশই সামরিক শাসনের অধীন। রাসূল (সা) সত্য কথাই বলেছেন। চৌদ্দশ বছর আগের একটি হাদীসের সত্যতা আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। সামরিক শাসনের যুগের সমাপ্তির পর কী আসবে– এ সম্পর্কে যদি আমরা কোনো মতামত দেই, তাহলে তাতে সন্দেহের অবকাশ থাকে। কিন্তু এ ব্যাপারে স্বয়ং মহানবী (সা) জানিয়ে গেছেন, যিনি নিজ থেকে কিছু বলেন না। আল্লাহ বলেছেন,

 وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ. إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ

তিনি নিজ থেকে কোনো কথা বলেন না। বরং এসব কথা অহী ছাড়া আর কিছু নয়, যা তার কাছে পাঠানো হয়। (সূরা নাজম: ৩-৪)

অতএব, রাসূলের (সা) ভবিষ্যতবাণী অনুযায়ী মুলকান জাবরিয়্যাহর পর আবু বকর, ওমর, উসমান, আলীর খেলাফত ব্যবস্থার মতো ব্যবস্থা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে।

উপসংহার

তারপর কোন ব্যবস্থা আসবে, আমরা তা জানি না। কিন্তু ইসলাম যে আবারো বিজয়ী হতে যাচ্ছে, এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। আগামী দিন হবে ইসলামের দিন। তাই এখন আপনাদের সামনে রয়েছে দুটি পথ: ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে কাজ করা এবং পরকালে পুরস্কৃত হওয়া, নতুবা বস্তুবাদী জীবন উপভোগ করা এবং পরকালে বঞ্চিত হওয়া।

মক্কা বিজয় সম্পর্কে নাজিল হওয়া একটি আয়াত এ প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

لَا يَسْتَوِي مِنكُم مَّنْ أَنفَقَ مِن قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ ۚ أُولَـٰئِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِّنَ الَّذِينَ أَنفَقُوا مِن بَعْدُ وَقَاتَلُوا

তোমাদের মধ্যে যারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে ও জিহাদ করেছে, তাদের মর্যাদা এক নয়। এরূপ লোকদের মর্যাদা তাদের চেয়ে বেশি, যারা বিজয়ের পরে ব্যয় করবে ও জিহাদ করবে। (সূরা হাদীদ: ১০)

এখানে বিজয় বুঝাতে ‘ফাতাহ’ না বলে ‘আল-ফাতাহ’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ, সুনির্দিষ্ট বিজয় তথা মক্কা বিজয়ের কথা বলা হয়েছে। অবাক করা ব্যাপার হলো, এই আয়াত যখন নাজিল হয়, তখনো মক্কা বিজয় হয়নি! আল্লাহ নিজেই বলেছেন, বিজয় আসার আগে যারা জিহাদ ও অর্থ ব্যয় করবে তারা অধিক উত্তম।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা! সিদ্ধান্ত এখন আপনার হাতে। আমরা যদি ইসলামের জন্য কাজ করি, তাহলে কাঙ্খিত বিজয় দ্রুত আসবে। আর যদি অলসতা করি, তাহলে বিজয় আসতে সময় লাগবে।

তাই আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব হলো আত্মগঠন করা, পরিবার গঠন করা এবং প্রত্যেকেই যেন ইসলামের পথে চলে, সে ব্যাপারে সচেষ্ট থাকা। আপনার চারপাশে ইসলামের আদর্শকে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করুন। মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিন। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখার চেষ্টা করুন। ইসলামী সংগঠন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, স্কুল, মিডিয়া, রাজনৈতিক দল ইত্যাদি গড়ে তুলুন। আল্লাহ তায়ালা যে বিজয়ের ওয়াদা করেছেন, আগামী দিনে ইসলামের সেই নিশ্চিত বিজয়ের অংশীদার হতে অন্তত কিছু একটা করুন।

ধৈর্য ধরে এতক্ষণ আমার কথা শোনার জন্য আপনাদেরকে ধন্যবাদ।

هٰذَا، وَصَلَّى اللهُ وَسَلَّمَ عَلىٰ سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَّعَلٰى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِيْنَ. شَكَرَ اللهُ لَكُمْ، وَبَارَكَ اللهُ فِيْكُمْ. وَنَسْئَلُ اللهُ تَعَالَى لَنَا وَلَكُمُ الْقَبُوْلُ. وَالسَّلاَمُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ.


নোট:

[1] হাদীসে ব্যবহৃত ‘মুলকান জাবরিয়্যাহ’ পরিভাষার অর্থ হলো জবরদস্তিমূলক শাসন। ড. সোয়াইদান যদিও এর অর্থ করেছেন সামরিক শাসন। আসলে সামরিক শাসন হলো জবরদস্তিমূলক শাসনের একটি প্রকার মাত্র। স্বৈরাচারী শাসনও জবরদস্তিমূলক শাসনের আওতায় পড়ে। – সম্পাদক

মো: হাবিবুর রহমান হাবীব
মো: হাবিবুর রহমান হাবীব
প্রাক্তন শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চবি। সমাজ উন্নয়ন কর্মী। Email: habibircu5@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *